logo

চম্পাবতী : ঐতিহ্য-উৎসারী নান্দনিক প্রযোজনা

আ বু  সা ঈ দ  তু লু 

আত্মঘাতী এক বেদেনারীর ত্যাগ ও প্রেমের আকুলতায় ভরা মানবিক হৃদয় ক্ষরণের আখ্যান চম্পাবতী নাটক। অস্পৃশ্য বেদে সম্প্রদায়ের বাস্তবতা দ্বন্দ্বসংঘাত, পরিণতি-আত্মত্যাগ ও নারী স্বাতন্ত্র্যের অনবদ্য রূপ মানবিক আলেখ্য ফুটে উঠেছে চম্পাবতী প্রযোজনায়। ‘সাধনা’র সাম্প্রতিক প্রযোজনা চম্পাবতী শিরোনামে এ-নাট্য। ২০১৩ সালের ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর সেগুনবাগিচার এক্সপেরিমেন্টাল মঞ্চে নাট্যটির উদ্বোধনী প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে এ উপস্থাপনার যাত্রা শুরু হয়। পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ে অবলম্বনে নবনাট্যায়ন করেছেন এ-সময়ের প্রথিতযশা কবি সৈয়দ শামসুল হক। চম্পাবতীর নির্দেশনায় রয়েছেন তিনজন। নৃত্যে – সাবিবর আহমদ খান, নাট্যে – শামীম হাসান এবং শিল্পে – লুবনা মারিয়াম। গত জানুয়ারিতে নাট্যটির তৃতীয় প্রদর্শনী হয়। ওই প্রদর্শনীর ওপর ভিত্তি করে নাট্যটির শিল্পবৈশিষ্ট্য-বৈচিত্র্য, নান্দনিকতা, বাংলাদেশি জীবনে বেদে, নাটকে রূপায়িত বেদেজীবন বা উপস্থাপন-প্রক্রিয়া, পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ও সৈয়দ শামসুল হকের মধ্যকার চিন্তনগত পার্থক্য, সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য, নাটকীয়তা এবং দর্শকদের উপযোগিতা অনুসন্ধানই লেখাটির মূল লক্ষ্য।

‘সাধনা’ বাংলাদেশের পরিবেশনা শিল্পচর্চায় একটি স্বনামধন্য সুপরিচিত সংগঠন। ঐতিহ্যের প্রতি দায়িত্ববোধ এ-সংগঠনটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। নৃত্যভিত্তিক এ-সংগঠনটি গড়ে উঠলে ঐতিহ্যের ধারার নানা মাত্রার শিল্পপ্রেরণ লক্ষ করা যায়। চম্পাবতী নাট্যটি সাধনার পঞ্চদশ প্রযোজনা। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় নির্দেশনার একক ঘরানাকে ভেঙে সাধনা নির্দেশনায় যুক্ত করেছে প্রগতিশীল উদার নতুন এক মাত্রা। সাধারণত নাট্য-প্রযোজনাগুলোয় একজন নির্দেশকের অধীনে বিভিন্ন ডিজাইনার থাকেন; কিন্তু এ-প্রযোজনায় সমকালীন ফিউশন চিন্তন ধারার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে এ-নাট্য নির্মাণে একক কোনো নির্দেশক নেই। প্রায়োগিক বৈশিষ্ট্যে সাধনার এ-ধরনের কর্ম নিঃসন্দেহে নাট্যক্রিয়ায় নতুন মাত্রা সংযোগ। চম্পাবতী প্রযোজনাটি নৃত্যনাট্য ব্যানারে উপস্থাপিত হলেও সমকালীন বাংলা নাট্যবৈশিষ্ট্যে প্রত্যুজ্জবল। নৃত্যের মুভমেন্ট, মুদ্রা ও অভিব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ঘটনাবিন্যাসের ধারায় নৃত্য-অভিনয়-সংগীত-বর্ণনা-উপকরণ-উক্তি-প্রত্যুক্তির সমন্বিত ও পরিমিত মাত্রার উপস্থাপনে অনন্যসাধারণ শৈল্পিক হয়ে উঠেছে প্রযোজনাটি।

সৈয়দ শামসুল হক এই চম্পাবতী নাট্যটি গ্রহণ করেছেন বাংলা সাহিত্যে পল্লিকবি-খ্যাত জসীমউদ্দীনের জনপ্রিয় বেদের মেয়ে নাটক থেকে। জসীমউ্দীন ১৯৫১ সালে গীতিনাট্য হিসেবে
এ-নাটকটি রচনা করেছেন। জানা যায়, ১৯৫১ সালে কবির এক বন্ধু পাটোয়ারী সাহেব চাঁদপুরের মতলব থানায় পূর্ববঙ্গের বেদে নিয়ে একটি কনফারেন্সের আয়োজন করেন। এ আয়োজন উপলক্ষে কবি জসীমউদ্দীন বেদের মেয়ে নাটকটি রচনা করেন। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরি গ্রন্থাকারে তা প্রকাশ করে। স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে নাটকটির ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং বহুল প্রযোজনা লক্ষ করা যায়। নাটকের পটভূমিতে বেদের জীবনচিত্র, বিয়োগান্ত ব্যাখ্যান, আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ ও নাটকীয় বৈচিত্র্যে অনবদ্য হয়ে ওঠে এটি। নাটকটি তিনটি অঙ্ক এবং এগারোটি দৃশ্য সংবলিত। থিয়েটারে প্রথম অভিনয় ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৫ সালে ঢাকায়। অভিনয় করেন – আবদুল মতিন, আবদুল করিম, নূরুল আনাম খান, বিনয় বিশ্বাস, ওসমান খান, সোহরাব হোসেন, টি করিম, গোলাম মোস্তফা, শেখ মোহিদুল হক, পিয়ারী বেগম, গীতা দত্ত, বিলকিস বারী, বুলবুল ইসলাম, বেলা, ফেরদৌসী বেগম ও রাবেয়া; চম্পাবতী চরিত্রে ছিলেন পূর্ণিমা সেনগুপ্তা। পরিচালনায় ছিলেন আবদুল করিম।

জসীমউদ্দীন প্রথম দিকে কাব্যচর্চায় নিবিষ্ট থাকলেও পূর্ণাঙ্গ বয়সে নাট্য রচনার দিকে মনোনিবেশ করেন। জসীমউদ্দীনের পূর্ণাঙ্গ নাটক ও একাঙ্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে – পদ্মাপার (১৯৫০),  বেদের  মেয়ে (১৯৫১), মধুমালা (১৯৫১), পল্লীবধূ (১৯৫৬),  গ্রামের মায়া (১৯৫৯), ওগো পুষ্পধনু (১৯৬৮), আসমান সিংহ (১৯৬৮) প্রভৃতি। সম্ভবত তৎকালীন নাট্যচর্চা ইউরোপীয় তত্ত্বনির্ভরতার জটিলতায় অনেক নাট্যকারকেই নাট্যচর্চায় ও ইতিহাসকরণে সাধারণত উপেক্ষিত হতে দেখা যায়। অত্যন্ত শিল্পকুশলতায় গ্রামীণ জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, সমাজ, জীবনবোধ, পরিবেশ-প্রকৃতি অনবদ্য সার্থক ও শিল্পকুশলতায় তুলে ধরেছেন। প্রচলিত ধারণায় জসীমউদ্দীনের কবর কবিতার মধ্য দিয়ে কবিপরিচয়ের বিধৃতি ঘটলেও মূলত কর্মসূত্রেই সমৃদ্ধি ঘটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতায়; গ্রামীণ জীবন, সাহিত্য-সংস্কৃতির গভীর চিত্র। ফলে কাব্যধারায় ক্রমশ হয়ে ওঠেন গ্রামবাংলার জীবনচিত্রের প্রতিলিপিকার। ব্যক্তিগত জীবনে সুশিক্ষিত এবং আধুনিক শিল্পচেতনার ধারক হিসেবে গ্রামবাংলার গেঁয়োতার বিপরীতে গ্রামীণ বোধ-বিশ্বাসের বিষয়গুলোর রুচিশীল শৈল্পিকমাত্রার প্রকাশ।

সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘জসীমউদ্দীনের ‘বেদের মেয়ে’ আর আমার ‘চম্পাবতী’-র মিল যতটা না তার অধিক অমিল। লোকজ ঐতিহ্য থেকে নেয়া গল্প ও গীতের সমাহারে আমার অগ্রজ কবি যে নাটকটি রচনা করেছিলেন, বহুদিন থেকেই আমি তার গঠন-শরীরে কিছু পঙ্গুতা লক্ষ করে উঠি, বিশেষ করে চরিত্র নির্মাণে, ঘটনা রচনে ও এর নাট্যগমনে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছু পরেই জসীমউদ্দীন লন্ডনে এসেছিলেন। তখন আমিও লন্ডন ছিলাম।… আমি বলছিলাম তাঁর ওই নাটক বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণের কথা। জসীমভাই বড়ো বিষণ্ণ হয়েছিলেন শুনে আর বলেছিলেন তাঁর সেই অনুপম বাচনভঙ্গিতে, এই কথা! ওই নাটকের গীত আর বাক্য তো আমার বাংলার গৈগেরাম থিকা পাওয়া, তার হকদার আমি একা না, তুমিও। তবে তুমি এই মশলা নিয়ে নিজেই রচনা করো না ক্যান।’ (উত্তরাধিকার পত্রিকায় প্রকাশিত চম্পাবতী নাটকের ভূমিকায়)

সাধনা-প্রযোজিত চম্পাবতী নাট্যটির কাহিনিবিন্যাসে দেখা যায় – এক বেদে দম্পতি চম্পাবতী-গয়া। বিভিন্ন জনপদে ঘুরে ঘুরে সাপ ধরে; সাপের খেলা দেখায়। গয়া যেমন চম্পাকে ভালোবাসে, তেমনি চম্পাও গয়াকে ভালোবাসে। একদিন এক গ্রামে সাপ খেলা দেখাতে গিয়ে চম্পাবতী মোড়লের কুদৃষ্টিতে পড়ে। মোড়ল নিজের স্বার্থ চরিতার্থে অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করে বেদে বহরের ওপর। ধীরে ধীরে চম্পা জড়িয়ে যায় মোড়লের চক্রান্তের জালে। ঘটনা অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে যেতে থাকে। শেষ পর্যন্ত নিজের বেদেজাতি রক্ষার্থে নারীত্ব-স্বামী-সংসার বিসর্জন দিতে ক্রমশ বাধ্য হয়ে ওঠে চম্পা। ঘটনা-পরম্পরায় গয়া-বেদের সঙ্গে মোড়লের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বাড়তেই থাকে। কিন্তু মোড়লের শক্তির কাছে গয়া পরাভূত হয়। অন্যদিকে তার স্ত্রী চম্পাবতীকেও মোড়লের পক্ষাবলম্বী মনে হয়। গয়া চম্পাকে অত্যন্ত খারাপ এবং অসতী ভাবে। তাই দুশ্চরিত্রা চম্পাকে গয়া পরিত্যাগ করে চলে যায়। চম্পা পেছনে পেছনে দৌড়ে এসে স্বামী গয়াকে জাতিরক্ষা প্রসঙ্গটি বলতে চাইলেও গয়া কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে চম্পাকে ত্যাগ করে চলে আসে। গয়া-বেদেও চম্পাকে ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায় এবং বেদে বহরের আরেক বেদেকন্যা আসমানীকে বিয়ে করে। আসমানীকে বিয়ে করলেও মনে মনে সারাক্ষণ সে চম্পাকেই খুঁজে বেড়ায়। অপরদিকে মোড়ল চম্পাকে নামমাত্র বিয়ে করে। যদিও মোড়লের ঘরে আরেক স্ত্রী রয়েছে। চম্পা-বেদে নীচু জাতি, সেজন্য রক্ষিতা বানিয়ে শুধু ভোগ করতে চায়। চম্পা তার ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু চম্পা কী করবে। কোথায় খুঁজে পাবে গয়াকে। কারণ বেদেরা তো যাযাবর, এরা সারাক্ষণ স্থান পরিবর্তন করে চলে। ফলে চম্পার করার কিছুই থাকে না। চম্পা ও গয়া যখন পৃথক হয়ে পড়ে, তখন তারা বুঝতে পারে, দুজন দুজনকে কতটা ভালোবেসেছে এবং ভালোবাসে, যা একসঙ্গে থাকাকালে কখনো উপলব্ধি করতে পারেনি। চম্পা যেমন সারাক্ষণ গয়ার স্বপ্ন দেখে, তেমনি গয়া সারাক্ষণ চম্পা চম্পা করতে থাকে। একসময় বৈষ্ণবীর আগমন ঘটে। মোড়লের বড় বউ চম্পার বন্ধ  জীবন-যন্ত্রণা বুঝতে পারে। সঙ্গে গয়ার প্রতি ভালোবাসাও বুঝতে পারে। সামান্য কারণে কী বোকামিটাই না করে ফেলেছে চম্পা। মোড়লের বাধা সত্ত্বেও বড় বউ চম্পাকে মুক্ত করে দেয়। মোড়লের স্ত্রী বলে – ‘পক্ষী উইড়া যাও তোমার স্বজনদের কাছে।’ গৃহস্থকোণ-বন্দিমুক্ত পাখি চম্পা উড়ে যেতে থাকে গয়া-বেদের সন্ধানে। চম্পা নানা জায়গায় খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথায় গয়া-বেদের বহর দেখতে পায় না। অন্যদিকে গয়া-বেদেও চম্পার বিরহে পাগলপ্রায়। নিজ স্ত্রী আসমানীকেও কিছু বলতে পারে না। কিছু করতেও পারে না। সারাক্ষণ চোখেমুখে মনেপ্রাণে চম্পাকেই কামনা করে। চম্পার বিরহ-যন্ত্রণায় বেদে-গয়া সবসময় নিজেকে  ভয়ংকর সব কাজে প্রবৃত্ত করে। হয়তো চম্পাহীন জীবনধারণ তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে। এমনি একদিন এক সাপ খেলায় গয়া-বেদেকে বিষধর এক সাপে দংশন করে। সাপের বিষমুক্তির জন্য বহরের প্রায় সবাই নানাভাবে চেষ্টা করে। কিন্তু গয়াকে বাঁচাতে পারে না। ক্রমশ মৃতপ্রায় হয়ে উঠতে থাকে। আসলে গয়া নিজেকে যেন নিঃশেষ করে দিতে চায়। কিন্তু আসমানীকে তা বুঝতে দিতে চায় না। গয়া-বেদের মৃত্যু যখন অত্যাসন্ন, তখন শেষবারের মতো চম্পাকে একবার দেখতে চায়। তখনই কাকতালীয়ভাবে গয়াকে খুঁজতে খুঁজতে হাজির হয় চম্পা। চম্পা গয়া-বেদের এহেন বিষযন্ত্রণা দেখে উন্মাদিনী হয়ে ওঠে। চম্পা নানাভাবে, নানা কৌশলে গয়াকে বাঁচাতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু চম্পাও ব্যর্থ হয়। গয়ার মৃত্যু যখন আরো ঘনীভূত, তখন চম্পাকে গয়া আবেগঘন পরিস্থিতিতে জীবনের শেষ কথা বলতে থাকে। চম্পাও গয়াহীন জীবন অসম্ভব মনে করে। তাই নিজের জীবন বিসর্জন দেয় গয়ার জীবনকে বাঁচাতে এবং গয়ার শরীরের বিষ তুলে নেয় নিজের মৃত্যু জেনেও। এক পর্যায়ে গয়া সুস্থ হয়ে ওঠে কিন্তু চম্পা ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চম্পার এমন আত্মত্যাগের কারণ জিজ্ঞাসায় গয়াকে দেওয়া চম্পার উত্তরের একটি কথা এমন যে, ‘পঙ্খী বলে ডেকেছো যে আমায়’। চম্পা আর কোনো কথা বলতে পারে না। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় চম্পাবতীর কণ্ঠস্বর।

জসীমউদ্দীন ও সৈয়দ শামসুল হকের দুটো নাটকের মধ্যে কাহিনিগত বৃহৎ কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত না হলেও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বেশকিছু পার্থক্য বিদ্যমান। নামকরণের ক্ষেত্রে জসীমউদ্দীন বেদে নারী, জীবন ও বাস্তবতা প্রাধান্যে নামকরণ করেছেন বেদের মেয়ে; সৈয়দ শামসুল হক প্রধান চরিত্র অনুসারে নামকরণ করেছেন চম্পাবতী। বেদের মেয়ে নাটকে চরিত্রের উক্তি-প্রত্যুক্তি বা সংলাপ অনেকাংশে আবেগপ্রাধান্যে বিশ্লেষণধর্মী; চম্পাবতী নাটকে কাব্যিক ছন্দনির্ভর। ভাষার ক্ষেত্রে বেদের মেয়েতে সম্পূর্ণ গ্রামীণ; চম্পাবতীতে গ্রামীণের সঙ্গে অনেকটা প্রমিতকরণ। বেদের মেয়ে নাটকে বেদে নারী, জীবনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও হৃদয়ক্ষরণ প্রধান; চম্পাবতীতে চম্পার জীবনের দ্বন্দ্বই প্রধান। বেদের মেয়ে ইসলাম ধর্মীয় বিশ্বাস-আশ্রিত। অধিকাংশ সংলাপেই ‘আল্লাহ’-‘রাসূল’সহ নানা বিশ্বাসতাড়িত শব্দ পাওয়া যায়। কিন্তু চম্পাবতী নাটকটিতে ইসলাম ধর্ম বিষয়টিকেই রাখা হয়নি। বেদের মেয়ে নাটকে গয়া-বেদে আসমানীকে বিয়ে করার পর চম্পাবতী ফেরত এসেছিল। ফলে চম্পাবতী ও আসমানীর মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। গয়ার বিরহ ও টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু চম্পাবতীতে দৃশ্যটি উপেক্ষায় গয়ার মৃত্যুকালীন চম্পাবতী ফেরত এসেছে। প্রেম ও আবেগের প্রাধান্য সৃষ্টি হয়েছে। বেদের মেয়েতে ফকির ও বৈষ্ণবের দৃশ্য আছে। ফকিরের আধ্যাত্মিকতা এবং গ্রাম্য বিশ্বাস-সংস্কার-সংস্কৃতিতে রামদা চালান ইত্যাদি। এসব চম্পাবতী নাটকে বাদ দেওয়া হয়েছে। চম্পাবতীতে শুধু বিরহ-ব্যঞ্জনায় বৈষ্ণবদৃশ্য রয়েছে। বেদের মেয়েতে যে-গানগুলো ছিল, চম্পাবতীতে তার দু-তিনটি গান বা গানের অংশ ব্যবহার করে নতুন করে সৃষ্টি করা হয়েছে। বেদের মেয়ে নাটকের কিছু চরিত্রও চম্পাবতী নাটকে বাদ রাখা হয়েছে। সর্বোপরি কাব্যিক বিন্যাসে প্রেম-বিরহ, বিয়োগগাথায় অনন্য চম্পাবতী।

জসীমউদ্দীন না থাকলে আজকের সাহিত্য-শিল্পে জনপ্রিয় বিষয়-উপাদান হিসেবে বেদেজীবন থাকত কিনা সন্দেহ। থিয়েটারে সংলাপের গুরুত্ব থাকলেও থিয়েটার কখনোই সংলাপের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারায় নাট্যচর্চায় কিংবা সমকালীন উত্তরাধুনিক নাট্যচিন্তায় সংলাপ একেবারেই গুরুত্বহীন। কথার ছন্দযুক্ততা নাট্যদৃশ্যে খুব বেশি ভূমিকা রাখে বলে মনে হয় না। চিন্তন, দৃশ্যকাব্য বা দৃশ্য-ইমেজই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি নাট্যে। সৈয়দ শামসুল হক নাটকটির যা পরিবর্তন করেছেন; মঞ্চ-প্রযোজনায় যে-কোনো নির্দেশকই তার চেয়েও বেশি পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা করে থাকেন। উল্লেখ্য যে, সৈয়দ শামসুল হকের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় নাটকের মোড়লের ভাঁড়ামি আর চম্পাবতী নাটকের মোড়লের ভাঁড়ামি প্রায় একই; অন্তর্গত একই সূত্রে গাঁথা। বেদের মেয়ে নাটকে মোড়লের ক্ষমতা ও পশুত্ব প্রধান। ভাঁড়ামিসুলভ নাট্যচিন্তন কিংবা তত্ত্বগত চিন্তা-দর্শন পরিত্যাগ করার দিন এসেছে বোধহয়।

বেদের মেয়ে নাটক সম্পর্কে কবি জসীমউদ্দীন বলেন, ‘… গ্রাম্য যাত্রার ঢঙে নূতন করিয়া লিখিলাম। তাই পাত্র-পাত্রীদের মুখে কতকগুলি নূতন গান জুড়িয়া দিতে হইল। … যাঁহারা থিয়েটার রূপে এই নাটক অভিনয় করিবেন তাঁহারা ইচ্ছা করিলে ঐ নতুন গানগুলি বাদ দিতে পারেন। কোন গ্রাম্য যাত্রার দল যদি এই নাটক অভিনয় করেন, তাহারা ইচ্ছা করিলে পাত্র-পাত্রীদের মুখে প্রয়োজন অনুসারে আরও নতুন গান জুড়িয়া দিতে পারেন। কেহ কেহ এই কাহিনীকে নৃত্যনাট্যে রূপ দিতে চাহিয়াছেন। সেই জন্য ইহার বহু স্থানে নৃত্যের ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে। … বাংলা এবং উর্দুতে বহুবার এই নাটকের অভিনয় হইয়াছে। গ্রাম দেশের বহুস্থানে আমার জানা অজানা বহু নাটুকে দল এই নাটকের অভিনয় করিয়াছে। গ্রামদেশে বহু নাটুকে দল রূপবান যাত্রা অভিনয় করিয়া অপূর্ব নাট্য কৌশলের পরিচয় দিয়াছেন। তাঁহারা যদি এই নাটকের অভিনয় করেন আমি সব চাইতে গৌরব বোধ করিব।’ (বেদের মেয়ে নাট্যগ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকা, পলাশ প্রকাশনী)

বাংলাদেশের বেদেজীবনই এ-নাটকের পটভূমি। অস্পৃশ্য হিসেবে ‘বেদে’ জাতি ‘বাইদ্যা’ বলেও পরিচিত। অনেকে সম্মানার্থে চিকিৎসক অর্থেও ‘বৈদ্য’ শব্দটার ব্যবহার করে থাকেন। যাযাবর বেদে জাতি পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের দিকে প্রথমে আরাকান থেকে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে বসবাস শুধু করলে পরবর্তীকালে নদীভিত্তিক বাংলাদেশের নানা অঞ্চলসহ পশ্চিমবঙ্গ ও আসামেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। বেদেরা দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। বেদেদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ হলেও নারীতান্ত্রিকতাই প্রধান। বেদেদের মধ্যে বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীর ঘরে যায়। স্ত্রীকেই সাধারণত স্বামী ও সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয়। এরা বিভিন্ন মৌসুমে গ্রামেগঞ্জে পরিভ্রমণ করে থাকে। বেদে মহিলাদের গ্রামে জীবিকার উদ্দেশ্যে পরিভ্রমণকে সাধারণত গাওয়াল বা গাওয়ালি বলা হয়ে থাকে। মহিলাদের সঙ্গে থাকে সাপের ঝাঁপি ও ওষুধের ঝুলি। বেদেরা ধর্মবিশ্বাসে মুসলিম। যদিও মুসলিম সমাজের সঙ্গে এদের সম্পর্ক অত্যন্ত কম। কিন্তু সাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু হিন্দু মিথলজির সাধারণত প্রশংসা কিংবা গুণকীর্তন করে থাকে। বিশেষত মনসা দেবীকে তারা মান্য করে। বেদেরা অত্যন্ত সাহসী প্রকৃতির হয়ে থাকে। বাংলাদেশে নানা শাখার বেদের পরিচয় মেলে। তারা সবাই যাযাবর এবং ভিন্ন মাত্রিকে চিকিৎসা ব্যবসা এবং ওষুধ বিক্রয় পেশার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যেমন- লাউয়ো (মাছ ধরা), গাইন (সুগন্ধি মশলা), বেজ (চোখের চিকিৎসা), পাইল্যা (ব্যথা নিরাময়, মাছের কাঁটা, মাছের হাড্ডি, ডুবুরি), বাজিকর (শিয়ালের হাড়-হাড্ডি, পাখির তেল), বান্দাইরা (জাদু, ভোজবাজি, ওষুধ বিক্রি), মালো (সাপের বিষ, পোকা, শিঙা), সাপুড়িয়া প্রভৃতি। বেদেদের মধ্যে সাপুড়িয়া বেদেরাই একটু ব্যতিক্রম। এরাই সাপ ধরে, সাপের খেলা দেখায়। তারা সাপ বিক্রয় করে না। এরা সাপের খেলা দেখিয়ে তাবিজ-কবজসহ নানা ধরনের ওষুধ বিক্রি করে থাকে। বেদেদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় – এরা প্রত্যেকেই জমিতে কর্ষণ করে ফসল ফলানো কিংবা এ-জাতীয় কায়িক শ্রমকে ভিত্তি করে জীবনধারণকে যথার্থ বা সঠিক বা মর্যাদাপূর্ণ বলে মনে করে না। (‘বেদে’  অন্তর্ভুক্তি, বাংলা পিডিয়া) বাংলাদেশে বেদেদের ভোটাধিকার রয়েছে। বাংলাদেশের সাভার, মুন্সীগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, তিনটুরী ও মিরসরাই, কুমিল্লার চান্দিনা, চৌদ্দগ্রাম ও এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় বেদেদের আবাস।

জসীমউদ্দীনের নাটকের নাম বেদের মেয়ে, প্রধান নারীচরিত্র চম্পাবতী। সৈয়দ শামসুল হক নাটকের নামকরণ করেছেন প্রধান নারীচরিত্রকে কেন্দ্র করে চম্পাবতী। চম্পাবতী চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাম্মী আক্তার। বেদে জীবনাশ্রিত এ-নাটকে ত্যাগ ও প্রেমের নিষ্ঠায় অনন্যসাধারণ চরিত্র চম্পাবতী। চম্পাবতী চরিত্রের অন্তর্চেতনা অত্যন্ত দক্ষ প্রকাশভঙ্গির আলেখ্যে উপস্থাপন করেছেন সাম্মী আক্তার। অসাধারণ প্রাণবন্ত ও নান্দনিক অভিনয়। নাটকে চম্পাবতী চরিত্রটি একদিকে যেমন প্রেমময়ী নারীত্বের প্রতীক, তেমনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যিক; প্রতিবাদী। অত্যন্ত সাহসী, ত্যাগী, বিনয়ী; নারীত্বের পূর্ণ মূর্তিমান। নাটকের শেষে মৃত্যুমুখী গয়া-বেদের প্রাণ বাঁচানোর মধ্য দিয়ে অকৃত্রিম প্রেম ও ত্যাগের মহিমা সৃষ্টি করে চম্পাবতী। অত্যন্ত প্রাণবন্ত দীপ্ত-ক্ষিপ্র এবং নৃত্য-অভিব্যক্তিক কুশলতায় আবেগী, হৃদয়ছোঁয়া দক্ষ অভিনয়ের মাধ্যমে চম্পাবতী চরিত্রটি রূপায়ণ করেছেন সাম্মী আক্তার।

চম্পাবতী নাটকের কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্র গয়া-বেদে। গয়া-বেদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন সাবিবর আহমেদ খান। অত্যন্ত প্রাণবন্ত, গভীর বাস্তবমুখী ও দক্ষ অভিনয় সাবিবর আহমেদ খানের। একদিকে যেমন প্রেমিক পুরুষ; অন্যদিকে তেমনি আদর্শ ও দক্ষ সাপুড়ে বেদে। গয়া-বেদের শক্তি-সামর্থ্য না থাকলেও ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। নিয়তির নির্মম পরিহাসে গয়াবেদে চম্পাবতীকে ছেড়ে আসমানীকে বিয়ে করলেও আসমানীর প্রতি ছিল দায়িত্ববান। কিন্তু সৃষ্টি করেছে ভালোবাসার অনন্য দৃষ্টান্ত। সাবিবর আহমেদ খান অত্যন্ত দক্ষ নৃত্য ও অভিনয়-কুশলতায় চমৎকারভাবে জীবন্ত করে তুলেছেন চরিত্রটি।

গ্রাম্য সমাজের লোলুপতার চিত্র মোড়ল চরিত্রের মধ্য দিয়ে অনবদ্য হয়ে উঠেছে। এ চরিত্রের কুট-কূশলতার কারণেই চম্পাবতী নামে এক সহজ-সরল শুভ্র বেদেনির জীবনের বিয়োগান্ত পরিণতি ঘনীভূত হয়ে ওঠে। এ মোড়ল চরিত্রে অভিনয় করেছেন মানব তালুকদার। অত্যন্ত অনবদ্য, প্রাণবন্ত ও অনন্যসাধারণ অভিনয় তাঁর। গ্রাম্য জীবন সমাজবাস্তবতার ধারায় মাথায় টুপি, পাঞ্জাবি পরিধান, অঙ্গভঙ্গি কিংবা চরিত্রাভিনয় যেমন দর্শককে বিনোদিত করেছে, তেমনি গ্রাম্য সমাজে নোংরামি-লোলুপতার চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। মানব তালুকদারের সমস্ত কাহিনিবিন্যাসের মধ্যেই কুঁজো হয়ে হাঁটা, অভিব্যক্তিগুলো কৌতুকপ্রবণ বিনোদনের মধ্য দিয়ে গভীরতর জীবনবাস্তবতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কুঁজো হয়ে হাঁটার চরিত্রাভিনয় সমস্ত নাট্যসময় ধরে রাখাও সহজ কথা নয়। কিন্তু অভিনয়ে সে-দক্ষতা দেখিয়েছেন মানব তালুকদার। অনবদ্য তাঁর অভিনয়। কৌতুকী চেলা মাইনক্যা চরিত্রে অভিনয় করেছেন অমিত চৌধুরী। অত্যন্ত সরস ও কৌতুকাভিনয়ের মধ্য দিয়ে গ্রামসমাজের মোড়লের লোলুপতার চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন অমিত চৌধুরী। পাঞ্জাবি, টুপি ও বগলে ছাতা নিয়ে কৌতুকপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি, গতিবিধিতে মাইনক্যা চরিত্রটি উপস্থিত দর্শকবৃন্দকে একদিকে যেমন গ্রাম্য সমাজবোধের অনুধাবনে সহযোগিতা করেছে, তেমনি সারাক্ষণ আনন্দের জোগানও দিয়েছে। এ নাটকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র আসমানী। আসমানী চরিত্রে অভিনয় করেছে, জুরিয়া মৌলী। ব্যক্তিত্ববোধ ও নারীত্ব চেতনায় অনন্যসাধারণ আসমানী। জুরিয়া মৌলীর অভিনয় অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও শৈল্পিকমাত্রায়। স্বামীর ভালোবাসা সে পরিপূর্ণভাবে পেতে চেয়েছে। নারী নির্যাতন ও নারী স্বাতন্ত্র্যের আরেক স্বাতন্ত্র্যিক চরিত্র মোড়লের স্ত্রী। মোড়লের স্ত্রী চরিত্রে অভিনয় করেছেন রেহানা হক পলি। অত্যন্ত অনবদ্য অভিনয়। কখনো আরোপিত মনে হয়নি রেহানা হক পলির চরিত্র উপস্থাপনে। অত্যন্ত নারীত্বসুলভ; সমাজব্যবস্থায় অবদমিত জীবন ফুটে উঠেছে। মোড়লের স্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও নারীত্বের এক অনন্যসাধারণ চরিত্র। ছিলেন একজন আদর্শ স্ত্রী। স্বামীর দুশ্চরিত্রের রূপ জানলেও অন্যের কাছে তা প্রকাশ করেননি। অনবদ্য প্রাণবন্ত অভিনয় রেহানা হক পলির। চম্পাবতীর মৃত আত্মার পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নাট্যটির পরিসমাপ্তি ঘটে।

চম্পাবতী নাটকের নাট্যনির্দেশক শামীম হাসান বলেন, ‘চম্পাবতীতে পরিবেশনা শিল্পের সকল শাখাই প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। কখনো সংলাপের মাধ্যমে মোড়লের লালসাকে তুলে ধরা; কখনো সংগীতের ব্যবহার হয়েছে চম্পার ব্যথাকে বাঙ্ময় করার জন্য। আবার মৃত্যুযন্ত্রণা ফুটে উঠেছে নৃত্যের শৈল্পিক ব্যবহারে। মোট কথা, কোনো এক জায়গায় আটকে না থেকে পরিবেশনা শিল্পের নানা উপকরণের ব্যবহারের প্রয়াসই ছিল এ-নৃত্যনাট্যে। এ ছাড়া প্রি-প্রোডাকশনের পর্যায়ে কিছু গবেষণা করেছি – বেদেদের জীবন-যাপন, তাদের ধর্মবিশ্বাস, তাদের জীবন সংগ্রাম প্রভৃতির ওপর। তার ওপর ভিত্তি করে টেক্সটের নতুন ইন্টারপিটেশন করেছি। মোট কথা, নাট্য, নৃত্য ও সংগীতের এক অভিন্ন সুর চম্পাবতী – যা আমাদের জনপদের হাজার বছরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির অনুগামী।’

ঐতিহ্যের ধারায় বাংলা নাট্যের বৈশিষ্ট্যে চম্পাবতী পরিবেশনাটি চারদিকের দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চে উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় সাধারণত নৃত্যশিল্পীদের বাচিক অভিনয়ে দক্ষতা লক্ষ করা যায় না। কিন্তু এ-উপস্থাপনায় বাচিক অভিনয়ও অত্যন্ত সুশ্রুত-সাবলীল-নাট্যিক ও চরিত্রপোযোগী। আবহে কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্র ছাড়াও রেকর্ডকৃত মিউজিক গান ব্যবহৃত হয়েছে। আলোক পরিকল্পনাও ছিল অসাধারণ। গ্রামীণ বিভিন্ন দৃশ্য উপস্থাপনে সাদা সায়াকোমায় শ্যাডো বা জীবন-ছায়াচিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। কাহিনিবিন্যাসের ক্ষেত্রে চম্পাবতীর জাতি রক্ষার্থে আত্মদান বিষয়টি একধরনের মানবিক টানাপড়েন সৃষ্টি করে। এখান থেকেই নাট্যটির মূল ঘটনায় অনুপ্রবেশ করে। চম্পাবতীর প্রতি দর্শকদের মধ্যে একটি স্নেহসুলভ কোমল মনোভাব সৃষ্টি হতে বাধ্য হয়। কাহিনিবিন্যাসের চরিত্রগুলো ইসলামি ধর্মবিশ্বাস-আশ্রিত। নাট্যটিতে চম্পাবতী ও গয়া-বেদের বিরহ উপস্থাপনে বৈষ্ণবীয় সিম্বল রয়েছে। বৈষ্ণবীয় চরিত্রও উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও বেদের মেয়ে নাটকে বৈষ্ণবী চরিত্র বিদ্যমান। নাট্যটির ঘটনাবিন্যাস যেহেতু ইসলাম বিশ্বাস-আশ্রিত, সেহেতু বিরহ প্রতীকে এই ইসলাম-আশ্রিত বিষয় থাকলেই সবচেয়ে বেশি যৌক্তিক হয়ে উঠত বলে মনে হয়। সুফিবাদী হুইল নৃত্যসহ নানা ভক্তিবাদী বা বিরহবাদী ইসলামি চেতনাগত প্রতীক তো নানা সময় লক্ষ করা যায়। সংস্কৃতির রিপ্রেজেন্টেশনের ওপর ছেড়ে দেওয়া নয়; নির্দেশকত্রয়ের এ প্রতীক ব্যবহারে ভাবনা প্রয়োজন। তাহলে নাট্যটি আরো বেশি বিষয়ের সঙ্গে যৌক্তিক ও সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে উঠত বলে মনে হয়। নাট্যের শেষ পর্যায়ে চম্পাবতীর চরম পরিণতির মধ্য দিয়ে দর্শকের মনে চরম আকুতির সৃষ্টি করে, যা বিয়োগীয় চরম অপার্থিব লোকে নিয়ে মানবীয় লোকে অবতরণ করায় দর্শককে। নাচ-গান-গল্প-অভিনয় সব মিলিয়ে অসাধারণ উপভোগ্য প্রযোজনা এটি। সর্বোপরি অত্যন্ত নান্দনিক উপস্থাপনা চম্পাবতী।

চম্পাবতীর শিল্প-নির্দেশক লুবনা মারিয়ম বলেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিন ধরেই ইচ্ছা ছিল এমন একটা কাজ করার, যেখানে থাকবে আমাদের লোকনৃত্য; যা হবে আমাদের ঐতিহ্যের। আমাদের পারফরমাররা শাস্ত্রীয় নৃত্যে পারদর্শী। কেউ মণিপুরি, কেউ কত্থক, কেউবা ভরত নাট্যম। আমরা রায়বেঁশে, পদ্মার নাচন, লাঠিখেলা, বেহুলার নাচাড়ি, জারিগানের নাচ ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। তারপর পুরুলিয়ার ছৌয়ের তান্ডবটা দেখলাম। ময়ূরবন ছৌ নিয়েও কাজ করলাম। ময়ূরবন ছৌ, পুরুলিয়ার ছৌ এসবই বাংলায় আছে। তারপর কালারীপাই নিয়েও কাজ করলাম। কালারীপাই তো একধরনের সমরনৃত্য। এতে অনেক তন্ত্রমন্ত্র আছে। বিহুটা নিয়েও কিছু কাজ করলাম। সঙ্গে ঝুমুরটা নিলাম। ঝুমুরনাচটাও লাস্য আঙ্গিকে আনার চেষ্টা করলাম। বাংলার প্রতিটি লোকনৃত্য নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে কাজ শুরু করলাম। বাংলাদেশের একটি নাচ করতে গিয়ে আমরা তো ক্লাসিক্যাল ব্যালে কিংবা জাজ করতে পারি না। এভাবে দীর্ঘদিন গবেষণা ও কাজ করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা প্রসেনিয়ামে করব না। আমরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কখনো কথা বলি না। বাচিক অভিনয় করিনি। হকভাইয়ের স্ক্রিপট তো আছেই, ততদিনে লিটনও মিউজিক তৈরি করে ফেলেছে। তখন শামীমকে ডাকলাম। আমরা দু-তিনটা ওয়ার্কশপ করলাম শামীমের সঙ্গে। আমাদের পারফরমাররা দু-তিন মাস ধরে সারেগাম করেছে। বেদের বহরে গিয়েও আমরা ভিডিও করলাম। আমাদের ইচ্ছা ছিল শো-তে নৃত্যনাট্যের সঙ্গে ভিডিও প্রজেকশন বা উপস্থাপন করা। কিন্তু মঞ্চসমস্যায় তা হয়ে ওঠেনি। আমাদের পরিশ্রমটা বড় না, যদি এ-প্রযোজনা কারো ভালো লাগে তবেই আমরা সার্থক।’

পল্লিকবি জসীমউদ্দীনের চেতনায় আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী নাট্য, সংস্কৃতিকে লোকনাট্য কিংবা লোকসংস্কৃতি ঘরানায় দেখতে পাওয়া যায়। লোকনাট্য শব্দটি উপনিবেশ শাসনকালীন সময়ে সৃষ্ট একটি শব্দ বা ব্যাখ্যান। এ শব্দ বা ব্যাখ্যানের ভাবব্যঞ্জনার মূলে রয়েছে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে দেশীয় শিল্পকে লোকশিল্প পরিভাষায় ব্যাখ্যা করা। এ ‘ফোকলোর’ টার্মটির মধ্যে স্বজাত্য চিন্তন বিকাশের বাধামূলক সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কৌশল রয়েছে। এ বিষয় নিয়ে আলাদা পরিসরে বিস্তর আলোচনা হতে পারে। সেলিম আল দীন এ ‘লোকনাট্য’ শব্দটিকে ফেলে দিয়ে ঐতিহ্যবাহী বা ঐতিহ্যের ধারার শিল্প বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। হাজার বছরের বহমান বাংলা নাট্যের রচনাবৈশিষ্ট্য যেমন আলাদা করা যায়, তেমনি পরিবেশন-বৈশিষ্ট্যও স্বতন্ত্র।

ঐতিহ্যের ব্যবহারমূলক শিল্প নয়, ঐতিহ্যের বিশ্বমুখী ও শিল্পনন্দনজাত সমকালীন বিকাশ জরুরি অর্থাৎ ঐতিহ্যের উৎসারী প্রযোজনা জরুরি। শিল্পকলা একাডেমীতে নাট্যপ্রদর্শনীর জন্য হল বরাদ্দ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুত নীতিমালা লক্ষ করা যায় না। শিল্পকলা বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান। শিল্পকলা যদি বিজাতীয় সংস্কৃতির লালন বা চর্চায় নীরবে কাজ করে, তবে তা বিস্মিত হওয়ার মতো। শিল্পকলা একাডেমীর প্রদর্শনীর জন্য হল বরাদ্দের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আবহমান ঐতিহ্যবাহী নাট্য আঙ্গিক বা বাংলার নিজস্ব নাট্যধারার নাট্যগুলোর প্রদর্শনীর জন্য হল বরাদ্দে প্রাধান্য বা অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত এবং এ ঐতিহ্যবাহী নাট্যগুলোর হল ভাড়ার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ও দেওয়া উচিত। যেমনটা ছাড় দিয়ে থাকে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের দলভুক্ততার দোহাইয়ে। এমনকি ঐতিহ্যের ধারায় ঢাকার বাইরের দলগুলোর জন্যও হল-বরাদ্দসহ বিশেষ সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত। অথচ চরম সত্য যে, এ পর্যন্ত হল বরাদ্দের খতিয়ানে সরাসরি বিজাতীয় কিংবা বিজাতীয় তত্ত্বনির্ভর নাট্যগুলোর অগ্রাধিকার দেওয়ার চিত্রই সর্বত্র এবং গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনভুক্ততার অজুহাতে অর্থ ছাড় দেওয়ার চিত্রই বিদ্যমান। দেখা যায়, দেশীয় শিল্প-বিকাশের কমিটমেন্টের চেয়ে ফেডারেশনভুক্ত দল হিসেবেই সুবিধাপ্রাপ্তি ঘটে বেশি। শিল্পকলা একাডেমীর সিস্টেমটাও উল্টো। ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য-আঙ্গিক ধারার নাট্য-প্রদর্শনী করতে গেলে হল ভাড়ার সঙ্গে এরিনামঞ্চ বানাতে প্রায় চার-পাঁচ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়। ফলে অনেকে ইচ্ছা থাকলেও ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি নাট্যধারার নাট্য-প্রযোজনায় সাধারণত হাত দিতে চায় না। আমাদের আবহমান বাংলার নাট্যধারায় চর্চা করলেই এক্সপেরিমেন্টাল বা নিরীক্ষা আর বিজাতীয় নাট্যও অন্ধ অনুকরণে জাতীয় মর্যাদা দেওয়ার মতো নব্য উপনিবেশ প্রেষণা ও মানসিকতা পরিত্যাগ করা উচিত। শিল্পকলা একাডেমীকে মনে রাখতে হবে, এটি ‘বাংলাদেশ’-এর শিল্পকলা একাডেমী। ইউরোপিয়ান বা ইন্ডিয়ান কিংবা বিদেশি শিল্পকলা একাডেমী নয়। অথবা, কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সম্প্রসারণমূলক প্রতিষ্ঠান নয়। সান্ত্বনামূলক ঐতিহ্যবাহী ভেলকিবাজি কারো কাম্য নয়; আমাদের সবার কাম্য বাংলাদেশের ঐতিহ্যের উৎসারী ধারায় বিশ্বজনীন বিকাশ।

চম্পাবতী নাট্যটি ঐতিহ্যের উৎসারী ধারায় উপস্থাপিত। বিষয়বস্ত্ত, অভিনয়রীতি, নৃত্যগীত সমন্বয়ে চারদিকের দর্শক পরিবেষ্টিত মধ্যমঞ্চে উপস্থাপিত। কিন্তু বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমীর হল বরাদ্দের তালিকায় সাধারণত এসব নাট্যপ্রযোজনাগুলোর ক্ষেত্রে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম বিধায় বোধহয় নিয়মিত প্রদর্শনী করতে দেখা যায় না। আর প্রবহমান গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের দোহাই দিয়ে সিন্ডিকেটমূলক আচরণ আমাদের কাম্য নয়। বাংলাদেশের শিল্পকলা একাডেমীর আদর্শ হওয়া উচিত দেশজরীতির বিশ্বমানের বিকাশে অনুপ্রেষণ অর্থাৎ ঐতিহ্যের উৎসারী ধারার বিশ্বজনীন বিকাশ। এজন্য দেশজ পরিবেশনারীতির প্রযুক্তিনির্ভর অত্যাধুনিক চারদিকের দর্শকবেষ্টিত পৃথক মঞ্চ স্থাপন যেমন জরুরি, তেমনি বিশ্বজনীন বিকাশে মর্যাদাগত অনুপ্রেষণও অত্যন্ত প্রয়োজন। চম্পাবতী অত্যন্ত শৈল্পিক ও নান্দনিক একটি প্রযোজনা। বাঙালি জীবনবোধ থেকে শুরু করে আবহমান বাংলার শিল্পবৈশিষ্ট্যে প্রত্যুজ্জ্বল। চম্পাবতী নাট্যের কুশীলববৃন্দ হচ্ছেন- সাম্মী আক্তার, সাবিবর আহমেদ খান, অমিত চৌধুরী, মানব তালুকদার, রেহানা হক পলি, লতিফা ইয়াসমিন সোমা, জুরিয়া মৌলী, লুবনা মারিয়াম, নাসিরুল ইসলাম রাজ, তাসকিন অহনা, লাবণ্য সুলতানা বন্যা, অনন্দিতা খান, লামিয়া সিরায়া মিলা, আবু নাঈম, মো. হানিফ, সোহান আরেফিন নয়ন, এসএম হাসান ইসতিয়াক ইমরান, নূরুল হক আবির। গায়েন ও দোহারে ছিলেন- সুমন, অজয়, শামীম হাসান, স্মরণ ও খাইরুল; সংগীতের সুর করেছেন জাহিদুল কবির লিটন এবং সংগীতে কণ্ঠ দিয়েছেন শফি মন্ডল, আনুশেহ আনাদিল ও নির্ঝর চৌধুরী। চম্পাবতী প্রযোজনাটির সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন লুবনা মারিয়াম।

Leave a Reply

*