logo

ঘাসফুলের ফোটা না ফোটার গল্প

না সি মু ল  হা সা ন

বেশিদিন আগের ঘটনা নয়। ২০১২ সালে খুব কম বাজেটের একটা সিনেমা মুক্তি পেল বলিউডে। খুব আহামরি কাহিনি আর ফর্মুলায় না গিয়ে জমজমাট একটা গল্প বলার চেষ্টা। ফলাফল ছবি হিট। সিনেমার নাম কাহানি। খুব ভালো রিভিউ এলো। অনেকেই এটিকে তুলনা করলেন সত্যজিতের সিনেমার সঙ্গে। বাংলা সিনেমার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির প্রতি পরিচালক সুজয় ঘোষের একধরনের ট্রিবিউটও এই সিনেমা। যাহোক, ক্রিটিকদের রিভিউয়ের প্রতিফলন দেখা দিলো বক্স অফিসেও। খুব ভালো ব্যবসা করল। নারীবাদী একটা টোন থাকার পরও সিনেমা ভালো চলায় সব দিকে প্রশংসার বন্যা। কিন্তু এসবের পরও অনেক দর্শক ও ক্রিটিকের মধ্যে সিনেমাটি নিয়ে একটা বড় ধরনের খটকা রয়ে গেল। খটকাটি সামান্য একটা প্রশ্ন হলেও তার মাহাত্ম্য অনেক বেশি। আর প্রশ্নটা হলো, একজন পরিচালক কি পারেন সিনেমার প্রায় পুরো অংশ ধরে দর্শককে এক ধরনের ভুল ইনফরমেশন দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে? পরিচালকের কি সেই অধিকার আছে? কাহানি সিনেমাটির বেশিরভাগ অংশজুড়েই এক ধরনের বিভ্রমের মাঝে রাখা হয় দর্শকদের। যা সত্য নয় এমন একটা দৃশ্য বারবার ফ্ল্যাশব্যাকে দর্শককে দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই অসত্য বা বিভ্রমের দায়ভার কখনই খুব বেশি লাইমলাইটে আসে না; কারণ ক্রিটিক ও বক্স অফিস দুই জায়গাতেই আশাতীত সাড়া এধরনের ছোটখাটো ব্যাপারকে সহজেই ঢাকা দিতে পারে। কিন্তু দর্শকের সঙ্গে যা হয়েছে তা রাখঢাক করে উপায় নেই। অনেকে ব্যাপারটাকে সিনেমার খাতিরে ছাড় দিতে পারলেও যুক্তি ও বিচারের খাতায় তা আসলে সিনেমার এক ধরনের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে আসে। আমরা রশোমন সিনেমাটিতেও এধরনের গল্প বলতে দেখেছি। বেশিরভাগ সময়ই দর্শক সেইসব দৃশ্য দেখে, যা চরিত্রগুলোর নিজের কল্পনায় বানানো। কিন্তু সিনেমার বিষয়বস্ত্তই এটি। বাইরের এই প্রসঙ্গগুলো টেনে আনার প্রধানতম কারণ হলো, ঘাসফুল দর্শনের পর আমার একই সঙ্গে কাহানি ও রশোমনের কথা মনে পড়ে যায়। আমার মনে প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকে, কোন সিনেমাটির সঙ্গে আমি এর তুলনা করব। একদিকে যেমন আমার মনে একটা বোধ তৈরি হয় যে আমাকে সিনেমার প্রায় পুরোটা সময় এক ধরনের বিভ্রমের মধ্যে রাখা হয়েছে, আবার অন্যদিকে এও মনে হতে থাকে, সিনেমা তো আসলে বিভ্রমেরই একটি খেলা। আমি ভাবতে থাকি, নিজের বিরুদ্ধে নিজের যুক্তি থরে থরে সাজাতে থাকি। যদিও মিথ্যা কোনো ফ্ল্যাশব্যাক বা অসত্য তথ্য নেই, তারপরও কেন যেন বোধ হতে থাকে যে আমার সঙ্গে, মানে দর্শকের সঙ্গে একধরনের লুকোচুরি খেলার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। সফল হলে পরিচালক আকরাম খানের কাজের একজন ভক্ত হিসেবে আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হতো না। কিন্তু সিনেমা সর্বোপরি সিনেমা, কোনো খেলা নয়। পরিচালক ও দর্শকের মধ্যকার যোগাযোগের বিশেষ কিছু জায়গায় বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়ে যায় সিনেমাটি দেখতে দেখতেই। এর ফলে যা হয়েছে তা হলো, সিনেমাটি চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সে যাওয়ার আগেই দর্শককে গল্প থেকে যেন বাইরে কোথাও নিয়ে যায়। আমরা যা দেখি তা যেন আমাদের মননে বা চিন্তায় ঠাঁই দিতে পারি না। আমরা পরিণতি দেখি কিন্তু আমাদের মধ্যে গল্প নিয়ে আফসোস বা ভালো লাগা তৈরি হয় না। মফস্বলের স্পষ্ট প্রেক্ষাপট দেখে আমরা আশায় বুক বাঁধি, কিন্তু ঝাপসা কিছু মানুষের দুঃখ, না পাওয়া বা পাওয়ার বোধগুলোকে যেন ধরতে ধরতে হারিয়ে ফেলি। আর খুঁজে পাই না।

২০১৪ সালে মেঘমল্লার দেখে বাংলা সিনেমা নিয়ে এক ধরনের উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল। আমাদের দ্বারাও যে ভালো সিনেমা সম্ভব তা জাহিদুর রহিম অঞ্জন সাধ্যমতো চেষ্টা করে বুঝিয়ে দিতে পেরেছেন। আর এজন্যই হয়তো আকরাম খানের মতো প্রতিভাবান পরিচালকের প্রথম সিনেমার কাছ থেকে একটু বেশিই চাইছিলাম। খুব করে চাইছিলাম গল্প আর স্ক্রিপ্টের দিক থেকে যেন খুব ভালো একটা কাজ আমরা পাই। তাই প্রথমেই আসা যাক গল্পে। সিনেমার শুরুতে আমরা দেখি একজন তৌকিরকে তার বাবা-মার সঙ্গে নির্জন কোনো মফস্বলের প্রাচীরঘেরা বাড়িতে বাস করতে। কোনো অসুখে স্মৃতি ভুলে যাওয়া তৌকির একদিন পুরনো এক প্যান্টের পকেটে একটা চিঠি খুঁজে পায়। চিঠিটা তাকে উদ্দেশ করে ঘাসফুল নামে একজনার লেখা। চিঠিটাতে এমন কিছু থাকে যা তৌকিরকে বাধ্য করে তার ভুলে যাওয়া স্মৃতির বাগান হাতড়ে বেড়াতে। কিন্তু কোনোভাবেই তৌকির তার অতীতের সঙ্গে ঘাসফুলকে মেলাতে পারে না। একসময় তৌকির জানতে পারে যাদের সে এতদিন বাবা-মা ভেবে আসছিল তারা আসলে তার
দাদা-দাদি। তার বাবা ও মা অন্য কেউ! আর এই অন্য কেউদের গল্পটাই রহস্যের জট ধীরে ধীরে খুলতে থাকে। পুরো গল্প না বলে এটুকুই বললাম। এটুকুতেই বুঝে যাওয়া উচিত সিনেমার সাবজেক্ট বেশ চ্যালেঞ্জিং ও আগ্রহ উদ্দীপক। আর দশটা বাংলা সিনেমার মতো এ টু জেড সরলরেখা মেনে কাহিনি এগোয়নি সিনেমাটিতে। গল্প শুরু হয়েছে সিনেমার আসল প্রেক্ষাপটের অনেক পরে। যার ফলে প্রচুর ফ্ল্যাশব্যাক ঘুরেফিরে এসেছে। প্যারালালি বর্তমান ও অতীতের কাহিনি চলেছে। এভাবে গল্প বলাটা অবশ্যই সাহসিক। কিন্তু বারবার মনে হয়েছে সিনেমার আর সবকিছু পারফেক্ট করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রিপ্টটার দিকেই খুব বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়নি। স্ক্রিপ্টই ঠিক করে দেয় সিনেমার চরিত্রগুলোকে আমরা কীভাবে বুঝব। তৌকিরের
দাদা-দাদির চরিত্র ছাড়া আর কোনো চরিত্রই সিনেমাটিতে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে না। দাদা-দাদির অতীত, চিন্তা, দর্শন, পছন্দ, উদ্দেশ্য কোনোকিছুই চরিত্রগুলোর মধ্যে না থাকার পরও আমরা দর্শকরা চরিত্র দুটির ভাসা ভাসা আমেজ পাই। সিনেমার তরুণ চরিত্রগুলোকে ঠিকমতো ধরাই সম্ভব হয়নি। স্ক্রিপ্টে তরুণ চরিত্রগুলোর ইচ্ছা, উদ্দেশ্য, ভালোবাসা আরো গভীরভাবে আসা দরকার ছিল। আকরাম খানের আগের সব কাজের বৈচিত্র্য ও ভাবনা নিয়ে অতীত অভিজ্ঞতা জানান দেয় যে তিনি চরিত্রের ডেভেলপমেন্ট করেন খুব ভালোভাবে। করেন, কারণ স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট ও চরিত্র বিল্ডআপ যে-কোনো ভালো সিনেমা বা নাটকের জন্য মৌলিক। কিন্তু ঘাসফুল সিনেমাটি চরিত্রগুলোকে যথেষ্ট স্পেস দেয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ঘাসফুল বা নার্গিস চরিত্রে অভিনয় করা শায়লা সাবির কথা। নাম ভূমিকায় থাকার পরও, সবচেয়ে উচ্ছল তাকে মনে হলেও, শুধু গল্প বলায় অংশগ্রহণ কম থাকায় তাকে যেন আমরা আমাদের মতো করে, আর দশটা মানুষের সঙ্গে মেলাতে পারি না, অনুভবও করতে পারি না। আমরা বুঝতে পারি না এটি আদৌ তার গল্প কি না। আমাদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, কার গল্প বলা হচ্ছে? মায়ের গল্প? তৌকিরের? না ঘাসফুলের? আর যদি বলাই হয় তাহলে কেন, কোন মোটিফে বলা হচ্ছে? তুলির অাঁচড়ের মতো মফস্বল জীবনটা পুরোপুরি উঠে এলেও, গল্প বিন্যাসে প্রাণ না থাকায় মানুষের সঙ্গে আমাদের অনুভব তৈরি হয় না। যা আসলে সিনেমাটির বাকি ভালো দিকগুলোকে অনেকটাই ম্লান করে দেয়।

কোনটি ভালো আর কোনটি খারাপ সিনেমা তার মধ্যে পার্থক্য করাটা খুব কঠিন। কিন্তু এতদিনের সিনেমা দেখা ও কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে সিনেমাকে অন্য দুই ভাগেও ভাগ করতে ইচ্ছা করে আমার। একটি সৎ সিনেমা আর আরেকটি অসৎ। অসৎ সিনেমার মানে এই নয় যে সিনেমাটি অবৈধ টাকায় তৈরি বা কিছু। অসৎ সিনেমা সেটাই, যেখানে দর্শককে সঙ্গে না নিয়ে গল্প বলা হয়। আগেকার দিনের সিনেমায় দেখা যেত রাজ্জাকের ছেলের চেহারা হয়েছে ঠিক রাজ্জাকের মতো। দুই চরিত্রেই রাজ্জাক। সিনেমা সেই যুগ বহুদিন আগে পার করে এসেছে। ঘাসফুলে বাবা তৌকির ও ছেলে তৌকির নিয়ে আবার সেই পুরনো দিনের সিনেমার ভঙ্গিতে ফিরে যাওয়া হয়েছে। আমরা একটা তৌকিরে এতই ডুবে থাকি যে আরেকটা তৌকিরের শব্দ আমাদের বুকে বাজে না। আমাদেরকে সত্য বলা হয় একদম শেষে। তৌকিরকে যখন তার দাদি তার সত্যিকারের বাবাকে নিয়ে গল্প বলে, তখন বাবার মৃত্যুর খবরটা দেওয়ার পর দাদি তৌকিরকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে ‘তৌকির’, ‘তৌকির’ বলে। তখনো আমরা জানি না এই তৌকিরই সেই তৌকির কি না। এমনকি আমরা সেটা কল্পনাও করি না। একটা দুর্ঘটনার জায়গা আছে, যেখানে বাড়ির ছেলে মারা যায়, ইচ্ছাকৃতভাবে সেই জায়গাটা আমাদের কাছে প্রকাশ করা হয় না। আমাদের মনে হতে থাকে লুকোচুরি হচ্ছে। সিনেমা শেষ হয়ে যাওয়ার একটু আগে আমাদের বলা হয় যাকে আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে দেখলাম সে আসলে তৌকিরের বাবা – এক আরেক তৌকির। ততক্ষণে বাবা তৌকিরের দৃশ্য শেষ। তার প্রতি কোনো ধরনের অনুভূতি জন্মানোর আর অবকাশ পাওয়া যায় না।

বাবা-মা হিসেবে যাদের দেখছি তারা যে তৌকিরের আসল
বাবা-মা নয় তা বোঝা যাচ্ছে অনেক পরে এসে। একদিকে যেমন প্রশ্ন জাগে, এত বড় হয়ে যাওয়ার পরও তৌকিরের মনে কেন কখনো প্রশ্ন জাগেনি তার আত্মীয়স্বজন বলতে কিছু নেই কেন; আবার অন্যদিকে প্রশ্ন জাগছে, কেন সিনেমার শুরুতেই দেখানো হলো তৌকির স্মৃতি মনে করতে পারে না। এই সবকিছুই কি তাহলে শুধু গল্প এগিয়ে নেওয়ার জন্য? নাকি ঘাসফুলের চিঠিটা পাইয়ে দেওয়ার জন্য? এই যে ঠিকমতো করে গল্পটা না বলা, যেখানে-সেখানে দরকারি ইনফরমেশন দর্শক পর্যন্ত না পৌঁছানো, ভাত আর পীরবাবাকে নিয়ে একটি অদ্ভুতুড়ে নাটক তৈরি করা – এ সবকিছুর সঙ্গে দর্শক মিল খাওয়াতে পারেনি বলেই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে এমন করে গল্প সাজানো উচিত হয়নি যেখানে আমরা দর্শকরা নিজেদের বঞ্চিত, ব্যর্থ বোধ করব; যেখানে চরিত্রগুলো ঠিকমতো ফুটে ওঠার স্পেস পাবে না।

স্ক্রিপ্ট নিয়ে হতাশা থাকলেও সিনেমার বাকি প্রায় সবকিছু নিয়ে দারুণ রকম আশাবাদ তৈরি হয়। যাঁরা বাংলাদেশের নাটক ফলো করে থাকেন তাঁরা জানেন আকরাম খান অনেক যত্ন নিয়ে কাজ করেন আর তার পরিচয় আমরা তাঁর করা নাটকেই পাই। তাঁর নাটকে গল্প খুব ভালো হয় এবং তা বলার ভঙ্গিমাও খুব ভালো। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, সিনেমার মতো বড় ফরম্যাটে এসে পরিচালক কি ব্যর্থ হলেন? পুরোপুরি ব্যর্থ… কোনোভাবেই না। গল্প বলার ভঙ্গিমা আর চরিত্রের বিকাশ নিয়ে কিছু ভুলের কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেলে আকরাম খানের পরিচালনায় সেই পুরনো যত্নের ছাপই স্পষ্ট দেখা যায়। প্রোডাকশন ডিজাইন থেকে শুরু করে লোকেশন চয়েস ও কস্টিউম থেকে শুরু করে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের ভেতর থেকে অভিনয় বের করে নিয়ে আসা পর্যন্ত অনেক কিছুতেই তাঁর আপসহীনতার পরিচয় পাওয়া যায়।

চিত্রগ্রহণ খুব ভালো হয়েছে। আমরা যারা ছোট শহর বা মফস্বল থেকে এসেছি তারা বুঝতে পারি ঘাসফুল সিনেমাটিতে আবার সেই মফস্বল আর মফস্বল নিয়ে তাবৎ নস্টালজিয়া সফলভাবে ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন ফ্রেম দেখে মনে হয়েছে আমাদের খুব চেনা সব ফ্রেম। সেই কুয়াশা, রোদ, আলোছায়ার খেলা, ঝিলের জল, রেললাইনকে অনেকদিন কেউ এভাবে তুলে আনার প্রয়োজন বোধ করেনি। অথবা হয়তো সেই মনন বা চিন্তার অভাবও থাকতে পারে। লাইটের কাজ ভালো লেগেছে। ইনডোরের কিছু দৃশ্যের মধ্যে আলোছায়ার জাদুময়তা ভালো লেগেছে। সাউন্ড ঠিকঠাক মনে হয়েছে। মফস্বলের শব্দ ও নীরবতাকে তুলে আনা হয়েছে যত্ন নিয়ে। সম্পাদনাও ভালো লেগেছে। সানী জুবায়েরের মিউজিক ও গানের কথা মুগ্ধকর ছিল। কিন্তু স্ক্রিপ্টের কারণে শুধু শেষের অংশটুকুতে ব্যবহৃত গানগুলো আমাদের হৃদয়কে ছুঁয়ে যাওয়ার সময় পায় না। তাও এক ধরনের ঘোর তৈরি করে যায়।

প্রোডাকশন ডিজাইন, আর্ট, কস্টিউম ও লোকেশন পছন্দ করার ক্ষেত্রে মেঘমল্লারের পর এই সিনেমাটি আরেকটা মাইলফলক। আমাদের তথাকথিত সিনেমায় সিনেমার জন্য দরকারি এইসব মৌলিক উপাদানের প্রয়োগ এমনিতেই খুব খারাপ। এসবের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ থাকাটা খুব জরুরি। ঘাসফুল সিনেমাটিতে সবটুকুই আছে। এটা ভেবে ভালো লাগছে যে, অন্তত এই ২০১৪-১৫ সালে এসে আমরা বোধ করছি এসব বিষয়ের গুরুত্ব। আমাদের সিনেমার জন্য পজিটিভ একটা খবর।

অভিনয়ে ভালো করেছেন মানস বন্দ্যোপাধ্যায় ও নায়লা আজাদ নূপুর। অনেকদিন পর বড় কোনো চরিত্রে তাঁদের দেখতে পেয়ে ভালো লেগেছে। কোনো জায়গাতেই মনে হয়নি অতি অভিনয় বা মেলোড্রামার প্রভাব পড়েছে তাঁদের কাজের মধ্যে। আসিফ নতুন হিসেবে ভালো করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। বিভিন্ন সংলাপের ক্ষেত্রে তার উচ্চারণ ও অভিনয়ে যথেষ্ট জড়তা আছে বলে মনে হয়েছে। তানিয়ার চরিত্র ছোট হলেও খারাপ করেননি। তার চরিত্রটা আরেকটু বড় হলে আরো ভালো কাজ করতে পারতেন বলে মনে হয়েছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে শায়লা সাবিকে। ট্রেইলারে সাবির স্ক্রিন প্রেজেন্স দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সিনেমাতেও তার কিছুটা পরিচয় পেয়েছি। শুরু থেকেই স্ক্রিপ্টে সাবিকে রাখতে পারলে সিনেমাটি যথেষ্ট শক্তিশালী হতো বলে মনে হয়। একদম শেষে এসে সাবিকে পেয়ে তাই আফসোস বাড়ে। অন্য গল্প বলতে গিয়ে এত সময় ব্যয় হয়েছে যে ঘাসফুলের নাম ভূমিকার শায়লা সাবিকেই দর্শক মনের মতো করে পান না।

ঘাসফুল সিনেমায় কথা খুব বেশি নেই। দৃশ্যের মাধ্যমে অনেক কিছু বলার চেষ্টা করা হয়েছে। সাইলেন্সকে কাজে লাগানো হয়েছে। গত বছর দেখা পিঁপড়াবিদ্যা ও মেঘমল্লার সিনেমা দুটিতেই এই ট্রিটমেন্টে যাওয়া হয়েছে। সিনেমার জন্য এটি আরেকটি পজিটিভ দিক। আশাবাদী হয়ে উঠি এই ভেবে যে, সিনেমার ভাষা আমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে কাজ করা শুরু করেছে। এছাড়া মোবাইল ফোনের ব্যবহার দেখিয়ে অতীত ও বর্তমানের অনুভূতি ও আচরণগুলোর পার্থক্যটাকে কিছুটা হলেও সাবটেক্সট হিসেবে আনা হয়েছে, যা মোটাদাগে খারাপ মনে হয়নি। সিনেমার সবচেয়ে পজিটিভ দিক মনে হচ্ছে মফস্বলকে আমাদের মধ্যে আবার নিয়ে আসা। অনেক দৃশ্যেই আশি বা নববইয়ের দশকের নস্টালজিয়া এসে ভর করে। পৃথিবীকে অনেক সহজ ও সরল মনে হয়। ছোট শহরের জীবনাচার, নির্জনতা, বাসস্থান, সবুজ, আলোছায়ার নড়াচড়া খুব ভালোভাবে এসেছে সিনেমায়। আমাদের সিনেমায় মফস্বলকে অনেকদিন পর যেন আবার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো।

আমাদের অনেক বড় স্বপ্ন বাংলা সিনেমা নিয়ে। খুব বেশি ভালো সিনেমা হয় না এখানে। এখানে যে-কোনো মৌলিক ও সুষ্ঠু নির্মাণ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই যখনই কোনো প্রতিভাবান পরিচালককে সিনেমার সঙ্গে জড়িত হতে শুনি, আশায় বুক বাঁধতে শুরু করি। তাই বোধহয় সিনেমাটি নিয়ে নেগেটিভ বলতে গিয়ে বারবার পজিটিভ চলে এসেছে। আকরাম খান মাত্র তাঁর ইনিংস শুরু করলেন বাংলা সিনেমাতে। ঘাসফুল শুধু তাঁর একার প্রজেক্ট নয়। আমরা যারা গল্পনির্ভর সিনেমা, ভালো সিনেমার কথা বলি তাদেরও কোনো অংশে কম না। আকরাম খানের ফেইলিওর মানে আমাদের সবার ফেইলিওর। ঘাসফুলের স্বপ্নভঙ্গ মানে আমাদের সবার স্বপ্নভঙ্গ। আজকে পুরোপুরি প্রস্ফুটিত হয়নি তাতে কী হয়েছে? আকরাম যদি স্ক্রিপ্টের প্রতি আরেকটু যত্নবান হন, মন থেকে বিশ্বাস করি তাঁর হাতেই কাল নতুন কোনো ঘাসফুল ফুটবে। ফুটতেই হবে! n

 

Leave a Reply

*