logo

গ্র ন্থ প রি চি তি

চিত্তপ্রসাদ
প্রকাশ দাস-সম্পাদিত
গাঙচিল, কলকাতা
মূল্য : ৬০০ টাকা

ক্রমবিবর্তিত মানবসভ্যতার বিকশিত ইতিহাস মানুষই রচনা করে সময়ের উত্থান-পতনের ছন্দে। শাসকের ইতিহাসের রঙিন প্রচ্ছদ শোষিতের ইতিহাসের সঙ্গে পরস্পর দ্বান্দ্বিক। খ্যাতিমানের কীর্তির উজ্জ্বল উপস্থিতি ইতিহাসের গর্বিত চরিত্র নির্মাণ করে, আবার রয়েছে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া প্রতিভাধর কর্মমুখর মানবসভ্যতার প্রতি সত্য উপায়ে আন্তরিক কর্মমুখর জীবনের অশেষ দান। দুটো বইকে তুলে ধরবার জন্যে উপরোক্ত সূচনার উপস্থাপন। প্রথম বই, প্রকাশ দাস-সম্পাদিত, গাঙচিল প্রকাশনী (কলকাতা) থেকে প্রকাশিত চিত্তপ্রসাদ। দ্বিতীয়টি প্রথমা প্রকাশন থেকে বেরোনো শিল্পী কামরুল হাসানের বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা – যা সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন সৈয়দ আজিজুল হক। জন্মশতবর্ষে পা রাখলেন বহুমুখী প্রতিভাধর দেশপ্রেমিক চিত্রকর। চিত্তপ্রসাদ।
একজন চিত্তপ্রসাদের জন্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে উপমহাদেশের জাতীয় চেতনা উন্মেষের আন্দোলনের ইতিহাসের রোজনামচায়। ১৯৪০-এর দশকে এদেশের চিত্রকলার অনেক ধারার মধ্য থেকে একটি ধারা গড়ে উঠেছিল বামপন্থী মতাদর্শকে অবলম্বন করে। এটি অবশ্য তৎকালীন বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির পটপরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। চিত্তপ্রসাদ ছিলেন মার্কসবাদী দর্শনে বিশ্বাসী প্রচারবিমুখ স্বশিক্ষিত শিল্পী ও কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী। এদেশের সমাজবাস্তব চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ এই শিল্পী আজীবন তাঁর চিত্রকলাকে রাজনৈতিক প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সমাজের সিংহভাগ মানুষের কাছে তাঁর শিল্পবার্তা পৌঁছে দিতে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন উডকাট, লিনোকাট,
সাদা-কালো কালি ও কলমের ড্রইং এবং পুতুলনাচের মতো ভারতবর্ষের আবহমানকালের অবহেলিত শিল্পমাধ্যম। জলরং, তেলরং, প্যাস্টেলেও কাজ করেছেন। কিন্তু অনড় নিজ মতাদর্শে। ১৯৪০-এর  কালি-কলম বা তুলিতে করা তাঁর বিখ্যাত তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা, চুয়াল্লিশে সারা ভারত বিজয়ওয়ারা কৃষক সম্মেলন, ছেচল্লিশের তেলেঙ্গানা কৃষক আন্দোলন, বায়ান্নতে এদেশের নিচুতলার শিশুদের দুঃখ-দৈন্যভরা জীবন নিয়ে বাইশটি ছাপচিত্রমালা ‘এনজেলস উইদাউট ফেইরিটেলস’ করেন। স্বভাবতই চিত্তপ্রসাদের এ সকল ছবি ভারতবর্ষের সামাজিক বাস্তবতার সত্য দলিল। বইটির প্রচ্ছদচিত্র চিত্তপ্রসাদের লিনোকাট দিয়ে করা। প্রচ্ছদেই শিল্পীর দর্শনকে স্পর্শ করতে পারেন সচেতন যে-কোনো পাঠক। বইটির সূচি চারটি ভাগে বিভক্ত। প্রকাশকের কথার পরেই চিত্তপ্রসাদের আরেকটি দিকের উন্মোচন ঘটেছে নির্বাচিত চিত্তপ্রসাদ : স্বরচিত রচনার মধ্য দিয়ে। চিত্তপ্রসাদের লেখায় উঠে এসেছে ছবির সংকট, আধুনিক ভারতীয় শিল্পকলার ভূমিকা, গুহাচিত্র, চিত্রকর বনাম বিজ্ঞাপনের দালাল, চিত্রকরের বিচারে
চিত্র-সমালোচক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাবনাচিন্তার গবেষণালব্ধ ফলাফল। তরুণ শিল্পী প্রজন্মের জন্য রচনাগুলো দারুণ শিক্ষণীয়। বইটির সম্পাদনায় প্রতিটি লেখার সঙ্গে রয়েছে চিত্তপ্রসাদের আঁকা ছবি। ফলে পাঠক-শিল্পীর গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয় অনায়াসে। ‘সঙ্গ-অনুষঙ্গ : নিকটজনের চোখে চিত্তপ্রসাদ’ শিরোনামের অভ্যন্তরে রয়েছেন ভারতবর্ষের অনেক কীর্তিমান বাঙালি। শিল্পী সোমনাথ হোর লিখেছেন, ‘আমার সঙ্গে যখন তাঁর পরিচয় হয় তখন তিনি পঞ্চাশের মন্বন্তরের অসহায় শিকার অজস্র নরনারীর ছবি এঁকে চলেছেন এবং সেগুলো সাম্যবাদী মুখপত্র পিপলস ওয়ার এবং জনযুদ্ধে অনবরত ছাপা হচ্ছে।’ সোমনাথ হোর আবার বলেছেন, ‘তিনি আমার দীক্ষাগুরু।’ চিত্তপ্রসাদ গান লিখেছেন সমাজবিরোধীদের উদ্দেশে। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের শিরোনাম – ‘অসাধারণ একজন শিল্পীর নাম চিত্তপ্রসাদ’। ‘চিত্তপ্রসাদ ও তাঁর শিল্পকাজ : নির্বাচিত রচনা’ অংশে সুধী প্রধান, প্রভাস সেন, রঘুনাথ গোস্বামী, গণেশ হালুই, নির্মাল্য নাগ, মৃণাল ঘোষ, এরিক স্টিন্যুস প্রমুখের লেখা সম্পাদিত হয়েছে।
এদেশের পত্রসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ চিত্তপ্রসাদের লেখা চিঠিগুলো। চিঠিগুলো পড়লে বেশ বোঝা যায়, ছবি আঁকার পাশাপাশি কতখানি সাহিত্য-নিমগ্ন ছিলেন তিনি। সম্পাদক প্রকাশ দাশ ‘চিত্তপ্রসাদের চিঠি’ অংশে নিজের মতামত জ্ঞাপন করেছেন এভাবে। মুরারি গুপ্তকে লেখা চিঠিগুলো ১৯৮১ এবং ১৯৯৪ সালের পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত। সোমনাথ হোর, সমর সেন, সুনীল জানাকে লেখা ১৯৬০ সালের চিঠিগুলো যোগসূত্র পত্রিকায় প্রকাশিত। সমগ্র গ্রন্থটি প্রকাশে সম্পাদক শুরুতেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন দেশ, পরিচয়, যোগসূত্র, গণেশ নাগ, নিউ এজ প্রকাশন, ললিতকলা একাডেমী (দিল্লি) প্রভৃতি পত্রিকা ও প্রতিষ্ঠান এবং বুদ্ধদেব বসু প্রমুখকে, যাঁদের সহযোগিতায় লিপিবদ্ধ হয়েছে চিত্তপ্রসাদসহ ভারতবর্ষের তৎকালীন ইতিহাসের বিভিন্ন অংশ। প্রয়োজনীয় টীকা, অসাধারণ তথ্যবহুল চিত্র পরিচিতি, লেখক পরিচিতি, পরিপাটি নির্দেশিকা চিত্র, বিষয়, নাম ও স্থানসংবলিত ৩৮২ পৃষ্ঠার কিছু অধিক বইটি সংগ্রহে রাখার মতো একটি মূল্যবান সম্পাদনা। আশির দশকের বিশিষ্ট কবি-প্রাবন্ধিক প্রকাশ দাশের অন্যতম প্রধান বিষয় ভারতীয় চিত্রকলা। তেরোশো পঞ্চাশের মহামন্বন্তরের পঞ্চাশ বছর স্মরণ উপলক্ষে দায় নামের একটি ছোট্ট গোষ্ঠীর উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে ভারতীয় জাদুঘরের শতবার্ষিকী হলে মন্বন্তরের শিল্পকলা প্রদর্শনীর একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে চিত্তপ্রসাদের চিত্রকলার নিবিড় সংস্পর্শে আসেন। তাঁর গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে চল্লিশের দশকের উত্তাল বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এর ফলে দীর্ঘ এক দশকের নিরলস চিত্তপ্রসাদ চর্চার ফল চিত্তপ্রসাদ গ্রন্থটি।

বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ও আমার কথা
কামরুল হাসান
সংগ্রহ ও সম্পাদনা : সৈয়দ আজিজুল হক
প্রথমা প্রকাশন
মূল্য : ২৮০ টাকা

দেশবিভাগের পরের তৎকালীন পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের ইতিহাসের শক্তিমান শিল্পী কামরুল হাসান (১৯২১-১৯৮৮)। পটুয়া কামরুল হাসানকে বাংলাদেশের সকলেই চেনেন, কিন্তু লেখক কামরুল হাসানকে পাঠকের সামনে তুলে ধরে সম্পাদক সৈয়দ আজিজুল হকের প্রচেষ্টায় এই গ্রন্থ সম্পাদিত হয়েছে। বইয়ের ভূমিকা থেকে জানা যায়, লেখক হিসেবে কামরুল হাসানের আবির্ভাব ঘটে কলকাতা আর্ট স্কুলে ছাত্র থাকাকালেই। ১৯৪৬-৪৭-এ মুকুল ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে দৈনিক আজাদের সাপ্তাহিক মুকুলের মহফিলের পাতায় নিয়মিত লিখতেন। পরবর্তী সময়ে শিল্প, শিল্পী, সংস্কৃতি নিয়ে বহু প্রবন্ধমূলক লেখা লিখেছেন। রাজনীতি ও ছোটগল্পও লিখেছেন। এবং জীবনের শেষ দশ বছরে নিয়মিত ‘খেরোখাতা’ নামে অসাধারণ একটি রোজনামচা লিখতে থাকেন আমৃত্যু। লেখক কামরুল হাসানের শক্তির দিক হলো, তিনি কৈশোর থেকেই রাজনীতি ও সমাজসচেতন, উদার ও প্রগতিশীল। কামরুল হাসানের লেখাগুলোর অধিকাংশই আগে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত। সম্পাদক স্পষ্টভাবে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। যেমন – বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন ‘আমার কথা’ শীর্ষক বাংলাদেশের চিত্রশিল্প আন্দোলনের ওপর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় গণসাহিত্য (সম্পাদক আবুল হাসনাত) পত্রিকায়। আবার শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘আমার মাস্টার মশাই : জয়নুল আবেদিন’ প্রথম প্রকাশিত হয় কণ্ঠস্বর (সম্পাদক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) পত্রিকায়। সাপ্তাহিক একতা পত্রিকায় (সম্পাদক : মতিউর রহমান) লিখেছেন, ‘একুশের ভাবনা’ ইত্যাদি। এর ফলে কামরুল হাসানের সঙ্গে বিভিন্ন পত্রিকার অস্তিত্বের ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত তথ্য-উপাত্ত পাঠকের মনে ইতিহাসসচেতনতা তৈরি করবে। অন্যদিকে পুরো বইটিতে কামরুল হাসানের সহজ-সরল ভঙ্গিতে বলে যাওয়া বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থার চিত্রায়ণ গভীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ‘আমার কথা : বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলন’ রচনায় কামরুল হাসান যেন দেশের ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে সহজ সত্যের দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান পর্ব, তৎকালীন সমাজবাস্তবতায় মুসলমান শিল্পীদের অবস্থান, অনেক মুসলিম শিল্পরসিক, বিভিন্ন পত্রিকার ভূমিকা ইত্যাদি সম্পর্কে পাঠকের জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে  সহজেই বিশ্লেষণ করা যায় যে, আমাদের শিল্পচর্চার ইতিহাসে প্রতিকূলতা ঠেলে কারা সাহসী নাবিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। রূপসী বাংলা চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের শেকড়ে শিল্পের বিকাশ ও সন্ধান, বিচার-বিশ্লেষণ হয়েছে খুব উদার প্রগতিশীল দৃষ্টিতে। বইটির বিভিন্ন প্রবন্ধে পাঠক সহজেই দৃশ্যায়ন করতে পারেন শিল্পীর নিজের ও জয়নুল আবেদিনের ভূমিকাসহ এদেশের দেশবিভাগ-উত্তর ও পরবর্তী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পর্যায়ক্রমিক পটপরিবর্তনের আঙ্গিকে শিল্পীদের সংগ্রাম ও বিকাশের যাত্রাপথ সম্পর্কে। ‘আমার স্কেচ ও প্রেমের ভ্রমরেরা’, ‘আমার কিছু কথা’ পড়তে পড়তে অনেক শিল্প শিক্ষার্থীর মনে হবে, কামরুল হাসানের শিল্পচর্চা তাঁরই মতো পর্যায়ক্রমিক প্রচেষ্টার ফল। উৎসাহিত বোধ করবেন শিল্প শিক্ষার্থীরা। দেশভাগ-পরবর্তী মুসলিমপ্রধান পূর্ব পাকিস্তানে কীভাবে আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে সে ইতিহাস জানাটা আজকের প্রজন্মের জন্য বাঞ্ছনীয়। বইতে সুন্দরভাবে সেসব দিনের বর্ণনা দেওয়া রূপকথার গল্পের মতোই ভাসতে থাকে মনের দৃশ্যকল্পে। তাঁর খেরোখাতার বিভিন্ন রচনা, পূর্ব প্রকাশিত লেখা এ গ্রন্থে সংগৃহীত ও সম্পাদিত হয়েছে। দেশের স্বনামধন্য অনেক শিল্পী-সাহিত্যিকের সঙ্গে কামরুল হাসানের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের কারো কারো মৃত্যুতে স্মৃতিচারণ করেছেন। কবি ফররুখ আহমদকে নিয়ে লেখা ফররুখ ভাই, কবি সিকান্দার আবু জাফরকে নিয়ে লেখা জাফর ভাই শিরোনামে বইয়ের পেছন দিকে ছাপা হয়েছে। ফেরা ১-৬-তে নিজের জীবনের বিভিন্ন কর্ম-অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। বাল্য স্মৃতি, ব্রতচারী, মণিমেলা, মুকুল ফৌজ ইত্যাদি। বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় কামরুল হাসানের ব্যক্তিগত ও শিল্পীজীবনের অ্যালবাম থেকে নেওয়া ছবি, তাঁর লাইন ড্রইংয়ের শিল্পকর্ম ইত্যাদি প্রকাশিত। পুরো বইটি যেন শুধু শিল্পী কামরুল হাসান নয়, বাংলাদেশের শিল্প-আন্দোলনকে জানবার সহজতর ও গুরুত্বপূর্ণ সমৃদ্ধ একটি প্রকাশনা।-
-জাফরিন গুলশান

Leave a Reply

*