logo

কিয়ারোস্তরি চারটি ছবি

মা হ মু দু ল  হো সে ন

ভূমিকা

ইরানি চলচ্চিত্রকার আববাস কিয়ারোস্তামি সাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিশ্ব-চলচ্চিত্রের প্রধান ওতরদের (auteur) মধ্যে একজন হয়ে উঠেছিলেন। গত জুলাই মাসের ৪ তারিখে ছিয়াত্তর বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। চলচ্চিত্র নির্মিতিতে, চলচ্চিত্রবিষয়ক কথনে কিয়ারোসত্মামি এক অনন্য প্রতিষ্ঠানই হয়ে উঠেছিলেন। জ্যাঁ লুক গোদার একসময় বলেছিলেন, ডি ডবিস্নউ গ্রিফিথকে দিয়ে চলচ্চিত্রের শুরম্ন আর তার শেষ কিয়ারোসত্মামিকে দিয়ে।

গত শতকের সাতের দশক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বছরগুলো পর্যমত্ম নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন কিয়ারোসত্মামি। ছোট-বড় মিলে তাঁর পরিচালিত ছবির সংখ্যা প্রায় পঁয়তাল্লিশ। এছাড়া আরো অনেক ছবির সঙ্গে প্রযোজক, কাহিনিকার এবং অন্যান্য ভূমিকায় জড়িত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপস্নবের পর যে নতুন বাসত্মবতা তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে চলচ্চিত্রিক সৃজনশীলতার এক শক্তিমান জগৎ গড়ে তুলেছিলেন যে কজন ইরানি নির্মাতা, আববাস কিয়ারোসত্মামি তাঁদের অন্যতম। তাঁর ছবি বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের প্রশংসা অর্জন করেছে, চলচ্চিত্র উৎসবে ব্যাপকভাবে পুরস্কৃত হয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্র-কথন নতুন চলচ্চিত্র-দর্শনের ইঙ্গিত দিয়েছে।

কিয়ারোসত্মামির চলচ্চিত্র বিষয়গতভাবে সদর্থক, মৃদু, সংকেতময়, গভীর সংবেদী ও চিত্রল। অথবা শুধু এই কেন – বাসত্মবতাবিষয়ক নতুন নতুন প্রসত্মাবনা, কাব্য ও চিত্রকলার ঐতিহ্যের মধ্যে সমকালের সত্যের উদ্যাপন, জীবন ও মৃত্যু বিষয়ে নৈতিক প্রশ্নগুলোর বিবেচনা অথবা প্রচলিত নৈতিকতা বিষয়ে পরিহাসপ্রবণ অনাস্থা – বিশদে বললে এসবই তাঁর চলচ্চিত্র। প্রশ্ন করা যেতে পারে, কিয়ারোসত্মামি কি এক আত্মমগ্ন, বিবরমুখী শিল্প-স্রষ্টা? তাঁর সমকালের নিষ্করম্নণতা কি তাঁকে বিচলিত করে না? তিনি কি নির্বিকার এবং নত? প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অবিরোধী তাঁর শিল্পযাত্রা? টেন এবং পরবর্তী ছবিগুলোর কথা যদি নাও তুলি; যে ক্লোজ-আপ, থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ, আ টেস্ট অব চেরি বা দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস তাঁকে দিয়েছিল জগৎজোড়া খ্যাতি এমন এক চলচ্চিত্রকার হিসেবে যিনি দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এক চলচ্চিত্রের রূপকার সেইসব ছবিতেই এক নিহিলিস্ট শিল্পীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি না কি আমরা? এমন এক শিল্পী যিনি শিল্পভোক্তার দায়মুক্তির দায়িত্ব নেন না। ক্লোজ-আপ দর্শককে সত্যবিষয়ক এক জটিলতার মধ্যে নিক্ষেপ করে, থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ এই নিশ্চয়তা দেয় না যে হোসেন এবং তাহেরেহ্ এক নতুন সুন্দর জীবন শুরম্ন করতে পারবে। যেমন নিশ্চয়তা দেয় না দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস যে বেহজাদ ওই শুদ্ধ গ্রামীণজীবনের অভিজ্ঞতায় একজন খাঁটি হিউম্যানিস্ট হয়ে উঠবে। আর আ টেস্ট অব চেরি তো বেঁচে থাকার অর্থ এবং যৌক্তিকতাকেই ক্লিন-চিট দেয় না! এভাবে এক মৃদুস্বর ভায়োলেন্স, ব্যর্থ মানবতা অথবা রাজনীতি বিষয়ে ক্ল্যান্ডেস্টাইন ম্যানিফেস্টো। কিয়ারোসত্মামি বলেছেন, যে বাসত্মবতার ভেতর তিনি সৃষ্টি করে যাচ্ছেন সেখানে তাঁর ছবিকে তিনি, ‘a tale of social injustice, frustration, forbiddance and stifling tradition’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারেন না। তাই সদর্থক পরিণতির এক ইঙ্গিত প্রায় সব ছবির শেষেই; কিন্তু শেষটাই পুরো ছবি নয়। বলা যায়, কিয়ারোসত্মামির বহু সত্মরের ন্যারেটিভের প্রতি অবিচার হবে তাঁর ছবির পরিণতিকে ছবির মর্ম হিসেবে গ্রহণ করলে। আলোচকরা এই বলে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন যে, ‘He was one of the greatest ironists and symbolists in the history of cinema, bringing out grand philosophical ideas and depicting independent-minded characters, nothetheless apparently deferring to imposed conventions and expectations.’

এই রচনায় আববাস কিয়ারোসত্মামির চারটি চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করা গেছে। এই চলচ্চিত্রগুলো তাঁর চারটি ভিন্ন ধরনের কাজের প্রতিনিধিত্বমূলক রচনা মনে করা যেতে পারে। দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস অমত্মর্জাত নিরীক্ষণের এক মগ্ন শিল্প রচনা। ক্লোজ-আপ মানুষের পরিচয়-সংকট এবং চলচ্চিত্র বনাম বাসত্মবতা অথবা ফিকশন বনাম ডকুমেন্টারি বিষয়ে পরীক্ষণ। আ টেস্ট অব চেরি জীবনের অর্থময়তা নিয়ে এক নাগরিক সংলাপ, যা দর্শককে সেরিব্রালি চলচ্চিত্রে সম্পৃক্ত করে আর শিরিন ডিজিটাল সময়ে নতুন চলচ্চিত্রের নিরীক্ষা। বলা যায়, এই প্রতিটি বিষয়েই একাধিক কাজ করেছেন কিয়ারোসত্মামি। অমত্মর্জাত নিরীক্ষণের বিষয়টি সেই হোয়্যার ইজ ফ্রেন্ডস হোম ছবিতে শুরম্ন হয়েছিল এবং তারপর থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ, অ্যান্ড লাইফ গোজ অন, দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস – এসব ছবির ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। ক্লোজ-আপ ফিকশন এবং প্রামাণ্যকরণের মধ্যে যে ভেদরেখা ভেঙে দিয়েছিল তা তাঁর পরের কাজে, বিশেষত প্রামাণ্য ছবির আঙ্গিকে, প্রধান হয়ে উঠেছিল। এমনকি টেনের মতো ছবি তিনি নির্মাণ করেছিলেন, যার প্রামাণ্য মূল্য তার কাহিনি মূল্যের চেয়ে কম নয়। আ টেস্ট অব চেরির মতো নাগরিক অসিত্মত্ববাদী ছবি তিনি আর করেননি, যদিও টেন অন টেন ছবিতে তিনি নিজেই বলেছেন, আ টেস্ট অব চেরি আর টেন নাগরিক জীবনের দুই রকম উপস্থাপন। ডিজিটাল মিডিয়াকে গুরম্নত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন কিয়ারোসত্মামি। এর শক্তি ও সম্ভাবনাকে নানা দিক থেকে পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে টেন, ফাইভ লং টেকস ডেডিকেটেড টু ওজু, এবিসি আফ্রিকা – এসব ছবিতে। শিরিন এই প্রক্রিয়ারই ক্লাইমেক্স।

 

দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস

 

কিয়ারোসত্মামির দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস তাঁর প্রথম পর্যায়ের প্রধান ছবিগুলোর মধ্যে শেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে পরিণত। এই ধারার ছবিগুলোতে তিনি ব্যক্তি এবং সমাজের সম্পর্ক বিষয়ে একধরনের নিবিড়, অমত্মর্জাত নিরীক্ষণ, চলচ্চিত্র ন্যারেটিভের অবভাসিক কৌশল, প্রাচীন পারস্যের দর্শন এবং চলচ্চিত্রে পারস্যের ঐতিহ্যবাহী মিনিয়েচার চিত্রকলার দৃশ্যগত দিকের ব্যবহার নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর পরের ছবিগুলোতে এসব বিষয়ে অধ্যয়ন, নিরীক্ষণ ও ইমপিস্নমেন্টেশন অব্যাহত থেকেছে; আসলে তাঁর সারাজীবনের কাজ একটি দীর্ঘ অ-বিযুক্ত চলচ্চিত্র-চিমত্মারই ফসল; কিন্তু পরে তাঁর কাজে ক্রমাগতই অন্যান্য মাত্রা যুক্ত হয়েছে। এক সাক্ষাৎকারে কিয়ারোসত্মামি বলেছিলেন, মানুষের স্বপ্ন সবসময়ই স্বাধীন, একটি চূড়ামত্ম নিপীড়নমূলক কর্তৃপক্ষও ব্যক্তির স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ, অ্যান্ড লাইফ গোজ অন অথবা দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস জীবনের অথবা বাসত্মবতার অবভাসিক নিরীক্ষণের ভেতরই স্বপ্ন নির্মাণ করে, সেই স্বপ্নের বাসত্মবতা জীবনকে ছুঁয়ে যায়, অন্যরকম জীবনের জন্য অনুপ্রাণিত করে। খৈয়াম কিয়ারোসত্মামির প্রোটাগনিস্টদের অনিরামেয় রকম জীবনবাদী করে তোলেন।

‘They tell me the other world is as beautiful as a houri from heaven!

Yet I say that the juice of the vine is better.

Prefer the present to those fine promises.

Even a drum sounds melodious from afar.’

অথচ এসব ছবি যেন বাসত্মবের এমনই দেখন যে, সেখানে কোনো মোহন মিথ্যা নেই। সত্যই, কিন্তু দেখবার নির্মিতিতে এক সিনেমাটিক দেশ-কালের ভেতর সে সত্য জীবনের প্রতি অমোঘ টান সৃষ্টি করে। আবার সে সত্য সেরিব্রালও, তা দর্শকের মধ্যে কাজ করে, জাগিয়ে তোলে, ধীর নিশ্চয়তায় দর্শককে ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকায় দাঁড় করায়। বলেছিলেন কিয়ারোসত্মামি, ওই সাক্ষাৎকারেই, যে ছবি তাঁকে প্রেক্ষাগৃহে অস্থির করে তোলে, ঘুমাতে দেয় না (!) সে ছবি তাঁর প্রিয় নয়; বরং যে ছবি দেখতে দেখতে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন এবং তারপর দিনের পর দিন এবং সপ্তাহের পর সপ্তাহ যে ছবি তাঁর ভেতরে কাজ করে সে ছবিই তাঁর প্রিয়। কিয়ারোসত্মামির লং টেক, চড়াই-উতরাইয়ের দীর্ঘ পথ, ধীর উন্মোচন, আটপৌরে সংলাপের ঘনিষ্ঠতা আমরা যাপন করতে থাকি; ছবি শেষ হওয়ার পর তারা আমাদের সঙ্গী হয়, হয়ে থাকে।

দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস শুরম্ন হয় পাহাড়ি পথে একটি ফোর হুইলার গাড়ির যাত্রার দৃশ্য দিয়ে। লং শট কখনো এক্সট্রিম লং শটে পরিণত হয়, পাহাড়ের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গাড়িটি চলতে থাকে; এই যাত্রা, এই দৃশ্যায়ন এক জাগতিক আধ্যাত্মিকতার জন্য দর্শককে প্রভাবিত করতে থাকে। গাড়ির যাত্রীদের টুকরো সংলাপে নতুন কিছু প্রকাশিত হয় না। তাদের আমরা দেখি না, তাদের সংখ্যাও জানা হয় না। এই যাত্রা এক অন্বেষণ, আপাত বাসত্মবতায় একটি লোকালয়ের, এই গভীর, পাহাড়ি নির্জনতায় – এই জানা যায়; কিন্তু অন্বেষণের বিষয়টিকে আরো সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলি আমরা। পরে, চলচ্চিত্র অগ্রসর হলে বোঝা যায় আমাদের ভুল হয়নি, অন্বেষণই এই ছবির, এই যাত্রার ধ্যান। অবলোকন ও অন্বেষণ – এভাবেই এই পাহাড়ি গ্রামে আমাদের অভিজ্ঞতা নির্মিত হয়। অবলোকন এক বাসত্মব-দৃষ্টিগ্রাহ্য অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে এবং বাসত্মবতা এমনভাবে কাজ করে আমাদের মধ্যে যে আমরা বুদ্ধি ও সংবেদ দিয়ে ক্রমাগত অন্বেষণ করি তার ভেতরের সত্যকে।

এখন অবশ্য ফারজাদের দেখা মেলে। এই বছর দশেকের স্কুলে পড়া বালক অপেক্ষা করছে এই গাড়ির আরোহীদের জন্য, তাদের পথ দেখিয়ে গ্রামে নিয়ে যায় সে। ক্রমশ জানা যায় যে গাড়ির আরোহীর সংখ্যা তিন, তাদের ভেতর বেহজাদকেই কেবল দেখি আমরা। বেহজাদ গাড়ি ছেড়ে ফারজাদের দেখানো পথ বেয়ে তাদের ঠিকানায় পৌঁছে। সে পথটা কঠিন, খাড়া পাহাড়-ভাঙা পথ, কিন্তু সহজ পথের চেয়ে সংক্ষিপ্ত – ফারজাদের কাছে শোনা কথা। আর যা বোঝা যায় তা হলো, বেহজাদ আর তার সঙ্গীরা এসেছে তেহরান থেকে এই গ্রামের এক বৃদ্ধ মহিলার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা জেনে। মৃত্যু-পরবর্তী যে আনুষ্ঠানিকতা তার প্রামাণ্যকরণের জন্যই সম্ভবত তারা সাতশো কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করে এই গ্রামে এসেছে। আমরা ধরে নিই, এই জনপদের ঐতিহ্যবাহী এ অনুষ্ঠানটি নিয়ে হয়তো একটি প্রামাণ্য ছবিই বেহজাদ আর তার সঙ্গীরা নির্মাণ করতে চায়। কিন্তু বিষয়টি নিশ্চিত নয়, কারণ তাদের কোনো যন্ত্রপাতি বহন করতে আমরা দেখি না। বেহজাদ ও তার সঙ্গীদের এই গ্রামে অপেক্ষার পালা শুরম্ন হয়। বৃদ্ধ মহিলা, আমরা এখন জানি যে তিনি হচ্ছেন মিসেস মালেক, তার মারা যাওয়ার কোনো তাড়া আছে বলে মনে হয় না। বেহজাদ প্রতিদিন নিয়ম করে ফারজাদের কাছে মিসেস মালেকের হাল অবস্থা জানতে চায় আর ক্যামেরা গলায় ঝুলিয়ে গ্রামের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়ায়, ছবি তোলে। চা-খানায়, প্রতিবেশীদের বাড়ির আঙিনায় বেহজাদকে দেখা যায়। বেহজাদের গ্রাম দেখার প্রক্রিয়ায় আমরা, দর্শকরা সঙ্গী হই। কিন্তু আমরা বেহজাদের চোখ দিয়ে গ্রামটিকে দেখি না, বরং বেহজাদের দেখাকে আমরা দেখি। এই পাহাড়ি গ্রামে মানুষের উলস্নম্ব জীবন, তাদের জীবনের চড়াই-উতরাই ভাঙাকে দেখে বেহজাদ, দেখতে দেখতে নিজের মুখোমুখি হয় প্রায়ই; তার মগ্ন, চিমিত্মত চেহারাকে সকালের দাড়ি কামানোর আয়নায় দেখি আমরা। আয়নার জায়গায় আসলে ক্যামেরা। বেহজাদকে মোবাইল ফোনে খোঁজ করে কেউ তেহরান থেকে। ভালো সিগন্যাল পাওয়ার জন্য তাকে বারবার গাড়ি নিয়ে ছুটতে হয় এই উপত্যকার একেবারে চূড়ার দিকে। সম্ভবত তার ছবির প্রযোজক মিসেস গোদজারি এই ফোনগুলো করেন এবং আমরা বুঝি যে তিনি ক্রমশ অস্থির হয়ে পড়ছেন। বেহজাদ ও মিসেস গোদজারির এই আলাপচারিতাগুলো এই শস্নথগতির গ্রামের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দেখতে আমরা ক্রমশ কিছু বোঝাপড়ার ভেতর প্রবেশ করি – বেহজাদের মতোই জীবন ও তার অর্থবিষয়ক, বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যবিষয়ক কিছু চিমত্মা আমাদের সঙ্গী হয়। ছবি চলতে থাকে, বেহজাদের এই গ্রামবাস এক সময়হীন, ক্লাইমেক্সহীন স্বাদু অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে থাকে। বেহজাদ কখন যেন খোঁজ পায় ইউসুফের। সে উপত্যকার চূড়ায় একটি গর্ত খুঁড়ছে। ইউসুফকেও দেখি না আমরা। কিন্তু সে বেহজাদের বন্ধু হয়ে ওঠে। বেহজাদকে সে আমন্ত্রণ জানায় গ্রামে তার প্রেমিকা, হয়তো বাগদত্তা, জয়নবের কাছ থেকে এক ঘটি দুধ সংগ্রহ করে নিতে। বেহজাদ জয়নবকে খুঁজে বের করে। জয়নবদের বাড়িতে মাটির নিচে এক অন্ধকার গোশালায় জয়নব গরম্নর দুধ দুইয়ে দেয় আর বেহজাদ তাকে শোনায় ফরোঘ ফারোখজাদের কবিতা। ‘হায়, আমার এই ছোট্ট রাতে,/বাতাস পাতাদের ছুঁয়ে যেতে চায়।/আমার এই ছোট রাত ভয়ংকর বেদনায় ভরা,/এই যে! ছায়াদের শব্দ তুমি শুনতে কি পাও?’ আধুনিক কবির এই শব্দ-সংবেদ গ্রামের প্রায়ান্ধকার গোশালায় এক না-দেখা কিশোরীর সঙ্গে আমাদের কি এক তোলপাড় করা সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই দৃশ্যের ভিজ্যুয়াল এবং সংলাপ তার সকল সম্ভাব্য কনোটেশনকে অতিক্রম করে যায়!

বেহজাদ ক্রমশ জড়িয়ে পড়তে থাকে গ্রামের অনুত্তেজিত, নিশ্চিত জীবনপ্রক্রিয়ায়। ছোট ছেলে ফারজাদের সঙ্গে অন্যায়, অসহিষ্ণু আচরণে একটি সম্পর্কের টানাপড়েন তৈরি করে ফেলে বেহজাদ এবং ভীষণ গুরম্নত্ব দিয়ে সে ফারজাদের সঙ্গে তার সম্পর্কটি আবার মেরামত করে নেয়। ফারজাদের স্কুলশিক্ষক এই গ্রামের জীবনের এক ভিন্ন পাঠ উপস্থিত করে। তার মতে এই যে শেষকৃত্যের অনুষ্ঠান, এটি কোনো বর্ণিল সাংস্কৃতিক ব্যাপার নয়, বরং স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের প্রতি সাধারণ মানুষের আনুগত্য প্রদর্শনেরই একটি আনুষ্ঠানিকতা।

উপত্যকার চূড়াতেই একসময় বেজহাদ আবিষ্কার করে যে, তার বন্ধু ইউসুফ মাটিচাপা পড়তে যাচ্ছে। দ্রম্নত গাড়ি চালিয়ে নিচে নেমে আসে সে এবং গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিয়ে সে ফিরে আসে দুর্ঘটনার জায়গায় এবং উদ্ধার করে ইউসুফকে। তারপর স্থানীয় ডাক্তারের মোটরসাইকেলের পেছনে চেপে কাছের শহরে রওনা হয় কিছু ওষুধের খোঁজে। ফসলে ছাওয়া পাহাড়ি মাঠের সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে এটাই এই ছবির শেষ যাত্রা। আশ্চর্য পার্থিবতায় এই যাত্রা অনন্য হয়ে ওঠে। চোখ জুড়ানো ল্যান্ডস্কেপের ভেতর দিয়ে চলতে চলতে ডাক্তার বলে, মৃত্যুর ওপারের জীবন থেকে কেউ ফিরে আসেনি। তাই এটা বলা মুশকিল যে সেখানে এই জীবনের চেয়ে ভালো কিছু আছে কি না। তার চেয়ে জীবনকে এই পৃথিবীতেই উপভোগ করা ভালো। সে ওমর খৈয়ামের মৃত্যুহীন পঙ্ক্তিমালা উচ্চারণ করে।

মিসেস মালেক একসময় মারা যান। গ্রামের মানুষ তার শেষকৃত্যের আয়োজন করতে থাকে। কিন্তু বেহজাদ মৃত্যু নয়, জীবনের প্রতি বেশি টান অনুভব করে, সে বরং গ্রামের বর্ণিল জীবনের ছবি তুলতে থাকে।

বেহজাদের এই অভিজ্ঞতা তাকে কি একজন ভিন্ন মানুষ করে তোলে, নাগরিক বৈদগ্ধ এবং অ-স্থির, নাসিত্মবোধ থেকে গভীর জীবনবাদী, সহজ সংবেদী কেউ হয়ে ওঠে কি সে? এমন নাটকীয় মেটামরফসিস ঘটে না এই ছবির সীমানার মধ্যে। কিন্তু এই গ্রামের অনাড়ম্বর পার্থিবতা আক্রামত্ম করে বেহজাদ এবং আমাদের। আর আরোহণের মহত্ত্ব এবং অর্জনকে আমরা বিশিষ্ট মানি। এটা এই ছবির, দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আসের সম্পন্নতা যে, এইসব পৃথিবীজাত আধ্যাত্মিকতা আমাদের নিমজ্জিত করে, কিন্তু কোনো ডগমার ছায়া পড়ে না। মগ্ন, প্রশামিত্মতে নতুন কিছু শুরম্ন করার কথা ভাবা যায়; প্রিয় পৃথিবীর মন্দ বায়ু নিশ্চয়ই সে শুরম্নর পালে হাওয়া দেবে; এমনই ‘আশায় বসতি’ গড়া যায়।

ধীর উন্মোচন অথবা অব্যক্ত সংবেদ এভাবেই এই ছবির চলন। আমরা দেখি না ছবির অনেক গুরম্নত্বপূর্ণ চরিত্রকে। তার ভেতর আছেন বৃদ্ধ মিসেস মালেক, বেহজাদের দুই সঙ্গী, গর্ত খুঁড়ছে যে ইউসুফ তাকে, এমনকি জয়নব একটি বড় দৃশ্যে অংশগ্রহণ করলেও তাকে দেখা হয় না দর্শকের। আমরা দেখি না, বেহজাদের প্রযোজক (সম্ভবত!) মিসেস গোদজারিকেও। এতসব না দেখা চরিত্ররা কাজ করে যেতে থাকে আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে; আমরা সক্রিয় হই নির্মাণে; এই চলচ্চিত্রের, অথবা আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটি চলচ্চিত্রের।

বেহজাদ যেভাবে এই গ্রামটিকে দেখে তার ইমেজ পারস্যের মিনিয়েচার চিত্রকলার আদলে গড়া। উলস্নম্ব কম্পোজিশন, ইমেজের মধ্যে কোনো বিষয়ের প্রতি আলাদা গুরম্নত্ব প্রদান না করা; এমনকি একই চিত্রের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের গল্পের উপস্থাপন (পাহাড়ি গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির মধ্যে উলস্নম্ব চলমান ক্যামেরা এই অনুভবটি দেয়) – এসব মিলে ইমেজের এই আনুষ্ঠানিকতা। পারস্যের মিনিয়েচার চিত্রকলার এই ইমেজ গঠন আরো অনেক কিছুর সঙ্গে একধরনের অনাড়ম্বর, সরল আধ্যাত্মিকতায় সম্পৃক্ত। কিয়ারোসত্মামি এই মেজাজটিই নির্মাণ করতে চেয়েছেন এই ছবিতে। পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপের আর তার মধ্যে আঁকাবাঁকা পথ ইরানি মিনিয়েচার ছবির খুব পরিচিত কম্পোজিশন। কেবল দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস কেন, এরকম পথে গাড়িতে ভ্রমণ আর ওয়াইড আ্যাঙ্গেল শটে ধীর প্যানে লং টেক ছড়িয়ে আছে কিয়ারোসত্মামির অনেক ছবিতেই। এই যাত্রা জীবনবিষয়ক প্রবল আসিত্মকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে তাঁর ছবিতে। সত্যিকার অর্থে অ্যান্ড লাইফ গোজ অন, থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ এবং দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস মিলে এই আসিত্ম-যাত্রারই এক অসাধারণ নির্মিতি।

ক্লোজ-আপ

 

Close-up is not a film about cinema, it is portrait of a man who is searching, erratically but desperately, for his place in the world. It is only because his passion, the object of his desire and his source of comfort is the cinema that the Close-up is also about cinema.’ আববাস কিয়ারোসত্মামির এই কথা তাঁর ক্লোজ-আপ ছবিটিকে নিয়ে ভাববার প্রধান অক্ষপথটি নির্মাণ করে দিতে পারে। প্রথম দর্শনে আমরা চলচ্চিত্রের আঙ্গিক বিষয়ে একটি নিরীক্ষা হিসেবে ছবিটির ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারি। অস্বীকার করা যাবে না যে, পরে যেভাবে অগ্রসর হয়েছে কিয়ারোসত্মামির চলচ্চিত্রের বাসত্মবতাবিষয়ক নির্মাণ ও বিনির্মাণ তাতে ক্লোজ-আপ একটি মোড় ফেরানো মাইলফলক। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট চলচ্চিত্র-অভিব্যক্তি হিসেবে ক্লোজ-আপ অবশ্যই একটি ট্র্যাজিক মানবীয় পোর্ট্রেট, একজন অসহায় মানুষের অসিত্মত্ববিষয়ক সংলাপ।

ক্লোজ-আপ শুরম্ন হয় হোসেইন সাবজিয়ানের গ্রেপ্তারের ভেতর দিয়ে। ক্রমশ জানা যায়, সাবজিয়ান নিজেকে বিখ্যাত ইরানি চলচ্চিত্রকার মহসিন মাখমালবাফ হিসেবে পরিচয় দিয়ে একটি পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। সেই অভিযোগেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বোঝা যায়, ছবির কাহিনিটি সত্য ঘটনানির্ভর এবং এতে যাঁরা ‘অভিনয়’ করছেন তাঁরা সবাই নিজেদের বাসত্মব জীবনের চরিত্রগুলোকেই রূপায়িত করছেন। আসলে এ ঘটনাটি কিয়ারোসত্মামি খবরের কাগজে দেখেছিলেন এবং বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি বিষয়টি নিয়ে একটি ছবি করতে, আসলে একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যেতে, আগ্রহ বোধ করেন। তিনি সাবজিয়ানের সংকট এবং তার বোধের মধ্যে একটি যাত্রার অভিজ্ঞতা নির্মাণ করতে চান। আদালতে মামলাটি চলতে থাকাকালে কিয়ারোসত্মামি শুটিং করার অনুমতি নেন। সেখানে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা যে সাক্ষ্য দেন তাতে করে ঘটনার আদলটি ক্রমশ গড়ে ওঠে। এসব ঘটনা কিয়ারোসত্মামি আবার একই ব্যক্তিদের সাহায্য নিয়ে পুনর্নির্মাণ করেন। জানা যায়, হোসেইন সাবজিয়ান একজন দরিদ্র মানুষ, পেশায় ছাপাখানার সহকারী। তার স্ত্রীর সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেছে, তার কিশোর সমত্মানের সঙ্গে যোগাযোগটি ক্ষীণ। তার চলচ্চিত্রের নেশা প্রবল, বিশেষ করে মহসিন মাখমালবাফ তার প্রিয় চলচ্চিত্রকার। একটি কারণ সম্ভবত এই যে, মাখমালবাফ তার মতোই কর্মজীবী পরিবারের সমত্মান। এই খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকারের পরিচিতি তাকে একধরনের আত্মবিশ্বাস দেয়। হয়তো একধরনের আত্মসম্মানও সে বোধ করে এই জাল পরিচয়ে। একদিন বাসে ভ্রমণ করার সময় সে দেখতে পায় যে তার সহযাত্রী মহিলা মাখমালবাফের দ্য সাইক্লিস্ট ছবিটির চিত্রনাট্যটি পড়ছেন। এই সুযোগে সাবজিয়ান নিজেকে মহসিন মাখমালবাফ হিসেবে পরিচয় দেয়। তার সহযাত্রী মিসেস আহানখা তাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান। সাবজিয়ান সেখানে যায় এবং ক্রমশ আহানখা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সে গল্প ফাঁদে যে তার (মহসিন মাখমালবাফের) আগামী ছবির একটি সম্ভাব্য সেট হিসেবে আহানখাদের বাড়ির কথা ভাবছে। পরে অবশ্য সে ধরা পড়ে যাওয়ার পর আহানখা পরিবার সন্দেহ প্রকাশ করে যে, সাবজিয়ান আসলে ডাকাতির পরিকল্পনা করছিল! সে একসময় ওই পরিবারের নিকট থেকে এক হাজার নয়শো তোমান ধার করে। আসলে আদালতে এই টাকা নেওয়ার বিষয়টিই তার অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। সাবজিয়ান আদালতে তার দোষ স্বীকার করে, অনুতপ্ত হয়। তবে সে দাবি করে যে তার একমাত্র অপরাধ হচ্ছে ওই ধারের টাকা ফেরত না দেওয়া। পরে আহানখা পরিবার সাবজিয়ানের বিরম্নদ্ধে তাদের অভিযোগ তুলে নেয়। ছবির শেষ দৃশ্যে মহসিন মাখমালবাফ (আসল) এবং সাবজিয়ানের দেখা হয়। পরিচিতি এবং বাসত্মবতাবিষয়ক কিছু মৌলিক প্রশ্ন উপস্থাপন করে ক্লোজ-আপ চলচ্চিত্র শেষ হয়।

সাবজিয়ান একজন তথাকথিত সরল, সাদাসিধে মানুষ নয়। তার চরিত্রে জটিলতা আছে, তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত তো নয়ই। কিন্তু সে একজন ভেঙে পড়া, ব্যর্থ, যন্ত্রণাকাতর মানুষও। একটি স্বপ্নের ভেতর দিয়ে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়; এই স্বপ্ন একটি ভিন্ন পরিচিতির। আসলে সে হয়তো এই প্রতারণার ভেতর দিয়ে, যেটি একটি আত্মপ্রতারণাও বটে, সে এমন জীবনের মিথ্যা স্বাদ নিতে চায় যে জীবন তার জন্য এক অর্থে নিষিদ্ধ। হয়তো কাকতালীয় ব্যাপার এই যে, তার এই পরিচিতির প্রতারণার খেলাটির সঙ্গে চলচ্চিত্রের যোগাযোগ আছে (সে চলচ্চিত্রকার মহসিন মাখমালবাফের পরিচয় জাল করতে চায়)। কারণ চলচ্চিত্রের যে দৃশ্যজগৎ তা বাসত্মবের এক বিভ্রমই তো সৃষ্টি করে। অথচ তা হয়তো বাসত্মব নয়। এক অর্থে সে এক স্বপ্নেরই জগৎ। অন্যদিকে আঙ্গিকগতভাবে এই ছবিতে বাসত্মবতা, কল্পনা, প্রামাণ্যকরণ – সব একাকার হয়ে গেছে। ছবির কাহিনি যেভাবে ক্রমশ উন্মোচিত হয় সে বিষয়ে একজন আলোচক মমত্মব্য করেছেন, ‘The absence of exact references to times and dates means that the audiences must continually reorder the scenes that they are shown on the screen, change their perspectives and question their perceptions, in an uncomfortable but productive state of uncertainty.’

আবার সাবজিয়ান তো চলচ্চিত্রেই মগ্ন এক চরিত্র। সে নিজেই নিজেকে তুলনা করে কিয়ারোসত্মামির দ্য ট্রাভেলার ছবির সেই ছেলেটির সঙ্গে যে তেহরানে একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে যেতে চায়। সেজন্য ছেলেটি ছবি তোলার ভান করে টাকা জোগাড় করে, কিন্তু ম্যাচের সময় ঘুমিয়ে পড়ায় তার আর খেলাটি দেখা হয় না। সে দাবি করে যে, সে আইন ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু শিল্পের জন্য তার যে ভালোবাসা তাও বিবেচনা করে দেখা উচিত। আসলে সাবজিয়ান সমাজের প্রচলিত নিয়ম, বিধি, নৈতিকতার ঘেরাটোপের বাইরে এক অসিত্মত্ববাদী চরিত্র। সে ক্রিমিনাল নয়, কিন্তু অর্থবহ অসিত্মত্বের জন্য তার ডেসপারেশন আছে। তার জীবনে স্বপ্ন এবং বাসত্মবতার কিছু দ্বন্দ্ব আছে। সে দ্বন্দ্ব তার আচরণের নিয়মত্মা, কিছু মাত্রায়। সম্ভবত চলচ্চিত্র ও জীবনের যে সম্পর্ক তা সাবজিয়ানের চরিত্রের দ্বন্দ্বের এক জুতসই সমামত্মরাল। আবার বাসত্মবতা, মানুষের সত্যিকারের পরিচিতিবিষয়ক বাসত্মবতা যে এক আপেক্ষিক ব্যাপার, সেটিও যেন বলার বিষয় হয়ে ওঠে এই ছবিতে। আমরা মানুষকে জানি তার একটি পরিচয়ের ভেতর দিয়ে, কিন্তু তার জীবন, স্বপ্ন, সংকট মিলে তার যে পূর্ণ পরিচিতি সেটি সম্ভবত এক অধরা সত্য – এক জটিল অসিত্মত্ববিষয়ক সংলাপ।

ক্লোজ-আপ ছবির শেষ দৃশ্য অবশ্য মানবিকতায় সমর্পিত। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে সাবজিয়ান দেখতে পায় তার জন্য অপেক্ষা করছেন মহসিন মাখমালবাফ স্বয়ং। তাঁর মোটরসাইকেলের পেছনে চেপে সাবজিয়ান রওনা হয় আহানখা পরিবারের বাড়ির উদ্দেশে, তার অনুতাপ প্রকাশের জন্য। কিয়ারোসত্মামি এই ছবির বা বাসত্মবতার ঘটনাক্রমের মধ্যে এভাবে যোগ করেন কিছু মাত্রা। সাবজিয়ানের মুক্তি পাওয়ার বিষয়টিতে যেমন তিনি ভূমিকা রাখেন তেমনি তিনি তাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন তার প্রিয় চলচ্চিত্রকারের সঙ্গে। আর আহানখাদের তিনি চলচ্চিত্রের চরিত্র করে তোলেন, যেমনটা তিনি তাদের কথা দিয়েছিলেন। কিয়ারোসত্মামি চলচ্চিত্রনির্মাতা, নাকি বাসত্মবের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেন? অথবা এই দুইয়ের মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য নেই – এই কি তিনি বলতে চান?

 

আ টেস্ট অব চেরি

 

আ টেস্ট অব চেরি অবশ্য জীবনের অর্থবিষয়ক এক নাগরিক, রিচুয়ালিস্ট সন্ধান। আপাত বিসত্মারে মিস্টার বদি আত্মহত্যা করতে চান; সেই কাজটি করার জন্য তিনি সহমর্মী, সহযোগী খোঁজ করেন, যেন তিনি মৃত্যুকেই খোঁজেন। আসলে মৃত্যু নয়, মিস্টার বদির এই যাত্রা, জীবনের অর্থময়তা বিষয়ে এক ডিসকোর্স হয়ে ওঠে। তিনি তার ফোর হুইলার চালিয়ে শহরের রাসত্মায় চলতে চলতে অনুসন্ধিৎসু চোখ রাখেন। বোঝা যায় কাউকে, বিশেষ কাউকে খুঁজছেন তিনি। দিনমজুরদের ডাকে তিনি সাড়া দেন না। তার কাজটি সম্ভবত তাদের জন্য নয়। গাড়ি থামিয়ে তিনি অচেনা মানুষদের তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা জানতে চান, কিন্তু তার উদ্দেশ্য প্রকাশ করেন না। এক তরম্নণ সৈনিককে গাড়িতে তুলে নেন তিনি। তাকে সময়মতো ব্যারাকে পৌঁছে দেওয়ার কথা দিয়ে তিনি তাকে নিয়ে যান শহরের প্রামেত্ম এক নির্জন এলাকায়। সেখানে একটি গাছের নিচে তিনি তার মৃত্যুর স্থানটি নির্ধারণ করে রেখেছেন। একটি গর্তও খোঁড়া আছে সেখানে। বদি সৈনিকটিকে অনুরোধ করেন পরদিন সকালবেলায় এখানে আসার জন্য। সে এখানে এসে তাকে দুইবার ডাকবে। যদি তিনি সাড়া দেন তাহলে সৈনিকটি তাকে রক্ষা করবে, গর্ত থেকে উঠে আসতে সাহায্য করবে। আর সাড়া না দিলে বিশ কোদাল মাটি ফেলে গর্তটি ভরাট করে দেবে। সৈনিকটি এই প্রসত্মাবে ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মিস্টার বদি মাটি ভরাট করার একটি অতিকায় গাড়িকে অনুসরণ করে একটি সিমেন্ট কারখানার বন্ধ গেটে পৌঁছে যান। সেখানে এক প্রহরী এবং তার বন্ধু এক ধর্মপ্রচারকের সঙ্গে তার দেখা হয়। এদের কাউকেই মিস্টার বদি তার কাজের জন্য সহযোগী হিসেবে জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। উল্টো ধর্মপ্রচারকটি তাকে ধর্মীয় উপদেশ শোনান। শেষ পর্যমত্ম বদি একজন বৃদ্ধ মানুষকে গাড়িতে লিফট দেওয়ার জন্য তুলে নিলেন। এই লোকটি, মিস্টার বাঘেরি, ন্যাচারাল হিস্ট্রি জাদুঘরের কর্মচারী। জানা যায়, এক বছর আগে তিনিও আত্মহত্যা করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পায়ের কাছে পড়ে থাকা মালবেরি ফল তাকে জীবনে ফিরে আসতে অনুপ্রাণিত করেছিল! মিস্টার বাঘেরি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে সহযোগিতা করতে রাজি হন, কারণ তার অসুস্থ ছেলের চিকিৎসার জন্য টাকা প্রয়োজন।

এরপর রাতের বেলা ওই গর্তে মিস্টার বদির আত্মহত্যার আয়োজন। ঘুমের বড়ি খেয়ে চোখ বোজেন তিনি। বৃষ্টি, মেঘের গর্জন এবং বিদ্যুৎ চমকানোর মধ্যে একসময় ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। এরপর দীর্ঘ অন্ধকার ফ্রেম পার হয়ে যখন আবার ইমেজ ফুটে ওঠে তখন দেখা যায় ওই একই স্থানে গুনতি করতে করতে মার্চ করে যাওয়া সৈনিকদের। আমাদের মনে পড়বে যে আগের দিন তরম্নণ সৈনিকটির সঙ্গে সেনাবাহিনীতে এই গুনতি করার বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছিল মিস্টার বদির। তিনিও একসময় সেনাবাহিনীতে ছিলেন। ছবির এই অংশটি ভিডিও ক্যামেরায় শুট করা। গত শতকের নয়ের দশকের সেই সময় মাত্র আবির্ভূত ভিডিও প্রযুক্তির গ্রেইনি ছবি সহজেই চেনা যায়। শুধু তা-ই নয়, শটগুলো হ্যান্ডহেল্ড, অনানুষ্ঠানিক। এ প্রায় আরেকটি চলচ্চিত্র শুরম্ন হওয়ার মতো ব্যাপার। রূপকে আরেকটি জীবন, বদির অথবা চলচ্চিত্রের। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিল্ম ক্যামেরাসহ ক্যামেরাপার্সনকে দেখা যায়। দেখা যায় স্বয়ং আববাস কিয়ারোসত্মামিকে। আর দেখা যায় মিস্টার বদিকেও। তার পরনে অবশ্য ভিন্ন পোশাক। বোঝা যায়, কিয়ারোসত্মামি ওই সৈনিকদের নিয়ে একটি শট নিচ্ছেন। শেষ সংলাপ হিসেবে শোনা যায়, ‘আমরা এখানে একটি সাউন্ড টেকের জন্য এসেছি।’

যে গাছটি মিস্টার বদির জন্য ছিল মৃত্যুর স্থানের চিহ্ন বিশেষ, তা-ই এই দৃশ্যে সৈনিকদের জন্য হয়ে গেল বিশ্রামের জায়গা, জীবনকে সঞ্জীবিত করার উপকরণ। এই দৃশ্যে যে সুরটি আমরা ট্রাম্পেটের বাদনে শুনি সেটি আমেরিকার বিখ্যাত জাজ গায়ক লুইস আর্মস্ট্রংয়ের ‘সেন্ট জেমস ইনফার্মারি’র সুর। ছবির আগের নববই মিনিটেরও বেশি সময়ে কোনো সুর আমরা শুনি না। শেষ দৃশ্যে পাশ্চাত্যের এই সুরের উপস্থিতি সম্ভবত এক অতিক্রামত্মাবস্থার প্রতীক। এর লিরিক প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকের প্রকাশ হলেও শেষ পর্যমত্ম মৃত মানুষটির জীবনকে উদ্যাপনের মুডে শেষ হয়। আত্মহত্যার বিপরীতে জীবনবাদী যে কথকতা তার বিশ্বজনীনতা প্রকাশ করতে এই সুরের আয়োজন এই ছবিতে – এমন মনে করা হয়েছে।

বলা যেতে পারে আ টেস্ট অব চেরি ছবিতে আববাস কিয়ারোসত্মামি জীবনকে এক পরীক্ষার মুখোমুখি করেছেন। এই পরীক্ষা মিস্টার বদির গাড়ির জানালা দিয়ে দেখা যাওয়া বিরান লাল মাটির ভূমি, ক্রেন শটে নিঃসঙ্গ আঁকাবাঁকা পথে বদির চলমান গাড়ি, তার আত্মহত্যাবিষয়ক প্রায় রিচুয়ালিস্টিক আয়োজনের ভেতর দিয়ে চলতে থাকে। যে চরিত্ররা তাকে সহযোগিতা করতে রাজি হয় না তাদের খুব জোরালো করে তোলা হয় না। আবার যে তাকে সহযোগিতা করতে রাজি হয় (মিস্টার বাঘেরি) তার অভিজ্ঞতার মধ্যে আত্মহত্যা বনাম মালবেরিবিষয়ক প্রায় কৌতুকপ্রদ একটি গল্প আছে। মিস্টার বদির জীবনের সমস্যা কী, কেন তিনি আত্মহত্যা করতে চান, তা জানা হয় না আমাদের। কিন্তু তার বিষাদঘন দিনযাপন; আত্মহত্যার জন্য শামত্ম, গম্ভীর, নিঃসঙ্গ প্রস্ত্ততি একধরনের কনভিন্সিং আবহ তৈরি করে। রাতের অন্ধকার মেঘ ও বৃষ্টিতে আরো অন্ধকার হয়ে যায়, পৃথিবীকে জীবনযাপনের জন্য খুব আকর্ষণীয় স্থান বলে মনে হয় না। আসলে এই পরীক্ষায় জীবন প্রায় হেরেই বসে। কিন্তু ভিডিও ক্যামেরায় শেষ এবং কার্যত বিচ্ছিন্ন দৃশ্যটি শুরম্ন হলে জীবন ভিন্নমাত্রায় প্রকাশিত হয়। আসলে জীবনবিষয়ক অনেক উত্তেজনা ও অনুভব অথবা তাদের অনুপস্থিতি কি বিভ্রম মাত্র? যেমন চলচ্চিত্র হয় জীবনের বা বাসত্মবতার বিভ্রম? জীবনে কি সবসময়ই দুঃস্বপ্নের ভেতর থেকে জেগে ওঠার সম্ভাবনা নেই এই আবিষ্কারে যে দুঃস্বপ্ন কেবল দুঃস্বপ্নই? অথবা মৃত্যুর ভেতর কেবল শোকের প্রসত্মাবনা কেন, বরং মৃত ব্যক্তির জীবনের উদ্যাপনও তো উৎসবই। মিস্টার বদিকেও যেন দেখানো যে, আসলে পর্দার ওপারে জীবনের অন্য এক রূপ আছে; সে খুব জৌলুসে কিছু নয়, কিন্তু কীভাবে যেন সপ্রাণ, সদানন্দ। মিস্টার বদিও যেন এই বিকল্পে প্রাণিত, যুক্তিতে নয়, এক অতিক্রামত্মাবস্থার ভেতর দিয়ে।

সেই যে কিয়ারোসত্মামি চলচ্চিত্রের শতবর্ষে বলেছিলেন, ‘In the darkened theater, we give everyone the chance to dream and to express his [sic] dream freely. If art succeeds in changing things and proposing new ideas, it can only do so via the free creativity of the people we are addressing, each individual member of the audience.’ আ টেস্ট অব চেরির চলচ্চিত্রিক যাত্রায় জীবনের অর্থ বিষয়ে যে সংলাপ চলতে থাকে তা দর্শককে ক্রমাগত তার নিজস্ব সংবেদের সঙ্গে বোঝাপড়ায় নিয়োজিত করে। মৃত্যু বা জীবন আমাদের কনভিন্স করে না, আলো এবং অন্ধকার অথবা জীবনের এপার বা ওপার আমাদের পক্ষ পায় না; কিন্তু একটি সংবেদী ও সেরিব্রাল প্রক্রিয়া জারি থাকে। আমরা মানি যে, এ বিষয়ে সংলাপ প্রাসঙ্গিক।

 

শিরিন

 

শিরিন ছবিটি কিয়ারোসত্মামি নির্মাণ করেছিলেন ২০০৮ সালে। ওপরের উদ্ধৃতিটি যে সাক্ষাৎকার থেকে নেওয়া সেটি প্রচারিত হওয়ার অমত্মত বারো বছর পর। প্রেক্ষাগৃহে সক্রিয় দর্শক কিন্তু কিয়ারোসত্মামির এক প্রধান প্রজেক্ট, তখনো। প্রতিক্রিয়ায়, স্বপ্ন নির্মাণে, এমনকি চলচ্চিত্রটির পূর্ণতা অর্জনে ক্রমশ তিনি দর্শককে আরো প্রধান করে পেতে আগ্রহী। বলছেন তিনি শিরিন প্রসঙ্গে, ‘A filmmaker has to be conscious about his responsibility. I always wish to remind the audience that they are watching a film. You see, it is very dangerous to make the audience more emotionally engaged than they need to be. In the darkness of the cinema, people are so innocent. It makes them feel that everything is closer and stronger. That is why we should not make them even more emotional : People need to think when they watch films, not to be robbed of their reason…. I make half movies. The rest is up to the audience to create for themselves.’

শিরিন পটভূমি নির্মাণ করেছে খসরম্ন, শিরিন ও ফরহাদের ত্রিভুজ প্রেমের প্রাচীন লৌকিক গল্প। দ্বাদশ শতকের ইরানি কবি নেজামি গনজাভি খসরম্ন ও শিরিন নামে এই কাহিনি নিয়ে একটি কাব্য রচনা করেছিলেন। সেই কাব্যকে মোটামুটি অনুসরণ করেছেন কিয়ারোসত্মামি। কিন্তু প্রচলিত চলচ্চিত্রের আঙ্গিকে নয়। আসলে এমন কোনো ইমেজই তিনি নির্মাণ করেননি যা ওই কাব্য বা খসরম্ন, ফরহাদ আর শিরিনের গল্পটিকে সিনেমা হিসেবে উপস্থাপন করবে। ইমেজ হিসেবে আমরা কেবল পাই অনেক কয়জন দর্শকের ক্লোজ-আপ শট। তাদের বেশির ভাগই নারী। যেন তারা একটি প্রেক্ষাগৃহে বসে একটি চলচ্চিত্র দেখছে। ধরে নিতে হবে যে ছবিটি দেখছে তারা সেটিই হচ্ছে শিরিন। সাউন্ড ট্র্যাকে সেই চলচ্চিত্রটির সংলাপ এবং তার গল্প-পৃথিবীর সুর, সংগীত তারা যেমন শুনছে তেমনি শুনি আমরাও – যাদের কিয়ারোসত্মামি শিরিন ছবিটি দেখতে ডেকে এনেছেন। আসলে কিয়ারোসত্মামি শিরিন ছবিটি নির্মাণই করেননি – এরকমও বলা যায়! অথবা চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভ নিয়ে এ এক নতুন খেলা বা নিরীক্ষা তাঁর। আমরা দেখি একশ চোদ্দজন ইরানি অভিনেত্রী এবং তাঁদের সঙ্গে ফরাসি অভিনেত্রী জুলিয়েত বিনোশেকে। আরো দেখা যায় কয়েকজন পুরম্নষকে। তাদের ভেতর আমরা কেবল টেস্ট অব চেরির মূল চরিত্রের অভিনেতাকে চিনতে পারি। এঁরা সকলে দেখছেন না-হওয়া ছবি শিরিন, একটি প্রেক্ষাগৃহে। জানা যায়, আসলে প্রেক্ষাগৃহে নয়, কিয়ারোসত্মামির বাড়ির বসার ঘরে এই শটগুলো নেওয়া হয়েছিল। দর্শকরা, আসলে মূলত মহিলা দর্শকরাই, ছবির সাউন্ড ট্র্যাকের সঙ্গে সঙ্গে নানা প্রতিক্রিয়া করেন; তাঁরা মৃদু হাসেন, বিচলিত বোধ করেন, আতঙ্কিত হন, আবেগে কেঁপে ওঠেন এবং কাঁদেন। তাঁরা কথা বলেন না বা কোনো অভিব্যক্তি বিনিময় করেন না। যেন প্রেক্ষাগৃহ ভরা মানুষের মধ্যে তাঁরা প্রত্যেকে একা এবং বিচ্ছিন্ন। আর আমরা আরেক সত্মরের দর্শক হিসেবে কখনো তাঁদের অভিব্যক্তিতে মনোযোগী হই, কখনো সাউন্ড ট্র্যাকে। এভাবে আমাদের মধ্যে শিরিন ছবিটি জন্ম নিতে থাকে। সেখানে শিরিন এবং তার প্রেমিক পুরম্নষেরা যেমন থাকে তেমনি চরিত্র হয়ে ওঠে এইসব দর্শকরাও তাদের অভিব্যক্তিগুলো নিয়ে। আমরা মধ্যযুগের মধ্য-এশিয়ার ল্যান্ডস্কেপ নির্মাণ করি আজকের ইরানি নারীদের আবেগঘন অভিব্যক্তিতে চোখ রেখে। চলচ্চিত্র-আলোচক মেহেরনাজ সাঈদ ভাফা বলছেন, ‘In Five, Kiarostami shoots landscape; here he shoots women’s faces as if they were landscape.’

ন্যারেটিভ চলচ্চিত্রের আঙ্গিক নিয়ে নিরীক্ষার পাশাপাশি শিরিন কাজ করে সমকালীন জীবনচিমত্মা নিয়ে। শিরিনের জীবনের ট্র্যাজেডিকে আজকের নারীজীবনের সমামত্মরালে স্থাপন করার একটি প্রক্রিয়া ক্রমাগতই চলতে থাকে এই ছবিতে। ছবির শেষে, যে ছবিটি দেখছেন আমরা যে ছবিটি দেখি সে ছবির চরিত্ররা, শিরিন প্রশ্ন করে, কেন কাঁদছেন দর্শকরা। সে কি তার জন্য নাকি তাদের নিজেদের জন্যই, তাদের প্রত্যেকের অমত্মর্জাত শিরিনের জন্য। সত্যিকার অর্থে খসরম্ন, শিরিন ও ফরহাদের গল্পটিকে সমকালীন বাসত্মবতায় রাষ্ট্র, নারী ও শিল্পীর সম্পর্ক হিসেবে পাঠ করারও সুযোগ আছে বলে মনে হয়।

কিয়ারোসত্মামি চলচ্চিত্রকে একধরনের প্রতিফলক হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন সবসময়। বলা হয়, তাঁর ছবি বাসত্মবতা ও সিনেমার পর্দায় তার প্রতিফলনের দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হয়। টেন বা হোম ওয়ার্কের মতো ছবিতে তাঁর প্রতিফলক আয়নাটি হয়তো সমাজের দিকে ঘোরানো। আ টেস্ট অব চেরিতে তা জীবনের প্রতিফলন আর ক্লোজ-আপ বা ফাইভ ছবিতে তা চলচ্চিত্র মাধ্যমটিরই প্রতিফলনটি নিয়ে যেন কাজ করে। বলা যায়, দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস বা অ্যান্ড লাইফ গোজ অনে চলচ্চিত্রনির্মাতার চেতনার প্রতিফলন গুরম্নত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আর শিরিনে এসে দর্শকের দিকেই যেন প্রতিফলকের মুখ ঘোরানো। আমরা দর্শক হিসেবে নিজেদের প্রতিক্রিয়াগুলোকেই দেখি এবং চলচ্চিত্রের যে গল্প-পৃথিবী তার অর্ধেকটা এভাবে নির্মিত হয়; দর্শকের প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে।

শিরিন ছবিটি করার চার বছর আগে কিয়ারোসত্মামি লুকিং অ্যাট তাজিয়া নামে একটি ভিডিও ইনস্টলেশন করেছিলেন। এই ইনস্টলেশনটি ইউরোপের কয়েকটি শহরে প্রদর্শিত হয়েছিল। এতে তিনটি ভিডিও স্ক্রিন ছিল। মাঝের স্ক্রিনটিতে ছিল মহররমের তাজিয়া মিছিলের একটি স্টেজ পারফরম্যান্স। দুই পাশের দুটি স্ক্রিনে ছিল দর্শকদের এই পারফরম্যান্সটি দেখার প্রতিক্রিয়ার দৃশ্য। একপাশের স্ক্রিনে নারী এবং অপর পাশের স্ক্রিনে ছিল নারী দর্শকরা। শিরিন ছবিটিকে অনেক আলোচক এই ভিডিও ইনস্টলেশনটির যে আঙ্গিক তারই একধরনের যৌক্তিক বর্ধন বলে মনে করেছেন। হয়তো কিয়ারোসত্মামি চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ একটি ধারা হিসেবে ভিডিও ইনস্টলেশনকে গুরম্নত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে চেয়েছেন। বিশেষ করে ইনস্টলেশন আর্টে দর্শকের সক্রিয়তার যে বিষয়টির ওপর জোর দেওয়া হয়, কিয়ারোসত্মামির কাছে তা সবসময়ই গুরম্নত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। তিনি ক্রমশ এমন এক চলচ্চিত্রে পৌঁছাতে চেয়েছেন যেখানে চলচ্চিত্রনির্মাতা একজন ব্যক্তি শিল্পী, ব্যাপক অর্থে একজন শিল্প-আয়োজক নন। বলা যায়, শিরিন ছবিতে কিয়ারোসত্মামি নিজেকে এরকম একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

আববাস কিয়ারোসত্মামি চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন এক নির্মাতা হিসেবে বেঁচে রইবেন, যিনি ক্রমাগত নতুন সৃজনশীলতায় এই শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন। n

তথ্যসূত্র

  1. http://sensesofcinema.com/2006/book-reviews/cinema_kiarostami/
  2. Richard Brody, Postscript: Abbas Kiarostami, 1940-2016, http://www.newyorker.com/culture/richard-brody/
  3. http://movieretrospect.blogspot.com/2013/04/ abbas-kiarostamis-close-up-analysis.html
  4. http://movieretrospect.blogspot.com/2013/04/ abbas-kiarostamis-close-up-analysis.html
  5. Abbas Kiarostami, “An Unfinished Cinema,” pamphlet written for the Centenary of Cinema, December 1995, and distributed in Odeon Theater, Paris.
  6. https://subtitlestocinema.wordpress.com/2007/ 08/30/the-soloist-interview-with-abbas-kiarostami/
  7. http://www.jonathanrosenbaum.net/2015/12/ 17173

Leave a Reply

*