logo

কামরুল হাসানের চিত্রকলা

সৈ য় দ  ম ন জু রু ল  ই স লা ম

Mother and child 50th

Mother and child 50th

বাংলাদেশের চারুকলার গঠনভূমিতে শুধু যে রয়েছে পুবের একচ্ছত্র আধিপত্য, তা তো নয়, রয়েছে পশ্চিমেরও নানা অবদান। এই ভূমিতে পুবের জীবনের সংগ্রাম, নিত্যদিনের হাসি-কান্না, কষ্ট ও কল্পনা, এর প্রকৃতির রং বৈচিত্র্যের পাশাপাশি তাই দৃশ্যমান পশ্চিমের নগর বাস্তবতার নানা রূপ; এর জীবনের জটিলতার মূর্ত-বিমূর্ত ছাপ, ধূসরতা এবং বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ। ইউরোপে গির্জা-প্রাসাদ-প্রতিষ্ঠানে যখন শিল্পকর্মের প্রচুর সংগ্রহ আর শিল্পীদের স্টুডিওতে তৈরি হওয়া বা হতে থাকা অসংখ্য শিল্পকর্মের সমারোহ – বাংলায় তখন বন্ধ্যা সময়। ধর্মীয় আইকনোগ্রাফি বাদ দিলে ভাস্কর্যের অন্যান্য নির্মাণের ক্ষেত্রে, চিত্রকলার ক্ষেত্রে তো বটেই, সৃষ্টির পরিবেশ ছিল না, পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না; চিত্রকর্মের টিকে থাকার ক্ষেত্রে আবহাওয়াও ছিল প্রতিকূল। ইংরেজ আমলে ইউরোপীয় সাহিত্যের পাশাপাশি ইউরোপের শিল্পকলার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে; তারও আগে-পিছে যেমন ঘটেছে মোগল বা পুবের দু’এক চিত্র-ঐতিহ্যের সঙ্গে। কিন্তু আমাদের দেশে শিল্পকলার যাঁরা চর্চা করতেন, তাঁদের একক বা সংঘবদ্ধ প্রকাশ ছিল অনুল্লে¬খ্য – না ঘটারই মতো। ফলে আঠারো বা উনিশ শতকের শিল্পচর্চার তেমন কোনো উদাহরণ আমাদের হাতে নেই। শিল্পীরা তৈরি থাকলেও প্রতিকূলতার চাপে হয় নিরাসক্ত ছিলেন, নয়তো জীবনসংগ্রামে জড়িয়ে শিল্পচর্চাকে একটা নিজস্ব গণ্ডিতে বেঁধে যেটুকু সান্ত্বনা পেতেন। কিন্তু রাজানুগ্রহ অথবা ধর্মপ্রতিষ্ঠানের আনুকূল্য ছাড়া তৈরি কোনো শিল্পকর্মের (প্রধানত ভাস্কর্য) নিদর্শন না-কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে পাওয়া যায়, না-কোনো জাদুঘরে দেখা যায়। চিত্রকলায় আমাদের যা কিছু হয়েছে, তার আয়ু তো দেড়শো বছরের মতো। পাল যুগের চিত্রকলার কিছু নিদর্শন আমাদের আছে। পাল যুগ থেকে নিয়ে কোম্পানি আমল পর্যন্ত কিছু কিছু ছবির নমুনাও আছে; কিন্তু শিল্পকলায় দেশ ও বিশ্ব দেখার, জীবনের বাস্তবতা ও স্বপ্ন-কল্পনার প্রতিফলন ঘটানোর; ব্যক্তির নানা সংকট ও সম্ভাবনা, তার ভালোমন্দ ভাবনার প্রকাশ তুলে ধরার; ইতিহাস ও সময়ের চিন্তাগুলিকে সাজানোর অভিপ্রায় উনিশ শতকের শেষ দুটি দশকের আগে আমাদের চোখে পড়ে না। এবং এই প্রয়াসে – যার শুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইবি হ্যাভেলের হাত দিয়ে, নব্য বঙ্গীয় চিত্রধারার মধ্য দিয়ে – আরো যুক্ত হয়েছিলেন নন্দলাল বসু, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও যামিনী রায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাই একটি চিত্রধারা সৃষ্টি করেছিলেন, যার তুলনা ভারতের কোথাও ছিল না।
কিন্তু বাংলার এই দেড়শো বছরের শিল্প ইতিহাসের সঙ্গে পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশের সংযুক্তি মাত্র শেষ ষাট-চৌষট্টি বছরের। শুরুতে একটা শূন্যতা ছিল, অভাব ছিল। সমাজ তৈরি ছিল না, কোনো প্রতিষ্ঠানও না; শিল্পীরাও হয়তো না। অথবা, থাকলেও তাঁদের কোনো সুযোগ ছিল না। সেই সুযোগ যখন এলো, জয়নুল আবেদিন ও তাঁর সতীর্থরা দুহাত ভরে তা গ্রহণ করলেন। ফলে, যে ভূমিতে একটা শূন্যতা ছিল, এই ষাট-চৌষট্টি বছরে সেখানে উঠল নজরকাড়া নির্মাণ, যার শুরুর স্থপতি জয়নুল ও তাঁর সতীর্থরা।
কামরুল হাসানের চিত্রকলা নিয়ে আলোচনায় এই দীর্ঘ উপক্রমণিকাটির কী আবশ্যকতা, কোনো পাঠক এরকম প্রশ্ন তুলতেই পারেন। কিন্তু এটি শুধু এ কারণে উপস্থাপন করা হয়নি যে, আমাদের এই ষাট-চৌষট্টি বছরের শিল্প-ঐতিহ্যের তিনি ছিলেন আদি স্থপতিদের একজন – যদিও এই বিষয়টিই উদ্যাপনের একটি বড় কারণ হতে পারে। এই উপক্রমণিকাটি প্রয়োজন অন্য একটি কারণেও – এবং তা হলো, কামরুল হাসানের ছবি যে শুধু পুবের ঐতিহ্যে বেড়ে উঠেছে, এবং লালিত-পালিত হয়েছে, তাতে পশ্চিমা চিন্তার কোনো সমাবেশ ঘটেনি, এরকম একটি সিদ্ধান্ত অপ্রমাণিত করা। তাঁর ছবি নিয়ে কিছু আলোচনা চোখে পড়েছে, যেখানে, তাঁর প্রতি সম্মান রেখেই, তাঁর ‘পটুয়া রীতি পুনঃপ্রবর্তনের’ বিষয়টিকেই প্রধান করা হয়েছে। দু’এক ক্ষেত্রে কামরুলের সঙ্গে যামিনী রায়ের সাযুজ্য রচনার একটি চেষ্টাও হতে দেখেছি। এসব আলোচনায় তাঁর আধুনিকতাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ কামরুল পশ্চিমের গুণগ্রাহী ছিলেন; পশ্চিমের শিল্পধারাগুলি সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং পশ্চিমের কোনো কোনো শিল্পীর কিছু কিছু প্রকাশ, যেমন পিকাসোর রেখার তীব্রতা ও গতিময়তাকে, তিনি প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখেছেন। কামরুলের আধুনিকতাটি প্রকৃত অর্থে ছিল নিজের সংস্কৃতি ও শিল্প-ঐতিহ্যকে শুধু দেশীয় বা স্থানিক নয়, বরং এক বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে স্থাপন করে বিচার করার সংকল্প। ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙ্গালি হ’ – এই মন্ত্রে যিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি প্রাণপণে বাঙালি হওয়ার মধ্যে কেন তাহলে বিশ্বমানব হওয়ার কামনা পোষণ করবেন? কারণ, তিনি আরো বিশ্বাস করতেন, বাঙালিকে শুধু বাঙালির সমান হলে চলবে না, তাকে মাথা ছাড়িয়ে বিশ্বমানবের সমান, বা তাকে ছাড়িয়েও আকাশের সমান হতে হবে। তাঁর ছবি তাই মৌলিকভাবেই দেশীয়, দেশজ; কিন্তু তাঁর চিন্তাজগতে – তাঁর নির্মাণের পেছনের ঐতিহ্য ও জ্ঞানজগতে – পশ্চিমের মানবতাবাদী ভাবনা ও নান্দনিকতার একটি নিকষিত রূপও ধরা পড়ে, যা তাঁর ছবিগুলি খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়।
কামরুল হাসান সহজাত ও সার্থক শিল্পী এবং সহজাত শিল্পের যে প্রধান বৈশিষ্ট্য – প্রথাবহির্ভূত আচার-আচরণ এবং আবিষ্কার-উদ্ভাবনার তাড়না – এ দুটিই পূর্ণমাত্রায় তাঁর শিল্পে বিদ্যমান। রং নিয়ে তিনি ক্রমাগত নিরীক্ষা বা গবেষণা করেননি; গবেষণার জন্য যে জাগ্রত মানস বা অবচেতনের ওপর চেতন মনের প্রাধান্য থাকা দরকার সেটি সহজাত শিল্পীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। কামরুল হাসানের চিত্রকর্ম দেখলে এটি বোঝা যায় যে, তাঁর নির্মাণ কোনো সূক্ষ্ম বুদ্ধি-বিবেচনাপ্রসূত নয়, বিকাশের মুহূর্তে রঙের পিঠে রং লাগিয়ে তিনি সৃষ্টি করেছেন; অনুভূতি সম্পূর্ণ ও সম্পৃক্ত থেকে গেছে, কোথাও কোনো বৈসাদৃশ্য দেখা দেয়নি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে। হলুদ রং দেশি পটুয়ারা বহুদিন ব্যবহার করে এসেছেন – গাঢ় ও উজ্জ্বল হলুদ বস্তুত দুতিনটি প্রধান রঙের একটি। কামরুল হাসানের চিত্রে সেই উজ্জ্বল হলুদের বিকাশ দেখা যায়; কিন্তু তিনি কোনো নিরীক্ষালব্ধ আয়োজনে ওই রংটি হাজির করেননি। হলুদের ভেতর যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস; জীবনের গূঢ় তাগিদ; প্রতিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার প্রগাঢ় প্রকাশ, সেটিকেই সর্বজনীন করেছেন মাত্র। ছবির পর ছবিতে কামরুল হাসান উজ্জ্বল, ঝকঝকে হলুদ বিভিন্ন অর্থে, বিভিন্ন পটভূমিতে, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহার করেছেন। যামিনী রায় অনেক সময় বীরভূম অঞ্চলের লাল মাটি বা সাধারণ এঁটেল মাটির সঙ্গে সিঁদুর বা অন্য কোনো দেশীয় রং মিশিয়ে তাঁর নিজস্ব রং সৃষ্টি করতেন। এ জন্য তাঁর চিত্রের বক্তব্য বিষয় চমৎকার সারল্যে বিধৃত হতো, বিভিন্ন রিলিফে বিভিন্ন অনুষঙ্গে বাক্সময় হতো। কামরুল হাসান সেই অর্থে হলুদ ব্যবহার করেছেন, কারো কাছ থেকে ধার করে নয়, পটুয়াদের মতোই জীবনের বৃহত্তর প্রকাশের তাগিদে; কিন্তু পটুয়া অর্থে নয়। শুধু হলুদ নয় – হলুদের পাশে গাঢ় নীল, গাঢ় লালের পাশে কমলা বা ফিকে সবুজ; ইংরেজিতে যে রীতিকে বলে ‘কনট্রাস্ট প্যাটার্ন’ অনেকটাই তাই তিনি প্রয়োগ করেছেন। প্রায়শ দেখা যায়, যেসব চিত্রে তিনি এই প্রকাশের আয়োজনকে যত বেশি স্বতঃপ্রবৃত্ত রেখেছেন তত বেশি তিনি সার্থক। কামরুলের ক্ষেত্রে এই কথাটি বলা যায়, তিনি এই স্বতঃপ্রবৃত্তিকে আত্মসচেতনতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আত্মসচেতনতা শিল্পেরই একটি প্রাথমিক বিবেচনা। কিন্তু তা যখন শিল্পের স্বতঃপ্রবৃত্ত অনুভূতির সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়, সেখানেই সমস্যা তৈরি হয়। বাংলাদেশে আধুনিক চিত্রশিল্পীদের অনেকের ক্ষেত্রে এই আত্মসচেতনতা ও স্বতঃপ্রবৃত্তি, চেতনা ও অবচেতনের দ্বন্দ্ব লক্ষণীয়। এর সমাধান সহজলভ্য নয়; চেতন মনের কোনো সমাধান অবচেতনের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হওয়া শক্ত। এই সমাধান অবচেতন মনে বিভিন্ন সত্তায় নিয়ত সংঘর্ষের মাধ্যমে, অনেক সময় শিল্পীর অজান্তেই হয়ে যায়। কামরুল হাসানের বৈশিষ্ট্য এই যে, তাঁর মধ্যে আত্মসচেতনতা প্রকাশের জন্য বাধা হয়নি, বরং তাকে পূর্ণতা দিয়েছে।
কামরুল হাসান বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত আরেক জায়গাতেও : মাটির সঙ্গে তাঁর যে নিবিড় সংযোগ তাকে তিনি তাঁর ছবিতে অশেষ দরদ দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। বাংলাদশ ও তার নিসর্গ, জনমানুষ, লোকালয়, লোকাচার, লোকালয়ের জীবন – এক কথায় গণজীবনের বহমানতা, প্রতিবেশের বিচিত্র গতি, এসব অতি সাড়ম্বরে উপস্থিত তাঁর ছবিতে। মাটির অতি নিকটে তাঁর আসন; তাঁকে নির্দ্বিধায় গণশিল্পী আখ্যা দেওয়া যায়। লোকজ মোটিফ, কিংবদন্তি অথবা রূপকথা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে অনেক শিল্প নির্মিত হয়েছে সত্য, কিন্তু গ্রামীণ সরলতা বা সম্পূর্ণতা, জনজীবনের চিরন্তন প্রবাহ ও প্রাত্যহিকতা সবকিছু একই সঙ্গে গ্রথিত করে একই সৃষ্টিভূমিতে সঞ্চালিত করা বোধকরি কামরুল হাসানের মতো নিষ্ঠাবান শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব।
শিল্পী হিসেবে কামরুল হাসানের সার্থকতা কোথায়? তাঁর গণকেন্দ্রিক বিষয় নির্বাচনে? তাঁর প্রকাশভঙ্গির বলিষ্ঠতায়? রঙের পরিপূর্ণ ব্যবহারে? অথবা তাঁর সঞ্চরণশীল মননশীলতায়? এক কথায় বলা যায়, এর প্রতিটিতে অথবা এদের সম্মিলিত প্রকাশে। কামরুল হাসানের শিল্পীসত্তা গড়ে উঠেছে বিভিন্ন চেতনার সমন্বয়ে, বিভিন্ন মেজাজের একসূত্রতায়; তিনি বেড়ে উঠেছেন বিভিন্ন প্রতিবেশে, তাঁর প্রকাশ বিভিন্ন মেরুতে। এর সব কটি নিয়েই তিনি। এর কোনো একটির চমৎকারিত্ব অবশ্যই সম্পূর্ণের চমৎকারিত্ব। কিন্তু কামরুল ছড়িয়ে থাকেন বিভিন্ন ডাইমেনশনে অথবা মাত্রায়। তাঁকে আলাদা করে বিচার করে, বিভিন্ন শিল্প উপাদান আলাদা আলাদা পরীক্ষা করে তাঁর সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁকে জানতে হলে তাঁর সকল প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। যে নারীদেহ তাঁর চিত্রে দিয়েছে একই সঙ্গে গতি এবং স্থিতিশীলতা, সেই নারীদেহ সম্পর্কেই বলা যাক। কামরুল হাসান, সহজ অর্থে, নারীর নগ্নতাকে এক নান্দনিক মাত্রায় উপস্থাপিত করেছেন। অবগাহন, চিঠি অথবা প্রসাধন যেদিকে চোখ ফেরানো যায়, নারী তাঁর সব কর্মকাণ্ডে একটা বড় আসন নিয়ে উপস্থিত। নারীদেহের সহজ আকর্ষণ, ভারী স্তন ও নিতম্ব কামরুল হাসানের ছবিতে যেন আরো ব্যাপ্তি পেয়েছে। শিল্পীর প্রথম দিককার ছবিগুলোতে নারীদেহ অতি নিখুঁত ও নিয়মনিষ্ঠভাবে আঁকা হয়েছে। এসব ছবিতে ক্যানভাসজুড়ে নারী প্রতিকৃতি রং ও রেখার সহযোগিতায় উদ্ভাসিত। পঞ্চাশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে (ও ষাটের দশকে) আঁকা নারী প্রতিকৃতিগুলি আধা-জ্যামিতিক পদ্ধতিতে ও রেখার ভাংচুরের মাধ্যমে উপস্থাপিত। এসব ছবিতে প্রথমেই যে-বিষয়টি দর্শককে আকৃষ্ট করে সেটি হলো রং ও রেখার একাগ্রতা। বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আনুপাতিক যোগাযোগ ক্ষুণœ করে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ইচ্ছামতো উপস্থাপনায় তিনি নারীদেহকে স্টাডি করেছেন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। ফিগারগুলো অতঃপর একই সঙ্গে লীলায়িত এবং বিকশিত হয়েছে। নারীদেহের প্রতি কামরুল হাসানের এই পক্ষপাতিত্ব তাঁর শিল্পচেতনার এক উদ্ভাসিত রূপ নির্মাণ করে। একজন রেনোয়াঁ বা একজন ডেগার মধ্যে যে শৈল্পিক সূক্ষ্মানুভূতি এসব নির্মাণকে রসোত্তীর্ণ করে, কামরুল হাসানের বেলাতেও তা ষোলো মাত্রায় প্রযোজ্য। কামরুলের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো একটি জায়গায় : যেখানে তিনি নারীর সামাজিক জীবনের স্থবিরতাকে ফুটিয়ে তুলতে চান (সে রকম ছবির সংখ্যা কম হলেও সেগুলোকে আমাদের বিবেচনায় নিতে হয়)। সেসব ছবিতে নারীদেহ স্থবির ও গতিহীন একটি মাত্রায় তার বিপন্নতাকে জানান দেয়। তার দেহটা থাকে, প্রাণ থাকে না। (যেমন তাঁর মধ্যম ও শেষ পর্যায়ের কয়েক ছবিতে) তখন তিনি – শুধু নারীদেহ সম্বন্ধেই বলি কেন – অন্য ছবিতেও কিছুটা ভাবলেশহীন একটা ভাব ফুটিয়ে তোলেন। নারীর নিম্নবর্গীয়তাকে এভাবে তিনি ব্যাখ্যা করেন।
রঙের ব্যাপারে কামরুল হাসানের সহজ সাবলীল প্রতিক্রিয়া বিশিষ্টার্থক হয়েছে অন্য এক স্থানে। বিভিন্ন সময়ে তিনি কয়েকটি ‘ডেকোরেশন পিস’ এঁকেছেন। রঙের নিপুণ সমাবেশে সূক্ষ্ম সুন্দর প্যাটার্নে আঁকা এসব ছবি এক একটি অনুভূতির প্রতীক। এসব ছবিতে শিল্পী বাংলার আলপনা পদ্ধতিকে আরো ঋদ্ধি দিয়েছেন।
কামরুল হাসানের সার্থকতার একটি বড় ভিত্তিভূমি রচনা করেছে তাঁর রেখাসৌষ্ঠব, এবং এ বিষয়টি একটু বিস্তারিত আলোচনা দাবি করে। গতি ও শক্তির অপূর্ব সমন্বয় তাঁর রেখাছবি বা ড্রইংয়ে। ড্রইংয়ে পূর্ণতা ও প্রচণ্ডতার এমন যোগাযোগ খুব কমই চোখে পড়ে। রেখায় জড়তা থাকলে, ড্রইং দুর্বল হলে কোনো নির্মাণ শিল্পোত্তীর্ণ হতে পারে না, যদিও দু’একটি ব্যতিক্রম বিরল নয়। কিন্তু ড্রইং ও রেখাজ্ঞানে অপটু, অস্থির শিল্পীরা যখন সরাসরি নির্বস্তুক ও বিমূর্তকলায় পৌঁছে যান, তখন বিচলিত হতে হয়, অথচ কী ধৈর্য ও কী আত্মত্যাগের মাধ্যমে একজন সত্যিকার শিল্পী গড়ে ওঠেন, একজন সেজান বা পিকাসো বা কামরুল হাসানের কাজ দেখলে তা বোঝা যায়।
কামরুল হাসানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন যাঁরা, তাঁর বন্ধু-বান্ধব অথবা সতীর্থরা, তাঁরাও জানেন না সারাজীবনে তিনি কত স্কেচ এঁকেছেন। কামরুল হাসানের নিজের কাছেই হয়তো কোনো হিসাব ছিল না। এত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এসব, বহু মানুষের ব্যক্তিগত, অথবা অনেক প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে এবং হয়তো অনেকগুলো হারিয়েও গেছে। এখন হাতের কাছে যা পাওয়া যায় এবং যেগুলোর প্রতিলিপি সংগ্রহ করা সম্ভব, সেগুলোই আমাদের বিবেচনায় রাখতে হয় তাঁর স্কেচ সম্পর্কে নতুন একটি মূল্যায়নের সময়। খেরো খাতায়, টুকরো কাগজে, সিগারেটের প্যাকেটের ভেতরে, দেশলাইয়ের বাক্সে – কত বিচিত্র জায়গাতে তিনি এঁকেছেন তাঁর স্কেচগুলো। কিন্তু কিসের ওপর আঁকছেন থেকে কী আঁকছেন, সেটিই বড় বিবেচনা হয়ে দাঁড়ায় তাঁর ক্ষেত্রে। আমার ভাবতে কষ্ট হয়, কামরুলের কত চমৎকার স্কেচ না জানি নষ্ট হয়ে গেছে, খেয়াল না করে কেউ ফেলে দিতেও পারে, যেমন মানুষ খালি সিগারেটের বা ম্যাচের বাক্স ফেলে দেয়।
কামরুল হাসানের স্কেচগুলোর বেশিরভাগই স্বয়ংসম্পূর্ণ, অর্থাৎ তারা নিজেরা এক একটি স্বয়ম্ভূ শিল্পকর্ম। তাদের বিষয় আছে, তাদের প্রকাশে শিল্পীর পরিপূর্ণ আন্তরিকতা আছে। কিন্তু কোনো কোনো স্কেচ বৃহৎ কোনো কাজের ইঙ্গিতবহ, বড় কাজের ছোট একটি মডেলও বলা যায় তাদের। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, এই শেষোক্ত উপায়ে যখন একটি স্কেচ তিনি আঁকতেন, তার একটি আন্তরিক রূপও সেই সঙ্গে তিনি কল্পনা করে নিতেন। এ জন্য ছোট থেকে বড়তে পৌঁছাতে কোনো যান্ত্রিকতার বাধা থাকত না। তাছাড়া, তাঁর জলরঙে করা বড় অনেক ছবি দেখে আমার মনে হয়েছে, তাদের ভেতর কোথায় যেন একটি স্কেচ লুকিয়ে আছে, ওই স্কেচটা শুধু ছবির কাঠামো বা কঙ্কালের পেছনে যে উঁকি দেয় তা নয়, পল ক্লের ছবির মতো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটি প্রকাশপ্রক্রিয়াকে তা মূর্তও করে। সাদামাটা একজন শিল্পীর কাছে স্কেচ জিনিসটি সীমাবদ্ধতার সূত্রপাত করে, স্কেচ জিনিসটি খুব যান্ত্রিক হতে পারে যদি তাতে ারংরড়হ না থাকে, গতিশীলতা না থাকে, গভীরতা না থাকে। কামরুলের স্কেচে এসব ছিল, এবং যেসব বড় ছবিতে, যেখানে ফর্ম ও স্পেস সাজানোর স্বাধীনতা প্রচুর, এই vision-এর ব্যাপ্তি বা গভীরতা ছিল।
কামরুল হাসানের স্কেচের অন্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের অনুবৈশ্বিক ঘনবদ্ধতা। স্কেচ বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি – ড্রইং, লাইনের আঁকিবুকি, সংক্ষিপ্ত ফিগার, মিতব্যয়ী স্পেস, কালি, কাঠ কয়লা অথবা পেনসিলের তাৎপর্যময় আচরণ, নির্মাণের, বিশেষ করে প্রতিস্থাপনার তারল্য – তার সঙ্গে একটি বিষয় আছে, যা গুরুত্বপূর্ণ হয় স্কেচের ক্ষেত্রে, তা হলো স্পেসের ঘনবদ্ধতা। কিন্তু এই ঘনবদ্ধতাকে অনেকে শুধুই ক্ষুদ্রায়ন বলে ধরে নেন, অর্থাৎ বৃহতের একটি সীমিত প্রতিরূপ। কিন্তু কামরুল হাসানের স্কেচ তার পরিসরগত ক্ষুদ্রতাকে সহজেই অতিক্রম করে যায়। আমরা যে বিষয় দেখি, চিন্তা দেখি, প্রতীক বা উৎপ্রেক্ষা দেখি অথবা দর্শন দেখি একটি স্কেচে তার প্রবল উপস্থাপনা পরিসরকে অপ্রধান করে দেয়। এটি সম্ভব হয় কামরুলের অনুবৈশ্বিক vision- এর জন্য। তিনি সম্পূর্ণ বিশ্বকে একটি ক্ষুদ্র গণ্ডিতে স্থাপন করেন, বিশ্বটি তাতে আঁটাসাঁট হয় না, বরং ক্ষুদ্র পরিমণ্ডলে অনেক বেশি তীক্ষè এবং তীব্রভাবে তা আমাদের সামনে ধরা দেয়। সত্য যে, কামরুলের এমন অনেক স্কেচ আছে, যাদের পেছনে কোনো বিশাল অনুপ্রেরণা নেই, যারা নিতান্ত আঁকিবুকি, যারা কোনো অলস মুহূর্তে আপনা থেকে আঙুলের ডগায় এসে গেছে। এদের মূল্য আছে আমাদের কাছে, কামরুলের অনুপ্রেরণাহীন ছবিগুলো তার বৈচিত্র্যের পূর্বাপর একটি পরিচয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যেসব স্কেচ কামরুল এঁকেছেন ভেতরের তাগিদ থেকে সেগুলোর ভেতর অনুবৈশ্বিক একটি সামূহিকতা রয়ে গেছে।
একটি স্কেচের খসড়া যখন তৈরি হতো কাঠ কয়লা অথবা কলমের ডগায়, তখন কামরুল হাসান কি তাকে বাড়তে দিতেন যতখানি তা বাড়তে পারত জলরং অথবা তেলরঙের একটা ছবিতে, বড় কাগজে অথবা ক্যানভাসে? তাঁর স্কেচগুলো দেখে মনে হয়, তাদের স্বতঃস্ফূর্ততাকে কোনোভাবে বিপন্ন না করেও এক ধরনের শৈল্পিক শাসন তিনি চালিয়েছেন তাদের রেখা অথবা ফর্মগত প্রকাশের ক্ষেত্রে। রেখা যত বলিষ্ঠ হয়, স্কেচে তত গতিশীলতা আসে, এজন্য রেখাকে তিনি পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখেন; কিন্তু মাঝে মাঝে রেখাগুলো পরস্পরসংলগ্ন হয়ে বিছিয়ে থাকে, তাদের আলাদা করা যায় না, মাঝে মাঝে তারা বহির্গামী হয়, অথবা ভেঙে যায় মাঝপথে। এই নিয়ন্ত্রণ ও রেখার স্বাধীন বিচরণ আসলে স্কেচচিত্রের একটি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরে, এবং তা হলো বৈপরীত্য অথবা কনট্রাস্ট। প্রথমে পরিসরের ক্ষুদ্রতা ও চিন্তার বিশালতা একটি কনট্রাস্ট তৈরি করে, তারপরও আছে সাদা-কালোর দ্বন্দ্ব, আয়োজনের সামান্যতা এবং অনুরণনের প্রকাণ্ডতার মধ্যবর্তী বিবাদ। স্কেচ যে একটি শৃঙ্খলা দাবি করে, তা হলো আয়োজনের। কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি নয়, এ ব্যাপারে ধারণাটি সম্যক না হলে বিপদ, কারণ স্কেচ (ও দর্শকের চোখ) রেখার সঞ্চালনেই প্রধানত আটকে থাকে। পিকাসোর এরকম একটি   চিন্তা ছিল যে, স্কেচে fluidity বা তারল্য না আনতে পারলে তা চিন্তার শুধু একটি ঘের বা ঘেরাটোপই টানবে, তার ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হবে না। পিকাসোর অনেক স্কেচে রেখাটি এতই সূক্ষ্ম ও ক্রমাগত এবং অভঙ্গুর যে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে রেখাগুলো একটি সাংগীতিক চরিত্র অর্জন করে। নান্দনিক একটি তৃপ্তি আমরা ওই খুব চিকন টান ও তরল রেখাপাত থেকে পাই। স্কেচকে ততটাই বাড়তে দেওয়া যায়, যতটা এর দ্বিমাত্রিক সার্ফেস একটি ত্রিমাত্রিকতার আভাস দেবে। তারপর যদি তাতে আরও মাত্রা চড়ানো হয়, স্কেচটি তার চরিত্র হারিয়ে ফেলে। কামরুলের স্কেচে দ্বিমাত্রিকতারই একটি বর্ধমান রূপ আছে। যে মুহূর্তে তিনি খুব হালকা রেখার একটি নারী মূর্তি আঁকেন এবং তাকে ওইখানে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়াস পান, দেখা যায় তাঁর নারী মূর্তিটি একটি পরিবেশ তৈরি করে ফেলে। তার একটি প্রেক্ষাপট, একটি ইতিহাস যেন আপনা থেকে দাঁড়িয়ে যেতে থাকে। ছোট্ট স্কেচেও কামরুল তাঁর অঙ্কনবিশিষ্টতা, তাঁর অবলোকনের গভীরতা, অথবা তাঁর লোকজ চিন্তার প্রতিফলন ঘটান। এটি তাঁর অনুবৈশ্বিক দর্শনের জন্য যে হয়, সেটি আমরা আগে বলেছি। কিন্তু এইভাবে যখন কামরুল একটি ফিগারে বা দৃশ্যে গভীরতা অর্পণ করেন Ñ বলা যায় নিজ থেকেই তা যেন অর্জিত হয়ে যায় – তখন ত্রিমাত্রিকতার পূর্ণাঙ্গতার দিকে আমরা পৌঁছতে থাকি।
অর্থাৎ বাড়তে না দিলেও স্কেচের ভেতরের জীবন থেমে থাকে না, হয়তো এ কারণেই তাতে ত্রিমাত্রিক একটি বাস্তবতা, একটি তারল্য প্রধান হতে থাকে। একসময় স্কেচগুলোতে যে অনুজীবন মূর্ত হয়, তার চরিত্র, তার অপরাপর সব বৈশিষ্ট্য, একটি বোধকেই সক্রিয় করে তোলে তাদের অনিবার্যতায়। এই ‘অনিবার্যতা’র প্রসঙ্গটি কামরুলের শিল্পকর্ম সম্পর্কে সাধারণ একটি বিচার বলেও উল্লেখ করা যায়। কিন্তু আমরা যখন এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই, ‘কেন কামরুল এতসংখ্যক স্কেচ এঁকেছিলেন’, তখন উত্তরটি হয় এরকম যে, এদের প্রায় সকলেই অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। বৃহতে যে জীবনবোধ, যে অন্বেষণ, সে সমাধান দেওয়া সম্ভব, ক্ষুদ্রতেও তা সম্ভব; বৃহৎ আয়োজনে যে অনুধাবনটি বাক্সময় হয়, হয়তো গভীরভাবে, সেটি ক্ষুদ্র পরিসরেও সম্ভব। স্কেচগুলো কামরুলের এক বিশেষ শিল্পপ্রয়াস, এক বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তারা উদ্ভূত। এজন্য তাদের আবির্ভাব ও তাদের নিজস্ব জীবন অনেকটা যেন স্বতঃসিদ্ধ ছিল কামরুল হাসানে সৃষ্টিশীলতার বিবর্তনে।
বাংলার পটুয়া এতিহ্য এবং লোকজ ফর্ম নিয়ে অনেক শিল্পীই কাজ করেছেন। বস্তুত কুড়ির দশকের শুরু থেকে বেঙ্গল স্কুলের প্রাচ্যবাদী চর্চা থেকে যাঁরা বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন, তাঁদের কাছে লোকজ ফর্ম কখনো সীমাবদ্ধ এবং পৌনঃপুনিক ছিল না। এঁদের মধ্যে যাঁরা অগ্রবর্তী ছিলেন তাঁদের কাজ বিশিষ্ট ছিল, স্বতঃস্ফূর্ততা, সামগ্রিকতা এবং কুশলতার গুণে এবং তাঁদের নন্দনচিন্তা ও মৃত্তিকাসংলগ্নতার শক্তির জন্য। প্রাচ্যবাদী চর্চা শুরু হয়েছিল একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি অর্জনের জন্য – অস্তিত্বের সংকটে একটি নিশ্চিতি খোঁজার জন্য। কিন্তু একসময় দেখা গেল ওই চর্চা  পশ্চিম-কাক্সিক্ষত (নির্দেশিত না হলেও) পথে যাচ্ছে। কিন্তু যামিনী রায়-নন্দলাল বসু প্রাচ্যবাদের পৌনঃপুনিকতা এবং সীমাবদ্ধতা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁদের কাজে বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য, নিসর্গ এবং কল্পনার জীবন প্রধান বিবেচনা হিসেবে দেখা দেয়।
কিন্তু সমকাল চিন্তা, অর্থাৎ ইতিহাসের সংকটকালে গণমানুষের যেসব প্রত্যাশা ও প্রত্যয় জন্মায়, যা উপনিবেশী সময়ে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে রূপ নেয়, যামিনী রায়ের মতো লোকজ রীতির চর্চাকারীদের মধ্যে তা ছিল না। বেঙ্গল স্কুলের রাজনীতি-নিরপেক্ষতা থেকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও একসময় পরিত্রাণ চেয়েছেন – তাঁর ভারতমাতার মতো ছবিতে মানুষের বৃহত্তর দেশচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু ভারতমাতা এক প্রতীকী ও দূরবর্তী অর্থে, রাজনৈতিক। এই রাজনীতির পরিমণ্ডলে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা এবং প্রত্যাশার একটা সার্বিক প্রতিফলন ঘটে। বেঙ্গল স্কুল ব্রিটিশদের কাছে প্রিয় হওয়ার একটি কারণ ছিল এর আপাত রাজনীতি-নিরপেক্ষতা। কিন্তু বাংলাদেশে, ত্রিশ-চল্লিশের দশক থেকে যাঁরা লোকজ ফর্ম ও ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁদের মধ্যে জয়নুল এবং তাঁর পরপরই কামরুল ও এস এম সুলতানের কাজে প্রতিরোধ-প্রতিবাদের বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এঁদের কাজ সমকালীন দেশীয় বা দলীয় রাজনীতি-সম্পর্কিত না হলেও রাজনীতির একটি প্রভাব এসব কাজের ওপর পড়েছে। ওই রাজনীতি সমাজ ও মানুষের প্রত্যাশা ও সংকল্প, কাল ও দেশচিন্তা এবং ক্ষমতার সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্বের বিভিন্ন প্রকাশকে ধারণ করে।
কামরুল হাসান যে জনজীবনের ছবি আঁকেন, তা সমাজের প্রান্তিক ও নিুবর্গীয় মানুষজনের, ব্রাত্যজনের। এদের জীবনে দ্বন্দ্ব এবং সংঘাত  নানাভাবে উৎপাদিত হয়। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে অধস্তন হওয়ার জন্য এসব মানুষের নিজস্ব স্পেস খুবই সংকুচিত। ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো এদেও নানাভাবে অধস্তন করে রাখে এবং শোষণ করে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রম দিলেও উৎপাদিত পণ্যের ওপর তাদের কোনো অধিকার থাকে না। এ সমাজের নিুবর্গীয়তার মাঝে নারীরা আরো এক ধাপ নিুবর্গীয়, অথবা, অন্যভাবে বললে, উপনিবেশী অথবা নব্য উপনিবেশী সমাজ যতটা শোষিত, নারীরা তার দ্বিগুণ। কামরুল হাসানের ক্যানভাসে এ অধস্তন এবং উপনিবেশপীড়িত মানুষজনের একটা মিছিল চলে। বস্তুত উচ্চবর্গীয়দের নিয়ে তাঁর ছবি প্রায় নেই বললেই চলে। আর্ট কলেজে পড়ার সময় অ্যাকাডেমিক চর্চার সূত্রে এবং পাস করে বেরোবার পর কিছুদিন পর্যন্ত কামরুল প্রাচ্যবাদী কিছু কাজ করেছেন। তাতে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার প্রতিকৃতি ইত্যাদিও ছিল। কিন্তু সেগুলোর সংখ্যা হাতে গোনার মতো। প্রধানত যা আমাদের চোখে পড়ে – না পড়ে উপায় নেই – তা হচ্ছে নিুবর্গীয়দের প্রতি কামরুল হাসানের অকৃত্রিম পক্ষপাতিত্ব।
কিন্তু নিুবর্গীয়দের কখনো নিষ্ক্রিয় অথবা মাত্রাবিযুক্ত মনে হবে না কামরুলের ছবিতে, যেমনটি কোনো কোনো শিল্পীর কাজে আমরা দেখতে পাই, বিশেষ করে যাঁরা গ্রামের মানুষজন ও অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষকে নিয়ে কাজ করেছেন। অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ প্রায়শ প্রতীকের অবস্থানে চলে যায় – হয় তারা প্যাস্টোরাল জীবনের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ায়, অথবা দ্বন্দ্বসংকুল সমাজের; যেখানে তাদের শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে তারা হয় বিপদগ্রস্ত, আক্রান্ত। কামরুলের ব্রাত্যজনেরা কোনো কৃপা অথবা নিস্পৃহতার পাত্র নয়, কারণ তারা active agent – তারা সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। এলিট সমাজ তাদের গ্রহণ করে কী করে না – এই বিবেচনায় না গিয়ে তারা তাদের ভূমিকা পালন করে যায়। কাজেই সক্রিয় পক্ষ হিসেবে তাদের জীবনে গতিশীলতা রয়েছে এবং কামরুল এ গতিশীলতাকে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন। ব্রাত্যজনের জীবনের দ্বান্দ্বিকতা চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে কামরুলের ছবিতে এবং এটি প্রধানত ঘটে তাঁর বিষয় সাজানোতে অথবা বিষয়ের অন্তর্গত কোনো চিন্তাকে একটি দ্বান্দ্বিক মাত্রায় সাজানোতে। জয়নুলের ছবিতে সমাজবাস্তবতা যেভাবে সরাসরি উপস্থাপিত হয়, কামরুলের ছবিতে ততটা নয়। কামরুলের মানস অনেকটাই রোমান্টিকতা আচ্ছন্ন ছিল, তাই বাস্তবের বাহ্যিক রূঢ়তা অথবা এর মুহ্যমান করার ক্ষমতাকে তিনি এড়িয়ে গেছেন। তাই বলে কামরুলের ছবিতে ফ্যান্টাসির আগমন ঘটেনি অথবা আবেগকে তিনি এক রোমান্টিক শুদ্ধতায় বাষ্পায়িত হতে দেননি। কামরুলের রোমান্টিকতা একটা আদর্শিক ভিত্তি থেকে উৎসারিত, যেখানে মানুষের নির্জন ও সৃষ্টিশীল মুহূর্তগুলো খুব মূল্যবান। এসব মুহূর্তে মানুষ তার নিজের কাছে, নিজের পরিপার্শ্বের কাছে স্থিত হয়। যদি নিজের ভেতরে ক্রোধ থাকে; যদি পরিপার্শ্বে প্রতিবাদ থাকে, তাহলে সেগুলো মানুষের চিন্তায় সঞ্চারিত হয়। কাজেই একটি রোমান্টিক মুহূর্ত অথবা দৃশ্যপটে স্থাপিত মানুষ কোনো অধিমাত্রিক রোমান্টিক ভাবনায় জাল বিস্তার করে ঘোর বা আচ্ছন্নতার আভাস তৈরি করে না, বরং ওই মুহূর্ত বা দৃশ্যপট মানুষকে সময় ও পরিবেশের সঙ্গে সংহত করে বাস্তবের সঙ্গে একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক তৈরি করে। কামরুলের ছবিতে আখ্যান আছে, ঘটনা আছে, ইতিহাস আছে এবং সেগুলো ব্রাত্যজনের। সেই জীবনের বাস্তব প্রকাশগুলোকে তিনি কখনো অবহেলা করেন না, বরং প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্নিহিত রোমান্টিকতার সঙ্গে তাদের একটা দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেন, যাতে বাস্তববাদী না হয়েও তাঁর ছবি বাস্তবের বোধকে এড়িয়ে যায় না।
যেহেতু কামরুলের চিন্তা ও কাজের একটি বড় অংশ আবর্তিত এই দ্বান্দ্বিক জীবনকে ঘিরে Ñ এর একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। দু-তিনটি আপাত নিরীহ ছবির কথাই ধরা যাক, যেগুলোকে গ্রামবাংলার চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন ক্যালেন্ডারে ব্যবহৃত হতে দেখেছি (চিরায়ত অর্থাৎ আদর্শিক, নির্বিরোধ এবং রোমান্টিক); মা ও শিশু (পঞ্চাশের দশক), উঁকি (১৯৬৭) ও কলসি কাঁখে নারী (১৯৮৭)। এ তিনটি ছবির দৃশ্যপট গ্রাম। প্রথমটি ইতালির পিয়েতা ছবির মতো নিষ্পাপতা এবং অমলিন মাতৃত্বকে উপজীব্য করেছে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলে মায়ের চোখের ভাষায় ভিন্ন একটি চিন্তাকেও শনাক্ত করা যাবে – যে চিন্তাটি তৃপ্তির, আনন্দের এবং পাশাপাশি উদ্বেগেরও। কামরুল হাসান সম্পর্কে বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের একটি মন্তব্য হচ্ছে এই যে, তিনি তাঁর নারীদের চোখ খুব বাক্সময় করে আঁকতেন। এরকম প্রকাশবহুল চোখ অন্য কোনো শিল্পীতে তেমন একটা দেখা যায় না। আমার নিজেরও মনে হয়েছে, প্রাচ্যবাদী ছবির অর্ধনিমীলিত অথবা ভঙ্গি-নির্ধারিত চোখ ও দৃষ্টির সীমাবদ্ধতার পর যামিনী রায়ের মানুষজনের চোখ দেখলে যেমন মাটির পুতুল ও পটুয়া ঐতিহ্যের এবং লোককল্পনার পটলচেরা চোখের কথা মনে পড়ে সেরকম কামরুল হাসানের নারীদের চোখ দেখলেও প্রসন্নতা ও বিশালতার পাশাপাশি তাদের আবেগ, অনুভূতি, উৎকণ্ঠার ছাপও অনিবার্যভাবে মনে পড়বে। মা ও শিশুর একটি বিশাল চোখ জগৎকে দেখছে – নিরাপদ মাতৃকোল থেকে যে জগৎ শুধুই প্যাস্টোরাল। অথবা মায়ের দৃষ্টি ওই প্যাস্টোরালের বাইরেও বিস্তৃত, যেখান থেকে বিপদ উঠে আসতে পারে, দ্বন্দ্ব যেখান থেকে বিস্তৃত হয়ে জীবনকে অধিকার করে নিতে পারে। ঘরের সামান্য জিনিস – একটি কলস এবং পেছনের গাছের কয়েকটি পাতা একটি সুরক্ষিত স্পেসে তৈরি করে বটে (মা নিজেও এক পবিত্র স্পেস), কিন্তু ওই স্পেসে অনুপ্রবেশকারী শক্তির কথা ভেবেও মায়ের মতো দর্শকরা উদ্বিগ্ন হন।
উঁকি বা উঁকি দেওয়া ছবিটিতে বর্ণলেপনের দক্ষতায় শুরুতেই উঁকি দেওয়া মেয়েটিকে একদম আলাদা করে ফেলে তার কৌতূহলী চোখ। তার শাড়ির আনুভূমিক ডোরাকাটা নকশা আঁচলে উল্লম্ব হয় এবং এ উল্লম্ব রেখার পরেই ছোট একটি জানালা, যা পৃথিবীর দিকে খোলা। জানালা দিয়ে মেয়েটি বাইরে উঁকি দেয়। এমন নয় যে, মেয়েটি অন্দরমহলে বন্দি, সূর্যের আলো লাগে না তার গায়ে। ঘরের ভেতরের কলসি-মটকা সাক্ষ্য দেয় মেয়েটি জল আনতে যায়। বাইরের পৃথিবীতে কিছু একটা ঘটছে এবং মেয়েটি তা দেখতে চাইছে। এই ঘরে-বাইরের সম্পর্কটি আপাত রহস্যময় হলেও এতে একটি গল্প জুড়ে দেন কামরুল হাসান। মেয়েটির বর্ণহীন, ঘরের জীবন একজন নিুবর্গীয়ের – সেখানে কাজটা গুরুত্বপূর্ণ। মাটির কলসি-মটকা একটি প্রাত্যহিক জীবনাচরণের কথা বলে যেখানে অস্তিত্ব নির্ভর করে পরিশ্রমের ওপর। এ কাজের জীবনে অবসর বিরল। এমন একটি অবসরের মুহূর্তেই মেয়েটি বাইরের পৃথিবীকে দেখে – তার কোনো ঘটনা, মানুষ অথবা প্রাণীকে (আমরা জানি না জানালার ওপারে কী)। কামরুল জানালার এপারটাকে বাস্তব করেছেন, ওপারটা শুধুই আন্দাজের। কিন্তু মেয়েটির জীবনের এই একটি অবসরের মুহূর্ত তার নিরলস জীবনের অন্য মুহূর্তগুলোকে বাক্সময় করে।
তৃতীয় ছবিটি কলসি কাঁখে নারী তার বর্ণ প্রয়োগেই বিশিষ্ট। বড় দাগে রং লাগিয়েছেন কামরুল, মেয়েটিকে একটি মোটা দাগের ঘের দিয়ে, যাতে গাঢ় রং (কালো, ঘন নীল) প্রাধান্য বিস্তার করে। লাল রংও আছে, তবে মেয়েটির পাশ দিয়ে আছে সবুজের একটা স্পর্শ, এ সবুজটি প্যাস্টোরালের প্রতিনিধিত্ব করে, যেমন কালো ও গাঢ় নীল করে মেয়েটির জীবন বাস্তবতার। কলসি কাঁখে এ নারীর ছবিতে রোমান্টিকতা শুধু ‘জলকে চলা’ ধরনের আর্কিটাইপে সীমাবদ্ধ নয় : সেই রোমান্টিকতার দ্বন্দ্ব বরং বাস্তবের সঙ্গে। এ ছবিটি একটি সুনির্মিত এবং কাম্য প্যাস্টোরাল চিত্রকল্পের কথা বলে না, বরং ব্রাত্যজনের, বিশেষ করে গ্রামের নারীর মতো উপর্যুপরি ব্রাত্যজনের জীবনের একটা নির্মোহ চিত্রও সেটি। কামরুল বাস্তবের প্রকট মাত্রাগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে মূল দ্বন্দ্বগুলোকে শনাক্ত করেন, যে দ্বন্দ্ব আছে মানুষের সমাজে ও জীবনে।

দুই
কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া কামরুল সমকালীন রাজনীতিকে সরাসরি তাঁর ছবিতে আনেননি Ñ অর্থাৎ রাজনীতির ভাষা ও বিষয় নির্মাণ করে বলে আমরা যেসব উপাদানকে চিহ্নিত করেছি, সেসব তাঁর ছবিতে প্রবলভাবে নেই। যেমন, তাঁর ছবিতে কাস্তে হাতে শ্রমিক, বন্দুকের সামনে দাঁড়ানো ছাত্র, জোতদার ও মহাজনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ কৃষক অথবা আন্দোলন-সংগ্রামের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়ে না। তার কারণ রাজনীতির মূল সূত্রগুলোকে তিনি তাঁর নান্দনিক চিন্তার সঙ্গে সমন্বিত করেছিলেন। সে চিন্তায় নিসর্গ, জনজীবন ও কল্পনার একটা সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সেজন্যে কামরুলের রাজনীতি তাঁর সার্বিক শিল্পদৃষ্টির একটি উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু যখন রাজনীতির ঘটনা সেই নান্দনিকতাকে খণ্ড-বিখণ্ড করার হুমকি দিত, তিনি রাজনীতিকে সোজাসাপ্টাভাবেই নিয়ে আসতেন তাঁর ছবিতে, কারণ তখন মানুষ বড় হয়ে দাঁড়াত তাঁর কাছে, শিল্পের তাৎক্ষণিক দাবি থেকেও। সেরকম একাত্তরে তিনি বিদ্রƒপ ও তীক্ষè আক্রমণে বিধ্বস্ত করেছিলেন পাকিস্তানি শাসক ও সেনাপতিদের। তেমনি আক্রমণে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন বাংলাদেশি স্বৈরশাসকের অহঙ্কার। একইভাবে, যে তিন রমণী অথবা জলকে চলা নারী অথবা অবসরে গল্প করা নারী অথবা নাইওরে যাত্রারত নারী তাঁর ছবিতে একটা আদর্শের চিত্ররূপ তুলে ধরে, সেই নারীই যে প্রয়োজন হলে জীবনযুদ্ধে নেমে পড়তে পারে, তারও একটি সম্ভাবনা তাঁর ছবিতে উঁকি দেয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাদের স্থাপন করলে।
কামরুলের ব্রাত্যজনেরা তাঁর ছবির প্রধান চিন্তাটি রচনা করে, যে    চিন্তা বাঙালির সংস্কৃতির মর্মমূলে প্রোথিত এবং সেটি হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠতা।
জীবনের শেষ ছবিটি তিনি আঁকলেন তাঁর চিরাচরিত শ্লেষ এবং ঘৃণা মিশিয়ে, মানুষের জীবনকে রাহুগ্রস্ত করে যে কুৎসিত এবং অশুভের অন্ধকার, তার প্রতি অনন্ত ধিক্কার ঢেলে দিয়ে, তারপর প্রস্থান করলেন, যেন অদৃশ্য হাতে কেউ তাঁকে আহ্বান জানাল। এই অন্ধকার এবং কুৎসিতের বিরুদ্ধে সারাজীবন তিনি সংগ্রাম করে গেলেন। শুধু ছবি এঁকে নয়, শুধু প্রতীকী অর্থে নয়; কামরুল হাসানের সংগ্রাম ছিল জীবনের মতোই বাস্তব। সম্ভব হলে সশরীরে তিনি অবতীর্ণ হতেন সে যুদ্ধে। তাঁর যৌবনের ব্রতচারী আন্দোলন ছিল সেরকম একটি শরীরী প্রস্তুতি। বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠ যে সময় – একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামের নয় মাস – ওই প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছে প্রতিটি দিন। বাঙালি প্রস্তুত ছিল, যুদ্ধে তাদের বিজয় তাই ছিল শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার। অথচ যুদ্ধের সেই বিশাল অর্জন ধরে রাখা গেল না। অন্ধকার বিবরে লুকিয়ে থাকা শ্বাপদ ও সরীসৃপ একসময় বেরিয়ে এলো এবং বাঙালির অস্তিত্বে কামড় বসাতে লাগল। জীবনের শেষ ছবিতে এই শ্বাপদ ও সরীসৃপ আবার বিষয়বস্তু হয়ে উঠল : কামরুল হাসান তাঁর সংগ্রামের তরবারিটি আমাদের হাতে দিয়ে পরপারে চলে গেলেন।
এতগুলো বছর আমাদের চারদিকে সেসব শ্বাপদ-সরীসৃপের আনাগোনা আমরা দেখেছি। যে স্বৈরাচারী শাসক তার ক্ষমাহীন কালিতে পরিণত হয়েছিল বিশ্ব বেহায়াতে, সে আজ অপসৃত বটে, কিন্তু তার গভীর ছায়াটি এখনো বিছিয়ে আছে সারাদেশে। যে উগ্র, অসহিষ্ণু ধর্মান্ধতাকে তিনি তুলনা করেছেন ধূর্ত শৃগালের সঙ্গে সে ধর্মান্ধতা এখনো সমাজকে ক্রমাগত ঠেলতে চাইছে পেছনের গলিতে। বাঙালির চিরন্তন শ্রেয়চিন্তা ও নান্দনিক বোধের এইসব শত্র“ এখনো সমান সক্রিয় Ñ হয়তো অনেক বেশি। কামরুল হাসানের জীবন এবং কর্ম থেকে প্রেরণা নেওয়ার প্রয়োজনও আমাদের আরো অনেক বেশি, এ মুহূর্তে।
যাঁরা কামরুল হাসানকে জানতেন, তাঁরা বলবেন, তাঁর জীবন ছিল কর্মমুখর, অথচ একটি স্থির কেন্দ্রের দিকে ধাবমান। সে কেন্দ্রটি ছিল এক সুস্থির সৌন্দর্য চিন্তার, যাতে ঐতিহ্য এবং ঘটমান বর্তমান, ইতিহাস এবং প্রাত্যহিকতা এসে মিলবে একটি বিন্দুতে; যেখানে স্বপ্ন ও কল্পনা এবং মানুষের সৃষ্টিশীলতার সচেতন প্রয়াস একটি অভিন্ন জীবন কাঠামো নির্মাণ করবে। কামরুল হাসান এক হাতে ছুঁয়েছেন গ্রামীণ জীবনের শাশ্বত অবয়বটি, অন্য হাতে তুলে নিয়েছেন সংগ্রামী জীবনের পতাকা। কামরুল হাসানের কাছে ঐতিহ্যচিন্তা আধুনিকতার বিপরীতার্থক কিছু ছিল না, ছিল সমার্থক, তাঁর রোমান্টিকবাদও ছিল তাঁর আধুনিকতার একটি আন্তরিক প্রকাশ। পরিষ্কার চিন্তাভাবনা, খোলামেলা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কামরুল হাসানের, জীবনে আর চিন্তাভাবনায় কোনো অসংগতি ছিল না তাঁর।
তাই বলে কামরুল হাসানের ছবিতে শুধু ঐতিহ্যের মিছিল চলেছে এমনটি বলা যাবে না। যেহেতু তিনি লোকজ শিল্পের পৌনঃপুনিক নকশা ও স্টাইলাইজড ফর্ম প্রয়োগ করেছেন তাঁর অসংখ্য ছবিতে এবং তাদের পরিণত করেছেন তাঁর প্রকরণ বৈশিষ্ট্যে, সেহেতু তিনি বাস্তবতার আড়ালে কোনো প্রচ্ছন্ন রোমান্টিকবাদকে বেছে নিয়েছেন, এমনটিও বলা যাবে না। তিনি যে রমণীদের, দেহাতি মানুষজনের, গ্রামীণ পরিবেশের ছবি এঁকেছেন, তার ভেতরের জীবনটি একান্তই বাস্তব। তাদের প্রকাশে ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ উপস্থিত হলেও তাদের জীবন কোনোক্রমেই প্রান্তবাসী নয়। কামরুলের মানুষজন নিরন্তর সংগ্রামমুখর জীবন থেকেই উত্থিত – সে-জীবনকে বা সে-সংগ্রামকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই।
মাঝে মাঝে এ প্রশ্নটি উত্থাপিত হতে দেখেছি : যদি কামরুল হাসান বাঙালির রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে এতটা সম্পৃক্ত থেকে থাকেন এবং প্রবলভাবে অনুভব করেন তার ঘাত-প্রতিঘাত, তাহলে তার ক্যানভাস কেন এতটা নিস্তরঙ্গ? কেন তা নয় মিছিলের মুখে উত্তোলিত হাতে, আকীর্ণ অথবা অসম্ভব গতিশীল রেখা ও রঙের উন্মাতাল নৃত্যে? আপাতদৃষ্টিতে এ বিষয়টি সৃষ্টি করে একটি অসংগতি, অথবা একটি ফাঁক। অথচ এ ফাঁকটি ভরাট হয়ে যায় যদি কামরুলের চিত্রভাবনার গতিশীল একটি রূপের সঙ্গে আমরা পরিচিত হই। যে নিস্তরঙ্গ জীবন তাঁর ছবিতে আমরা দেখি, সেটি যদি মাত্র একটি খণ্ডিত প্রকাশ হয়, হয় একটি মুহূর্তের শুধু উদ্ভাস, যার সঙ্গে অন্যান্য মুহূর্তের সম্পর্ক নেই, তাহলে তার চিত্রভাবনার সঙ্গে জীবনের সম্পৃক্ততা থাকে সামান্যই। কিন্তু আসলে তো সেটি ঘটেনি। কামরুল হাসান যে-দৃশ্যটি আঁকেন – হয়তো কোনো মুহূর্তের কোনো অবসরেরও – তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক দীর্ঘ জীবনপ্রবাহ, এক দীর্ঘ সময়কালের ব্যাপ্তি। দিনের কাজের অবসরে আলাপরত রমণীরা কাজের অনিবার্যতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়, যা মধুর করে তোলে অবসরের ক্ষণিক বিরতিকে। ওই অবসরের উলটো পিঠে সংগ্রামী জীবনের ঢেউ। কামরুল হাসানের সব ছবি যদি পাশাপাশি রাখা যেত, তাহলে তারা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক মহাকাব্য সৃষ্টি করতে পারত, যাতে প্রেম-প্রীতি, ভ্রাতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবনের আরো নানা প্রকাশ। এই বিশাল মোজাইকটি প্রমাণ করতে পারত তার জীবনদৃষ্টির সামূহিকতা।
হয়তো কামরুলের চোখে জীবনের এই বিশাল ব্যাপ্তি যে দৃশ্য তুলে ধরে সেটি অনেক বেশি শক্তিশালী। শাশ্বত কোনো ঘটনাবহুল সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রকাশের চাইতে হয়তো প্রতিবাদের-প্রতিরোধের শক্তিটা যতটা একটি উত্তোলিত হাতে দেখাতে পারে, তার থেকে বেশি পারে এক গাঁয়ের বধূ, তার কলসি কাঁখে দৃপ্ত চলনে, যেহেতু সকল সংগ্রামের মূলে যে জীবনচেতনা তার উৎসমুখটি রয়েছে তার প্রতিদিনের পরিশ্রমের জীবনে। কামরুল হাসান তাঁর মানুষজনের জীবনে দেখেছিলেন এক নিরন্তর অস্তিত্বের সংগ্রাম – এই সংগ্রামটিই মূল সংগ্রাম : একে নানারূপে মূর্ত করেছে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলনগুলো; এ-সংগ্রামকে অর্জনের এক সম্ভাব্য পথে পরিচালিত করতেই তাদের সকল আয়োজন। যদি উৎসমুখে অনুসন্ধান করে থাকেন অন্বেষী শিল্পী, তাহলে নির্যাসটুকুই তিনি নেবেন, মূলটুকুই গ্রহণ করবেন সঠিক গুরুত্ব দিয়ে। সেটিই স্বাভাবিক – উৎস থেকে বহু দূরে প্রবাহের নানা শাখা-প্রশাখাকে তিনি হয়তো উপেক্ষাই করবেন।

তিনি
আমাদের তিন অগ্রজ শিল্পীর Ñ যাঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন নিজেদের সমাজের ও কালের প্রতিভূ : জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতান এবং কামরুল হাসান – তাঁদের দায়বদ্ধতা প্রকাশ ছিল তিন রকমের। ‘সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ’ কথাটি বহু ব্যবহারে কিছুটা জীর্ণ হয়ে গেছে, তবে এখনো এর বর্ণনাধর্মী মূল্যটি অক্ষয় রয়ে গেছে। সকল শিল্পীই তো দায়বদ্ধ সমাজের কাছে; তাহলে এ তিন শিল্পীর ক্ষেত্রে পৃথকভাবে কেন বলা? একথা সত্য যে, শিল্পীদের একটা দায় থাকে তাঁদের চারদিকের মানুষজন, সমাজের কাছে; তাঁদের হয়ে ওঠা নিশ্চিত করে এইসব মানুষ ও সমাজ। কিন্তু তাঁদের প্রকাশে ওই স্বীকৃতি সবসময় না-ও আসতে পারে। তাছাড়া, সমাজকে একটি এজেন্ডা হিসেবে ধরে নিয়ে ছবি আঁকতে বসেন খুব কম শিল্পীই। সে এজেন্ডাটি এই ক্ষুদ্রসংখ্যক শিল্পী সাজান একজন সমাজ-সংস্কারকের মতো অথবা একজন নৃতত্ত্ববিদের মতো। তাতে সমাজের জীবন-স্পন্দনটি থাকে তাজা। জয়নুল আবেদিন শিল্পীজীবনের শুরুতে দেখেছেন খেটে খাওয়া মানুষের জীবন, সাঁওতালদের জীবন এবং, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়, ছিন্নমূল মানুষের মানবেতন জীবন ও সমাজের শীতল নিস্পৃহতা। একসময় জয়নুল আবেদিন প্যালেস্টাইনি মানুষের সংগ্রামকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবনের হাহাকারকে খুব কাছে থেকে শুনেছেন। এজন্য তাঁর ক্যানভাসে জীবনসংগ্রামের প্রত্যক্ষ রূপটি ভেসে ওঠে। সেখানে পরাজয় আছে (দুর্ভিক্ষের চিত্রাবলী); কিন্তু প্রতিরোধ আছে, জয়ও আছে (বিদ্রোহী)। জয়নুলের ছবিতে রাজপথের মিছিলের মুখ বা উত্তোলিত হাত না থাকলেও নানা রকমের মিছিল আছে এবং প্রতীকেরও অভাব নেই। তাঁর ছবিতে যে কাকটিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়, সেটি একটি প্রতিপক্ষ এবং পক্ষকে চিনে নিতেও আমাদের অসুবিধা হয় না। অর্থাৎ জয়নুলের দৃষ্টি ছিল বাস্তবে, সমাজে, জীবনে এবং চারদিকের ঘটনাপ্রবাহে। সে তুলনায় এস এম সুলতান অনেকটা একদর্শী। তিনি বাস্তবকে দেখেন ভিন্ন একটি মাত্রায়, সেখানে একটি তলে যোগ হয় স্বপ্নময়তার অথবা আদর্শবাদের। সুলতানের বিশাল ক্যানভাস জুড়েও অসংখ্য মানুষজন চলাচল করে – তারা গ্রামের কৃষক, কিষানি। তারা ক্ষেতে কাজ করে, মাছ ধরে, চর দখল করে, মাছ কাটে, সন্তানকে স্তন্য দান করে। এসবই বাঙালি জীবনের প্রতিদিনের চালচিত্র। সুলতান যদি বাস্তবসম্মত হতেন তাহলে তাঁর চিত্রায়ণে একটি গভীর বিষাদবোধও উৎপাদিত হতো। কারণ কৃষকের, মজুরের জীবনে অভাব, অনটন, রুগ্ণতা ও মৃত্যু অবধারিত সব সত্য। কিন্তু সুলতান তা করেন না। তিনি তাঁর কৃষক, মজুর, চরের মানুষ, এমনকি শিশুদেরও পরিণত করেন বলশালী সমর্থ দেহের মানুষে, তাদের পেশিতে থাকে তেজ ও শক্তি, তাদের দৃষ্টিতে অর্জনের সন্তুষ্টি। কাজেই বাস্তবের চিত্রের ওপর একটি সম্ভাবনার মাত্রা পড়ে; তাঁর ক্যানভাস সবুজ হয়ে ওঠে মাঠের ফসলে, গোলা ভরে থাকে ধানে, পুকুর ভরে থাকে মাছে। এই আদর্শিক চিত্রটি কিছুতেই মেলে না বাস্তবের সঙ্গে – কিন্তু আমরা তাকে অস্বীকার করি না অথবা অবাস্তব বলে দূরে সরিয়ে দিই না। তিনি আধুনিক জীবনের dystopia-কে পাশ কাটিয়ে অনুসন্ধান করেন একটি utopia, যা জীবনে নেই বলে কোনোদিন তা অর্জন করা যাবে না, এ কথাটি বিশ্বাস করতে তিনি অস্বীকার করেন। সুলতানের সমাজচিন্তা অলীক অথবা বিমূর্ত নয় এজন্য যে, তার আদর্শিকতার ভিত্তি হচ্ছে চিরায়ত গ্রামীণ জীবন। সুলতানের দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত ভবিষ্যতের দিকে; তিনি বর্তমান থেকে ভবিষ্যতে একটি উত্তরণ আশা করেন।
কামরুল হাসান দৃষ্টি ফেরান অতীতে এবং বর্তমানে। তাঁর মানুষজনও সংগ্রামী – কিন্তু কামরুল মানুষের বর্তমান সংগ্রামকে মুখ্য করেন না। কারণ বর্তমান এক অনিবার্য প্রকাশ, একটি অবধারিত  সময়ধারা মাত্র। তিনি সে ধারার শুরুতে দৃষ্টি দেন। ১৯৮৬ সালে ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একটি অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, কেন তিনি তাঁর ছবিতে বাঙালির জীবনকে এতটা ছন্দিত, এতটা নান্দনিক করে দেখান। তিনি বলেছিলেন, বাঙালির জীবনের মূল পরিচয়টিই হচ্ছে এটি – অর্থাৎ এর ছন্দময়তা, এর সৌন্দর্য। তিনি মনে করেন, জীবনের বিকার বিক্ষোভ ও ক্লান্তি চিরস্থায়ী কোনো বিষয় নয়, এসব উৎপাদিত হয় সময়ের অভিঘাতে এবং মানুষের মধ্যে প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকতা যখন তৈরি করে নানা অবসাদ, তখন। কামরুল হাসান বলেছিলেন, বাঙালির জীবনে এই প্রশান্তি, এই সৌন্দর্য, এখনো তিরোহিত হয়নি, কারণ এই তার ঐতিহ্য। তবে সামাজিক-রাজনৈতিক নানা শক্তি একে শোষণ করছে, বিপর্যস্ত করছে। যদি বাঙালি তার ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কার করতে পারে, তাহলে পুনরায় শান্তি এবং সৌন্দর্যে তার ফিরে যাওয়া কঠিন কিছু হবে না। সুলতান এই শক্তি ও সৌন্দর্যকে মূর্তরূপে স্থাপন করেছেন তাঁর ছবিতে, কামরুল তাকে রেখে দিয়েছেন এক প্রতীকের আবরণে। কিন্তু কামরুল যদি বাঙালি জীবনের চিরায়ত সম্ভাবনার রূপকার হয়ে থাকেন তাহলে এক অর্থে তাঁরা পরস্পরকে প্রতিভাত করবেন, এটি স্বতঃসিদ্ধই হয়ে দাঁড়ায় – তাঁরা যেহেতু ছিলেন সহযাত্রী। কিন্তু তাঁদের চিন্তাচেতনার ক্ষেত্রেও যে নৈকট্য ছিল, সে বিষয়টি অতটা তলিয়ে দেখা হয় না। যামিনী রায়ের একটি গভীর উদ্বেগ ছিল এই যে, মৃত্তিকাসংলগ্ন জীবন Ñ যে জীবন মানুষকে এক শুদ্ধ নান্দনিক বোধ উপহার দিতে পারে – তিরোহিত হয়ে যাবে নগরায়ণ এবং যান্ত্রিকতার বিস্তারে। এজন্য তিনি লোকজ শিল্পের যা চিরন্তন, তাকে নিজের শিল্পের কেন্দ্রে স্থাপন করতে উৎসাহী হয়ে পড়েন। একদিকে তাঁর ছিল উদ্বেগ, অন্যদিকে সন্দেহ এবং ভয়। আধুনিক সভ্যতাকে তিনি গ্রহণ করেছেন, কিন্তু এর অন্ধকার দিকগুলোকে শঙ্কার সঙ্গে দেখেছেন এবং ভীত হয়েছেন এই ভেবে যে, একদিন সারল্য থাকবে না, সৌন্দর্য থাকবে না জীবনে। তাঁর সেই বিখ্যাত বিড়ালটি সেই ভয় থেকেই তিনি এঁকেছেন।
যামিনী রায়ের সঙ্গে কামরুল হাসানের একটি তুলনা অনেককেই করতে দেখেছি, তাঁদের স্টাইলের নৈকট্যের অথবা সাযুজ্যের কারণে, তবে প্রধানত এই সাযুজ্য-উদ্ঘাটনের প্রয়াস সীমাবদ্ধ রয়েছে ওই স্টাইলের অঞ্চলেই। যেহেতু উভয় শিল্পী দ্বারস্থ হয়েছিলেন লোকজ শিল্পের এবং যেখান থেকে গ্রহণ করেছেন সময়-পরীক্ষিত রেখা ও নকশা, ফিগার বিন্যাস ও চিত্রতলের উপস্থাপনার ঐতিহ্যকে নিজের ভেতরে স্থাপন করে একটি নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি সৃষ্টির প্রয়াস। আধুনিক চিত্রকলা মানেই যে পশ্চিমা বিমূর্ত প্রকাশবাদকে নির্ভর করে সৃষ্ট হবে, তা তো নয়। যামিনী রায় তাঁর নিজের সময়কে যেভাবে দেখেছিলেন, বুঝেছিলেন, সেভাবেই তাকে উপস্থাপিত করেছেন তাঁর ক্যানভাসে।
যামিনী রায়ের প্রসঙ্গটির উল্লেখ এজন্য প্রয়োজন যে, তাতে কামরুল হাসানের আধুনিকতার পরিচয়টি জানা সহজ হয়। কামরুল হাসানও ঐতিহ্যে সমর্পিত শিল্পী ছিলেন, কিন্তু ঐতিহ্যকে তিনি মিলিয়েছেন গতিশীল জীবনের সঙ্গে। সমকালের সমস্যাগুলোর একটি সমাধান পেয়েছেন ঐতিহ্য চিন্তায়, কিন্তু তিনি জানতেন, প্রতিটি সময়কাল তার নিজের দাবি নিয়ে আসে শিল্পের কাছে – সেটা মেটাতে হয়। তিনি বিমূর্তায়নকেও মূল্য দিয়েছেন; কিন্তু তাঁর যে বিশেষ শিল্পভাষা ছিল, তাতে বিমূর্তায়ন প্রধান আসনটি পায়নি – সে আসন তিনি তৈরি করেছিলেন ঐতিহ্যের কাঠ দিয়ে এবং সে আসনে তিনি বসিয়েছেন তাঁর নিজস্ব শিল্পভঙ্গিকে।
যামিনী রায়কে যে কারণে কামরুল হাসান পেছনে ফেলে যান, সেটি তাঁর সমকাল চেতনার প্রাবল্যের কারণে। নিজের দেশ ও সময়কে তিনি অনুভব করেছেন তাঁর চিন্তা ও চেতনার গভীরে। তিনি যে শুধু রাজনৈতিক-সামাজিক নানা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন তাই নয়, বুদ্ধির মুক্তির সার্বিক আন্দোলনে তিনি নানাভাবে ছিলেন সক্রিয়। তাঁর শিল্পকলা বাঙালির সৃষ্টিশীলতাকে নতুনভাবে উপস্থাপিত করেছে, নতুন মূল্যায়ন করেছে। এক অর্থে তাঁর ঐতিহ্যে যাত্রা ছিল এই সৃষ্টিশীলতার পূর্বাপর চমৎকারিত্বের একটি চিত্র তুলে ধরা, যা অনুপ্রাণিত করবে বর্তমানকে যা ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে সৃষ্টিশীলতার ধারাটিকে। অন্যদিকে আধুনিক একজন চিত্রীর দায়বদ্ধতাও তাঁর ছিল – তিনি সময়ের জিজ্ঞাসাগুলোর উত্তর দিয়েছেন, রেখা রং ও ফর্মের নিজস্ব ও অননুকরণীয় বিন্যাসে ব্যাখ্যা করেছেন; জীবনের নানা অভিজ্ঞতাকে, তিনি দেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে এবং সমকালে জীবন জিজ্ঞাসাকে যুগপৎ উপস্থিত করেছেন তাঁর ক্যানভাসে।

চার
কামরুল হাসান কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন তাঁর পরের সময়ের শিল্পীদের – এ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা হয়তো এখনই সম্ভব নয়, এজন্য আরো সময়ের প্রয়োজন। কিন্তু তার মৃত্যুর এতগুলো বছর পর অন্তত এ বিষয়টি পরিষ্কার যে, তাঁর ঐতিহ্য-চিন্তা এবং সমকালচেতনার সম্মিলনটি আমাদের আধুনিক চিত্রকলার একটি প্রবল অভিঘাত সৃষ্টি করেছে, যা তরুণ শিল্পীদের কাছে একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। তাঁদের কাজে এর প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, এবং সংগতকারণেই এই ঐতিহ্যচিন্তায় প্রকাশটি হচ্ছে বিচিত্রভাবে, বিভিন্ন উপায়ে। আর কামরুল হাসানের সমাজচেতনা, তাঁর সংগ্রাম এবং তাঁর জীবনসম্পৃক্ততার বিষয়টি সবসময় আমাদের সামনে একটি বিশাল অনুকরণযোগ্য উদাহরণ হয়েই থাকবে।

Leave a Reply

*