logo

‘কাজই সমস্ত সমস্যার প্রতিকার’

সা গ র  চৌ ধু রী

শিরোনামের উক্তিটি যাঁর তিনি হলেন অঁরি মাতিস (Henri-Émile-Benoît Matisse), নিঃসন্দেহে বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রতিভাবান শিল্পীদের অন্যতম। চিত্রশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের পর থেকে মাতিসের নিজস্ব স্টাইল বা অঙ্কনশৈলী আধুনিক ইয়োরোপীয় শিল্পের মূলধারাকে উলেস্নখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করেছে ছয় বা সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে। কয়েক প্রজন্মের উদীয়মান শিল্পীদের কাজকে অনুপ্রাণিত করেছে নানা ধরনের মাধ্যম ব্যবহারে মাতিসের সাবলীল দক্ষতা, যেমনটা করেছে তাঁরই সমসাময়িক (যদিও বয়সে তাঁর চেয়ে বছর বারোর ছোট) আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী পাবলো পিকাসোর (Pablo Picasso) শিল্পকর্ম। মাতিসের জীবনব্যাপী সৃষ্টির বিশাল সম্ভারের মধ্যে আছে পরিচিত সমসত্ম রকম শিল্পকর্মের নিদর্শন – তুলির টানে আঁকা উজ্জ্বল বর্ণময় ছবি, রেখাচিত্র ও ভাস্কর্যের পাশাপাশি এচিং, লিনোকাট, লিথোগ্রাফ, অ্যাকুয়াটিন্ট (তামার পাতের ওপরে নাইট্রিক অ্যাসিডে খোদাই করা নকশায় জলরঙে আঁকা ছবির আদল ফুটিয়ে তোলা) ইত্যাদি প্রায় সব রকমের গ্রাফিক আর্টস, পেপার কাট-আউট বা কাগজ কেটে তৈরি নকশা এবং বুক ইলাস্ট্রেশন বা পুসত্মক অলংকরণ। প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি (ল্যান্ডস্কেপ), অচেতন বস্ত্তর ছবি (স্টিল লাইফ), প্রতিকৃতি ইত্যাদি অঙ্কনে – স্টুডিওর ভেতরে অথবা বাইরে খোলা জায়গায় – তিনি ছিলেন সহজাত পারদর্শিতার অধিকারী। নারীদেহের অমত্মর্নিহিত সৌন্দর্যকে নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিস্ফুটিত করে তোলাও তাঁর শিল্পকর্মের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য।

অঁরি মাতিসের জন্ম ১৮৬৯ খৃষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর তারিখে, ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলে বেলজিয়ামের সীমামত্মবর্তী এক অখ্যাত জনপদে, মৃত্যু দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলবর্তী ‘ফ্রেঞ্চ রিভিয়েরা’ অঞ্চলের ‘নিস’ (Nice) শহরে, ১৯৫৪ সালের ৩ নভেম্বর। এই শহরে তিনি বাস ও কাজ করেছেন আমৃত্যু তেত্রিশ বছর। জীবনের প্রামত্মভাগে উপনীত হওয়ার পর কোনো প্রসঙ্গে মাতিস বলেছিলেন : ‘আমার কাহিনি যদি কখনো সততার সঙ্গে গোড়া থেকে শেষ পর্যমত্ম লেখা হতো, তাহলে সেটা প্রত্যেককেই বিস্ময়বিহবল করে তুলত।’ নিজের সম্পর্কে তাঁর এই মমত্মব্য প্রকৃতপক্ষেই অবাসত্মব বা অতিরঞ্জিত ছিল না।

মাতিস ছবি আঁকা শুরম্ন করেন একুশ বছর বয়সে। তার আগে তিনি মা-বাবার ইচ্ছা অনুসারে ওকালতিতে শিক্ষানবিশি করছিলেন। ওই সময়ে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের চিকিৎসার জন্য তাঁর অস্ত্রোপচার হয়। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যমত্ম রোগশয্যায় বাধ্যতামূলক কালাতিপাতের একঘেয়েমি কাটানোর জন্য তাঁর মা তাঁকে কিছু ছবি আঁকার সরঞ্জাম এনে দেন। এই ঘটনাই তাঁর জীবনকে আচম্বিতে ঘুরিয়ে দিলো সম্পূর্ণ নতুন পথে। রং-তুলি হাতে পাওয়ার পর তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে গিয়ে মাতিস বলেছেন : ‘যে মুহূর্তে আমি রঙের বাক্সটা হাতে নিলাম সেই মুহূর্তেই আমি বুঝতে পারলাম যে এটাই আমার জীবন।’ আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিতকারী ওকালতির পেশাকে চিরতরে ত্যাগ করার সিদ্ধামত্ম তাঁর মা-বাবাকে হয়তো খুশি করেনি, তবে তাঁরা ছেলেকে বাধাও দেননি। ১৮৯১ সালে মাতিস প্যারিসে চলে গেলেন পুরোপুরিভাবে শিল্পকলা শিক্ষার্থীর জীবন শুরম্ন করার জন্য। প্রথম এক বছর তিনি কাটালেন একাডেমি জুলিয়ান (Académie Julian) নামক প্রতিষ্ঠানটিতে, যেটা ছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহ্যিক শিল্পকলার প্রধান শিক্ষালয়গুলির মধ্যে একটি। এখানে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন রক্ষণশীল ঘরানার শিল্পী উইলিয়াম-অ্যাডলফ ব্যুগারইউ (William-Adolphe Bouguereau), সুতরাং হয়তো চিরাচরিত ধারা অনুসরণ করেই মাতিসের শিল্পশিক্ষার সূচনা হয়েছিল। ১৮৯২ সালে তিনি যোগ দেন একোল দে বৌজ-আর্টস (École des Beaux-Arts) নামক শিক্ষালয়টিতে, Symbolist বা প্রতীকীবাদী শিল্পী গুসত্মাভ মোরোর (Gustave Moreau) তত্ত্বাবধানে শিক্ষানবিশি করার জন্য। মাতিস তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম দিকের কাজগুলি প্রদর্শন করতে শুরম্ন করেন ১৮৯৫ সাল থেকে এবং এগুলির মধ্যে, বিশেষ করে রেখাচিত্রগুলিতে, যেন এক ধরনের শুষ্ক, গতানুগতিক, স্কুলের আঁকার ক্লাসে শেখা বিদ্যার ছাপই সুস্পষ্ট। তবে একই সময়ে তৎকালীন প্যারিসের স্বতঃস্ফূর্ত প্রগতিশীল শিল্পচর্চার  আঙিনায় যেসব ভিন্ন ভিন্ন বৈপস্নবিক শিল্প আন্দোলন যুগপৎ অথবা একের পর এক ঘটে চলেছিল, যেমন ‘রিয়ালিজম’, ‘নিও-ক্লাসিসিজম’, ‘ইমপ্রেশনিজম’ এবং ‘নিও-ইমপ্রেশনিজম’, অচিরেই তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তিনি নানা বিচিত্র শিল্পধারা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরম্ন করলেন, নতুন ধরনের রং-তুলির কাজ, আলোছায়ার যুগলবন্দি ও অভিনব সৃজনকৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব শৈল্পিক ভাষা উদ্ভাবন করার পথে এগিয়ে চললেন। মাতিসের এইসব প্রাথমিক পর্যায়ের কাজে, রঙের ব্যবহারে ও অঙ্কনশৈলীতে, তাঁর স্বদেশীয় পূর্বসূরিদের, যেমন এদুয়ার্দ ম্যানে (Édouard Manet) বা পল সেজানের (Paul Cézanne) প্রভাব লক্ষ করা যায়। ডাচ শিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের দ্বারাও তিনি বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ১৯০৪ সালের গ্রীষ্মে মাতিস বেড়াতে গিয়েছিলেন ‘সেইন্ট-ট্রোপেজ’ নামে একটি গ্রামে। ফ্রান্সের ‘প্রভেন্স’ অঞ্চলে সমুদ্রতটবর্তী এই ছোট্ট জেলেদের গ্রামটিতে তখন তাঁর এক শিল্পী বন্ধু পল সাইনাক (Paul Signac) বাস করছিলেন। এখানে এসেই মাতিস আবিষ্কার করলেন দক্ষিণ ফ্রান্সের অত্যুজ্জ্বল সোনালি রোদকে, যে উজ্জ্বলতা তখন থেকে প্রতিফলিত হতে থাকল তাঁর আঁকা ক্যানভাসের বুকেও। পল সাইনাক এবং কাছাকাছি একটি গ্রামে ওই সময়ে অবস্থানকারী আরেকজন শিল্পী বন্ধু অঁরি-এদমন্দ ক্রসের (Henri-Edmond Cross) মাধ্যমে মাতিস পরিচিত হলেন ‘পয়েন্টিলিস্ট’ (Pointillist) অঙ্কনশৈলীর সঙ্গে, যা হলো অসংখ্য ছোট ছোট নানা রঙের বিন্দু কাগজে বা ক্যানভাসে মানানসইভাবে সাজিয়ে পরিপূর্ণ চিত্র ফুটিয়ে তোলা। ১৮৮০-র দশকে এই অঙ্কনশৈলীর প্রবর্তন শিল্পী জর্জ সিউরাতের (Georges Seurat) হাতে। এর ফলশ্রম্নতিতে মাতিস আঁকলেন তাঁর বিখ্যাত নিও-ইমপ্রেশনিস্ট চিত্র Luxe, Calme et Volupté (Luxury, Calm and Voluptuousness)। ছবিটির নাম চার্লস বদলেয়ারের (Charles Baudelaire) রচিত একটি কবিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং ১৯০৫ সালের বসমত্মকালে প্যারিসের Salon des Indépendants গ্যালারিতে প্রদর্শিত হওয়ার পর এটি শিল্পরসিক মানুষজন ও শিল্পকলা সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছিল।

এর পরের গ্রীষ্মে মাতিস ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলেরই এক সামুদ্রিক বন্দরে। এখানে মাতিসের হাতে একের পর এক সৃষ্টি হলো আশ্চর্য বর্ণোজ্জ্বল একগুচ্ছ ছবি, নানা ধাঁচের তুলির টানে ক্যানভাসের গায়ে যেমন পড়ল রঙের গাঢ় প্রলেপ, তেমনি টিউব থেকে সরাসরি রঙের প্রয়োগে ফুটে উঠল সর্পিল তরঙ্গায়িত রেখায়, অনেকটা যেন আরবীয় নকশার আদলে আঁকা সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপরে ভাসমান জলযান, বেলাভূমিতে বিচরণশীল নর-নারীর আকৃতি। মোটামুটি একই সময়ে প্যারিসে Salon d’Automne-এ প্রদর্শিত মাতিসের Woman with a hat ছবিটি থেকেই ‘Fauvism’ (মূল ফরাসি fauves শব্দটি থেকে চয়িত, যার অর্থ হলো ‘wild beasts’ বা ‘বন্য প্রাণিকুল’) নামে খ্যাত আভাঁ-গার্দ (avant-garde) আন্দোলনের প্রথম ধাপটির সূচনা। ছবির বিষয়বস্ত্তকে প্রাণবমত্ম করে তোলার জন্য মাতিস উজ্জ্বল রং ব্যবহারের সঙ্গে জোরালো তুলির টানের যে খামখেয়ালি, আপাত-অসংযত মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন সে সম্পর্কে মমত্মব্য করতে গিয়েই সমসাময়িক একজন কলাসমালোচক এই শব্দটি তৈরি করেছিলেন। Fauvism-এর সঙ্গে তাঁর সংক্ষিপ্ত সহবাসের সময়ে মাতিস ক্যানভাসে বেশ কয়েকটি উলেস্নখযোগ্য ছবি এঁকেছিলেন, যাদের একটি হলো মাদাম মাতিস, অর্থাৎ তাঁর পত্নী অ্যামেলির (Amélie Noellie) প্রতিকৃতি (১৯০৫)। এই ছবিটি The Green Line বা The Green Stripe নামেও পরিচিত, সম্ভবত এই কারণে যে অ্যামেলির মুখম-লের দুই অর্ধকে মাতিস এঁকেছিলেন দুই রঙে – মানুষের ত্বকের স্বাভাবিক রঙে এবং হালকা হলুদ-সবুজ রঙে – একনজরে দেখলে মনে হয় দুই অর্ধ যেন একটা সবুজ রঙের রেখা দিয়ে বিভক্ত। একাধিক কলাসমালোচকের মতে, এই প্রতিকৃতি যেন মাতিসের নিজের এবং Fauvism আন্দোলনের মূল দর্শনের প্রতীক – সুষমতা, বিশুদ্ধতা ও অচঞ্চলতার মেলবন্ধনে সার্থক শিল্প সৃষ্টির লক্ষ্যে রঙের কাব্যিক ব্যবহার। এ পর্যায়ের অন্যান্য উলেস্নখযোগ্য চিত্রের মধ্যে আছে Bonheur de vivre (১৯০৫-০৬), Marguerite Reading (১৯০৫-০৬), The Young Sailor (১৯০৬), Blue Nude, Memory of Biskra (১৯০৭), Le Luxe (১৯০৭) ইত্যাদি।

মাতিসের শিল্পীজীবনের পরবর্তী অংশকে একাধিক পর্যায়ে ভাগ করা যায়, যেগুলিতে তাঁর অঙ্কনশৈলীতে হয়তো ধাপে ধাপে কিছু পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু তাঁর অমত্মর্নিহিত লক্ষ্য সবসময়ই অপরিবর্তিত থেকেছে – ‘জাগতিক সমসত্ম বস্ত্তর মূল চরিত্রের সন্ধান’ এবং ‘সুষমতা, বিশুদ্ধতা ও অচঞ্চলতার যোগসাজশে শিল্প সৃষ্টি’, যেমনটা তিনি নিজেই বলেছেন তাঁর ১৯০৮ সালে লেখা Notes of a Painter বইটিতে। ১৯০৮-১৩ এই পাঁচ বছরে মাতিসের কাজে প্রাধান্য পেয়েছে চারম্নকলা ও অলংকরণ, যে সময়ে তিনি বেশ কয়েকটা বড় আকারের ছবি এঁকেছেন, যাদের মধ্যে আছে ‘Reclining Odalisque’ (১৯০৮), তাঁর রম্নশ পৃষ্ঠপোষকের বরাত দেওয়া এক জোড়া ‘ম্যুরাল’ বা দেয়ালচিত্র ‘Dance and Music’ (১৯০৯-১০), স্টুডিওর অভ্যমত্মরে আঁকা ত্রয়ী চিত্রাবলি ‘The Red Studio’ (১৯১১) এবং মরক্কোর দৃশ্যপটে আঁকা একগুচ্ছ অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন বর্ণময় ছবি। এরপর বছর চারেক ধরে চলল ‘কিউবিজম’ (Cubism) নিয়ে মাতিসের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যা থেকে সৃষ্টি হলো একামত্ম অনাড়ম্বর, যেন প্রায় জ্যামিতিক সংযুতিতে বিন্যসত্ম, কখনো বা বিমূর্ত, নির্বস্ত্তক চরিত্রের কিছু চিত্র – ‘View of Notre-Dame’ (১৯১৪), ‘The Yellow Curtain’ (১৯১৫), ‘The Piano Lesson’ (১৯১৬), ‘Bathers by a River’ (১৯১৬) এবং নানা ভঙ্গিতে উপবিষ্ট
নর-নারীর একগুচ্ছ প্রতিকৃতি। একই সময়ে অবশ্য ‘Plumed Hat’ নামে বিখ্যাত প্রতিকৃতিটির (১৯১৯) মতো আরো কিছু সযত্নে অঙ্কিত নিখুঁত ছবি তিনি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

মাতিস নিস শহরে বসবাস শুরম্ন করেন ১৯১৭ সালের শরৎকালে। এর পরের তেরো-চোদ্দ বছরে তাঁর শিল্পকর্মের প্রধান বিষয় ছিল নারীমূর্তি, বিশেষত শিল্পীর নিজস্ব কল্পনায় সৃষ্ট কোনো সুরম্য প্রাসাদের বিলাসবহুল অন্দরমহলে দ-ায়মান, উপবিষ্ট বা অর্ধশায়িত স্বল্পবসনা সুনদরীরা। উজ্জ্বল রঙে আঁকা এইসব চিত্র যেন দক্ষিণের বাতায়ন দিয়ে আসা রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত, মধ্যপ্রাচ্যীয় হারেমের মতো জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জায় অলংকৃত। ১৯২৯ সালে মাতিস ‘কার্নেগি ইন্টারন্যাশনাল’ (Carnegie International) নামে খ্যাত সমসাময়িক শিল্পকলার আমত্মর্জাতিক প্রদর্শনীর জুরি নির্বাচিত হয়ে আমেরিকায় যান। বিশ্বের দ্বিতীয় প্রাচীনতম এই শিল্পকলা প্রদর্শনীর সূচনা করেছিলেন শিল্পপতি অ্যানড্রু কার্নেগি ১৮৯৬ সালে, উত্তর আমেরিকার পিটসবার্গ শহরে (প্রথম প্রাচীনতম হলো ভেনিসে আয়োজিত দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী La Biennale di Venezia, সূচনা ১৮৯৫ সালে)। পরের বছরের বেশ কিছুটা সময় তিনি যেসব জায়গায় কাটিয়েছিলেন তাদের মধ্যে আছে তাহিতি, তারপরে নিউইয়র্ক, বাল্টিমোর ও মেরিয়ন শহরগুলি। মেরিয়ন শহরের একজন গুরম্নত্বপূর্ণ আধুনিক শিল্পকলা সংগ্রাহক ড. অ্যালবার্ট বার্নস, যাঁর সংগ্রহে ছিল আমেরিকায় মাতিসের সর্বাধিকসংখ্যক শিল্পকর্ম, তাঁর প্রাসাদের দ্বিতল প্রদর্শশালার জন্য একটা বিশাল আকারের ম্যুরাল আঁকার বরাত দিলেন মাতিসকে। এই দেয়ালচিত্রের বিষয় হিসেবে মাতিস বেছে নিলেন একটা নৃত্যের দৃশ্য, যার ভাবনা দুই দশকেরও বেশি আগে তাঁর Fauvist পর্যায়ের ছবি ‘Bonheur de vivre’ আঁকার সময় থেকেই তাঁর মাথায় ঘোরাফেরা করছিল। এই চিত্রে দেখা যায় একটা বিমূর্ত, প্রায় জ্যামিতিক নকশার পটভূমিতে স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত নৃত্যশীলা রমণীদের। দেয়ালচিত্রটি রচনার কাজ শেষ হয় ১৯৩৩ সালে এবং তখন থেকে মেরিয়ন শহরে বার্নস ফাউন্ডেশনের গ্যালারিতে এটি প্রদর্শিত রয়েছে। চিত্রটির অঙ্কনপদ্ধতিতে মাতিস একটা নতুন শৈলী ব্যবহার করেছিলেন – আগে থেকে রং করা কাগজ নানা আকৃতিতে কেটে তাদের উপযুক্তভাবে সাজিয়ে তিনি পরিপূর্ণ চিত্রটি ফুটিয়ে তুললেন। নিজের উদ্ভাবিত এই শৈলী মাতিসকে নিশ্চয়ই পরিতৃপ্ত করেছিল, কারণ এর কয়েক বছর পর থেকে পেপার কাট-আউট বা কাগজ কেটে তৈরি নকশা তাঁর শিল্পকর্মের একটি প্রধান মাধ্যম হিসেবে তিনি আজীবন ব্যবহার করেছেন।

আরো যে একটি মাধ্যম নিয়ে মাতিস সারাজীবন ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন তা হলো ড্রইং বা রেখাচিত্র। রেখাচিত্র অঙ্কনের দক্ষতা একজন শিল্পীকে তাঁর অনুভবকে সবচেয়ে প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ করতে সমর্থ করে এবং মাতিসও তাঁর শিল্পকর্মের পরিকল্পনা করার সময় সবচেয়ে উপযুক্ত শৈলী নির্ধারণ করার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলির সমাধানে কিংবা নতুন চিমত্মাভাবনাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে প্রয়োগ করায় সাহায্য পেয়েছেন রেখাচিত্র অঙ্কনের পারদর্শিতা থেকে। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি সব সময়েই কোনো ছবি আঁকা শুরম্ন করার আগে কালি ও কলমে তার বিষয়ের ও মডেলের রেখাচিত্র তৈরি করে নিয়েছেন। তাঁর এই অভ্যাসের জের  ধরেই ১৯৪০-এর দশকে মাতিস সৃষ্টি করেন তাঁর বিখ্যাত ‘Thémes et Variations’ চিত্রমালা, যেগুলিতে রূপায়িত হয়েছে কালি-কলমের সূক্ষ্ম আঁচড়ে বা রং-তুলির বাহুল্যবর্জিত টানে নারীদেহের কমনীয়, সরলীকৃত আকৃতি কিংবা ‘স্টিল লাইফ’ বা অচেতন বস্ত্তর প্রতিচ্ছবি। আরো বছর দশেক পরে মাতিস ইজেল থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে লম্বা কাঠির ডগায় বসানো মোটা তুলি দিয়ে দড়ির ওপরে খেলা দেখানো বাজিকরদের একগুচ্ছ ছবি এঁকেছিলেন, যেগুলিতে খেলোয়াড়দের লাফঝাঁপ, অঙ্গভঙ্গি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কেবল নিপুণ, বলিষ্ঠ রেখার টানে।

তাঁর শিল্পীজীবনের প্রায় গোড়া থেকেই মাতিস ভাস্কর্য নিয়েও কাজ করেছেন। ভাস্কর্য যদিও রং-তুলি বা কালি-কলম থেকে আলাদা একটা মাধ্যম, অনেক সময়েই মাতিস চিত্রাঙ্কনের নানাবিধ সমস্যার সমাধানে কিংবা শিল্পসৃষ্টির অনুপ্রেরণা হিসেবে এই মাধ্যমকে ব্যবহার করেছেন। তাঁর ভাস্কর্যগুলির অর্ধেকেরও বেশি তিনি শেষ করেছিলেন ১৯০০ ও ১৯১০ সালের মধ্যে, তবে এই সময়ের পরেও তিনি বেশ কিছু ধারাবাহিক বা অনুক্রমিক কাজ (series) করেছেন, কোনো কোনোটার ব্যাপ্তি হয়তো কয়েক বছর ধরে। এই শ্রেণির সবচেয়ে উলেস্নখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে নারীর পৃষ্ঠদেশের চারটি ভাস্কর্য (Back reliefs, ১৯০৩-৩১), এক মহিলার মাথার পাঁচটি প্রতিরূপ (Jeannette, ১৯১০-১৬), উপবিষ্ট নগ্নিকার বড় আকারের প্রতিমূর্তি (Large Seated Nude, ১৯২৫-২৯)।

মাতিসের বয়স যখন ষাটের কোঠায় তখন তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন পুসত্মক অলংকরণে। ১৯৩২ সালে ফরাসি কবি সেত্মফান মালার্মের Poésies নামে বইটির প্রচ্ছদের এবং ভেতরের কিছু অলংকরণ দিয়ে এই ক্ষেত্রে তাঁর কাজের সূচনা এবং পরিণতি ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত তাঁর নিজেরই বই Jazz অতীব দৃষ্টিনন্দন ‘কাট-আউট’ ছবি দিয়ে সাজিয়ে। পুসত্মক অলংকরণের আরো বেশ কিছু কাজ অবশ্য তিনি এই সময়ের মধ্যে করেছিলেন। তবে মাতিসের শিল্পীজীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কৃতিত্ব সম্ভবত ভেনিসের Chapel of the Rosary নামে গির্জার সৌন্দর্যবিধানের দায়িত্ব পালন করা। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল – এই তিন বছর মাতিস অক্লামত্ম পরিশ্রমে গির্জার দেয়ালগুলির সাজসজ্জার, পবিত্র ক্রুশ স্থাপনের স্থানগুলির, সমসত্ম আসবাবপত্রের, ‘স্টেইন্ড গস্নাস’ বা রঞ্জিত কাচের জানালাগুলির, এমনকি সমসত্ম আনুষ্ঠানিক পোশাক ও প্রার্থনাবেদির আচ্ছাদনের নবীকরণ ও সংস্কারের কাজ সুসম্পন্ন করেন। তাঁর কাজ শেষ হওয়ার পর গির্জা যেন সত্যিই নবকলেবর ধারণ করে।

সারাজীবন ধরে প্রায় বিরামহীনভাবে কাজ করে চলায় মাতিস কখনো ক্লামত্ম বোধ করেননি। জীবনের সায়াহ্নে পৌঁছে তিনি বলেছিলেন : ‘কেন আমি কোনোদিনই একঘেয়েমিতে ভুগিনি? পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি কখনো কাজ করা বন্ধ করিনি।’ এটাই বোধ করি শিল্পী মাতিসের জীবনদর্শন।

২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন মিউজিয়াম অভ্ আর্টের গ্যালারিতে Matisse : In Search of True Painting নামে একটি প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল, যেটা চলেছিল পরের বছরের মার্চ মাস পর্যমত্ম। ২০১৫ সালে লন্ডনে যাওয়ার পর জানতে পারলাম ব্রিটিশ মিউজিয়ামে ওই প্রদর্শনীর নির্বাচিত কিছু অংশ দেখানো হচ্ছে, সময় করে দেখতে গিয়েছিলামও। সেখানে রাখা নানা স্যুভেনিরের মধ্যে ছিল মাতিসের স্বাক্ষরসহ ফটোগ্রাফ ছাপা এই পোস্টকার্ডটি। n

Leave a Reply

*