logo

কমলা ঝরিয়া স্মৃতি-বিস্মৃতির আলোছায়ায়

আ বু ল  আ হ সা ন  চৌ ধু রী

কলের গানের কল্যাণে বিশ শতকের গোড়া থেকে বাংলা গানের যে স্বর্ণযুগ শুরু হয় তার মধ্যপর্বের এক অসামান্য সুরশিল্পীর নাম কমলা ঝরিয়া (১৯০৬-১৯৭৯)। তিরিশ থেকে পঞ্চাশ – এই তিনটি দশক তিনি দাপটের সঙ্গে বাংলা গানের ভুবনে নিজেকে সক্রিয় রেখেছিলেন। শ্রোতার মনে সমীহ-জাগানো এই শিল্পীর অর্জন তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গিয়েছিল – কিন্নরকণ্ঠী কমলা বাংলা গানের জগতে হয়ে উঠেছিলেন কিংবদন্তির নায়িকা। একসময়ে যিনি খ্যাতি-যশ-প্রতিষ্ঠায় লোকনন্দিত শিল্পী ছিলেন, গান ছাড়ার পর দ্রুতই তিনি অন্তরালের বাসিন্দা হয়ে ওঠেন – অনেকখানিই বিস্মৃতির ধূসর জগতে আশ্রয় হয় তাঁর। ‘আমায় নহে গো – ভালবাস শুধু ভালবাস মোর গান। বনের পাখীরে কে চিনে রাখে গান হ’লে অবসান’ –  নজরুলের এই গানের কথা কমলা ঝরিয়ার জীবনে যেন অনেকখানিই সত্য হয়ে উঠেছিল। তাঁর মৃত্যু হয় ২০ ডিসেম্বর ১৯৭৯। দেশ পত্রিকায় (৫ জানুয়ারি ১৯৮০) তাঁর স্মরণে প্রকাশিত একটি ছোটো লেখায় কিছুটা খেদের সঙ্গেই বলা হয় : ‘পরিণত বয়সেই তাঁর মৃত্যু – তবু এই সংবাদ প্রচারিত হবার পরও এ-যুগের কোনো শিল্পী অথবা কোনো সংগীতসংস্থা প্রয়াত শিল্পীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলিও নিবেদন করতে আসেননি – তা যেমনই বিস্ময়কর তেমনই বেদনাদায়ক। ব্যতিক্রম মেগাফোন কোম্পানির কর্তৃপক্ষ এবং গ্রামোফোন কোম্পানির কর্তৃপক্ষ ও কর্মিবৃন্দ, যাঁদের সহায়তায় শিল্পীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।’
দুই
কমলা ঝরিয়া জ েন্মছিলেন বাংলা মুলুকের বাইরে বিহারের ঝরিয়ায়। রুক্ষ মাটির ঝরিয়া কয়লাখনির অঞ্চল হিসেবে বিখ্যাত। আগে বিহার রাজ্যের অন্তর্গত থাকলেও এখন ঝরিয়া বিহার-ভেঙে জন্ম নেওয়া ঝাড়খন্ড রাজ্যের শামিল – ধানবাদ জেলার একটি মহকুমা হিসেবে। কমলার জš§ ১৯০৬ সালে। তাঁর বংশ-পদবি ‘সিং’। পিতা ঠিকেদারি ব্যবসা করে বেশ পসার করেছিলেন। ঝরিয়ার রাজবাড়ির খুব কাছাকাছিই থাকতেন কমলারা। ঝরিয়ার রাজারাও ‘সিং’ পদবিধারী – দূর-আত্মীয়তার একটি সম্পর্কও নাকি ছিল। হয়তো এই কারণেই রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁদের একটি সহজ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। অবশ্য তাঁর পারিবারিক পরিচয় সম্পর্কে অন্য কথাও শোনা যায়। কবি-কথাশিল্পী গোলাম কুদ্দুস প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী কে. মল্লিকের একটি জীবনী-উপন্যাস লেখেন সুরের আগুন (১৯৬১) নামে। লেখক এখানে কমলার মাকে ‘বাজারের’ মেয়েলোক ও তাঁর মাসিকে অন্যের ‘রক্ষিতা’ বলে গল্পচ্ছলে উল্লেখ করেছেন। এই বিবরণ গল্পের খাতিরে, না বাস্তব তথ্যের প্রতিফলন – তার সত্যাসত্য যাচাই আজ আর সম্ভব নয়। অবশ্য মনে রাখা দরকার, সেকালে অবিদ্যা-পাড়া থেকেই তো সংগীত ও থিয়েটারের অসাধারণ প্রতিভাময়ী শিল্পীরা সব আসতেন।
যাই হোক, আগের কথায় আবার ফিরে আসি। ঝরিয়ার রাজা গানবাজনার অনুরাগী ছিলেন। তাঁর দরবারে গানের কদর ছিল। সেকালের নামী শিল্পী কে. মল্লিক আট-নয় বছর ঝরিয়ার রাজার সভা-গায়ক ছিলেন (আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত : বিস্মৃত সুরশিল্পী কে. মল্লিক : অপ্রকাশিত আত্মকথা, ঢাকা, অক্টোবর ২০০১; পৃ. ৪১)। এই কে. মল্লিকই কমলা ঝরিয়ার প্রথম গানের গুরু। একেবারে শিশু-বয়সেই গানের আসরে এসে বসতেন কমলা। গানের প্রতি তাঁর এই ঝোঁক দেখে রাজা তাঁকে কে. মল্লিকের কাছে গান শেখার সুযোগ করে দেন – তখন তাঁর বয়স নয়-দশের বেশি নয়। কে. মল্লিক কমলার গানের ঝোঁক আরো উসকে দেন – তাঁর হাতেই কমলার গানের ভিত রচিত হয়। এরপর তিনি ঝরিয়ার রাজদরবারের আরেক সংগীতগুণী শ্রীনাথ দাসনন্দীর হাওলায় উচ্চাঙ্গসংগীত শিখতে শুরু করেন। গানের প্রতি কমলার একান্ত অনুরাগ ও তাঁর সংগীত-প্রতিভার পরিচয় পেয়ে তা আরো বিকশিত করার লক্ষ্যে কে. মল্লিক তাঁকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বেতার ও গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। কমলার জীবনের মোড় ঘুরে যায় এই ঘটনায়। তিনি প্রথম গান রেকর্ড করেন হিজ মাস্টার্স ভয়েসে। প্রণব রায়ের লেখা ও তুলসী লাহিড়ীর সুরে ‘প্রিয় যেন প্রেম ভুল না’ ও ‘নিঠুর নয়ন-বাণ কেন হান’ – এই গান দুটি নিয়ে তাঁর প্রথম রেকর্ড বের হয় সেপ্টেম্বর ১৯৩০-এ। কলের গানের ভুবনে তাঁর আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া পড়ে যায়। তাঁর অনুপম গায়কির বৈশিষ্ট্যে গানের বাজার মাত করেন। অবশ্য এই কাজ খুব সহজ ছিল না। কেননা তখন গানের জগতে ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, আশ্চর্য্যময়ী, হরিমতীদের রাজত্ব। গহরজানের গানের রেশ তখনো সংগীতরসিক মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে  যায়নি।
গ্রামোফোন রেকর্ডে তাঁর নামের পদবি নিয়ে ভারি মজার এক গল্প চালু আছে। জানা যায় : ‘প্রথম রেকর্ড প্রকাশের সময় কর্তৃপক্ষ তাঁর পদবী জানতেন না তাই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত কাজী নজরুল ইসলাম, তুলসী লাহিড়ী এবং ধীরেন দাসের সিদ্ধান্ত অনুসারে রেকর্ডের লেবেলে তাঁর নামের পাশে পদবীস্থলে বাসস্থান (ঝরিয়া)-এর নাম যুক্ত করে দেন – সেই থেকেই তিনি – মিস্ কমলা ঝরিয়া’ (দেশ, ৫ জানুয়ারি ১৯৮০)। গল্পটি কতোটুকু সত্যি তা হলফ করে বলা মুশকিল। অবশ্য কমলা ঝরিয়া যখন গ্রামোফোন রেকর্ডে গান দিতে আসেন, তখন
রেকর্ড-সংগীতের জগতে বেশ কয়েকজন ‘কমলা’র অস্তিত্ব ছিল – কমলা দেবী (হাজরা), কমলা ভট্টাচার্য, কমলা দেবী, কমলা পট্টধর, কমলা চট্টোপাধ্যায়। তাই পরিচয়ের পার্থক্য বোঝানোর জন্যে পদবির উল্লেখের প্রয়োজন ছিল।
তিন
কমলা ঝরিয়ার গানের জীবনে বেশ কয়েকজন সংগীতগুণীর বড় ভূমিকা আছে, এঁদের মধ্যে বিশেষ করে নাম করতে হয় কে. মল্লিক, ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম ও তুলসী লাহিড়ীর। কমলার সংগীতজীবনের উšে§ষ ও আত্মপ্রকাশের পর্বে কে. মল্লিক যে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেছিলেন, সে-কথা আগেই বলেছি। ঝরিয়ার রাজদরবারের সভা-গায়ক শ্রীনাথ দাসনন্দীর কাছে কমলার উচ্চাঙ্গসংগীতে যে হাতেখড়ি, তা পূর্ণতা পায় ওস্তাদ উজির খাঁ ও ওস্তাদ জমিরুদ্দীন খাঁর কল্যাণে। গ্রামোফোন কোম্পানির প্রশিক্ষক হিসেবে জমিরুদ্দীন খাঁর কাছে গান শিখে রেকর্ডও করেছেন কমলা।
নজরুলের সান্নিধ্য ও শিক্ষাও কমলাকে সমৃদ্ধ করেছে। নজরুলের কাছে কমলার সংগীত-ঋণ কম নয়। সেসব কথা তিনি কখনো-সখনো স্বীকারও করেছেন। তবে কমলার সংগীত-সতীর্থরা নানাভাবে তার উল্লেখ করেছেন। আব্বাসউদ্দীন আহ্মদ জানিয়েছেন : “কাজিদা তখন গ্রামোফোন কোম্পানীর জন্য গান লিখে চলেছেন। আঙুরবালা, ইন্দুবালা, হরিমতি, কানন দেবী, কমলা ঝরিয়া, ধীরেন দাস, কমল দাশগুপ্ত, মৃণালকান্তি ঘোষ সবাই তাঁর গানের জন্য ‘কিউ’ লাগিয়ে বসে থাকে” (‘আমার শিল্পী জীবনের কথা’, পূর্বোক্ত; পৃ. ৪৯)। আঙ্গুরবালাও উল্লেখ করেছেন : ‘ওনার [নজরুল] রচিত ও সুরারোপিত গান উনি নিজেই শেখাতেন। পরিচয়ের পর আমি নিয়মিত ওনার কাছে শিখতে লাগলাম। আমাদের সঙ্গে ইন্দুবালা ও কমলা ঝরিয়াও শিখত। প্রত্যেকের জন্যে পৃথক সময় নির্দিষ্ট ছিল’ (প্রশান্ত দাঁ : ‘বাংলার বুলবুল আঙ্গুরবালা’, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ১৯৯৩; পৃ. ৪৫)। কিন্তু বেশি দিন এই সম্পর্ক বজায় থাকেনি – তুলসী লাহিড়ীর কারণে তা ছিন্ন হয়। নজরুলের যে-কটি গান তিনি রেকর্ড করেন তার মধ্যে গোটা দশেক গানের হদিশ পাওয়া গেছে (১. ‘পরদেশী বঁধু ঘুম ভাঙ্গায়ো চুমি’ : জুন ১৯৩২, ২. ‘সেই কথারই জানাজানি’ : জুলাই ১৯৩২, ৩. ‘রুম ঝুম বাদল আজি বরষে’ : আগস্ট ১৯৩২, ৪. ‘মন লহ নিতি নাম রাধাশ্যাম’ : ডিসেম্বর ১৯৩২, ৫. ‘তোমার সৃষ্টি মাঝে হরি’ : ডিসেম্বর ১৯৩২, ৬. ‘কাহারই তরে কেন ডাকে’ : ১৯৩৩, ৭.  ‘হোরি খেলে নন্দলালা’ : ফেব্র“য়ারি ১৯৩৪, ৮. ‘কেন করুণ সুরে হৃদয়পুরে’ : জুন ১৯৩২, ৯. ‘হরি, নাচত নন্দদুলাল’ : সেপ্টেম্বর ১৯৩৩, ১০. ‘জাগো তন্দ্রামগ্ন জাগো ভাগ্যহত’ : ১৯৩৫)। শেষ তিনটি যথাক্রমে ‘সাবিত্রী’, ‘মীরাবাঈ’ ও ‘প্রতাপাদিত্য’ রেকর্ড-নাট্যের গান। নজরুলের গান গেয়ে বেশ নামও করেন তিনি। একবার একজন তাঁর কাছে জানতে চেয়েছিলেন নজরুলের সুরে গান গাওয়ার বিষয়ে। জবাবে তিনি বলেছিলেন : ‘তা গেয়েছি, তবে গোড়ার জীবনে। পরে লাহিড়ী মশাই আমাকে আলাদা করে তালিম দিয়েছেন, কত কী শিখিয়েছেন! পরে তো আমি বেশিরভাগ ওঁর গানই গেয়েছি। তবে কাজীদার দানও ভুলবো না। কত বড়ো মানুষ, কত অফুরন্ত ওঁর গানের ভাণ্ডার। কথায় কথায় মুখে মুখে গান বাঁধতে পারতেন, এমন ক্ষমতা’ (শ্যামল ঘোষ : ‘স্মৃতি সত্তা নাট্য’, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০৩; পৃ. ১৮৫)।
তুলসী লাহিড়ীর ভূমিকার কথা না বললে কমলা ঝরিয়ার জীবনের কথা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঝরিয়া থেকে কলকাতায় আসার দু-এক বছরের মধ্যেই কমলার জীবন গেঁথে যায় তুলসী লাহিড়ীর সঙ্গে। তিনি হয়ে ওঠেন কমলার ‘কর্তা’ এবং সেই সুবাদে অভিভাবক ও নিয়ন্ত্রক। এর ফলাফল কমলার জন্যে মোটের ওপর ভালোই হয়েছিল Ñ বেতার, গ্রামোফোন, মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে তিনি যে যুক্ত হতে পেরেছিলেন তার মূলেও ছিলেন তুলসী লাহিড়ী। কমলার ব্যক্তি ও শিল্পীজীবনে তুলসী লাহিড়ীর প্রভাব ও অন্তরঙ্গ সম্পর্কের গভীরতা কতোটুকু সে-বিষয়টি জানা বিশেষ জরুরি।
চার
ঝরিয়া থেকে কলকাতায় গ্রামোফোনে গান দিতে এসে তুলসী লাহিড়ীর সঙ্গে কমলার পরিচয়। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে অন্তরঙ্গতার এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে তুলসী লাহিড়ী দ্বিতীয় স্ত্রী শান্তিলতা এবং চার পুত্র ও দুই কন্যাকে ছেড়ে কমলার সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। দুজনের এই সম্পর্ক তুলসী লাহিড়ীর পরিবার মেনে নেন – মেনে নিতে বাধ্য হন – প্রকাশ্যে তাঁরা কখনো এ নিয়ে কোনো অভিযোগ তোলেননি। এদিকে-ওদিকে ভাসতে ভাসতে শেষ পর্যন্ত লাহিড়ী-পরিবারের ঠাঁই হয় কলকাতার ৩৬ কৃষ্ণপুর রোডের এক বস্তির খোলার ঘরে – দুঃখ-দারিদ্র্য আর অবহেলায় তাঁদের জীবন কাটতে থাকে। অপরদিকে তুলসী লাহিড়ী কমলাকে নিয়ে নানা ভাড়াবাড়িতে থাকার পর শেষে তাঁকে কলকাতার ১৫৮/সি রাসবিহারী এভিনিউয়ের একেবারে সদর রাস্তার পাশে একটি বেশ বড়োসড়ো তিনতলা বাড়ি কিনে দেন। ঝরিয়া থেকে কমলার এক ভাই এসে সপরিবার এই বাড়িতে ওঠেন। এখন এখানে বাস করেন কমলার ভাইঝি মীরা সিং ও তাঁর কন্যা দেবযানী কুণ্ডু।

পাঁচ
তুলসী লাহিড়ী ও কমলা ঝরিয়া সমাজ-সম্পর্কের বাইরে এক কীর্তিময় শিল্পের সংসার গড়ে তুলেছিলেন। তিরিশের যুগের প্রায় গোড়া থেকেই যে সম্পর্কের সূচনা তা তুলসী লাহিড়ীর মৃত্যুকাল অর্থাৎ ১৯৫৯ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ছিল। কমলার শিল্পী ও ব্যক্তিজীবনেও এই গুণী মানুষটি ছায়ার মতো ছিলেন। কমলারও তাঁর প্রতি ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও নির্ভরতা। শুভ জোয়ারদার হাবু লাহিড়ীর কাছ থেকে জেনেছিলেন, কমলা-তুলসী লাহিড়ীর একসঙ্গে বাস করা নিয়ে কিছু প্রতিক্রিয়া ও ফ্যাসাদও দেখা দিয়েছিল। বিক্ষুব্ধ প্রতিবেশীদের কেউ রংপুরে তুলসী লাহিড়ীর পিতা সুরেন্দ্রনাথ লাহিড়ীকে জঘন্য ভাষায় চিঠি লিখে জানান : ‘আপনার পুত্র একটি বাজারের রাঁড় নিয়ে একসঙ্গে থেকে যা কাণ্ড করছে তা চোখে দেখা যায় না। এতে করে পাড়ায় ভদ্রলোকের বাস করা দায় হয়ে যাচ্ছে।’ এই ধরনের চিঠি পেয়েও সুরেন্দ্রনাথ বিচলিত হননি। সতর্ক করার জন্যে চিঠিটি তিনি শুধু পুত্রকে কলকাতায় পাঠিয়ে দেন।
ঘটনা শুধু এখানেই থেমে থাকেনি – তা অচিরেই সহিংস রূপ নেয়। ফলে ১৯৩৬ সালের দিকে কলকাতার চিৎপুরে হিজ মাস্টার্স ভয়েসের যে রিহার্সেল-বাড়ি বিষ্ণু-ভবন – তার সামনেই ভাড়াটে গুণ্ডাদের হাতে তুলসী লাহিড়ীকে লাঞ্ছিত হতে হয়। এর পেছনে সেই সময়ের সংস্কৃতিজগতের ঈর্ষাকাতর কারো কারো ইন্ধন ছিল। এই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা ও আরো কেউ কেউ। তুলসী লাহিড়ীর ছেলে দীনেন্দ্রচন্দ্র ওরফে হাবু লাহিড়ী এ-বিষয়ে বলেছেন : ‘কমলা ঝরিয়ার লেবেলটা তারা তুলসীবাবুর কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল’ (‘শব্দ শাব্দিক’ : তুলসী লাহিড়ী জš§শতবর্ষ স্মরণ, সংখ্যা-১, উত্তর ২৪ পরগনা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৯৫; পৃ. ২৫)। সামাজিক নিন্দা-সমালোচনা, পারিবারিক অশান্তি-অস্বস্তি, দৈহিক লাঞ্ছনা ও মানসিক পীড়ন সত্ত্বেও তুলসী লাহিড়ীর কাছ থেকে কমলাকে কেউ দূরে সরিয়ে নিতে পারেনি।
কমলা ঝরিয়া ও তুলসী লাহিড়ীর অন্তরঙ্গতা যে কতোখানি গভীর ছিল সে-সম্পর্কে পুত্র হাবু লাহিড়ী খোলামেলা মন্তব্যে জানিয়েছেন : ‘কমলা ঝরিয়ার সঙ্গে তাঁর [তুলসী লাহিড়ী] স্বামী-স্ত্রীর থেকেও বেশী সম্পর্ক ছিল। তখনকার দিনে প্রত্যেক গুণী শিল্পীর এ ধরনের গাইয়ে মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক থাকত। নইলে সঙ্গীত জগতের competition অনেক সময় আর্থিক লোক্সানের সামনে পড়তে হত’ (‘শব্দ শাব্দিক’ : তুলসী লাহিড়ী জš§শতবর্ষ স্মরণ, সংখ্যা-১, পূর্বোক্ত; পৃ. ২৫)।
১৯৫৯-এর ২২ জুন তুলসী লাহিড়ীর জীবনাবসান হয় কমলা ঝরিয়ার রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাড়িতেই। দীর্ঘকালের সঙ্গী ও অভিভাবককে হারিয়ে কমলা শোকে কাতর হয়ে পড়েন। কাছের মানুষ ইন্দুবালা তাঁর ২৩ জুন তারিখের ডায়েরিতে লিখেছেন : ‘আজকের পত্রিকায় তুলসী লাহিড়ী মহাশয়ের মৃত্যুসংবাদে বড়ই ব্যথা পেলাম, তিনি আমার বাবু ছিলেন, কত লোকের কাছেই না আমার গানের নিন্দা করতেন। (ঝরিয়া) কমলার আজ বড় মনকষ্ট।’ তুলসী লাহিড়ীর মৃত্যুর পর কমলা গানের জগৎ থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন। অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন তিনি, বাইরের যোগাযোগও কমে আসে। এরপর তাঁর আর কোনো নতুন রেকর্ড বের হয়েছে বলে জানা যায় না। মৃত্যুর বছর তিনেক আগে শেষ বড়ো কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যখন গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়া লিমিটেডের পক্ষ থেকে তাঁকে ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ দিয়ে সম্মানিত করা হয়।
ছয়
সংগীতের জগতে কমলা ঝরিয়া – গ্রামোফোন রেকর্ড, বেতার, থিয়েটার, রাজদরবার, সংগীতবাসর – নানা মাধ্যমে নিজেকে উপস্থাপিত করেছেন। এমনকি চলচ্চিত্রও বাদ যায়নি। অবশ্য চলচ্চিত্রে অভিনয়ের চাইতে গানের অংশই প্রধান ছিল।
যতো আঙ্গিকে – যতো ভাষায় কমলা গান করেছেন – তাঁর এই সৃষ্টিবৈচিত্র্যের সঙ্গে আর কোনো শিল্পীর তুলনা হতে পারে না। এইচএমভি-র ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ সম্মাননা প্রদান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মারকপত্রে (৬ এপ্রিল ১৯৭৬) কমলা ঝরিয়া সম্পর্কে যে-কথা বলা হয়, শিল্পী হিসেবে তা তাঁর চুম্বক-মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হতে
পারে :
… এখন বয়সে ছয় দশক পেরিয়ে এসেছেন শিল্পী, সংগীতক্ষেত্র থেকে প্রায় অবসর নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর অনুপম কণ্ঠমাধুর্য মূর্ছিত হয়ে আছে অগণিত শ্রোতার কানে, তন্ময় হৃদয়ে, বিহ্বল আনন্দিত অভিজ্ঞতায়। চারশোর বেশি রেকর্ডে এই লাবণ্যভঙ্গিম কণ্ঠ চিরবন্দী হয়ে গেছে। বাঙলা ছাড়া হিন্দী উর্দু পাঞ্জাবি মারাঠি ভাষাভাষীর কানেও পৌঁছিয়ে দিয়েছেন তিনি তাঁর কণ্ঠসুধা – এত বেশি ভারতীয় ভাষায় সেকালের আর কোনো মহিলা শিল্পী বোধহয় গান করেন নি। চলচ্চিত্রেও তিনি সংগীতাভিনয়ে অংশগ্রহণ করেছেন গৌরবের সঙ্গে। বেতারকেন্দ্রের শিল্পী হিসাবেও দীর্ঘ তিন দশক ধরে তাঁর কণ্ঠের সঙ্গে সমগ্র দেশ পরিচিত। কীর্তনের বিনম্র ভক্তিরসাতুর আত্মনিবেদনে, মাথুরের অশ্র“কাতর বিরহ-বেদনায় শ্রীমতী কমলা দেবীর কণ্ঠ শুষ্ক হৃদয় বিগলিত করে।
সারা জীবন কমলা দেবী অবশ্য বিচিত্র ধরনের গান গেয়েছেন। বাঙলা ঠুংরি গানে তাঁর কণ্ঠ ছিল সতেজ সাবলীল, রাগাশ্রিত বাঙলা গানেও তিনি পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। তাছাড়া গজল ঢপকীর্তন বাউল ভাটিয়ালি নজরুলগীতি – সবক্ষেত্রেই শ্রীমতী কমলার কণ্ঠ ছিল অনায়াস-নৈপুণ্যে বিস্ময়বাহী।…
বাঙলা গানের বহুশাখায়িত বৈচিত্র্যে সহজ সঞ্চরণ করেও শেষ পর্যন্ত কমলা দেবী তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ গীতি-অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন করুণাঘন শ্রীকৃষ্ণের স্নিগ্ধ চরণতলে – সেইখানেই বোধহয় তাঁর সাধনার চরম পরিপূর্ণতা অনুভব করে তিনি কৃতকৃতার্থ হয়েছেন। পদাবলী কীর্তনের আসরেই তাঁর জনপ্রিয়তা সর্বাধিক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ভাববৃন্দাবনের লীলামাধুরী অনুধ্যান করেই তাঁর জীবনপথের তোরণদ্বারের দিকে তিনি শান্তচরণে এগিয়ে চলেছেন।

সাত
বাংলা গানের এক আশ্চর্য প্রতিভা কমলা ঝরিয়া। আধুনিক, কীর্তন, ভজন, রামপ্রসাদী, আগমনী, বিজয়া, ভক্তিমূলক, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতি, রাগপ্রধান, নজরুলগীতি, চিত্রগীতি, গজল – নানা ধরনের গান তিনি গেয়েছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অশোককুমার সরকার এইচএমভি-র ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ প্রদান উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় (৬ এপ্রিল ১৯৭৬) কমলা ঝরিয়ার পরিচিতি প্রসঙ্গে তাঁর কণ্ঠ-ঐশ্বর্য এবং গায়কির স্বাতন্ত্র্য ও অনন্যতার কথা বলেছেন এইভাবে : ‘সহজ ও স্বচ্ছন্দ গান করার ভঙ্গী, স্পষ্ট উচ্চারণ এবং সবচেয়ে বড় কথা, গান শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই আশ্চর্য সুরময় পরিবেশ সৃষ্টি; এ সবই কমলা দেবীর মতো নিষ্ঠাবতী শিল্পীরই বৈশিষ্ট্য হতে পারে।’
কমলা ঝরিয়ার গ্রামোফোনের ভুবনে প্রবেশ এইচএমভি-র কল্যাণে। তাঁর প্রথম রেকর্ড এখান থেকেই বের হয়। এইচএমভি-র
তালিকা-পুস্তিকায় (ক্যাটালগ) প্রতি মাসে নতুন রেকর্ড ও শিল্পীর পরিচিতি ছাপা হতো। ক্যাটালগের প্রচ্ছদে শিল্পীদের ছবি স্থান পেতো। এইচএমভি-র ক্যাটালগে শিল্পী কমলা ঝরিয়া সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করা হয়, তা উদ্ধৃত করলে তাঁর শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে এমন কয়েকটি মন্তব্য পেশ করা হলো।
‘ঝরিয়ার শ্রীমতী কমলা অতি অল্প দিনেই আপনাদের আদরণীয়া হইয়াছেন তাঁহার মধুর কণ্ঠ ও অপূর্ব্ব গাহিবার প্রণালীর গুণে’ – এইচএমভি-র এই ঘোষণা (ডিসেম্বর ১৯৩১) যে অতিকথন নয় তার সাক্ষ্য মেলে কমলার গানের আবেদন ও লোকপ্রিয়তায়। খুব অল্প সময়েই তিনি গ্রামোফোন রেকর্ডের জগতে স্থায়ী আসন করে নেন। জুলাই ১৯৩৩ এইচএমভি থেকে কমলা ঝরিয়ার দুখানি গানের রেকর্ড বের হয় : ‘দূর থেকে চেয়ে দেখে ভরে না আঁখি’ ও ‘বল শতদল চাঁদ হেরে চাঁদমুখ ঢাকা কি ছিল’। একটু উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই এ-সম্পর্কে বলা হয়েছে : ‘মিস্ কমলার সুরেলা কণ্ঠে নৃত্য-চটুল ছন্দের এই গান দুইখানি ফুলের পাতলা ঠোঁটের হাসিটুকুর মতই সুন্দর – তাহার উপর বাঁশী ও স্বরোদের সহযোগীতা শুনিলে মনে হয় যেন চাঁদের সোহাগে গরবী ফুলবধূ দখিনা বায়ের সাথে তালে তালে দুলিতেছে’ (‘নূতন বাংলা রেকর্ডের তালিকা’ : এইচএমভি, জুলাই ১৯৩৩)। ডিসেম্বর ১৯৩৩ প্রকাশিত কমলার আরেকটি আধুনিক গানের রেকর্ডের পরিচিতি এই রকম : ‘জনপ্রিয় গায়িকা মিস্ কমলা সুকবি তুলসী লাহিড়ী মহাশয় রচিত এই দুইখানি গান স্বরোদ সহযোগে কত সুন্দর গাহিয়াছেন শুনুন। গায়িকার এই নূতন রেকর্ডখানি সুর, লয়, তাল সকল দিক দিয়াই অপূর্ব্ব শ্রীমণ্ডিত হইয়াছে’ (‘His Master’s Voice’ : ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত নতুন রেকর্ডের তালিকা, ডিসেম্বর ১৯৩৩)।
কীর্তন গানেই সবচেয়ে বেশি নাম করেছিলেন কমলা। জুন ১৯৩৪-এ তাঁর প্রথম কীর্তনের রেকর্ড বের করে এইচএমভি। ‘সখি কো কহু আওয়ব মাধাই’ ও ‘(মাধব) বহুত মিনতি করু তোয়’। এই গান সম্পর্কে তালিকা-পুস্তিকায় লেখা হয়েছিল : মিস্ কমলার কীর্ত্তন গান রেকর্ডে এই প্রথম প্রকাশিত হইল। গান দুইখানির বিষয় ‘বিরহ’ – গায়িকার মধুর কণ্ঠে গানের ভাষা অপূর্ব্ব শ্রীমণ্ডিত হইয়াছে (‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস নূতন রেকর্ড’, জুন ১৯৩৪)। এই বছরেরই নভেম্বরে বেরুলো যে বৈষ্ণবপদের গীতরূপ তা শ্রোতার মনকে আরো স্পর্শ করলো। তুলসী লাহিড়ী
সুর-যোজনা করেন এই জোড়া-কীর্তনের : ‘যোজন মন মাহ’ ও ‘সখি কহতি কানুর পায়’। কমলার কণ্ঠের এই কীর্তন কেমন আবেদন সৃষ্টি করেছিল সে-সম্পর্কে জানা যায় :
শ্রীমতী কমলার গান আজকাল কোন বিশেষণের অপেক্ষা রাখে না। চাঁদের আলো যে সুন্দর, বনের কোকিলের কুহুধ্বনি যে মনোহারী এ কথা ব’লে বোঝাবার দরকার হয় না। গতবার শ্রীমতী কমলার দুটি ভাটিয়ালী গান আমাদের চোখে অশ্র“ হয়ে দুলেছে, এবারে তাঁর দুটি কীর্ত্তন শোনাচ্ছি।
কীর্ত্তন বাঙ্লার প্রাণের গান। বাঙ্লার জলে স্থলে, গগনে পবনে, রাঙা পথের ধূলিতে যে প্রেমের চন্দনরেণু ছড়িয়ে রয়েছে, কীর্ত্তন গান সেই অবিনশ্বর প্রেমের মধুর মন্ত্র। তাই কীর্ত্তন আজও পুরাণো হয় নি। শ্রীমতী কমলা প্রাচীন বৈষ্ণবকবির পদাবলী গেয়েছেন। দু’টি গান যেন প্রেম-বিহ্বলা রাধিকার অশ্র“-সজল দু’টি আঁখি।… (‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস নূতন বাংলা রেকর্ড’, নভেম্বর ১৯৩৪)।
‘সুধীকণ্ঠী গায়িকা কমলাবালার ভজন গান শ্রোতৃবর্গের অত্যন্ত আদরের সামগ্রী’ – এই মন্তব্য করা হয় তাঁর ‘চারু চরণ চারণ চিত্ত চোর বনোয়ারী’ ও ‘ব্রজ বধূগণ দুকূল হরণ রাস রসবিহারী’ ভজন গানের রেকর্ড প্রকাশ উপলক্ষে। কীর্তনের মতো তাঁর ভজনও বিশেষ সমাদর পেয়েছিল।
লোকগান – বিশেষ করে ভাটিয়ালি গান গেয়েও তিনি বেশ নাম করেন। অনেক ভাটিয়ালি গানই তিনি গেয়েছেন – এর মধ্যে প্রখ্যাত গীতিকার প্রণব রায়ের লেখা ও তুলসী লাহিড়ীর সুর-দেওয়া দুটি গানের কথা বিশেষ করে বলতে হয়। ‘ও বিদেশী বন্ধু’ এবং ‘যেথায় দূরে গাঙের চরে ফুল ফুটেছে থরে থরে’ – এই গান দুটির রেকর্ড বের হয় ১৯৩৪-এর শেষদিকে। এ-বিষয়ে এইচএমভি-র তালিকা পুস্তিকায় উল্লেখ করা হয় :
ভাটিয়ালীর উদাস করা সুর বাঙলার ঘর-ছাড়া মাঝি-মাল্লার, অকূল পথের পথিকের। এই ভাটিয়ালী সুরে বিজড়িত নদী-জলের সজল করুণা, স্রোতে ভেসে-যাওয়া নীড়ের তরে বিহগীর কান্না-কূজন। কূল ভাঙ্গা নদীর সাথে স্রোত-সম-চঞ্চল বেদরদী বন্ধুর যেন কোথায় মিল আছে; নদী ভাঙ্গে ঘরের কূল, বন্ধু ভাঙ্গে মনের কূল! তাই
নাইয়া-মাঝির গানে, কূলে প্রতীক্ষমানা কুলবধূর গানে ফুটে ওঠে সেই সকরুণ অভিযোগ। কবি প্রণব রায়ের এই ভাটিয়ালী গানের বাণীতে মূর্ত্তি ধরে ফুটে উঠেছে কুলবধূর সেই মিনতি, সেই বেদনাতুর কাতরতা। গেয়েছেন বীণা-বিনিন্দিত কণ্ঠে শ্রীমতী কমলা। গানের বাণী ও সুর যেন গলা ধরাধরি করে কাঁদছে বিজন নদীকূলে বসে।’ (‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস : সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে প্রকাশিত নূতন বাংলা রেকর্ড’, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪)।
এই একই সালের অক্টোবর মাসে শৈলেন রায়ের কথা, কৃষ্ণচন্দ্র দে ও ধীরেন দাসের সুরে যে দুটি ভাটিয়ালি গান এইচএমভিতে রেকর্ড হয় (‘এল আবার ফাগুন মাস’ ও ‘আমার মন নিয়েছে কাড়ি’) তা ছিল দ্বৈতকণ্ঠের – কমলা ঝরিয়া গেয়েছিলেন ‘লোককান্ত সুর-শিল্পী’ ধীরেন দাসের সঙ্গে। এখান থেকে তাঁর যেসব পল্লীগীতির রেকর্ড বের হয়, তা যথেষ্টই শ্রোতা-সমাদর লাভ করে – ‘কুল মজালি ঘর ছাড়ালি’, ‘বন্ধু বিদেশে গেল’ এবং এই রকম আরো কিছু গানের কথা উল্লেখ করা যায়।
এই প্রসঙ্গে ঝুমুর গানের কথাও এসে যায়। পুরুলিয়ার ঝুমুর গানের প্রখ্যাত শিল্পী সিন্ধুবালা দেবী লোক-গবেষক দীপঙ্কর ঘোষের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় (১১ এপ্রিল ২০০০) জানান, কমলা ঝরিয়ার সঙ্গে তিনি ঝুমুর গান করেছেন পুরুলিয়ার কাশীপুর রাজবাড়িতে। কমলা রাজার আমন্ত্রণে মাঝেমধ্যেই সেখানে যেতেন, একনাগাড়ে বেশ কিছুকাল ছিলেনও। ঝুমুর গানেও কমলা ঝরিয়ার ভালো দখল ছিল। সিন্ধুবালা আলাপ প্রসঙ্গে বলেছেন : ‘… কমলাও ঝুমুর গাইত। পাহাড়িয়া ঝুমুরগুলা যা গাইতো উÑদারুণ।’ গ্রামোফোন কোম্পানি – কী এইচএমভি কী মেগাফোন কেউই কমলার কণ্ঠের ঝুমুর গান রেকর্ডে ধরে রাখেননি। ফলে আমরা এক অমূল্য সংগীত-সম্পদের শ্র“তি-সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছি।
কমলা ঝরিয়া চলচ্চিত্রে অভিনয়, সেইসঙ্গে গানও করেছেন।
রেকর্ড-নাটক ও রেকর্ড-গীতিতে অংশ নিয়েছেন। জানুয়ারি ১৯৩৫-এ এইচএমভি তিন খণ্ডে ‘প্রীতি উপহার’ নামে একটি কমিক নাটিকার রেকর্ড বের করে। এতে কাজী নজরুল ইসলাম, তুলসী চক্রবর্তী, ধীরেন দাস, নিভাননী, বীণাপাণি, সরযূবালা ও হরিমতীর সঙ্গে কমলা ঝরিয়াও ছিলেন। এইচএমভি-র বারোটি রেকর্ডে স¤পূর্ণ ‘মীরাবাঈ’ গীতি-আলেখ্যর প্রধান শিল্পী ছিলেন কমলা ঝরিয়া। ‘প্রতাপাদিত্য’ নাট্যপালাতেও কণ্ঠ দিয়েছেন তিনি।
এইচএমভি থেকে তাঁর নানা অনুষঙ্গের – যেমন গজল, কাওয়ালি, ভজন, না’ত, ক্বাসিদা, গীত, ঠুম্রির রেকর্ড প্রকাশ পায়। তিনি যেসব হিন্দি ছবিতে (‘সার্কাস কুইন’, ‘মতওয়ালী মীরা’, ‘স্নেহবন্ধন’, ‘সেবা’) কণ্ঠ দেন তারও কিছু কিছু রেকর্ড এখান থেকে বের হয়।

আট
১৯৩২-এ প্রতিষ্ঠিত হয় স্বদেশি রেকর্ড কোম্পানি ‘মেগাফোন’। মেগাফোনের স্বাপ্নিক ও রূপকার ছিলেন বরিশালের জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ (জে. এন. ঘোষ)। গ্রামোফোন-সামগ্রী ও বাদ্যযন্ত্র-বিক্রেতা এই কর্মী-পুরুষের মেধা ও শ্রমে অল্পদিনেই মেগাফোন কোম্পানি দাঁড়িয়ে যায়। এইচএমভি-র সঙ্গে শিল্পী-সম্মানীর বিষয় নিয়ে নজরুলের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ফলে নজরুলের নেতৃত্বে বেশ কিছু শিল্পী-কুশলী এইচএমভি ছেড়ে চলে আসেন। নজরুলের সঙ্গে এঁরা যোগ দেন নতুন প্রতিষ্ঠিত মেগাফোন কোম্পানিতে। আরো যাঁরা আসেন তাঁদের মধ্যে হীরেন বসু, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামীর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। হীরেন বসু কানন দেবীকেও নিয়ে আসেন এখানে। কিছু পরে তুলসী লাহিড়ী ও কমলা ঝরিয়াও যুক্ত হন মেগাফোন কোম্পানির সঙ্গে। অল্পদিনেই মেগাফোন হয়ে ওঠে বাংলা ও বাংলার বাইরের সেকালের নামী শিল্পী-কুশলীদের মিলনকেন্দ্র।
কমলা ঝরিয়া ও মেগাফোন ছিল একে অপরের পরিপূরক। কমলার গ্রামোফোন রেকর্ড-জীবনের প্রথম পর্ব কেটেছে হিজ মাস্টার্স ভয়েসে – আর দ্বিতীয় পর্ব মেগাফোনে। কমলার পরিপূর্ণ সাংগীতিক মেধা বিকাশের ক্ষেত্রে – জনপ্রিয়তা অর্জনে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথা স্মরণ করতেই হয়। আবার অন্যদিকে কমলাও ছিলেন মেগাফোনের কলা-লক্ষ্মী – অমূল্য সম্পদ। মেগাফোনে তাঁর সংগীত-প্রতিভার সবটুকু তিনি উজাড় করে দিয়েছিলেন। কী গাননি তিনি – কীর্তন, বিজয়া, আগমনী, রামপ্রসাদী, আধুনিক থেকে শুরু করে ভজন, টপ্পা, ঠুম্রি, খেয়াল – নাট্যপালাতেও গেয়েছেন – ফিল্মের গানও রেকর্ড করেছেন। বাংলা তো ছিলই তারপরে উর্দু-হিন্দি-পাঞ্জাবি ও আরো আরো ভারতীয় ভাষায় রেকর্ডে গান দিয়েছেন এখানে। মেগাফোনকে প্রচুর ব্যবসা দিয়েছিলেন কমলা। রেকর্ড-যুগের অবসান হলেও মেগাফোন আজো কমলা ঝরিয়ার গান বাঁচিয়ে রেখেছে ক্যাসেট, সিডি ও ডিভিডির মাধ্যমে। তবে সেই পুরনো রমরমা অবস্থা আজ আর নেই। সেকালের কথা ও কাহিনি আজ দূরের স্মৃতি। পুরনো দিনের শিল্পীদের সংগীত-শ্রোতারা যেমন মেগাফোনও তেমনি ভুলতে বসেছে। মেগাফোনের গানের বাড়িতে এই প্রতিষ্ঠানের মূল সংগীত-ব্যক্তিত্ব নজরুল অনুপস্থিত, কমলার স্মৃতি বলতে রিহার্সেল-রুমে ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ও কানন দেবীর পাশাপাশি তাঁর একটি বড়ো ছবি ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে।
কমলার মেগাফোনের অনেক গানই কাল থেকে কালান্তরে পৌঁছেও শ্রোতার মনকে অধিকার করে রেখেছে। ‘কালজয়ী’ এসব গান সম্পর্কে এই বিশেষণকে কেউ বাড়িয়ে বলা কথা এমন বলতে পারেন না। ‘রজনী প্রভাতে মাতা যশোমতী’, ‘তোমারি গরবে গরবিনী হাম’, ‘মাধব বহুত মিনতি করি তোয়’, ‘গোকুল ছাড়ি যবহু’, ‘না হ দরশ সুখ’, ‘সজনী অব কি করকি’, ‘কানু পরিবাদ মনে ছিল সাধ’, ‘সখি না বলা বচন আন্’, ‘কাতরা রাধিকা দেখিয়া অধিকা’, ‘কহিও কানুরে সই’, ‘ঐ খেনে ধনী রোয়ি’, ‘ধিক্ ধিক্ তোরে নিঠুর’, ‘সই কে বলে পীরিতি ভাল’, ‘তুহু রহু নিকরুণ’, ‘কি মোহিনী জান বঁধু’ – এইসব কীর্তনের সুর-ব্যঞ্জনা মানুষকে ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যায়। ‘মা হওয়া কি মুখের কথা’, ‘মা আমায় ঘুরাবি কত’, ‘রইলি না মন আমার বশে’, ‘আমার হৃদ-কমল’, ‘চিন্তাময়ী তারা তুমি’, ‘মা গো আমার কপাল দোষী’, ‘মন গরীবের কি দোষ আছে’, – কমলার কণ্ঠে রামপ্রসাদের গান এক নতুন আবেদন তৈরি করেছিল।
ভক্তিমূলক ছাড়াও তাঁর আধুনিক বা কাব্যগীতির কথাও স্মরণ করতে হয়। এই প্রসঙ্গে বাংলা ঠুম্রি, খেয়াল ও গজলের কথাও এসে যায়। মেগাফোন থেকে এমন অনেক গানই বেরিয়েছিল – চটজল্দি উল্লেখ করা যায় ‘আমি এলাম মালা দিতে’, ‘ফুল-সম বঁধু তব হাতে’, ‘জান কি সজনী’, ‘পথ-পানে চাহে’, ‘বিরহ-মিলনেরই ডালা’ ও ‘স্বপন ভেঙ্গো না, যেও না বঁধুয়া চলি’-র কথা। শেষের গান দুটির রেকর্ড প্রকাশ পায় এপ্রিল ১৯৩৯। ‘মেগাফোন রেকর্ড’-এর ক্যাটালগে রেকর্ডটির পরিচিতিতে কমলা ঝরিয়া ‘বাঙ্লার শ্রেষ্ঠ গায়িকা’ হিসেবে মান পান। সেইসঙ্গে মন্তব্য করা হয় : ‘সুকণ্ঠ, সূক্ষ্ম সৌন্দর্য্য এবং সুষ্ঠু-অভিব্যক্তি এই তিনটির সর্ব্বাঙ্গসুন্দর সমাবেশে এই রেকর্ডখানি’।
কমলার গায়কিতে এক ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়েছিল আকালের গান গেয়ে। তুলসী লাহিড়ীর কথা ও সুরে কমলা মার্চ ১৯৪৬-এ মেগাফোন থেকে দুটি গান রেকর্ড করেন : ‘শোন্ রে শোন্ বাংলা দেশের কাঙ্গাল চাষী ভাই’ এবং ‘ভুলো না রেখ মনে বাঁচবে যত কাল/ সোনার দেশে কেন এল পঞ্চাশের আকাল’। এই গণসংগীত দুটি সেই সময়ে অত্যন্ত আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। মেগাফোনের ‘বাসন্তী গীতি-মাল্য’ (মার্চ ১৯৪৬) তালিকা-পুস্তিকায় আকালের এই গান সম্পর্কে উল্লেখ করা হয় : ‘১৩৫০ বাঙ্গালার পল্লীজীবনে যে করুণ স্মৃতি রেখে গেছে তারি মর্ম্মস্পর্শী অভিনব রূপ পাবেন সুগায়িকা শ্রীমতী কমলার এই দুখানি অপরূপ গানে। কথা ও সুর দিয়ে দেশের সত্যকার ব্যথা ও বেদনার পরিচয় দেবার চেষ্টা
রেকর্ড-জগতে এই প্রথম।’
এইচএমভি-র মতো মেগাফোনেও কমলা বেশ কিছু ফিল্মের গান রেকর্ড করেন। মনে পড়বে ‘অভিজ্ঞান’ ছবির গান : ‘মালা যদি দিলে ভুলে’ ও ‘তোমার কাছে চাইতে বঁধু’। ‘তনুর দেউলে কাঁদে দেবতা’ ও ‘কাজল-কালো হরিণ-চোখের স্বপন আমায় ডাকে’ – কমলার গাওয়া দেবযানী ছবির এই গান দুটি সম্পর্কে মেগাফোনের তরফ থেকে বলা হয় : ‘মতিমহল থিয়েটার্সের’ দেবযানী বাণীচিত্রের শ্রেষ্ঠ গান দুটি আমরা প্রকাশ করলাম। গায়িকার গানের পরিচয় নিষ্প্রয়োজন কারণ যাঁরা ছবিটি দেখেছেন তাঁরাই গান দুটির প্রশংসা করেছেন’ (‘মেগাফোন রেকর্ড’ : ডিসেম্বর ১৯৩৯)। কমলার হিন্দি ফিল্মের গানের রেকর্ডও মেগাফোন বের করেছিল। অভাগিন ছবিতে কমলার গাওয়া ‘তুম সে মাঙ্নে মে লাজ আয়ে’ ও ‘জিগর কে ঘাওকো উপরকা মরহাম’ – এইসব গান একসময় লোকের মুখে মুখে ফিরতো। শুধু বাংলা নয়, সেই সঙ্গে অন্য ভাষাতেও তাঁর রেকর্ড বের হয়, ফলে বাংলা গানের যেসব শিল্পী ভিন্ন ভাষার গান গেয়ে সর্বভারতীয় খ্যাতি ও স্বীকৃতি পেয়েছিলেন, সেই তালিকায় কমলা ঝরিয়ার নামও যুক্ত হয়।
নয়
গ্রামোফোনে গান দেওয়ার কিছু আগে থেকেই তিনি বেতারে গান গাইতে শুরু করেন। কলকাতায় প্রথম বেতারকেন্দ্র স্থাপিত হয় ১৯২৭ সালে ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন নামে। প্রথম থেকেই নিয়মিত তিনি বেতারে সংগীত পরিবেশনের সুযোগ পান। গ্রামোফোন কোম্পানিতে গান রেকর্ড করার বিষয়টি সহজ হয়ে ওঠে বেতারশিল্পী হওয়ার সুবাদে। বেতারে কমলার গান গাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অশোককুমার সরকার। টানা তিন দশক তিনি বেতারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অল্ ইন্ডিয়া রেডিও-র সুবর্ণ জয়ন্তীতে ২৬ আগস্ট ১৯৭৭ ইন্দুবালা-আঙ্গুরবালার সঙ্গে কমলা ঝরিয়াও সংবর্ধিত হন ও স্মারক-সম্মাননা লাভ করেন।
বলতে গেলে তুলসী লাহিড়ীর আগ্রহ ও উৎসাহেই কমলা ছায়াছবিতে নামেন। তাঁর গানের সঙ্গী ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা, হরিমতী এবং আরো দু-একজন আগেই ফিল্মে অভিনয় শুরু করেছিলেন। এঁরা একসঙ্গেও কয়েকটি ছবিতে সহশিল্পী হিসেবে কাজ করেন। কমলার ক্ষেত্রে অভিনয়ের চেয়ে গানই মুখ্য হয়ে উঠেছিল। তুলসী লাহিড়ীর কাহিনি নিয়ে প্রিয়নাথ গাঙ্গুলি ১৯৩৩-এ যমুনা পুলিনে নামে একটি ছবি তৈরি করেন। এই ছবিতে বিশাখা চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই কমলা ঝরিয়ার চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ। এরপর তিনি বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে অন্তত গোটা বিশেক ছবিতে অভিনয় করেন : বিল্বমঙ্গল (১৯৩৩), পাতালপুরী (১৯৩৫), মন্ত্রশক্তি (১৯৩৫), স্বয়ম্বরা (১৯৩৫), তরুবালা (১৯৩৬), সোনার সংসার (১৯৩৬), বাঙ্গালী (১৯৩৬), একটি কথা (খণ্ডচিত্র, ১৯৩৬), সাথী (১৯৩৮), দেবযানী (১৯৩৯), ঠিকাদার (১৯৪০), ফিভার মিকচার (১৯৪০), বিজয়িনী (১৯৪১), অবতার (১৯৪১), স্টেপ মাদার, নাইট বার্ড ইত্যাদি। অহীন্দ্র চৌধুরী, দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধায়, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, ধীরাজ ভট্টাচার্য, কে. এল. সায়গল, নির্মলেন্দু লাহিড়ী, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, তুলসী লাহিড়ী, চন্দ্রাবতী, রাজলক্ষ্মী, ছায়া দেবী, কানন দেবী – সেকালের থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের এইসব খ্যাতিমান শিল্পীদের সঙ্গে কমলা ঝরিয়ার অভিনয়ের সুযোগ মিলেছিল।
থিয়েটারের সঙ্গেও যোগ ছিল কমলার। মূলত তুলসী লাহিড়ী জড়িত ছিলেন এমন কিছু নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। গান গাইতে হয় এমন চরিত্রেই তিনি বেশির ভাগ অংশ নিয়েছেন। মঞ্চে তাঁকে যেমন দেখেছিলেন সে-বিষয়ে তাঁর এক গুণগ্রাহী শ্যামল ঘোষ জানিয়েছেন :
আঙুরবালা-ইন্দুবালা দুজনেই এক সময়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করেছেন। তবে তা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তবে আমি কিন্তু কমলা ঝরিয়ার অভিনয় একবার দেখেছিলাম তাঁর পড়ন্তবেলায়। বিশ্বরূপা থিয়েটারে আরোগ্য নিকেতন নাটকে। চরিত্র তেমন কিছু নয়, কিন্তু কয়েকখানা গান ছিল। আর সে গান যে কী মনোরম গেয়েছিলেন। অনায়াস ভঙ্গিতে গাওয়া তাঁর সেই কীর্তনাঙ্গের গান অডিটোরিয়ামের শেষ আসন পর্যন্ত ললিত-মাদকতা তৈরি করেছিল। কণ্ঠের সেই দাপট এই মাইক্রোফোনের যুগের কোনো শিল্পী কল্পনাও করতে পারবেন না। চিৎকার নয়, যেন ঘরে বসেই গাইছিলেন, অথচ কী স্পষ্ট কী মেলডি! (‘স্মৃতি সত্তা নাট্য’, পূর্বোক্ত; পৃ. ১৮৪)।

দশ
কমলা তারিফ পেয়েছেন বাঙালি সংগীতরসিক শ্রোতার, বাংলা মুলুকের বাইরেও – কিন্তু কোনো রাষ্ট্রীয় খেতাব বা পুরস্কার তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। অবশ্য এসব নিয়ে তাঁর কোনো খেদও তেমন ছিল না। অতি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। ‘ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শান্ত ও শালীন আচরণে সকলকেই মুগ্ধ করেছেন। তাঁর আত্মপ্রত্যয় ছিল প্রচুর কিন্তু তিনি আত্মসচেতন ছিলেন না’ (দৈনিক যুগান্তর : ২১ ডিসেম্বর ১৯৭৯)। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখেছেন এমন একজনের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে : ‘কমলা ঝরিয়া একটু গ্রাম্যধরনের নরম প্রকৃতির মহিলা, যিনি নিজের কথা তেমন করে গুছিয়ে বলতে পারেন না, অথবা বলতে চান না’ (‘স্মৃতি সত্তা নাট্য’, পূর্বোক্ত; পৃ. ১৮৪-৮৫)। ইন্দুবালার মতো প্রগল্ভ বা গোছানো বা খোলামেলা নন, আঙ্গুরবালা-কানন দেবীর মতো মেকি বংশগৌরব বা আভিজাত্যের ভানও ছিল না, – শান্ত-সৌম্য-বিনয়ী-আত্মমুখী-নিভৃতচারী অথচ আন্তরিক-সৌজন্যপরায়ণ কমলার সঙ্গে কিছুটা যেন যূথিকা রায়ের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। যূথিকা রায়কে খুব কাছ থেকে দেখে এই সাদৃশ্যের তুলনা মনে আসে।
শ্যামল ঘোষ নজরুলের গানের তিন কন্যা – ইন্দুবালা-আঙ্গুরবালা-কমলা ঝরিয়াকে নিয়ে বাইশ মিনিটের যে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন  ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ নামে – তাতে খুব সংক্ষিপ্ত পরিসরে হলেও কমলার শিল্পীসত্তা ও জীবনকথার অন্তরঙ্গ আভাস মেলে। ২৪ জানুয়ারি ১৯৭৫ এই তথ্যচিত্রের উদ্বোধনী-প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন সত্যজিৎ রায়, সুরলোকের তিন কন্যার হাতে সম্মান-উপহার তুলে দেওয়ার জন্যে। আমন্ত্রিত না হয়েও সাগ্রহে হাজির হয়েছিলেন সুরামত্ত ঋত্বিক ঘটক। ইন্দুবালা-আঙ্গুরবালা ছিলেন, কিন্তু কমলা ঝরিয়া যে-কোনো কারণেই হোক অনুষ্ঠানে থাকতে পারেননি। এককালের এই সাড়া জাগানো তিন শিল্পী জীবনের শেষপর্বে প্রায়-বিস্মৃতির আড়ালেই চলে গিয়েছিলেন। এই তথ্যচিত্র যেন বিস্মৃতির ধূসর জগৎ থেকে তাঁদের নতুন করে আলোয় নিয়ে এলো। ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ তাই দর্শকদের মন কেড়েছিল – গণমাধ্যমের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কলকাতার প্রধান কাগজগুলোতে – এমনকি কৃত্তিবাস-এও এর প্রশংসাসূচক আলোচনা বেরিয়েছিল, এখানে কলম ধরেছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।
এগারো
তাঁর সমকালের শিল্পীদের স্মৃতিচর্চায় কমলা ঝরিয়ার প্রসঙ্গ তেমন করে আসেনি। একেবারে জীবনের শেষের দিকে কোন কোন শিল্পীর গান ভালো লাগে এমন প্রশ্নের জবাবে আঙ্গুরবালা বলেছিলেন : ‘… কে. মল্লিক, কমলা ঝরিয়া, মালবিকা কানন ও মান্না দের গান ভাল লাগে ভিন্ন ভিন্ন কারণে’ (প্রশান্ত দাঁ : ‘বাংলার বুলবুল আঙ্গুরবালা’, কলকাতা, পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ১৯৯৩; পৃ. ৬১)। আবদুল আহাদ তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন : ‘আমরা… রেকর্ড বাজিয়ে বাজিয়ে সে যুগের সব বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীদের গান শুনতাম। কে. সি. দে, আঙুরবালা, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া, শচীনদেব বর্মণ, কানন দেবী, কে. মল্লিক – এঁদের গান সময় পেলেই শুনতাম’ (‘আসা যাওয়ার পথের ধারে’, ঢাকা, অগ্রহায়ণ ১৩৯৬; পৃ. ১৫)। অন্তত এইসব সাক্ষ্য থেকেও বেশ বোঝা যায়, সেকালে বাংলা রেকর্ড-সংগীতের শিল্পী হিসেবে কমলা কতটা জনপ্রিয় ছিলেন।
বারো
তুলসী লাহিড়ী কমলার জীবনবীণার তারটি বেঁধে দিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার পর কমলা প্রায় বছর কুড়ি বেঁচে ছিলেন। অনেকটাই নিঃসঙ্গ-সাথীহারা – বাইরের জগৎ তাঁর কাছে ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসে – একসময় প্রায় ছিন্ন হয়ে পড়ে এই সম্পর্ক। শেষজীবন নানা রোগশোকে কাটে। শ্বাসকষ্টে মাঝে-মধ্যেই পীড়িত হতেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত তিনবার করোনারি থ্রম্বসিসে আক্রান্ত হন। বিদায়ের দিনটি ছিল তাঁর গানের দিন – ‘প্রকাশ্যে গান করা বন্ধ করলেও যখনই মন চেয়েছে গান গেয়েছেন আপন মনে নিজের আনন্দে। মৃত্যুর দিন সকালে অনেকক্ষণ গান গেয়েছেন, বারবার বলেছেন : ‘আজ খুব গান করতে ইচ্ছে করছে’ (সাপ্তাহিক দেশ : ৫ জানুয়ারি ১৯৮০)।
এইচএমভি-র পক্ষ থেকে ৬ এপ্রিল ১৯৭৬ কলকাতার রবীন্দ্রসদনে আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কানন দেবী, পঙ্কজকুমার মল্লিক, যূথিকা রায় ও কমলা ঝরিয়াকে ‘গোল্ডেন ডিস্ক’ দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানের স্মারকপত্রে তাঁর সম্পর্কে লেখা ছোটো এক পরিচিতি-রচনার উপসংহারে যে-কথা কটি বলা হয়েছিল তা উল্লেখ করেই এই কমলা-উপাখ্যান শেষ করি :
সংগীতের আসর থেকে অবসর নিয়েও… তিনি নির্লিপ্ত নিষ্কামভাবে সংসারের বেদির ওপর জীবনের শেষ নৈবেদ্য অর্পণ করেছেন, আর আমাদের দান করেছেন সংগীতের এক সম্পন্ন বর্ণোজ্জ্বল উত্তরাধিকার। বাঙালির গানে শ্রীমতী কমলা ঝরিয়া একটি প্রদীপ্ত যুগের দেবদেউলের প্রোজ্জ্বল হোমশিখা।

ব্যক্তিঋণ
অমিত গুহ (সূরাজ-শ্র“তিসদন, কলকাতা), কমলকুমার ঘোষ (মেগাফোন কোম্পানি, কলকাতা), রন্তিদেব মৈত্র (কলকাতা), ড. স্বপন বসু (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা), ড. বারিদবরণ ঘোষ (কলকাতা), ড. বাঁধন সেনগুপ্ত (দক্ষিণ ২৪ পরগনা), ড. দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায় (কলকাতা), ড. শুভ জোয়ারদার (কলকাতা), শ্যামল ঘোষ (কলকাতা), প্রদীপ্ত রায় (কলকাতা), প্রশান্ত দাঁ (কলকাতা), শুভ ভট্টাচার্য (আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা), স্বপন সোম (কলকাতা), তপনকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (হাওড়া), আসাদুল হক (ঢাকা), আবদুস্ সাত্তার (ঢাকা), বাবু রহমান (ঢাকা), লালিম হক (কুষ্টিয়া), ড. তপন বাগচী (বাংলা একাডেমী, ঢাকা)।

Leave a Reply

*