logo

একলা দুজন চিত্রকর : রবীন্দ্রনাথ, অমৃতা

স ন ৎ কু মা র  সা হা

এই ভূখণ্ডর চিত্রকলা নিয়ে যাঁদের কৌতূহল, এঁদের কথা তাঁদের সবার জানা। তবু লিখি, কারণ তা অমৃত সমান। এবং অমৃতের তৃষ্ণা অশেষ। দুজনের বিষয় একসঙ্গে তোলার কারণ – অমত্মত আমার যা অজুহাত – তা তাঁদের সাদৃশ্য নয়, বৈপরীত্য, যদিও দুদিকেই বিস্ময় অপার। জীবনাবসান দুজনেরই ১৯৪১-এ। এবং ছবির জগতে বিচরণ –  না, শুধু বিচরণ বলা ভুল, অকৃত্রিম আত্মানুসন্ধান ও বাসত্মবে তার প্রতিফলন, যেখানে বাসত্মব উপায় ও উপেয়, দুই-ই এবং প্রতিটি, আপন-আপন চেতনার বৃত্তে সৃষ্টি প্রতিভার বিপুল উদভাসের তাড়নায় – একই কালপর্বে, মোটামুটি গত শতকে বিশের দশকের শেষ থেকে আমৃত্যু অনুশীলনে। কিন্তু শুধু এটুকু বলায় মৌলিক বিস্ময়- এক আড়ালে পড়ে। সবাই জানি, রবীন্দ্রনাথ বেঁচেছিলেন ৮০ বছর, আর অন্যজন, এক অবাক করা নারী, অমৃতা শেরগিল, মাত্র ২৮ বছর। ১৯১৩-তে জন্ম তাঁর। এবং হয়ে ওঠা একবারে ভিন্ন এক পরিবেশে। এখানেও বোধ হয় ভুল হলো, পরিবেশ এক নয়, অসংখ্য। প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর নতুন হয়ে ওঠা। তাঁর বেদনা, উল্লাস ও উত্তেজনা, কিছুই তিনি গোপন করেন না। যখন ছবি আঁকেন তখন তাতে তাঁর সবটুকু উজাড় করে ঢেলে দেন। আপন সত্তায় যখন ফুটে ওঠেন, তারপর থেকে বাঁচেনও সেইভাবে। রবীন্দ্রনাথের বেলায় এমনটি বলা যায় না।

আমরা জানি, প্রথমে পিরালি ব্রাহ্মণ, তারপর বাবা দেবেন্দ্রনাথের প্রবর্তনায় পুরো ব্রাহ্ম, এক বিচ্ছিন্ন পরিবেশে কেটেছে তাঁর শৈশব ও বাল্যকাল। ব্রাহ্ম-আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সমাজ-সংস্কার। কিন্তু নীতিশূন্য উচ্ছৃঙ্খলতাতে তাঁর বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় ছিল না। বরং আদর্শ রচনার তাগিদ তাতে প্রবল ছিল। অল্প বয়সে মাতৃহারা রবীন্দ্রনাথ বড় হয়েছেন ভৃত্যশাসিত আপন জগতের নিঃসঙ্গতায়। কখনো বেচাল হননি। তখনকার ব্রাহ্মসমাজের প্রধান পরিবারে বড় হয়েছেন। বাজে কোনো দৃষ্টামত্ম খাড়া করার সুযোগ ছিল না। তেমন কিছু করলে পরনিন্দা-লোলুপ বাঙালি রসনায় তা হাজারগুণ বিসত্মৃতি পেত। বাইরে থেকে ব্রিটিশ রাজত্বে রক্ষণশীল ভিক্টোরীয় রম্নচিবাগিশ আচরণের প্রভাবও তাঁদের ওপর পড়েছিল। পরে বাবার নির্দেশে আদি ব্রাহ্মসমাজের পরিচালনার ভারও তাঁকে নিতে হয়। এইসব গ–র ভেতরে তাঁর অলোকসামান্য প্রতিভার বিকাশ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদে তাঁর আস্থা ছিল না। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞানে য়োরোপীয় অবদান তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৮৮৫ সালে যখন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি থেকে বাচ্চাদের জন্যে বালক পত্রিকা বের হয়, তখন তাতে উপযুক্ত রসদ জোগান রবীন্দ্রনাথ। তাঁর কবিত্বপ্রতিভা বিকশিত হতে শুরম্ন করে তার আগে থেকেই। প্রথম প্রকাশিত কাব্য সন্ধ্যাসংগীত ১৮৮১ সালে, প্রায় সমসময়ে প্রভাতসংগীত ও ভানুসিংহঠাকুরের পদাবলী, গীতিনাট্য কালমৃগয়া ও বাল্মীকি প্রতিভাও। এসবেই নতুনত্ব ছিল। সাহিত্যিক সংবেদনা ও শিল্পসংযমও ছিল। উনিশ শতক শেষ হওয়ার আগেই সমসময়ের বাংলা সাহিত্যের তিনি প্রধান লেখক। এবং অন্যতম প্রধান সামাজিক ব্যক্তিত্ব। কথাগুলো এ কারণে বলা যে, একুশ শতকের কাছাখোলা-রম্নচিবিকারে রবীন্দ্রনাথকে সং সাজিয়ে আসর জমানোর খেমটা পালা যে আজ কোনো কোনো চালবাজ বাজারে ছাড়ছেন, তাদের পেছনে বাসত্মব ঘটনার বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই। দামেত্ম ও বিয়াত্রিচেকে নিয়ে প্রাচীন সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের নিজেরই একটি বহুল পঠিত প্রবন্ধ আছে। বিয়াত্রিচে ও দামেত্মর যোগাযোগ সেভাবে কোনোদিনই ঘটেনি। এই বিয়াত্রিচেকে যে দামেত্ম তাঁর কাব্যলক্ষ্মী করেছেন, তাতে কোথাও কোনো কলঙ্কের দাগ পড়েনি। রবীন্দ্রনাথের চিঠিপত্র সবই সংরক্ষিত। এতটুকু গোপনতার প্রয়োজন তাঁর হয়নি। ছিঁচকে নেংটি ইঁদুরেরা সে-সবেই দাঁত বসাচ্ছেন। আর কানকাটা রকবাজের দল ভুঁড়ি নাচিয়ে হরিবোল-হরিবোল ডাক ছাড়ছেন।

যা বলতে চাই তা হলো, রবীন্দ্রনাথের জীবন, সাহিত্য ও শিল্পবোধ বরাবর সমলয়ে বাঁধা ছিল। তাতে যে কখনো-কখনো রক্ষণশীলতার সঙ্গে তিনি আপস করেননি, তা নয়। মেয়েদের বিয়ে দিতে তিনি বাঁধা সড়কে হেঁটেছেন। খেসারত দিয়েছেন শুধু তিনি নন, তাঁর মেয়েরাও। ‘আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন’, বলেছেন তিনি একেবারে শেষ বেলায়। কিন্তু কখনো অসততার আড়ালে আশ্রয় নেননি। আত্মপ্রকাশে কোথাও কোনো কুণ্ঠাকে প্রশ্রয় দেননি। শুধু নিশ্চিত হতে চেয়েছেন, সবার সামনে যে আত্মপ্রকাশ, তা শিল্প হয়ে উঠছে কি না। অস্বীকার করা যায় না সময়ের সঙ্গে তা ভোল পালটেছে। তিনিও নিজেকে সেই অনুযায়ী প্রস্ত্তত করেছেন। অথবা তাঁর অমত্মর্জাত প্রতিভাই তাঁকে সেই দিকে ঠেলেছে। ‘একী কৌতুক নিত্য নূতন/ওগো কৌতুকময়ী,/আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে/বলিতে দিতেছ কই।’ (অমত্মর্যামী, চিত্রা) – এ শুধু কথার কথা নয়, তাঁর সত্য অনুভবের ও চারিত্র্য শুদ্ধতার অকপট উচ্চারণ। এই মৌল অবস্থান থেকে কখনো তাঁর বিচ্যুতি ঘটেনি। যদিও নিজেকে তিনি বদলেছেন বারবার। তাই জীবনের শেষ প্রহরে যখন তিনি পুরোদস্ত্তর চিত্রকর, তখনো তা কোনো ভান নয়। সব আবরণ ঘুচিয়ে ফেলে তাঁর অমত্মর্গত সম্ভাবনার শেষটুকু ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা। সত্য কথা, উৎসাহ ছিল বাইরে থেকে। ১৯২৪-এ বুইনেস আইরেসে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এদিকে তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি সায় দেন না। কদিন ভেবে মনস্থির করেন, ছবিও তিনি আঁকবেন। তবে আর সবকিছু বাদ দিয়ে নয়। তার পরও যা তিনি লিখেছেন, কবিতা, উপন্যাস, নৃত্যনাট্য, প্রবন্ধ, সবেতেই ধরা পড়ে তাঁর পথিকপরাণের যাত্রা। সমামত্মরালে চলে ছবি আঁকা। যেন অগ্নিগিরির উদ্গিরণ (কথাটা অবনঠাকুরের)।

অমৃতা শেরগিলের তুলনা বরং চলে উল্কার সঙ্গে। ওই ছোট্ট জীবনটায় বুদ্ধি-বিবেচনা দানা বাঁধার পর থেকেই যেন ছুটে চলেছেন। কোথাও কোনো স্থিরতা নেই। মা-বাবার মিশ্র বিয়ে। বাবা অভিজাত শিখ, উমরাও সিং শেরগিল মজিথিয়া; আর মা, হাঙ্গেরিয়ান, তাও আবার ইহুদি-ক্যাথলিক জর্মন পরিবারের, নাম, মেরি আঁতোনিয়েত গটেসম্যান; অপেরায় গান করেন। অমৃতার জন্ম হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে। জীবনের প্রথম আট বছর তাঁর সেখানেই কেটেছে। আচার-আচরণে তারই ছাপ। সংস্কারের পিছুটান নেই। ভারতবর্ষে আগমন তারপর। কিন্তু থিতু হন না। অমৃতসর-বুদাপেস্ট যাতায়াতের ভেতরেই তাঁর হয়ে ওঠা। মা-বাবার বনিবনা হয় না। নিত্য ঝগড়াঝাঁটি। তাঁর মনের ওপর তার রেখাপাত গভীর। ক্ষণিকতার ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ সেখানে জমাট বাঁধে। ইচ্ছাকৃত নয়। ইচ্ছাকে অতিক্রম করে। তা স্থায়ী হয়। ব্যক্তিগত বাসত্মব জীবনাচরণে ও অতুলনীয় শিল্প-প্রতিভায় মেশে।

ষোলো বছর বয়সে আবার তাঁর য়োরোপে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা নিয়ে ফিরে আসা। এবার প্যারিসে। চিত্রকলায় পারদর্শী হতে। তার পরের পাঁচটি বছর তাঁর কেটেছে লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতায়। সেইসঙ্গে য়োরোপীয় মানদ–ই অসাধারণ বলে গণ্য হওয়ায়। ব্যক্তিগত আচরণে দুর্নাম ও প্রতিভায় অলজ্জ সুন্দরের অকুণ্ঠ প্রকাশ সমানতালে এগোয়। শুধু যথেচ্ছ পুরম্নষসঙ্গে নয়, উভকামিতাতেও তিনি জড়ান। কিন্তু সবকিছুই ক্ষণিকের উন্মত্ততা। মুহূর্তের আয়োজন, আর মৃৎপাত্রের মতো ফেলে যাওয়া। একসময় তাঁর স্বীকারোক্তি : ‘I am always in love, but fortunately for me and unfortunately for the party concerned, I fall out of love or rather fall in love with someone else before any damage can be done! You know the type of alcoholic who stops drinking at the messy stage?’

বিখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ম্যালকম মাগেরিজ অমৃতা ভারতবর্ষে ফিরে আসার পর একসময় তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৬ সালে তাঁর এক মমত্মব্যে পাচিছ : ‘Why I love Amrita is that she, like myself, is a bare soul, without any allegiance or beliefs or hopes, just a sense of animality, so strong that she can paint as I write reproducing bare forms of life without idealizing upwards or downwards. …’

আমরা অবাক হই না, যখন জানি তাঁর প্যারিস বাসকালে তিনি একবার অমত্মঃসত্ত্বা হন ও গর্ভপাত ঘটান। এটা তাঁকে বিমর্ষ করেছে, এমন কোনো তথ্য পাই না। ১৯৩৮-এ একবার হাঙ্গেরিতে গিয়ে তিনি তাঁর সম্পর্কিত ভাই একজন চিকিৎসক, ভিক্টর এগানকে বিয়ে করে দুজন একত্রে ফিরে এসে পারিবারিক জমিদারি সারায়াতে ঘর বাঁধেন। তবে ভিক্টরকে রাজি হতে হয়েছিল, অমৃতার ব্যক্তিগত স্বাধীন চলাফেরায় তিনি হস্তক্ষেপ করবেন না। তিন বছর পর ভিক্টরের চিকিৎসাধীনেই অমৃতার আকস্মিক মৃত্যু তাঁকে কিংবদমিত্মর চিরকালের নায়িকায় রূপামত্মরিত করে। জওহরলাল নেহরম্ন, এমনকি মহাত্মা গান্ধী তাঁদের শোক ও আক্ষেপ জানান।

অমৃতার ব্যক্তিমায়া ও একমুখী, এবং একরোখা, শিল্প-সাধনার সঙ্গে অনেকটা মেলে মেক্সিকান প্রতিভা, আর এক কিংবদমিত্ম, ফ্রিদা কাহলোর (১৯০৭-৫৪) সংগ্রাম, সমত্মাপ ও সার্থকতার। ফ্রিদা এক সাক্ষাৎকারে জানাচ্ছেন, ‘… my painting’s are… the most frank expression of myself, without taking into consideration either indgements or prejudices of anyone. I have painted little and without the least desire for glory or ambition, but with the conviction that before anything else, I want to give myself pleasure. অমৃতার বেলায়, বোধ হয় ফ্রিদার বেলাতেও, আরো একটু যোগ করা যায়, শুধু pleasure নয়, এক আত্মিক তাড়নার আনন্দ-যন্ত্রণাদিগ্ধ বাধ্যতা তাঁকে ছবি আঁকায় টেনেছে। এ-কথা রবীন্দ্রনাথের বেলায় ঠিক খাটে বলে মনে হয় না। অনেকটা খেলার ছলেই তাঁর ছবিতে মন দেওয়া। এবং তা সবসময়ই প্রশ্নবোধক। মূল্য বিচারের দিকে তিনি একেবারেই যাননি। শখ যখন তাগিদে রূপ নিয়েছে অথবা তাঁর নিহিতার্থ খোঁজায় তিনি ব্যসত্ম হয়েছেন, তখনো তিনি বুঝতে চেয়েছেন, এটা কি ঠিক হচ্ছে? আমরা ভুলি না, ওই তিরিশের দশকেই তাঁর সৃষ্টির অন্য পালাগুলোর কথা। মানব-বাসত্মবতায় সংকট ও সম্ভাবনার প্রশ্নগুলো সেসবে প্রকট। ‘আঘাতে-আঘাতে বেদনায়-বেদনায়’ তাঁকে তারা পর্যুদসত্ম করেছে।

এবার এই দুই চিত্রকর, রবীন্দ্রনাথ ও অমৃতার চিত্রকর্মের দিকে একটু নজর দিই। প্রথমে রবীন্দ্রনাথ। কারণ শুরম্নতেই তিনি বিশ্বখ্যাতির উচ্চাসনে। অমৃতা সেখানে আগন্তুক।

 

দুই

 

রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে যাঁদের কৌতূহল, তাঁরা সবাই জানেন, তবু শুরম্নতে ওই কথাগুলোই আবার বলি, ১৮৯৩ সালে ইন্দিরা দেবীকে তিনি লেখেন, ছিন্নপত্রে আছে – ‘ঐ যে চিত্রবিদ্যা বলে একটা বিদ্যা আছে, তার প্রতিও আমি সর্বদা হতাশ প্রণয়ের লুব্ধ দৃষ্টিপাত করে থাকি – কিন্তু আর পাবার আশা নেই, সাধনা করবার বয়স চলে গেছে। অন্যান্য বিদ্যার মতো তাঁকেও সহজে পাবার জো নেই – তাঁর একেবারে ধনুক-ভাঙা পণ – তুলি টেনে টেনে একেবারে হয়রান না হলে তার প্রসন্নতা লাভ করা যায় না। একলা কবিতাটিকে নিয়ে থাকাই আমার পক্ষে সবচেয়ে সুবিধে – বোধ হয় যেন উনিই আমাকে সব চেয়ে বেশি ধরা দিয়েছেন…’

আপাতদৃষ্টে এখানে কথায় কোনো জটিলতা নেই। আমরা তাঁর মনোজগতের অকপট ছবি একটা পাই। কিন্তু একে
স্থান-কালে মিলিয়ে নিতে গেলেই নানা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তাদের সমাধান খুঁজে পাই না। এখনো না। তিনি বলছেন, ‘চিত্রবিদ্যা বলে একটা বিদ্যা আছে, -’ তাতে অনুমান করি, এই বিদ্যার মৌলিক কাঠামো একটা তাঁর মাথার ভেতরে আছে। হয়তো সত্যি সত্যিই এ নিয়ে কোনো আস্থার জায়গা তখন তাঁর কাছে প্রশ্নাতীত ছিল। এবং সেখান থেকেই আরেক অনুরূপ চিঠিতে রবি বর্মার পৌরাণিক ছবিতে তাঁর মুগ্ধতার কথা তিনি জানাচ্ছেন। অনুমান করি, একই নান্দনিক বোধ থেকে তাঁর লেখা চিত্রার বহুল পঠিত দুটো কবিতা, ‘উর্বশী’ (১৮৯৫) ও ‘বিজয়িনী’ (১৮৯৬)। দুটোতেই রয়েছে ‘সুন্দরের’ জয়গান। এবং এই ‘সুন্দর’ বাসত্মবের অনুকৃতি (Naturalism) পরম পরাকাষ্ঠা। এই ‘সুন্দর’ কি তাঁর ওই ‘চিত্রবিদ্যা’র ও সারকথা? এবং তা ব্যক্তিগত কল্পনায় স্বরূপের সাধারণত্বকে আয়ত্তে আনা? সেই সাধারণত্বতে কি ব্যক্তিক চৈতন্যের স্বতঃস্ফূর্ত পূর্ণ অধিকার? বোধের জগতে তার বিশেষ কোনো রূপ সঙ্গে সঙ্গে সাড়া জাগায়? নাকি এ পূর্বনির্ধারিত প্রত্যয়; এবং ওই বিদ্যা-শৃঙ্খলায় আরোপিত?

এখানে একটা বিষয় খেয়াল করি। ১৮৩৫-এ বেন্টিংক-মেকলে সংযোগে এদেশে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা ব্যবস্থা যে শুধু চালু হয় তা নয়, তাতে নৈর্ব্যক্তিক নিয়ম-শৃঙ্খলার প্রবর্তন হয়, এবং পাঠ্যসূচিরও একটা সাধারণ মান নির্ধারিত হয়। চারম্নকলারও সেখানে আলাদা ভূমিকা থাকে, যেমন থাকে মেয়েদের গার্হস্থ্যবিজ্ঞানের। প্রতিটি বিষয়ে স্বীকৃত মানের শিক্ষকের প্রয়োজন পড়ে। চিত্রকলাতেও। তার প্রয়োজন মেটাতে খোলা হয় কলকাতায় বেঙ্গল আর্ট স্কুল। কিন্তু তারা কী শেখাবে? এখানেই তৈরি হয় অ্যাকাডেমিক আর্টের বিষয়সূচি, এবং তা থাকে সম্পূর্ণত য়োরোপীয় চিত্রকলার ইতিহাসনির্ভর। সেখানে এক গুরম্নত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রাখে রেনেসাঁ পর্বের শিল্প, এবং তার পশ্চাতে প্রাচীন গ্রিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য। বাসত্মব-বিভ্রম রচনা করা ও লাবণ্যে ব্যঞ্জনায় ইন্দ্রিয়ানুভূতির সর্বোত্তম প্রকাশ ঘটানো তাদের লক্ষ্য। এই অ্যাকাডেমিক আর্ট কল্পনায় প্রত্যক্ষণের মোক্ষ রূপ খোঁজে। কোনো বিচ্যুতিকে তা প্রশ্রয় দেয় না। এমনটি ভাবা অস্বাভাবিক নয় যে, রবীন্দ্রনাথ ‘উর্বশী’ ও ‘বিজয়িনী’ রচনার সময় তাঁর স্মৃতিতে লন্ডন ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারিতে দেখা রেনেসাঁ চিত্রকর বতিচেলিস্নর ‘দ্য বার্থ অফ ভেনাস’ ছবিটি প্রেরণা জুগিয়ে থাকবে। ভারতীয় চিত্রকরদের ভেতরে এই সময়ে রবি বর্মা সবচেয়ে প্রভাব বিসত্মারী। ভারতবর্ষীয় পুরাণের বিভিন্ন বিষয় বেছে নিয়ে তিনি তাঁর চিত্রমায়ায় তাদের জীবমত্ম করে তোলেন। কোনো আর্ট স্কুলে তিনি যাননি। তবে য়োরোপীয় ছবিতে অঙ্গসংস্থান ও রঙের ব্যবহার তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। ছবিতে সেই অনুযায়ী তাদের প্রয়োগ ঘটান। মজার এই, য়োরোপীয় দর্শকরা যেমন তাতে মুগ্ধ হন, ভারতীয় দর্শকরাও তেমনি। তাঁরা তাঁদের পৌরাণিক চরিত্রদের কল্পরূপ বাসত্মবে দেখেন। এবং এই দর্শককুল গোটা ভারতবর্ষের সর্বত্র, গ্রামে-গঞ্জেও ছড়ানো। তার অন্যতম কারণ রবি বর্মার বৈষয়িক বিবেচনা।

তখন রঙিন ছবি মুদ্রণযন্ত্রে যথাযথ ছাপাবার ব্যবস্থা সর্বোত্তম দক্ষতায় চালু হয়ে গেছে। রবি বর্মা এই রকম মুদ্রণযন্ত্রের ব্যবহারে তাঁর পৌরাণিক ছবি লাখ লাখ ছেপে সসত্মা দরে বাজারে ছাড়েন। শুধু অভিজাত দোকানে নয়, শহর-গঞ্জের ফুটপাতেও বিক্রেতারা ছবির পসরা সাজিয়ে বসেন। কেবল রবি বর্মার নয়, অসংখ্য অনামা শিল্পীর ছবিও। নানা রকমের। রবি বর্মার খ্যাতি ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে বিদেশেও। বিষয়ও সাধারণ গণমানুষের ঐতিহ্যাশ্রয়ী। সফল উদ্যোগপতি হতে তাঁর সময় লাগে না। এ কাজে তাঁর ভাই রাজা বর্মা ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও সহযোগিতা করেন। যেমন নাকি কুমোরটুলির মূর্তি গড়াবার কাজে। নতুন বোতলে পুরনো মদ যেন। চিত্রকলার নতুন আয়োজনে ব্যাপারটা মনে হয় সে রকম। অবশ্য বোতলটা বিদেশি; মদের রেসিপিও। কেবল বিষয় দেশি।

রবি বর্মা (১৮৪৮-১৯০৬) যখন মারা যান, তার আগেই কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। বিশেষ করে কলকাতায়। ১৮৯৬-তে কলকাতা আর্ট স্কুলের প্রধান হয়ে আসেন ইবি হাভেল। য়োরোপীয় অ্যাকাডেমিক আর্টের চর্চাকে তিনি এখানে প্রাথমিক বলে মেনে নিতে অস্বীকার করলেন। মোগল রাজপুত চিত্রকলার প্রচুর নমুনা তিনি সঙ্গে করে এনেছিলেন। তাঁর অভিমত, ভারতবর্ষের নিজস্ব শিল্পকলার ঐতিহ্য আছে। সে কেন পরানুকরণে কালক্ষয় করবে? এতে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। য়োরোপের দরজা বন্ধ করে দিয়ে চারম্নকলায় শিক্ষাদানে আপত্তি জানান নতুন গজিয়ে ওঠা অনেক চিমত্মাবিদ। তবে ১৯০৫-এ কার্জনের হুকুমে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে সব প্রতিবাদ সাময়িকভাবে ভেসে যায়। রবীন্দ্রনাথও পাশ্চাত্য বর্জনের মিছিলে নামেন। প্রতিভাবান চিত্রকর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর-পরিবার থেকে উঠে এসে হাভেলের পাশে দাঁড়ান। প্রাচ্য শিল্প বা ওরিয়েন্টাল আর্টের একটা শাখা তাঁরা এগিয়ে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হন। তাঁদের অনুপ্রাণিত করে অজমত্মার ফ্রেসকো, মোগল, রাজপুত ও পাহাড়ি মিনিয়েচার শিল্প। এঁদের অনুসরণ করেন মুকুল দে, অসিত হালদার, নন্দলাল বোস, এঁরা। মোটেই নির্দ্বান্দ্বিক হয় না। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর বিতর্ক তুমুল আকার নেয়।

মাধ্যম কিন্তু সাময়িক পত্র-পত্রিকা। আগেই বলেছি, মুদ্রণ শিল্পে অসামান্য উন্নতি ঘটায় চিত্রকরদের ছবির আলো-ছায়া-রং সব মিলিয়ে হুবহু অনুলিপি ছাপানো মোটেই আর দুঃসাধ্য ছিল না। তখনকার মেধাবী চিত্রকরদের আঁকা ছবি প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী এসব পত্রিকা নিয়মিত ছাপত। আসলে এটাই ছিল ছবির সবার সামনে আত্মপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। প্রবাসী অ্যাকাডেমিক ও ওরিয়েন্টাল দু-ধরনের ছবিই ছাপত। ভারতবর্ষ তুলনায় রক্ষণশীল। তারা কেবল অ্যাকাডেমিক আর্টকেই প্রশ্রয় দিত। সুরেশচন্দ্র সমাজপতির সাহিত্য ছিল ঠাকুর পরিবারের চরম বিরোধী। সেই সূত্রে অবনীন্দ্রনাথের। অবনীন্দ্রনাথের বুদ্ধ ও সুজাতা ছবিতে উভয়েরই অঙ্গসংস্থান যথাযথ হয়নি – বুদ্ধের কান অহেতুক লম্বা, একই রকম সুজাতার হাত, এ অভিযোগ তুলে তাঁর রচনায় তিনি অবনীন্দ্রনাথের মু-পাত করলেন। সুকুমার রায়ও ন্যাচারালিস্ট বা অ্যাকাডেমিক আর্টের পক্ষে কলম ধরেন। এতে সমাজপতির উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। কারণ সুকুমার রায় ছিলেন ঠাকুর পরিবারের খুব কাছের ও পছন্দের মানুষ। অবনীন্দ্রনাথের মতে ছবি ‘ভাব’ প্রকাশের মাধ্যম। ভাবের প্রতিফলনে বিষয় যদি পুরোপুরি বস্ত্তনিষ্ঠ না থাকে, কিন্তু যথার্থ আবেগ ও মানসিক প্রতিক্রিয়া জাগায়, তবে তা শিল্পে রসোত্তীর্ণ। অন্যদিকে অ্যাকাডেমিক আর্টের অনুগামীরা বিষয়ের প্রত্যক্ষ রূপে যথাযথ থাকায় জোর দেন।

রবীন্দ্রনাথ এই বিতর্কে অংশ নেননি; তবে গভীর মনোযোগের সঙ্গে তাঁর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অনুসরণ করেন। অনুমান, কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধামেত্ম তিনি পৌঁছতে পারেননি। বরং ভেতরে ভেতরে সবটাই শূন্যগর্ভ বলে তাঁর মনে হয়। ১৯২১-এ য়োরোপে এসে তিনি জার্মানিতেও যান। তুলনায় ওখানেই তাঁর অনুরাগীদের সাড়া পেয়েছিলেন বেশি। তাঁর ৬০তম জন্মবার্ষিকীতে তিনি হবাইমারের জর্মন ন্যাশনাল থিয়েটারে তাঁর কবিতা পড়ে ও গান গেয়ে শোনান। ওখানে থাকাকালে বাওহাও অভিব্যক্তিবাদী (expressionist) চিত্রকর, কান্দিনস্কি, পল ক্লি, ঈটেন, মুশে, এঁদের সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। একটা কারণ, বাওহাও শিল্পীদের ভারতীয় মরমিয়াবাদ, বিশেষ করে উপনিষদে আগ্রহ। রূপের অমত্মরে ও রূপের বাইরে সার-সত্যের অন্বেষণ, যাতে কোনো আকারের দাসত্ব থাকে না, এই বোধের অনুরণন তাঁরা চিত্রকলায় ঘটাতে চান। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের কাজ দেখে মুগ্ধ হন, এবং পরের বছর কলকাতায় প্রদর্শনীর এক আয়োজন করেন।

এই বাওহাও শিল্পীদের কোনো প্রভাব কি রবীন্দ্রনাথের ওপর পড়েছিল? অনুমান হ্যাঁ, এবং না। ছবি আঁকায় কোনো প্রথাগত শিক্ষা রবীন্দ্রনাথের ছিল না। ওকাম্পো এদিকে তাঁকে মনোযোগী না করলে তিনি যে এ পথে কখনো আসতেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে ঠাকুর পরিবারের যে পরিম-লে তাঁর বেড়ে ওঠা, তাতে ছবি আঁকার চালচলনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ভালোই ছিল। তাঁর কলমের স্বেচ্ছাচারেও যে স্বতঃস্ফূর্ত ছন্দ আছে, এবং তা ছবিতে রূপামত্মরিত হতে পারে, এটা বোধ হয় তিনি আগে ভেবে দেখেননি। পরে যখন তিনি ছবি আঁকতে থাকেন, তখন স্মৃতির সঞ্চয় যখন যা সামনে আসে, তার ওপরেই রং ও রেখা টেনে চলেন। বাওহাও অভিজ্ঞতাও সেখানে একটা উপাদান। তবে বোধহয়, একমাত্র নয়। পথচলতি নানা পোস্টার, নানা বিজ্ঞাপন এসবও কখনো কখনো মনে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। তার প্রতিফলনে শুরম্ন করে তিনি অগ্রসর হয়েছেন, এমন উদাহরণ কম নেই। তবে ছবি কী চেহারা নিতে চায়, এ নিয়ে তাঁর ধারণা আগেই তৈরি থাকত, এমন মনে হয় না। প্রম্নসেত্মর উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহ যেভাবে এগোয়, তার সঙ্গেও কি মিল খুঁজে পাওয়া যায় না তাঁর আঁকা অনেক ছবিতে? ন্যাচারালিস্ট ও ওরিয়েন্টালিস্ট বিতর্কে কোনোদিকই তাঁকে টানেনি। এটা বোঝা যায় ১৯২৩-এ রক্তকরবীর অলংকরণে তিনি যখন গগনেন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হন। গগনেন্দ্রনাথ ওই দুই ঘরানার কোনোটিতেই ছিলেন না। পাশ্চাত্যে পিকাসো কিউবিজমে তখন সাড়া জাগিয়েছেন, গগনেন্দ্রনাথের ঝোঁক সেদিকে। এবং তিনি সফলও। রক্তকরবীর অলংকরণ আলাদাভাবেই আমাদের অভিনিবেশ দাবি করে। আরো একটা বিষয়, বোধ হয় সমাপতনই বলা যায়, কারণ রবীন্দ্রনাথ তখনো সচেতন চিত্রকর নন, এর পা-ুলিপির একটা পাতায় কাটাকুটি জোড়া লাগিয়ে তিনি যে এক অজানা উদ্ভট জন্তুর আকার তৈরি করেছেন, পরে তা তাঁর অন্যতম সেরা সৃষ্টি বলে গণ্য হয়েছে। মজা এই, ওই পাতার সংলাপের খসড়ার সঙ্গে কোথাও ওই জন্তুর এতটুকু যোগসূত্র নেই।

এই আলোচনায় সম্পূর্ণত অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটা বিষয় এখানে ছুঁয়ে যাই। তখন বাংলায় স্বদেশি আন্দোলনের কল্পপ্রতিমা ছিল খ–ত ও নির্বোধ। য়োরোপীয় রেনেসাঁর প্রেরণায় অতীতের যে ভাবমূর্তি তাঁরা রচনা করেন, তাতে আবেগ যতটা ছিল, বস্ত্তনিষ্ঠা ততটা নয় অথচ তাঁদের যে কোনো সচেতন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল, তাও নয়। বর্ণবিভাজন প্রথা অতীত ভারতেরই অবদান – বোধ হয় সবচেয়ে বীভৎস ও মারাত্মক অবদান। তারই সূত্র ধরে আসে সাম্প্রদায়িক বিভাজন। এ সবই যেন ধরে নেওয়া। অলঙ্ঘনীয়। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত সৎচিমত্মা ও সততার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু সমষ্টি জীবনে এর পরিণাম ভয়াবহ। স্বদেশি আন্দোলনের সেই খেসারত এখনো আমরা দিয়ে চলেছি। যেহেতু চিত্রকলা মানসমূর্তিকে চাক্ষুষ করায়, তাই এ বিষয়ে তাঁর অসচেতনা কম ক্ষতির কারণ হয় না।

পাঞ্জাবের প্রতিভাবান চিত্রকর আবদুর রহমান চুগতাই (১৮৯৭-১৯৭৫) অবনীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর ঋণের কথা আজীবন অকপটে স্বীকার করেছেন। অবনীন্দ্রনাথও মোগল ঐতিহ্যের অনুসরণ ছাড়াও ওমর খৈয়াম ও আরব্য রজনী-উপাখ্যান নিয়ে ধারাবাহিক ছবি এঁকেছেন। তবু তাঁর ‘ভারত মাতা’ ছবিই যেন অবনীন্দ্রনাথের কীর্তির শ্রেষ্ঠ পরিচয়। চুগতাই প্যান-ইসলামিক সচেতনতার বাইরে আসতে পারেননি। স্বদেশি ভাবনা চুগতাইয়ের জন্য কোনো জায়গা (space) তৈরি করতে পারেনি।

ফিরে আসি রবীন্দ্রনাথে। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আবার তাঁর দেখা পান ১৯২৬-এ। এবার প্যারিসে। তিনি অবাক হয়ে দেখেন, এখন রবীন্দ্রনাথ পুরোদস্ত্তর চিত্রকর। শৌখিনতার লেশমাত্র নেই। আত্মবিশ্বাসেও কোনো কমতি নেই। তবে কৌতূহল আছে – নিজেকে আরো ভালো করে জানার। ‘আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না’ – তিনি গেয়েছিলেন। (অবশ্য গান এক পা গিয়েই অন্যদিকে মোড় নেয়। তখন তা মানুষের নৈর্ব্যক্তিক আবহমান ধারায় মেশে)। এখানেও সেই জানার তাগিদ। এবং তার জন্যে সম্ভবত ওই সফরেই ভিয়েনায় গেলে ফ্রয়েডকে ডেকে তাঁর সঙ্গে কথা বলায় তাঁর আগ্রহ। তবে সাক্ষাৎকারের পর দুজনের কেউই কিছু বলেননি। অনুমান, তা ভালো জমেনি। দুজন দু-ধাতে গড়া। সে-সময়ের য়োরোপে জ্ঞানকা– আদি কারণ খোঁজার তাগিদটা ছিল জোরালো। মার্কস, ডারউন আগের শতকে এক এক দিক থেকে প্রাণের অভিযানের তাত্ত্বিক ধারণা খাড়া করেন। দুটোই বৈপস্নবিক। একই রকম কিছু পরে ফ্রয়েড মানুষের সব অভীপ্সাকে এক সূত্রে গেঁথে নির্জ্ঞানে সৃষ্টির আদিম লিপ্সায় নিয়ে গিয়ে মেলান। রবীন্দ্রনাথ একেশ্বরবাদী বটেন। তবে তার প্রকাশ দেখেন বিশ্ব-ব্রহ্মামেত্ম সর্বত্র। তাদের সমন্বয়ের সম্পূর্ণতাতেই তাঁর আনন্দ। ফ্রয়েডের তত্ত্বভূমিতে একে আনা যায় না। মনে হয়, যোগাযোগের ফল শূন্যই থেকে গেছে।

তবে অজানা এক রহস্য যে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে খেলা করেছে এ কথা প্রায় সবাই মেনে নেন। ওকাম্পো নিশ্চিত বুঝলেন, এ ছবি য়োরোপেও কদর পাবে। সেখানে তখন অবচেতনা ও পরাবাসত্মবতা নিয়ে আগ্রহ বেশ প্রবল। তা আদিমতার অভিসারী। বোদ্ধারা চিত্রকর রবীন্দ্রনাথের সহমর্মীই হবেন। তিনি তাই প্যারিসে পিগালে-আভা-গার্দ আর্ট গ্যালারির কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে ১৯৩০-এর ২ মে তাঁর ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করলেন। যেমন আশা করেছিলেন, সাড়া মিলল তার চেয়েও বেশি। ভ্যাবাচ্যাকাও খেলেন অনেকে। কারণ সৌম্য-শামত্ম কবি রবীন্দ্রনাথের যে ভাবমূর্তি, তার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। (খুঁটিয়ে পড়লে অবশ্য অনেক জায়গায় রূপের নয়, ভাবের মিল চোখে পড়বে।) পরাবাসত্মবতার এক তাত্ত্বিক, অঁরি বিদ্যু এই ছবিগুলোকে বললেন চিত্রকলার শুদ্ধতম প্রকাশ। প্রশিক্ষণের নামে কোনোরকম আরোপিত ধারণা থেকে এরা মুক্ত। এক ঝটকায় রবীন্দ্রনাথ য়োরোপীয় আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম প্রেরণাপুরম্নষে পরিণত হলেন। ছবি আঁকতে তিনি যে কোনো পূর্বপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন না, এতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়ল।

প্যারিস প্রদর্শনীর সফলতার পর যখন তা নিয়ে তিনি বিলেতে এলেন, তখন তাঁর প্রতিক্রিয়া হলো মিশ্র। অনেক প্রদর্শনী থেকে বিদগ্ধজনেরা মুখ ফিরিয়ে থাকলেন। এর একটা কারণ রাজনৈতিক। তিনি যে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকা–র (১৯১৮) পর প্রতিবাদে নাইট খেতাব বর্জন করেছিলেন, এবং ব্রিটিশ শাসনকে তার সঙ্গে প্রতিবাদলিপিতে সত্যসিদ্ধ ধিক্কার জানিয়েছিলেন, যা এ-জাতীয় সাহিত্যে এখনো এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে, তাতে তাঁরা তাঁকে উপেক্ষা দিয়ে যথোচিত অবমাননা জানালেন। তারপরও বার্মিংহামের প্রদর্শনী খুব সফল হয়। তাতে তিনি খোলা মনে জানান, তাঁর ছবির অমত্মর্নিহিত কোনো বাণী নেই। কোনো উদ্দেশ্য নেই। তারা নিজেরাই নিজেদের পরিচয়। তারা তারিফও পায়। এরপর জার্মানি, জেনেভা, কোপেনহেগেন, মস্কো – এসব জায়গাতেও তাঁর ছবির জয়যাত্রা চলে। পরে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রতেও। দর্শকরা সেখানেও বিস্ময়বিমূঢ়, মুগ্ধ।

১৯৩০-এর ওই প্রদর্শনীর পর বিশ্ব পরিস্থিতি দ্রম্নত পালটায়। প্রথমে মহামন্দায় অর্থনীতিতে বিপর্যয়, তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। এই পরিবেশে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ছবি আঁকা থেকে সরে আসেননি। অনেক উলেস্নখ করার মতো ছবি এঁকেছেন। অবশ্য প্রথমে যেমন বলেছিলেন, শুধু কলমের আঁচড়ে, সেখানে স্থির থাকতে পারেননি। জলরঙেও প্রচুর ছবি এঁকেছেন। নিসর্গ দৃশ্যও। মনে হয়, তাতেও স্মৃতিতে প্রস্থান। শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর যেন সার্বিক চৈতন্যময়তায় ফিরে আসে। তবে প্রদর্শনী আর কোথাও তেমন হয়নি। ঘরোয়া দু-চারটে হয়তো। তাঁর জীবনাবসানের পর নতুন বিধ্বসত্ম পৃথিবী। অমত্মর্লোকে দৃষ্টি নয়, বিকট বিপর্যয়ে নেতিতে প্রস্থান, অথবা উদ্ভটের ছিন্নমসত্মা প্রদর্শন, বিপরীতে সমষ্টি-সাধনার মন্ত্র উচ্চারণ – অথবা এদের সমন্বয়হীন সমাহার। এই প্রেক্ষাপটে তখন রবীন্দ্রনাথের ছবি বড়ই বেমানান। তার ভেতরেও বুদ্ধদেব বসুর মতো পরগাছা প–তের চটকদার মমত্মব্য শুধু বিভ্রামিত্মই জাগায়।

একসময় রবীন্দ্রনাথ যামিনী রায়কে বলেছিলেন, কখনো কখনো চারপাশের দৃশ্যমান জগৎ যেন তার প্রত্যক্ষের রূপে নয়, তার প্রকৃত সত্তায় তাঁর কাছে উদ্ভাসিত হয়। তিনি ছবিতে তাকেই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন। তা তাঁকে আনন্দ দেয়। যেন প্রাথমিক বাসত্মবতা ধরা দেয়। গানে গেয়েছেন তিনি, ‘দাঁড়িয়ে আছ তুমি আমার গানের ওপারে’ – এও যেন তেমন। তাকেই দেখায় প্রাণময় করে তোলা, ‘একটুকরো পাথর, একটা গাধা, একটা কাটা গাছ, একজন বুড়ি, যাই হোক।’ মৌলিক বাসত্মবতায় দেখায় ও দেখানোয় তিনি আধুনিক চিত্রকলায় আদিমতাকে তাঁর মতো করে চেনান। এই ন্যাচারালিস্টদের হাতে প্রত্যক্ষের অনুকৃতি নয়, স্বদেশি ভাবনার সীমাবদ্ধতাও নয়, তাদের অতিক্রম করে. অথবা পাশ কাটিয়ে বিশ্ব আধুনিকতার সর্বস্বতায় একাত্ম হওয়া। তবে তেমন হওয়ার কোনো ব্রত নিয়ে নয়, সবটাই আপনা থেকে।

রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু ন্যুড ছবি এঁকেছেন। এমনকি সামনে থেকে পুরোপুরি দিগম্বর পুরম্নষ ছবিও। কিন্তু কোনোটাই মডেল বসিয়ে বা দাঁড়িয়ে রেখে নয়। এবং এসব ন্যুড নিজেদের দেখায় না। দেখায় অমত্মর্জাত কোনো অ্যাগনি (agony), কোনো উদাসীনতা অথবা কোনো উন্মাদনাকে। একস্ট্যাসি (ecstasy) অথবা, নিশ্চিমত্ম স্বাভাবিকতা অবশ্যই নয়। একটাতে দেখি, এক নগ্নিকা প্রাগৈতিহাসিক এক পাখির পিঠে তা আঁকড়ে ধরে উড়ে যাচ্ছে। মুখ পাখির পিঠে সোজা। ছবির রহস্যময়তা শিহরণ জাগায়। অন্য একটিতে অবনত এক নগ্ন নারীকে ঘিরে আছে কয় গম্ভীর সুবেশা মহিলা। আলো-ছায়ার গাম্ভীর্যে যেন কোনো অশুভ ইঙ্গিত। এ কি ‘ত্রাসের বিকট ভঙ্গি’? ‘ভয়ের বিচিত্র’ ছবি? এই আকুলতাই কিন্তু ওই ছবির দিকে আমাদের বারবার টানে। এবং এ কোনো সাধারণীকৃত আকৃতি নয়। গভীর – গভীর ব্যক্তিগত।

তিনি, আরো মুখ থেকে মুখোশের দিকে ঝুঁকেছেন। পিকাসোর ছবি তিনি নিশ্চয়ই আগে দেখেছেন। তবে তাঁর বেলায় এমনও হতে পারে, শিলাইদহ-সাজাদপুরে বাসের সময় চৈত্র মাসে অমত্ম্যজ পাড়ায়, অথবা তত অমত্ম্যজ নয় এমনও, যে গাজনের নাচ তিনি হয়তো দেখেছিলেন, তার স্মৃতি ঠেলে ওপরে উঠে এসেছে। আমাদের ছেলেবেলাতেও অমন নাচ আমরা দেখেছি।

তাঁর কিছু ছবিতে আর একটা বিষয় ইঙ্গিতবাহী। নারীমুখ যেন আপনা থেকে কাদম্বরী দেবীর মুখের আদল পেয়ে যায়। তাঁর সরল স্বীকারোক্তি, ‘তাঁর মুখ আমি ভুলতে পারি না।’ স্মৃতির সঞ্চয় যে তাঁর ছবিতে কী ভূমিকা নেয়, তার আভাসও এতে চলে। একসময় কথায় কথায় তিনি আরো বলেছিলেন, নিঃসঙ্গ ছেলেবেলায় রাতে ঘুমোতে গিয়ে নিভু-নিভু তেলের বাতিতে চারদিকে দেয়ালে নানা ফাটলের, নানা রেখার বৈচিত্র্য তাঁকে আচ্ছন্ন করে রাখত, কল্পনাকে তাঁর উস্কে দিত; যতক্ষণ না তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন। এসবও বোধ হয় ছবিতে তাঁর জীবমত্ম হয়ে ফিরে এসেছে।

অমৃতা শেরগিল ছিলেন মেজাজি আর ঠোঁটকাটা। কারো খ্যাতিকেই মনের মতো না হলে পাত্তা দিতেন না। তিনিও কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছবিকে যথেষ্ট তাৎপর্যময় ও মূল্যবান মনে করেছিলেন, যদিও তাঁর নিজের আঁকা অন্যরকম। এবার তাঁর দিকেই আমরা দৃষ্টি দিই।

 

তিন

 

নিঃসঙ্গতার সঙ্গে কল্পনাকে মিলিয়ে এক স্থিরবিন্দু থেকে রবীন্দ্রনাথের জীবন শুরম্ন। তারপর আপন প্রতিভায় বিকশিত হয়েছেন। ক্রমশ ছড়িয়েছেন চারপাশে। বিশ্বজগৎ সমসত্মটায়। উপলব্ধি করেছেন, ‘আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন।’ এবং তাতে তিনি বিচ্ছিন্নতার বিপন্নতায় ডোবেননি, বরং সংস্কারহীন মুক্তিতে মানবসত্তার সমসত্মটায় একাত্ম হতে চেয়েছেন। ঝড়ঝাপটা অনেক এসেছে। পালিয়ে যাননি। তাঁর অমত্মরের স্বরূপ নিজের মতো করে চিনেছেন। লড়াই করেছেন। তাঁর সৃষ্টিপ্রতিভার প্রকাশে তার ছাপ পড়েছে। কিন্তু কখনো তিনি উন্মূল হননি। অসিত্মত্বের সংকট তাঁকে ভোগায়নি। তার সত্যকে পুরো পাবার ও জানার তৃষ্ণা যদিও মেটেনি। কারোই মেটে না। ব্যক্তিজীবনের নিত্য আপেক্ষিকতাতেই তার নিয়তি। তবু ‘অমত্মরে-বাহিরে’ সামঞ্জস্যের হেতু তাঁকে খুঁজতে হয়নি। আপন প্রতিভায় তাকে নির্মাণও করতে হয়নি। জন্মসূত্রে প্রাণ ও প্রকৃতির বাসত্মবতায় এক মৌলিক উপাদান হিসেবেই তা তাঁর কাছে নিশ্চিত থেকেছে। স্বেচ্ছায় একে তিনি পালটাতে চাননি। তার সুযোগ ও সম্ভাবনা, দুই-ই তাঁর সামনে ছিল। প্রলোভন যে দেখায়নি, তাও নয়। কিন্তু সেসবে তিনি ভোলেননি। আপন পরিচয়ের ভিত্তিভূমি নিয়ে তিনি আদৌ দ্বিধায় ভোগেননি।

অমৃতা তাঁর জন্মসূত্রেই এখানে ভিন্ন প্রেক্ষাপট রচনা করেন। তার সঙ্গে তাঁর নিত্য সংযোগ-নিত্য সংঘাত। এতে কি বিপর্যসত্ম হয়েছেন? প্রতিভা কি তাঁর বিপথগামী হয়েছে? সদুত্তর দিতে পারি না। কারণ এমনটি না হলে অমৃতার সৃষ্টিমায়া আজো এমন প্রবলভাবে আমাদের আকর্ষণ করত কি না, বলতে পারি না। মাতৃভাষা তাঁর হাঙ্গেরিয়ান। ১৯৩৪-এর আগ পর্যমত্ম ভারতে কোনো শিকড় গজায়নি। ষোলো বছরে প্যারিসে ছবি আঁকা শেখায় আসার পর থেকে জীবনযাপনে, পোশাকে-আশাকে পিতৃভূমির কোনো পিছুটান চোখে পড়ে না। ছবি আঁকেন, যেমন আর পাঁচজন য়োরোপীয় আঁকেন, তেমন। জীবন ও ছবি, দুটোতেই বেপরোয়া। ছবি কিন্তু নজর কাড়ে। তখনই পুরস্কার জোটে। এটা তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি। তা স্বতঃস্ফূর্ত ও অসংকোচ। ভারতবর্ষের আপন সত্তার পরিচয় ও ছবির ভাবনা নিয়ে যে বিতর্ক, তাতে তাঁর কোনো মাথাব্যথা নেই। য়োরোপীয় শিক্ষায়, য়োরোপীয় মেজাজে আঁকা। কিন্তু তখনই তাঁর সক্ষমতার ছাপ নির্ভুল। তা যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তেমনি তাঁর বৈশিষ্ট্য চেনায়। বিশেষ করে রেখার লাগাম শক্ত হাতে ধরে রাখায়, রঙের ব্যবহারে প্রগলভ প্রাণশক্তির পরিচয়ে ও বিষয়ের তন্নিষ্ঠ সজীবতায়। ছবি যেন ক্যানভাস থেকে চেতনায় আছড়ে পড়ে। কিন্তু কোথাও কোনো তাল কাটে না। অবাক হই, ওই অল্প বয়সেই কেমন করে এই দক্ষতা তিনি আয়ত্তে আনলেন। তাদের নমুনা এখনো আমাদের হতবাক করে। ওই সময়ের কোনো কোনো ছবিতে ভাবের গভীরতা বিস্ময়কর। যেমন, এক বিগত যৌবনা মডেলের ন্যুড-স্টাডিতে। অমত্মহীন বিষাদ ও ক্লামিত্ম তার আমাদের চেতনার গভীরে আঘাত হানে। তার অভিঘাত সহজে যায় না। এটা ওই সময়ের অমৃতার বেলাতেও ব্যতিক্রমী। কারণ তিনি যেন তখন ক্ষণবাদী ভোগতৃষ্ণার সাক্ষাৎ প্রতিনিধি। তার প্রকাশ তাঁর ছবিতেও। এবং তা অকুণ্ঠ।

যে-কোনো বিচারেই অমৃতা ছিলেন অসামান্যা সুন্দরী। এ বিষয়ে তিনি নিজেও ছিলেন সচেতন। একের পর এক নিজের ন্যুড ছবি আঁকেন। কোনো মূল্য আরোপ করে নয়। সুন্দরই সুন্দরের পরিচয়। শুধু এটুকু মনে রেখে। নিস্পৃহ আত্মরতি আমাদের কামনা জাগায় না। কিছুটা প্রতিহতই করে। যেন ওই অসহ্য সুন্দর তার বর্ম। এবং একটা চ্যালেঞ্জ। আমরা পরাসত্ম হই। এখনো। এটা সত্যিই মনে হয়, অসংখ্য পুরম্নষের সঙ্গে, অসংখ্য নারীর সঙ্গে তুরম্নদ্দম একের পর এক মিলনক্রিয়া চূড়ামত্ম সম্পূর্ণতায় নিয়ে গিয়েও মানসিকভাবে তিনি যেন এক অনাঘ্রাতা কুমারী।

মনে করা ঠিক নয়, তাঁর ব্যতিক্রমী বেহিসেবি জীবনযাপন তাঁর চিত্রকর খ্যাতির বিজ্ঞাপন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে প্যারিসে চিত্রকলায় একটি সর্বোচ্চ পুরস্কার অর্জন করেন। এ পর্যমত্ম ওই রকম পুরস্কার প্রাপকদের ভেতর সর্বকনিষ্ঠদের তিনি একজন। তবে তাঁর উপচেপড়া প্রতিভা সামলাবার এ জৈবিক নিরাময়ক্রিয়া কি না বলতে পারি না। অনেক পুরম্নষপ্রতিভার এমন আচরণের কথা আরো আগে থেকে আমরা জানতে পাই। সমাজে একরকম তা গা সওয়া। কোনো নারীর বেলায় তা নয়। এটা ঠিক, তাঁর
মা-বাবার মিশ্র বিয়ে ও এক সম্ভ্রামত্ম শিখ পরিবারের মেয়ে হওয়ায় এখানকার সামাজিক মানদ-কে তিনি উপেক্ষা করতে পারতেন। কিন্তু সে সময়ে য়োরোপীয় সমাজেও তিনি নিজেকে কেবলমাত্র স্বেচ্ছাধীন করে তুলেছিলেন। তার সাধারণ অনুমোদন সেখানেও ছিল না।

তবে ছবির রূপকলায় তিনি কিন্তু অনেকটা গতানুগতিকই। প্রতীকী বা বিমূর্ত ভাবনার দিকে, অথবা রবীন্দ্রনাথের মতো ‘মগন গহন ঘুমের ঘোরে’ ‘স্বপ্ন স্বরূপের অনর্গল’ রূপলীলার চিত্রলেখায় তিনি আকৃষ্ট হননি। মানব-মানবীর স্বাভাবিক আকৃতিকে তিনি বিপর্যসত্ম করেননি। কিন্তু তারপরও ওই মানব-মানবীতে বোধের যে রহস্যময়তা উঁকি দেয়, ‘না বলা বাণীর ঘন যামিনী’ যেমন হাওইয়ের মতো ঝলসে ওঠে, অথবা বিষণ্ণতার কুহক যেমন রচিত হয়, তাতে তারা আদৌ গতানুগতিক থাকে না। যাকে বলি একামত্ম নিজস্বতা, তা তাদের প্রত্যেকটিকে উদ্ভাসিত করে। আপন কালকে তিনি অবলীলায় অতিক্রম করেন। এবং যাঁরা সচেতনভাবে নানা রকম কালোয়াতির কারসাজিতে মাতেন, তাঁদের অবহেলায় পেছনে ফেলে।

জানিয়েছি, ১৯৩৪-এ তিনি ভারতবর্ষে এসে এখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরম্ন করেন। য়োরোপে যে মাঝে-সাঝে আর যাননি, তা নয়। বিয়ে করতেই তো গিয়েছিলেন কমাসের জন্য ১৯৩৮-এ। তবে স্থায়ী ঠিকানা আর য়োরোপে নয়। দেখবার বিষয়ও বদলে যায়। কিন্তু একে কি বলে ঘরে ফেরা, না, ঘর ছাড়া? আট বছর বয়স পর্যমত্ম যিনি বড় হয়েছেন হাঙ্গেরিতে আবার ষোলো থেকে একুশ, প্যারিসে, মাঝের বছরগুলোতেও মা-বাবার সঙ্গে যখন খুশি য়োরোপে, এবং যাঁর মাতৃভাষা হাঙ্গেরিয়ান, তিনি প্রকৃতিগতভাবে ভারতবর্ষীয় নন। কিন্তু তিনি ভারতীয়ত্বকেই গ্রহণ করলেন, কারো চাপে বা আকর্ষণে নয়, নিজের স্বাধীন ইচ্ছায়। এখানকার মানুষের কুচুটে স্বভাব তাঁকে আহত করেছে; কিন্তু নিজের জেদ বজায় রেখেছেন। তার মানে এ নয়, তাঁর ব্যক্তিগত আচরণ তিনি পালটেছেন, ‘মহান ভারতে’ তিনি মজেছেন। যেমনটি আমরা অন্য কারো কারো বেলায় শুনি। কিন্তু ছবি আঁকায় ভারতীয় পরিচয়ে তিনি অমর হন। যদিও য়োরোপীয় অমৃতার অলজ্জ সুন্দরের আকর্ষণও বজায় থাকে।

এদিকে বঙ্গভঙ্গ রদ হবার পর (১৯১১) ব্রিটিশরাজের মনোভঙ্গিতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আসে। এতদিন তারা প্রাচীন ভারতের জৌলুস সামনে এনে ও প্রাচীন য়োরোপীয় কীর্তির সমামত্মরালে তাকে রেখে আর্য সভ্যতায় ঐক্যের কথা বলে উচ্চাভিলাষী ভদ্র জনগোষ্ঠীকে তাদের বিশ্বসত্ম ও অনুগত রাখায় সচেষ্ট ছিলেন। ওই ভদ্রলোকদের ভেতর থেকেই স্বদেশি আন্দোলনে তাঁরা ধাক্কা খেলেন। এবার তাঁরা বলতে শুরম্ন করলেন, গ্রামই ভারতের প্রকৃত স্বরূপ, ধর্ম অন্যতম মৌলিক উপাদান। প্রাচীনতর জনসমাজগুলোকে, যেমন সাঁওতাল, কোল, ভিল ইত্যাদিকে তাঁরা বলতে শুরম্ন করলেন আসল ভারতীয়। সাংস্কৃতিক পরিচয়ে ও তার প্রতিফলনে গুরম্নত্ব পেতে শুরম্ন করলেন তাঁরা। সাহিত্যে কিপলিং তাঁদের আদর্শের প্রতিনিধি হয়ে উঠলেন। বাংলায় বাবুরা হঠাৎ করেই সাঁওতালদের, বিশেষ করে সাঁওতাল রমণীদের রোমান্টিক দৃষ্টিতে দেখতে শুরম্ন করলেন। সেইসঙ্গে ভদ্রলোকদের উপার্জনের সম্ভাবনার জায়গাগুলো সংকুচিত হতে শুরম্ন করল। সংকীর্ণ কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা তাঁদের নিজেদের ভেতরেই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও তিক্ততা বাড়াবার কাজে সহায় হলো। যদিও গ্রামীণ সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নে কোনো মৌলিক সুদূরপ্রসারী উদ্যোগই নেওয়া হলো না। স্থবিরতা সেখানে মৌরম্নসী পাট্টায় বহাল থাকল।

প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া যে ব্রিটিশরাজের কাজে আসেনি, তা নয়। কিন্তু এ বুমেরাং হয়ে তাঁদের বিপর্যসত্ম করল তুলনায় বেশি। এ সময়েই ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অঙ্গনে মহাত্মা গান্ধীর আবির্ভাব। দ্বান্দ্বিকতার উলটো পিঠে তিনিও চাইলেন গ্রামীণ মানুষের সংযোগ। বললেন, গ্রামই হলো ভারতাত্মার প্রাণকেন্দ্র। তাকে বাদ দিয়ে গণজাগরণ ও স্বাধীনতাসংগ্রাম অবাসত্মব। অস্পৃশ্যতার অচলায়তন তিনি ভাঙতে চাইলেন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ভাঙতে অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের মিলিত স্রোতে গণজোয়ার আনলেন, সুবেশ-ভদ্রলোকের খোলস তিনি ছুড়ে ফেললেন, সবার পিছে, সবার নিচে যে নাম-গোত্রহীন মানুষ, তার সাজে নিজেকে সাজালেন, জাতীয় কংগ্রেসকে প্রকৃত অর্থে জাতীয় রূপ দিতে চাইলেন। এর ছাপ পড়ল শিল্পকলাতেও। নন্দলাল বোস, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, এঁরা কংগ্রেসের পোস্টার, ম্যুরাল, এসব আঁকায় অকাতরে নিজেদের ঢেলে দিলেন। ভারতবর্ষের এই বাসত্মবতার প্রেক্ষাপটে ১৯৩৪-এ অমৃতার ভারতবর্ষে পুনরাগমন। কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে নয়, অমত্মর্জাত, ব্যাখ্যাতীত শিল্প-সাধনার, এবং জীবন-সাধনারও, এক তাগিদে তিনি গ্রামীণ ভারতের দিকে দৃষ্টি ফেরালেন। তাঁর মনে হলো, এসব গ্রামীণ মানব-মানবীতে আছে মানবাত্মার শুদ্ধ প্রতিফলন। কোনো উলস্নাসে বা উচ্ছ্বাসে নয়, তাদের দিনযাপনের আতিশয্যহীন, আভরণহীন পৌনঃপুনিকতায়, এক রকম, নিরানন্দই বলা চলে, প্রাণশক্তির তাৎপর্যহীন উন্মোচনে। এই অনুভব তাঁর স্বতোৎসারিত। কোনো যুক্তিতর্কের সিঁড়ি বেয়ে নয়। এখানেই তিনি তাঁর মনঃসংযোগ করলেন। অচিরেই সোনা ফলল। গান্ধীও আকৃষ্ট হলেন। যদিও তাঁর ছবি তাঁর মতো। গান্ধীর রাজনৈতিক ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলার আগ্রহ তাতে বিন্দুমাত্র নেই। এবং তাঁর জীবনযাপনে স্বাধিকার প্রমত্ততায় কোনো পরিবর্তন আসে না। তবে তার প্রভাব তাঁর ছবিতে পড়ে না। সেখানে তিনি একনিষ্ঠ। তাই বলে তিনি স্বয়ম্ভু নন। অস্বীকার করা যায় না, হাঙ্গেরি-প্যারিসে প্রশিক্ষণ তাঁর ছবিতে একধরনের বলিষ্ঠ স্বাতন্ত্র্য আনে, যা মনে হয় তাঁর মজ্জাগত, এবং ভারতের গ্রামীণ বাসত্মবতার অমত্মঃস্থ সার প্রতিমায় ফুটিয়ে তুলতে চাইলেও কলাকৃতি তাকে উপেক্ষা করে না। বোধ হয়, তিনি তা চানও না। বিষয় বরং ওই কুশলতাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়। তার অনন্যতা ক্ষুণ্ণ হয় না। দেখার চোখ অবশ্য তাঁর নিজস্ব। অসুন্দরকেও তা অসামান্যতা দেয়। তার সরল কারম্নকার্যহীনতা স্বয়ং স্থায়ী প্রভাব রেখে যায়। নিসর্গদৃশ্য তিনি এঁকেছেন কি না জানি না। তবে তাঁর আঁকা মানব-মানবী পারিপার্শ্বিকের বস্ত্তময়তা যেন আত্মস্থ করে রাখে। এখানে অজমত্মার ফ্রেসকোমালা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে বলে মনে হয়। নিজেও তিনি বারবার বলেছেন, অজমত্মা গুহাচিত্রে তিনি মুগ্ধ।

এই পর্বে আঁকা তাঁর কটি ছবির এখানে উলেস্নখ করি। 1. Hill Men and Woman (১৯৩৫), Three women (১৯৩৭), Man in White (১৯৩৫), The Brahmacharia (১৯৩৭), Child Wife (১৯৩৯)। আমার দেখা সবই বইয়ের পাতায়। আপাতদৃষ্টে ওই সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক উত্তেজনার অথবা কোনো বক্তব্যের ছাপ এসবে নেই। কিন্তু আঁকা সব নর-নারীর অবয়বে তাদের বাসত্মব ভূমির ছাপ নির্ভুল। তারা প্রত্যেকেই যেন একধরনের নিরম্নপায় বিপন্নতার প্রতীক। তাদের চোখে-মুখে তার নিসত্মব্ধসংযমী প্রকাশ। ছবির মানব-মানবী কাউকেই সুশ্রী বলা যায় না। অধিকাংশ কৃষ্ণকায়। কিন্তু এমন তার অভিঘাত যে, মনের ওপর তার আলোড়ন সহজে থামে না। এক গভীর বিষাদ তাদের ঘিরে রাখে। যেন তখনকার জাতীয় চেতনার প্রতিচ্ছবি। সম্ভবত এ কারণেই গান্ধীকে তারা বিচলিত করেছিল। অমৃতার ছবিকে তিনি গুরম্নত্ব দিতেন। তবে রবীন্দ্রনাথের ছবি আঁকা রোমাঁ রোলাঁ পছন্দ করেননি। ‘এই বয়সে কী ছেলেমানুষী করছেন কবি!’ – বলেছিলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ ও অমৃতা একই কালপর্বে দুই ভিন্ন মেজাজের চিত্রকর। জীবনযাপনের ধরন দুজনের দুমেরম্নর। তবু ওই সময়ে এই ভূখ–র তাঁরা সর্বপ্রধান দুই মহীরম্নহ। মৌলিকতায় তুলনাহীন। অমৃতার প্রশিক্ষণ কেতাবি ঢঙে। ছবির আয়োজনও তেমন। কিন্তু ছবির মানব-মানবীরা চেতনার এমন গভীর থেকে উঠে আসা, এবং চোখে-মুখে তাদের এমন নিরম্নপায় আর্তি যে, কালের সীমায় বাঁধা থেকেও নিমেষে তারা তাকে অতিক্রম করে। অমৃতার ছোট্ট জীবনটাও অতিকথায় স্থায়ী হয়।

কিন্তু এ দুজনের কেউই কোনো প্রভাব রেখে যান না। কাল এখানে হমত্মারক। তাঁদের জীবনাবসানের সম-সময় থেকেই প্রবলভাবে আছড়ে পড়ে গণচেতনার বহুমুখী বিক্ষেপ। রবীন্দ্রনাথের বা অমৃতার একামত্ম ব্যক্তিগত আপসহীন সমীকরণ আর টিকিয়ে রাখা যায় না। নন্দলাল বোস, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় একভাবে সমঝোতা করেন। কিন্তু যামিনী রায় খ্যাতির শীর্ষে উঠলেও ব্যক্তি ও গণমানসের দায় ও দাবি কীভাবে মেটাবেন, ঐতিহ্যের সঙ্গে ছবির বাজারের কীভাবে সমন্বয় ঘটাবেন, এসব প্রশ্নের সমাধান না পেয়ে চরম অতৃপ্তি নিয়েই চিরবিদায় নেন। প্রেক্ষাপটও বদলে যায়। বদলে যায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ধরন। এতে চিত্রকলা আগের চেয়ে বেশি সাড়া জাগাতে পারছে কি না বলতে পারি না। একশ বছর আগে বাংলা সাময়িক পত্র-পত্রিকায় আসল ছবির মুদ্রণ ছাপানো একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেইসঙ্গে তা নিয়ে শিল্প-সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া আজ তেমনটা চোখে পড়ে কি? বিমূর্ত ছবি কীভাবে বিচার করি, রঙের খেলার মূল্যায়ন কীভাবে হয় এসব নিয়ে আমার নিজেরই কোনো ধারণা নেই। তবু কেউ কেউ মনে স্থায়ী আসন পেতে থেকে যান। হয়তো দুজন দুরকম। তবু। যেমন রবীন্দ্রনাথ ও অমৃতা শেরগিল। নাইবা থাকল তাঁদের সৃষ্ট কোনো ঐতিহ্য। n

 

সহায়ক গ্রন্থ

১.   মাহমুদ আল জামান, রবীন্দ্রনাথ : চিত্রকর, মূর্ধণ্য, ঢাকা-২০১২

২.   Partha Mitter, Art and Nationalism in colonial India, 1850-1922, Cambridge University Press, 1994

৩.  __, The Triumph of Modarnism, Indian Artists and the Avant-garde, 1922-47, Reaktion books, London, 2007.

 

Leave a Reply

*