logo

উস্কে দিয়েছেন, তবে কাঠামোর মধ্যেই

কা বে রী  গা য়ে ন

যে পাতা সবুজ ছিলো, তবুও হলুদ হতে হয় –

শীতের হাড়ের হাত আজও তারে যায় নাই ছুঁয়ে

যে মুখ যুবার ছিলো, তবু যার হয়ে যায় ক্ষয়,

হেমন্ত রাতের আগে ঝরে যায় – পড়ে যায় নুয়ে।

(জীবনানন্দ দাশ)

২০১৩ সালের ৩০ মে ঋতুপর্ণ ঘোষ যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ৪৯ বছর। এত অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একদিকে যেমন তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, অন্যদিকে দারুণ স্বীকৃতিও পেয়ে গেছেন। সব শিল্পীর জীবনে প্রকাশ ও স্বীকৃতির এমন মেলবন্ধন ঘটে না। তাঁর মৃত্যুতে মানুষের হাহাকার চোখ এড়ায় না। একজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকারের মৃত্যুতে যতখানি শোক হওয়ার কথা, শোক ততটাই হয়েছে। চোখ এড়ায় না তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনাও। জীবিত অবস্থায় এবং মৃত্যুর ঠিক পর পর আমরা দুই ধরনের আলোচনা দেখি। জীবদ্দশায়, তাঁর চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনায় তাঁর ‘যৌনতা-নির্মাণ’, বাণিজ্যিক উপাদানের অঢেল ব্যবহার, নান্দনিক উপস্থাপন – এসবের সমালোচনা-প্রশংসা দুই-ই হয়েছে, কিন্তু মৃত্যুতে সব ছাপিয়ে তাঁর উচ্ছ্বসিত প্রশংসাই জায়গা করে নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর অকালমৃত্যু বড় বেশি বেদনার মতো বেজেছে। আজ এক বছর পর, চোখের জল যখন শুকিয়েছে খানিক, আবার উত্তপ্ত সমালোচনার আগুনও মিইয়েছে অনেকটাই, তখন খানিকটা নির্মোহভাবে আলোচনা করা যেতেই পারে। প্রত্যেক সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বকেই এইসব আলোচনার মুখোমুখি বুঝি হতেই হয় এবং এসব আলোচনাই তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তাকে জীবন্ত রাখে।

১৯৬৩ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া ঋতুপর্ণ ঘোষের পড়াশোনা এবং পারিবারিকভাবেই চলচ্চিত্র নির্মাণের আবহে বেড়ে ওঠা তাঁর জীবন আর পাঁচজন গড়পড়তা বাঙালির নয়, বরং রবীন্দ্রনাথ কিংবা সত্যজিৎ রায়ের মতোই একটি ধ্রুপদী সাংস্কৃতিক ধারায় গড়ে উঠেছে। বাবা-মা দুজনই ছিলেন চিত্রকর, পরে অবশ্য বাবা সুনীল ঘোষ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ শুরু করেন। ভাগ্যিস করেছিলেন! ঋতুপর্ণও তাই ১৪ বছর বয়স থেকেই বাবার সঙ্গে শুটিংয়ে যাওয়া শুরু করেন। ছবির সম্পাদনা হতো তাঁদের বাসার খাবার টেবিলে। বাবার সঙ্গে বসেই শট বাছাই করতেন। কৈশোর থেকেই তিনি জানতেন চলচ্চিত্র নির্মাণের কলাকৌশল। তাঁর নিজের ভাষায়,

‘ছোটবেলা থেকেই জানতাম, চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার জন্য কোন বিশেষ প্রশিক্ষণ লাগে না। বিশেষ কোন যোগ্যতাও লাগে না। ১৪ বছর বয়সেই অনেক কিছু জানতাম। রাশপ্রিন্ট কাকে বলে? সিনেমার সম্পাদনা কীভাবে হয়? ফাইনাল প্রিন্ট কী জিনিস? মিক্সিং কখন করতে হয়? সাউন্ডের লেয়ারগুলো কী কী? কীভাবে সেগুলো মিক্স করতে হয়, কতগুলো ট্রাক করা সম্ভব? টেকনিক্যাল সব বিষয় আমার জানা ছিলো, কারণ আমাদের বাসায়ই এসব হতো। সিংক সাউন্ড কী? ফোলি সাউন্ড কী? নন-সিংক সাউন্ডই বা কী? এর সবকিছু আমি জানতাম। … অনেক সময় বাবাকে সাহায্য করেছি, স্ক্রিপ্ট নিয়ে একসাথে আলোচনা করেছি। এটা একটা পারিবারিক বিষয়ের মতো ছিলো।’

 

ফলে চলচ্চিত্রনির্মাতা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তাঁকে কোনো ট্রেনিং নিতে হয়নি, কেবল বাবার প্রামাণ্যচিত্রের জায়গায় তিনি বেছে নিয়েছেন ‘গল্প বলা’কে।

পারিবারিকভাবেই চলচ্চিত্র নির্মাণের উত্তরাধিকার পাওয়া এক সন্দ্বীপ রায় ছাড়া আর তেমন কেই-ই বা আছেন তাঁর সমসাময়িকদের ভেতর? ঋতুপর্ণ যখন হীরের আংটি নিয়ে ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রজগতে পা রাখেন, তখন পটভূমিতে রয়েছে পারিবারিকভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিজ্ঞতা, সাউথ পয়েন্ট স্কুল আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা আর নাগরিক কলকাতার নাগরিকতা। কলকাতার নাগরিকতা তাঁর জীবন ও কাজের ওপর কী ভীষণ প্রভাব ফেলেছে, তা বোঝা যায় তাঁর নিজেরই কথায় :

‘আমার চলচ্চিত্র জীবন শুধু নয় ব্যক্তি হিসেবে আমার বর্তমান অবস্থানের উপর কলকাতার বিশাল প্রভাব আছে। আমি কিন্তু এখানে প্রভাব হিসেবে কলকাতার নাম করছি, বাংলার নয়; আর এই দুয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। কলকাতার কথা আসলেই আমাদের মুখে দুটো নাম চলে আসে, রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায়। কিন্তু বাংলা মানে কেবল রবীন্দ্রনাথ আর সত্যজিৎ না, আরও অনেক কিছু।’২

তিনি একটি নাগরিক মানস নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত রাখেন, যে নাগরিক মানস এনলাইটেনমেন্ট ট্রাডিশনের শিল্প-সাহিত্য-সংগীতের ধ্রুপদী কাঠামোকে আত্মস্থ করেছে, যার চূড়ান্ত বিকাশ আমরা দেখেছি রবীন্দ্রনাথে। যে নাগরিক মানস সত্যজিতের অপু-ত্রয়ী থেকে সর্বশেষ আগন্তুকে দৃশ্যমান। এবং তাঁর শিল্পরুচি যে রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায় ঘরানার, সেটি সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেন বা তিনি রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিতের ধারাবাহিকতা। সেটি গল্প বলার ধরন কিংবা সংগীতের ব্যবহার থেকে শুরু করে যে অভিজাত পরিপাটি রুচির নির্মাণ গড়ে ওঠে চলচ্চিত্রজুড়ে, তার স্তরে স্তরে পরিব্যাপ্ত। মানসটি বিশ শতকজুড়ে ব্রাহ্ম সমাজের শিক্ষা-রুচি-উদারনৈতিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের। কিন্তু কীভাবে সেই মানস আবার রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ থেকে পৃথক, সেটিও দেখব আমরা। তবে তাঁর কাজে সত্যজিতের প্রভাব তিনি লুকানোর চেষ্টা করেননি :

‘আমি অবশ্যই এমন কেউ যে রায় ধারায় সিনেমা বানায়। কিন্তু এটাকে আমি অস্বীকার করার চেষ্টা করি না, বরং এতে আমি খুব খুশী; আমি মনে করি বাচ্চা-কাচ্চাদের দেখতে বাবা-মার মতোই হওয়া উচিত [হাসি]। আমি অবশ্যই রায়ের উত্তরসূরি, রায়ের সিনেমার মধ্যেই আমরা বেড়ে উঠেছি।’৩

রবীন্দ্রনাথ ও সত্যজিৎ রায়ের প্রভাববলয়ে প্রস্ত্ততি নেওয়া ঋতুপর্ণ ঘোষের আবির্ভাব ও অবদানকে বুঝতে হবে সেই সময়কার টালিগঞ্জ সিনে ইন্ডাস্ট্রির সাপেক্ষে। বাংলা চলচ্চিত্রের বড় দুর্দিনে একঝলক সতেজ হাওয়া নিয়ে তাঁর আগমন। সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল-বুদ্ধদেব যুগ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে মূলধারার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে উত্তম-সুচিত্রা-সৌমিত্র-অপর্ণা যুগের ম্যাজিক শেষ। চলচ্চিত্রের নামে বেপরোয়া ক্লিশের চর্বিতচর্বণ যখন বাংলা সিনে-ইন্ডাস্ট্রির প্রতি বিমুখ করে ফেলেছে মধ্যবিত্ত বাঙালি দর্শককে তখন তাঁর আগমন একটি মান-রুচির কাঠামো অফার করে দর্শককে ফের হলমুখী করে। সেইসঙ্গে বিষয়বৈচিত্র্য এবং আধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার এমন এক মুগ্ধতা তৈরি করে, যা শুধু দর্শককেই হলে ফিরিয়ে আনে এমন নয়, বরং পরবর্তী আরেক প্রজন্মকেও নতুন এক ধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী করে তোলে। সেই ধারাটি ভারত উপমহাদেশের সিনে-ইন্ডাস্ট্রির ‘আর্ট-ফিল্ম’ আর ‘কমার্শিয়াল ফিল্মে’র এক আপস, যা স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে এই দুই ধারা যা বোঝাত তার এক ধরনের অবলুপ্তি। এই ধারার নির্মাণ আধুনিক। সিনেমাটোগ্রাফি, সম্পাদনা, কাহিনিবিন্যাস, সংগীতের ব্যবহার – এ বলে আমায় দেখো তো, ও বলে আমায় দেখো। আর বিষয়বস্ত্তর বৈচিত্র্য একলাফে সত্তরের দশকের ‘আর্ট-ফিল্ম’ ঘরানার দেশ-সমাজ পালটে দেওয়ার (সত্যজিৎ ব্যতিক্রম) ম্যাক্রো-প্রতিজ্ঞা থেকে ভিন্ন এক ধরনের সমস্যায় আলো ফেলেছে, যা মূলত ব্যক্তিক। নয়া উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থায় ব্যক্তিমানুষের যে নাগরিক সংকট, আলো মূলত সেদিকেই এসব চলচ্চিত্রের। মানুষের সামষ্টিক উন্নয়নের
শৈল্পিক-প্রতিজ্ঞা ছেড়ে এই তুখোড় চলচ্চিত্রনির্মাতারা ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি-ব্যক্তিক সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে মুন্শিয়ানার সঙ্গে কাজ করছেন। সেই কাজ অবশ্যই বাবার শেষ জমি বন্ধক রেখে বা মায়ের বালা বিক্রি করে চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা নয় কেবল, বাণিজ্যিকতা এসব চলচ্চিত্রের প্রাণভোমরা কিন্তু সেই বাণিজ্যিকতা করতে গিয়ে তাঁরা কাঁচা অশ্লীলতার চর্চা করেন না। যৌনতার নির্মাণ এই বাণিজ্যিকতার অপরিহার্য উপাদান; কিন্তু পরিমিত সম্পাদনা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির গড়রুচির সঙ্গে মানানসই। সব মিলিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে এ এক নতুন ধারা, যার শুরু এই প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকারের হাত ধরে।

যদিও নিজেকে চলচ্চিত্র নির্মাণের টেকনিশিয়ান বলেছেন ঋতুপর্ণ, কিন্তু বিষয়টা হয়ে উঠেছিল অনেকটা ‘অবীন ঠাকুর ছবি লেখে’-র মতো। অনায়াস দক্ষতায় তিনি গল্প দেখিয়ে গেছেন। দৃশ্যের পর দৃশ্য তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন এমন দক্ষতায় যে, তিনি যা দেখিয়েছেন দর্শক মুগ্ধ হয়ে তাই-ই দেখতে গেছেন। মনে পড়ছে অন্তরমহলের (২০০৫) একটি দৃশ্য। রানী ভিক্টোরিয়ার মুখের আদলে দুর্গা প্রতিমাকে পাল্কি করে নিয়ে আসা হচ্ছে শরতের ভরা কাশফুলের মাঠের ভেতর দিয়ে (চকিতে মনে পড়ে যায় অবশ্য দুর্গা-অপুর কাশবনে ট্রেন দেখার দৃশ্য) কিংবা বাড়িওয়ালির (১৯৯৯) শেষ দৃশ্যে অভিনেত্রী কিরণ খের চোখের জল মুছে চলে যাচ্ছেন কক্ষ ছেড়ে যেখানে তিনি কাঁদছিলেন, আর সিলিং ফ্যানের শব্দ হচ্ছে ক্যাঁচ ক্যাঁ-আ-চ করে। বড় বুকে লাগে, বড় মন কেমন করে ওঠে। এমন সব অসংখ্য দৃশ্য তিনি নির্মাণ করেছেন। এই নির্মাণনৈপুণ্যের কারণেই সম্ভবত উপস্থাপিত অনেক বিষয়ের সঙ্গে একমত না হলে দর্শকরা সমালোচনা করেছেন কিন্তু উপেক্ষা করতে পারেননি। এক্ষেত্রে তাঁর চলচ্চিত্রে যৌনতার নির্মাণ বিষয়ে কথা বলা যেতেই পারে। বাংলাভাষী সিনে-দর্শকদের মধ্যে যৌনদৃশ্য চালিয়ে দেওয়া খুব সহজ কোনো বিষয় না হলেও কঠিন হয়নি ঋতুপর্ণের জন্য। উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪), দহন (১৯৯৮), উৎসব (২০০১), চোখের বালি (২০০৪), দোসর (২০০৪), সব চরিত্র কাল্পনিক (২০০৯), অন্তরমহল (২০০৯), আবহমান (২০১০), চিত্রাঙ্গদা (২০১২) – ক্রমাগত তিনি যৌনাবেদনময় দৃশ্য দেখিয়েছেন, শারীরিক সম্পর্ক দেখিয়েছেন। বিশেষ করে উনিশে এপ্রিলে (১৯৯৪) যখন প্রথম দেখি বা দেখি দহনে (১৯৯৮) এসব দৃশ্য, তখন চমকে উঠেছিলাম। এর আগে সরাসরি শারীরিক ঘনিষ্ঠতার দৃশ্য এমনভাবে মূল ধারার বাংলা চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি। কিন্তু উপস্থাপনের মুন্শিয়ানার কারণে খুব বেশি শোরগোল ওঠেনি। দর্শক আত্মস্থ করে নিয়েছে, আর নিজেদের তৈরি করেছে চোখের বালি, অন্তরমহল বা চিত্রাঙ্গদার জন্য। প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে সম্ভব হয়েছে? এ-প্রসঙ্গে ঋতুপর্ণ ঘোষের বক্তব্য হলো, ‘বেডসিন শুট করা খুব সহজ কথা নয়। এ ধরনের দৃশ্য শুট করায় সত্যিই খুব মুন্শিয়ানার প্রয়োজন হয়। একটা জড়তা তো থাকেই। টেনশনও থাকে অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং পরিচালকের মধ্যে।’ তাঁর মতে, ‘নগ্নদৃশ্য শু্যটিং-এর ক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হয়, সব কিছুর পরেও যেনো দৃশ্যটি শৈল্পিক হয়, রুচিসম্মত হয়। অথচ যেনো অবাস্তব না লাগে। শুধু নগ্ন দৃশ্য কেনো, ধরা যাক একটি দৃশ্য, যেখানে নায়িকা পোশাক পাল্টানোর জন্য শাড়ি ছাড়ছে, আর হঠাৎ ঘরে কেউ ঢুকে এসে অপ্রস্ত্তত হয়ে যাবে। এই শাড়ি ছাড়ার মধ্যে থাকে একটা চাপা উত্তেজনা অথচ মিনিস্কার্ট বা হটপ্যান্ট পরে অবলীলায় নায়িকা যখন নাচের দৃশ্য করেন, তখন তেমন রাখঢাক ব্যাপারটা থাকে না।’৪

অর্থাৎ তিনটি বিষয়ের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন – দৃশ্যটি যেন ‘শৈল্পিক’ হয়, ‘রুচিসম্মত’ হয় এবং ‘বাস্তব’ মনে হয়। এই তিনের সংমিশ্রণ হয়েছে বলেই হয়তো তাঁর যৌনতার নির্মাণ কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজ মেনে নিয়েছে। এই নির্মাণে তিনি যে কত সতর্ক থেকেছেন সে বিষয়েই কথা বলেছেন ঋতুপর্ণের এক সহকারী। তিনি দহনে এ ধরনের দুটি দৃশ্যের নির্মাণের কথা বলেছেন যার একটি এখানে উল্লেখ করছি,

‘…একটি দৃশ্য ছিলো ইন্দ্রানী ও সঞ্জীব দাশগুপ্তের চুম্বনদৃশ্য, অন্যটি ঋতুপর্ণা ও অভিষেকের ‘রেপ ইন ম্যারেজ’ দৃশ্য। প্রথমটির জন্য সিনেমাটোগ্রাফার হরি নায়ার তৈরী করেছিলেন আলো অাঁধারি পরিবেশ। তা-ও অধিকাংশ কলাকুশলীকে ঋতুপর্ণ বাইরে বার করে দিয়েছিলেন। আমি, হরি আর ওর ফোকাস পুলার, রানা ও ঋতুপর্ণ ছিলাম এই দৃশ্য শু্যটিং-এর সময়। বজবজের একটি বাড়িতে হয়েছিলো এটি।… এরপর কলকাতায় মনোহর পুকুর রোডের এক বাড়িতে ওই ‘রেপ ইন ম্যারেজ’ সিন-এর শু্যটিং-এর আয়োজন হয়। এই দৃশ্যে ঋতুপর্ণার জন্য আনা হয় নাইট ড্রেস। ফুরফুরে হালকা নাইট ড্রেসের তলায় অন্তর্বাস পরলে সেটা বাস্তবসম্মত হবে কি, হবে না, তা নিয়েও চলে আলোচনা গবেষণা। অবশেষে সব ঠিকঠাক। ঋতুপর্ণা ও অভিষেক মানসিকভাবে প্রস্ত্তত। মাত্র ক’জন থাকবে ঘরটিতে। হরি, ঋতুপর্ণ, আমি (মেয়ে বলে) আর একজন সহকারি। এমনকি ফোকাস পুলারেরও জায়গা নেই। হরি নিজেই ফোকাস করবে।’৫

এই শুটিং দেখতে স্বয়ং প্রযোজক এসেছিলেন কিন্তু ঋতুপর্ণ তাকেও ঢুকতে দেননি। এই বাড়তি সতর্কতা এবং যত্ন যৌনতার নির্মাণকে সহনীয়তা দিয়েছে। দর্শক হিসেবে আমরা বুঝে ফেলি তিনি দৃশ্যগুলো নেহাতই বাণিজ্যিক কারণে করছেন কিন্তু তাই বলে ‘সিটি’ পড়ে না হলে।

ঋতুপর্ণের নির্মাণে সংগীত ও কবিতার এক অসাধারণ প্রকাশ দেখি আমরা। রবীন্দ্রসংগীত, ইউরোপীয় ক্লাসিক্যাল, ভারতীয় ক্লাসিক্যালে তাঁর অনায়াস আসা-যাওয়ার যে প্রস্ত্ততি সেটি তাঁর ছবিকে এক অনন্যমাত্রা দেয়। সেই যে তিতলির জন্য লিখেছিলেন আর দেবজ্যোতি মিশ্রের করা সুরে শ্রীকান্ত আচার্যকে দিয়ে গাইয়েছিলেন গান ‘মেঘপিয়নের ব্যাগের ভেতর মন খারাপের  দিস্তা/মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা’, তা আজো স্মৃতিতে গেঁথে আছে। কে ভুলবে রেইনকোটের চাপা গানগুলো? রেইনকোটের তিনটি গানের লিরিক তো তিনি নিজেই লিখেছেন : Mathura nagarpati kahay tum gokoli jao, Piya tora kaisa abhiman, Akele hum nadiya kinare। গানগুলো তিনি লিখেছেন মৈথিলী ভাষায়। সংস্কৃত, হিন্দি ও ব্রজবুলি ভাষা মিলে মৈথিলী। তাঁর সংগীতরুচি গড়ে উঠেছে পশ্চিমা ধ্রুপদী সংগীতের বিপুল প্রভাবে এবং তাঁর চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রনাথের গানের অঢেল ব্যবহার দেখা যায়। এই দুইয়ের সংযোগকে তিনি ব্যাখ্যা করেন এভাবে যে, ‘রবীন্দ্রনাথ নিজেও পশ্চিমা সংগীত ট্রাডিশনে বড় হয়েছেন, পরে এই সংগীতকেই নিজের স্বতন্ত্র ট্রাডিশনে রূপান্তরিত করেছেন। তাঁর গানের গভীরে গেলে পশ্চিমা ধ্রুপদী সংগীতের অনেক উপাদান পাওয়া যায়।’ এভাবেই তিনি রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ক্লাসিক্যালের মর্মস্পর্শ করেন। তবে রবীন্দ্রসংগীতের তো বটেই, সংগীতের সর্বোচ্চ ব্যবহার বুঝি দেখা যায় চোখের বালিতে। তিনি নিজেও তেমন মনে করেন। চোখের বালির সব গানই রবীন্দ্রনাথ থেকে নেওয়া। তিনি এও মনে করেন যে, ‘চোখের বালির ধ্রুপদী মান তাঁর সংগীতের কারণেই প্রখর হয়েছে।’ উৎসব কিংবা অন্তরমহলে গানের ব্যবহার আর চিত্রাঙ্গদায় রবীন্দ্রনাথের গানের যে নতুন অর্থ প্রদান, এমন আর দেখা যায় না। তাঁর চলচ্চিত্রে কবিতার এত অনায়াস ব্যবহার দেখে চমকে উঠতে হয়। এমনকি যখন একেবারেই প্রত্যাশা নেই, তেমন সব দৃশ্যেও। যেমন দোসরের শেষ দৃশ্য দেখে যখন আমি বেশ ক্ষুব্ধ এবং খানিকটা উত্তেজিত, এইভাবে তাকে ঠকানো স্বামী নামের লোকটির কাছেই ফিরে গেল মেয়েটি শেষ পর্যন্ত, তখনই  ‘অন্ত্যমিলে রাজপুত্রের জয়’ কবিতাটি যখন পড়া হতে থাকে তখন ক্ষুব্ধতা ভুলে কান পেতে শুনতে থাকি কবিতাটি। এমনই কৌশলী তাঁর নির্মাণ। তবে কবি এবং কবিতা নিয়ে এমন একটি সর্বনাশা ছবি বানানো যে যেতে পারে সে বুঝি বাংলা সিনে-ইন্ডাস্ট্রি সব চরিত্র কাল্পনিকের আগে ভাবেওনি। ‘আমাদের ছোটনদী চলে বাঁকে বাঁকে’ কবিতাটি সেই কোন ছোটবেলায় রাধিকা শুনেছিল মামাবাড়ি যাওয়ার পথে, ফের সে শুনেছে বিয়ের পরে প্রথম যেবার শ্বশুরবাড়ি যায়। শুরুর দৃশ্যে এই কবিতার অনুষঙ্গ জানিয়ে দেয় এইসব কবিতা, স্মৃতি কেবল আজ। যা একদিন ছিল অথচ নেই। ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্ত্ত মানুষের কাফেলার কবিতা জয়গোস্বামীর, কী অপূর্ব পাঠ জয়গোস্বামীরই গলায় –

সেই কোন দেশ দিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম

কোন দেশ ছেড়ে আমরা যাচ্ছিলাম

পেরিয়ে পেরিয়ে উঁচু-নীচু ঢালু মাঠ

শিশির ভেজানো কাঁটাতার গাছপালা

আলপথে নেমে আমরা যাচ্ছিলাম

ছোটবোন আর মা-বাবা গ্রামের লোক

তারপাশে আমি দুলারী, না প্রিয়বালা…

কিংবা ‘অতল তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে, হৃদি ভেসে গেলো অলকানন্দা জলে’…কবিতার পেছনে ছুটেছে কবি, কবিতার পেছনে ছুটেছে নারী। রাধিকা কবি নয় অথচ ছুটেছে হারিয়ে ফেলা কবিতার খোঁজে, ছুটেছে মরে যাওয়া কবি-স্বামীর সবটা জানার চেষ্টায়, হায়! নতুন বিয়ের পরে রাধিকা একজন পাগলকে দেখেছিল ট্যাক্সিতে বসে। শহরে যেন কীভাবে ঢুকে পড়েছিল সেই পাগল (নাকি ঢুকে পড়ে পাগল হয়েছে? এই মমতাহীন শহর তাকে পাগল বানিয়েছে?) কিন্তু আর ফিরে যেতে পারেনি জন্মভূমিতে, পারবে না কোনোদিন আর। রাধিকা খুব ভয় পেয়েছিল। যে মানুষ থাকে আষ্টেপৃষ্ঠে সারারাত তার সঙ্গে, আর সকালে যায় বাইরের পৃথিবীতে, জীবিকার প্রয়োজনে, যদি সে আর ফিরে না আসে কোনোদিন বরং ফিরে আসে অন্য কেউ, সেই পাগল? আর যে তার নিজের মানুষ, সে কোথায়, কোন প্রবাসে, নাম না জানা কোন শহর-জনপদে না জানি সে ঘুরে বেড়াচ্ছে! স্বপ্নের ভেতর জায়গা করে নেয় পাগল, জায়গা করে নেয় অসুস্থ কবি, পাশাপাশি। যাদের কিছু নেই কেবলই প্রবাস আছে, যারা এই শহরের কেউ নয়। রাধিকা কী করবে এই প্রবাসে? ‘কে রবে এই পরবাসে হায়!’ হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে।

ব্যক্তিক মানুষের রক্তাক্ত হৃদয় যা নগরায়ণের কারণে একদিন শুরু হয়েছিল সোয়া তিনশো বছর আগে সুতানুটি, গোবিন্দপুর আর কলিকাতা জুড়ে, নাম হয়েছিল কলিকাতা, শতকে শতকে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে যে শহর সেই শহরের মানুষদের হাসি-কান্না, জটিলতা-রক্তক্ষরণের কবিতা লেখা হয়েছে সেলুলয়েডে। এ এক নিরন্তর চেষ্টা। সেই চেষ্টার সবচেয়ে কাব্যিক প্রকাশ বুঝি ঋতুপর্ণের চিত্রাঙ্গদার শেষ দৃশ্যের শেষ সংলাপ, ‘কোন রূপান্তরই সম্পূর্ণ নয়, পদ্ধতিটা চলতেই থাকে।’ নির্মাণশৈলীর এই অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে রাতারাতি অকল্পনীয় জনপ্রিয়তা দিয়েছে সন্দেহ নেই। প্রায় প্রতিটি চলচ্চিত্রই অভিনন্দিত হয়েছে জাতীয় পুরস্কারে। তাঁর এই বিপুল দর্শকপ্রিয়তার কেন্দ্রে তাঁর নির্মাণদক্ষতা তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে আরো একটি বড় কারণ সম্ভবত তিনি প্রতি কাহিনিতেই একটি পূর্ণ গল্প শুনিয়েছেন।

প্রথম ছবি হীরের আংটি (১৯৯৪), কাহিনি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের। কাহিনিনির্ভর কিংবা গল্পনির্ভর চলচ্চিত্র দিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু। এটিও উপমহাদেশের মূল ধারার চলচ্চিত্রের একেবারে ভেতরকার কথা। উপমহাদেশের দর্শক সিনেমাটোগ্রাফি বা নান্দনিকতা নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে ঢের বেশি উদ্বিগ্ন গল্পটি কী। ফলে চলচ্চিত্র দর্শকদের সঙ্গে শুরুর ছবিতেই তাঁর কোনো বিরোধ তৈরি হয় না। বিষয়টি সচেতনভাবেই করেছেন তিনি। কেন নন-ন্যারেটিভ ধারা ভারতীয় চলচ্চিত্রে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি সে বিষয়ে তাঁর স্পষ্ট বোঝাপড়া ছিল :

‘সব সিনেমাই মানুষের মনোরঞ্জনের জন্য তৈরী করা হয় না। এটা সত্যি কথা। কিন্তু মনি কাউল ও কুমার সাহানিরা এসে এতোই দুর্বোধ্য সিনেমা বানানো শুরু করলেন যে সেগুলো দেখার মতো কোন দর্শকই আর রইলো না। তখন নন-ন্যারেটিভ পদ্ধতি সিনেমায় আসতে শুরু করেছে। ভারতের গল্পভান্ডারের কোন শেষ নেই। এদেশের নিজস্ব গল্প, উপকথা, রূপকথা আছে। এর নিজস্ব ট্রাডিশন আছে। তাই হঠাৎ করেনন-ন্যারেটিভ পদ্ধতি কেউ গ্রহণ করেনি।’৬

এই ন্যারেটিভ নিশ্চিত করতে গিয়ে নিজে কাহিনি লেখার পাশাপাশি বেশ কিছু সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁর দ্বিতীয় ছবি উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪) ইংমার ব্যারিম্যানের (১৯৭৮) অটাম সোনাটা অবলম্বনে নির্মিত। তৃতীয় ছবি দহনের (১৯৯৮) কাহিনিকার সুচিত্রা ভট্টাচার্য। এছাড়া নির্মাণ করেছেন অগাথা ক্রিস্টির দ্য মিরর ক্রাকড ফ্রম টু সাইড অবলম্বনে শুভমহরত (২০০৩), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাহিনি অবলম্বনে নির্মাণ করেছেন তিনটি ছবি – চোখের বালি (২০০৩), নৌকাডুবি (২০১০), চিত্রাঙ্গদা (২০১২), ও’হেনরির গল্প দ্য গিফট অব দ্য ম্যাজাই (১৯০৬) অবলম্বনে রেইনকোট (২০০৪), তারাশঙ্করের থিম থেকে অন্তরমহল (২০১০) আর শেক্সপিয়ারের কাহিনি থেকে দ্য লাস্ট লিয়ার।

এইসব গল্পের মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের সম্পর্ক আর ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয় যাকে আমরা আইডেনটিটি বলি, সেই আইডেনটিটির মুখোমুখি হয় তাঁর চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকা, অন্তত খানিকটা সময়ের জন্য। এই আত্মপরিচয়ের মুখোমুখি হওয়া চূড়ান্তভাবে আমরা দেখি চিত্রাঙ্গদায় (২০১২), সন্দেহ নেই। রুদ্র ভালোবাসে পার্থকে, পার্থও কি? ভালোবেসে পার্থকে রুদ্র তার লিঙ্গ পরিবর্তনের জটিল অপারেশনের ভেতর দিয়ে যায় আর তার মনোদৈহিক যন্ত্রণায় যে স্পেসটি সে পায়, সেখানে সে আসলে উন্মোচিত হতে থাকে নিজেরই কাছে। সে বোঝাপড়া করে নিজের সঙ্গে, আসলে সে কে? পরিবার-সমাজ তাকে যে পরিচয় দিয়েছে, তার পরিচয় কি সেটি? নাকি তার ‘ডিজায়ার’ তাকে যেভাবে দেখতে চায় সেটি? এই দ্বন্দ্ব তিনি নিষ্পত্তি করতে পারেননি চলচ্চিত্রে শেষ পর্যন্ত, যেমন পারেননি তাঁর জীবনেও। কিংবা হয়তো পেরেছিলেন নিজের জীবনে অনেক চড়ামূল্যে, তবে চলচ্চিত্রের রুদ্র শেষতক পারেনি। রুদ্র ফিরে গেছে কাঠামোর কাছে ফের। এটিই কি তাঁর চলচ্চিত্রের মূল প্রবণতা? উস্কে দিয়ে কি ফের কাঠামোর কাছে ফিরে যান তিনি?

 

উস্কে যদি দেন, তবু কেন ফিরে যান কাঠামোর কাছে?

 

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে হীরের আংটি (১৯৯২), তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র। তেমন কোনো অভিঘাত তৈরি করেনি, তবে পরিচ্ছন্ন গল্প বলার ইঙ্গিতটি এই শুরুর কাজেই ছিল। এবং সেই ইঙ্গিত বুঝে উঠবার আগেই তিনি চমক নিয়ে আসেন দ্বিতীয় চলচ্চিত্র উনিশে এপ্রিলের (১৯৯৪) জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়ে ১৯৯৫ সালে। মাত্র ৩১ বছর বয়স তখন তাঁর।

দ্বিতীয় ছবি ইংমার ব্যারিম্যানের অটাম সোনাটা অবলম্বনে উনিশে এপ্রিলের কাহিনি বা নির্মাণশৈলীও প্রচলিত কাঠামোর বাইরে নয়। এক ডাক্তার-মেয়ে এবং তাঁর সেলিব্রিটি নৃত্যশিল্পী মায়ের দ্বন্দ্ব এবং শেষতক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে কাহিনি এগোয়। মেয়ের ধারণা ছিল তাঁর বাবার সঙ্গে মায়ের দূরত্বের জন্য মা-ই দায়ী, নৃত্যশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ারের দিকে নজর দিতে গিয়ে বাবার সঙ্গে দূরত্ব হয়েছে। মাকে সে তাই ক্ষমা করতে পারে না। বিশেষ করে মায়ের পুরুষ বন্ধুকে নিয়েও তার অসন্তুষ্টি তুঙ্গে। এসব কারণে তার নিজের বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গেও সম্পর্ক ভেঙে যায় যায়। ফের মায়ের সঙ্গে আলাপচারিতার মাঝেই তার ভুলও ভাঙে এবং শেষ পর্যন্ত বয়ফ্রেন্ডও তার কাছে ফিরে আসে। যতটা সময় নিয়ে ঋতুপর্ণ তাঁর কাহিনিতে উত্তেজনার গোড়াপত্তন করেন এই চলচ্চিত্রে, সেই তুলনায় সমাধানটা হয়ে যায় যেন হঠাৎ করেই। কাহিনি বা উপস্থাপনশৈলী মূলধারার কমার্শিয়াল চলচ্চিত্রের। নায়ক-নায়িকা কমার্শিয়াল – অপর্ণা সেন, দেবশ্রী রায়, দীপংকর দে। বক্স-অফিস তিনি মাথায় রেখেছেন। শুরুর দিকেই একটি শারীরিক মিলন দৃশ্যের নির্মাণ বাণিজ্যিক প্রয়োজনে, তবে সাহসী। তবু গতানুগতিক এই কাহিনির একটি বিষয় নজর এড়ায় না আর তা হলো পুরুষতান্ত্রিক প্রাত্যহিকতার বাইরে নারী চরিত্র দুটি তাঁদের একটি নিজস্ব পরিসরেই পরস্পর পরস্পরের কাছে উন্মোচিত হন। আর সেই পরিসর বা স্পেসটি হলো রান্নাঘর, রান্নাঘরেই কাছাকাছি আসেন তাঁরা। নারী চরিত্রগুলোর জন্য এমন পরিসর বারবার তৈরি করে দেন ঋতুপর্ণ, সেই পরিসরেই তাঁর চলচ্চিত্রের নারীদের পারস্পরিক সম্পর্ক একে অন্যের কাছে উন্মোচিত হয়।

চলচ্চিত্রটির কমার্শিয়াল উপাদান তিনটি : প্রথমত, কমার্শিয়াল কুশীলব; দ্বিতীয়ত, যৌনতার উপস্থাপন যা তখন পর্যন্ত বাংলা সিনে ইন্ডাস্ট্রিতে এভাবে ব্যবহৃত হয়নি অথচ ব্যবহৃত সেই মাত্রায় যে মাত্রায় শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি খুব বেশি আহতও হয় না; তৃতীয়ত, শেষ যেভাবে হয় সবাইকে তুষ্ট করার মধ্য দিয়ে, অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোকে একেবারেই আহত না করে। সম্পর্কের সমস্যা উপস্থাপন করলেও সেই সমস্যার সহজ সমাধান তৈরি করে সবাইকে তুষ্ট করার, পরিবার বা সমাজের একটি অচলায়তনকেও আঘাত না করার অদ্ভুত মুন্শিয়ানা প্রদর্শনের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো জাতীয় পুরস্কার অর্জন তাঁর। এই প্রবণতাটি আমরা বারেবারেই দেখব ঋতুপর্ণের চলচ্চিত্রে, এমনকি চিত্রাঙ্গদা পর্যন্ত।

দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন তিনি দহন (১৯৯৮) চলচ্চিত্রের জন্য। সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কাহিনি অবলম্বনে বিষয়বস্ত্ত একদিক থেকে দেখলে আমাদের চেনা জগতের। ‘অপদার্থ’ স্বামীর সামনে গুন্ডারা স্ত্রী রমিতা চৌধুরীকে যৌন নির্যাতন করতে গেলে যখন কেউ এগিয়ে আসেনি তখন স্কুল-শিক্ষক শ্রবণা সরকার তাকে উদ্ধার করতেই শুধু ঝাঁপিয়ে পড়ে না, তাদের দিয়ে আদালতে ডায়েরি পর্যন্ত করায়, গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরে। কিন্তু সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে রমিতার স্বামী, শ্বশুরবাড়ি রমিতার ওপর চাপ প্রয়োগ করে তাকে দিয়ে কার্যত এই কেসের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করে। অন্যদিকে শ্রবণা সরকার একা লড়াই করতে গিয়ে আইনি মারপ্যাঁচে কোর্টে প্রমাণ তো করতে পারেই না, বরং অসুস্থ ও একা হয়ে যায়। তার প্রেমিকের সঙ্গে মানসিক বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এই কাহিনিতে দুই ধারার নারী। শ্রবণা ও শ্রবণার ঠাকুরমা বনাম রমিতাসহ অন্যান্য নারী। স্রোতের বিপরীতে থাকা এই দুই নারী শেষ পর্যন্ত একাকিত্বই বরণ করেছে এবং সুখী হয়নি। কিন্তু তাদের লড়াই কাউকে এমনকি উদ্বুদ্ধ পর্যন্ত করে না এমন কাজ ফের করবার জন্য এবং শ্রবণার লড়াইটা কাঙ্ক্ষিতও হয়ে ওঠে না। এক ধরনের ‘আহা’বোধ তৈরি হয় বড়জোর। দহন তাই শ্রবণার ব্যক্তিগতই থেকে যায়, ব্যক্তিগত থেকে যায় রমিতার। রমিতা কিছুদিনের জন্য তার দিদির কাছে মন্ট্রিয়লে যাবে কারণ সে সম্পর্কগুলো যেখানে যেমন আছে সেগুলোর মুখোমুখি না হয়ে ‘যেমন আছে থাক না তেমন’ করেই রেখে দিতে চায়। রমিতার জা পরিবারের জন্য খেটে যাবেন প্রশ্নহীন। এই কাহিনিতেও শ্রবণা ও তার ঠাকুরমা এবং রমিতা ও রমিতার দিদির মধ্যে একটি অলক্ষ্য স্পেস তৈরি করে দিয়েছেন ঋতুপর্ণ, যেখানে তারা নিজেদের উন্মোচন করে কিন্তু সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। কেবলই ব্যক্তিগত কথোপকথনের পরিসর, রমিতার ক্ষেত্রে কেবলই মনোলোগ, চিঠিতে। এমনকি শ্রবণা পর্যন্ত দূরত্ব তৈরি হওয়া বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিবাহিত হওয়াটার কাছেই সমর্পণ করে এবং তীব্র ব্যক্তিত্বশালী ঠাকুরমা সেই একমাত্র ‘নাতজামাই’কে পায়েস খাওয়ানোর জন্য বসে থাকেন। এইসব দহন তাই প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর একটি ইটেও স্খলন ধরায় না এবং শ্রবণা-শ্রবণার ঠাকুরমার পরিসর এবং রমিতা-রমিতার দিদির পরিসর শেষ পর্যন্ত ভেতরের দহনকে উন্মোচন করে, একটু জিরিয়ে ফের কাঠামোতে ফিরে আসার সেতু হিসেবেই কাজ করে। দর্শক দারুণ একটি চলচ্চিত্র দেখার সন্তুষ্টি নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। এমনই সন্তুষ্টি নিয়ে দর্শক বাড়ি ফিরে যায় উৎসব (২০০১) দেখে, ‘অন্ত্যমিলে রাজপুত্রের জয়’ দেখে বাড়ি ফিরে যায় দর্শকরা দোসর (২০০৬) দেখে। বিধবা বিনোদিনীর যৌনতাকে যথেচ্ছ উপস্থাপন করেও রবীন্দ্রনাথের কাহিনির সূত্রেই মহেন্দ্রকে দিয়ে শেষ দৃশ্যে তাকে ‘বউঠান’ বলে প্রণাম করার মধ্য দিয়ে, তাকে কাশি পাঠিয়ে স্বস্তি ফিরিয়ে দেন দর্শকদের চোখের বালিতে, যেমন শখানেক বছর আগে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বস্তি ফিরে আসে শেষতক নৌকাডুবিতে। এমনকি স্বস্তি ফিরে আসে চিত্রাঙ্গদাতেও, রুদ্র ফিরে আসে নিজের কাঠামোতে। শুভমহরতে অপরাধীর শাস্তি হয় আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। বাড়িওয়ালির বনলতার জীবনে যে ঝড় উঠেছিল, সে ঝড় শান্ত হয়ে আপন চৌহদ্দিতেই ফিরে পান নিজেকে বনলতা। রেইনকোটে প্রেমিক-প্রেমিকার ভালোবাসা অটুট প্রমাণিত থাকে। অন্তরমহলে অবশ্য জমিদারের ছোট বউকে আত্মহত্যা করতে হয়, সম্ভবত তারাশঙ্করের কাহিনির প্রসাদগুণে, কিন্তু সে বছর দুর্গাপূজায় দেবী প্রতিমার পরিবর্তে ঘটপূজা হয়েছিল, এর বাইরে খুব কোনো অভিঘাত তৈরি হয়নি। তাঁর প্রথম দিককার নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র দহন, অসুখ, বাড়িওয়ালির নারীরা শেষতক একা, পরাজিত, বিষণ্ণ হয়ে ফিরে যান নিজ পরিসরে আর পরবর্তী অংশের চলচ্চিত্রে, যেমন উৎসব, দোসর, সব চরিত্র কাল্পনিক, নারীদের জেদ, ক্ষোভ, অহংকারের পরিণতি তাদের স্বামীদের কাছে ফিরে যাওয়ায়। সম্পর্কের রি-ইউনিয়নে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে পান দর্শক। নারী-চরিত্রগুলোর ভেতর কখনোবা নড়াচড়া শুরু হয় বেশ জোরেশোরে এসব চলচ্চিত্রে এবং যেসব সমস্যার মুখোমুখি তারা হন, সেইসব সমস্যার অনায়াস সমাধান কিন্তু পরিচালক ব্যবস্থাপত্রের মধ্যেই রাখেন। কেউই সেসব নড়াচড়া ছাপিয়ে বেরিয়ে আসতে উদ্যোগী পর্যন্ত হন না। তিনি পরিবার ও সমাজ কাঠামোকে আশ্বস্ত রাখতে এতই বদ্ধপরিকর যে, যেসব চলচ্চিত্রে মনে হয়, আরে এইবার তো তিনি অন্য মাত্রায় পৌঁছে গেছেন, পেছনে বুঝি ফেলে এলেন ধ্যারধেরে বিশ্বাস আর সামাজিক যত অনড়, অটল সম্পর্ককে, কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত কাহিনিকে নিয়ে যান সকল বিরোধশেষে বৃত্তেই ফিরে আসায়। সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয় কোনো চুম্বন-দৃশ্যে বা শরীরী-ঘনিষ্ঠতার দৃশ্যে কিংবা অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল যে সমস্যায় সেটি মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। এই মেনে নেওয়ার সম্পর্ক-পুনঃস্থাপনমূলক চলচ্চিত্রে পুরুষচরিত্রই অবধারিতভাবে সক্রিয়, সিদ্ধান্ত নির্মাণকারী। নারী চরিত্রগুলো কেন এমনভাবে ফিরে আসে ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের কাছে, সেটিও পরিষ্কার নয়। অথচ একশ বছরেরও আগে রবীন্দ্রনাথ যখন নষ্টনীড় লেখেন আর সত্যজিৎ নির্মাণ করেন চারুলতা, তখনো কিন্তু ভেঙে যাওয়া পারিবারিক বিশ্বাস জোড়া লাগানোর কোনো পথ তাঁরা রেখে আসেন না। অথচ ভারসাম্য তৈরিতে ঋতুপর্ণকে আত্মসমর্পণ করতে হয় বক্স-অফিসের কথা মাথায় রেখে, এবং নিজের সৃজনশীল ক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিকতার কাছে তাঁকে এই বিন্দুতে বারেবারেই আত্মসমর্পণ করতে হয়।

যদিও সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর নির্মাণকে অনেকেই একাকার করে দেখেন, কিন্তু স্মরণ করা যেতে পারে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালীর কথা। কী ভীষণ ধাক্কা দিয়েছিল সেই সময়ে উপমহাদেশের গোটা চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে। তছনছ করে দিয়েছিল চলচ্চিত্র-সম্পর্কিত সকল ধারণাকে। আসলে এখনো দেয়। সত্যজিতের কাহিনি ও ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষা ছিল বরাবর আসক্তিহীন। শিল্পের জন্য যা প্রয়োজন, তিনি তাই-ই করেছেন নির্মোহভাবে – বাজার কিংবা সমালোচক তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না কখনই। একেবারে শুরুর চলচ্চিত্র থেকে। কাঞ্চনজঙ্ঘার কুয়াশা ও মেঘের সঙ্গে সঙ্গে মানব-মানবীর মনঃপরিবর্তন বিষয়ে সত্যজিৎ যখন কুয়াশাময় আবছা ছবি নিয়ে আসেন সিনেমার পর্দায়, তখন তিনি থোড়াই কেয়ার করেন দর্শক কীভাবে নেবে সেই আবছা ছবিকে। সত্তরের দশকে সত্যজিৎ সম্পূর্ণ ভিন্নধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। সে সময়কার কলকাতার রাজনীতিকে তিনি উপেক্ষা করেননি। কিন্তু ঋতুপর্ণ সবসময়ই দারুণ ছবি নির্মাণ করতে চেয়েছেন, দর্শক-সমালোচক নন্দিত হতে চেয়েছেন, দর্শক যে কারণে প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র দেখতে আসে, সেই সুন্দর-সুরুচিবান মান-কাঠামোকে একইভাবে ধরে রাখতে চেয়েছেন বরাবর, তাই তাঁর কাছে যে দর্শক-প্রত্যাশা সংস্কৃতি-ইন্ডাস্ট্রি গড়ে দিয়েছে, তিনি তার বাইরে যাওয়ার সাহস দেখাননি শেষ পর্যন্ত। আর রবীন্দ্রনাথের নির্মাণের অন্তরালে যে শূন্যতা, যে হাহাকার, এমনকি বসন্তের গানের নিচেও যে ক্ষণিকে ফুরিয়ে যাওয়ার বেদনা, সেই আশ্চর্য অন্তর্লীন বেদনা ঋতুপর্ণের নির্মাণে কোথায়? তাই রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিতের নির্মাণ-কাঠামোর ধারাবাহিকতা যদিবা পাওয়া যায় ঋতুপর্ণে, অন্তর্নিহিত অনুসন্ধানটি সেখানে পাওয়া যায় না।

কিন্তু প্রশ্নগুলো ছিল তাঁর মধ্যে, তাই কাঠামোর মধ্যে থেকেই তিনি খানিক উস্কে না দিয়ে পারেননি সেসব প্রশ্ন এবং কাঠামোর মধ্যেই মিলিয়ে দিয়েছেন। এসব প্রশ্নের নিচে বহমান পুরুষতন্ত্র ও পুঁজির আধিপত্যশীল ক্ষমতা-কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা তো দূরে থাক, চিহ্নিতও করেননি। সেই শূন্যস্থান তিনি পূরণ করেছেন ভালো গান, ভালো শট, ভালো কবিতা, ভালো সম্পাদনা ব্যবহার করে। দর্শকরা বাণিজ্যিক ধারার সবচেয়ে দামি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দারুণ পোশাকে মোড়া অসাধারণ অভিনয়সমৃদ্ধ চমৎকারভাবে নির্মিত প্রশ্নহীন বা সকল প্রশ্নের সমাধানকৃত ছবি দেখে বাড়ি ফিরেছেন। এটিই পুঁজির বৃত্তে বন্দি সংস্কৃতি-ইন্ডাস্ট্রির কুশীলবদের অনিবার্য ট্র্যাজেডি। তাঁদের সফলতার অন্তর্গত আপসই তাঁদের অনিবার্য ট্র্যাজেডি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ঋতুপর্ণ, বাংলা চলচ্চিত্রের অসামান্য প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকার, এই ট্র্যাজেডি এড়াতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ঋতুপর্ণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্থিতাবস্থার আশ্চর্য মেধাবী নির্মাতা এক!

 

তথ্যসূত্র

১।     সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন AsiaSource-এর Nermeen Shaikh। ২০০৩ সালের Locarno International Film Festival- Golden Leopard-এর জন্য মনোনীত ঋতুপর্ণের চোখের বালি। ২০০৫ সালের ৯ এপ্রিল ৩য় বার্ষিক South Asia Human Rights Film Festival উপলক্ষে এশিয়া সোসাইটি সিনেমাটি প্রদর্শনের আয়োজন করে। প্রদর্শন উপলক্ষে ঋতুপর্ণ নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন। সে-সময়েই এই সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। অনুবাদ করেছেন খান মুহাম্মদ বিন আসাদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি পাওয়া যাবে

        http://www.cadetcollegeblog.com/muhammad/4419

২।     (Shaikh, 2003/অনুবাদ : আসাদ)।

৩।    (Shaikh, 2003/অনুবাদ : আসাদ)।

৪।     ঋতুপর্ণকে উদ্ধৃতকারী লেখকের নাম পাওয়া যায়নি। AsiaSource-এর উল্লেখ করে অনেকগুলো ওয়েবসাইটেই এই লেখাটি পাওয়া গেছে ‘ডেস্ক রিপোর্ট’ হিসেবে। আমি নিয়েছি ‘নগ্নতা, ধর্ষণ, চুম্বনদৃশ্য শুটিংয়ে যা করতে হয়’ শীর্ষক লেখা থেকে। লেখাটি পাওয়া যাবে : http://www.fuleswaricox24.com

।    প্রাগুক্ত।

৬।            (Shaikh, 2003/অনুবাদ : আসাদ)।

Leave a Reply

*