logo

ইন্দুবালা : স্মৃতি ও প্রণতি

বাঁ ধ ন  সে ন গু প্ত

সংগীতরসিক মানুষের কাছে ‘সংগীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালা’ নামটি বাঙালি সমাজে আজো শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকে। সর্বভারতীয় ধ্র“পদী সংগীতের আলোচনায়ও শোনা যায় তাঁর নাম ও গানের কথা। তাঁর সুধীকণ্ঠের পরিশীলিত পরিবেশনার গুণে তিনি চিরদিন রসিকসমাজের মন জয় করে নিয়েছিলেন। বাংলার নাট্যমঞ্চে, চলচ্চিত্রে এবং সর্বোপরি রেকর্ডের গানে তাঁর সমকালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথম জীবনে কিংবদন্তি এক শিল্পী ওস্তাদ গৌরীশঙ্কর মিত্রের কাছে সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি। সেটা ১৯১২ সাল। ইন্দুবালার বয়স তখন চোদ্দ। অবশ্য মা রাজবালার কোলে বসেই প্রথম মুখে মুখে তাঁর গান শেখা শুরু। গৌরীশঙ্কর ছিলেন সেকালে কলকাতা ও বেনারসের বিখ্যাত এক সারেঙ্গিবাদক। মা রাজবালার বাড়িতে সংগীতের আসরে আসতেন তখন ওস্তাদ লছমী মিত্র। তিনি ইন্দুবালার গান শুনেই তাঁর ভাই গৌরীশঙ্করকে নিয়ে আসেন। ইন্দুবালা তাঁর পরামর্শে নাড়া বাঁধেন ওস্তাদজি গৌরীশঙ্করের কাছে। প্রণামি ধার্য হয় সেকালে মাসিক পঁচিশ টাকা। সে সময় গৌরীশঙ্করের কাছে গান শিখতেন কৃষ্ণচন্দ্র দে, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, শ্বেতাঙ্গিনী কৃষ্ণভামিনী ও অনাথনাথ বসু এবং ইন্দুবালা স্বয়ং। গৌরীশঙ্করের ঠিকানা ছিল তখন ১৫৮ বলরাম দে স্ট্রিট, জোড়াসাঁকো, উত্তর কলিকাতা। তাঁর সহযোগী ছিলেন প্রিয় সারেঙ্গিবাদক শ্যালক ছন্নুলাল মিশ্র এবং চানু মিশ্র। ছন্নু পরে গান গেয়েও খুব সুনাম অর্জন করেছিলেন।
গৌরীশঙ্করের বাবা ছিলেন বিখ্যাত বেচু ওস্তাদ। তাঁর প্রধান শিষ্যা ছিলেন সেকালের শ্রেষ্ঠ গায়িকা রূপসী অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেই শিল্পী গওহরজান। গওহরজানের গানের সময়ে আসরে তাঁর দুপাশে সারেঙ্গি হাতে বসতেন ওস্তাদ গৌরীশঙ্কর মিশ্র ও পাটনার ওস্তাদ এমদাদ খাঁ। এই গওহরজান এক আসরে ইন্দুবালার গান শুনে তাঁকে স্বয়ং গান শেখাতে রাজি হয়েছিলেন।
গৌরীশঙ্কর মিশ্রের কাছে প্রথমে যে গানটির তালিম ইন্দুবালা পেয়েছিলেন সেটি ছিল ইমন রাগের একটি গান – বাংসুরি মোরি মোরা জিনা ছুঁয়ো। সেবার জন্মাষ্টমীতেই প্রথম গান গাইবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ইন্দুবালা। সেখানে গাইতে এসেছিলেন স্বয়ং গওহরজান, আগ্রাওয়ালি মালকা, চুলকুল্লেওয়ালি মালকা নূরজাহান, বেনজীর, লক্ষেèৗওয়ালি কচুয়াবাঈ, মনুয়াবাঈ, বেনারসওয়ালি, বড়ৈসৈনা, শুনোনা, জানবীবাঈ, মৈতুদ্দিন, কেরামত উল্লা খাঁ, যাদুমণি, কিরণবাঈ, সরমাবাঈ, কৃষ্ণভামিনী ও আরো অনেকে। ভারতশ্রেষ্ঠ গত শতাব্দীর সেই শিল্পীদের উপস্থিতিতে সেই প্রথম গওহরজানকে প্রণাম করে ইন্দুবালা ১৯১২ সালে আসরে প্রকাশ্যে গেয়েছিলেন সেই ইমন রাগের গুরুর কাছে শেখা প্রথম গানটি এবং খেয়ালের পর একটু ঠুংরি। খেয়াল, ঠুংরি, ভজন ছাড়াও পাঞ্জাবি টপ্পা গানেও ইন্দুবালার সেকালে খুব সুনাম ছিল। তাঁর প্রিয় রাগের মধ্যে ইমন ছাড়াও ছিল বেহাগ, কেদারা, খাম্বাজ, ছায়ানট, পুরিয়া, মিশ্র পিলু, মিশ্র ভৈরবী, মিশ্র তিলক-কামোদ, মিশ্র বেহাগ, সিন্ধু, মিশ্র কানাড়া, আশাবরী, মেথ ইত্যাদি। এছাড়া তাঁর গাওয়া অসংখ্য গজল গান ছিল সেকালে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তখন থেকে সারা দেশে রাতারাতি ছড়িয়ে পড়তে থাকে নবাগতা এই প্রতিভাময়ী শিল্পীর গানের কথা। তাঁকে প্রদান করা হয় সংগীতসম্রাজ্ঞীর সম্মান।
শিল্পী ইন্দুবালার জন্ম ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে। কাজী নজরুল ইসলামের চেয়ে বয়সে তিনি ছিলেন মাস সাতেকের বড়। আমি তাঁকে প্রথম দেখি মার্কাস স্কয়ারে ও মহাজাতি সদলে নজরুল গানের আসরে প্রতিষ্ঠিত গায়িকা হিসেবে। তাঁর বয়স তখন ছেষট্টি। তখনো তাঁর গলায় প্রচণ্ড দাপট। মার্কাস স্কয়ারে তখন বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলন প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হতো। সেখানে ইন্দুবালা, আঙুরবালা এবং শচীন দেববর্মনও গাইবার জন্যে আমন্ত্রিত হতেন। প্রথম তাঁর গলায় শুনেছিলাম নজরুলগীতি – কেন আলো ফুলডোর আজি বিদায়বেলা। মহাজাতি সদনেও তখন ‘অগ্নিবীণা’ আয়োজিত নজরুল জন্মজয়ন্তীতে সকল প্রতিষ্ঠিত শিল্পীই আমন্ত্রিত হতেন। সেখানেও ১৯৬৪ সালেই শুনেছিলাম সংগীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালার গাওয়া গান – অঞ্জলি লহ মোর সংগীতে। তখন কেবলই তাঁকে দর্শকাসন থেকে দেখবার সুযোগ হয়েছিল। পরে বছর দুই বাদেই তাঁর সান্নিধ্যে আসবার সুযোগ হলো।
তখন ১৯৬৭ সাল। লেখক সমরেশ বসুর স্ত্রী সুকণ্ঠী গায়িকা গৌরী বসুর কাছে গান শিখতে যেতাম প্রতি সপ্তাহে। তাঁর গায়িকা ইন্দুবালার সঙ্গে পত্রে যোগাযোগ হবার পর তাঁর একান্ত অনুরোধে ইন্দুবালাকন্যা সমা গৌরীকে গান শেখাতে রাজি হন। ফলে আমি গৌরী বসুকে নিয়ে যেতাম প্রায়ই ইন্দুবালার বাড়িতে উত্তর কলকাতার ২১ যোগেন দত্ত লেনে। প্রথম দিন গৌরী বসুই আমাকে সংগীতসম্রাজ্ঞীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মনে আছে প্রথম দিন গায়িকার পা ছুঁয়ে প্রণাম করায় তিনি দ্রুত সরিয়ে নিয়েছিলেন তাঁর পা। কুণ্ঠা ভরা গলায় বলেছিলেন – বাবা, আপনি কত পণ্ডিত। গণ্যমান্য মানুষ। প্রণাম নিলে যে আমার পাপ হবে। আসলে বড়দি তাঁর চিঠিতে আগেই আমার সম্পর্কে অনেক কথা জানিয়েছিলেন। আমার নজরুল গবেষণার খবর জানিয়ে দেওয়াতেই সেই বিপত্তি। আমি অবশ্য তাঁর আপত্তি না মেনে তাঁকে সেদিন প্রণাম করে ধন্য হয়েছিলাম। ক্রমশ ‘আপনি’ থেকে তুমি বলে সম্বোধন করতে তিনি রাজি হলেন। গৌরী বসুকে আমরা ছাত্রছাত্রীরা বড়দি বলে ডাকতাম। ফলে বড়দির মতোই আমিও পনেরো দিন থেকে ইন্দুবালা দেবীকে ‘ইন্দুমা’ অর্থাৎ মা মা বলেই ডাকবার সৌভাগ্য লাভ করলাম। অবশ্য তিনি তাঁর জামাই বাবাজি অর্থাৎ সমরেশ বসুকে শেষ পর্যন্ত ‘বাবু’ বলেই সম্বোধন করতেন। সমরেশদার সঙ্গে তাঁর দেখা হলে মজার মজার কথার বিনিময় হতো। সমরেশদার আগ্রহে সম্মতি পেয়ে ইন্দুমা কিছুদিন পরেই একবার নৈহাটিতে এসে সমরেশ বসুর বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। ছিলেন দিন দুই। তাঁর সঙ্গী ছিল পালিত পুত্র প্রণব বসুর (মালা) বউ ছবি ও তার ছেলে পল্লব। নৈহাটিতে গৌরী বসুর অবস্থানকালে যে আদর-আপ্যায়ন ইন্দুমা পেয়েছিলেন তা কোনোদিনই ইন্দুবালা ভুলতে পারেননি। সেই সঙ্গে ছিল লেখক সমরেশ বসুর সান্নিধ্য এবং জামাই বাবাজির সঙ্গে দিনভর তাঁর নানা মজার মজার গল্প, রসিকতা আর গান। সেইসব দিনের স্মৃতি আজো ভোলা দায়।
রামবাগান এলাকাটিকে আগে বলা হতো রূপোগাছি। পাশেই ছিল সোনাগাছি, যার পুরনো নাম ভল্লুকবাগান। মা রাজবালা বা ‘রাজুবালা’ মেয়ে ইন্দু হবার পর কিছুকাল সিমলা স্ট্রিটে বাস করেছিলেন। তারপর বালিকা ইন্দুকে নিয়ে তিনি ২১ দয়াল মিত্র লেনে এসে বসবাস করতেন। স্বামী মতিলাল বসু তখন তাঁর সার্কাস দল নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতেন। তিনি ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বন্ধু। শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলন শেষে ফেরার পথে লাহোরে মতিলাল বসুর সঙ্গে বিবেকানন্দের শেষবার দেখা হয়েছিল। ১৯১০ সালের ১৭ ফেব্র“য়ারি বহুমূত্র রোগে মতিলালের অস্ত্রোপচারকালে মৃত্যু হয়। ইন্দুমার বয়স তখন বারো। মা রাজবালার কত গল্প তখন তাঁর মুখ থেকেই শুনতাম। বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে যেত সেসব গল্প শুনতে শুনতে রামবাগানের দোতলায়।
শুনেছিলাম ১৮৮৭ সালে কলকাতার মালোপাড়ায় রাজবালার জন্ম। অর্থাৎ নটী বিনোদিনীর জন্মের (১৮৭৭) ঠিক দশ বছর পরেই তাঁর আগমন। বাঙ্লায় পাবলিক থিয়েটারের সূচনা হয় ৭ ডিসেম্বর ১৮৭২ সালে। নাটকের নাম নীলদর্পণ। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র। পরের বছর ১৮৭৩ সালের ১৬ আগস্ট মধুসূদনের শর্মিষ্ঠা যখন মঞ্চস্থ হয় তখন থেকে শুরু হয় বাংলা নাটকে অভিনেত্রীদের অংশগ্রহণ। শুরু হয় অভিনয়জগতে মহিলাদের জয়যাত্রা।
রাজবালার জন্মের (১৮৮৭) মাত্র মাস চারেক পরেই রাজবালার মা পুঁটিরানী দাসীর মৃত্যু হয়েছিল, এমনকি কয়েক বছর পরেই তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর বাবাকেও। পুঁটিরানীর পনেরোটি সন্তানের মধ্যে কন্যা রাজবালাই ছিলেন শেষ সন্তান। মৃত্যুর আগে পুঁটিরানীর নামে তাঁর স্বামী কলকাতায় দুটি বাড়ি দিয়ে যান। কিন্তু আত্মীয়স্বজনের ছলচাতুরীতে তা শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়ে যায়। পুঁটিরানীকে ঠাঁই দেন জনৈকা এক প্রতিবেশী। তাঁর নাম খুদিমাসি। অন্যদের হাতে প্রতিপালিত রাজুর খুদিমাসি খুব দাপুটে বলে প্রতিবেশীরা খুবই সমীহ করত। তাঁকে সবাই বেশ ভয় পেত। এলাকায় তাঁকে সবাই ডাকত ‘ছোটবাবু’। খুদি রাজবালাকে খেতে-পরতে দিতে কখনো কার্পণ্য করেননি। বড় বোন হরিমতী হঠাৎ আশ্রয়ের খোঁজে স্বেচ্ছায় পালিয়ে ঢাকায় চলে যায়। অসহায় রাজবালা একদিন সে সময় খবর পেলেন কলকাতায় নাকি এক বাঙালিবাবুর সার্কাসের দল এসেছে। সেখানে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের খেলা দেখানোর কাজে নেওয়া হবে। কাগজে তাই বড় বিজ্ঞাপনও বেরিয়েছে। সার্কাসের দলটির নাম ‘বোসেস গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’। মালিক চব্বিশ পরগনার ছোট জাগুলিয়া গ্রামের বসু পরিবারের জনৈক মতিলাল বসু, বিএ। রাজুবালার মুখেই আমি শুনেছিলাম মতিলালের বাবা ছিলেন সেকালের স্বনামধন্য কবি, নাট্যকার, অভিনেতা ও বক্তা মনোমোহন বসু। মতিলাল ছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত বা ‘বিলে’ অর্থাৎ স্বামী বিবেকানন্দের সহপাঠী ও বাল্যবন্ধু। আর পিতা মনোমোহনের সঙ্গে সহপাঠী মধুসূদনের বন্ধুত্ব ও ঘনিষ্ঠতার কথাও সকলেরই জানা।
প্রফেসর মতিলালের বোসেস সার্কাস দলে রাজবালা খেলা দেখানোর কাজে নির্বাচিত হয়ে নিয়মিত ট্রাপিজের খেলা দেখাতেন। ইন্দুবালার মামা অর্থাৎ তিনকড়ি দাস ওরফে ‘তেনা’ও একই সঙ্গে সেই সার্কাসের দলে যোগ দিয়েছিলেন এবং নিয়মিত ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে ঘুরে ঘুরে খেলা দেখাতেন। জিমনাস্ট হিসেবে রাজবালার খুবই সুনাম ছিল। বিশেষ করে তাঁর বোনলেস ( Boneless) ক্রীড়াশৈলী খুবই জনপ্রিয় ছিল। তখন তাঁর আট-নয় বছর বয়স। বয়স যখন এগারো তখন তাঁর পেশাগত নৈপুণ্যের পাশাপাশি দেহের শ্রীবৃদ্ধি লক্ষ করা গিয়েছিল। মুগ্ধ মতিলাল তাঁর সৌন্দর্য ও গুণে মুগ্ধ হয়ে তখন রাজুর পাণিপ্রার্থী হন। ১৮৯৮ সালে সার্কাস দল যখন উজ্জয়িনীতে তখন সেখানে এক কালীমন্দিরে স্থানীয় পুরোহিতের উপস্থিতিতে মতিলাল ও রাজবালা মা কালীকে সাক্ষী রেখে মাল্যবিনিময় করেন এবং রাজবালাকে সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে করে মতিলাল স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন। সে বছরই অমৃতসরে (পাঞ্জাব) রাজবালার কন্যা ইন্দুবালার জন্ম হয় ১৮ কার্তিক ১৩০৫ (১৮৯৮) বুধবার। তিন বছর পরে মতিলাল কলকাতায় নিজের পরিবারে ফিরে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন। রাজবালা বাধ্য হয়ে কন্যা ইন্দুবালাকে নিয়ে আলাদা বসবাস করতেন। মতিলাল অবশ্য তাঁর খোঁজখবর রাখতেন। কন্যা ইন্দুবালার প্রতি তাঁর আকর্ষণ ও  েস্নহমমতা তখনো বজায় ছিল। মতিলাল রাজবালাকে অর্থব্যয় করে সে সময় রাজুর বাড়িতে ওস্তাদ রেখে  ধ্রুপদ শেখানোর ভার নিয়েছিলেন। রাজবালার গানের সঙ্গে সংগত করতে আসতেন সেকালের অন্যতম প্রধান পাখোয়াজ-বাদক    ওস্তাদ দুলি ভট্টাচার্য। বাড়িতে প্রতি সন্ধ্যায় গানের আসর বসত। রাজবালার সেই সন্ধ্যা আসরে নিয়মিত আসতেন গোবিন্দপ্রসাদ মিশ্র, লছমীপ্রসাদ সিংহ, গোবিল গুরু, কেশবপ্রসাদ মিত্র, চণ্ডী বন্দ্যোপাধ্যায়, রজনীবাবু, ছোট দুলি খাঁ ও বড় দুলি খাঁ, অন্ধ গায়ক বিখ্যাত সাতকড়ি ওস্তাদ, গিরিবালা ও বিড়ালহরির মতো খ্যাতনামা শিল্পীদের দল। অসাধারণ টপ্পা গাইতেন রাজবালা। সেকালে রসিকমহলে তাঁর টপ্পার ভারি কদর ছিল। আমি তাঁর মুখে প্রায়ই টপ্পা শোনার আবদার করতাম। মেজাজ ভালো থাকলে ইন্দ্রবালার উপস্থিতিতে যোগেন দত্ত লেনের ইন্দুবালার গানের সেই ঘরে মেঝেয় ছড়ানো গদির বিছানায় রাজুবালা শোনাতেন পাঞ্জাবি ঘরানার অপ্রচলিত টপ্পা। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশক ছিল মা ও মেয়ের গানের আসরে অন্যতম প্রধান জুটি। সেসব দিনের কথা আমায় লিখে পাঠাতেন পাঞ্জাবনিবাসী প্রবীণ ইন্দুবালার এক অনুরাগী সংগীতরসিক শ্রোতা বলদেব রাজ চুগ। তিনি নিয়মিত ইন্দুবালার শেষ জীবনের খবরাখবর আমার মাধ্যমে চিঠি লিখে জানতে চাইতেন। বলরাজ চুগ সাজেনের ইংরেজিতে লেখা প্রায় শতাধিক এমন আমাকে লেখা চিঠি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে। আমি ১৯৬৭-৮৫ সাল পর্যন্ত তাঁকে প্রতিটি চিঠির উত্তর লিখে পাঠিয়েছি। ১৯৭৫ সালে নতুন দিল্লিতে ভারত সরকার প্রদত্ত সংগীত নাটক অ্যাকাদেমি পুরস্কার যখন ইন্দুবালার প্রতিনিধি হিসেবে আনতে গিয়েছিলাম তখন মিস্টার চুগ খোঁজ নিয়ে রবীন্দ্রভবনে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এবং ইন্দুবালা দেবীর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে হঠাৎ তাঁর চিঠিপত্র বন্ধ হয়ে যায়।
সেকালে সার্কাসের বিস্ময়বালিকা এই রাজবালা গায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি অভিনয়েও সুনাম অর্জন করেছিলেন। বিশের দশকে রাজবালা রামবাগানে (রূপোগাছি) সোনাগাছির ‘ভিখারিনী থিয়েটারের’ অনুকরণে বন্যাক্রান্ত মানুষজনদের সাহায্যার্থে ‘কাঙালিনী থিয়েটার’ নামে একটি নাটকের দল খোলেন। তাঁরই নেতৃত্বে রামবাগানের মেয়েরা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরে নগর প্রদক্ষিণ করে অর্থ ও বস্ত্রাদি সংগ্রহ করে এনে তা বন্যায় আক্রান্তদের মধ্যে বিতরণ করতেন। ‘রামবাগান নারী সমিতি’র কাঙালিনী থিয়েটার রাজবালার নেতৃত্বে মঞ্চস্থ করে নাটক নরমেধ যজ্ঞ। যযাতির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন স্বয়ং রাজবালা। তাঁরই উদ্যোগে এরপর ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শুধুমাত্র মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত ও অভিনীত বাংলাদেশের প্রথম মহিলা থিয়েটার দল ‘রামবাগান ফিমেল কালী থিয়েটার’। পরিচালক হিসেবে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল দানীবাবুর শিষ্য যোগীন্দ্রনাথ সরকারের নাম। কেননা রামবাগানের মেয়েদের কারো নাম থাকলে ব্যবসায় অসুবিধের সম্ভাবনা ছিল প্রবল। অবশ্য রাজবালার সেই ফিমেল কালী থিয়েটারে যোগীন্দ্রনাথ মহলা ও নির্দেশনার কাজেও সাহায্য করতেন। মেয়েদের সেই দলের শোতে টিকিটের হার ছিল একশ বছর আগে দশ, আট, ছয়, পাঁচ, দুই ও এক টাকা। অবশ্য ব্যালকনিতে শুধুমাত্র মেয়েদের টিকিট। দাম দুই টাকা ও এক টাকা। রাজবালার সেই দলটি মোট বারোটি নাটক সাফল্যের সঙ্গে পরপর মঞ্চস্থ করেছিল। যেমন – বিল্বমঙ্গল, হীরের ফুল, খাস দখল, নরমেধ যজ্ঞ, বরুণা, পলিন, হীরেমালিনী, কুঞ্জ দরজী, আলিবাবা, রেশমী রুমাল, পরদেশী ও চন্দ্রগুপ্ত। ফিমেল কালী থিয়েটার দল উঠে যাবার পর ১৯২৪ সালে অভিনেত্রী রাজবালা ‘মডার্ন থিয়েটার নাট্য সম্প্রদায়’ পরিচালিত নবীনচন্দ্র সেনের রৈবতক নাটকে ২০ আগস্ট প্রথম অবতীর্ণ হন নায়িকা সুলোচনার ভূমিকায়। এলফ্রেড রঙ্গমঞ্চে সেই নাটক প্রথম অভিনীত হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন রাজবালা।
১৯৩৫ সালে রাজবালা রাতকানা নামে একটি চলচ্চিত্রে মেয়ে ইন্দুবালার সঙ্গে মায়ের ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করেন। ছবিটি ছিল ডবল ভার্সানের, অর্থাৎ বাংলা ও হিন্দিতে। রাতকানা মুক্তি পেয়েছিল ৩ আগস্ট ১৯৩৫ তারিখে কলকাতায় রূপবাণী প্রেক্ষাগৃহে। পরিচালনা ও ফটোগ্রাফি ছিল যতীন দাসের। প্লেব্যাক অর্থাৎ কণ্ঠদান করেছিলেন রঞ্জিত রায় ও দুনিয়াবালা। ইস্ট ইন্ডিয়ান ফিল্মের এ ছবিটির কাহিনিকার ছিলেন নির্মলশিব বন্দ্যোপাধ্যায়। মেয়ে ইন্দুবালার সঙ্গে এরপর তিনি আর কোনো ছবিতে অভিনয় করেননি। আমায় বলতেন, মেয়ের আমার তখন গানে, থিয়েটারে ও ছবিতে কত সুনাম। আমি কি আর নিজের মেয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারি? তাছাড়া পত্র-পত্রিকায় আলোচনার সময় সেকালে তখন প্রায়ই লেখা হতো – দেখা যাক, এবার মা হারে কী মেয়ে হারে! দেখে অস্বস্তি হতো ভাই!
বিরাশি বছর বয়সে রাজবালা মেয়ে ইন্দুবালার ২১ নং যোগেন দত্ত লেনের রামবাগানের সেই দোতলা বাড়িতেই সেপ্টেম্বর ১৯৬৮-তে (২৭ ভাদ্র ১৩৭৫) শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। তার পরই মা-অন্তপ্রাণ ইন্দুবালা মনের দিক থেকে ক্রমশ সত্যিই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। রাজবালার প্রয়াণের পর থেকে যেন বিগত দুটি শতাব্দীর সাংস্কৃতিক যোগাযোগ প্রকৃত অর্থে ছিন্ন হয়ে গেল। নিমতলা ঘাটে দাহকার্যে আমিও উপস্থিত ছিলাম।
তখন মায়ের তুলনায় মেয়ে ইন্দুবালার খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা ছিল নিঃসন্দেহে আকাশচুম্বী। বিশের দশক থেকে পাঁচের দশক পর্যন্ত তিনি সম্মান ও যশের সমুদ্রে øান করে গেছেন। বহু অর্থ তিনি সে সময় রোজগার করেছিলেন। ছয়ের দশক পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি আকাশবাণীতে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করতেন। তখন অবশ্য তিনি ফেলে এসেছেন তাঁর যৌবন ও জনপ্রিয়তার উজ্জ্বল সোনালি দিন। কিন্তু তখনো গানই ছিল তাঁর সর্বসময়ের সঙ্গী।
গানই ছিল ইন্দুবালার প্রাণ। সেকালে সংগীতে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি প্রতিভা। বিয়ের পর বাবা মতিলাল মাত্র বছরতিনেক পরে যখন রাজবালা ও মেয়ে ইন্দুবালাকে ছেড়ে চলে যান ১৯০১ সালে ইন্দুবালার বয়স তখন মাত্র আড়াই বছর। ফলে মায়ের কাছেই গানে তাঁর হাতেখড়ি। সতেরো বছর বয়সে প্রথম গ্রামোফোনে তাঁর রেকর্ড বেরোল (১৯১৬)। গ্রামোফোন কোম্পানির ম্যানেজার ভগবতী ভট্টাচার্য আর মনীন্দ্র ঘোষের (মোক্তাবাবু) অনুরোধে প্রথম করা ইন্দুবালার রেকর্ডে ছিল দুটি গান – ১. ওরে মাঝি তরী হেথা (P4390) এবং ২. তুমি এসো হে। রেকর্ড করতে এসে পরিচয় হয় প্রথম কাজী নজরুল, জমীরুদ্দিন খাঁ, কমল দাশগুপ্ত, সুবল দাশগুপ্ত, গিরিণ চক্রবর্তীদের সঙ্গে। তাঁর গানে মুগ্ধ নজরুল তাঁকে দিয়ে পরে প্রায় আটান্নটি নজরুলের গান রেকর্ড করান। রেকর্ডে তিনি প্রথম হিন্দিতে রেকর্ড করবার অনুমতি আদায় করেছিলেন। ফলে তাঁর গলায় রেকর্ডে শোনা গিয়েছিল হিন্দি ভাষায় গাওয়া খেয়াল, রাগাশ্রিত গান, গজল ইত্যাদি। তাঁর গাওয়া বাংলায় নজরুলসংগীত (আটান্নটি), শ্যামাসংগীত (এগারোটি), বেসিক বাংলা গানের সংখ্যা পঁয়ষট্টিটি ও হাসির গান দুটিসহ মোট একশো চৌত্রিশটি গান। পাশাপাশি এছাড়া ছিল উর্দু ও হিন্দিতে গাওয়া একশো নয়টি গানের রেকর্ড এবং দুটি পাঞ্জাবি গান, দুটি ওড়িয়া গানসহ দুটি চৈতী গান (Sample record)| শুধু তাই নয়, সিনেমায় তাঁর গাওয়া গানের সংখ্যা উর্দু ও হিন্দিতে একত্রিশটি এবং বাংলায় ফিল্মে গাওয়া আরো চারটি গান ছিল তাঁরই গলায় রেকর্ডে বিধৃত। ফলে সংগীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালার মাত্র ত্রিশ বছরে রেকর্ডে গাওয়া গানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল সর্বমোট দুশ চুরাশি অর্থাৎ প্রায় তিনশর কাছাকাছি। অর্থাৎ প্রতিবছরে গড়ে আটটি করে গানের রেকর্ড, যা আজো প্রায় ভাবাই যায় না! পাশাপাশি প্রায় বারোটি রঙ্গমঞ্চে ইন্দুবালা অভিনীত অসংখ্য রজনীসমৃদ্ধ বাংলা নাটকের সংখ্যা মোট পঞ্চান্ন। এর মধ্যে সর্বাধিক অভিনীত ইন্দুবালার নাটক ছিল বিল্বমঙ্গল, যা চারশ রজনী অতিক্রান্ত হয়েছিল। তাঁর অভিনীত শেষ নাটক ছিল পৃথ্বীরাজ (২৩ ডিসেম্বর ১৯৫০)। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও ইন্দুবালা ছিলেন যথেষ্ট জনপ্রিয় গায়িকা ও অভিনেত্রী। মোট পঞ্চাশটি ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন। ছবিগুলো ছিল বাংলা, হিন্দি, উর্দু, তামিল ও পাঞ্জাবি ভাষায় তোলা। অথচ প্রতিভাময়ী ইন্দুবালা মাত্র ষোলো বছরে (১৯৩১-৪৬) এতগুলো ছবিতে অভিনয় ও গান গেয়ে সারা ভারত জয় করেছিলেন। আবার এরই পাশাপাশি ইন্দুবালা ‘সম্মিলিত নারী সমিতি’, পশ্চিমবঙ্গের সভানেত্রী ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ১৯৫৮ সালে ড. প্রতাপচন্দ্র চন্দ্রের সভাপতিত্বে পশ্চিমবঙ্গব্যাপী ‘সমাজ উপেক্ষিতা পতিতা নারীদের সম্মেলন’ মধ্য কলকাতায় সাফল্যের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রকাশ্য সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী শ্রী অশোক সেন (২৮ জুলাই ১৯৫৮)। সমাজবহির্ভূতা পতিতা নারীদের জীবনযাত্রার উন্নয়নকল্পে আজীবন এই প্রতিভাময়ী নিজে সামনে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দান করে গিয়েছেন। তাঁর উদ্দীপ্ত বিবৃতি ও বক্তৃতা সেকালে পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হতো।
প্রায় দুই দশক, আমি তাঁর কাছে নিয়মিত যাতায়াত করেছিলাম। একসময় দোতলার ঘরটি নজরুল ইসলামসহ বিখ্যাত গায়ক-গায়িকাদের উপস্থিতিতে সংগীতের জাদুতে ও মূর্ছনায় পরিপূর্ণ থাকত। সেই ঘরে বসেই তাঁর মুখে আমি শুনতাম তখনকার অজস্র বিরল মুহূর্তের স্মৃতিচারণা। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে শুনতাম সেই সব মেহফিলের স্মৃতি জড়ানো গানের কলি। তিনি দেখাতেন জীবনের শ্রেষ্ঠ সেই সব মেডেল, পারিতোষিক, উপহার তাঁর একাধিক আলমারি থেকে। দেখতাম HMV গ্রামোফোন কোম্পানির কাছ থেকে উপহারস্বরূপ পাওয়া দামি সেকালের বিদেশি রিডের স্কেল চেঞ্জার বিশাল হারমোনিয়াম, দেশে-বিদেশে পাওয়া অজস্র স্বর্ণ ও রৌপ্য পদক সম্ভার, বিভিন্ন বেতারকেন্দ্র থেকে পাওয়া একাধিক মহামূল্য ধাতুখচিত মানপত্র। তিনি দেখিয়েছিলেন রাজসভা থেকে পাওয়া মহামূল্যবান শাড়ি, পোশাক-পরিচ্ছদ আর অলংকারসমূহ। লোভনীয় সেই সব অজস্র উপহার তিনি পরিবারের লোকদের ও অন্যদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নেশা ছিল মুদ্রা সংগ্রহের। বিশ্বের নানা প্রান্তের মহামূল্য ধাতু নির্মিত মুদ্রাগুলো তখন আমারও দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল। আর ছিল দেশি-বিদেশি দামি দামি শাল। তাঁর অমূল্য সংগ্রহ থেকে মুদ্রা ও শাল বিনিময় করতে আসতেন বিখ্যাত নায়ক সুদর্শন অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী। প্রায়ই পরিচিত অনেকেই এসে নিয়ে যেতেন তাঁর ব্যক্তিসংগ্রহে রক্ষিত দুষ্প্রাপ্য গ্রামোফোন রেকর্ড, যা অনেক বিখ্যাত সংগীতকার ও পত্র-পত্রিকার সমালোচকরা নিঃশব্দে আত্মসাৎ করেছিলেন। প্রায়ই আফসোস করতেন তিনি তা নিয়ে। এমনকি তাঁর মূল্যবান গানের খাতাগুলোও অনেকে দেখতে বা লিখে নিতে গিয়ে আর ফেরত দেননি। চাইলে বেমালুম পরে তা অস্বীকারও করতেন।
১৯৭০ সালের মাঝামাঝি তাঁর শরীর ভেঙে পড়তে থাকে। সংসারে নির্দিষ্ট আয় বলতে শেষ দশটি বছর হাত প্রায় শূন্য। সভা ও সংবর্ধনার সংখ্যা তখন বাড়লেও আর্থিক অভাব-অনটন ক্রমশ বেড়েই যেতে থাকে। তাঁর ঘনিষ্ঠ শুভাকাক্সক্ষী ও অনুরাগীরা আর্থিক সাহায্য করতে এসেও কেউ কেউ প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কেননা তাঁর আত্মাভিমান ছিল প্রবল। সহজে কারো দান বা সাহায্য তিনি নিতে চাইতেন না। জোর করে লোহিয়া হাসপাতালে একবার চোখ অপারেশন করানো হলো। অপারেশন সাকসেসফুল হবার পর নার্সের একটি অপমানসূচক মন্তব্যের প্রতিবাদে ইন্দুবালা ক্রোধে ফেটে পড়েন। তখন তাঁকে সামলানো দায় হলো। তীব্র চিৎকার আর নড়াচড়ায় ছিঁড়ে গেল অপারেশন করা চোখের ব্যান্ডেজ আর সেলাই। রাগে কাঁপতে লাগলেন সংগীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালা। বাধ্য হয়ে তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলো। ছিঁড়ে গেল চোখের সেলাই। ফলে নষ্ট হয়ে গেল তাঁর একটি চোখ। অপারেশন হয়েও সব বিফলে গেল। শিল্পী আজীবন ছিলেন ভয়ংকর মেজাজি মানুষ। প্রায়ই অসুস্থতা ছিল তখন তাঁর নিত্যসঙ্গী। সেই সঙ্গে আর্থিক সংকট। প্রায়ই চিঠিতে সেসবের উল্লেখ থাকত। অফিসে একদিন পেলাম ইন্দুবালার লেখা চিঠি। পত্রের তারিখ ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। ইন্দুমা লিখেছিলেন –

মা
২৪/১২/৭১
কলিকাতা
পরমকল্যাণীয়
বাবা বাঁধন। পত্রপাঠ তুমি আমার বাড়ী একবার নিশ্চয় আসবে। আমার ভয়ানক বিপদ। নিশ্চয় আসবে। øেহাশীষ জানবে, আশা করি ভাল আছ। গতকাল অলোক এসেছিল আমায় দেখতে। গৌরী পাঠিয়েছিল।
ইতি
তোমার ইন্দুমা

কল্যাণীয়
শ্রীমান বাঁধন সেনগুপ্ত
ডিপোজিট সেকশন
ট্রেজারী বিল্ডিংস, কলিকাতা-১

১. অলোক – অলোক মিত্র (গায়ক শ্যামল মিত্রের খুড়তুতো ভাই, নৈহাটি) ২. গৌরী – গৌরীবসু (লেখক সমরেশ বসুর স্ত্রী)

গিয়ে শুনলাম ইন্দুবালাকে যে সরকারি মাসিক ভাতা বা বৃত্তি আগের বছর রাইটার্সে ছোটাছুটি করে মঞ্জুর করিয়ে এনেছিলাম তা এক মাস হলো বন্ধ। তা ‘ভয়ানক বিপদ’ বলে তিনি আমায় চিঠিতে জানিয়েছেন। লিটরারি পেনশন প্রতিবছর মঞ্জুরের জন্যে প্রাপককে নতুন করে আবেদন করতে হতো তখন। দরখাস্ত লিখে ইন্দুমার সইসহ তা রাইটার্সে জমা দেওয়ার পর ফের মাসিক একশো পঞ্চাশ টাকা করে মঞ্জুর হয়েছিল। ১৯৮২ সালে তা বেড়ে দুশ পঞ্চাশ টাকা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এমন ভাতা প্রাপকের তালিকায় ছিলেন দুইশর মতো অসহায় প্রবীণ শিল্পী, চিত্রকর, গায়ক-গায়িকা ও খেলোয়াড়। তারপর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইন্দুবালার সেই পেনশন আর্থিক বছরের গোড়ায় প্রতিবার আবেদনপত্র পাঠানোয় তা পেয়ে গিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালে ইন্দুমা প্রথম হৃদযন্ত্রের আক্রমণের শিকার হন। গিয়ে দেখি তিনি বেশ মনমরা। অসহায় তাঁর চাউনি স্ট্রোক হয়েছে জেনে। পরের বছর (১৯৭২) জানুয়ারি মাসে আমার ঊনত্রিশতম জন্মদিন ২ জানুয়ারি নৈহাটিতে সমরেশ বসুর বাড়িতে গিয়ে গৌরী বসুকে প্রণাম করতে গিয়ে তাঁর মুখে শুনলাম ইন্দুমা ফের অসুস্থ। এবার তাঁর প্রকৃত রোগ কী তা নাকি বোঝা যাচ্ছে না। দেহে তিনি নাকি একাধিক আক্রমণের শিকার। পরের দিন বিষ্ণু দের বাড়িতে গিয়ে হঠাৎ সেখানে দেখা পেলাম ট্রপিকালের প্রধান ডা. নৃপেন সেনের। তিনি ইন্দুবালার গানের ভক্ত। ব্যক্তিজীবনে তিনি স্বনামখ্যাত বিপ্লবী ইলা মিত্রের ছোট ভাই। তাঁকে ইন্দুবালার কথা বলায় তিনি রাজি হলেন ইন্দুমাকে বাড়ি গিয়ে তাঁকে পরীক্ষা করে আসতে। একদিন তাঁর গাড়িতে তিনি ট্রপিকাল মেডিসিন হাসপাতাল থেকে নিয়ে এলেন ইন্দুবালার সেই রামবাগানের বাড়িতে। দেখেশুনে নৃপেনদা পরামর্শ দিলেন অবিলম্বে ইন্দুমাকে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করতে। কিন্তু ইন্দুবালা বাড়ি ছেড়ে হাসপাতালে যেতে রাজি নন। বাড়ির লোকজনও তাঁর মেজাজের কথা মনে রেখে বাড়িতে রাখাই শ্রেয় মনে করছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমি অনেক করে বাড়ির লোকদের ও ইন্দুমাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে কলকাতার সেরা সরকারি হাসপাতাল পিজি অর্থাৎ শেঠ সুখলাল কারনানি হাসপাতালে (এসএসকেএস) ভর্তি করিয়ে দিলাম। ডা. নৃপেন সেনই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন আগেই। সঙ্গে সঙ্গে তাই কেবল ওয়ার্ডে ১৯ নং বেডে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো। সারাটা দুপুর কেটে গেল তাঁর জন্যে সবকিছু ব্যবস্থা করতে। প্রণব অর্থাৎ ইন্দুমার পালিত পুত্র মানা চলে গেল স্টুডিওতে। সে ছবিকে তার আগে দিয়ে গেল রামবাগানের বাড়িতে। পরদিন থেকে আমায় রোজই প্রায় যেতে হতো পিজিতে। একদিন না গেলেই সংগীতসম্রাজ্ঞীর অভিমান হতো। অফিসে ঘন ঘন কামাই করা ছাড়া আর গত্যন্তর রইল না। প্রায়ই হাসপাতালে গিয়ে আমায় নিজের হাতে নোংরা পরিষ্কার করতে হতো। বাথরুমে যাবার পথে তিনি সব নোংরা করে ফেলতেন প্রায়ই। বিরক্ত হতো নার্সরা। তারা আড়ালেই থাকত ভিজিটিং আওয়ার্সে। বেচারি ইন্দুমার কথা ভেবে বাধ্য হয়ে আমাকেই সব পরিষ্কার করতে হতো। এদিকে অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। মায়ের তখন ধূমপান বন্ধ। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যে তিনি আরো কষ্ট পাচ্ছিলেন। কেটে গেল এইভাবে প্রায় দিন পনেরো। তখন এসে গেল সরস্বতী পুজো। রোজ নৃপেনদাকে হাসপাতাল থেকে গিয়ে ট্রপিকালে রিপোর্ট দিয়ে আসতে হচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে যেতাম। রোজ হালিশহরের বাড়িতেও ফেরা হতো না। তাই রাতে বিষ্ণু দের বাড়িতে থেকে যেতে হতো। কখনো বা ড. সরোজকুমার দাসের বাড়িতে চলে যেতাম। অবস্থার সামান্য উন্নতি হলো পরে নৃপেনদার তৎপরতায়। তিনি বললেন ইন্দুবালাকে বাড়িতে এবার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। তাঁর দেওয়া নতুন প্রেসক্রিপশন মতো বাড়িতেই চলতে লাগল ইন্দুমার চিকিৎসা। ক্রমশ তিনি অনেকটা এরপর সুস্থ হতে লাগলেন। ফেব্র“য়ারির (১৯৭২) তৃতীয় সপ্তাহে আমি গেলাম ঢাকায় ২১ ফেব্র“য়ারির উৎসবে স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে। সাংস্কৃতিক সেই সফরে সেবার ছিলেন প্রবোধ সান্যাল, মনোজ বসু, অসীম রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ আমি ও ড. জিষ্ণু দে। ফিরে এলাম কলকাতায় ২ মার্চ বৃহস্পতিবার দুপুরে।
ইন্দুমা তখন অনেকটা সুস্থ। আমি তাঁকে নজরুলজয়ন্তীতে নিয়ে গেলাম আমাদের অফিস এজি বেঙ্গলে। নিয়ে গিয়েছিলাম মুজাফ্ফর আহমদ, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, কাজী সব্যসাচী ও গৌরী বসুকে। ইন্দুবালা সবাইকে পেয়ে দারুণ খুশি। এক গাল হেসে সাজগোজ করা চশমা পরা ইন্দুমা যাবার সময় আমার দিকে চেয়ে বললেন, বাবা বাঁধন, তোমার জন্যেই আবার এঁদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
নতুন ভাবনা হঠাৎ মাথায় এলো একদিন। ইন্দুমার জীবনী লিখব আমি। ইন্দুবালার শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকছে না। তাই ইন্দুমার সাহায্য ও পরামর্শ পেতে হলে তা দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু ইন্দুবালা কিছুতেই আমার সে প্রস্তাবে রাজি হতে চাইছেন না। ওই সময় সংগীতসম্রাজ্ঞী পেলেন নতুন দিল্লি থেকে সংগীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার (১৯৭৫), HMV থেকে প্রদত্ত গোল্ডেন ডিস্ক (Golden Disc), রবীন্দ্রসদন (১৯৭৬) এবং আকাশবাণীর (কলকাতা) পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে প্রদত্ত সম্মান স্মারক (১৯৭৭) ইত্যাদি। সত্যজিৎ রায়ও তাঁর জীবনীর প্রয়োজনের কথা একদিন ইন্দুমাকে প্রণাম করে রবীন্দ্রসদনে প্রকাশ্যে জানালেন। তখন তাঁর সম্মতি পাওয়া গেল। তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন জীবনের বহুবিধ প্রামাণিক উপাদান, কাগজপত্র। পড়তে দিলেন তাঁর ডায়েরি, ফাইল ও তাঁর নিজস্ব সমাপ্ত বা অসমাপ্ত একাধিক রচনা। বছরতিনেক প্রায় প্রতিদিন সেসময় রামবাগানে প্রয়োজনে তাঁর কাছে ছুটে গিয়েছি। বহুবার বাড়ি ফিরতে রাত হয়েছে। রামবাগান পাড়া থেকে ফিরতে গভীর রাতে ভয় করত। অদূরে সোনাগাছি। ইন্দুমা চা আর পাড়ার দোকান থেকে গরম তেলেভাজা এনে খাওয়াতেন। তথ্য সংগ্রহ, পত্র-পত্রিকা, সাক্ষাৎকার ও বিভিন্ন লাইব্রেরিতে গিয়ে তথানুসন্ধানে কেটে যায় বছরতিনেক। ইন্দুমাকে ‘পাণ্ডুলিপি’ লেখা হলে তা শুনিয়ে আসতাম। প্রয়োজনে তিনি মতামত দিতেন এবং ত্র“টি থাকলে সংশোধন করে দিতেন। অবশেষে পাণ্ডুলিপি তৈরি হবার পর ইন্দুমাকে নিয়ে প্রথম বই লিখে তা ছাপা হলো ১৯৮৪ সালে ইন্দুবালার জীবিতাবস্থায়। গ্রন্থের মুখবন্ধে ইন্দুবালার আশীর্বাণী ছিল।
এ বইয়ের নামকরণ করে দিয়েছিলেন আমার প্রিয় অধ্যাপক ও বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। ইন্দুবালা ছাপবার দায়িত্ব নিয়েছিল মৌসুমী প্রকাশনী, যার কর্ণধার  েস্নহাস্পদ শ্রীমান দেবকুমার বসু। ব্যক্তিজীবনে দেবকুমার লেখক সমরেশ বসুর জ্যেষ্ঠ পুত্র। ১৯৮৪ সালের ৫ মার্চ সোমবার কলকাতা পুস্তক মেলায় এলাহাবাদ ব্যাংক হলে ইন্দুবালার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং লেখক সমরেশ বসু। আমন্ত্রিত আলোচক ছিলেন শ্রীমতী সরযুবালা দেবী, গৌরকিশোর ঘোষ ও লেখক নিজে। প্রধান আকর্ষণ অবশ্য শ্রীমতী ইন্দুবালা দেবী। সেদিন বিকেল সাড়ে তিনটেয় সশরীরে উপস্থিত ছিলেন সংগীতসম্রাজ্ঞী ইন্দুবালা ও তাঁর পরিজনেরা। মঞ্চের সামনে ছিল তাঁর বিশাল এক কাটআউট। ওপরে লেখা ‘নেম ইজ ইন্দুবালা’। ইন্দুবালাকে নিয়ে প্রথম বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ও আলোচনা পর্ব মিটে যাবার পরে মৌসুমী প্রকাশনীর তরফ থেকে কলকাতার পুস্তক মেলার মিডিয়া সেন্টারে লেখকের সঙ্গে ইন্দুবালার এক ঘণ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারসমৃদ্ধ ভিডিও সেদিন ইন্দুবালা-অনুরাগীদের সামনে প্রদর্শিত হয়েছিল। দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সেদিন প্রণব মুখোপাধ্যায় ও তাঁর স্ত্রী শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ও।
পরের দিন সব পত্রিকায় ছবিসহ ইন্দুবালা প্রকাশ সংবাদ বড় করে ছাপা হয়েছিল। ইন্দুমা সব পত্রিকা কিনে এনে তা পড়ে নিজের কাছে রেখেছিলেন। একালের ছেলেমেয়েরাও যে তাঁকে মনে রেখেছে তাও এতদিনে তিনি টের পেলেন।
বই লিখবার সময় তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা সময়ে নেহায়েতই কৌতূহলের বশে ইন্দুমাকে সন্তানের মতো প্রশ্ন করেছি। উনি বিরক্ত না হয়ে তখনই জবাব না দিলেও পরে কখনো না কখনো তার জবাব দিতে কুণ্ঠিত হননি। জানিয়েছিলেন তিরিশের দশকে তাঁর বিয়ে হয়েছিল মহীশূরে চামুণ্ডেশ্বরীর মন্দিরে দেবতাকে সাক্ষী রেখে। স্বামী ছিলেন উত্তর কলকাতার এক বনেদি কায়স্থ পরিবারের সন্তান। ইন্দুবালা ছিলেন তাঁর চেয়ে বছরসাতেকের বড়। ইন্দুবালাকে বিয়ে করে কলকাতায় এসে গিরিশ পার্কের কাছে বালীপাঠে ঘরসংসারও করেছিলেন বছরতিনেক। পরে শ্যামবাজার অঞ্চলে তিনি পিত্রালয়ে ফিরে যান পৈতৃক বিশাল সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবেন সেই আশঙ্কায়। চলে গেলেও তিনি ইন্দুবালাকে ভরণপোষণ বাবদ গোপনে দীর্ঘকাল টাকা পাঠাতেন। স্বামীর ঔরসজাত একটি সন্তান ইন্দুবালার প্রসবকালীন অবস্থায় মারা গিয়েছিল বলে তিনি আমায় জানিয়েছিলেন। স্বামীর সঙ্গে গোপনে তাঁর যোগাযোগও ছিল দীর্ঘকাল।
১৯৩৩ সালে ইন্দুবালা কুড়ি হাজার টাকায় একটি দোতলা বাড়ি ২১ নং যোগেন দত্ত লেনে কিনে মাকে নিয়ে জীবনকৃষ্ণ বাবুর আশ্রিত ১৪ দয়াল মিত্র লেনের আশ্রয় ছেড়ে চলে আসেন। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত একটানা সংগীতসম্রাজ্ঞী প্রায় অর্ধশতাব্দী কালেরও বেশি সেখানেই কাটিয়ে গেছেন।
৩০ নভেম্বর ১৯৮৪ ইন্দুবালা প্রয়াত হন। বয়স হয়েছিল প্রায় ছিয়াশি বছর। শেষদিকে ভালোই ছিলেন। নৈহাটিতে গৌরী বসুকে নিয়মিত ওই বয়সেও নিজ হাতে দীর্ঘ পত্র লিখে জবাব দিতেন। ইন্দুমা ও গৌরী বসুর লেখা এমন শতাধিক পত্র আমি সংগ্রহ করে রেখেছি। প্রয়াণের পর ছুটে গিয়েছিলাম সেই চেনা রামবাগানে ইন্দুমার বাড়িতে। দোতলার সেই চেনা ঘরে তখন তিনি শুয়ে আছেন। নিস্পন্দ, প্রাণহীন। তাঁর প্রাণহীন দেহ বহন করে গিয়েছিলাম তাঁর নাট্যমঞ্চ স্টার, রংমহল ও বিশ্বরূপায় (শ্রীরঙ্গম/নাট্যনিকেতন)। বেলা শেষ হবার আগেই তাঁর প্রাণহীন দেহ পৌঁছল নিমতলা ঘাটে। সেখানে তখন অপেক্ষারত আর একটি শবদেহ – রাধাকান্ত নন্দীর। পাশে অবনত গায়ক মান্না দে।
ইন্দুমার সঙ্গে দুই দশকের চেনা-পরিচয়, মান-অভিমান, øেহ আর আশীর্বাদের পর্ব সমাপ্ত হয়ে গেল আমার সেদিন সন্ধ্যায়। চিতার আগুন তাঁকে দ্রুত গ্রাস করে নিচ্ছিল। মনে পড়েছিল, তিনি প্রায়ই বলতেন – ‘আমি রামবাগানের ইন্দু। এই রামবাগান ছেড়ে আমি চলে যাব কী জন্যে? কীসের লোভে আমি চলে যাব নিজের জায়গা ছেড়ে? রামবাগানই তো আমায় সবকিছু দিয়েছে। অর্থ, সম্মান, ভালোবাসা, সব …।’
সত্যিই তো তাই। এখান থেকে কয়েক পা দূরে ‘রূপবাণী’ সিনেমা হলের দ্বারোদ্ঘাটন অনুষ্ঠানে জনগণ পাড়ার মেয়ে ইন্দুকেই উদ্বোধক রবীন্দ্রনাথের সামনে গর্বভরে পরিচয় দিয়ে উদ্বোধন সংগীতটি সেদিন গাইতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে বসে সংগীতসম্রাজ্ঞী সেদিন সাহস করে নির্দ্বিধায় গেয়েছিলেন তাঁর ভাষায় একটি ‘রোব্বাবুর গান’ – ‘কেন চোখের জলে ভিজিয়ে দিলেম না’। …

Leave a Reply

*