logo

আবারো নতুন করে : জানা কথাগুলো…

এ না মু ল ক রি ম নি র্ঝ র

সূত্রপাত
গত ২৪-৩১ মার্চ ২০১২ সুইজারল্যান্ডের ফ্রিবুয়র শহরে হয়ে গেল ২৬তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। যেখানে এবার মূলত এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার চলচ্চিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে এ উৎসবের ফোকাস কান্ট্রি ছিল বাংলাদেশ। ওদের ভাষায় এর শিরোনাম ছিল ‘টেরা ইনকোগনিটা’ অর্থাৎ ‘অজানা দিগন্ত’। এদেশের চলচ্চিত্র বিষয়ে নানা ধরনের আলোচনাসহ এই বিভাগে মোট আটটি ছবি প্রদর্শিত হয়েছে। তারেক মাসুদের মাটির ময়না ও রানওয়ে, নাসিরউদ্দীন ইউসুফের গেরিলা, গোলাম রাববানী বিপ্লবের স্বপ্নডানায়, গিয়াসউদ্দিন সেলিমের মনপুরা, রুবাইয়াৎ হোসেনের মেহেরজান, বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগের ছবি মনের মানুষ এবং আমার আহা! ছিল বাংলাদেশ থেকে নির্বাচিত চলচ্চিত্র।
সুইজারল্যান্ড-বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ছিল এই বিশেষ আয়োজন। তাদের মতে, সুইস কোনো উৎসবে এবারই ছিল বাংলা ছবির সবচেয়ে বড় উপস্থিতি। আমন্ত্রিত
চলচ্চিত্র-নির্মাতা হিসেবে গোলাম রাববানী বিপ্লব ও গিয়াসউদ্দিন সেলিমসহ আমি যোগ দিয়েছিলাম উৎসবে। উল্লেখ্য, বিপ্লব এবার ছিলেন অন্যতম জুরিদের একজন।
২০০৭-২০০৯-এ অনেকগুলো চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের শেষে দীর্ঘ বিরতির পর আবারো আমার চলচ্চিত্র আহা!র অন্তর্ভুক্তি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে আনন্দিত করেছে। বিশ্বচলচ্চিত্রের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কী হলো, আমাদের সামগ্রিক অনুভূতি সেটা তার চেয়ে অনেক বড় বিষয়। নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক পরিসরে ফোকাস কান্ট্রি হিসেবে বাংলাদেশকে জায়গা করে নেওয়া কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, তার কতটুকু আমরা বুঝতে পারলাম? এটা তো সত্যি যে, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এক ধরনের কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। কখনো মুক্তিযুদ্ধ, কখনো মৌলবাদ, কখনো সেন্সর, চলচ্চিত্র কাঠামো-নীতিমালা, প্রযুক্তি সুবিধা, প্রযোজনা, ডিস্ট্রিবিউশন বা বিষয়বস্ত্ত ইত্যাদি বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে চলচ্চিত্র বিষয়ক ভাবনাটি গভীরতা নিয়ে উপলব্ধি করা গিয়েছিল। এদেশের নির্মাতাদের স্ট্রাগলের বর্ণনা ভিনদেশি অনেকের কাছেই হয়তো রূপকথা মনে হয়। তারপরও ছবি বানানোর এত চেষ্টা কেন? কেনইবা বিশ্বচলচ্চিত্রের মেলায় হাজির হওয়া বা দু-কথা বলার চেষ্টা! তবে এটাও ঠিক, এইসব বাস্তবতা নতুন কিছু নয়। এদেশের চলচ্চিত্র মাধ্যম নিয়ে আলোচনা বা গল্পগুলো মোটামুটি একই চাকায় ঘুরছে-ফিরছে বেশ কিছুদিন। এরই মধ্যে বিদেশে কোনো চলচ্চিত্র উৎসবে গেলে দর্শকদের আগ্রহ দেখে উৎসাহ জাগে নতুন করে। তবে এবারের যাত্রায় অভিজ্ঞতা ভিন্ন। উৎসবের হৈ-হুল্লোড় আর সহযাত্রী দুই নির্মাতা বন্ধুর সঙ্গে চলমান আড্ডায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে দেশ, সিনেমার ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আমাদের অবস্থান, সম্ভাবনা ইত্যাদি।

কী হতে পারত, কী হচ্ছে এবং কী হতে পারে?
এই জিজ্ঞাসাগুলো আমাদের মতো চলচ্চিত্রকর্মীদের নানাভাবে ভারাক্রান্ত করে রাখে। খুব সাধারণ মস্তিষ্কে এটা বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব একটা দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তির জন্য অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা সম্পদ ইত্যাদি দিয়ে দেশকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হয়, সেই সারিতে সিনেমা কেন নয়? এবারের আয়োজকদের যেমন যথেষ্ট কৌতূহল ছিল প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ইমপ্রেসকে নিয়ে। কারণ এ আয়োজনের নির্বাচিত অধিকাংশ চলচ্চিত্রই ছিল তাদের প্রযোজিত। উৎসবে অংশগ্রহণকারী ইমপ্রেসের ইবনে হাসান খান এ কারণে প্রশংসাও পেয়েছেন বিভিন্ন আলোচনায়।
আসলেই কী হতে পারত? যদি প্রতিটা বছর এদেশ থেকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো মানসম্পন্ন অন্তত একটা ছবিও নির্মিত হতো। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অভিজ্ঞ অনেকেই রয়েছেন এখানে। গুণী-মেধাবী নির্মাতারাও রয়েছেন। তাঁদের কাজে লাগিয়ে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনার। ইমপ্রেস একাই যেটুকু চেষ্টা করে এগিয়ে দিয়েছে অনেক। কিন্তু আমরা যদি সত্যি আরো বহুদূর যেতে চাই, তবে লাগবে বড় ধরনের পরিকল্পিত সিদ্ধান্ত। খেলাধুলা বা ব্যান্ডশো, টেলিভিশন অনুষ্ঠানের স্পন্সর যদি পাওয়া যায় নিয়মিত, চলচ্চিত্রের দোষটা কোথায়? আর এর ফলাফলটা বা কম কী? অনেকেই বলে, যেসব চলচ্চিত্র বিদেশি উৎসবে যায় সেগুলো দেশের মানুষ কম দেখে। এইসব খোঁচা দেওয়া বোকা বোকা কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কোনো অর্থ নেই, অন্তত এই সময়ে। লাভ হচ্ছে কার? কারো না। মাঝখান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সম্ভাবনা, বরং একটা সময় এসেছে নতুন করে সবকিছু ভাবার। চলচ্চিত্রের মতো শক্তিশালী মাধ্যমকে উপেক্ষা করার অর্থ সময়কে এড়িয়ে চলা। আর এক্ষেত্রে সরকারকে সবচেয়ে বেশি এবং সেই সঙ্গে অন্যান্য উৎসাহী প্রতিষ্ঠান যেগুলো রয়েছে সেগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। অতীতের চলচ্চিত্রের যেটুকু গৌরবজনক অধ্যায় তার সঙ্গে যোগ করতে হবে বর্তমান ও ভবিষ্যতের চেষ্টা।
আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক কাঠামো, কেটে যাওয়া চলমান নিয়মিত জীবনের গল্প আর তার ভেতরের বহুবর্ণ কাঠামো নিয়ে যেসব শাখা-প্রশাখা আছে, গুণী নির্মাতারা সহযোগিতা পেলেই তা নিয়ে মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ ও চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার অযথা প্রতিবন্ধকতা দূর করাটাও জরুরি বিষয়। কমবেশি অল্প আলোচনায় একটা পরিষ্কার রূপরেখা তৈরি করা যায় ‘কী হতে পারে?’ – বিষয়টা নিয়ে। আমরা স্বপ্ন দেখি এদেশের একটা স্বাস্থ্যকর চলচ্চিত্র পরিবেশের, স্বপ্ন দেখি বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশি ছবির উজ্জ্বল অবস্থান নিয়ে। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। চল্লিশ বছর পর অন্তত স্বাধীন দেশের মর্ম বুঝে একজোট ভাবনাকে জরুরি মনে করা উচিত।
বিদেশে চলচ্চিত্র উৎসবে গেলে যে বিষয়টা আরো বেশি চোখে পড়ে – আয়োজনের উৎসাহ ও সকলের সংশ্লিষ্টতা। একেকটা শহর, এলাকা, এসব উৎসবকে কেন্দ্র করেই বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়ে ওঠে। এবার যেমন একজন আয়োজক জিজ্ঞেস করলেন কক্সবাজারকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সম্ভাবনার কথা। পর্যটন পরিচিতি, দেশের ভাবমূর্তি সব মিলিয়ে হতে পারে ভবিষ্যৎমুখী সফল একটা আয়োজন, যাতে দেশের পর্যটনের লাভ, দেশের সিনেমা ও নির্মাতাদের লাভ। কত অর্থ বিসর্জন যাচ্ছে অর্থহীন সব নিষ্ফল জাতীয় আয়োজন নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে একটাই, কে নেবে উদ্যোগ? কে এগিয়ে আসবে শুরুতে উৎসাহী হয়ে?
হ্যাঁ, সমস্যা একটা আছে, এখন পর্যন্ত চলচ্চিত্রই হচ্ছে তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে স্বাধীন ও শক্তিশালী মাধ্যম। হয়তো সে কারণেই শাসক, কর্তাব্যক্তি ও দেশ-প্রভুদের এর অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। নতুন ও আধুনিক প্রদর্শন ব্যবস্থার জন্য মাল্টিপ্লেক্স, সিনেমা স্কুল বা সমসাময়িক প্রযুক্তির আয়োজন, নিয়মিত মানসম্পন্ন প্রযোজক না থাকার পরও কীভাবে চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দেওয়ার মতো ছবি নির্মাণ হয়, এটা বিদেশি দর্শকদের অন্যতম প্রশ্ন। রাজনৈতিকভাবেই এদেশের চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না এটাও তাদের কৌতূহলের বিষয়। কিন্তু আজকের এই সময়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর অনেক দেশের চলচ্চিত্র-চেষ্টা দেখে পেছনে পড়ে থাকাটা হয় শিক্ষার অভাব, অথবা শাসকশ্রেণির নেহাত ভয় পাওয়ার মতো বিষয় হয়তোবা। এদেশের মানুষদের মানসিক চাপের পরিমাণ তো কম নয়। চারদিকের অস্থিরতা, বিশ্বাসহীনতা, ভাঙতে থাকা মূল্যবোধের কাঠামো – সব মিলিয়ে এখনো সুষ্ঠুভাবে মানসিক স্বাস্থ্য গড়ে তুলতে, বিভিন্ন শহরে বিনোদনকেন্দ্রের অংশ হিসেবে সিনেপ্লেক্স গড়ে তোলা জরুরি। ঠিক যতটা জরুরি নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক বা মরা নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ। প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে খুব সহজেই দেখা যায় আগামী প্রজন্মের পরিস্থিতি। আর বাঙালি চিরকালই উদ্যাপনের বিষয়ে অগ্রণী, বাংলা নববর্ষ বা বিশেষ দিবসে তাদের উৎসবের রংছটা দেখলেই বোঝা যায়, প্রয়োজন নিয়মিত সুযোগের।

তাই শুরুতেই বলেছিলাম, একটা উৎসবে যোগ দেওয়া মানেই সহস্র প্রশ্ন, স্বপ্ন নতুন করে সংগঠিত হতে শুরু করে। আমরা যদি আবারো নতুন করে একটু ভাবি, অতীতমুখী জটিল বা তুলনামূলক আলোচনায় না যাই; বরং যেভাবে চারপাশের সব দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো জেনে বা মেনে নিয়েই একটা স্বচ্ছ পরিকল্পনা আশা করি, যেখানে চলচ্চিত্র কেন্দ্র, আনুষ্ঠানিক প্রযুক্তি, চলচ্চিত্র নীতিমালা, উৎসবে অংশগ্রহণ বা স্থানীয়ভাবে চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন ইত্যাদিকে সকলের ওপরে স্থান দিয়ে কিছু পদক্ষেপ নিই। ক্ষতিটা কোথায়? সরকার যাকে উদারভাবে সহায়তা করবে, তার সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াবে সব উৎসাহী প্রতিষ্ঠান আর চলচ্চিত্রকর্মীরা, দেশটাকে সবার ওপরে রেখে। এছাড়া কি আর কোনো বিকল্প উপায় আছে? ছোট ছবি, বড় ছবি, বাণিজ্যিক, জীবনঘনিষ্ঠ, চলচ্চিত্র উৎসবের ছবি অথবা টেলিভিশনের ছবি – সে যেটাই হোক না কেন? সবটাই প্রয়োজন মাধ্যমকে টিকিয়ে রাখার জন্য। দায়িত্ব হিসেবে ভাবলে এটাও তো কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, যার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।
সবশেষে এটাই স্বীকার করছি, বিদেশের মাটিতে সতীর্থদের সঙ্গে আড্ডাবাজি, উৎসবের পোশাকি আলোচনায় বসে দুই কথা বলতে পারা কিংবা নিজেদের ছবি প্রদর্শনের আগে-পরে প্রশংসাসূচক মন্তব্য যতই ভালো লাগুক। লিখতে বসে গুরুগম্ভীর অনেক কথা বলাই যেতে পারে। কিন্তু সেটা কতটা জরুরি এ-সময়ে? আমরা যতই আশাবাদী হই না কেন, মনটা ভেঙে যায় বারবার। তবু সেটাকে জোড়া লাগাতে হয় – প্রাণের স্বার্থেই, চলচ্চিত্রের স্বার্থেই। ৩ এপ্রিলকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সরকার সম্প্রতি। সেটা যদি সত্যিকার অর্থে অঙ্গীকারের অংশ হয়, তবেই একটা কিছু পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা এবং সেই পরিবর্তনটাই একমাত্র উপায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সময়ে। 
http://www.fiff.ch/en/programme-2012/movies/terra-incognita-bangladesh/aha!.html
http://www.fiff.ch/en/programme-2012/movies/terra-incognita-bangladesh
http://www.fiff.ch/en/programme-2012/the-festival-in-pictures/pictures/details.html?galAlbum=44
http://www.fiff.ch/en/programme-2012/the-festival-in-pictures/pictures/details.html?galAlbum=45

 

Leave a Reply

*