logo

আববাস কিয়ারোস্তমি পথে যেতে যেতে

ফৌজিয়া খান

আববাস কিয়ারোস্তামি। জন্ম ইরানের তেহরানে, ১৯৪০ সালে। চলচ্চিত্রনির্মাতা হিসেবে পৃথিবীজুড়ে তাঁর খ্যাতি হলেও তিনি ছিলেন কবি, দার্শনিক। স্থিরচিত্র তুলতেন, ছবি অাঁকতেন, ইলাস্ট্রেশন করতেন, করতেন গ্রাফিক ডিজাইনও। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা, সম্পাদনা, শিল্প নির্দেশনা এবং প্রযোজনাও করতেন তিনি। তাঁকে আমরা মূলত চিনি কাহিনিচিত্র নির্মাতা হিসেবে। তবে তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং প্রামাণ্য চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছেন। চলিস্নশেরও বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আববাস কিয়ারোসত্মামি ইরানের ইউনিভার্সিটি অব তেহরানে পেইন্টিং ও গ্রাফিক ডিজাইন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। পড়াশোনার খরচ জোগাবার জন্য তিনি তেহরানে ট্রাফিক পুলিশ হিসেবে কাজ করেছেন। ষাটের দশকে আববাস কিয়ারোসত্মামি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি ইরানের টেলিভিশনের জন্য প্রায় একশ পঞ্চাশটি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছেন। ষাটের দশকের শেষদিকে তিনি চলচ্চিত্রশিল্পে ক্রেডিট তৈরির কাজ করতে শুরম্ন করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরম্ন করেন ১৯৭০ সালে।

ইরানের চলচ্চিত্র
চার হাজার বছরের ইতিহাসে সমৃদ্ধ দেশ ইরানে চলচ্চিত্র চর্চা শুরম্ন হয়েছিল মাধ্যম হিসেবে এর আত্মপ্রকাশের পাঁচ বছরের মধ্যে। ইরানের তখনকার সম্রাটের সরকারি ফটোগ্রাফার মির্জা ইব্রাহিম খান আক্কাস বাশি ১৯০০ সালে প্রথম শুট করেন। সম্রাটের ইউরোপ সফরনামা ছিল এর বিষয়। ১৯০৪ সালে তেহরানে চালু হয় একটি সিনেমা হল। ১৯৩০ সালের মধ্যে তেহরানে প্রায় পনেরোটি সিনেমা হল চালু হয়ে যায়, তেহরানের বাইরে ছিল এগারোটি। এসব হলে মূলত নিউজ-রিল দেখানো হতো। ১৯২৫ সালে ওভানস ওহানিয়ান নামে এক ব্যক্তি ফিল্ম স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। এর পাঁচ বছরের মধ্যে দ্য সিনেমা আর্টিস্ট এডুকেশনাল সেন্টারে ক্লাস শুরম্ন হয়ে যায়। ১৯৩০ সালে ওভানস ওহানিয়ানের পরিচালনায় নির্মিত হয় ইরানের প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্র হাজি আগা। ১৯৩২ সালের শেষদিকে ইরানে সবাক ছবি লর গার্ল নির্মাণ করেন আবদুল হুসেন সেপামত্মা। এর পর থেকে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র নির্মিত হতে থাকে সেখানে। ষাটের দশক পর্যন্ত মেলোড্রামা আর থ্রিলারধর্মী চলচ্চিত্র ইরানের চলচ্চিত্রশিল্পকে ডমিনেট করেছে।
ইরানে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন শুরম্ন হয় ১৯৪৯ সালে। ইরানীয় চলচ্চিত্রশিল্পের দুই পুরোধা ব্যক্তিত্ব ইসমাইল কৌশান এবং ফারম্নখ ঘাফফারির উদ্যোগে গঠিত হয় ন্যাশনাল ইরানিয়ান ফিল্ম সোসাইটি। তারা সপ্তাহব্যাপী বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। বাণিজ্যিক ধারার বাইরে বিকল্প চলচ্চিত্র চর্চার গোড়াপত্তন হয় তখন। এরই ধারাবাহিকতায় চার হাজার বছরের চর্চায় সমৃদ্ধ পারসি সাহিত্য ও পুরাণের যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে আজ ইরানের চলচ্চিত্র নৈতিকতা ও মানবিকতার বাণী ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীজুড়ে।
১৯৬৯ সালে তেহরানে প্রতিষ্ঠিত হয় ইনস্টিটিউট অব ইন্টেলেকচুয়াল ট্রেনিং অব চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং অ্যাডাল্টস (কানুন নামে পরিচিত)। আববাস কিয়ারোসত্মামি এই প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র বিভাগে কাজ করতেন। এখানে শিশু-কিশোরদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হতো। ইরানের তৎকালীন সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় পরিচালিত হতো এই ইনস্টিটিউট। আজ বিশ্বজুড়ে ইরানের ছবি বলতে আমরা যা বুঝি তার রূপ নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে এই ইনস্টিটিউট। সেই সময়কার চলচ্চিত্র বিষয়ে আগ্রহী প্রায় সব নির্মাতা ও নির্মাণ কুশলী এই ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এখানে নির্মিত ছবিগুলো ইউনেস্কোর সহযোগিতায় পরিবেশন করা হতো। বলা চলে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইনস্টিটিউট অব ইন্টেলেকচুয়াল ট্রেনিং অব চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং অ্যাডাল্টসের চলচ্চিত্র বিভাগ ইরানের জাতীয় চলচ্চিত্রের রূপ নির্মাণের লক্ষ্য কাজ করছিল।
১৯৭৯ সালে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন হয় – প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান। খোমেনির নেতৃত্বে সেখানে জারি হয় ইসলামি শাসনতন্ত্র। সমাজে আরোপিত হয় নানা রকমের অনুশাসন। ১৯৮৩ সালে নারী-পুরম্নষের সম্পর্ক, সন্ত্রাস এবং মূল্যবোধ – এসব বিষয় চলচ্চিত্রায়ণের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ জারি করা হয়। ফলে ইরানে নতুন ধারার চলচ্চিত্র চর্চা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। কঠোর সেন্সরশিপে অতিষ্ঠ হয়ে চলচ্চিত্রনির্মাতাসহ প্রগতিশীলদের অনেকে দেশান্তরী হতে শুরম্ন করেন। কিন্তু আববাস কিয়ারোসত্মামি ইরানেই থাকেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলচ্চিত্র নির্মাণ অব্যাহত রাখেন।
এখানে একটি কথা বিশেষভাবে বলতে হয়, কয়েক সত্মরবিশিষ্ট সেন্সরশিপ ডিঙিয়ে ছবি বানাতে গিয়ে ইরানের চলচ্চিত্রনির্মাতারা মৃদুভাষী, ইঙ্গিতময়, রূপকধর্মী চলচ্চিত্রিক ভাষার ব্যবহারে অনন্য হয়ে ওঠেন। স্বকীয় চলচ্চিত্রিক এই ভাষার গুণেই পৃথিবীজুড়ে ইরানের ছবি চলচ্চিত্রপ্রেমী বোদ্ধা মহলের গভীর মনোযোগে ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছে।

এবং আববাস কিয়ারোসত্মামি
১৯৭০ সালে প্রথম ছবি নির্মাণ করেছেন কিয়ারোসত্মামি, আর তাঁর শেষ ছবি মুক্তি পায় ২০১২ সালে। তিনি মারা যান ২০১৬ সালে, জুলাই মাসের ৩ তারিখ। ছিয়াত্তর বছর বয়সী আববাস কিয়ারোসত্মামির চলচ্চিত্র চর্চা প্রায় পঁয়তালিস্নশ বছর দীর্ঘ। এই সময়কালে তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রের সংখ্যা চলিস্নশেরও বেশি। তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। পূর্ণ বা স্বল্পদৈর্ঘ্য, কাহিনি বা প্রামাণ্য – যে চলচ্চিত্রই বানান না কেন সবখানেই তিনি মানুষের কথা বলেছেন, জীবনের কথা বলেছেন। দেশ-কাল-নিরপেক্ষ জীবনের চিরায়ত কিছু বিষয় তাঁর চলচ্চিত্রের মূল আরাধ্য। তাঁর ছবিতে বস্ত্তনিষ্ঠ প্রকৃতির পটে প্রবহমান জীবনের উপস্থাপন দর্শককে গূঢ় দার্শনিক বোধে জারিত করে।
এই লেখার শুরম্নতেই বলেছি, আববাস কিয়ারোসত্মামি ইরানের ইনস্টিটিউট অব ইন্টেলেকচুয়াল ট্রেনিং অব চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং অ্যাডাল্টসের চলচ্চিত্র বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। এখান থেকে তিনি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি (১৯৭০) নির্মাণ করেন। এই ছবির মূল চরিত্র আট-দশ বছরের এক কিশোর। স্কুল থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরার পথে একটি রাগী কুকুর তাড়া করলে ভয় পেয়ে পিছু ফিরে দৌড়ে গলির এক মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কুকুরটি তাকে দেখতে থাকে। সেও কুকুরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর ওই পথ দিয়েই যাচ্ছেন এমন একজন বয়স্ক মানুষকে দেখে ছেলেটি সাহস পায় – তার পেছন পেছন হাঁটতে থাকে সে। কোনো একটা মোড়ে এসে সেই মানুষটি তাঁর পথে হেঁটে যান, কিন্তু সে তখনো বাড়ি পৌঁছেনি। একটু থমকে দাঁড়ায়, কুকুরটিকে দেখে। কুকুরটি বসে আছে তার বাড়ির সদর দরজার সামনেই। কিন্তু ছেলেটি এবার আর ভয় পায় না। ঘেউ ঘেউ করে ওঠা কুকুরকে পাশ কাটিয়ে এবার সে বাড়িতে ঢুকে যায়। ওই পথেই অন্য এক কিশোর আসছিল। কুকুরটি তাকে দেখেও তেড়ে যায়। এই কিশোরের স্থির হয়ে যাওয়া শটে কিয়ারোসত্মামি ছবিটি শেষ করে দেন। সে কি ভয় পাবে, আগের বালকটির মতোই দৌড়ে পিছু হটবে? এসব প্রশ্ন আমাদের মনের মধ্যে খেলা করলেও আমরা ততক্ষণে জেনে গেছি, এই কিশোর ভয় পেয়ে পিছু হটবে না। কারণ একই ঘটনা আগের শিশুর বেলায় ঘটেছে এবং রাগী কুকুরটিকে উপেক্ষা করে ভয়কে সে জয় করেছে। মানবসমাজে শিশুরা নতুন সব ঘটনার মুখোমুখি হয় – সেইসব ঘটনার কোনোটা তাকে ভীত করে। কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠরা তাদের সেইসব অকারণ ভয় জয় করার আস্থা দেন, পথ দেখান, উত্তরকালের পরিব্রাজকদের সাহস জোগান। কোনো দিকনির্দেশনা ছাড়াই কেবলমাত্র পর্যবেক্ষণ করেও বড়দের কাছ থেকে নবীনরা অনেক কিছু শিখে নেয়, পথ চলে। একদিন তারাও আবার বড় হয়ে তাদের উত্তরসূরিদের পথ দেখায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জীবনের দীক্ষা এইভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে। জীবনের এই চিরায়ত দার্শনিক সত্যের সঙ্গে কিয়ারোসত্মামি শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেন দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি ছবিতে রাগী কুকুর দেখে ভয় পাওয়ার ছোট্ট একটা ঘটনা পর্দায় উপস্থাপন করে। ঘটনাটি ইরানের না হয়ে পৃথিবীর যে-কোনো জায়গার হতে পারত। কোনো সংলাপ নেই ছবিতে। সংগীতেরও বিশাল আড়ম্বর নেই। সাদা-কালো ফিল্মে দিনের প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে চিত্রায়িত এই ছবিটি দেখে প্রামাণ্যচিত্র বলে দর্শকদের ভ্রম হতে পারে। আসলে কিয়ারোসত্মামির পরের ছবিগুলো দেখলে দর্শকের এই ভ্রম কেটে যাবে। নিরাভরণ, নৈর্ব্যক্তিক বাসত্মবতায় মানবজীবনের গূঢ় কিন্তু চিরায়ত গল্পগুলোই আববাস কিয়ারোসত্মামি তাঁর ছবিগুলোর মধ্য দিয়ে আমাদের বলতে চেয়েছেন। নববইয়ের দশকের আগে এই গল্পগুলো বলার জন্য তিনি শিশু-কিশোরদের জীবনবাসত্মবতায় ভর করেছেন। বারো মিনিট দৈর্ঘ্যের সংলাপবিহীন ছবিটি কিয়ারোসত্মামি নির্মাণ করেছিলেন নিউ রিয়ালিস্ট ধারায়। এই চলচ্চিত্রে ভবিষ্যতের আববাস কিয়ারোসত্মামির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

মানুষ আর মানবিকতার জয়গান
আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে মানবিক মানুষের জয়গান। তাঁর চরিত্ররা অধিকার নিয়ে জোর গলায় বক্তৃতা করে না। কিন্তু প্রাত্যহিক যাপিত জীবনের খর মুহূর্তে পাশে এসে দাঁড়ায়, নীরবে আদরের পরশ বুলিয়ে দেয়। ভালোবাসার এই পরশ অলক্ষক্ষ্য ছড়িয়ে দিতে দিতেই মনে করিয়ে দেয়, সবার জীবনেই আসে এমন ভঙ্গুর মুহূর্ত। এইসব মুহূর্ত অনিবার্য। এইসব বিহবল মুহূর্ত অসহনীয় লাগে। কিন্তু কিয়ারোসত্মামির নিস্পৃহ দৃশ্যায়ন বলে – ক্ষরণই শেষ কথা নয়। সময় ও ঘটনার প্রবহমানতায় ক্ষরিত হতে হতেও মানুষকে পথ হাঁটতে হয়, সচল থাকতে হয়। বিহবল ক্ষরণের মুহূর্তে তাই আববাস কিয়ারোসত্মামির চরিত্রেরা বেদনায় মুহ্যমান হয় না। বুকের মধ্যে সেই বেদনা ধারণ করেই জীবনের পথে হাঁটে। কিন্তু সবসময়ই পাশে পায় তার চারপাশের মানুষদের। তারা গূঢ় বেদনার সময় পাশে থেকে ভালোবাসার পরশ বোলায়। শুরম্নর দিকের হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম (১৯৮৭) থেকে শেষের ঠিক আগের ছবি সার্টিফায়েড কপিতেও (২০১০) আববাস কিয়ারোসত্মামির চরিত্রদের আরেকজনের বিপদে নানা ঝুঁকি নিতে দেখি। রক্ত বা পারিবারিক সম্পর্কের দায় থেকে নয় – ভালোবাসার, মানবিকতার বোধে তারা নানা দায় নিজের কাঁধে তুলে নেয়।
হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোমে ছোট্ট আহমেদ তার সহপাঠীর বাড়ির কাজের খাতা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রাণান্ত করে পথ থেকে পথে ঘোরে। বন্ধুকে খুঁজে না পেয়ে অবশেষে রাত জেগে নিজের এবং বন্ধুর বাড়ির কাজ করে তবে পরদিন স্কুলে যায়। বন্ধুকে শিক্ষকের মারের হাত থেকে বাঁচায়। দ্য ট্রাভেলার (১৯৭৪) ছবিতে আর সবাই যখন ফুটবলপাগল কাশেমের বিপক্ষে, তখন বন্ধু গোপনে তার পাশে থেকে দূর শহরে একা গিয়ে খেলা দেখার অ্যাডভেঞ্চারে সাহস জুগিয়ে যায়। এই ভালোবাসারই আরেকটু অন্য রূপ দেখি লাইফ, অ্যান্ড নাথিং মোর (১৯৯১) ছবিতে। এই ছবির প্রধান চরিত্র এক চলচ্চিত্র পরিচালক; তিনি ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যাওয়া কুকার গ্রামে খোঁজ নিতে যান তাঁর ছবিতে অভিনয় করা দুই কিশোরের। থরম্ন দি অলিভ ট্রিজ (১৯৯৪) ছবিতেও পাই চলচ্চিত্র পরিচালকের আরেক চরিত্র মোহাম্মদ আলী কেশাভারজকে। থরম্ন দি অলিভ ট্রিজের কাহিনিতে একটি ফিল্মের শুটিং হতে দেখি আমরা। সেই ছবির পরিচালক মোহাম্মদ আলী; হুসেন ও তাহেরা তাঁর ছবির দুই অভিনয়শিল্পী। হুসেন তাহেরাকে ভালোবাসে। হুসেন ক্রমাগত তাহেরাকে তার আবেগের কথা জানাতে থাকে। কিন্তু তাহেরা নির্বিকার। ছবিতে তাহেরা হুসেনের সঙ্গে একটিও কথা বলে না। ছবির পরিচালক মোহাম্মদ আলী শুটিং শেষে বাড়ি ফেরার পথে হুসেনকে তাহেরার পিছু নিতে কিছুটা যেন উসকে দেন – পথে যেতে যেতে হুসেন তাহেরাকে তার ভালোবাসার কথা জানাতেই থাকে। ইরানের সমাজে নারী-পুরম্নষের সম্পর্ক সহজভাবে দেখা হয় না। অথচ আলী হুসেনকে তাহেরার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দেন! দেখি টেস্ট অব চেরি (১৯৯৭) ছবির সেই আশ্চর্য হৃদয়বান মানুষদের! এই ছবিতে আত্মহননে আচ্ছন্ন বাডি মৃত্যুর পর তাকে কবর দেওয়ার লোক খুঁজছে হন্যে হয়ে। পথে পথে সে খুঁজে ফেরে এক দিনমজুর। অনেক টাকা মজুরি দেওয়ার কথা বলেও কাউকে আত্মহননের পর কবর দেওয়ার জন্য খুঁজে পায় না। বরং বন্ধ হয়ে যাওয়া সিমেন্ট কারখানার নিরাপত্তারক্ষীর আফগান বন্ধুটি এবং পাথরভাঙার খোলায় এক নির্মাণশ্রমিক তাকে ওমলেট, চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। চেরি ফলের মিষ্টি স্বাদ, শিশুর ভালোবাসা, স্ত্রীর সঙ্গ কিংবা রোদ আর বাতাসের সৌন্দর্যের কথা শোনায় ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের সেই কর্মী যে পারিশ্রমিক ছাড়াই আত্মহননের পর কবর দিতে রাজি হয়ে বাডিকে বাড়ি পাঠায়। অতি সাধারণ এই মানুষরা ধসত্ম সময়ে বাডিকে ভালোবাসার পরশ দিয়ে জীবনের পথে ডাকে যেন-বা।
টেন (২০০২) ছবির মানিয়া। তেহরানের রাজপথে তার চলন্ত গাড়িতে দশটি সিকোয়েন্সে কয়েকজন মানুষের দেখা পাই। এদের মধ্যে প্রেমিকের প্রত্যাখ্যানে ভেঙে পড়া তরম্নণীর চাপা দুঃখ যখন চোখের জল হয়ে গালে গড়িয়ে পড়ে, হাসতে হাসতে কাঁদতে থাকা সেই তরম্নণীর গালে মমতার পরশ বোলায় মানিয়া। সমাজে নারী হিসেবে অধসত্মন অবস্থানে ক্ষুব্ধ মানিয়া তখন সহমর্মিতার, মানবিক বোধের এক পরমজন হয়ে ওঠে। মানিয়ার মতোই মমতাময় আরেকজন মানুষকে দেখি কিয়ারোসত্মামির লাইক সামওয়ান ইজ ইন লাভ (২০১২) ছবিতেও। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক তাকাশির দেখা পাই। তিনি এক রাতের জন্য ভাড়া করেছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কলগার্ল আকিকুকে। ছবির ঘটনাপ্রবাহে তাদের মধ্যকার ভাড়াটে সম্পর্কের সীমা ভেঙে যায়। রাগী প্রেমিকের সহিংসতায় আহত আকিকুর শুশ্রূষায় তাকাশি যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন তার তুলনা আজকের পুঁজির দাসত্বে বন্দি জীবনে পাওয়া বেশ কঠিন। পয়সা দিয়ে সঙ্গ কেনার সাময়িকতা অতিক্রম করে আকিকুর দাদার বয়সী তাকাশি যেন তার সত্যিকারের দাদা হয়ে ওঠেন। নিজের কাজ ফেলে আহত, রক্তাক্ত আকিকুকে রাসত্মা থেকে উদ্ধার করে বাড়ি নিয়ে আসেন। ভালোবাসা আর মানবিকতার প্রকাশে আববাস কিয়ারোসত্মামি কিছুটা নির্মোহ নির্বিকার। লং, মিড লং শটে মূলত এই মানুষদের চিত্রায়ণ করেন কিয়ারোসত্মামি। প্রবহমান জীবনের পটে তাঁর চরিত্ররা কোনো নাটকীয়তা আরোপ না করে ভালোবেসে কাছে এসে কেবল জানান দেয় – আছি আমরা তোমার পাশে। তাঁর বলা ‘A movie is about human beings, about humanity.’ এই কথারই সাক্ষ্য হয়ে আছে তাঁর ছবিগুলো।

কিয়ারোসত্মামির শিশুরা
১৯৯০ সালে নির্মিত কাহিনিচিত্র ক্লোজ-আপ কিয়ারোসত্মামিকে পৃথিবীজুড়ে খ্যাতি এনে দেয়। এর আগে তাঁর নির্মিত প্রায় সব চলচ্চিত্রের বিষয় শিশু-কিশোরদের জীবন। ইনস্টিটিউট অব ইন্টেলেকচুয়াল ট্রেনিং অব চিলড্রেন অ্যান্ড ইয়াং অ্যাডাল্টসে কাজের সূত্রে সেই সময় তাঁর চলচ্চিত্রের পর্দায় শিশু এবং কিশোররা মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল। এই পর্বে তাঁর নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উলেস্নখ করতে হয় দ্য ব্রেড অ্যান্ড অ্যালি (১৯৭০), দ্য এক্সপেরিয়েন্স (১৯৭৩), দ্য ট্রাভেলার (১৯৭৪) এবং হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোমের (১৯৮৭) নাম। তাঁর শিশুরা শহর এলাকার বাইরে থাকা মানুষ। তারা শৈশবের সারল্য, কৌতূহল, মমত্বে ভরপুর; জীবনকে ছুঁয়ে-ছেনে দেখবার দুর্নিবার আকাঙক্ষায় বেপরোয়া। ফুটবল তাঁর শিশুদের ভীষণ পছন্দের। স্কুলের বদ্ধ পাঠ্যসূচি, পড়াশোনা নিয়ে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের কঠোরতা, বাড়িতে নানারকম ফুটফরমাশ খাটবার বাধ্যবাধকতা কোনোকিছুই তাদের ফুটবলপ্রীতি কমাতে পারে না। এই পর্বের প্রায় সব ছবিতে নানাভাবে ফুটবল প্রসঙ্গ এসেছে। তবে দ্য ট্রাভেলার ছবিতে ফুটবলে আচ্ছন্ন কিশোর কাশেমের তুলনা নেই। খেলা নিয়ে মেতে থাকার জন্য স্কুলে শাসিত্ম পায়, বাড়িতেও গালমন্দ শোনে – কিন্তু ফুটবল ছাড়ে না। তার প্রিয় দল খেলবে দূরের কোনো শহরে – পত্রিকায় এই খবর পড়ে সেই খেলা দেখতে যাওয়া মনস্থ করে। গাড়িভাড়া আর টিকিটের টাকা জোগাড়ের জন্য টিফিনের পয়সা বাঁচায়, গোলপোস্ট বিক্রি করে দেয় – এমনকি নষ্ট ক্যামেরায় সহপাঠীদের ছবি তুলে টাকা নেওয়ার মতো ভ-ামিও করে সে। স্কুলে পরীক্ষা না দিয়ে বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে শহরে যায় সে। খেলা শুরম্ন হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে পৌঁছে যায় স্টেডিয়ামে। দু-চার ঘণ্টা হাতে পেয়ে চারপাশটা ঘুরে দেখতে গিয়ে পথের ক্লামিত্মতে স্টেডিয়ামের এক কোনায় ঘুমিয়ে পড়ে। দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে দেখে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা স্টেডিয়াম সাফ করছে – খেলা শেষ! যে খেলা দেখার জন্য এত কিছু করল সেই খেলা না দেখেই ফেরার গাড়ি ধরতে হবে তাকে। কোনো হাহাকার নয়, বরং এক নির্লিপ্ত নিরাসক্তি নিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দেয় সে। লং শটে চিত্রায়িত ব্যর্থ কাশেমকে দেখে আমরাও স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মতো দার্শনিক বোধে উত্তীর্ণ হই যেন-বা।
স্বপ্ন দেখা, স্বপ্নের পেছনে আটঘাট বেঁধে ছুটে চলা এবং স্বপ্ন পূরণ হওয়া কিংবা না হওয়াকে নিরাসক্তভাবে গ্রহণ করে বা মেনে নেয় কিয়ারোসত্মামির শিশুরা। এই নিরাসক্তি আসলে পরিচালক আববাস কিয়ারোসত্মামির। তিনিই প্রবহমান জীবনে প্রাপ্তি কিংবা প্রাপ্তিহীনতা – দুটোই গ্রহণ করার দীক্ষা দেন যেন শিশু-কিশোরদের। হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম ছবিতে আরেকজন নিরাসক্ত শিশু আহমেদকে পাই। ভুলে সহপাঠী-বন্ধুর বাড়ির কাজের খাতা নিয়ে বাড়ি চলে আসে সে। বিকেলে হোমওয়ার্ক করতে গিয়ে এই ভুল বুঝতে পারে। বন্ধুটি বাড়ির কাজ না করায় সেদিনই স্কুলে শিক্ষকের মার খেয়েছে। তারপর মায়ের নিষেধ, বাড়িতে অন্যান্য সাংসারিক কাজ, বন্ধুর বাড়ির দূরত্ব, দূরগ্রাম কুকারে গিয়েও বন্ধুকে খাতাটি ফেরত না দিতে পারা – পরে রাত জেগে নিজের এবং বন্ধুর বাড়ির কাজ শেষ করে পরদিন স্কুলে হাজির হয়ে ভালোবাসার এক অফুরান ভা-ারের সন্ধান দিয়ে আমাদের সে আপস্নুত করে। হিংসা, দ্বেষ আর বিদ্বেষে ভরপুর এই পৃথিবীতে এমন দায়িত্বশীল, মানবিক মানুষকে পেয়ে আমাদের বুকের মধ্যিখান আর্দ্র হয়। ছবিতে এই ভালোবাসার প্রকাশ নির্লিপ্ত, পরিচালকের নিরাসক্ত দার্শনিকতায় চিত্রিত।
আছে জীবন, আছে মরণ
আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে প্রবহমান জীবন – মৃত্যু যার স্বাভাবিক সহচর, ফিরে ফিরে আসে। কিংবা বলা চলে তাঁর ছবির প্রধান বিষয়গুলোর মনোযোগের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে থাকে। এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উলেস্নখ করতে হয় দুটি ছবি অ্যান্ড লাইফ গোজ অন (এই ছবিরই অন্য একটি নাম লাইফ, নাথিং মোর, ১৯৯১) এবং টেস্ট অব চেরির (১৯৯৭) কথা। মৃত্যু অথবা মুত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান দুই ছবিতে দুইভাবে এসেছে। অ্যান্ড লাইফ গোজ অন ছবির কাহিনির প্রধান চরিত্র এক চলচ্চিত্র পরিচালক। ভূমিকম্প হওয়ার পর তিনি তাঁর ছবিতে অভিনয় করা দুই কিশোরের খবর নিতে কুকার গ্রামে যান। পথে যেতে যেতে তিনি ধ্বংস আর মৃত্যুর কালো গহবর কালের গর্ভে রেখে দিয়ে জীবনের পথ ধরে চলা নানা মানুষকে দেখেন। দেখেন তারা ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞ এবং মৃত্যুর মিছিলে সব হারিয়েও জীবনের প্রাত্যহিকতায় সরবে নির্বিকার ভঙ্গিতে অংশ নিচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে দার্শনিক বোধে উত্তীর্ণ হয়ে অ্যান্ড লাইফ গোজ অনের পরিচালকের এই দেখা আসলে কিয়ারোসত্মামিরই জীবনকে দেখার নির্যাস। কালের প্রবহমানতায় মৃত্যু এবং ধ্বংস মোকাবিলা করে জীবনের পথেই তো চলতে হয় মানুষকে। এই জীবনকে ভালোবাসার আহবানই যেন বা টেস্ট অব চেরির আত্মহত্যাপ্রবণ বাডিকেও। পুরো ছবিজুড়ে বাডি তাকে কবর দেওয়ার জন্য একজন লোক খুঁজে ফেরেন। শেষে তার দেখা হয় এমন একজনের সঙ্গে যিনি নিজেও একসময় মরতে চেয়েছিলেন। চেরি গাছের ডালে রশিতে ফাঁস দিতে গিয়েও মরতে পারেননি তিনি। দেখেন নতুন এক সূর্য আকাশে আলো ছড়াচ্ছে। ছোট শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে। যাওয়ার পথে তাকে গাছের ডালে বসে থাকতে দেখে ওরা চেরি খেতে চায়। গাছ ঝাঁকিয়ে কিছু চেরি শিশুদের পেড়ে দিয়ে টাটকা কিছু চেরি নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। মিষ্টি চেরি খেয়ে তার স্ত্রীর মুখে হাসি ফোটে। আর আগের দিন যে ঘটনায় মরে যেতে চেয়েছিলেন তা আর তত গুরম্নত্বপূর্ণ মনে হয় না। তারপর থেকে দিব্যি বেঁচে আছেন তিনি। জীবনের এই উপলব্ধি, জীবনের পথে ফিরে জীবনের ছোটখাটো অনুষঙ্গ ভালোবাসার প্রেরণা সুন্দর দার্শনিক বোধে চরিত্রটির সংলাপে উঠে আসে : ‘If you look at the four seasons each season brings fruit. In summer, there’s fruit, in autumn too. Winter brings different fruit and spring too. No mother can fill her fridge with such a variety of fruit for her children.
You want to refuse all that?
You want to give it all up?
You want to give up the taste of the cherries?
Don’t. I’m your friend, I’m begging you!
চলন্ত ট্রেনরূপী জীবনের প্রান্তসীমায় মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে এটা ঠিক, তবে সে জীবনের প্রান্তসীমাতেই – শেষ স্টেশনে এসে গিলে খাবে। তার আগের স্টেশনগুলোতে কিন্তু নেমে দম নিতে হবে, জীবনকে দেখতে হবে ছুঁয়ে-ছেনে। এইভাবে এই বোধে মৃত্যু পরাজিত হয় জীবনের চলচ্চিত্রকার আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, অমূল্য মানুষের ভালোবাসায় মৃত্যু পরাজিত হয় জীবনের কাছে। মরণের বিপর্যসত্ম ধসের ওপর দাঁড়িয়েও জীবন প্রবহমান, চলছে পথে পথে।

চরিত্রেরা করাপ্ট কিন্তু ইনোসেন্ট
আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে পথে পথে চলা প্রবহমান জীবনে যে মানুষগুলোর সঙ্গে আমাদের দেখা মেলে তাদের অনেকেই কিন্তু অসৎ। তাদের অনেকে অবলীলায় মিথ্যা বলে। শুরম্নর দিকের ছবি দ্য এক্সপেরিয়েন্স (১৯৭৩), দ্য ট্রাভেলার (১৯৭৪) কিংবা হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম (১৯৮৭) ছবিতে মিথ্যুক শিশুদের দেখি। তাদের কেউ বন্ধুকে শিক্ষকের হাতে পিটুনি খাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে মিথ্যা বলে (হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম), কেউ স্টুডিও মালিকের নিষেধ সত্ত্বেও রাতে লুকিয়ে অফিসে থেকে যায়, কিশোরীর নজর কাড়তে অফিস কর্তার কোট গায়ে চাপিয়ে দিব্যি পথে বেরিয়ে পড়ে (দ্য এক্সপেরিয়েন্স), আবার কেউ নষ্ট ক্যামেরায় সহপাঠীদের ছবি তুলে দেওয়ার ভান করে পয়সা নেয় ফুটবল খেলা দেখার খরচ জোগাড়ের জন্য (দ্য ট্রাভেলার)। এই শিশু-কিশোররা অসততার উদ্দেশ্যে মিথ্যার আশ্রয় নেয় না; জীবনের বাসত্মবতা যখন তাদের সরল সুন্দর আকাঙক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন তারা মিথ্যায় ভর করতে দ্বিধা করে না। তাদের ইচ্ছা আসলে সুন্দরকে ছুঁয়ে-ছেনে দেখা। ফলে তারা দোষী নয় কেউ। আমাদের একরকম প্রশ্রয় থাকে ওদের এই মিথ্যার বেসাতিতে। আমাদের চূড়ান্ত প্রশ্রয় পায় কিয়ারোসত্মামির ক্লোজ-আপ (১৯৯০) ছবির প্রধান চরিত্র হুসেন শাবজিয়ানের জন্য। হুসেন শিক্ষিত বেকার। চলচ্চিত্রপ্রেমী। সে ইরানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মহসীন মাখমালবাফের পরিচয়ে তেহরানে এলিট এক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে। ছবি বানাবার কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ধরাও পড়ে। বিচারের মুখোমুখি হয়। সরলভাবে নিজের দোষ শিকার করে নেয়। সিনেমা পরিচালকের পরিচয়ে টাকা নেওয়ার অপরাধ ক্ষমা করে দেন বিচারক। কারণ আগে সে কোনো অপরাধ করেনি। যে পরিবারটির কাছ থেকে সে টাকা নিয়েছিল – তারাও তাকে ক্ষমা করে এই শর্তে যে সমাজের জন্য কোনো ভালো কাজ করবে। হুসেন শিক্ষিত হয়েও বেকার। সে ফিল্ম ভালোবাসে, ভালোবাসে বই পড়তে, ভালোবাসে মানুষ ও প্রকৃতি। এমন একজন হুসেনের টাকা নেওয়ার ভ-ামি আমরা উপেক্ষা করি কারণ হুসেন তার সংলাপের মধ্য দিয়ে ইরানের চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্রের বিষয়, বিচারব্যবস্থার অসাড়তা এবং ইরানীয় চলচ্চিত্রকারদের কারোর কারোর এলিটিস্ট চরিত্রকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে। আববাস কিয়ারোসত্মামির চরিত্রেরা এই রকম। কূপমণ্ডুক সমাজের উপেক্ষা ছুড়ে দিয়ে মোক্ষ লাভের জন্য তারা ভ-ামি করে। আমরা তাদের ভালোবাসি। কারণ তারা জীবনকে ভালোবেসে কিছু আপাত মিথ্যার বেসাতি করে।

নারী চরিত্র নাই, আছে যখন
আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে আমরা নারীদের দেখি খুব কম। শুরম্নর দিককার বেশির ভাগ ছবি শিশু-কিশোরদের নিয়ে। কিশোরীরা নেই প্রায়। শিশুপর্ব শেষে কিয়ারোসত্মামির ছবিতে আসে মানুষেরা – লৈঙ্গিকভাবে এরা প্রায় সবাই পুরম্নষ। পুরম্নষপ্রধান ছবিগুলোতে লিঙ্গ-বাসত্মবতা বিষয় নয় মোটেই। এইসব ছবি মানুষে মানুষে সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং মৃত্যুর পটভূমিকায় দাঁড়িয়ে জীবনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুষঙ্গকে ভালোবেসে যাপনের পথে পথ চলবার এক নির্মোহ আবহে নিয়ে যায় আমাদের। চরিত্র হিসেবে প্রথম প্রবলভাবে নারীকে পাই আমরা টেন (২০০২) এবং শিরিন (২০০৮) ছবিতে। দুটি ছবিতেই মানুষ হিসেবে সমাজে নারীর অবস্থান প্রবলভাবে উপস্থিত। নারীর জীবন তুলে আনেন অপার মমতায়। টেন ছবিতে ইরানের পিতৃতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী সমাজের রাজপথে গাড়িচালকের আসনে দেখি মানিয়াকে। প্রাত্যহিকতায় নারীর অধসত্মন অবস্থানে ক্ষুব্ধ মানিয়া উচ্চকণ্ঠ – তার বিক্ষুব্ধ সংলাপে পিতৃতন্ত্রের বিরম্নদ্ধে প্রতিবাদ দেখি আমরা। এই ছবির দশটি সিকোয়েন্সের প্রতিটিতেই মারিয়ার চোখ দিয়ে আমরা ইরানীয় নারীদের সাপ্রেসড জীবনের কথা শুনি। আর শিরিন ছবিতে আমরা দর্শকের সারিতে ইরানের নারীদের দেখি। তারা একটি প্রেক্ষাগৃহে বসে খসরম্ন, শিরিন আর ফরহাদের ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি দেখছেন। বারো শতকের ইরানি কবি নেজামী গনজাভির লেখা কাব্য ভিত্তি করে নির্মিত ছবিটি দেখে শিরিনের নারীরা আবেগে বিচলিত হন, কাঁদেন। তাদের কোনো কথা নেই। পর্দায় যে ছবি তারা দেখছেন সেই ছবির চরিত্র শিরিন (যাকে আমরা কোনো সময় পর্দায় দেখি না, সাউন্ড ট্র্যাকে কেবল তার কণ্ঠ শুনি) তাদের কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করেন। জবাব তো নেই প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে একসঙ্গে বসে একা একা কেঁদে চলেন শিরিন ছবির নারী দর্শকেরা। তাদের এই কান্না কি কেবল পর্দার শিরিনের জন্য? না বোধহয়। নিজেদের নারীজীবনের মূঢ় বেদনা চোখের জল হয়ে নীরবে শিরিনের নারী-দর্শকের মর্মে আঘাত হানতে থাকে বলে মনে হয় আমাদের।

না কাহিনি, হা প্রামাণ্য
আববাস কিয়ারোসত্মামির চলচ্চিত্র বিষয় এবং নির্মাণ প্রকরণে আপাতদৃষ্টিতে সরল। এই সরলতার পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলেই দেখি তারা প্রবলভাবেই জটিল। চারপাশের আপাত সরল চেনা কিছু ঘটনা কিংবা মানুষের চিরায়ত কিছু বাসত্মবতা কিয়ারোসত্মামির ছবির বিষয়। এই চেনা মানুষ, মানুষের জীবনের জানা কিছু ঘটনা আশ্চর্য আলোতে বস্নার করে দেয় কাহিনিচিত্র আর প্রামাণ্যচিত্রের দেয়াল। বাসত্মব মানুষ ফিকশনে চরিত্র হয়ে আসে – যেমনটা ঘটেছে ক্লোজ-আপ ছবিতে মহসীন মাখমালবাফ চরিত্রের বেলায়। আবার বাসত্মব কোনো ঘটনা বা স্থান তাঁর কাহিনিচিত্রের গুরম্নত্বপূর্ণ ঘটনা, স্থান সেই চলচ্চিত্রের বিষয় নির্ধারণ করেছে। যেমন কুকার নামে একটি গ্রামের কথা তাঁর একাধিক ছবিতে আছে। কুকার তেহরানের খুব কাছেরই একটি গ্রাম। সেই গ্রাম তাঁর তিনটি কাহিনিচিত্রে (হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম, অ্যান্ড লাইফ গোজ অন এবং থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ) তিন ভিন্ন অনুষঙ্গে এসেছে। এসেছে ১৯৯০ সালে ইরানের একটি ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ। অ্যান্ড লাইফ গোজ অন এবং থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ – ছবি দুটিতে সম্পূর্ণ আলাদা প্রেক্ষাপটে ভূমিকম্প ঘটনা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফিকশনে ডকুমেন্ট আসে উপাদান বা অনুষঙ্গ হিসেবে। এটা কখনো গল্প বলার প্রয়োজনে, যেখানে ছবিতে সেই প্রামাণ্য বিষয়টি ফিকশনাল এলিমেন্ট হিসেবেই ব্যবহৃত হয়। আবার ফিকশনে প্রামাণ্য উপাদান হিসেবেই উপস্থিত হয় প্রামাণ্য অংশ। যেমনটা ঘটেছে দ্য টেস্ট অব চেরি ছবিতে। এই ছবিতে ফিকশনাল পুরো অংশটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর দেখা যায় প্রামাণ্য অংশ যেখানে আববাস কিয়ারোসত্মামি দ্য টেস্ট অব চেরি ছবির জন্যই শুটিং করছেন। ফিকশনাল এবং প্রামাণ্য অংশ – দুটো মিলেই তৈরি হয় দ্য টেস্ট অব চেরি চলচ্চিত্র। অন্যদিকে তাঁর টেন ছবিটি একটি ফিকশন। কিন্তু এই ছবি এমন কায়দায় লিখিত মুখস্থ কোনো সংলাপ ছাড়া এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যে এটি যে-কোনো প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের চেয়ে অনেক বেশি প্রামাণ্য হয়ে উঠেছে। মানবজীবনের চিরায়ত সত্যের যে নির্যাস তিনি দর্শককে দিতে চান সেইখানে কোনটি বাসত্মব আর কোনটি নির্মিত বাসত্মব সেই শ্রেণীকরণ অবান্তর হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে আর বেশি কিছু লেখার আগে কিয়ারোসত্মামির চলচ্চিত্রে ফিকশন আর প্রামাণ্যের বিভাজিত দেয়াল প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন সেই কথাটিই এখানে মোক্ষম বলে মনে হচ্ছে : ‘We can never get close to the truth except through lying.’

দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণ
আববাস কিয়ারোসত্মামি কোনো ছবিতেই কাহিনি, ঘটনার পূর্বাপর পুরোটা জানান না আমাদের। আবার পর্দায় বলতে দেখি না এমন অনেক সংলাপ, শব্দ এবং মনোলগের চমৎকার ব্যবহার আমরা পাই আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে। ফলে পর্দায় দেখানো বাসত্মবতার বাইরে থাকা বাসত্মবতা, মানুষ এবং ঘটনা ছবির ন্যারেটিভে জায়গা করে নেয়। এই অসম্পূর্ণতার কারণ কিয়ারোসত্মামি চান, যে ছবি তিনি পর্দায় তৈরি করেছেন তা পূর্ণাঙ্গ হয়ে উঠুক দর্শকের মনের ভেতর। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি কথাবলি নামের একটি অনলাইন প্রকাশনায় রাজীব দত্তের বাংলা অনুবাদে পড়া এক সাক্ষাৎকারের কথা মনে পড়ছে। সাক্ষাৎকারটি ইরানের আরেক চলচ্চিত্র পরিচালক শাহীন পারহামি নিয়েছিলেন ২০০০ সালে, মন্ট্রিয়লে। সেই সাক্ষাৎকারে আববাস কিয়ারোসত্মামি বলেছেন, ‘আমার তো ঈর্ষা লাগে, যখন দেখি কোনো লেখকের একটা উপন্যাস পড়তে গিয়ে কল্পনা করার বিশাল জগৎ পাওয়া যায়। সিনেমাও শিল্পী এবং দর্শককে এই স্বাধীনতা দিতে পারে। যখন দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস (১৯৯৯) বানাচ্ছিলাম, আমি জানতাম একটা লোক বারবার পাহাড়ে উঠছে, এটা দেখতে অনেক বিরক্তিকর। কিন্তু আমি এ চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম, দর্শক বিরক্ত হোক। চরিত্রগুলোই ওই ধরনের। বিরক্তিকর। কোনো কাহিনি নেই। শুধু নিত্যনৈমিত্তিক কিছু বিষয় এবং কিছু দৃশ্য। এই ছবির মূল চরিত্র কিছু ঘটার অপেক্ষায় আছে। এই-ই কিন্তু এই ছবির কাহিনি। কিন্তু তেমন কিছু আসলে ঘটে না। এই যে কিছু না ঘটা এতে দর্শকের কৌতূহল তৈরি হচ্ছে। শেষের দিকে একজন মাটিচাপা পড়ার মতো ছোট একটা ঘটনা ঘটল, গল্পটা তৈরি হয়ে গেল। আমরা যা দেখছি না, তারও একটা ভালো ইমপ্যাক্ট আমাদের ওপর পড়ে। সেই ইমপ্যাক্ট আমাদের ওপর অনেক দিন থাকে। এটা দর্শকের কল্পনাকে আরো বিসত্মৃত করে। অনেক সময়, উপন্যাসে আলাদা অধ্যায়ের মতো সিনেমায়ও দর্শকের জন্য কিছু খালি রাখা লাগে, যাতে তার কল্পনাকে উসকে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।’
কেবল দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস ছবিতে নয় – দর্শকের এই সক্রিয়তার সুযোগ তাঁর প্রায় সব ছবিতেই প্রবলভাবে উপস্থিত। ক্লোজ-আপ, লাইফ, অ্যান্ড নাথিং মোর, টেস্ট অব চেরি, থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ, শিরিন, টেন, ফাইভ, লাইক সামওয়ান ইন লাভ (২০১২) – উলেস্নখযোগ্য প্রায় সব ছবিতেই পর্দায় উপস্থাপিত চরিত্র ও ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না ছবির গল্প। পর্দায় উপস্থাপিত মানুষের জীবনের গল্পগুলোর নানান সূত্র দর্শকের হৃদয় এবং মসিত্মষ্কের কাছে ছেড়ে দেন। দর্শক স্বাধীন। তিনি কিংবা তারা নিজেদের মতো করে গল্প নিজের ভেতরে তৈরি করে নিতে পারেন। আববাস কিয়ারোসত্মামি দর্শককে চূড়ান্তভাবে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন টেন (২০০২) এবং ফাইভ (২০০২) ছবিতে। টেন ছবিতে তবু আমরা কিছু মানুষের দেখা পাই, তাদের কথা শুনি। সেই কথাগুলো ছোট ছোট অনেক গল্পের, বাসত্মবতার দৃশ্য আমাদের ভেতরে জারিত করে। কিন্তু ফাইভ ছবিতে কেবল দৃশ্য আর শব্দ। কোনো সংলাপ নেই। ফলে গল্পের কোনো সূত্র আর পরিচালক তাঁর দর্শককে দেন না। লম্বা পাঁচটি শটই এই ছবির পাঁচ সিকোয়েন্স এবং তারপর কোনো সংলাপ না শুনিয়ে শেষ হওয়া ছবি ফাইভ আমাদের অন্তর্গত বাসত্মবতায় ঘুরে ঘুরে অবোধ্য অনুভব নিয়ে তাড়া করে। এই তাড়ার কোনো এক প্রান্তসীমায় পৌঁছে জীবন ও জগতের অবিনশ্বর নির্মোহ প্রবহমানতাকে আরো একবার চিনে নিয়ে জীবনকে আরো বেশি করে ভালোবাসতে শিখি আমরা।
ইমেজের পরিবর্তে অন্ধকার যখন ইমেজ
আববাস কিয়ারোসত্মামি চান পর্দায় তিনি যে গল্প বা কাহিনি বা চরিত্রসমূহের সম্পর্ক – যা কিছু দেখান – দর্শক তার চেয়ে আরো বেশি কিছু দেখুক; ভাবুক তার নিজের মতো করে হৃদয়ের মধ্যিখানে ধারণ করম্নক নতুন কিংবা সম্প্রসারিত অন্য এক সিনেমা। ফলে কিয়ারোসত্মামির এমন অনেক চরিত্র আছে যারা কথা বলে খুব কম। অনেক সময় তাদের মুখে সংলাপ নেই বললেই চলে। সংলাপ, উত্তরে আবার সংলাপ ব্যাপারটা কিয়ারোসত্মামির ছবিতে খুব কম। আসলে তাঁর কাহিনি যা বলে, না বলে তার চেয়ে বেশি কিছু। হলিউডের সিনেমার মতো সংলাপ এবং অ্যাকশন প্রাবল্যের বাইরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কেতায় গল্প বলেন আববাস। অন ক্যামেরার চেয়ে অফ ক্যামেরার সংলাপ অনেক বেশি, বেশি একনাগাড়ে কথার পর কথা বলে যাওয়া চরিত্র। দীর্ঘ সময় ধরে প্রায় একতরফা কথা বলে তার অনেক চরিত্র। লক্ষণটা প্রায় শুরম্নর দিক থেকে থাকলেও বেশি করে স্পষ্ট হয় ক্লোজ-আপ থেকে। তারপর তো এই কৌশল দেখি দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস, থ্রম্ন দি অলিভ ট্রিজ, দ্য টেস্ট অব লাইফে। এটা সবচেয়ে বেশি করে দেখি শিরিন এবং টেন ছবিতে। শিরিন – পুরো ছবিটাই অফস্ক্রিন সংলাপে নির্মিত আর তার বিপরীত ট্রিটমেন্টে নির্মিত টেন। যেখানে দশটি সিকোয়েন্সে দীর্ঘ দীর্ঘ সংলাপ শুনি অনস্ক্রিনে – কার উদ্দেশে বলা তাকে না দেখেও। সংলাপ প্রতি-সংলাপের রীতি প্রায় পুরোপুরি বর্জন করেন কিয়ারোসত্মামি, দর্শকের ওপর ভরসা করেন তাঁর দর্শকের সক্রিয়তায়। পর্দায় ইমেজকে অন্ধকারে বা অন্য কথায় আলোহীনতায় ঢেকে দিয়ে কিয়ারোসত্মামি চলচ্চিত্রকে দৃশ্য সংবেদনের সীমা অতিক্রম করে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার অন্য এক ভুবনে নিয়ে যান। তিনি ভর করেন শব্দে, সংলাপে। যেমনটা করেছেন দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস ছবিতে। এখানে দুধ দোয়ানোর একটি দীর্ঘ দৃশ্যে স্ক্রিন প্রায় অন্ধকার করে দেন তিনি। আর এবিসি আফ্রিকা (২০০১) নামের প্রামাণ্যচিত্রে আট মিনিট দৈর্ঘ্যের দৃশ্য পুরোটাই অন্ধকার। দর্শকের কাছে আছে কেবল শব্দ আর সংলাপ। এই শব্দ এবং সংলাপও দর্শককে নিয়ে যায় পর্দায় উপস্থাপিত বাসত্মবতার অতিরিক্ত অন্য এক বাসত্মবতায়। না বলা কথা জানা, না দেখা দৃশ্য দেখা এবং না দেখা মানুষকে জানার এক দুর্লভ সুযোগ ঘটে কিয়ারোসত্মামির ছবিতে। তাঁর ছবির বাসত্মবতায় সক্রিয় মসিত্মষ্ক এবং হৃদয় নিয়ে দর্শকের ভূমিকায় থেকে পরিচালকের পাশাপাশি আমরাও ছবি নির্মাণের আনন্দ উপভোগ করতে পারি।

ছবির কবিতা, কবিতার ছবি
শিল্পবোদ্ধাদের অনেকে আববাস কিয়ারোসত্মামিকে পারসি কবি রম্নমির উত্তরাধিকার বলেছেন। মৃদুভাষণে স্বপ্নাচ্ছন্ন মায়াময় অনুভবের অতীত এক অনুভবে নিয়ে যায় রম্নমির কবিতা। বলা হয়ে থাকে, কিয়ারোসত্মামিও তাঁর দর্শককে কবিতার সেই মায়াময় বোধের জগতে নিয়ে যেতে চান। তিনি চান এটা। করেন এটা। মানুষের চিরায়ত ভাবনা ও বোধকে মূর্ত করতে আববাস কিয়ারোসত্মামি তাঁর পর্দায় দূর থেকে দেখা ইরানীয় প্রকৃতির পট ব্যবহার করেছেন। ব্যবহার করেছেন না বলা কথা, বোধ – না দেখা দৃশ্য, দৃশ্যের সংবেদন। নাই আলোতে সংলাপ আর শব্দে প্রত্যক্ষ সংবেদনের সীমা ছাড়িয়ে অনুভবের এক অবোধ্য সংবেদনে পৌঁছে দিতে চান আমাদের। পরিচালকের এই চাওয়ার পথ বেয়েই ইমেজের হাত ধরে বারে বারে তাঁর নানা ছবিতে আসে কবিতা। কখনো অন্যের, কখনো নিজের লেখা কবিতা; কখনো ধ্রম্নপদ, কখনো সমসাময়িক কবির রচনা। হোয়ার ইজ মাই ফ্রেন্ডস হোম এবং দ্য উইন্ড উইল ক্যারি আস ছবিতে তিনি সরাসরি অন্যের লেখা কবিতা ব্যবহার করেন। কবিতার এই ব্যবহার বর্তমানের সঙ্গে অতীতকে, পরিবর্তনের সঙ্গে প্রবহমানতাকে সংযুক্ত করে। তাঁর ছবিকে সারল্যের সীমার ওপারে মায়াময় রহস্যের কিনারে নিয়ে যায়। তাঁর এই প্রবণতা বিশেষ হয়ে ওঠে ফাইভ (২০০২) এবং রোডস অব কিয়ারোসত্মামি (২০০৫) ছবি দুটিতে। ফাইভ ছবিতে কোনো চরিত্র নেই, নেই কোনো সংলাপ। স্থির ক্যামেরা লম্বা সময় ধরে কাস্পিয়ান সাগর তীরে পাঁচটি প্রাকৃতিক দৃশ্য দর্শকের দরবারে পেশ করে। পরিপার্শ্ব শব্দ ছাড়া কোনো শব্দ নেই, নেই সংগীত; কোনো গল্প বা কাহিনির ইঙ্গিতও নেই। আছে কেবল ব্যাখ্যার অতীত এক বোধের সংবেদন। তীরে আছড়ে পড়া ঢেউগুলো হয়তো জীবন ও জগতের প্রবহমানতার কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। চলচ্চিত্রের তথাকথিত সমসত্ম ব্যাকরণ দু-হাতে দূরে ঠেলে দিয়ে পূর্ণাঙ্গ কবিতা হয়ে ওঠে কিয়ারোসত্মামির ফাইভ। এই কবিতার অন্য এক রূপ দেখি তাঁর রোডস অব কিয়ারোসত্মামি নামের প্রামাণ্যচিত্রে। এইখানে দেখি বেশ লম্বা এক কবিতা ব্যবহার করেন তিনি, স্বকণ্ঠে। যেখানে কেন পথ আসে ফিরে ফিরে তাঁর ছবিতে তার এক দার্শনিক ব্যাখ্যা তিনি দেন। কবিতাটিই এখানে উদ্ধৃত করা যাক :
The road is the expression of man’s
journey, in search of provisions.
The road is the illustration of 
the soul that has no peace,
and the body is pack animal of the soul
that carries it from place to place.
Whoever neglect his pack animal will
never reach his journey’s end,
but the journey of man continues.
Our roads are like ourselves, sometimes
stony, sometimes paved,
sometimes winding, sometimes straight
and the paths we draw on the earth are like scratches upon it.
And we have other ways inside us,
ways of sadness, ways of joy,
ways of love, ways of thought,
ways of escape
and sometimes ways which
spring from hatred,
ways which destroy us,
ways which go nowhere,
ways without a conclusion
like a stagnant river.
The road is man’s confession
of the places he is fleeing from,
the places he is heading.
The road is life, the road is man,
and man’s road, however small,
flows on the page of existence,
sometimes without conclusion,
sometimes victorious.
পথের ব্যাখ্যায় সেই প্রবহমান জীবনেরই কথা!

এঁকেবেঁকে গেছে যে পথ
লেখার শুরম্নতেই বলেছি, আববাস কিয়ারোসত্মামি স্থিরচিত্র তুলতেন। প্রায়ই তিনি বেরিয়ে পড়তেন ঘরের বাইরে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে খোলা প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতেন। সেই সময় তিনি হাজার হাজার পথের ছবি তুলেছেন নিতান্ত শখের বশে। কিন্তু তাঁর বানানো চলচ্চিত্রেও পথ আসে ফিরে ফিরে। তাঁর চরিত্ররা যত না ঘরে তার চেয়ে বেশি পথে। পথে – চলন্ত গাড়িতে। খুঁজে চলেছে তারা, ফিরছে তারা কোনো নীড়ে, কিংবা চলছে তারা পথে যে পথ তাদের নিয়ে যাবে দূরে কোথাও – আরো দূরের কোনো জানা কিংবা না জানা থানে। কেন? উত্তরটা আছে তাঁর ছবির বিষয়ে, তাঁর চরিত্রগুলোর জীবনের অলিগলিতে। তাঁর চরিত্রেরা আসলে এই পৃথিবীতে পরিব্রাজক মাত্র। জন্ম থেকে তারা চলেছে। মরণ তাদের শেষ ঠিকানা। কিন্তু সেখানে পৌঁছুবার আগে তারা পৃথিবীর রূপ, রস আর রঙের বাহার দেখে নিতে চায়। ভালোবাসতে চায়, চায় ঘর বাঁধতে, চায় দূর শহরে গিয়ে খেলা দেখার আনন্দ উপভোগ করতে। পথ থেকে পথে চলতে চলতেই তারা জীবনকে খুঁজে ফেরে, জীবন যাপনের আড়ম্বর জোগাড় করে। এই পথই তাদের পথের শেষের নিশানার ইশারাও দেয়। এই পথে আছে প্রিয়জনের কাছে ফেরার ডাক, আছে প্রিয়জনের কাছে প্রত্যাখ্যানের বেদনা; আছে অনিশ্চিত যাত্রার ইঙ্গিত। আনন্দ আর বেদনা, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির সম্মিলনে মানুষের সামগ্রিক যাত্রার এক দার্শনিক রূপায়ণ পথ থেকে পথে ফেরা আববাস কিয়ারোসত্মামির চলচ্চিত্র। রোডস অব আববাস কিয়ারোসত্মামি ছবিতে ধ্রম্নপদ কিংবা সমসাময়িক পারসি কবিদের উদ্ধৃত করে তিনি স্পষ্টতই বলেন : the road is : ‘exile, wind, song, travel, and restlessness’
‘Moonlight shining on a path it cares not to follow’
or
‘I struggle down the road heading nowhere’ or
‘Each route carries travelers who
make slow progress as they
rush from side to side.’

স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ, আশা আর নিরাশার মেলবন্ধনে মানুষের জীবন বয়ে চলে। চলতে চলতে এগিয়ে যায়, নানা বাঁক বদলে বদলে অভীষ্টের দিকে পৌঁছুতে থাকে। দার্শনিক বোধের এই প্রতীকী রূপ আববাস কিয়ারোসত্মামির ছবিতে ব্যবহৃত এঁকেবেঁকে যাওয়া পথেরা।

শেষ করার আগে
আববাস কিয়ারোসত্মামি অপেশাদার অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর অধিকাংশ ক্রুও ছিলেন অপেশাদার। প্রথম ছবি থেকেই তিনি নিজস্ব চলচ্চিত্র ভাষা তৈরি করতে চেয়েছেন। ছবি থেকে ছবিতে তিনি তাঁর চলচ্চিত্রিক কৌশলের ইঙ্গিত রেখেছেন। আবার একই সঙ্গে তিনি এক ছবি থেকে অন্য ছবিতে একেবারে ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে চেয়েছেন। তাঁর টেন আর ফাইভ দেখতে এবং শুনতে খুব আলাদা। সংবেদনের আলাদা সত্মরে সম্পূর্ণ ভিন্নরকমভাবে তারা কাজ করে। দুটি ছবিই তিনি তৈরি করেছেন সমসাময়িক ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহার করে। এই ব্যবহার যেমন বিকল্প স্বাধীন সিনেমার রূপ আমাদের কাছে উপস্থিত করে, ঠিক তেমনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় – প্রযুক্তি সব নয়। প্রসঙ্গটি শেষ করা যায় তাঁরই কথা দিয়ে : ‘It seems that filmmakers are being divided between those working in digital and those who are not. I think it’s not something predetermined – it all depends on what project we have in mind, and on that basis we choose the medium.’
সিনেমা তাঁর কাছে বক্তব্য প্রচারের কোনো মাধ্যম নয়। তিনি আসলে চেয়েছেন জীবন সম্পর্কে তাঁর দার্শনিক প্রজ্ঞা দর্শকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে। চেয়েছেন একটা গান, একটা ছবি বা কবিতার মতোই দর্শক অনুভব করম্নক তাঁর ছবি! আববাস কিয়ারোসত্মামি বিষয় এবং তা প্রকাশের অনন্যতায় সিনেমার ইতিহাসে এক বিশেষ জন হয়ে আছেন, থাকবেন। 

তথ্যসূত্র
১. আববাস কিয়ারোসত্মামি-নির্মিত সব চলচ্চিত্র
২. অনলাইন পত্রিকা সেন্সেস অব সিনেমা
৩. উইকিপিডিয়া
৪. দ্য গার্ডিয়ান
৫. অনলাইন প্রকাশনা কথাবলি এবং
৬. ইউটিউবে পাওয়া আববাস কিয়ারোসত্মামির বিভিন্ন সাক্ষাৎকার।
আগস্ট, ২০১৬

Leave a Reply

*