logo

আধুনিক ঐতিহ্যের চিত্রী আমিনুল ইসলাম

শরীফ আতিক-উজ-জামান

দেশবিভাগোত্তর সময়টাকে সূচনাকাল ধরে বাংলাদেশের শিল্পকলার যে বয়স গণনা করা হয়ে থাকে সেই হিসাবে আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১) দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পী। আর এই প্রজন্মের শিল্পীদের হাত ধরেই বাংলাদেশে পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক বিমূর্ততার গোড়াপত্তন হয়েছে। সমগ্র ষাটের দশকজুড়ে এঁদের ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রভাববলয়ের মধ্যে ছিল এদেশের শিল্পকলার জগৎ। তাই বাস্তববাদ ও প্রকৃতিবাদের সঙ্গে লোকশিল্পের মিশ্রণে বিশেষ শিল্প প্রকাশভঙ্গির নির্মাণে যত্নবান জয়নুল-কামরুল-সুলতান-সফিউদ্দীনের মতো প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে এঁদের ছিল মানসিক দ্বন্দ্ব ও শিল্পভাবনার বিরোধ। এ থেকে অবশ্য এদেশের শিল্পকলাই লাভবান হয়েছে। একটি বিশেষ বৃত্তে আবদ্ধ না থেকে বহুমাত্রিকতা অর্জনের পথে অগ্রসর হতে পেরেছে। উনিশ শতকের শেষপাদে ইয়োরোপে যে বিমূর্ততার সূচনা তা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই যুগেই নতুন নতুন মতবাদের মাধ্যমে আরো ব্যাপকতা অর্জন করেছে। ১৯০৫ সালে প্রকট রং ব্যবহারের চমক নিয়ে ফভরা উপস্থিত হওয়ার দুবছরের মাথায়ই পিকাসো, ব্রাক, জুয়ান গ্রিস প্রমুখ জ্যামিতিক ছকে ছবি অাঁকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন, যা কিউবিক বা ঘনকবাদ আন্দোলন নামে পরিচিতি লাভ করল; এর দুবছর পর ১৯০৯ সালে যন্ত্র, গতি, দ্রুততা, শক্তি ইত্যাদি আধুনিক যুগের বৈশিষ্ট্য ও চিত্রকল্প উপস্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে ফিউচারিস্ট শিল্প আন্দোলন শুরু হলো; ১৯১৬ সালে বস্ত্তর কদর্যতার মাঝে সৌন্দর্য অনুসন্ধানের ব্রত নিয়ে দাদাবাদীরা হাজির হলেন। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৮), যার প্রতিক্রিয়ায় মানুষের মনোজগতে যে পরিবর্তন এলো তার ছোঁয়া পড়ল শিল্প-সাহিত্যে। টি এস এলিয়ট প্রমুখ সাহিত্যের খোলনলচে পালটে দিলেন আর রেনে ম্যাগ্রিত, দালি, ব্রেতোঁ, ডুশ্যাম্প প্রমুখ স্বপ্নের চিত্ররূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে পরাবাস্তববাদী চিত্র আন্দোলনের সূচনা করলেন। এসবই আমিনুল ইসলামের জন্মের পূর্বেকার ঘটনা। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, সেই সময় প্রাচ্যশিল্পে, বিশেষ করে ভারতীয় চিত্রকলায় এসব মতবাদের ছোঁয়া তেমন একটা লাগেনি। লাগাটা জরুরি ছিল কি না তা অন্য প্রসঙ্গ। কিন্তু ভারতীয় চিত্রকলা তখনো প্রকৃতি ও বাস্তববাদী ধারায় আবদ্ধ, বেশি করে কাহিনিনির্ভর, দ্বিমাত্রিক ও অলংকারবহুল। এ অবস্থা থেকে ভারতশিল্পকে নতুন পথ দেখিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ইয়োরোপ ভ্রমণকালে প্রচুর পাশ্চাত্য শিল্পকলা দর্শনের অভিজ্ঞতা আর শৈশবের কিঞ্চিৎ অাঁকাজোকার দক্ষতা কাজে লাগিয়ে তিনি নতুন এক ধরনের ছবির জন্ম দিয়েছিলেন, যার মধ্যে সুস্পষ্ট ইউরোপকেন্দ্রিক আধুনিকতা ছিল। কিন্তু সেই পথে সহসাই কেউ হাঁটেননি, কলকাতার একমাত্র আর্ট স্কুলেও ভিক্টোরীয় শিল্পাদর্শ লালনের চেয়ে বেশি কিছু হয়নি। যাঁদের এদেশের প্রথম প্রজন্মের শিল্পী বলা হচ্ছে তাঁরা সবাই ওই আর্ট স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তাঁদের শিল্পচর্চায় তাই গৎবাঁধা বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন রয়েছে, যার মাঝ থেকেই তাঁরা নিজস্ব শৈলী নির্মাণে সমর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক আধুনিকতা এসেছে আমিনুল ইসলামদের দেখানো পথ ধরে। কাইয়ুম চৌধুরীর লেখা থেকে জানতে পারি যে, কলকাতায় দেশ পত্রিকায় চিঠি লিখে আমিনুল জানিয়েছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলার উত্তরাধিকার বাংলাদেশের শিল্পীরাই বহন করছেন।’১
আমিনুল পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক আধুনিকতার প্রতি তাঁর দুর্বলতার কথা কখনো অস্বীকার করেননি, বরং বিভিন্ন সময়ে যেসব ভারতীয় শিল্পী, প্রদোষ দাসগুপ্ত, চিন্তামনি কর, নীরদ মজুমদার, পরিতোষ সেন প্রমুখ ইয়োরোপে শিল্পশিক্ষা নিয়ে ফিরে এসে আবার ঐতিহ্যলগ্ন হতে গিয়ে তথাকথিত ভারতীয়তায় আত্মসমর্পণ করেছেন, তাঁদের তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছেন। এ-সম্পর্কে তিনি তাঁর নিজের একটি লেখায় যে মন্তব্য করেছেন তা থেকে বিমূর্ততার প্রতি তাঁর আকর্ষণের কারণ খানিকটা হলেও উপলব্ধি করা যাবে :
‘উলি�খিত প্রায় সবাই একসময়ে অবনীন্দ্রনাথ-প্রবর্তিত ‘বেঙ্গল স্কুলে’র বিরোধী হয়েও দেশ-বিদেশ ঘুরে পঞ্চাশের দশকে ফিরে এসেছেন তথাকথিত ভারতীয়তাতেই। ব্যতিক্রম শুধু পরিতোষ সেন। এ-সময়ের কলকাতা ও শান্তিনিকেতনকেন্দ্রিক অধিকাংশ বাঙালি শিল্পীর কূপমন্ডূকতা আমাদের বিস্মিত করে বইকি। … ইউরোপে আধুনিক ধারার এতসব বৈপ�বিক কর্মকান্ড সংঘটিত হয়েছে বিংশ শতাব্দীর চলি�শের দশকের মধ্যেই। এদের কিছু প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। তথাপি এই সময়ের পরে ইউরোপ প্রবাসী শিল্পকলা শিক্ষার্থী বাঙালি শিল্পীগণ এ সম্বন্ধে বিশেষ ভাবিত ছিলেন না।’২
আমিনুল ইসলাম জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালে ঢাকার অদূরে নানাবাড়িতে। এদেশের অনেক বিখ্যাত শিল্পীর পারিবারিক রক্ষণশীল আবহ তাঁদের শিল্পী হয়ে বেড়ে ওঠার পথে বিশেষ অন্তরায় ছিল, সেক্ষেত্রে আমিনুলের পারিবারিক পরিবেশ অনুকূলেই ছিল বলতে হবে। তাঁর স্কুল ইন্সপেক্টর বাবা ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত উদার দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ ছিলেন। তারপরও তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার ব্যাপারে তাঁদের সমর্থন ছিল না। শিল্পীর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তাঁরা তাঁকে এ পথে বেশিদূর এগোতে দিতে চাননি। কিন্তু আমিনুলের ঐকান্তিক ইচ্ছার কাছে শেষ পর্যন্ত তাঁরা হার মানেন। আমিনুল চেয়েছিলেন ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতা আর্ট স্কুলে পড়তে যাবেন, কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হয়ে গেল আর তখন ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হবে জানতে পেরে তিনি অপেক্ষা করে রইলেন সেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য। তবে মধ্যবর্তী সময়টাতে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা কলেজে।
শিল্পকলার প্রতি আমিনুলের আগ্রহ তৈরি হয়েছিল নানাবাড়িতে কারুশিল্পের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র ধরে। গ্রামের মহিলাদের নকশি পিঠা, বেতের অাঁশ দিয়ে গোল হাতপাখা ও শাড়ির পাড়ের সুতো দিয়ে ফুল-লতা-পাতা তৈরির শৈল্পিক কাজ তাঁকে টেনেছিল। ১৯৩৬ সালে তাঁর বাবা ঢাকায় বদলি হয়ে এলে আমিনুল প্রথমে মাহুতটুলির একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পরে আর্মানিটোলা স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুলের অঙ্কন-শিক্ষকের কথা আমিনুল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। পুরনো ঢাকার রামমোহন লাইব্রেরিতে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের চিত্রকর্মের সঙ্গে আমিনুলের পরিচয় হয়। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি সেখানে ভর্তি হন। ওই স্কুলের তিনি প্রথম শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রথম দিককার কাজে শিল্পের ব্যাকরণ রপ্ত করার কৌশল যেমন লুকানো থাকে না, আমিনুলও তার খুব একটা ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাঁর জলরঙে করা সিদ্ধেশ্বরী মন্দির (১৯৫০), কিউ (১৯৫১), রাতে গানের আসর (১৯৫১) ইত্যাদি সেই ধরনের অ্যাকাডেমিক কাজ। কিন্তু তারপরও এটাই সত্য যে, বিষয়বস্ত্তকে গুরুত্বহীন করে, গল্প বলা পরিহার করে চিত্রকলার আঙ্গিকগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ আমিনুলদের হাত দিয়েই প্রথম শুরু হয়েছে। এঁদের অগ্রজদের দু-একজনের কাজে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রয়াস লক্ষ করা গেলেও কেউ ওই পথে বেশিদূর এগোনোর সাহস করেননি তাঁদের সৃষ্টির ললাটে ‘দুর্বোধ্য’ তকমা এঁটে যাওয়ার ভয়ে। নতুনরা এই সাহস দেখিয়েছিলেন, কিন্তু ফয়জুল আজিমের মতো কেউ কেউ এটাকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেছেন :
প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা, যাঁরা তখন শিল্পাঙ্গনে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো বিরাজমান, এঁদের পাশাপাশি তখনো অখ্যাত ও দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ শিল্পীরা অস্তিত্বের জন্যে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভিন্ন শিল্পাঙ্গিক বেছে নিয়েছিলেন – এ সিদ্ধান্ত একেবারে অযৌক্তিক বিবেচনা করা যাবে না। বিশেষ করে পাশ্চাত্য বিমূর্ত শিল্পের সংস্পর্শে আসার পরে এ ধরনের শিল্প সম্পর্কে তরুণ শিল্পীদের প্রবল আগ্রহ এবং পাশাপাশি পাশ্চাত্য ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এলিট শ্রেণী ও নব্য পুঁজিপতি শ্রেণীর মাঝে যখন বিমূর্ত শিল্পের কদর লক্ষ্য করা যায়। যা হোক ব্যাপক পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে দ্বিতীয় প্রজন্মের একদল শিল্পী এবং এঁদের প্রবর্তিত বিমূর্ত শিল্পের ধারাটি এদেশের শিল্পাঙ্গনে একটি শক্ত আসন পেতে নিল।৩
এ বক্তব্যের মধ্যে কিছুটা সত্যের প্রতিফলন রয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু বিমূর্ত শিল্প সৃষ্টির পেছনে সামাজিক বাস্তবতা, ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব – মানসিক দ্বন্দ্ব, নৈরাশ্য, হতাশা, পারক্যবোধ ইত্যাদি জটিল অবস্থা প্রকাশের দায় ছিল। স্বভাবতই সব অনুভূতি বাস্তব-অনুষঙ্গে প্রকাশ করা যায় না বলেই বিমূর্ততার আশ্রয় নিতে হয়েছে। সেই ধারাতে শিল্পচর্চার আগ্রহকে শুধু পাশ্চাত্যমুখিনতা বলে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। আমিনুলদের এই ধারার প্রতি আগ্রহ অবশ্যম্ভাবী ছিল। শিল্পের আন্তর্জাতিকতাবাদ থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না। ফ্লোরেন্স পর্ব (১৯৫৩-৫৬) আমিনুলের বিমূর্ততার প্রতি আগ্রহ শুধু বাড়িয়ে দিয়েছিল তা-ই নয়, ওই চর্চায় আরো দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হয়েছিল। কারণ ১৯৫৪ সালের ওই সময়টাতে যে ছবিগুলো তিনি অাঁকলেন তা প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শৈলীর বাইরে। স্পষ্টত ফ্লোরেন্স, জেলের স্বপ্ন, পরিবার ইত্যাদি ছবির জ্যামিতিক ছন্দ পিকাসোর ঘনকবাদের অনুপ্রেরণাজাত। এরপর নৌকা (১৯৫৭), হকার (১৯৫৭), দুর্গত (১৯৫৮), তরুণ অশ্বারোহী (১৯৫৮), লালরঙে নারীর গঠন (১৯৬২) ইত্যাদি ছবিতেও এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত থাকল। কিন্তু আলো-ছায়ার সুসামঞ্জস্যতায় আকার গঠন না করে বস্ত্তর বাহ্যিক কাঠামো ও ভেতরের গঠন অনুযায়ী তিনি জ্যামিতিক আকার সৃষ্টি করলেন। প্রথমদিকের কাজে রঙের ব্যবহার খানিকটা জ্যাবড়া মনে হয়, যে দুর্বলতা তিনি পরবর্তী সময়ে কাটিয়ে উঠেছিলেন। নৌকা কাজটিতে দেখা যায়, প্রতিটি রঙের স্বকীয়তা বজায় রেখে জ্যামিতিক এককগুলোর পুরোটা বা আংশিক কালো রেখার বেষ্টনী দিয়ে পরপর সাজিয়ে গেছেন। হকার ছবিটিও একই বৈশিষ্ট্যের। কিন্তু আমিনুল ইসলাম-চিত্রিত ঘনকবাদকে শিল্পী রফিক হোসেন বিশুদ্ধ ঘনকবাদ বলতে রাজি নন। তাঁর মতে,
আমিনুলের গঠনকালীন অর্থাৎ পঞ্চাশ দশকের কাজগুলো পরীক্ষা করলে দেখা যায়, পাশ্চাত্যের উত্তর-প্রতিচ্ছায়াবাদ এবং পিকাসোর ঘনকবাদ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি পঞ্চাশ দশকে এদেশে ঘনকবাদ প্রবর্তন ও প্রচলনের চেষ্টা করেন। তখন আমিনুল বয়সে ছিলেন তরুণ এবং শিল্পী হিসেবেও বিশেষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছিলেন না। ফলে ঘনকবাদের মূল বিষয় অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক বিষয়টা না বুঝে ঘনকবাদ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। ফলে জ্যামিতিক আকারে এক নতুন ধারার প্রবর্তন করেন। অতএব এগুলোকে ঘনকবাদ বললে ভুল হবে। এই কাজগুলোকে ঘনকবাদের অপভ্রংশ বা জ্যামিতিক আকার বলাই সমীচীন হবে।৪
দৃষ্টিভঙ্গির এই ভিন্নতাকে বিবেচনায় রেখেই একথা স্বীকার করে নিতে হবে যে, আমিনুল ঘনকবাদের যে নিরীক্ষা চালিয়েছিলেন তা অসমাপ্ত রেখে বা মুন্শিয়ানার শিখরে না পৌঁছেই অন্য রূপরীতির দিকে ঝুঁকে গেলেন, যাকে কেউ কেউ তাঁর অস্থিরতার প্রকাশ, আবার কেউ কেউ নিজস্ব শৈলী অন্বেষণের পথপরিক্রমায় বাঁকবদল বলে চিহ্নিত করেছেন। ষাটের দশকের শুরুতেই আমিনুল যে নতুন ধারার কাজ শুরু করলেন তাকে অনেকে বিমূর্ত প্রকাশবাদী ধারার কাজ বলেছেন। অ্যাক্রিলিকে করা রূপান্তর (১৯৬৭) সিরিজের কাজ, তেলরঙে করা বৃদ্ধি (১৯৬৭), সকালের আলো (১৯৬৮), সন্ধ্যার আলো (১৯৬৮), আগামী সংগ্রাম (১৯৭০) ইত্যাদি এই ধারার কাজ। ওসমান জামাল এগুলোকে এভাবে চিহ্নিত করেছেন,
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, আমিনুল এই অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিস্ট ছবিগুলোতে প্রাণসঞ্চারের উপযোগী ফর্মগুলোই কেবল জৈব বিশ্ব থেকে চয়ন করেছেন এবং রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে আদিম জৈব শক্তিসমূহের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে প্রত্যক্ষ করেছেন।৫
বিমূর্ত চিত্রকলার মতোই এই বক্তব্য বেশ জটিল হয়ে গেল। বিমূর্ত প্রকাশবাদ মূলত একটি শিল্পশৈলী, যার ভেতর দিয়ে শিল্পী স্বতঃস্ফূর্ততার সঙ্গে নিজস্ব ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন। চলি�শের দশকে জন্ম নেওয়া এই শিল্প মতবাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে নতুন মাত্রা যুক্তকারী হলোকাস্ট ও পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল। এই বীভৎস ঘটনা মানুষের মনে যে বেদনাদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল তার চিত্রকল্প ধরা পড়েছিল শিল্পীর ক্যানভাসে, যখন তাঁরা একটি সমগ্র ক্যানভাসকে কমলা অথবা নীল রঙে রাঙিয়ে রূপ দিতে চাইলেন। এটা একটি আমেরিকান শিল্প আন্দোলন, যা সারা বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল। দ্রোহ, নৈরাজ্য, নৈরাশ্য, পারক্যবোধ, ব্যক্তি-অনুভূতি শুধুমাত্র রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করাটাই এই শিল্প ঘরানার বৈশিষ্ট্য। এর সঙ্গে জার্মান প্রকাশবাদীদের আবেগ, তাড়না ও স্বপ্রকাশের একাগ্রতা যুক্ত হয়েছিল। বেশিরভাগ বিমূর্ত প্রকাশবাদী শিল্পকর্ম বস্ত্ত বা কোনো আদলের চিত্রায়ণ নয়, বরং রং ও তুলির টানের অধ্যয়ন। মূলত দুই ধরনের বিমূর্ত প্রকাশবাদের অস্তিত্ব রয়েছে। জঙ্গম চিত্র (Action Painting) ও বর্ণিল জমিন চিত্র (Color Field Painting)। প্রথমটির লক্ষ্য হলো বুনট ও গতির রূপায়ণ। জ্যাকসন পোলক হলেন এই ধারার জনক। ক্যানভাসে ফোঁটা ফোঁটা রং ফেলে এবং ঢেলে দিয়ে তিনি এই ধরনের চিত্রমালা সৃষ্টি করেছিলেন। আর দ্বিতীয় ধারার শিল্পীরা শুধুমাত্র রং ও আকার নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন। মার্ক রথকো এই ধারার স্রষ্টা, যিনি আয়তাকার ক্ষেত্রে ও রঙের বৈচিত্র্যের মাধ্যমে চিত্র রচনা করেছেন।
আমিনুলের রূপান্তর সিরিজের ছবিসহ উলি�খিত ছবিগুলো রথকো-সৃষ্ট ধারার। দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্ত্তর আকার রঙের মাঝে বিলীন হয়ে গেছে, বহুবর্ণের মাঝে যেমন সামঞ্জস্য তৈরি করেছেন আবার মাত্র তিনটি রঙের মিশ্রণে অদ্ভুত ছন্দ সৃষ্টি করেছেন। রূপান্তর-৩ ছবিটিতে সবুজ, কালো ও সাদা মাত্র তিনটি রং ব্যবহার করেছেন তিনি। এই বর্ণাশ্রয়ী কাজগুলোর মাধ্যমে আমিনুল নতুন পথে চলতে শুরু করলেন। মইনুদ্দীন খালেদও বিষয়টাকে এভাবেই দেখছেন :
ষাটের দশকের শেষের দিক থেকে আমিনুল ‘রূপান্তর’ সিরিজ অাঁকার মধ্য দিয়ে বর্ণপ্রধান হয়ে গেলেন। প্রকৃতির চেনা অনুষঙ্গ অবলুপ্ত করে নানা রঙের আলোয় ভরিয়ে তুললেন ক্যানভাস। ইম্প্রেশনিজমের স্বাধর্ম সংযুক্ত হলো তাঁর কাজে। আর ইম্প্রেশনিজম থেকে যদি বিমূর্তধারা সরাসরি উত্থিত হতো তাহলে আমরা যে শিল্প জন্ম নিতে দেখতাম, তেমনি এক বিমূর্ত প্রকাশবাদী শৈলীতে শিল্পচর্চা শুরু করলেন আমিনুল। এই ভাষা অনেককাল শিল্পীহৃদয়কে আবিষ্ট করে রেখেছে।৬
এই ছবিগুলোতে অসম মাত্রার বর্ণবিভেদের ফলে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়েছে। আমিনুল সেখানে যথেষ্ট সফল। কিন্তু এই মাধ্যমেও তিনি স্থির থাকেননি। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তাঁর কাজ হয়ে উঠল পরাবাস্তবধর্মী। তেলরঙে করা গণহত্যা (১৯৭২), রঙিন চশমায় বাস্তবতা (১৯৭৬), দালির স্মরণে (১৯৮৪) ইত্যাদি ছবি
পরাবাস্তববাদী চিত্রশৈলীর অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু ছবিগুলো ঠিক উতরেছে বলে মনে হয় না। ক্যানভাসের নিচের দিকে কিছু স্তূপীকৃত হাড়গোড়, মাথার খুলি রেখে কালো রঙের প্রাধান্যে কিঞ্চিৎ লাল-নীল-হলুদ-সাদার অসম মাত্রার বর্ণবিন্যাসে প্রায় পুরো ক্যানভাস ভরিয়ে তুলেছেন। কালোর যে ভাবার্থ ও প্রতীকী অর্থ – হতাশা, দুঃখ, শোক, ধ্বংস – তা আরোপ করেও এটাকে গণহত্যা বোঝানো গেছে বলে মনে হয় না। একই কথা প্রযোজ্য দালির স্মরণে (১৯৮৪) ছবিটির ক্ষেত্রে। ছোট্ট কিশোর নদীতে জাল ফেলেছে, কিন্তু তাতে মাছের বদলে মানুষ ধরা পড়েছে। ভাবনায় অভিনবত্ব রয়েছে, কিন্তু ড্রইং খুব স্বস্তি দেয় না চোখে। ওপরের দিকে বড় একটা স্পেস ছেড়ে দিয়ে নিচের দিকে মূল ড্রইংটা করা হয়েছে। পরিপ্রেক্ষিত দুর্বল, ড্রইং ও রঙের ব্যবহার আমিনুলের মানের নয়। তবে রঙিন চশমায় বাস্তবতা (১৯৭৬) ছবিটি বেশ অর্থবহ। দাবার ছকের ওপর তিনটি চশমা, যার ভেতর দিয়ে লাল, সবুজ ও আকাশি নীল বর্ণ দেখা যাচ্ছে; আকাশে ঘোলাটে চাঁদ, চারদিকে তার মরা আলো ছড়ানো। কী বোঝাতে চেয়েছেন তিনি? জীবন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে বাঘবন্দি খেলা, যাকে রঙিন চশমায় রঙিন দেখালেও আসলে তা অন্ধকারে ঢাকা? হতে পারে। তবে এই মাধ্যমে আমিনুল খুব সফল না হলেও একেবারে অসফল বলা চলে না।
এরপর আমিনুলের উলে�খযোগ্য ও নিরীক্ষাধর্মী কাজ হলো আয়না কোলাজ সিরিজ। অজানা পথ (১৯৭৬), আত্মপ্রতিকৃতির অন্বেষায় (১৯৮২) ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে তেলরং ও আয়না কোলাজ ছবিগুলো আত্মোপলব্ধির প্রচেষ্টা বলে ধারণা করে নিতে পারি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেকে দেখে, সেই দেখার ভেতর দিয়ে নিজের সম্পর্কে কি কোনো প্রশ্ন জাগে? আয়নাকে প্রতীক হিসেবে কল্পনা করে শিল্পী রফিক হোসেন বলেছেন, ‘আত্মবিশে�ষণ ও আত্মোপলব্ধির প্রতীক হিসেবে আয়না ব্যবহার করা হয়েছে …। মানুষ একদিকে উৎপাদনশীল এবং অন্যদিকে সৃজনশীল কর্মকান্ডের ভেতর দিয়ে যেমন নিজেকে প্রকাশ করে তেমনি নিজেকে উপলব্ধি করে।’৭ আত্মপ্রতিকৃতির অন্বেষা আসলে আত্মোপলব্ধিরই প্রচেষ্টা। মিশ্র মাধ্যম ব্যবহার করেছেন এখানে তিনি। প্রথমে মোটা করে রং চাপিয়ে তার ওপর ছোট ছোট আয়না খন্ড বসিয়ে মাঝে মাঝে ফাঁকা জায়গা রেখে কোনোটার মধ্যে কান, কোনোটায় জোড়া চোখ, নাক, ঠোঁট এঁকেছেন। এ এক সত্তার বিচূর্ণন। এলিয়ট যেমন তাঁর কবিতায় ভিন্ন ভিন্ন কথক ব্যবহার করে দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছেন, যারা আসলে সত্তার বিচূর্ণিত রূপ, এখানেও তেমনই মনে হয়। আমিনুল আপন সত্তাকে ভিন্নভাবে প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। তবে দু-একটি কাজে অস্বচ্ছ ও অনুজ্জ্বল রং ব্যবহার করার ফলে ছবির প��স্টিক মূল্য কমে গেছে। তবে এই কাজগুলোর সঙ্গে পিয়ের মন্ড্রিয়ানের কাজের মিল অস্বীকার করা যায় না।

আমিনুলের আরো কিছু উলে�খযোগ্য কাজ হলো মোজাইক ম্যুরাল। বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে কাজ করাটা তাঁর একটা নেশা। এটাকেই হয়তো অনেক সমালোচক অস্থিরতা বলে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু একজন শিল্পীর আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে নানা মাধ্যম নিয়ে কাজ করার, কিন্তু শেষমেশ একটাতে থিতু হতে হয়। সব মাধ্যমে সব শিল্পী সফল হন না, যেমন সব গান সব গায়কের কণ্ঠে মানিয়ে যায় না। তবে আমিনুল বিমূর্ত প্রকাশবাদী ধারাতেই বেশি সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রথম দিকের দুর্বলতা তিনি নববইয়ের দশকে কাটিয়ে উঠেছিলেন। ওই সময়ের কাজের মুন্শিয়ানা আমাদের নজর কাড়ে। তেলরঙে করা রঙের মূর্ছনা সিরিজ (১৯৯৪), সংগীতের ছন্দ ও গঠন (১৯৯৪), বিভক্তি (১৯৯৬), মাটি, পানি এবং আকাশ (২০০২), বর্ষা সিরিজ (২০০২) কাজগুলোর প��স্টিক মূল্য অসাধারণ। প্রতিটি ছবিতে অসম বর্ণবিভেদে চমৎকার বৈচিত্র্য এনেছেন, তাই ‘সংগীতের ছন্দ ও গঠনে’র সামনে দাঁড়ালে মনে হয় Unheard music is sweeter… আর বর্ষার সামনে দাঁড়ালে কখনো ঝমঝম, আবার কখনো পাতায় ঝরে পড়া টুপটাপ শব্দ কানে আসে। এই ছবি আসলে অনুভব করার, শুধু দেখার জন্য নয়। ‘কেন বার বার আমিনুল সঙ্গীতের ওপর জোর দিয়েছেন? তাঁর বক্তব্য হচ্ছে : শিল্পী দৃশ্যমানতা, বাস্তবিক কিংবা নির্বস্ত্তকমূলক, তৈরি করছেন দৃষ্টির বোধকে খুশি করার জন্য, তেমনি সঙ্গীত ও ধ্বনির মাধ্যমে গড়ে তুলছেন মেলডি। সঙ্গীতজ্ঞ ব্যবহার করেন নানা স্কেল কম্পোজিশন গড়ে তোলার জন্য; শিল্পী রেখা, আকার, রং, বুনট দিয়ে তৈরি করেন রূপরীতি দৃষ্টির বোধকে খুশি করার জন্য।’৮
তবে পরিশেষে একটু আক্ষেপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, আমিনুল ইসলাম তাঁর ষাট বছরের শিল্পীজীবনে এক রূপরীতি থেকে আরেক রূপরীতিতে ছোটাছুটি করেছেন, দৃষ্টিনন্দন চিত্রকলা উপহার দিয়েছেন; কিন্তু নিজস্ব ঘরানা তৈরি করতে পারেননি। ছবি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ছবি বলে চেনা যায় – এমনটি তাঁর ক্ষেত্রে হয়নি। আর বর্তমান সময়ের শিল্পীদের সামনে অজস্র মতবাদ আর অগুনতি ফর্মের ঐতিহ্য থাকার কারণে যা কিছুই করা হোক না কেন পূর্বসূরি কারো না কারো কাজের সঙ্গে কিছু মিল আবিষ্কার হয়েই যায়। এটা বোধহয় আধুনিক শিল্পের এক ধরনের সীমাবদ্ধতা। এটা কাটিয়ে যিনি একেবারেই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন, নিজেকে আলাদা করে চেনাতে পারবেন তিনি নতুন ঘরানার স্রষ্টা হিসেবে প্রশংসিত হবেন। তবে আমিনুল সম্পর্কে একটি কথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, তিনি শিল্পস্রষ্টা হিসেবে যে আলো ছড়িয়েছেন সে আলোতে
উত্তর-প্রজন্মের শিল্পীরা দীর্ঘদিন পথ চলবেন।

তথ্যসূত্র
১. কাইয়ুম চৌধুরী, বৈরী স্রোতের শিল্পী আমিনুল, কালি ও কলম, আশ্বিন ১৪১৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১৩
২. আমিনুল ইসলাম, চলি�শের ও পঞ্চাশের দশকে ইউরোপে বাঙালি শিল্পী, কালি ও কলম, আশ্বিন ১৪১৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১২৫-২৬
৩. ফয়জুল আজিম, চারুকলার ভূমিকা, বাংলা একাডেমি, জুন ১৯৯২, পৃষ্ঠা-৮২
৪. রফিক হোসেন, বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের ইতিহাস, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, আগস্ট ২০০৭, পৃষ্ঠা-২১১
৫. ওসমান জামাল, আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জুন ২০০৪, পৃষ্ঠা-৩১
৬. মইনুদ্দীন খালেদ, আমিনুল প্রতিভা : শিল্পের রূপান্তর, কালি ও কলম, আশ্বিন ১৪১৮, ঢাকা, পৃষ্ঠা-৮০
৭. রফিক হোসেন, বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের ইতিহাস, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, আগস্ট ২০০৭, পৃষ্ঠা-২১৭
৮. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, চিত্রশিল্প : বাংলাদেশের, বাংলা একাডেমি, জুলাই ১৯৭৪, পৃষ্ঠা-৭৭

Leave a Reply

*