logo

আত্মোপলব্ধির আত্মবিরোধী সত্য

কা মা ল উ দ্দি ন  নী লু

‘আত্মসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, আত্মকে ধ্বংস করো’ – ইবসেনের পিয়ের 

হেনরিক ইবসেনের কাব্যনাট্য পিয়ের গিন্ট সম্পর্কে আলোচনা শুরু করতে গিয়ে প্রথমেই ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে আত্মোপলব্ধির বিষয়টি এসে পড়ে। এর অর্থ কি নৈতিক মনোবৃত্তির কার্যক্ষমতাকে বোঝায়? কিংবা অন্যের মনোবৃত্তিকে ব্যবহারের মাধ্যমে ক্ষমতা, মর্যাদা ও অর্থোপার্জনকে বোঝায়? এই কাব্যনাট্য থেকে বিভিন্ন অংশ নিয়ে আমি আধুনিক বিশ্বের ব্যবসায়িক নেতৃত্বের সঙ্গে এর সম্পর্কটি চিহ্নিত করব। আমি বিশ্বাস করি, ইবসেনের এই কাব্যটি উদ্ভাসিত করে মানব পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অভিব্যক্তিকে।

আত্ম সম্পর্কিত ধারণাটি যে অত্যন্ত আগ্রহের বিষয়বস্ত্ত সে সম্পর্কে আমি যুক্তি উপস্থাপন করব। আমি বিশেষভাবে ইবসেনের আত্ম সম্পর্কিত ধারণাটি পরীক্ষা করে দেখব এবং ‘আত্মসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে, আত্মকে ধ্বংস করো’ বাক্যটির মতো ইবসেনের সবচেয়ে প্রহেলিকাময় অন্তঃবাক্যগুলোকে ব্যাখ্যা করব। পিয়ের গিন্টের প্রধান সমস্যাটা হলো সত্যিকার অর্থে সে কখনোই নিজ সত্তার ভেতরে ছিল না। তার বসবাস ছিল দুর্বল সত্তার ভেতরে। সে ছিল এক রকমের ‘ট্রল’, অন্যভাবে বলা যায় সে ছিল লোভী ও স্বার্থপর।

আমরা পিয়ের গিন্টকে তার ষাট বছর বয়সকালে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে পাই, যে তার জীবনকে নিয়ে ভাবছে এবং তারপর বুঝতে পারে তার জীবন পরিক্রমা ছিল আসলে অর্থহীন ও উদ্দেশ্যবিহীন। ফলে সে অস্তিত্ববাদী প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করে : ‘আত্মসত্তাকে প্রতিষ্ঠা করার অর্থটা কী? আমার সমগ্র জীবনে আমি কে ছিলাম?’ নিরন্তর আত্মসত্তাকে খুঁজতে গিয়ে একজন মানুষের অভিজ্ঞতা অনুসন্ধানের অর্থটিকে আমি এখানে আলোচনা করব।

হেনরিক ইবসেন ১৮৬৭ সালে পিয়ের গিন্ট রচনা করেন। আমরা কি পিয়ের গিন্টকে একজন আধুনিক ব্যবসায়ীর আদিরূপ হিসেবে ধরে নিতে পারি, যে বিশ্বের মাঝে তার সময়, শক্তি ও মেধা খাটিয়েছে শুধুমাত্র একটি প্রধান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে – জীবনে রোমাঞ্চ আনা, সাধ্যমতো অর্থ উপার্জন করা এবং সম্পদশালী ও ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা?

যখন তার রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা প্রায় শেষের পথে তখন সে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করে, সম্ভবত মানসিক প্রশান্তির আশায়। ফলাফলটা এত প্রচন্ডভাবে তার মনে দোলা দেয় যে তার ভেতরে এই ভাবনাটা উপস্থিত হয়, অর্থ ও ক্ষমতার পশ্চাদ্ধাবনটা তার আদৌ প্রয়োজন ছিল কি না?

পিয়ের গিন্ট সম্পর্কে কোনো কোনো ব্যাখ্যায় বলা হয় যে তার পুরো জীবনটাই ছিল আত্মপরিচয়ের সন্ধানে ছুটে চলা – তার প্রকৃত আপন সত্তার সন্ধানে বিশ্বব্যাপী রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা। পিয়েরের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো সে কারো কাছেই কোনো ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে আগ্রহী নয়, এ কারণে সে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। চলুন, আত্মোপলব্ধির আত্মবিরোধী সত্যকে জানার জন্য এই চরিত্রটিকে একটু সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করি।

পিয়ের গিন্ট ছিল একসময়কার সম্মানিত ব্যক্তি জন গিন্টের পুত্র, যিনি তাঁর সমস্ত অর্থ ব্যয় করে ফেলেন উদরপূর্তি ও অমিতব্যয়ী জীবনযাপনের পেছনে, ফলে তিনি খুব দ্রুত হয় পড়েন কপর্দকশূন্য। জন তখন ভাগ্যান্বেষণে স্ত্রী-পুত্রকে ঋণের মাঝে রেখে একজন সেলসম্যান হিসেবে তাঁর খামার ছেড়ে দীর্ঘ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। পিয়েরের মা ওসে তার ছেলেকে বাবার হারানো সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনার মতো করে গড়ে তুলতে চায়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই প্রমাণিত হয় কাজ করার ক্ষেত্রে পিয়ের আসলে একটা অপদার্থ।

নাটকের শুরুতেই দেখা যায় পিয়েরের মা তাকে বকাঝকা করছে তার রংচঙে কল্পনাপ্রবণতার জন্য, বিদ্রূপ করছে ধনবান কৃষকের কন্যা ইনগ্রিকে পাওয়ার সুযোগ নষ্ট করার জন্য। পিয়ের এর ফলে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ইনগ্রির বিয়ের আসরে ছুটে যায় তাকে ছিনিয়ে আনার জন্য। সেখানে অন্য একটি উপত্যকা থেকে আসা একটি পরিবারের সঙ্গে দেখা হয় তার। তাদের মাঝে সে সুলভ্যেইকে দেখতে পায় এবং তার সঙ্গে তাকে নাচতে অনুরোধ করে। কিন্তু সুলভ্যেই তাকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তার সম্পর্কে খারাপ অনেক কিছুই সে শুনেছে। সে তার কাছ থেকে চলে যায় এবং পিয়ের মদ্যপান করতে শুরু করে। যখন সে শুনতে পায় বিয়ের কনে নিজেকে ঘরে আটকে রেখেছে তখন সে তাকে নিয়ে পালিয়ে যায় ও পাহাড়ে রাতযাপন করে। ওদিকে পিয়ের পাহাড়ে হারিয়ে যেতেই পিয়েরের মা, সুলভ্যেই এবং সুলভ্যেইর বাবা তাকে খুঁজতে থাকে। ইতোমধ্যেই পিয়ের পথ হারিয়ে ফেলে এবং পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে। তার সঙ্গে দেখা হয় তিনজন প্রণয়াকুল গোপকন্যার, যারা ট্রলের প্রণয়লাভের অপেক্ষা করছে। পিয়ের তাদের সঙ্গে প্রচুর মদ্যপান করে এবং পরের দিনটি একাকী শারীরিক অস্বস্তির মধ্যে পার করে দেয়।

সে একজন সবুজ পোশাক পরিহিত নারীর সংস্পর্শে আসে, যে আসলে ট্রলরাজের কন্যা। তারা দুজন পাহাড়ের গভীরে ট্রলরাজের সভাকক্ষে আসে এবং ট্রলরাজ পিয়েরকে বলে যে সে যদি তার মেয়েকে বিয়ে করতে চায় তাহলে অবশ্যই নিজেকে ট্রলে রূপান্তর করতে হবে। পিয়ের রাজি হয় না। পরবর্তী সময়ে সে দেখতে পায়, সবুজ পোশাকের নারীর রয়েছে একটি শিশুসন্তান। পিয়ের দাবি করে, সে তাকে স্পর্শ পর্যন্ত করেনি, কিন্তু জ্ঞানী ট্রলরাজ বলে পিয়ের তার কল্পনার ভেতরেই শিশুটিকে জন্ম দিয়েছে, যেমন করে সে তার মেয়েকে কামনা করেছে।

ট্রলরাজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে : ট্রল এবং মানুষের মধ্যে পার্থক্য কী? উত্তরটা হলো : ‘মানুষ, আপন সত্তাধীন হও’, ‘ট্রল, আপন সত্তায় থাকো – যথেষ্ট’। আত্মবাদ ট্রলের আদর্শ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সময় অতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে পিয়ের ক্রমাগত বলে চলে যে, সে আপন সত্তাধীন হতে পেরেছে। একবার যখন সে বয়গ নামের একটি প্রাণী, যার কোনো বাস্তব অবয়ব নেই তার মুখোমুখি হয়, সে তাকে জিজ্ঞেস করে ‘তুমি কে?’ বয়গ উত্তর দেয় : ‘আমি’। পিয়ের বয়গের একটি কথাকে আদর্শবাণী হিসেবে গ্রহণ করে: ‘ঘোরো, ঘুরে বেড়াও’। বাকি জীবনটা পিয়ের নিজ বা সত্যের মুখোমুখি না হয়ে অকাজের ভেতরেই পার করে দেয়।

যখন পিয়েরের সঙ্গে সুলভ্যেইর বোন হেলগার দেখা হয়, যে তাকে খাবার এবং সুলভ্যেইর শুভকামনা পৌঁছে দেয়, পিয়ের তাকে একটি রুপার বোতাম দেয় সুলভ্যেইকে দেওয়ার জন্য, যেন সে তাকে ভুলে না যায়। গ্রাম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে পিয়ের যখন পাহাড়ে একটি কুটির বানাচ্ছে তখন সুলভ্যেই ফিরে আসে এবং তার সঙ্গে থাকতে চায়। পিয়ের আনন্দিত হয় এবং তাকে গ্রহণ করে। কিন্তু যখনই সুলভ্যেই কুটিরে ঢুকতে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে সবুজ পোশাকের এক নারী আবির্ভূত হয় একটি পঙ্গু ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে। এ হলো ট্রলরাজের সেই মেয়ে। সে পিয়েরকে অভিশাপ দেয়, যখনই সুলভ্যেইর সঙ্গে দেখা হবে, তখনই তাকে এবং পূর্বকৃত পাপগুলোকে তার মনে পড়বে।

পিয়ের এই ব্যাপারটাকে সহজভাবে নেয় না এবং কুটির ছেড়ে চলে যেতে মনস্থ করে, সে অজুহাত দেখায় : ‘আমার আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে’। তার মায়ের মৃত্যুর সময় সে ফিরে আসে এবং আবারো বেরিয়ে পড়ে।

অনেক বছর ধরে পিয়ের বাইরেই থেকে যায়, অনেক ধরনের পেশায় নিয়োজিত হয় এবং অসংখ্য চরিত্র অবলম্বন করে। মরক্কোর সমুদ্রতীরে ব্যবসায়ী হিসেবে অসমসাহসিক কর্মে লিপ্ত হয়, হাতে নোংরা অর্থ নিয়ে। এছাড়া সে একাধারে ধর্মপ্রচারক, দাসব্যবসায়ী ও আরো অনেক কিছু হিসেবেই দায়িত্ব পালন করে। তার বন্ধুরা তার সমস্ত কিছু ডাকাতি করে নিয়ে তাকে ফেলে যায় সমুদ্রতীরে। সেখানে সে চুরি হয়ে যাওয়া বেদুইনের কিছু পোশাক পায় এবং এই সমস্ত পোশাক গায়ে পরে সে সেখানকার উপজাতিদের ধর্মগুরু হয়ে বসে। তাদের সর্দারের মেয়ে অনিত্রাকে সে ভোগ করতে চায়, কিন্তু অনিত্রা তাকে ফাঁকি দিয়ে চলে যায়। এরপর পিয়ের মিশরে যাত্রা করে এবং তারপর স্ফিংসের মুখোমুখি হয়।

সেখানকার পাগলাগারদের পরিচালকের সঙ্গে দেখা হয় তার। সে পাগলাগারদে আসে এবং বুঝতে পারে যে প্রত্যেকটি রোগী তার নিজ ভুবনের মধ্যে আছে, নিজের ভেতরে এতটাই ডুবে আছে যে কেউ কারো পরোয়া করছে না। যৌবনে একবার পিয়ের সম্রাট হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। এই জায়গাটিতে আসার পর সে অবশেষে অভিনন্দিত হয় ‘আত্ম’র সম্রাট হিসেবে।

বৃদ্ধ পিয়ের বাড়ি ফেরার পথে জাহাজডুবির শিকার হয়। জাহাজে যে সমস্ত যাত্রী ছিল তাদের মধ্যের এক অদ্ভুত যাত্রীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়, যে তার দেহটাকে কেটে দেখতে চায় স্বপ্নটা ঠিক কোন জায়গায় থাকে। এই যাত্রীটি পিয়েরকে তার বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আতঙ্কিত করে তোলে। জাহাজডুবির পরে পিয়ের তীরে পৌঁছায় তার সমস্ত অর্থসম্পদ হারিয়ে একজন সকরুণ, বদমেজাজি বৃদ্ধ হিসেবে। নরওয়েতে তার বাড়ি ফেরার পথে সে একজন কৃষকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দেয় ও একটি নিলামে অংশগ্রহণ করে, যেখানে তার পূর্বজীবনের প্রায় সবকিছুই সে বিক্রি করতে চায়। নিলাম অনুষ্ঠিত হচ্ছিল একটি খামারবাড়িতে, যেখানে সেই বিয়েটি হয়েছিল। পিয়ের হোঁচট খায় এবং তার না করা সমস্ত কর্মের মুখোমুখি হয় সে, তার নিঃশব্দ সংগীত, অকৃত কাজ, শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু এবং অপ্রার্থিত প্রশ্ন।

তার মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে আসে এবং বলে যে তার মৃত্যুশয্যা ব্যর্থ। কারণ সে তাকে স্বর্গে নিয়ে যায়নি তার উদ্দেশ্যহীনতার কারণে। পিয়ের পালিয়ে যায় এবং বোতাম-কারিগরের মুখোমুখি হয়, যে পিয়েরের আত্মাকে গলিয়ে ফেলবে যদি সে ব্যাখ্যা করতে না পারে তার জীবনের কোন পর্যায়ে সে ‘নিজ’ ছিল। পিয়ের প্রতিবাদ করে এবং বলে যে সমসময় সে তা-ই ছিল, আর কিছুই নয়। তারপর ট্রলরাজের সঙ্গে তার দেখা হয় এবং তিনি বলেন, পিয়ের তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই ছিল ট্রল, মানুষ নয়।

বোতাম-কারিগর তাকে জানায়, সে যদি গলতে না চায় তাহলে তাকে কিছু একটা নিয়ে আসতে হবে। পিয়ের তার পাপ স্বীকারের জন্য একজন যাজককে খুঁজতে থাকে এবং পেয়ে যায় এক রোগা মানুষকে। যে বিশ্বাস করে পিয়ের এমন কোনো পাপ করেনি যাতে তাকে নরকে পাঠানো হবে। সে গুরুতর এমন কিছুই করেনি। পিয়ের হতাশ হয়ে পড়ে এবং বুঝতে পারে যে তার জীবনটা আসলে একটি খেসারত। বোতাম-কারিগর ফিরে আসে এবং তার পাপের তালিকা চায়, কিন্তু সে কিছুই দিতে পারে না, যদি না সুলভ্যেই তার পাশে এসে দাঁড়ায়। সে সুলভ্যেইর কাছে ছুটে যায় এবং তাকে তার পাপের কথা জিজ্ঞাসা করে। সুলভ্যেই তখন বলে : ‘তুমি তো কোনো পাপ করোনি, প্রিয়তম’। পিয়ের বুঝতে পারে না – ভাবে সে বোধহয় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। সুলভ্যেইকে জিজ্ঞাসা করে : ‘আমাদের শেষ দেখার পর থেকে পিয়ের গিন্ট কোথায় ছিল? আমার সত্তার ভেতরে কি আমি ছিলাম না? সত্য সত্তার ভেতরে? যেখানে চিহ্ন এঁকে দিয়েছিলেন ঈশ্বর?’ সুলভ্যেই বলে : ‘ছিলে আমার বিশ্বাসে, আমার আশায়, আমার ভালোবাসায়।’ পিয়ের চিৎকার দিয়ে ওঠে ও তাকে মা ডাকে এবং তার কোলে নিজেকে সমর্পণ করে।

সুলভ্যেই তাকে ঘুমপাড়ানি গান শোনায় এবং আমরা ধরে নিই যে তার মৃত্যু হয়, যদিও মৃত্যুর কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাই না। পিয়ের গিন্ট কি একজন মিথ্যাবাদী? নাটকের শুরুতে আমরা বিশ বছর বয়স্ক পিয়ের এবং তার মা ওসে-কে পাই।

ওসে : পিয়ের, তুই মিথ্যে কথা বলছিস!

পিয়ের : না, কখনোই না!

ওসে : সত্যি করে বল – আমার চোখের দিকে তাকা!

পিয়ের : কেন সত্যি করে বলব?

ওসে : যা ভেবেছিলাম! তোর সব কথা মিথ্যে!

পিয়ের : যা বলেছি সব সত্যি। একটাও মিথ্যে না।

এভাবেই ইবসেনের নাটকটি শুরু হয় এবং এখানে একেবারে শুরুতেই ইবসেন কণ্ঠস্বরের আঘাত সৃষ্টি করেন।

পিয়ের গিন্ট মিথ্যা বলছে – কিন্তু সে এটা অস্বীকার করছে। পিয়ের কি এখানে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার? বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যের পার্থক্যটি কি তার কাছে তাহলে অস্পষ্ট? অথবা পিয়ের যা করেছে এবং নিজের সম্পর্কে সে কি একজন সচেতন, নৈরাশ্যজনক, কুখ্যাত মিথ্যাবাদী? কাব্যটিতে এক্ষেত্রে আমরা আরো কয়েকটি চরিত্রকে বিশ্লেষণ করতে পারি। যেমন, বয়গ এখানে সরল পথ অনুসরণের প্রতিমূর্তি, যে শুধু ঘুরে বেড়াতে বলছে, সে কারো সঙ্গেই তার জীবনপথের মোড়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় না।

বয়গ তাহলে কে? একটি ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, বয়গ হলো পিয়েরের সত্তা, তার ভীরু সত্তা। এটা একটা প্রশ্নের সূত্রপাত করে। জটিলতার মুখোমুখি হলে বশ্যতা স্বীকার করতেই হবে এর অর্থটা কী?

নাটকে পরবর্তী সময়ে ইবসেন পিয়েরের আত্মসত্তার ধারণাটির আরো গভীরে প্রবেশ করেছেন। যখন পিয়ের বৃদ্ধ হয়ে পড়ে তখন সে তার জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করে। সে কি তার জীবনকে কিছু একটাতে পরিণত করতে পেরেছে কিংবা তার জীবনটা কি একেবারেই শূন্য ছিল? সে কী ছিল তাহলে? সে কি তার নিজের প্রতি সৎ ছিল এবং তার প্রচন্ড সম্ভাবনাকে সে কি উপলব্ধি করতে পেরেছে? সে কি এমন কোনো মানুষ ছিল যে কারো উপকারের জন্য কোনো কিছু করেছে? নাকি সে ছিল ট্রল? আত্মকেন্দ্রিকতার পথেই ভ্রমণ করেছে অবিরত, যে অবিশ্রান্তভাবে অর্থের পেছনে ছুটে বেড়ানোর জন্য তার নিচু প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করেছে সবসময়? পিয়েরকে কাজে লেগেছে কোন জায়গায়? ইবসেনের নাটকটি পিয়েরের নিজ সত্তাকে দেখিয়েছে বিভিন্ন পথের মোড়ে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে পিয়েরের আলাপচারিতার মাধ্যমে।

পিয়ের গিন্টের সত্তা সমগ্র বাসনানির্ভর, কখনোই পরিতৃপ্ত অহংবোধ নয়।

পিয়ের : গিন্টের সত্তা আতিথ্য দেয়

ক্ষুধা, কামনা, বাসনাকে।

গিন্টের সত্তা সমুদ্রপ্রমাণ কল্পনা,

আকাঙ্ক্ষা আর চাহিদা।

এসব স্পন্দিত করে আমার বক্ষ,

যার ভেতরেই আমার জীবন।

কিন্তু ঈশ্বরের ঈশ্বর হওয়ার জন্য

যেমন প্রয়োজন কাদামাটি।

তেমনি আমারও প্রয়োজন মহামূল্য স্বর্ণ,

সম্রাট যে হতে চাই আমি।

 

পিয়ের গিন্ট তার সহযাত্রীদের কাছে স্বীকার করে যে, তার স্বপ্ন ও জীবনের লক্ষ্য হলো সম্রাট হওয়া।

 

মি. কটন : নিঃসন্দেহে একটি লক্ষ্য আছে আপনার;

আর সেটা হলো -?

পিয়ের : সম্রাট হতে চাই আমি।

চারজন : কী?

পিয়ের : সম্রাট!

চারজন : কোন জায়গার?

পিয়ের : সারা বিশ্বের!

মঁসিয়ে বেলোঁ : কীভাবে সম্ভব?

পিয়ের : স্বর্ণের ক্ষমতায়।

এটা নতুন কোনো আকাঙ্ক্ষা নয়,

জীবিকার ভেতরেই লুকিয়ে রেখেছিলাম।

যখন ছোট ছিলাম, ভাবতাম

মেঘে ভর করে উড়ে চলেছি

সাগরের ওপর দিয়ে,

অনেক উঁচুতে উঠে যেতাম,

গায়ে থাকত রাজপোশাক

আর কোমরে তরবারির সোনালি খাপ।

তারপর ঝুপ করে নিচে পড়ে যেতাম,

কিন্তু আমার লক্ষ্য ছিল অটল।

একটি কথা লেখা আছে কোথায় যেন

মনে করতে পারছি না এখন,

যদি বিশ্বকে জয় করেও তুমি

হারাও নিজ সত্তাকে,

তাহলে তোমার সেই অর্জন

যেন ফেটে যাওয়া মাথার খুলিতে

জড়িয়ে থাকা বিজয়মাল্য।

এটাই সেই লেখা বা কথা,

যা বলা যায় পরিমিত সত্য কথন।

ভন এবারকপ্ফ : তাহলে গিন্টের আপন সত্তাটা কোথায়?

পিয়ের : আমার কপালের পেছনে

মস্তিষ্কের যে বিশ্বটা রয়েছে সেখানে।

ঈশ্বর যেমন কখনো শয়তান হতে পারেন না,

তেমনি আমিও সেখানে শুধুই আমি।

 

গিন্টের আপন সত্তাটি হচ্ছে অর্থ, ধনসম্পদ ও ক্ষমতার সর্বজনীন পশ্চাদ্ধাবন। নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করতে গিয়ে পিয়ের গিন্ট নোংরা ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী একজন উদ্যোক্তায় পরিণত হয়।

মি. কটন : আপনি কিসের ব্যবসা করতেন?

পিয়ের : আমি বেশিরভাগ সময়

নিগ্রো ক্রীতদাসদের বিক্রি করতাম ক্যারোলিনাতে

আর মূর্তি বিক্রি করতাম চীনে।

মঁসিয়ে বেলোঁ : ছিঃ ছিঃ!

ট্রাম্পেতারস্ট্রলে : এ তো শয়তানের মতো কাজ, আঙ্কল গিন্ট!

পিয়ের : আপনারা ভাবছেন

ব্যবসাটা নিয়মবিরুদ্ধ ছিল।

আমি নিজেও এটা অনুভব করেছি।

এই কাজটাকে আমি ঘৃণা করতাম,

কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনি যদি

কোনো কাজ একবার শুরু করেন,

তাহলে সেটা থামিয়ে দিতে পারবেন না।

এটা কোনো হালকা ব্যাপার নয়,

বিশেষ করে এই ধরনের বিশাল ব্যবসা

যার সঙ্গে জড়িত ছিল হাজারো কর্মরত মানুষ,

সেটা একবারেই থামিয়ে দেওয়াটা ছিল কঠিন।

অন্তত আমি এটা মেনে নিতে পারি না।

কিন্তু অন্যদিকে ফলাফলটাকে আমি

যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি।

তাই সীমা অতিক্রম করতে গিয়ে

আমি সবসময় আতঙ্কে ভুগেছি।

(…)

তাহলে আমার কী করা উচিত ছিল?

চীনের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করাটা

আমার জন্য ছিল অত্যন্ত কঠিন।

একটি পরিকল্পনা আমার মাথায় এলো,

নতুন একটি ব্যবসা শুরু করলাম

সেই একই দেশের সঙ্গে।

প্রতিটি বসন্তে সেখানে মূর্তি পাঠাতাম,

আর প্রতি শরতে খ্রিষ্টান যাজকদের জন্য পাঠাতাম

মোজা, বাইবেল, রাম আর চাল।

মি.কটন : বাহ্, লাভ ছিল তো?

পিয়ের : অবশ্যই।

অত্যন্ত সাফল্যজনক ছিল।

নির্ভয়ে তারা পরিশ্রম করেছে,

প্রতিটি মূর্তি বিক্রির বিনিময়ে

একজন করে কুলিকে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষা দেওয়া হলো।

ফলে প্রভাবটা স্তিমিত হয়ে গেল।

যাজকেরা অযথা বসে থাকার সময় পেলেন না,

মূর্তি বিষয়ক রটনার ফলে

তারা তটস্থ হয়ে থাকতেন সর্বদা।

মি. কটন : কিন্তু আফ্রিকার পণ্যগুলো?

পিয়ের : সেখানেও আমার নৈতিকতারই জয় হলো।

আমি দেখলাম আমার মতো বয়সের কারো জন্য

এই অবৈধ ব্যবসাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

কখন যে মৃত্যু এসে পড়বে কেউ জানে না,

তাছাড়া জনহিতৈষীরা কত যে ফাঁদ পেতে রেখেছে!

এর সঙ্গে আরো আছে প্রতিকূল আবহাওয়া,

অবশ্য শেষ পর্যন্ত আমারই জয় হলো।

নিজেকেই বললাম : পিটার, এবার তোমার পাল গোটাও,

ভুলগুলো সংশোধন করে নাও।

দক্ষিণে একটা জমি কিনে ফেললাম,

কাজে লাগালাম রপ্তানির জন্য রাখা শেষ নিগ্রোগুলোকে।

ওরা আস্তে আস্তে দক্ষ হয়ে উঠল,

সেইসঙ্গে বলিষ্ঠ, মোটা ও মসৃণ।

আমার জন্য ছিল এটা আনন্দের,

এমনকি ওদের জন্যও।

হ্যাঁ, অহংকার না করেই বলতে পারি

আমি ওদের সঙ্গে পিতার মতো আচরণ করেছি –

বিনিময়ে ব্যবসাতে প্রচুর লাভও অর্জন করেছি।

ওদের জন্য স্কুল তৈরি করে দিলাম,

যাতে নৈতিকতা একটি নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত

বজায় রাখা যায় এবং নজর রাখা যায়

যেন খুব নিচু স্তরে নেমে না আসে।

একসময় আমি ব্যবসাটা থেকে অবসর নিলাম,

উপনিবেশটা বিক্রি করে দিলাম,

বিক্রি করে দিলাম মানুষ, ঘোড়া, গরু সব।

বিদায় নেওয়ার সময় বিনামূল্যে ওদের

পানি মেশানো মদ খাওয়ালাম।

নিগ্রোরা এতেই মাতাল হয়ে গেল,

বিধবাদের দেওয়া হলো নস্যি।

আমি বিশ্বাস করি,

যারা মন্দ কাজ করে না, তারা ভালো কাজ করে।

এই বাণীটা যদি নিষ্কর্মা না হয়,

তাহলে আমার আগের সব পাপ

নিশ্চয়ই ক্ষমা করা হয়েছে।

আমি অনেকের চেয়েও দৃঢ়ভাবে বলতে পারি,

আমার অসৎকর্ম ভারসাম্যতা পেয়েছে

আমার সৎকর্মের দ্বারা।

 

ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে পিয়ের গিন্ট ছিল নির্দয়ভাবে একজন আত্মকেন্দ্রিক। সে নৈতিকতা বিচ্ছিন্নকারী কর্মকৌশলে নিজেকে জড়িত করেছিল। এই কর্মকৌশলগুলো ছিল মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যেগুলোর মাধ্যমে নৈতিক আত্ম-প্রেরণা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, যা কোনো ধরনের নৈতিকতার আশ্রয় ছাড়াই সৃষ্টি করেছে অসদাচরণের পথ।

আত্মোপলব্ধি আসলে কী? নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করার অর্থ কী? একটি জনপ্রিয় অভিমত হলো, যে ব্যবসায়ীটি অনেক ধনসম্পদ, মর্যাদা ও ক্ষমতা অর্জন করেছে, সে-ই নিজেকে উপলব্ধি করতে পেরেছে। সে আমাদের সমাজের বর্তমানকালের নায়ক এবং তার এই অর্জনের জন্য মানুষ তাকে শ্রদ্ধা করে। একটি ব্যতিক্রমী অভিমত হলো একজন শিল্পী, যে তার শিল্পসত্তার প্রতি সারাজীবন বিশ্বস্ত ছিল। সে অর্থোপার্জনের জন্য কাজ করেনি, বরং সে যেটাকে বিশ্বাস করে সেটাকেই প্রকাশ করে গেছে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে। নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করতে গিয়ে শিল্পীটি বিত্ত বৈভবকে বিসর্জন দিয়ে তার অন্তর্জ্ঞানকে অনুসরণ করেছে, যেটা তাকে বলেছে সে যেন মহৎ কাজে নিজেকে বিলিয়ে দেয়।

আত্মোপলব্ধির একটি চিরায়ত অভিমত রয়েছে। এটার একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে, যেহেতু এটা একজন মানুষের সৎ জীবনযাপনের দিকেই ইঙ্গিত করে। প্রাচীন গ্রিসে সৎ জীবনযাপনের শর্তই ছিল সদগুণকে উপলব্ধি করা, এর অর্থ হলো সর্বোচ্চ সামর্থ্যের বিকাশসাধন – অর্থাৎ মানুষ হিসেবে সমৃদ্ধি অর্জন করা।

‘সত্তা’ সম্পর্কিত ধারণাটিকে আসুন এবার একটু সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করি। সত্তা বলতে কী বোঝায়? সাধারণভাবে বলতে গেলে সত্তা হলো একটি জাহাজের ক্যাপ্টেন। এটা মানুষের একটি বিশেষ ক্ষমতা, যেটা আমরা যা করেছি এবং যা করা উচিত সেটার ভাবনার প্রতি আমাদেরকে কর্মক্ষম করে তোলে। প্রতিটি মানুষের গভীরতম স্থানে সত্তাটি প্রবিষ্ট করা আছে। সত্তা হলো মানুষের মর্মের ভান্ডার। একমাত্র সিরকেগোর ছাড়া মানুষের ভেতরের সম্ভাব্য সংগ্রাম সম্পর্কে জীবন্ত ব্যাখ্যা কেউই তেমন একটা দিতে পারেননি। তিনি এটাকে বলেছেন ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থার একটি     অন্তর্দ্বন্দ্ব। আরেকজন অস্তিত্ববাদী সার্ত্রে কারো সত্তার অনুভূতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে কয়েকটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন, মানসিক যন্ত্রণা, পরিত্যাগ এবং হতাশা।

আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সত্তা হচ্ছে সামাজিক তুলনা, ছদ্মবেশ এবং আমাদের খ্যাতির চিন্তার জগৎ। সত্তাকে দেখা যেতে পারে একটি নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতরে, উইলিয়াম জেমসের মতো করে : ‘আমার সত্তাটা হচ্ছে আমার শরীর এবং আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।’

বোতাম-কারিগরের মুখোমুখি হয়ে পিয়ের গিন্ট বুঝতে পারে যে, সে কখনোই তার নিজ সত্তার ভেতরে ছিল না।

বোতাম-কারিগর : তুমি কখনোই তোমার নিজের ভেতরে ছিলে না, সুতরাং তুমি মারা গেলেও তো এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

পিয়ের : কখনোই ছিলাম না? হাসি পাচ্ছে আমার!

পিয়ের গিন্ট নামে কি তবে আর কেউ ছিল?

না, বোতাম-কারিগর, বিচার করতে জানো না তুমি।

তুমি যদি আমার ভেতরটাকে দেখো

তাহলে বুঝতে পারবে,

পুরোটা জুড়েই রয়েছে শুধু পিয়ের।

বিশ্বের আর কিছুই নেই সেখানে,

না, কিছুই নেই।

 

পিয়ের গিন্ট বোতাম-কারিগরকে জিজ্ঞাসা করে ‘আত্মসত্তাধীন হওয়া’ বলতে কী বোঝায়?

 

বোতাম-কারিগর : আত্মসত্তাধীন হতে চাইলে, পিয়ের গিন্ট, আত্মকে ধ্বংস করতে হবে।

কিন্তু তোমার কাছে এই উত্তরের মূল্যই নেই।

এ কারণেই বলছি, যা কিছুই করো না কেন,

প্রভুর উদ্দেশ্য পূরণের জন্যই করো।

পিয়ের : কিন্তু প্রভুর উদ্দেশ্য মানুষ যদি না বোঝে?

বোতাম কারিগর : অনুমান করে নেবে।

 

এই ধরনের একটি উক্তি আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি? এর পেছনে যুক্তিটা কী? এর অর্থ কি নিজেকে উৎসর্গ করা? নিজের প্রতি সত্য থেকে ঈশ্বরকে কিছু একটা নিবেদন করতে হবে, আকাঙ্ক্ষিত কোনো কিছু পরিত্যাগ করতে হবে কিংবা কিছু একটা পাবার আশায় কষ্ট ভোগ করতে হবে? যদি তাই হয়, তাহলে সেটা কোন ধরনের উৎসর্গ?

একেবারে সমাপ্তিতে আমরা পাই নাটকটির অন্যতম লক্ষণীয় সংলাপ, যেখানে পিয়ের জিজ্ঞাসা করছে :

 

‘আমি এতদিন কোথায় ছিলাম,

সম্পূর্ণ আমি, সত্য আমি?

কোথায় ছিলাম,

ঈশ্বরের চিহ্ন তুলে ধরে?’

 

সুলভ্যেই উত্তর দেয় :

‘এখানে – আমার বিশ্বাসে, আমার আশায়, আমার ভালোবাসায়।’

পিয়ের গিন্ট নাটকে আমরা বেশ কয়েকজনকে দেখতে পাই, যাদের উৎসর্গ করার মতো প্রকৃত ও সত্য সত্তা রয়েছে। সুলভ্যেই তার জীবনের বেশিরভাগ অংশ নিবেদন করেছে পিয়েরের প্রতীক্ষায়। তরুণ কৃষকটি সেনাবাহিনীতে যোগ না দিতে চেয়ে নিজের আঙুল কেটে ফেলেছিল পরিবারের দেখাশোনা করার উদ্দেশ্যে। এটা অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় যাজকের কথায় :

‘কিন্তু আইনের ওপরেও একটি ব্যাপার সমুজ্জ্বল,

এই মানুষটি দেশপ্রেমিক ছিল না,

গির্জা এবং রাষ্ট্রের প্রতি সে ছিল নিষ্ফলা বৃক্ষ।

কিন্তু পাহাড়ি উপত্যকার পারিবারিক গন্ডিতে

যেখানে সে কর্তব্য পালন করত,

সেখানে সে ছিল বৃহৎ,

কারণ তার নিজস্বতা ছিল সেখানে।’

উৎসর্গের জন্য কারো এমন কিছু দিতে হবে যেটা তার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান, উৎসর্গের প্রতি পিয়েরের অনীহা কাব্যটিতে অত্যন্ত ভালোভাবে বর্ণিত আছে। উদাহরণস্বরূপ তৃতীয় অঙ্কে, যখন সে দেখে তরুণ কৃষকটি তার হাতের আঙুল কেটে ফেলে।

‘পুরো আঙুলটাই কেটে ফেলল! এত রক্ত!

এখন সে বেঁধে ফেলছে সেটা, দৌড়ে বেরিয়ে গেল।

কী সাহস! মহামূল্য আঙুল! কেটে ফেলল!

আচ্ছা, এইবার বুঝেছি,

সৈন্যবাহিনীতে যাওয়া ঠেকাতেই

তার এই আচরণ, নাহলে তাকে যুদ্ধে পাঠানো হতো।

আর ছেলেটি এভাবেই রক্ষা পেয়ে গেল।

কিন্তু তার তো আঙুল কাটা গেল,

সারাজীবন এভাবেই তাকে চলতে হবে?

এটাকে যদি বিবেচনা করি, হ্যাঁ, ঠিক,

কাজ করার জন্য নিজেকে শুধু প্রস্ত্তত করলেই হবে না,

সত্যিকার অর্থে সেটা করে দেখাতে হবে।

নাহ, এটা একেবারেই বুঝতে পারি না।’

উৎসর্গের প্রতি পিয়ের গিন্টের সত্যিকার কোনো ইচ্ছাই ছিল না। যখনই উৎসর্গ করার মতো কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি সে হয়েছে, তখনই সে জটিলতার সৃষ্টি করেছে। পিয়ের উৎসর্গকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ। সে মনে করে যে এই বিশ্ব তার শ্রেষ্ঠ সমস্ত কিছু তাকে এমনি এমনিই দিয়ে দেবে।

‘সত্তা’ সম্পর্কে সাধারণত ভাবা হয় যে এটা হলো নিরন্তর পরিবর্তনশীল শারীরিক ও মানসিক উপাদানের পিন্ড। যদি এই অস্থায়ী একত্রীকরণটি দৃঢ়ভাবে এঁটে থেকে স্থায়িত্ব লাভ করে তাহলে সেটা অসুখী অবস্থার সৃষ্টি করে। শারীরিক ও মানসিক উপাদানগুলো যখন ভুলভাবে এঁটে থাকে তখন সেটাকে ভ্রান্তিবশত বলা হয় সত্তা, অনাত্ম মতবাদটি সেটা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রতি মানুষকে প্রবৃত্ত করে।

মানুষ বনাম ট্রল।

দোবরে-রাজ ঘোষণা করে যে

মানুষেরা বলে,  ‘মানুষ, আপন সত্তাধীন হও’,

কিন্তু… ট্রলরা বলে ‘ট্রল, আপন সত্তায় থাকো – যথেষ্ট’।

 

ট্রলদের ক্ষেত্রে যে নরওয়েজীয় অভিব্যক্তিটি ইবসেন ব্যবহার করেছেন সেটা হলো ‘Troll, v.r deg selv – nok.’

এখানে ‘যথেষ্ট’ শব্দটির একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যেতে পারে যে আপনার দুর্বল সত্তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য আপনাকে আপনার ব্যক্তিসত্তার প্রতি উদার ও সদয় হতে হবে। আক্ষরিকভাবে মানুষ ও ট্রলের আদর্শবাণী হলো ‘আপন সত্তাধীন হও’ বনাম ‘আপন সত্তাধীন হও – যথেষ্ট’। নরওয়েজীয় ভাষাতেও এটা দুর্বোধ্য ও রহস্যময়।

ট্রলদের রাজা দাবি করে যে পিয়ের গিন্ট তার জীবনের বেশিরভাগ সময় আসলে ট্রল ছিল। কিন্তু পিয়ের গিন্ট প্রবলভাবে এটা প্রত্যাখ্যান করে।

 

পিয়ের  : আমি ট্রল নই –

আমার সারাজীবনে ট্রলদের বিরোধিতাই করেছি শুধু।

দোবরে-রাজ : না, সত্য নয়।

আমাদের নীতিকথা তোমার অন্তরে জ্বলজ্বল করছে,

তোমার সারাজীবনে যা করেছ

তা শুধু আমাদের শিক্ষার প্রতিই

কৃতজ্ঞতা প্রকাশ মাত্র।

যতই গোপন করো না কেন

তুমি কিন্তু আসলেই ট্রল।

তোমাকে যা শিখিয়েছি

তাই ছিল তোমার জীবনের অবলম্বন।

তুমি নিজেকে সম্পদশালী করে গড়ে তুলতে চেয়েছ,

ট্রলের মতবিশ্বাস প্রকাশ্যে স্বীকার করেছ।

পিয়ের : আমি একজন পাহাড়ি ট্রল?

নিজেতেই আচ্ছন্ন আমি?

দোবরে-রাজ : তুমি ট্রলে পরিণত হওয়ার এক জীবন্ত উদাহরণ।

ইবসেনের অন্য অনেক নাটকেই আমরা তার আত্মোপলব্ধি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিটি বুঝতে পারি। এ ডলস্ হাউস নাটকে নোরা আত্মোপলব্ধি অর্জন করে একজন মা হিসেবে একটি অপরিমেয় উৎসর্গের মাধ্যমে – তার স্বামী ও সন্তানদের ছেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে।

পিয়ের গিন্ট নাটকের শেষ অঙ্কে পিয়ের অকৃত্রিমতা প্রকাশ করে সুলভ্যেইর প্রতীক্ষার প্রতি সাড়া দিয়ে। এখানে পিয়ের দ্বিধাহীনতা ও সততার প্রতি সাড়া দিতে সক্ষম হয় এবং শেষ পর্যন্ত তার নিয়তিকে সে মেনে নেয়। কিন্তু পিয়ের ব্যবসার মধ্যে অকৃত্রিমতা খুঁজে পায়নি। আসলে পিয়ের ব্যবসার মধ্যে সম্ভবত নিজেকে উপলব্ধি করতে পারেনি। পিয়ের ছিল কবিসুলভ স্বপ্নচারী মানুষ এবং তার সর্বোচ্চ সামর্থ্য গল্প বলার ক্ষমতার মাধ্যমেই প্রকাশ পেয়েছে। শৈল্পিক পথে সে কখনোই হাঁটেনি। কবি হওয়ার দুঃসাহস সে দেখায়নি। কিন্তু ইবসেন একজন নাট্যকার হওয়ার মাধ্যমে নিজেকে উৎসর্গ করার একটি গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

পিয়ের গিন্ট চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আর্থিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত দরিদ্র ছিল। সে গ্রহণ করেছিল এমন এক পথ, যে পথ তাকে পরিণত করেছিল একজন আন্তর্জাতিক শিল্পপতিতে, একজন আত্মপ্রতিষ্ঠিত মানুষে, যদিও সে ব্যবসাকে মনে করত একটি অনৈতিক কাজ। পিয়ের ব্যবসাতে এক ধরনের সাফল্য অনুভব করত স্বার্থপরতার এক বিবেকহীন পশ্চাদ্ধাবনের মাধ্যমে, সে তার এই অশেষ অভিযাত্রা বজায় রেখেছিল জীবনে একটু সুখ লাভের আশায়। পিয়ের জীবনের সমাপ্তিতে পৌঁছেছিল একজন বৃদ্ধ ও একাকী মানুষ হিসেবে, আত্মপরিচয়ের খোঁজে নিরন্তর ঘুরে ঘুরে যে অবশেষে তার নিজের সম্পর্কে দুঃখজনক সত্যটি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ট্রলে পরিণত হওয়াটা আসলে কী? মুনাফার প্রতি বিচারবুদ্ধিহীন পশ্চাদ্ধাবনের মাধ্যমে এটাকে চিহ্নিত করা যায়, অর্থাৎ এটা হলো ‘নিজেকে সম্পদশালী’ করার মানসিকতা, বর্তমান ব্যবসায়িক বিশ্বে যেটা সুপরিচিত। যে ব্যবসায়ীটি তার দুর্বল সত্তার সেবক সে ধ্বংস করে ফেলতে পারে প্রকৃতি, মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, যদিও নিশ্চিতভাবেই সে ধ্বংস করে ফেলবে তার নিজ সত্তাকে। সত্যিকার অর্থে ও পুরোপুরিভাবে মানুষ হতে চাইলে এবং নিজের সত্তাকে উপলব্ধি করতে চাইলে প্রয়োজন নিঃস্বার্থ হওয়া, অর্থাৎ দুর্বল সত্তার প্রবৃত্তিকে অগ্রাহ্য করা এবং নিজের চেয়েও উচ্চতর উদ্দেশ্যকে প্রতিপালন করা।

Leave a Reply

*