logo

অ্যান্ডি ওয়ারহল ও আমেরিকার শিল্পকলার গতিপথ

ম ই নু ল  ই স লা ম  জা বে র
খবরটা কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুর গণ্ডিও পেরোতে পারেনি। ১৯৮৭-র ২২ ফেব্র“য়ারির ভোরে হাজার লোকের ভিড়ে ভরে যাওয়ার আগেই নিউইয়র্কের ৩৩ ইস্টউড স্ট্রিটের বাড়িটির দরজা-জানালা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ বাড়ির একটি অ্যাপার্টমেন্টের মালিক অ্যান্ডি ওয়ারহল যিনি ‘বব রবার্টস’ নাম নিয়ে মাত্র কিছুদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, এই ভোরবেলায় মারা গেছেন। রোজ সকালের মতোই তাঁর বড় ভাই কুশল জানতে ফোন করে অ্যান্ডিকে চাইলেন – অ্যান্ডির এক বন্ধু আবেগহীন কণ্ঠে জানালেন, ‘সে মারা গেছে।’ ব্যস, ওটুকুই – বন্ধু-পরিবার বা পৃথিবীর আর কারো যেন কিছুটি জানবার নেই। লাজুক, মুখচোরা স্বভাবের ছোটবেলার অ্যান্ডি যেন মৃত্যুকালেও লুকিয়েই রইলেন – ছেলেবেলায় হয়তো সে-কারণে বন্ধুদের অনেক গঞ্জনা শুনেছিলেন তিনি – এবার বন্ধুরাই তাঁকে লুকাতে সাহায্য করলেন। যে মানুষ তাঁর মুখটি সারাক্ষণ মুখোশে ঢেকে রাখতে চেয়েছেন, মৃত্যুর পর তাঁকে তেমনটাই রাখা উচিত হবে বলে ভেবেছিলেন বন্ধুরা।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকেই কেমন ধোঁয়াশার মাঝে যাপন করতে চেয়েছেন অ্যান্ডি ওয়ারহল। তাঁর জীবনের কোনটি ঠিক সত্যি আর কোনটি মিথ্যা – তা যেন তিনি নিজেও জানতেন না।  মৃত্যুর পর নানা মানুষ নানাভাবে নানা সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। আর যে যখনই অ্যান্ডির জীবনকে বুঝতে চেয়েছেন – তিনি তখনই যেন নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন গোলকধাঁধায়। জীবনের প্রায় অধিকাংশ সময়েই সেলিব্রেটি আর স্টারদের মাঝে কাটালেও, ছবি-চলচ্চিত্র কিংবা নিজের ছাপানো পত্রিকার মাধ্যমে নানা তারকার জীবনকে নানাভাবে তুলে ধরলেও অ্যান্ডি নিজেকে রেখেছেন মুখোশের আড়ালে। জীবনের শুরুতে ছিলেন মুখচোরা, লাজুক; পরিণত কালে ওসব কিছুকেই অতিক্রম করে ছুটেছিলেন নাম, যশ আর অর্থের পেছনে – তবু নিজের ভেতরের ‘আমি’কে কখনো কারো কাছেই তুলে ধরেননি। হয়তোবা নিজের কাছেও না। অ্যান্ডির এই জীবনাচরণই যেন তাঁর শিল্পের মূলশক্তি। কোনো কিছুর সঙ্গেই অ্যান্ডি একাত্ম হননি কখনো, এমনকি নিজের সঙ্গেও না। নিজের ভেতর থেকে বাইরে বেরোতে পেরেছিলেন বলেই হয়তো ‘স্যুপের ক্যান’ আর     ‘মেরিলিন মনরো’কে একইভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন চিত্রতলে। সমাজে থেকেও ছিলেন সমাজের বাইরের জীব। ‘কোকাকোলা’ কিংবা ‘ক্যামবেল স্যুপ ক্যান’, ‘মনরো’ কিংবা ‘লিজ টেইলর’ – বস্তু কিংবা মানুষ – সবকিছুকেই দূর থেকে দেখেছেন। ক্যানভাসে যেন অজান্তেই তুলে ধরেছেন আমেরিকার আসল রূপ – ফ্রি আর্ট কিংবা ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম’ যা পারেনি – অ্যান্ডির স্যুপ ক্যান সেটাই পেরেছে। বিশ্বকে জানিয়েছেন -আসল আমেরিকা হলো এই কনজিউমারের আমেরিকা। ‘হলিউড’ আর ‘স্টারডম’ তার মোক্ষ – অর্থের রঙিন স্বপ্নকে বাস্তবায়নই তার লক্ষ্য। মজার ব্যাপার হলো, অ্যান্ডি এই কাজটি নির্লোভ-নির্মোহভাবে করেননি কখনই। ছবিতে যে-আমেরিকার রূপ তুলে ধরেছিলেন – সেই আমেরিকাকেই ধারণ করেছিলেন নিজের জীবনে – অর্থ আর নামের মোহ কোনোটি থেকেই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দূরে সরে থাকেননি তিনি। মুখোশের অন্তরালে এই রূপটি বেশ ভালোভাবেই লুকিয়ে রেখেছিলেন অ্যান্ডি। আর এই লুকোছাপাই হয়তো তাঁকে সাহায্য করেছে পশ্চিমের শিল্পকলার ‘দর্শন’কে এক হাতে চিরকালের মতো বদলে দিতে।
অ্যান্ডি ওয়ারহলের আসল নাম অ্যান্ডি ওয়ারহোলা (Andy Warhola))। হাইস্কুলে পড়ার সময় নামের শেষের ‘ধ’টি ছুড়ে ফেলেন তিনি – বড্ড বেশি ‘অ-আমেরিকান’ বলে। তাঁর জন্মের শহর, পেনসিলভানিয়া রাজ্যের পিটসবার্গ ছিল নানা ধরনের শ্রমিকের আবাসস্থল। উনিশ শতকের শেষ থেকেই পূর্ব  আর পশ্চিম ইউরোপের  অভিবাসী নিম্নবিত্তের পরিবারগুলো এ-শহরের পাহাড়গুলো দখল করতে শুরু করেছিল। অ্যান্ডির বাবা অন্দ্রে ওয়ারহোলা (Ondre Warhola)আর মা জুলিয়া ওয়ারহোলা (Julia Warhola)এসেছিলেন আজকের স্লোভাকিয়া থেকে। তাঁদের তিন ছেলের সর্বকনিষ্ঠ অ্যান্ডির জন্ম হয় ১৯২৮-এর ৬ আগস্ট। সময়টি আমেরিকায় অর্থনৈতিক ইতিহাসে খুব তাৎপর্যপূর্ণ – অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে (গ্রেট ডিপ্রেশনের) দেশটির দরিদ্র পরিবারগুলো হয়ে পড়েছিল আরো দরিদ্র। অন্দ্রে ওয়ারহোলা ছিলেন নির্মাণশ্রমিক আর জুলিয়া করতেন গৃহকর্মীর কাজ। দারিদ্র্য, অবহেলা, অশিক্ষা – ওয়ারহোলা পরিবারটি যেন এসবেরই পাকচক্রে বাঁধা ছিল। খুব ছোটবেলা থেকেই বড় দুই ভাই অর্থোপার্জনে নেমে পড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। মায়ের কারণেই অ্যান্ডিকে অন্য ভাইদের মতো বাইরের কাজ করতে হয়নি কখনো। বরং মায়ের কিনে দেওয়া ছবি আঁকার উপকরণ নিয়ে পড়ে থেকে, আর ‘কাল্পনিক’ অসুখে ভুগতে ভুগতেই শৈশব পার করেছিলেন অ্যান্ডি। বাবার মৃত্যুর পর পুরো পরিবার কাজে ব্যস্ত থাকলেও অ্যান্ডির যতœআত্তিতে কমতি হয়নি। তবু অ্যান্ডির কাছে তাঁর শৈশব কখনো সুখকর কিছু ছিল না। পরবর্তীকালে অনেক সময়েই তিনি সখেদে বলেছেন – ‘I came from nowhere.’ অ্যান্ডির শৈশবের অন্য আরো অনুষঙ্গ ছিল, মায়ের সঙ্গে প্রতি রবিবারের চার্চযাত্রা, ‘ক্যামবেল’ স্যুপ দিয়ে দুপুরকালের আহার শেষ করে রেডিও অনুষ্ঠান শোনা, কার্টুন-কমিকস কেনা, আর নানা সেলিব্রেটির অটোগ্রাফ করা ছবি জোগাড় করা। আর ছিল ছবি আঁকার নেশা। রঙিন কাগজে নানান ফুল আর রং করার বই নানা রঙে ভরাট করার শর্তে মায়ের কাছ থেকে চকোলেট পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল অ্যান্ডির ছবি আঁকার প্রণোদনা। শৈশবের এই চর্চাগুলোকেই  মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত বলবৎ রেখেছিলেন অ্যান্ডি – সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রমিত করে নিয়েছিলেন কেবল।
১৯৪৫ সালে কার্নেগি টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে (আজকের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়) স্কুল অফ ফাইন আর্টসে ভর্তি হন অ্যান্ডি। এখানে পেইন্টিং অ্যান্ড ডিজাইন বিভাগে তাঁর সহশিক্ষার্থী ছিলেন বালকম্ব গ্রিন (Balcomb Green), রবার্ট লিপার (Robert Leeper), স্যামুয়েল রোজেনবার্গ (Samuel Roxenberg) আর হাওয়ার্ড ওর্নার (Howard Worner))। তবে অ্যান্ডির শিল্পশিক্ষার ইতিহাস আরো প্রাচীন। মায়ের আগ্রহের  কারণে  নয়  বছর  বয়স  থেকেই  ছবি  তোলা  আর কার্নেগি মিউজিয়ামে ছবি আঁকার তালিম নেওয়া শুরু করেছিলেন তিনি (এই ক্লাসগুলো হতো প্রতি শনিবার এবং নিখরচায়)। বলে রাখা ভালো, অ্যান্ডিই ছিলেন তাঁর পরিবারের একমাত্র কলেজ পড়ুয়া।
কার্নেগি টেকের প্রথম বছরে অ্যান্ডি তেমন ভালো করতে পারেননি বলে গ্রীষ্মের ছুটিতেও ড্রইং ক্লাস করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। ফল হলো আশাতীত। গ্রীষ্মে ট্রাকে করে বড় ভাইদের ফল বিক্রি করার দৃশ্যকে কালি-কলমে তুলে ধরে অ্যান্ডি জিতে নিলেন মার্টিন অ্যান্ড লেইসার (martin & leisser) ) প্রাইজ। কার্নেগি টেকের গ্যালারিতে প্রদর্শিতও হলো ছবিখানি। নিজের ওপর এই প্রথম যেন আস্থা খুঁজে পেলেন অ্যান্ডি। ১৯৪৭-৪৮-এ শুরু করলেন তাঁর নিজস্ব ঘরানার ‘ব্লটেড লাইন-প্রিন্টিং’। ট্রেসিং কাগজে ড্রইং তুলে নিয়ে তার ওপর আবার পুরনো ঝরনা কলম দিয়ে এঁকে নিয়ে কালি চুষে নেয় এমন কাগজে ছাপ দিয়ে বেশ অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করতে পারতেন তিনি। ড্রইংয়ের এই বিশেষ টেকনিক অ্যান্ডি পরবর্তীকালে কমার্শিয়াল কাজে ব্যবহার করেছেন।
১৯৪৯-এ কার্নেগি টেকের পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ওয়ারহল পাড়ি দেন নিউইয়র্ক শহরে। যদিও নিউইয়র্কের প্রতি একটা তীব্র আকর্ষণ সবসময়ই অনুভব করতেন তিনি, তবে তা তিনি তাঁর মনের ভেতরেই লুকিয়ে রাখতেন। বাইরের ভাবটা ওয়ারহলের ভাষায় ছিল এমন :
‘এক গ্রীষ্মে ডিপার্টমেন্ট স্টোরে কাজ করার সময় মি. ভলমার নামের এক ব্যক্তির কারণে ভোগ (Vogues Magazine), হারপারস বাজার (Harpers Bazar)আর ইউরোপীয় ফ্যাশন ম্যাগাজিন উলটে-পালটে দেখতে হতো আমাকে। মি. ভলমার আমার ‘আইডল’ ছিলেন। কারণ তিনি যে নিউইয়র্কের – সেটি ভাবতেই আমার রোমাঞ্চ লাগত। তবে আমি যে খুব নিউইয়র্কে পাড়ি জমাতে চাচ্ছিলাম তা নয়।’১ অবশেষে সহশিক্ষার্থী ফিলিপ পার্লস্টেইনের (Philip Pearlstein)সঙ্গে নিউইয়র্ক এসে অ্যান্ডি ডেরা বাঁধলেন ৩২৩ ওয়েস্ট ২১ স্ট্রিটে। গ্ল্যামার (Glamour) ম্যাগাজিনের শিল্প-সম্পাদক টিনা ফ্রেডরিকসকে (Tina Fredricks) নিজের পোর্টফোলিও দেখিয়ে কাজ জোগাড় করে নিতে অ্যান্ডিকে তেমন বেগ পেতে হলো না। শুরু হলো কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসেবে অ্যান্ডি ওয়ারহলের জীবন।
দুই
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকা, শিল্পের ‘Pure’ আর ‘Applied ‘দুটি শাখাতেই ইউরোপ এবং বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের শিল্প-দর্শনের সঙ্গে এক আপাতযুদ্ধে রত ছিল। শিল্পের বাজারের ‘নিজস্বতা’ খুঁজে পেতে শিল্পের বোদ্ধা আর সমালোচকরা ‘নিউইয়র্ক আর্ট স্কুল’, ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম’ কিংবা ‘অ্যাকশন পেইন্টিং’কে এই প্রথম সুনজরে দেখতে শুরু করলেন। ১৯৪৫-এর আগ পর্যন্ত আমেরিকার শিল্পকলার কোনো আলাদা অবস্থান পশ্চিমা শিল্পের জগতে ছিল না বলেই ধরে নেওয়া যায়। বিশ শতকের শুরুর দিকের ম্যাক্স ওয়েবার (Max Waber), আর্থার ডোভ (Arthur Dove),চার্লস ডিমাথ (Charles Demuth),স্টুয়ার্ট ডেভিস (Stuart Davis)-এমনসব বিখ্যাত আমেরিকান শিল্পী মূলত ‘ইউরোপীয় মডার্নিজমে’ই ডুবে ছিলেন। আর আমেরিকার ‘আর্ট বাজারে’ও বিকোতো ইউরোপীয় রথী শিল্পী-ভাস্করদের কাজ – আমেরিকার নিজস্ব শিল্পীদের তেমন কদর মিলত না। হয়তোবা একমাত্র ব্যতিক্রমী শিল্পী ছিলেন নরম্যান রকওয়েল (Norman Rockwell) – আমেরিকার গ্রামীণ পরিবেশ আর সাধারণ মানুষের জীবনের প্রায় ‘ইলাস্ট্রেটিভ’ ছবি এঁকে শিল্পজগতে একটা জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। নরম্যান রকওয়েলের ছবিগুলো ছাড়া আমেরিকাকে আমেরিকার মতো করে দেখানোর জন্য হয়তো তেমন কোনো শিল্পকর্ম তখন ছিল না – অন্তত শিল্পকলার বাজারে।
বিশ আর তিরিশের দশকের আমেরিকার আর্ট-বাজারের এই অবস্থা যতটা না ঘটেছে শিল্পীদের ‘ক্রিয়েটিভিটি’র অভাবের কারণে, তার চেয়ে বেশি ঘটেছে শিল্পের ‘মার্কেটিং’য়ের অনুপস্থিতির ফলে। বেশিরভাগ শিল্পীরই কাজের বিক্রি তেমন হতো না। যে কয়জন রুজভেক্টের  Works Progress Administration (WPA)আওতায় কিছু সরকারি ফরমায়েশি কাজ খুঁজে পেয়েছিলেন, তাঁরা বাদে বাকি সবারই শিল্পীজীবন বেশ অনিশ্চিত ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়টি যেন সব পালটে দিলো। আমেরিকার অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শুধুমাত্র নিউইয়র্ক শহরই শ’খানেকেরও বেশি গ্যালারিতে ভরে গেল। আর গ্যালারিগুলোও প্রদর্শিত করতে শুরু করল আমেরিকার নিজস্ব শিল্পীদের শিল্পকর্ম। আমেরিকার মধ্যবিত্তের হাতে এখন টাকা। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ফরাসি ছবির আমদানিও কম। তাই ছবি কিনতে গেলে দেশি শিল্পীদের কাজই কেনা সহজ হয়ে পড়ল। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতারও প্রভাব পড়ল ‘আর্ট-বাজারে’। মোমা (MOMA : Museum of Modern Art), পেগি গুগেনহাইমের আর্ট অফ দিস সেঞ্চুরি গ্যালারি (Peggy Guggenheim’s Art of this Century Gallery) আর অন্যান্য করপোরেট ক্রেতা দেশি শিল্পীদের কাজ কেনা শুরু করে দিলেন।
বাজারের এই নতুন রূপের সঙ্গে যুক্ত হলো ‘নতুন আমেরিকা’র রূপ প্রকাশের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রয়াস। জার্মানি আর জাপানের পর এখন দেশটির শত্র“ সোভিয়েত ইউনিয়ন আর তার ‘কমিউনিস্ট’ দর্শন। কমিউনিজমের ভয়কে পুঁজি করে, বলা হলো, আমেরিকার আর্ট হবে ‘ফ্রি এক্সপ্রেশন’ (Free expression)-এর আর্ট  – ‘Free   country, free expression’ এর আর্ট ‘Free   country, free expression’ । সিনেটর ম্যাকার্থি (Joseph McCarthy) আর তাঁর সঙ্গীরা সবখানে খুঁজে ফিরলেন ‘কমিউনিজমের ভূত’। বলা হলো, ‘(ইউরোপীয়) মডার্ন আর্টস বা কমিউনিজমের বরপুত্র’, কিউবিজম, ফিচারিজম, সাদা, এক্সপ্রেশনিজম ‘অ্যাবস্ট্রাক্টশনিজম’ – এ সবকিছুই ক্রেমলিনের হাতিয়ার – আমেরিকার সত্তার বিরোধী২। আমেরিকার প্রপাগান্ডা বলে চলল, ‘(ওসব দেশে) যখন শিল্পীরা রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হয়ে পড়ে, শিল্পের উন্নতি তখন বাধাগ্রস্ত হয়, শিল্পীর নিজের বলতে আর কিছুই বাকি থাকে না’৪। সোভিয়েত ‘রিয়েলিজম’ নরম্যান রকওয়েলের ‘আমেরিকান সাধারণ কিন্তু গর্বিত মানুষের ছবির’ থেকে কতটুকু ভিন্ন ছিল সে-প্রশ্নের উত্তর এখানে খুঁজব না আমরা – তবে সে-সময়ের আমেরিকার অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থান এর থেকে বেশ বোঝা যায়।
রাষ্ট্রের এজেন্ডা যাই হোক না কেন, এ-অবস্থার সুফল কিন্তু পেলেন শিল্পীরা। সরকারিভাবেই এখন আমেরিকায় শিল্পকলাকে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৎপরতা শুরু হলো – কখনো ‘ঢোল পিটিয়ে’, কখনো ‘গোপনে’। বলা হলো, ‘আমেরিকান আর্ট’ ‘নন-পলিটিক্যাল’ আর্ট – রাজনীতিতে বাধা নয়। শিল্পী তাঁর স্বাধীনতার পুরোটা ব্যবহার করেই তাঁর শিল্প তৈরি করেন। সরকার এই শিল্পকে এবং তার দর্শনকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়ে ‘কমিউনিজম’কে জয় করে নিতে চাইছিলেন। আর শিল্পীরা চাইছিলেন প্রতিষ্ঠা – বিশ্বব্যাপী সুনাম। সরকার হয়তো লড়ছিলেন সোভিয়েত ব্লকে, শিল্পীরা প্রমাণ করতে চাইছিলেন, পশ্চিম ইউরোপের চাইতে এখন তাঁরাই বেশি মডার্ন। জ্যাকসন পোলকের (Jackson Pollock)অ্যাকশন আর্টের রোমান্টিসিজম, বারনেট নিউম্যানের (Barnett Newman)আত্মকেন্দ্রিক শিল্প, উইলিয়াম ডি কুনিংয়ের তির্যক সমাজদর্শন, রথকোর সম্পূর্ণ নির্বস্তুক চিত্রকলা – এ সবকিছুই যেন এখন আমেরিকার শিল্পের আরাধ্য আর বিশ্বকেও বোঝানো হলো – এই হলো আসল ‘মডার্ন আর্ট’।২
এমনই এক শিল্পকলার বাজারে ‘কমার্শিয়াল আর্টিস্ট’ হিসেবে আবির্ভূত হলেন অ্যান্ডি ওয়ারহল। প্রতিভার দাম পেতে তাঁকে বেশি দিন অপেক্ষাও করতে হলো না। পঞ্চাশের দশকের শুরুতেই নিউইয়র্কের গুটিকয়েক নামকরা কমার্শিয়াল শিল্পীর মধ্যে অ্যান্ডি হলেন একজন। গ্ল্যামার হার্পারস বাজার (Harpers bazar), ভোগ (Vogue), ম্যাককলস (গপঈধষষং), ভ্যানিটি ফেয়ার  (Vanity Fair) – এমন সব নামি ম্যাগাজিন আর ইয়ং অ্যান্ড রুবিকান  (Young &     Rubican)-এর মতো অ্যাড এজেন্সি – সবারই জন্য কাজ করছেন অ্যান্ডি ওয়ারহল। ওয়ারহলের ড্রয়িংয়ের ধরন, মিনিমাইজেশনের প্রয়াস, ক্যালিগ্রাফির নতুনত্ব – এ সবকিছুই অন্য সবার থেকেই ছিল ভিন্ন। তখনকার অন্য শিল্পীদের মতো ছবিকে ফটোগ্রাফিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা ওয়ারহল করেননি কখনো। তাঁর লাইন ড্রইংয়ের কাজ দেখেই চিনে নেওয়া যেত তাঁকে। আর্ট ডিরেক্টরস ক্লাব তাঁকে চারবার পুরস্কৃত করে, যার তিনটিই ছিল আইয়ের (ও) জন্য করা মেয়েদের জুতার ড্রইংয়ের কারণে। তাঁর করা বেতার অনুষ্ঠানের ‘দ্য নেশনস নাইটমেয়ার’ (The Nations Nightmare)-এর বিজ্ঞাপন নিউইয়র্ক টাইমসের ১৯৫১-র সেপ্টেম্বর সংখ্যায় বের হয়। পরবর্তীকালে এটি বেতার অনুষ্ঠানটির অ্যালবামের মোড়ক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। ১৯৫৩ সালে এই কাজের জন্যে তিনি প্রথম আর্ট ডিরেক্টরস ক্লাব গোল্ড মেডেলও লাভ করেন। সে-সময়ে টিফানি অ্যান্ড কোংয়ের (Tifany & Co.) জন্য করা ক্রিসমাস কার্ড, ‘স্টাডিজ অফ দ্য বয় বুক (Studies of the Boy Book) বইয়ের ইলাস্ট্রেশন, গোল্ডেন স্লিপার শোতে (Golden Slipper Show) দেখান নানান ধরনের জুতোর ডিজাইন – ওয়ারহলের করা সে-সময়কার বিখ্যাত কিছু কমার্শিয়াল কাজের উদাহরণ। সে-সময়ের কথা বলতে গিয়ে অ্যান্ডি বলেন, ‘তারা যদি আমাকে জুতো আঁকতে বলত, আমি আঁকতাম। যদি ড্রইংগুলোকে ঠিকঠাক করতে বলত আমি করতাম – আমাকে তারা যা বলত আমি করতাম… আর এত সব ঠিকঠাকের পর ওই কমার্শিয়াল কাজগুলো যেন বোধসম্পন্ন হতো… কমার্শিয়াল কাজ করার প্রক্রিয়া মেশিনের মতো ছিল বটে, তবে তার স্বভাবে বোধের কমতি ছিল না।’১পঞ্চাশের দশকে প্রধানত কমার্শিয়াল আর্টে জড়িয়ে গেলেও ওয়ারহল ফাইন আর্টের কাজও করেছেন কিছু। তবে ফাইন আর্টের ড্রইংয়েও কমার্শিয়াল আর্টের প্রক্রিয়া আর ধরনের বেশ প্রভাব ছিল। কিছু কাজ  আবার অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিস্টদের মতোও। তাঁর প্রথম দিককার কিছু কোলাজেরও হদিস পাওয়া গেছে। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে তিনি প্রকাশ করেছেন ‘A is an Alphabet’, ’25 Cats Named Sam and One Blue Pussy’, ‘A la recherche du shoe Perdu’. ‘In the Bottom of the Garden’, ‘Wild Raspbenies’ এবং আরো কিছু ইলাস্ট্রেটেড বই – নিউইয়র্কের বডলি গ্যালারিতে (Badly Gallery) এগুলোর প্রদর্শনীও হয়েছিল। অ্যান্ডি ওয়ারহলের সে-সময়ের ছবির সঙ্গে পরবর্তীকালের ছবির বিষয়গত, উপকরণগত এবং দর্শনগত পার্থক্য থাকলেও এ-ছবিতে তাঁর পরবর্তীকালের কাজের ইঙ্গিত স্পষ্ট। তাঁর মৃত্যুর পর খুঁজে পাওয়া পঞ্চাশের দশকে করা ঝরনা কলমে আঁকা ন্যুড, বলপয়েন্টে করা পুরুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গ, পায়ের পাতা, ছুরি, হাতমোজা, লিপস্টিক, প্রজাপতি, ডলার, জুতো Ñ এসবের ড্রইংয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ ও প্রকরণের পরিবর্তন, নতুন কিছু করতে পারার জন্যে তাঁর আকুলতার ইঙ্গিতবাহী। ১৯৫৬ সালে অ্যান্ডি তাঁর কোলাজ-ড্রইংয়ের একক প্রদর্শনী  করেন। বিষয় ছিল সোনা বা রুপার ফয়েলে মোড়ানো জুতা আর এদের প্রতিটিরই নাম ছিল নানান বিখ্যাত ব্যক্তির নামে (Mae West, Julie Andrews, Kate Smith, Truman Capote, James Dean) । পরবর্তীকালে এই ছবিগুলো ছাপা হয়েছিল লাইফ ম্যাগাজিনের ১৯৫৭-র জানুয়ারি সংখ্যায়। তবে তখন পর্যন্ত এ কাজগুলোকে ‘ফাইন আর্ট’ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়নি। লাইফ ম্যাগাজিনের আর্ট নিউজ – এসব  কাজের ছোট্ট রিভিউ লেখা হয়েছিল বটে তবে তা ‘ফাইন আর্ট’ বিষয়ক শাখায় নয় বরং ‘ভিস্যুয়াল অডিটিস’ (Visual oddities)শাখায় ছাপা হয়েছিল২।
পঞ্চাশের দশকেরই কোনো একসময়, অ্যান্ডি ওয়ারহল তাঁর কমার্শিয়াল আর্টের গণ্ডি থেকে বের হয়ে ফাইন আর্টের মাঝেও বিচরণ করার পণ করলেন। যেরকম ছবি আঁকতে শুরু করলেন তাতে তাঁর কমার্শিয়াল আর্ট আর ফাইন আর্টের মধ্যে যে খুব সহজে দাগ টানা সম্ভব তা নয়। পার্থক্য হয়তোবা এই যে, ফাইন আর্টের কাজগুলো কোনো ম্যাগাজিন বা অ্যাড এজেন্সির ফরমায়েশে করা হয়নি। নতুবা সাদা চোখে মনে হতেই পারে অ্যান্ডি ওয়ারহল পত্রিকার বিজ্ঞাপনকেই গ্যালারির দেয়ালে ঝুলিয়েছেন।
অ্যান্ডি যথার্থই বুঝেছিলেন, অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমের দিন ঘনিয়ে এসেছে। আমেরিকার এলিট শ্রেণিতে তার কদর হলেও, সাধারণ জনগণ এটাকে খুব ভালোবেসে নিয়েছে তা নয়। সে-সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, আমেরিকার দরকার ছিল নতুন নরম্যান রকওয়েলের, যাঁর দৃষ্টি হবে আধুনিক, যিনি শুনতে পাবেন আমেরিকার নাড়ির স্পন্দন। চিত্রকলাকে বাজাতে হবে আমেরিকান সমাজের সুর। অ্যান্ডি এও জানতেন, আমেরিকার আমজনতার চোখ এখন হলিউডকে দেখে, সাধারণ আমেরিকানের তৃষ্ণা কোকাকোলা ছাড়া মেটে না, দোকানে গিয়ে কেনাকাটায় মত্ত হতে না পারলে আমেরিকানের ঘুম হয় না। কনজিউমারিজম আর অর্থের মোহ – ধনবাদী সমাজের এই দুই উপকরণকে যদি ছবিতে তুলে ধরতে হয় তবে তা কিছু জীবনের ফিগারেটিভ ড্রইং বা শিল্পীর মনের অস্থিরতাকে রঙে-রেখায় তুলে ধরলেই শুধু চলবে না। তাতে হয়তো ভুল গল্পই বলা হবে। কনজিউমারিজম আর অর্থের মোহ ১৯৫০-এর আমেরিকানের চোখে খারাপ কিছু ছিল না – ‘আমেরিকান ড্রিমের’ জন্য কষ্ট করতে হবে আর গরিব থেকেই হতে হবে বড়লোক – এই ছিল সবার বিশ্বাস। ধনবাদী সমাজ কনজিউমারিজমকেই ভালোবাসে, বিশ্বাস করে গরিব না থাকলে বড়লোক হওয়া যায় না। আমেরিকার এই রূপকে শিল্প-চিত্রকলায় তুলে ধরতে হলে তাই বের করতে হবে নতুন শৈল্পিক পথ। নিজেও আপাদমস্তক অর্থ, যশ-নামের পূজারি অ্যান্ডি ঠিক করলেন, তাঁর নিজের জীবনের থেকেই তুলে আনবেন শিল্পের উপকরণ। আর শিল্পপদ্ধতি হিসেবে বেছে নিলেন তখনো তেমন প্রতিষ্ঠা না পাওয়া ‘পপ আর্ট’। অ্যান্ডি জানতেন, তখনকার আমেরিকার বাস্তবতায় শ’খানেক ইলাস্ট্রেশন আর ড্রইংয়ের এক্সিবিশন করেও ‘ফাইন আর্টের’ শিল্পীর মর্যাদা পাওয়া যাবে না। তিনি বুঝেছিলেন, এই নাম তিনি করতে পারবেন, জ্যাসপার জোনস (Jasper Johns), রবার্ট রোজেনবাগ (Robert Rauschenberg) কিংবা ল্যারি রিভার্সের (Larry Rivers)হাঁটা নতুন পথে। অ্যান্ডি এও বুঝেছিলেন, তাঁর কমার্শিয়াল আর্টের দক্ষতা পপ আর্টে তাঁর প্রতিষ্ঠার পথকে আরো মসৃণ করে দেবে।
১৯৬০-এ কমিকসের নানান চরিত্রকে ক্যানভাসে এঁকে অ্যান্ডি তাঁর ফাইন আর্ট পপ শিল্পের যাত্রা শুরু করলেন। ১৯৬১-তে বনউইট টেলার (Bonwit Teller)ডিপার্টমেন্ট স্টোরের দেয়ালে প্রথম ঝোলানো হলো অ্যান্ডি ওয়ারহলের ‘পেইন্টিং’। ‘অ্যাডভার টিসমেন্ট’, ‘লিটল কিং’, ‘সুপারম্যান’, ‘বিফোর অ্যান্ড আফটার’, ‘স্যাটারডেস পপাই’। ফটোগ্রাফের ইমেজ প্রজেক্টরের সাহায্যে বড় করে ক্যানভাসে ফেলে খসখস এঁকে ফেলতেন কমিক কিংবা বিজ্ঞাপনের ডিজাইন। তারপর রং চড়িয়ে টাঙিয়ে দেওয়া, ব্যস। শুরু হলো অ্যান্ডির পপ আর্টের পথে যাত্রা।
ছবিও যেমন পাল্টাল, তেমনি ওয়ারহল নিজেকেও পাল্টালেন। পঞ্চাশের দশকজুড়ে প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁদের পেছনে আঠার মতো লেগে ছিলেন, এখন সরে এলেন তাঁদের থেকে। পঞ্চাশের অনেক ছবিতেই স্পষ্ট ছিল তাঁর সমকামিতার ছায়া – সেসব এখন উঠে গেল। ফাইন আর্টিস্ট ওয়ারহল এখন অনেক বেশি ইমেজ-সচেতন। ‘লাজুক’, ‘মুখচোরা’ বলে তাঁর যে-‘পরিচয়’ ছিল ওয়ারহল তাকে ভিন্নভাবে পরিচিত করালেন। শব্দগুলোর পরিবর্তিত অর্থ এখন ‘নিভৃতজীবী’, ‘মিতভাষী’। তাঁকে পেতে তাঁর কাছে ছুটে আসতে হবে। কমার্শিয়াল আর্টের জগৎ থেকে ফাইন আর্টের নতুন ভুবন গড়তে ওয়ারহল শুধু আর্ট নয়, ‘আর্টিস্ট’কেও নতুন করে তৈরি করে নিলেন।
বাড়িতে কাজ করতেন না অ্যান্ডি। স্টুডিও ভাড়া করে নিয়েছিলেন তিনি তাঁর কাজের জন্য। কিন্তু বাড়ি অথবা স্টুডিও কিংবা সামাজিক পরিবেশ – সব জায়গাতেই অ্যান্ডি যেন একজন তৃতীয় ব্যক্তির চরিত্রে আবির্ভূত হলেন। খুব কম সময়েই কারো সঙ্গে কথা বলতেন তিনি, যেন অন্যরা টেলিপ্যাথির জোরে বুঝে নিত তিনি কী চান। অ্যান্ডি ওয়ারহল তাঁর শিল্পের সঙ্গেও একাত্ম হতে চাইতেন না। যা আঁকছেন, যেখানে আঁকছেন আর যিনি আঁকছেন – তাঁদের কেউ যেন কারো চেনাপরিচিত নন। একে অপর থেকে যোজন দূরে – কেবল ‘শিল্প’ নামক সম্পূর্ণ নিরাকার প্রায় দুর্বোধ্য সম্পর্কে তাঁরা সংযুক্ত।
তিন
অ্যান্ডির পপ আর্ট চোখকে নতুন করে দেখতে শেখায়। তাঁর ভাষায়, ‘পপের খপ্পরে একবার পড়লে, কোনো কিছুকেই আর আগের মতো দেখা যায় না। পপ-ভাবনা আমেরিকাকে নতুনভাবে দেখায়।… আমরা ভবিষ্যৎকে দেখছি – এ-ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত। অনেকেই ‘পপে’র অনেক কাছাকাছি হেঁটে বেড়িয়েছেন, কিন্তু এর অর্থোপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ তাঁরা অতীতের ভাবনা থেকে বেরোতে পারেননি, অতীতের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারেননি।’১  অ্যান্ডি বিশ্বাস করতেন, তিনিই ‘পপ আর্ট’কে ঠিক বুঝে নিয়েছিলেন – অন্য কথায় তিনিই ছিলেন আসল ‘পপ আর্টিস্ট’। এ-ভাবনা অযৌক্তিক ছিল না মোটেই। আমেরিকার শিল্পকলার ইতিহাসে অ্যান্ডি ওয়ারহলই হয়তো একমাত্র শিল্পী, যাঁর দেখানো পথে অগণিত শিল্পী হেঁটেছেন, এখনো হাঁটছেন। তাঁকে অনেকেই বলতেন ‘পোপ অফ পপ’।
১৯৬২-তে অ্যান্ডি ‘বাবার স্ট্যাম্প’ দিয়ে করলেন ‘ডু ইট ইওরসেলফ’ পেইন্টিং। এলিজাবেথ টেইলারের ট্যাবলয়েডে প্রকাশিত ফটোগ্রাফ ব্যবহার করে করলেন তাঁর পোর্ট্রেট সিরিজ। নিউইয়র্ক মিরর পত্রিকায় প্রকাশিত গাড়ি দুর্ঘটনার ছবি ব্যবহার করে শুরু করলেন ‘ডেথ অ্যান্ড ডিজাস্টার’ সিরিজ। এ সিরিজের লক্ষ্য ছিল ভাগ্য বিপর্যয়ের প্রতি মানুষের ভয়কে তুলে ধরা। অ্যান্ডি অজান্তেই তাঁর নিজের ভয়টাকেও এখানে প্রকাশ করলেন যেন। খাপছাড়াভাবে ছবিগুলোকে দেখলে মনে হতেও পারে ছবিগুলোর সঙ্গে অ্যান্ডি কোনো সম্পর্কের সূত্রে আবদ্ধ নন – ভাবা যেতে পারে এসব হয়তো খামখেয়ালিপনা। তবে একসঙ্গে পুরো সিরিজে চোখ বুলিয়ে নিলে সহজেই বোঝা যায় সত্য লুকিয়ে আছে আরো গহিনে।
এর কিছুদিন পরই শুরু হলো সিল্ক স্ক্রিনকে কাজে লাগিয়ে ছবির ‘প্রডাকশন’। নিজ হাতে আঁকা ‘ডলার’ নোটের অগণিত কপি করলেন ‘ফটো সিল্ক স্ক্রিন’ পদ্ধতিতে। এই সিল্ক স্ক্রিনই পরবর্তীকালে অ্যান্ডি ওয়ারহলের শিল্পচর্চার প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়।
চারপাশের সবকিছুই – তা সে মানুষ কিংবা বস্তু, অসাধারণ খবর কিংবা সাধারণ ঘটনা – তুলে ধরতে শুরু করলেন তাঁর ক্যানভাসে। তাঁর কাছে ফাইন আর্ট আর পেইন্টিং শুধু ব্রাশ আর ক্যানভাস নয়, এমনকি শিল্পীর হাতের ছোঁয়াও নয় বরং তিনি তা যতটুকু সম্ভব লুকিয়ে রাখতে চান। তাঁর কাছে পেইন্টিং হলো শিল্পীর ভাবনা – তার চারপাশকে, সমাজের দর্শনকে চিত্রতলে তুলে ধরা। অ্যান্ডির আধুনিক শিল্পী তাঁর চারদিককে দেখাবে শুধু – তাঁর মনকে চারদিকের সঙ্গে মিশিয়ে নতুন গল্প শোনাবে না। দর্শক তাঁর মতো দেখে-বুঝে নেবেন।
১৯৬২-র ৫ আগস্ট হঠাৎ করেই মৃত্যুবরণ করলেন মেরিলিন মনরো। অ্যান্ডি খুঁজে পেলেন তাঁর নতুন ছবির গল্প। শুরু হলো মেরিলিন মনরো সিরিজ। সব ছবিতেই মনরো তাকিয়ে আছেন – যেমন তাকাতেন ট্যাবলয়েড বা ম্যাগাজিনে। শুধু অ্যান্ডির সিল্ক স্ক্রিনে মেরিলিন যেন মাত্র কয়েকটি রঙে ফুটে ওঠা ‘আমেরিকান পণ্য’ – অন্য দশটি পণ্যের থেকে বা অন্য দশটি মানুষের সিল্ক স্ক্রিন পেইন্টিংয়ের থেকে ভিন্ন কিছু নয় মোটেই। অ্যান্ডির পপ আর্টের দর্শনই হলো তাই বস্তু-মানুষ-খবর-টাকা – যা কিছুকে আমরা আলাদাভাবে দেখতে শিখি – তাদের সবাই আসলে একই – মাত্র কয়েকটা রঙের সুতায় গাঁথা। এটি প্রমাণ করতেই হয়তো  অ্যান্ডি  এরপর  চিত্রতলে  তুলে  ধরলেন  এলভিস প্রিসলি আর ক্যামবেল স্যুপ ক্যান। ১৯৬২-র ৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্টে ফেরাস গ্যালারিতে (Ferus Gallery) প্রদর্শিত হয় অ্যান্ডি ওয়ারহলের ‘ক্যামবেল’স স্যুপ ক্যান। ৩২টি ২০ ইঞ্চি x ১৬ ইঞ্চি মাপের ক্যানভাস ভরা নানা স্বাদের ক্যামবেল কোম্পানির স্যুপের ক্যান – এই হলো ছবির প্রদর্শনীর বিষয়। প্রতিটি ছবির সঙ্গে লেবেল আঁটা ‘ক্রিম অফ অ্যাসপারাগাস’, ‘অনিয়ন’ ‘রাইস’, ‘ভেজিটেবল’ ইত্যাদি। নভেম্বর মাসে করা অন্য এক প্রদর্শনীতে ঝোলানো হয় ‘বেইসবল’, ‘ডু ইট ইওরসেলফ’ কোকাকোলা, ড্যান্স ডায়াগ্রাম, এলভিস, মেরিলিন, ডিজাস্টার। এবারই প্রথম অ্যান্ডির ছবি প্রদর্শিত হলো অন্যান্য ‘ফাইন আর্টে’র শিল্পীদের সঙ্গে। প্যাসিডোনা আর্ট মিউজিয়ামে ‘নিউ পেইন্টিং অফ কমন অবজেক্টস’ আর নিউইয়র্ক সিডনি জেনিথ গ্যালারিতে ‘দ্য নিউ রিয়ালিস্ট’ প্রদর্শনীতে অ্যান্ডির কাজ স্থান পেল। টাইম ম্যাগাজিনে পপ আর্ট-বিষয়ক একটি লেখায় উঠল ‘অ্যান্ডি ওয়ারহলের চিত্রকলা’।
পপ আর্টের শুরুর দিকের কাজগুলোতে অ্যান্ডির হাতের ছোঁয়ার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে অ্যান্ডি যতই নতুন বিষয়কে তাঁর ছবিতে যুক্ত করতে লাগলেন, ততই যেন ‘শিল্পী রূপ’ উপস্থিতি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ল। একদম প্রথম দিককার বিজ্ঞাপনভিত্তিক পেইন্টিং ১৯৬০-এর ‘স্টর্ম ডোরে’ সাদা-কালোয় আঁকা কাচের দরজা ফ্রেম ঘেঁষে যেন কালো পলিমার পেইন্ট চুঁয়ে পড়ছে। ক্যানভাসের ওপর কালো আর ছাইয়ের প্রায় ইতস্তত ছোপ। দরজার পাশেই দামটা লেখা। কেউ ভাববেন স্টর্ম ডোরের বিজ্ঞাপন Ñ কাঁচা হাতে করা। কেউ ভাববেন এ-কারণেই এটি ‘নন-কমার্শিয়াল’ – আর তাই ‘ফাইন আর্ট’। অনেক শিল্পবোদ্ধাই এই ছবিগুলোতে ‘জ্যামিতির ছোঁয়া’ দেখেছেন। অনেকেই দেখেছেন হাতের কাজের সুস্পষ্ট ছাপ। অ্যান্ডি ঠিক করলেন ছবিতে তাঁর হাতের ছোঁয়ার কোনো ইঙ্গিতই রাখবেন না আর। স্টর্ম ডোরেরই পরবর্তী কাজগুলোতে দরজার ফটোগ্রাফ ক্যানভাসে লেপ্টে দেওয়া হলো – শিল্পীর হাতের পরশ লাপাত্তা। কমিক স্ট্রিপের পেইন্টিংগুলো যেন আরো সচেতনভাবে করলেন। যেন সুপারম্যানের ফটোগ্রাফটাকে ক্যানভাসে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে – কেবল ডায়ালগের অংশগুলো মাঝে মাঝে সাদা ওয়ালে ঢাকা।
ষাটের মাঝামাঝি সময়ে অ্যান্ডি তাঁর ছবি থেকে ‘শিল্পীসুলভ’ সব ইঙ্গিতকে বিদায় জানালেন। অ্যান্ডির জীবনীকার ভিক্টর বকরিসের ‘লাইফ অ্যান্ড ডেথ অফ অ্যান্ডি ওয়ারহলে’ এমিল দ্য অ্যান্টোনিওর বক্তব্য
এ-ক্ষেত্রে স্মরণযোগ্য। অ্যান্ডির ‘কোকাকোলা’ সিরিজের দুটো কাজ তিনি দেখেছিলেন। প্রায় ছয় ফুট লম্বা দুটি কোকাকোলার বোতল – একটিতে যেন ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিস্ট’ ধাঁচ আর অন্যটি ছিল সাদা-কালোয় আঁকা সাধারণ বোতল। আমি বললাম, ‘এই অ্যান্ডি, ওই অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজটা তো যাচ্ছেতাই, অন্যটা অসাধারণ। এটাই তো আমাদের সমাজ, এটাই তো আমরা, এই কাজটা অসাধারণ, তোমার উচিত হবে প্রথম কাজটা  পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা আর অন্যটা রাখা’।৫ বন্ধুদের পরামর্শে হোক বা নিজের অভিজ্ঞতায়ই, অ্যান্ডির পরবর্তীকালের কাজগুলোতে আর তথাকথিত শিল্পীর হাতের ছোঁয়া রইল না।২
চার
কিন্তু অ্যান্ডি ওয়ারহলের পপ আর্ট আসলে কী, একি আদতেই শিল্প, নাকি একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্টের প্রতারণা? ছবিতে যদি শিল্পী তুলি না ছোঁয়ালেন তো তাকে কী করে চিত্রকলা বলি? এগুলো কি বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ডের ক্যানভাস সংস্করণ? ওয়ারহলের কাজ দেখতে বসে এমন সব প্রশ্ন মাথায় ভিড় করবেই। আর এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, অ্যান্ডি ওয়ারহল আমেরিকার শিল্পকলার ইতিহাসে কেন অমর হয়ে থাকবেন।
চল্লিশ আর পঞ্চাশের ‘কনফিউশনে’র যুগে আমেরিকার সমাজ খুঁজছিল নিজস্ব শিল্পভাষা। অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম হয়তো শিল্পের এলিটদের নতুন কোনো ভাষায় কথা বলতে শিখিয়েছিল। কিন্তু তার পরশ সাধারণ্যে পৌঁছেনি। তাই পপ আর্টিস্টরা চেয়েছিলেন সাধারণের ভাষায় কথা বলতে। জ্যাসপার জোনস আর রবার্ট রোজেনবার্গ বোধহয় প্রথম আমেরিকান শিল্পী, যাঁরা অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজমকে দূরে সরিয়ে পপ আর্টের জগৎকে উন্মুক্ত করেছিলেন। সমালোচকেরা কেউ খুব ভালোভাবে নেননি এই নতুন শিল্পান্দোলনকে। ‘তাৎক্ষণিকতা’ আর রইল না। শিল্পীর মনের ভাব আর জানা গেল না। শিল্পী আর শিল্পের সংযোগ ছিন্ন হলো। আর তেমনই যদি হয় তবে শিল্প আর কোথায়? – সমালোচকেরা নাখোশ। তবু নতুন শিল্পীরা দমবেন না। জ্যাসপার জোনস তাঁর ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ‘ক্রিটিক সিসে’ চশমার পেছনে ক্রিটিকের মুখ বসিয়ে হয়তো তাদের সকল প্রশ্নের জবাবই দিয়ে দিয়েছিলেন।
জোনস আর রোজেনবার্গ হয়তো পপ আর্টের যাত্রা শুরুর পথটাকে মসৃণ করে দিয়েছিলেন। মানচিত্র, পতাকা, দেহের অংশবিশেষের ভাস্কর্য। সিল্ক স্ক্রিনের সাহায্যে খবরের কাগজের অংশবিশেষ রাঙিয়ে দেখান – মোট কথায় বস্তুর বিন্যাস দিয়ে বস্তুর ভাষায় নিজেকে আর সমাজকে দেখানোর চেষ্টা – যা মোটেই আর বিমূর্ত নয় – তা দেখানোই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। তবে তাঁদের কেউই নিজস্ব শিল্প ছোঁয়া থেকে ছবিকে বঞ্চিত করতে চাননি। অ্যান্ডি ওয়ারহল বুঝেছিলেন, আমেরিকার সমাজ আরো ‘হালকা’ কিছু চায় – হয়তো শিল্পীর হাতের ছোঁয়া নয় – বরং শিল্পীর ভাবনার তোড়েই ভাসাতে হবে আমেরিকান শিল্পকলাকে।
অ্যাবস্ট্রাক্ট   এক্সপ্রেশনিস্টরা   যা   ভাবেননি,   পপ  আর্টিস্টরা  তাই ভাবলেন। নিন্দুকেরা বলল, এ শিল্পের কোনো অর্থ নেই। পপ আর্টিস্টরা বললেন, সমাজের চারপাশটাতে একক চোখ বোলাতে। শিল্পী কি কখনো সমাজের বাইরে থাকতে পারেন? চারপাশে যে অর্থের ওড়াউড়ি চলছে, দেশে দেশে যে-হানাহানি, নিজের দেশ বাঁচানোর নামে অন্য দেশে যে-‘স্পাই’ পাঠানো হচ্ছে, এ সবকিছুকে যদি শিল্পী ছবিতে না তুলে ধরেন – তবে শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতার কী হবে? পপ আর্টিস্টরা বললেন, সাধারণ উপকরণকে সাধারণভাবে দেখিয়েই জনগণের চোখ খুলতে হবে। সাধারণ চোখ অনেক কিছু না দেখেই চলে যায়। শিল্পী যখন দেখান তখনই সে ভাবতে শেখে। ক্যালেস ওডেনবার্গ (Cales Oldenberg) দেখালেন টাইপরাইটার, জেমস রসেনকুইস্ট (James Rosenquist) তুলে আনলেন হেয়ার ড্রায়ার আর জেট ফাইটার। ওয়ারহল প্রথম আঁকলেন টেলিফোন, কোকাকোলার বোতল আর সমাজের চোখ খুলে দিলেন ক্যামবেলের স্যুপ ক্যান এঁকে। তাঁরা বললেন, এসবকে বুঝলেই আমেরিকা তথা পশ্চিমা সমাজকে বোঝা যাবে।
পপ আর্টিস্টরা যা এঁকেছেন – বিশেষত অ্যান্ডি সেসব কিছুকে ক্যানভাসে তুলে ধরেছিলেন – তার সবই আমেরিকার সাধারণ জীবনের নিত্যদিনের অনুষঙ্গ। তবে এই প্রতিটি সাধারণ বস্তুই যেন আমেরিকার সে-সময়ের গল্প বলে – সমাজজীবনকে তুলে ধরে। ধনবাদী সমাজের নব আবিষ্কার যেমন তাতে উঠে আসে, তেমনি স্যুপ ক্যান তুলে সাধারণ আমেরিকানের জীবন প্রতিনিয়ত সংগ্রামের গল্প। হাতে সময় কই লাঞ্চের?  প্রতিটি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারই তখন ক্যামবেলের অধিকারে। তেমনি ‘কোকাকোলা’ যেন আমেরিকার একতাকে প্রকাশ করে – ধনী আর গরিব সবাই তো কোকাকোলাই পান করে – সবাই তো ‘আমেরিকান ড্রিমের’ পেছনেই ছোটে।
কোকাকোলা বা ক্যামবেল স্যুপ যেমন আমেরিকার জীবনের প্রতিফলন, তেমনি মেরিলিন, এলভিস কিংবা লিজ টেইলর আমেরিকার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। ভিক্টর বকরিসের মতে, ওয়ারহলের প্রতিটি ছবি আসলে ‘পোর্ট্রেট’, ওয়ারহলের কাছে মনরো যতটুকু মর্যাদা পেয়েছেন, ঠিক ততটুকুই পেয়েছে ক্যামবেলের ক্যান। স্যুপ ক্যানগুলো যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার মুখচ্ছবি – ‘ক্যাপিটালিজম’ আর ‘কনজিউমারিজমে’র ওপর কিছু প্রাইমারি রঙের প্রলেপ। অ্যান্ডির ভাষায় – ‘এটাই আমরা খাই, এটা আমারই।’১ আর লেখক গ্যারি ইন্ডিয়ানার ভাষায়, ‘স্যুপ ক্যান আমেরিকাকে সাধারণের হাত থেকে বাঁচাতে চায়নি, বরং সাধারণত্বকেই মূল্যবান করেছে।’২ চিত্রকলা তো বধির। তার ভাষা বুঝতে হলে তার সঙ্গেই মিশে যেতে হবে। পপ আর্ট যেন সেই বধির ভাষার সাধারণ রূপ। তার সঙ্গে একাত্ম হওয়া তেমন কঠিন নয়।
পাঁচ
১৯৬৩-তে অ্যান্ডি ওয়ারহল কিনলেন ১৬ মিমির মুভি ক্যামেরা। অ্যান্ডি যেন আবার পরিবর্তিত হলেন। আঁকার থেকে মুভি তৈরিতেই তাঁর বেশি আগ্রহ এখন। তৈরি করলেন স্লিপ (ঘুম), নরমাল লাভ। এতদিনে অ্যান্ডির কাজ সারা আমেরিকায় পরিচিতি পেয়েছে। নিউইয়র্কের গুগেনহাইম মিউজিয়ামে অন্যদের সঙ্গে তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে। পঞ্চাশের কমার্শিয়াল আর্টিস্ট ষাটে এসে পুরোদস্তুর ফাইন আর্ট শিল্পী। আর এখন আবার ‘মুভি’র ডিরেক্টর পরিচালকও। ১৯৬৩-তে অ্যান্ডির এক পুরনো বাড়িতে তাঁর নতুন স্টুডিও করলেন। নাম হলো তার ‘ফ্যাক্টরি’। অ্যান্ডির ফাইন আর্ট এখন যথার্থই ‘শিল্প’ – ‘ফ্যাক্টরি’তে, নানান সহকারীর সাহায্যে যার ‘মাস প্রডাকশন’ হয়। তাঁর যুক্তি – শিল্পকলা তো ‘শিল্প’ই। ‘টাকা’ রোজগারে লজ্জা কী? ‘ব্যবসার চাইতে বড় শিল্প আর কী আছে?’৩
পুরো ষাটের দশকেই ফ্যাক্টরিতে চলছিল মাস প্রডাকশনে শিল্প নির্মাণ। অ্যান্ডি এখন কেবল ‘বিষয়’ নিয়ে ভাবেন। বাকি কাজ সহকারীদের। মাঝে মাঝে হয়তো তিনি বলে দেন, কোথায় কী করতে হবে। কথিত আছে, অনেক ক্ষেত্রে সই করার কাজটাও অ্যান্ডি অন্যের হাতে ছেড়ে দিতেন। এভাবেই তৈরি হলো তাঁর ‘স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’ আর ‘ইলেক্ট্রিক চেয়ার’। আঁকলেন জ্যাকুলিন কেনেডিকে। সে-সময়ের প্রধান ‘আইকন’গুলোকে নিজের চিত্রতলে অমর করে ধরে রাখাই যেন হলো ওয়ারহলের কাজ। তিনি যে কাজে হাত লাগান না – এ-কথা বলতেই যেন ওয়ারহলের আনন্দ। নিজের হাতে রং লেপেও বলতেন, অন্য কাউকে দিয়ে করিয়েছেন। তাতে যে-সমালোচনা হবে – সে-সমালোচনাই তাঁকে আরো যশস্বী করবে – অ্যান্ডি তা বদ্ধমূল বিশ্বাস করতেন। নিজের মুখকে মুখোশের আড়ালে ঢাকবার কোনো সুযোগই তিনি কখনো হাতছাড়া করেননি। শত শত পরচুলা ছিল তাঁর – মাথাভর্তি চুল থাকলেও – পরচুলা ছাড়া সাধারণ্যে বের হননি তিনি কখনো। খুব কাছের মানুষ ছাড়া বাড়িতে আসতে পারেনি কেউ – এমনকি ভাইয়েরাও শুধু সাপ্তাহিক ছুটির দিনটিতে আসতে পারতেন। অ্যান্ডির নাম যত ছড়াল, ততই তিনি নিজেকেও আঁধারে ঢাকলেন। তাঁর রক্ত-মাংসের জীবনটাও যেন এক ‘পপ আর্ট’।
অ্যান্ডি ওয়ারহল ১৯৬৪-তে আবার ‘খবর’ হলেন, তাঁর সেলফ পোর্ট্রেট দিয়ে। এবার চারপাশে শোরগোল। সমালোচকেরা এখন বললেন, অ্যান্ডি হলেন সেই শিল্পী, যিনি সবকিছুকে পরিবর্তিত করে ফেলেছেন। কেউ কেউ বললেন, ‘হয়তো অ্যান্ডি ওয়ারহলই বিশ শতকের প্রধানতম শিল্পী’। অনেকেই বললেন, ‘অ্যান্ডি ওয়ারহল আমাদের বাস্তবতাকে অন্যরূপে দেখিয়েছেন… আমাদের সমাজবোধকে পরিবর্তিত করেছেন।’ অ্যান্ডি এখন সেলিব্রেটি। ছোটবেলায় যে সেলিব্রেটিদের অটোগ্রাফের আশায় বসে থাকতেন, ওয়ারহল এখন তাঁদেরই শরিক। তিনি জানলেন, শিল্পের জগতে তাঁর যে-লক্ষ্য ছিল তা পূরণ হয়েছে। অ্যান্ডি ওয়ারহল এবার শুধুই মুভি তৈরিতে মনোনিবেশ করলেন। তবে এ মুভি শুধুই তাঁর মতো। ‘ক্যামবেল স্যুপ ক্যানে’র মতো। আর দশটা চলচ্চিত্রের মতো কিছু তিনি করবেন না।
ফ্যাক্টরিতে যিনিই নতুন আসেন অ্যান্ডি তাঁকেই ক্যামেরার সামনে বসিয়ে দেন। কাজ শুধু তাকিয়ে থাকা। তাকিয়ে থাকতে থাকতে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এলেও কিছু করার নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অ্যান্ডি এমন সব মুভি তৈরি করতে লাগলেন। তৈরি করলেন ব্লো জব (Blow job), BU (Eat),ড্রাকুলা (Dracula), কাউচ (Couch), হেয়ারকাট (Haircut), কিস (Kiss)। )। তাঁর ছবির মতোই চারপাশের সব সাধারণ ঘটনাই চলচ্চিত্রেরও গল্প। তবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে একই বিষয় বারবার। সে-সময়ের প্রেক্ষাপটে এমন কাজ তেমন প্রশংসাযোগ্য ছিল না। চলচ্চিত্রকাররা বলেছিল, অ্যান্ডি ছবি আঁকে আঁকুক Ñ ওর কী দরকার ‘মুভি’ তৈরিতে আসার? এগুলো তো আর ‘মুভি’ নয় বরং ‘বোরিং’ ‘সিকোয়েন্সে’র সমন্বয়। অ্যান্ডির উত্তর ছিল – ‘আমি সবসময়ই অবাক হয়েছি, যখন দেখেছি লোকজন জানালার সামনে বা বারান্দায় বসে দিনভর বাইরে তাকিয়ে থেকে ক্লান্ত হয় না। কিন্তু তাদের যদি মুভি বা থিয়েটারে বসিয়ে দেওয়া যায় তো তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আমি মনে করি, খুব শ্লথ চলচ্চিত্র আসলে বারান্দায় বসে বাইরে তাকিয়ে থাকার মতোই রোমাঞ্চকর।’১
অ্যান্ডি ওয়ারহল যেন শিল্পজগতের সবদিকে ছড়িয়ে যেতে চাইছিলেন। মুভি তৈরির কাজে আর সময় দিতে না পেরে সহকারীদের কাজে লাগাতে লাগলেন তিনি। অ্যান্ডির ফ্যাক্টরি এখন আর স্ক্রিন প্রিন্টে ব্যস্ত নয় – মুভির ‘মাস প্রডাকশনে’ দিনভর রত। এর সঙ্গে সঙ্গে চলল ‘হাই সোসাইটি’, ‘সেলিব্রেটি’, ‘সমকামী’, ‘ড্রাগসেবী’ – যথা নিউইয়র্কের প্রায় সকল জগতের মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা। ‘ভেলভেট আন্ডারগ্রাউন্ড’ নামক ‘রক ব্যান্ডে’র অ্যালবামের প্রযোজনাও করেছেন  তিনি  এ-সময়ে। তবে এসবের বাইরেও প্রদর্শনী করেছেন ব্রিলো বক্স (Brillo Box), হাইঞ্জ বক্স (Heinz Box) ইত্যাদি এবং অন্যান্য বাক্সের ভাস্কর্যের। তবে এবার আর ক্যানভাসে নয়, বাক্সগুলো এনে তিনি সাজিয়ে দিলেন গ্যালারির বিভিন্ন স্থানে। সাধারণ আমেরিকানের ঘরে রাখা সাবানের বাক্স বা টমেটো ক্যাচাপের বাক্স এখন অ্যান্ডির ভাস্কর্যের বিষয় হলো। এ-সময়ে করা তাঁর আরো একটি বিখ্যাত কাজ হলো ‘দ্য সিলভার ক্লাউডস’। হিলিয়াম-ভরা বিশেষায়িত প্লাস্টিক বেলুন দিয়ে ভরিয়ে দিলেন তিনি কাসটেল্লি গ্যালারির একটি কক্ষ (১৯৬৬)। এর কিছুকাল পরই প্রকাশ করতে শুরু করলেন ইন্টারভিউ ম্যাগাজিন। বলা হলো, এটি একটি মাসিক ফিল্ম জার্নাল। অ্যান্ডি তাঁর মুভির অভিনেতাদের অনেককেই এ-ম্যাগাজিনে তুলে ধরেছিলেন।
অ্যান্ডি ওয়ারহলের একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘ভবিষ্যতে সবাই অন্তত ১৫ মিনিটের জন্য হলেও ‘স্টার’ হবে।’ নিজে ‘স্টার’ হতে চেয়েছিলেন। সেলিব্রেটির খাতায় নিজের নাম লিখিয়ে তারপর দায়িত্ব নিলেন নিজের মতো করে ‘স্টার’ তৈরি করার। অ্যান্ডি টেলিভিশনের অনুষ্ঠান প্রযোজনা এবং সঞ্চালনা করতে শুরু করলেন। তাঁর ফ্যাক্টরিতে এখন নানান মানুষের ভিড়। সবারই বাসনা ‘স্টার’ হবার। একজন তো রাগের মাথায় অ্যান্ডিকে গুলিই করে বসলেন। সুস্থ হয়ে ফেরার পর অ্যান্ডি অবশ্য তাঁর এই ‘ফ্যান’দের থেকে দূরে সরে আসেন। তবে সেলিব্রেটিদের সঙ্গ তিনি কখনো ছাড়েননি।

ছয়
অ্যান্ডি ওয়ারহল তাঁর ছবিতে আমেরিকার সমাজকে যেভাবে দেখিয়েছেন – সেভাবে হয়তো অন্য কেউ দেখাতে পারেননি। নানা সময়ে সমাজের নানান উপকরণকে তুলে এনে হাজির করেছেন দর্শকের সামনে। আর এভাবেই অ্যান্ডি আমেরিকার শিল্পজগৎকে সত্যিকারের স্বাধীনতাও এনে দিয়েছেন। বলেছেন ‘সবাই শিল্পী’। সবারই এই ক্ষমতা আছে। আর শুধু শিল্পের বিষয়ই নয়, শিল্পের মাধ্যম ব্যবহারেও তিনি এনেছেন স্বাধীনতা। স্ক্রিন প্রিন্টের এমন ব্যবহার আর ‘মুভি ক্যামেরা’কে চিত্রশিল্পের মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরার কাজটি অ্যান্ডিরই হাত দিয়ে সম্ভব হয়েছে। সবাই তাঁর ‘ছবি’ পছন্দ করবে বা প্রশংসা করবে এমনটি তিনি ভাবেননি কখনো। সবাই তাঁর কাজের অর্থ বুঝবে – তেমন প্রয়োজনীয়তাও তিনি অনুভব করেননি। অর্থ বোঝানোর ছবি তিনি তাঁর কমার্শিয়াল জীবনে অনেকই এঁকেছেন। তাঁর কাজ দেখে অজান্তেই মানুষ যদি একাত্ম হতে পারে তবেই তিনি সফল হবেন – এই ছিল তাঁর মোক্ষ। সন্দেহাতীতভাবেই সত্য, অ্যান্ডি ওয়ারহল সে-কাজটি খুব ভালোভাবেই করতে পেরেছিলেন। তাঁর স্যুপ ক্যান বা মেরিলিন মনরো আমেরিকার সমাজ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সেই ষাটের দশকে যেমন, আজকের দিনেও তেমনই সমর্থ।
ওয়ারহলের কাজের সঙ্গে মারসেল দুসম্পের (Marcel Duchamp) কাজের বিষয়গত মিল খুঁজে পান অনেকেই। বলা হয়, বিশ শতকের পশ্চিমা শিল্পজগতে প্রধানতম আধুনিক শিল্পী এঁরা দুজনই। প্রধানতম হতেই পারেন তবে দুজনেই সমান প্রভাব বিস্তার করেছেন কি শিল্পজগতে? দুসম্প তো বলতেন, তিনি যদি কোনো বস্তুকে সামনে তুলে ধরেন তা সে ‘সাইকেলের চাকা হোক’ বা ‘ল্যাট্রিন’ – তাই হবে শিল্প। কারণ তিনি শিল্পী! অ্যান্ডি তেমন জোর গলায় কিছুই বলেননি। কাউকে বাধ্যও করেননি তাঁর মতো করে ভাবতে। কিন্তু যে-বিষয়গুলোকে তিনি তুলে এনেছেন তাঁর ক্যানভাসে, আর যেভাবে এনেছেন – তা সাধারণ-অসাধারণ-শিল্পী-অশিল্পী অনেককেই আন্দোলিত করেছে। দুসম্প তেমন প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন কি না তা ভাবনাযোগ্যই বটে। অ্যান্ডি ওয়ারহলই একমাত্র আমেরিকান শিল্পী, যাকে জার্মানির বনের ট্যাটু শিল্পী যেমনভাবে অনুসরণ করেছেন, তেমনিভাবেই করেছেন নিউইয়র্কের ‘সাবওয়ে’র শিল্পীরা। জীবদ্দশাতেই তিনি দেখেছেন, তাঁর দেখানো পথে হাঁটছেন অসংখ্য শিল্পী। অ্যান্ডির মতো এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করা অনেক শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব হয়নি এবং তা সংগত কারণেই।
সাত
পিটসবার্গের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশঘেঁষা ফোর্বস স্ট্রিটের ওপর দিয়ে ডাউনটাউনের দিকে যাবার পথেই পড়ে কার্নেগি মিউজিয়াম। মিউজিয়ামটির ভেতরে রাখা ওয়ারহলের করা অ্যান্ড্রু কার্নেগির পোর্ট্রটে বাইরে থেকেই দৃশ্যমান। ডাউনটাউনের বাসের জন্য অপেক্ষা করার ফাঁকে ছবিটা দেখে নিচ্ছিলাম। আমার ডানে নানান রঙে-কেশসজ্জিত একটি মেয়ে, বাঁয়ে কোকাকোলা হাতে একটি ছেলে হেডফোনের গানে একইভাবে মাথা নাড়াচ্ছে, আর একটু দূরে কিছু ফেলে দেওয়া খাবারের বাক্স সাজিয়ে বসে ক্যান্ড স্যুপে চামচ নাড়াচ্ছেন একজন ‘হোমলেস’। ভাবলাম, অ্যান্ড্রু কার্নেগির পোর্ট্রেেটর রংগুলোই কি দেখছি এই দৃশ্যগুলোতে? বাস এসে দাঁড়াল সামনে। তার সারাগায়ে লেবেল আঁটা নানান বিজ্ঞাপনের। ডাউনটাউনের রাস্তা ধরে যাবার পথে যত বিলবোর্ড তার চাইতেও বেশি দেয়ালে দেয়ালে আঁকা নানান পোর্ট্রেট – সবই যেন অ্যান্ডির স্ক্রিনপ্রিন্ট। বাস থেকে নেমে সেতু পেরিয়ে যখন ওয়ারহল মিউজিয়ামে প্রবেশ করলাম – মনে হলো এই পুরো পথে আমেরিকার যা কিছু আমার চোখে সাধারণ মনে হয়েছিল – অ্যান্ডি তাকেই করেছেন অসাধারণ। দিয়েছেন শিল্পের সম্মান।
আমেরিকার নাড়ির স্পন্দনে যে কনজিউমারিজম আর সেলিব্রেটি-পূজার প্রণোদনা – তা ঠিক বুঝতে পেরেছিলেন অ্যান্ডি ওয়ারহল। তিনি আওয়াজগুলো বুকে ধারণ করতেন। হয়তো ভালোও বাসতেন। আর তাই খুব সহজেই চোখে আঙুল দিয়ে সবাইকে তা দেখিয়েছেনও এবং তা শৈল্পিকভাবেই বটে। অনেকেই হয়তো তাঁর কাজের প্রক্রিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করতেন এবং করেনও। কিন্তু আজকের আমেরিকার আনাচে-কানাচে যে ওয়ারহলের কাজের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে তা অস্বীকার করা হয়তো তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ওয়ারহল মানুষের চোখ যেমন খুলে দিয়েছেন, তেমনি শিখিয়েছেন বস্তু বা ব্যক্তি সব কিছুকেই নৈর্ব্যক্তিকভাবে – মাত্র অল্প কিছু রঙের কাচ দিয়ে দেখে নেওয়া যায়। শিল্পীকে খুব ভারী, খুব শক্ত কিছু করবার কষ্ট থেকে বাঁচিয়ে হালকা করেছেন তিনি। আর সেকালের নিজের মাঝে নিমগ্ন শিল্পীদের ভাবনাজগৎকে ধাক্কা দিয়ে তাকে আরো বড় করে সমাজকে সে-জগতের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বুঝিয়েছেন ‘আধুনিক শিল্পীর চোখ-কান আধুনিক কালকে বোঝার জন্য তৈরি থাকতে হবে সর্বদাই। আর এ সবকিছুই করেছিলেন তিনি, একদমই অজান্তে – নিজের এবং চারপাশের সবার। ‘অতি সাধারণে’র মুখোশে ঢেকে রেখেছিলেন তিনি তাঁর ‘অসাধারণ’ কাজ। এই মুখোশের নানান পরত খুলতে আরো কতদিন লাগবে তা হয়তো ভবিষ্যৎই বলতে পারে।
তথ্যসূত্র
1.    The Andy Warhol museum, 1994.
2.    Gary Indiana, Andy Warhol and the can that sold the world, Basic Books, 2010.
3.    Andy Warhol 365 Takes, the Andy Warhol museum
collection. 2004.
4.    Frances Stonor Saunders, The  cultural cold war : the CIA and the world of Arts and Letters, 1999, New York.
5.    Victor Bockris, The life and death of Andy Warhol, 1989.

Leave a Reply

*