logo

সুব্রহ্মণ্যনের ছবি – উৎসবের অন্ধকার

ত প ন  ভ ট্টা চা র্য

উনিশশো একাত্তরের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে কে জি সুব্রহ্মণ্যন্ ঐতিহাসিকভাবে জড়িয়ে রয়েছেন সেই একই সালে টেরাকোটায় করা ‘Bangladesh series’ রিলিফগুলি করার জন্য। তাঁর কাজগুলিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম সরাসরি আসেনি, এসেছে পশ্চিম পাকিস্তানের মিলিটারি অত্যাচারের নমুনা হিসেবে। তখন এমন খবর দৈনিক কাগজগুলিতে আসত, কীভাবে পাকিস্তান মিলিটারি নারী-শিশুদের ওপরও অত্যাচার করছে, সেই খবরগুলিই ছিল ভিত্তি এমন সব কাজের। সুব্রহ্মণ্যন্ কাজগুলিতে পাশাপাশি রাখতেন অত্যাচারিত শরীরগুলি এবং তারই পাশে উদ্ধত মিলিটারি শাসকদের মুখাবয়ব, তাদের পোশাক ও পদক। প্রতিবার এই কাজগুলি ব্যঙ্গের কশাঘাত হিসেবে উপস্থিত হতো। ক্ষমতাকে ঠাট্টা করার একটা ঝোঁক কাজগুলিতে রয়েছে।

এই বাংলাদেশ সিরিজেই তিনি টেরাকোটাগুলি করেছিলেন প্রথমে খন্ড খন্ড চৌকো করে এবং তারপর তা একসঙ্গে জোড়া দিয়ে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ বাদ দিয়ে আজ চল্লিশ বছর পরেও তিনি টেরাকোটাগুলিকে এমনভাবেই নির্মাণ করেন। যেমন নশ্বরতা ও মৃত্যু অনুভবে করা ‘মাছ ও জীবাশ্ম’ সিরিজ, ১৯৭৬, ‘আলমারিতে নাটক’, ১৯৭৭, ‘মুদ্রা’, ১৯৭৭ ইত্যাদি কাজ। ‘মাছ ও জীবাশ্ম’ সিরিজেও তিনি মাছ এবং মাছটাকে চিড়ে তার হাড়, কাঁটা এমনভাবে উপস্থিত করেন যেন ওই হাড়, কাঁটার ওপরের পোশাক হিসেবেই পুরো মাছটা উপস্থিত, ওই নশ্বর চিহ্ন নিয়েই মাছটা ঘোরে বা ‘আলমারিতে নাটক’ কাজেও আলমারিতে রাখা পোশাকগুলিই জীবন্ত হয়েছে, পোশাকগুলিই হারিয়ে যাওয়া শরীরের বিকল্প হয়ে ওঠে, এই যে চিহ্ন ও চিহ্নিতকরণ এবং যা নানান মুদ্রায় উপস্থিত তা সুব্রহ্মণ্যনের কাজের এক গভীর বিশেষত্ব।

নন্দলাল, রামকিঙ্করেই দেখা যায়, শিল্প সৃষ্টিতে তাঁরা নানান উপাদান, সামগ্রী দিয়ে উৎসাহিত হচ্ছেন। নন্দলাল কারুশিল্পী ও শিল্পীর ফারাক এমনভাবে মানেননি যেভাবে হিন্দু ধর্মে জাতপাত তৈরি করা হয়েছিল। এর এই কাজ, তার ওই কাজ এমনভাবে বিভক্ত করা শিল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রে করা যায় না। এবং সেই নন্দলাল, রামকিঙ্করের ছাত্র সুব্রহ্মণ্যন্ নানান উপাদানে উৎসাহিত নন কেবল, সেই উপাদানের ভেতরেও যে সম্ভাবনা তাকে চূড়ান্তে নিয়ে যান তিনি। এবং তা শুরু হয়েছিল এই টেরাকোটার কাজগুলির মাধ্যমেই। এইভাবে বীরভূমের যে বিশেষত্ব, তার টেরাকোটা মন্দিরগুলি, তারও দেয়ালে আপাত দ্বিমাত্রিক ভাস্কর্যগুলি তাই আরেক আধুনিকতায় রূপ পেল সুব্রহ্মণ্যনের টেরাকোটায়।

টেরাকোটায় সুব্রহ্মণ্যন্ তাঁর প্রথম, সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজটি করেন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষের কাছাকাছি সময় ১৯৬২-৬৩-তে, লক্ষ্ণৌতে। রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীতে ভারতজুড়ে প্রতিটি রাজ্যের কেন্দ্রে নাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কাজের জন্য একটি করে হলঘর করা হয়, তেমনই একটি হয় লক্ষ্ণৌতে। সেই হলের দেয়ালেই রবীন্দ্রনাথের নাটকের ওপর ভিত্তি করে তিনি নির্মাণ করেন ‘King of the Dark Chamber’ নামের এক বৃহৎ ম্যুরাল। একাশি ফিট লম্বা এই ম্যুরালটি, প্রস্থে নয় ফিট। এই কাজটির জন্য সুব্রহ্মণ্যন্ মোট এক হাজার তিনশোটি খন্ড খন্ড টেরাকোটা চৌকো তৈরি করেন। যদিও একাত্তর সাল থেকে করা কাজগুলির তুলনায় এই কাজটি আড়ষ্ট, স্বাচ্ছন্দ্যরহিত মনে হয়, যেমন কাজটির ভেতর আরো খোলা অবসরের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওই যে রিলিফে করার ঝোঁক সুব্রহ্মণ্যনের রয়েছে, তা এই কাজ থেকেই শুরু হয়।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য থেকে উৎসাহিত হয়ে এই যে কাজ রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকীতে শুরু হয়েছিল, তা পঞ্চাশ বছর পরেও এই সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতেও অব্যাহত রয়েছে। যেমন ২০১১-১২-তে রবীন্দ্রনাথের কবিতা, সাহিত্যের যে ইংরেজি অনুবাদের বই ‘সীমা প্রকাশনা’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাকেও চিত্রিত করেছেন সুব্রহ্মণ্যন্।

এমন নয়, ভাস্কর্যে কেবল দ্বিমাত্রিক রিলিফেই কাজ করেছেন তিনি বা কেবল টেরাকোটায় কাজ করেছেন। যেমন বালু, সিমেন্টে (Sand cast cement) ১৯৬৯ সালে করা গান্ধী দর্শনের ম্যুরালটি। সেখানে সর্বধর্ম সমন্বয়ের আকারে একটা রিলিফ করেও তার সঙ্গে যুক্ত করেছেন একটি ফিগার। যেমন শান্তিনিকেতনে কলাভবনে ১৯৮৮-র শুরুতে করা উল্লেখযোগ্য কাজটি। যেখানে তিনজন দেবী সবেমাত্র জল থেকে উঠলেন আর তাঁদের আবাহন করে নিয়ে আসছে কচ্ছপ ও কুমির। চারদিকে ছড়িয়ে আছে পদ্মপাতা, এমনকি পাখিও উড়ছে। এই ভাস্কর্যের কাজটিও বালু, সিমেন্ট, লোহা, টিনের পাত দিয়ে করা, যা উত্থাপন করে সান্দ্রো বতিচেল্লির ‘ভিনাসের জন্ম’ ছবিটি। কিন্তু ওই পর্যন্তই, তারপর তা হয়ে ওঠে সুব্রহ্মণ্যনেরই জগৎ, যা বাংলার ইতিহাস, মিথ, ভৌগোলিকতার সাক্ষ্য বহন করে। যেভাবে জল ও জঙ্গলের ভেতর এই দেবীরা উপস্থিত হন জল থেকে। পেলব সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত দেবীরা এই সামগ্রিক ভাস্কর্যে, যদিও তাঁদের একজন সিংহের ওপর বসে আছেন ও আরেকজনের হাতে রয়েছে সাপ।

উপাদান হিসেবে ব্রোঞ্জ ইত্যাদির তুলনায় ভঙ্গুর মাটি, পোড়ামাটি, বালু, সিমেন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করা সুব্রহ্মণ্যনের এক বৈশিষ্ট্য। যেমন খন্ড খন্ড চৌকো করে তিনি যেন নানান ক্ষেত্রে কাজটি ছড়িয়ে দেন, পরস্পরের ভেতর ধারাবাহিকতা তৈরি করে একটা কথন বা narrative নির্মাণ করেন তিনি, যাতে প্রায়শ কামমূলক উপস্থাপনা থেকে যায়। কামকে খেলা বা মানুষের জীবনের লীলা হিসেবে দেখাবার প্রবণতা সুব্রহ্মণ্যনে যথেষ্টই রয়েছে। আর রয়েছে ভঙ্গি, যা ভারতীয় ভাস্কর্যের একটা বৈশিষ্ট্য, তাও লক্ষ করি আমরা। আর যেহেতু মাটি নিয়ে কাজ করেন তিনি, তাতে স্পর্শ বা ছোঁয়ার ভূমিকা রয়েছে, হাতের ম্যাজিকে কাজটি হচ্ছে। এবং মাটি বলেই তাতে ঘটতে পারে নানান রূপ ও রূপান্তর। বাংলার ধর্ম ও সংস্কৃতিতে মাটির এক গভীর ভূমিকা রয়েছে নদীমাতৃক দেশ হওয়ার কারণে; কিন্তু তাই আরেক আধুনিকতায় রূপান্তরিত হতে পেরেছে সুব্রহ্মণ্যনের কাজে।

১৯৬৭-৬৮ সালে সুব্রহ্মণ্যন্ নিউইয়র্কে থাকেন। সেখানে স্টুডিও ঘর ছোট থাকায় তিনি ছোট ছোট ক্যানভাস করেন, তারপর সেগুলি জোড়া দিয়ে একটা বড় কাজ করে উঠতেন। এমন বহুপদী ক্যানভাস তখন তিনি নিয়মিত করতেন। পরে তাঁর ছবিতে এমন কাজের ধারা আর বজায় থাকেনি, তিনি সাধারণত বড় ক্যানভাসেই করেন। কিন্তু এমন ধারা তিনি বজায় রেখেছেন পরবর্তীকালের টেরাকোটা রিলিফগুলির কাজেই। সেখানে এই খন্ড খন্ড চৌকো কাজ করে তাকে জোড়া দিয়ে বড় কাজের ধারা তিনি বজায় রেখেছেন এবং কয়েকটি ব্যতিক্রমী ছবিও তিনি এমনভাবে এঁকেছেন যেমন ১৯৯১-এর করা ‘The Bombay Alter piece’ কাজটি।

দুই

 

ষাটের দশকের ছবিগুলির বিশেষত্ব ছিল, মুখ দেখা যায় না এমন কিছু মানুষের পরোক্ষ উপস্থিতি, সুব্রহ্মণ্যনের ছবিতে শরীর, বিশেষত মানব শরীর কেবল অজস্রের ভেতর পলায়মান একজন হয়ে উপস্থিত হতো এবং তাদের লুকোচুরিতে মনে হতো কেবলই রহস্যাবৃত কোনো যৌন খেলা হয়ে চলেছে, তার বদল হয়ে একটা নিরূপিত, সুস্পষ্ট আকার এলো ১৯৭৯-র ‘বেড়ালসহ মেয়ে’ বা ‘ফুলদানিসহ মেয়ে’ ইত্যাদি ছবিতে। এই যে তিনি গ্লাস ও অ্যাক্রিলিকে রিভার্স চিত্রকলা শুরু করলেন, তার ঐতিহ্য যেমন রয়েছে দক্ষিণ ভারতে তাঞ্জোরের গ্লাস ছবির, তেমন ছবির দৃশ্যেও বাংলার কালীঘাট চিত্রকলার সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ল। শান্তিনিকেতনে থাকার জন্য ছেড়ে আসা দক্ষিণ ভারত ও বাংলার চিত্রকলার ঐতিহ্যকে তিনি বিচিত্রভাবে আত্মস্থ করলেন। এইভাবে তিনি তাঁর উপস্থিতিকেও একটা গভীর সাংস্কৃতিক সমন্বয় হিসেবে নির্মাণ করতে পারলেন।

১৯৮৮-তে অক্সফোর্ডে থাকাকালীন এমনই অ্যাক্রিলিক শিটে তিনি অাঁকলেন তাঁর বিখ্যাত ‘Fairy tales of oxford and other paintings’ সিরিজটি। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের দৈনন্দিন হইচইয়ে ভরা যে মানুষের জীবন তার ভেতর নিয়ে এলেন মুঘল মিনিয়েচারের বিখ্যাত চরিত্র এনায়েত খানকে। কিন্তু তারপর যখন ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে, তখন ধীরে ধীরে তাঁর বিষয় হয়ে দাঁড়াল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের, শান্তিনিকেতনের চারপাশের জীবন। এবং রসিকতা, যৌনতা ইত্যাদি মিলিয়ে সেখানেও সৃষ্টি হলো ব্যক্তিগত পুরাণ, বাস্তবতা সেখানে হয়ে ওঠে অলীক উপস্থিতির মতন, যেখানে চেনা শান্তিনিকেতনই কেমন অচেনা বিচিত্র জগৎ হয়ে ওঠে, আবার কিছু অচেনাও ছবি দেখতে দেখতে চেনা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এত জীবন উৎসবমুখরতার ভেতরই হঠাৎ হঠাৎ উঠে আসত মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচারের কাহিনিও এবং তা দেখাতে গিয়ে তিনি ক্রিশ্চিয়ান, হিন্দু পুরাণ কাহিনিগুলি থেকে উদ্ধৃতি দিতেও সংশয় করতেন না। সুব্রহ্মণ্যনের ছবিতে যৌনতা, যৌন-ইঙ্গিত নানান রসিকতায়, তির্যকবোধে ছড়িয়ে রাখা হয়, এমনকি পশু ও নারী-পুরুষেও বিচিত্র রকম সম্পর্কে, মমতায় উপস্থিত হয় এবং ছবিতে ব্যবহৃত ডিজাইনগুলিও এমন কাহিনিতে মদদ জোগায়।

শান্তিনিকেতনে পূর্বপল্লীতে সুব্রহ্মণ্যন্ থাকতেন এবং এখনো বরোদা থেকে এসে সেখানেই থাকেন। আপাত শান্ত অঞ্চলটি পৌষ মেলায় ভিড়ে জনজোয়ারে পরিণত হয়, বাউলের আখড়া, গানও কম হয় না।  সুব্রহ্মণ্যন্ বছরের পর বছর সেই মেলায় এসেছেন এবং এইসব থেকেই তিনি তুলে নিতে পেরেছেন এমনকি বাউলেরও জীবনছবি অসংখ্য চিত্রমালায়। তাঁর ছবিতে শহুরে ও গ্রামীণ মানুষ একাকার হয়ে থাকে, যেমন শান্তিনিকেতনে ঘটে থাকে। শান্তিনিকেতনের হনুমান, পাখি, বেড়াল, ফুল ও অন্যান্য গাছও বাদ থাকে না। তারা অবলীলায় ঢুকে পড়ে তাঁর ছবিতে। অর্থাৎ নন্দলাল, বিনোদ বিহারী, রামকিঙ্কর যেভাবে তাঁদের দৃশ্যকল্প শান্তিনিকেতন, বোলপুর থেকেই সংগ্রহ করে নিতেন, পুরো অঞ্চল আত্মস্থ করে নিয়েই তাঁদের সৃষ্টিশীলতায় তা প্রকাশ করতেন, সুব্রহ্মণ্যনের ক্ষেত্রেও তাই হলো, তা যেন আরো ব্যাপক জনজীবনসুদ্ধ তিনি আত্মস্থ করলেন, তাদের ব্যক্তিগত পুরাণকল্পে উপস্থিত করলেন। বরং eros বা যৌনতা যা আগের শান্তিনিকেতনের শিল্পীরা এড়িয়ে গেছেন অথবা খুবই সাদামাটাভাবে উপস্থিত করেছেন, এমনকি রবীন্দ্রনাথেরও কয়েকটি ছবি বাদে যা ইঙ্গিতে, চিহ্নে উপস্থিত, রামকিঙ্করেও সে দূরত্ব কখনো কমলেও মিলিয়ে যায়নি। সুব্রহ্মণ্যন্ এক গভীর মানবিক উপলব্ধিতে উপস্থিত করেছেন একের পর এক। তিনি কখনো গোঁড়া, প্রথাসম্মতকে মেনে নেননি পরম্পরার দোহাই দিয়ে।

 

তিন

 

১৯৮৩ সালের শেষের দিকে বিখ্যাত শিল্পী তৈয়ব মেহেতা শান্তিনিকেতনে থাকতে আসেন। সমবয়স্ক এই শিল্পীর সঙ্গে সুব্রহ্মণ্যনের সখ্য গড়ে ওঠে। এমনকি বছর দুয়েক থেকে মুম্বাই ফেরার আগে তৈয়ব একটি প্রদর্শনীও করেন কলাভবনের নন্দন হলে, যার ক্যাটালগে একটা ছোট কিন্তু মূল্যবান লেখা লিখে দেন সুব্রহ্মণ্যন্।

তৈয়বও বাংলার জনজীবন ও পুরাণকল্প দিয়ে উৎসাহিত হন তাঁর ছবিতে। তিনি শান্তিনিকেতনে থাকাকালীনই চড়কমেলার ওপর ভিত্তি করে এক বিশাল ছবি অাঁকেন। এবং মুম্বাইতে ফিরে ১৯৮৯ সাল নাগাদ তাঁর কালী সিরিজ শুরু করেন। এই সময়টা বাংলার লোকজীবন, পুরাণ কাহিনি ও এখানকার ধীমান জীবন নিয়ে উৎসাহিত হন শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনও। নববইয়ের দশকে দেবী দুর্গা, কালী, অসুর ও তাদের পরিবারের সন্তান-সন্ততি নিয়ে মেতে ওঠেন কে জি সুব্রহ্মণ্যন্ও। তিনি এই দেবী, অসুরদের দেখেছেন লোকজীবনেরই প্রসার, বিস্তার, ব্যাপ্তি হিসেবে। এই চিত্রমালার তিনি নামকরণ করেছিলেন ‘বহুরূপী’, যেন এরা সবাই অভিনীত চরিত্র। মুখ, মুখোশ একাকার হয়েছে যেমন চরিত্রগুলিতে, তেমন এরা এই জনজীবনেরই গরিব মানুষ সব। মুর্শিদাবাদী পটচিত্র, কালীঘাট চিত্রকলা থেকে ফ্রেঞ্চ স্কুল এখানে সামগ্রিক অভিব্যক্তির পূর্ণতা পেয়েছে। বলা যায়, সুব্রহ্মণ্যন্ চিত্রকলায় নৃত্যনাট্য নিয়ে এসেছেন যেমন আমরা দক্ষিণ ভারতের কথাকলি শৈলীতে দেখি, নারী এই ছবিগুলিতে প্রায়ই প্রবক্তার ভূমিকায় উপস্থিত হয় এবং চরিত্রগুলি হয়ে ওঠে বিচিত্ররূপী, বহুমুখী কল্পনায় যেখানে তারা নানান রূপে-মূর্তিতে উপস্থিত হতে পারে।

বাস্তব ও কল্পনায় মেশানো নির্মাণের উৎসব ও আটপৌরের বর্ণচ্ছটা ঘেরা কে জি সুব্রহ্মণ্যনের ছবি। গোধূলির বর্ণময়তা থেকে বাস্তবের প্রখর আলোতে যাতায়াতের যত অলিগলি, তাই যেন তাঁর কাব্যিক ব্যক্তিত্বে উদ্ভাসিত। সুব্রহ্মণ্যনের ছবিতে বহু আলোচিত শান্তিনিকেতন স্কুল (নন্দলাল, বিনোদ বিহারী) যেমন রয়েছে তেমনি ফ্রেঞ্চ স্কুল (পিকাসো, মাতিস), জাপানি চিত্রকলা, চীনা ছবি, কালীঘাটের ছবি, অনায়াসে দেখা যায়। যেমন তিনি ফোল্ডারের মতো নানান বিভাজন করেন দৃশ্যপটকে তাতে জাপানি ছবির ধরন বা কালি-কলমের ড্রইংগুলিতে চীনা দ্রুত লিখনও আমরা সহজেই দেখতে পাই। এতকিছু তিনি যে উদ্ধৃতির মতো করে রাখেন না, আত্তীকরণ করে নিয়েই অাঁকেন তাও বোঝা যায়। তাঁর ছবি যেমন অবলীলায় শান্তিনিকেতনের ধারাবাহিকতায় রাখা যায়, আবার লন্ডন স্কুলের সঙ্গেও (রন কিতাই, ডেভিড হকনি, কেন কিফ) তার একটা স্বাভাবিক সম্পর্ক রয়েছে, যার সম্বন্ধে বিশদ এই প্রবন্ধেরই কোথাও আলোচিত হবে। এতকিছুর পরও তিনি যেন তাঁর সমবয়স্ক রামকুমার, তৈয়ব মেহেতা, সৈয়দ হায়দার রাজার মতো ‘foundational     modernism’-এর চর্চা করেননি। আবার আজকাল যে ধরনের উত্তর-আধুনিকদের দেখা যাচ্ছে, যেমন মনোযোগহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আস্ফালনে বাতাস ভরে উঠেছে, তার থেকেও সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র তিনি। তাঁর ‘inter textual strategies’ তাই যতটা ভাবা যায় তার চেয়েও গূঢ় সংশ্লেষযুক্ত বিনির্মাণ, যা নতুন শিল্প নির্মাণের দাবি না করে আধুনিক জীবনের রূপকল্পকে বিশ্লেষণ করে।

অ্যাড্রিয়ান স্টোক্সের পিকাসো সম্পর্কে বয়ান উদ্ধৃত হয়েছে টেট গ্যালারি প্রকাশিত Late Picasso প্রদর্শনীর ক্যাটালগে। তাতে স্টোক্সের ভাষ্য হলো, ‘That modern art, the art typical of our day is the slang so to speak, of art as a whole, standing in relation to the old master as does slang to ordinary language…. If modern art is the slang of art, it has never been as extremely and gloriously so as in Picasso’s last works.’

এবার ‘old masters’-দের জায়গায় নন্দলাল, বিনোদ বিহারীর কথা ভাবলে কী বলতে চাওয়া হচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে যায় যদি খুব ভালো করে ছবি দেখা থাকে। অর্থাৎ সুব্রহ্মণ্যনের আগে কোনো শান্তিনিকেতন শিল্পীই এত slang নন, কিন্তু এক্ষেত্রে আমরা slang-কে ব্যাখ্যা করব। যেভাবে ডেভিড সিলভেস্টার ওই একই ক্যাটালগে ব্যাখ্যা করেছেন, ‘…slang is elliptical, punning, subversive, abusive, casual, witty, unexpected, insolent, abrupt, thrown away and rich in teasing allusions’. এই slang আয়ত্ত করার জন্য সুব্রহ্মণ্যনের যে কালীঘাট চিত্রকলা বা জাপানি জড়ানো পট ঘাঁটতে হয়েছে তা বলা বাহুল্য। সুব্রহ্মণ্যনের ভেতর এক অস্থির শিল্পচেতনা বর্তমান এবং সেটা যে জ্ঞানভান্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তা কেবল moral নয়, তার ভেতর সক্রিয় এক গভীর দুষ্টু ক্রিয়াও (wickedness)। অর্থাৎ তাঁর ‘knowledge system’ নন্দলাল, বিনোদ বিহারীর তুলনায় অনেকটাই জটিল দুষ্টুমিভরা খেলার মতো রোলা বার্থ বা মিশেল ফুকোর জ্ঞানভান্ডার জাঁ পল সার্ত্র বা বার্ট্রান্ড রাসেলের তুলনায়।

কিন্তু এই খেলার প্রতিভার জ্ঞানভান্ডারে এক আশ্চর্য মানবিকতাও থেকে যায়, যা হঠাৎ প্রকাশিত হয়, যা উপদেশাবলি না হয়ে সংবেদনে টইটম্বুর। তিনি কারুশিল্প ও চারুশিল্পকে গুলিয়ে ফেলেন না, কিন্তু তাদের সংযোগস্থলকে আবিষ্কার করেন এবং সেই মতো ব্যবহারও করেন। বিশেষত তাঁর টেরাকোটা ও সবার ওপর কাজগুলিতে ‘craft-level’ ও artistick expression’ এত পরস্পর যা ওই যে তাঁর interextual language-এর ওপর দখল, তারই প্রমাণ দেয়। সুব্রহ্মণ্যনের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েও এই দিকটি আলোচনা করা যায়। তিনি লিখেছেন, ‘In the Western scene what exercises you most is how to preserve, in the pressure ridden whirligig of a world, your contact with yourself and your environment. In a scene like China’s what engages your attention are those subtle interlinks with an age old traditions, and thus survival or loss in the face of a changing world.’ কে জি সুব্রহ্মণ্যনের শিল্পকর্ম এক অর্থে কোনো বিশেষ নান্দনিক উপায়ের একমাত্রিক আধিপত্য বিস্তারের বা সেই মতো ঐতিহ্যের অনুশীলনের সমালোচনা হিসেবেই নির্মিত, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তিনি শান্তিনিকেতন শিল্পীদের ধারাবাহিকতার সঙ্গে সমালোচিত সত্তা নিয়েই যুক্ত। কোনো অনড় প্রতিষ্ঠানের মতো যুক্ত নন বরং চঞ্চলভাবে বিষয়ান্তরে যেতে পারেন, ভ্রূক্ষেপহীনভাবেও। সুব্রহ্মণ্যনের বিখ্যাত এনায়েত খান সিরিজটা লক্ষ করা যাক; মুঘল যুগের বেতনভুক্ত আফিম সেবনকারী কর্মীটির মৃত্যুশয্যার যে মুঘল ড্রইং ও চিত্রকলা রয়েছে তাকে তিনি ফিরিয়ে আনলেন অক্সফোর্ডের পরিবেশে। অবশ্য এনায়েত খানের ড্রইংটি যেহেতু Victoria and Albert Museum-এ রাখা সেই অর্থে সে সত্যিই অনেক দিন ধরে বিলেত নিবাসী। আমরা দেখতে পাই রোগে ভুগে অকালবৃদ্ধ শীর্ণকায় একজন মানুষ শুয়ে থাকা অবস্থায় অনুভব করছেন যে বেঁচে থাকার ক্ষমতাগুলি তাঁর ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে, তিনি যেন সামগ্রিক পূর্ণতা, eros-এর ভেতর ফুরিয়ে যাচ্ছেন, তিনি এখন কেবলমাত্র সেইটুকুর অপেক্ষায় শুয়ে আছেন। মুঘল যুগের বিচিত্র ছবিটিকে এমন ‘fun flora and frollic’-এর ভেতর স্থাপন করেন সুব্রহ্মণ্যন্ যে তা একটা অভিঘাত সৃষ্টি করে। এমনই অনুভূতির ছবি রয়েছে রন কিতাইয়ের ‘মৃত্যুশয্যায় জন ফোর্ড’ ছবিটিতে। যেখানে অসুস্থ, মৃত্যুশয্যায় শায়িত বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক ফোর্ড লক্ষ করেন কলাকুশলীদের বিবিধ ক্রিয়া। সুব্রহ্মণ্যনের ছবিতে যে ধরনের চলমান জীবনের eros ছোটাছুটি থাকে তাও কিতাইয়ের ১৯৮৩-৮৪-তে করা ‘Cecil court, London WC2 (The refugees)’-এর সঙ্গে কোথায় যেন মিলে যায়। আবার সুব্রহ্মণ্যনের ছিন্নমস্তা সিরিজের ছবিগুলির সঙ্গে Ken Kiff-এর অাঁকা ‘The feminie as Generous, Frightening and Serene’ (১৯৮২-৮৩)-এর একটা যোগাযোগ পেয়ে যাই আমরা। কিন্তু অন্যদিকে ব্রিটিশ শিল্প-সমালোচক টিমথি হাইম্যান সুব্রহ্মণ্যনের ছবি নিয়ে উচ্ছ্বসিত নন। ১৯৯৮-তে প্রকাশিত ভূপেন খক্কর বইতে লিখেছেন, ‘As for Subramanyan, it is difficult to assess how much the Baroda ‘Project’ owes him… but in his own paintings, hed struggled for many years against a sterile formalism, influenced by stints in New York and London…. He developed in his lectures and writings (if not, as yet, in his own art) a strongly antiformalist tendency’. যে শিল্পী লেখালেখি করেন তাঁকে এ ধরনের অসুবিধের সম্মুখীন হতে হয়, তাঁর লেখা ও অাঁকাকে বিচারের সময় গুলিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বর্তমান লেখককে দিল্লির গায়তোন্ডের মতো একজন শিল্পী বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের ছবি অসাধারণ কিন্তু তাঁর কবিতা খুব খারাপ। সুব্রহ্মণ্যনের ছবির formalism-কে sterility-র সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা একেবারেই সঠিক নয় মনে হয়।

কেননা এই formalism-এ নানান আকর্ষণ ও বিচ্ছিন্নতা একই সঙ্গে প্রতিভাত হয়। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, আমেরিকান আর্টে formal ও cerebral-এর সমন্বয়ের ছড়াছড়ি কিন্তু সুব্রহ্মণ্যন্ তাঁর ভেতরে সম্পূর্ণ মৌলিক ভাষা যোগ করতে পেরেছেন। যে celebral ও formal-এর অভাবের জন্য বোনারের ছবিকে নিতে পারেননি পিকাসো। বোনারের প্রতি সেই তীব্র অনুরাগই হাইম্যানকে সুব্রহ্মণ্যনের ছবি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে হয়তো। এটা ঠিক যে, রং দিয়ে জমি তৈরি করা বা
grid-এর ধরন আনা যে আধুনিক ভিত্তি, সুব্রহ্মণ্যন্ শুরুই করেন তার অনেক দূর থেকে। তাঁর কারুকর্মটা অনেকাংশেই magical, যেন হঠাৎ ক্যালাইডোস্কোপের মতো ছবির উপাখ্যান হয়ে তা ধরা পড়ে। Glass Painting-কে এমনভাবেই কাজে লাগিয়েছেন সুব্রহ্মণ্যন্। সাধারণভাবে পশ্চিমের চিত্রকলায় তেমন কিছু ঘটেনি বলেই হাইম্যান বিচলিত হয়েছেন মনে হয়। অর্থপূর্ণ একটা ইচ্ছাগাড়ি চালিয়ে চলেন সুব্রহ্মণ্যন্। তাঁর ছবির গোয়ালপাড়া, স্মৃতিময়তা, eros একটা ব্যক্তিগত রূপকল্পের আকার নিয়ে নেয়। আবার নানান প্রসঙ্গিক ভাবনা যে তিনি ভাবেন তা তাঁকে এক ধরনের ‘scholar-painter’-এ পরিণত করে। ভারতবর্ষের মতো দেশে যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলিতে গুণমান এত মামুলি যে সেখানে তার গুরুত্ব অনেকটাই যেন যুক্তিনির্ভর, অতিরিক্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ ইউরোপে ‘Shaman artist’ জোসেফ বুইয়ের গুরুত্ব যেমন। এটা কোনো তুলনা করে বলা হচ্ছে না, যতটা বিষয়টার গুরুত্ব হিসেবে উল্লিখিত হলো।

সুব্রহ্মণ্যন্ একটা জাগতিক ‘panthenon’ নির্মাণ করেন পশু-পাখি, জাগতিক চিৎকার, হইচই দিয়ে তেমন জগতের সামান্য ওপর দিয়ে উড়ে বেড়ান পরীদের নিয়েও। এবং আধুনিক ঔপন্যাসিককে নিয়ে লিখতে গিয়ে ফ্রেডরিক জেমসন যেমন লেখেন, ‘What is culturally
interesting is that he has had to convey the great theme formally (since the waning of content is very precisely the subject)’. জেমসন তাঁর ১৯৪৮-এর প্রবন্ধ
Postmodern, or the cultural logic of late Capitalism’-এ আরো লিখেছেন, ‘The effacement of the older
(essentially high modernist) frontier between high culture and so-called mass or commercial culture.’ এই থেকে যার উৎপত্তি হচ্ছে তাকে জেমসন বলেছেন, ‘chaotic’. জেমসনের এই পুরোটা লজিকই মনে করা যেতে পারে সুব্রহ্মণ্যনের শিল্পকর্ম দেখে যেন নির্মিত। সুব্রহ্মণ্যন্ ভারতবর্ষে প্রথম সচেতনভাবে এই বাজার, লৌকিক, পট চিত্রকলায় সংবেদ, সংরাগ, যৌনতাকে ব্যক্তিগতে রূপান্তরিত করেন এবং এই প্রক্রিয়ায় তিনি অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, বিনোদ বিহারী থেকে সরে যান তাঁদের সম্পূর্ণ অস্বীকার না করে, যেমন করতে চেয়েছিলেন Progressive শিল্পীরা। অবনীন্দ্রনাথ যে ‘অভিজাত’ থেকে সরে যেতে পারেনি, এটা যে এক অর্থে আধুনিকতারও অভাব তা অবনীন্দ্রনাথের আলোচনায় সুব্রহ্মণ্যন্ করেছেন। উত্তর আধুনিকের নামে যে অগভীর চর্চা চলছে তা থেকে সুব্রহ্মণ্যন্ স্বতন্ত্র। তিনি অবলীলায় এই অগভীরতাকে যুক্ত করেন বাজার, কালীঘাটের ছবি ও তাঞ্জোর কাচের ছবির সঙ্গে। গীতা কাপুর যেমন নন্দলাল, বিনোদ বিহারীর মতো শান্তিনিকেতন শিল্পীদের সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘proto modern’ তাকেই হয়তো এগিয়ে নিয়ে একদিন বলা হবে সুব্রহ্মণ্যন্ হলেন ‘proto post-modern’. আবার তারই সঙ্গে শিবকুমারের ভঙ্গিতে লেখা যেতে পারে, সুব্রহ্মণ্যন্ হলেন ‘contextual post-modern’.

সুব্রহ্মণ্যনের গূঢ় বুনোটের ছবিগুলিতে যে উন্মাদ, ক্রন্দনরত, অসুখী, কামুক, পশুপাখি দেখা যায় তারা হয়তো পশু যুক্তি হারিয়ে ফেলা মানুষদের সঙ্গে ক্রমাগত লুকোচুরি খেলছে। মানুষ ও পরীরা সুব্রহ্মণ্যনের ছবিতে একটা তাৎক্ষণিক উচ্ছ্বাস নিয়ে থাকে কিন্তু সব মিলিয়ে ছবিগুলি হতাশা, ক্রোধ, উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ থেকে হঠাৎ আনন্দ, আলোকিত বন্ধুত্ব ইত্যাদির দিকে যেতে গিয়ে সব মিলিয়ে যায়। এই মরীচিকাকেই বর্তমান লেখক জেমসনের ভাষা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে চায়, ‘the waning of the content’ এই দিক থেকে সুব্রহ্মণ্যনের ছবির একটা দূরতর যোগ রয়েছে আমেরিকান আর্টে, বিশেষত লিচটেনস্টাইন, কার্টুন ইত্যাদির সঙ্গে। অর্থাৎ  যে formal আশ্চর্য রকমের বুদ্ধিদীপ্ত, মননশীল তা মহৎ শিল্পের আওতাতেই পড়ে। সুব্রহ্মণ্যনের ছবির পৃথিবী গভীরভাবে crazy এবং পরিবর্তনহীনভাবে বহুসংখ্যক। জীবিত ও অন্য বস্ত্তগুলির মাতলামিপনা এত ভিন্নতায় উপস্থিত যে, ছবিতে নানান মানবিক বিষয়, যেমন মানুষের আগ্রাসী মনোভাব, দ্বৈতসত্তা, যৌনসত্তা, যৌনতা একই সঙ্গে উপস্থিত ও অনুপস্থিত। প্রজ্বালক, উদ্দীপক, এমনকি উত্তেজক ছবিগুলির দ্ব্যর্থকতাবোধ অনুভূতিময়তা হিসেবে প্রতিভাত হয়। সাধারণত আমরা যতটা ভাবতে পারি জীবন যেন তার চেয়েও উন্মাদ, crazy তাঁর ছবিতে। সুব্রহ্মণ্যনের পরীরা আকাশে উড়ে বেড়ায়, তার কারণ তারা সেখানে উড়বার জন্য খালি জায়গা পেয়েছে যেন, অন্য কোনো দৈব কারণ তিনি সরাসরি উপস্থিত করেন না। বহু বাচনিকের লীলাক্ষেত্রের মতো ছবির বিস্তার ঘটে। তাই যাদের সেটা নানান পুলকিত উত্তেজনায় তলানিতে ঠেকেছে ঠিক তাদের জন্য নয় তাঁর ছবি। অপমানের, দুঃখের রাত্রিগুলি স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছেন তিনি কিন্তু তাকে এমন ডিজাইনে সাজিয়ে লুকোচুরি করে উপস্থিত করেন, যা কোনোভাবে প্রচার বা একবাচনিক বলে প্রতিভাত হয় না, তিনি মতবাদকে সার্বিক উপলব্ধিতে পরিণত করেন ছবির সূত্রে।

ইশারা হয়ে ওঠে তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত নির্মাণ। তিনি আমাদের বিশ্বাসকে নতুনতর করে নেবার সুযোগ করে দেন। তাঁর ছবি আমাদের ক্রমাগত সামনে ও পেছনে দেখতে সাহায্য করে, পূর্বনির্ধারিত ধারণা ও প্রত্যাশা বদলে দেয়। তাঁর ছবিতে ভাষ্যের ভিন্ন ভিন্ন ধরনের সমাহার থাকে এবং সামগ্রিকভাবে ভাষার অস্তিত্ব আছে বলে মানবিক অস্তিত্ব রয়ে গিয়েছে এমনই বিশ্বাস লক্ষ করি তাঁর কাজগুলিতে। সাধারণত গাম্ভীর্য
‘empathy’ ইত্যাদির বদলে এক ধরনের কৌতুক-মিশ্রিত রসবোধের অভিব্যক্তি ছবির ভাষায় নিয়ে আসেন তিনি, জীবনের প্রচলিত আকাঙ্ক্ষাগুলি নানান পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় ছবিতে। বিভিন্ন শিল্প উৎস ব্যবহার করে চিন্তার এক আকার তৈরির নিজস্ব পদ্ধতি তিনি নির্মাণ করেছেন, প্রায়শই আশ্চর্য রকমের বিনির্মাণ ঘটিয়ে। তিনি পরম্পরার ভেতর যে শৈল্পিক সংঘাত সৃষ্টি করে চলেছেন প্রায় তিরিশ বছর ধরে তা যতটা বিস্ময়কর, ততোধিক প্রাসঙ্গিক। 

Leave a Reply

*