logo

সাহিত্য থেকে মঞ্চে ও চলচ্চিত্রে সংযোজন ও পরিক্রমা

অং শু মা ন  ভৌ মি ক

চিদানন্দ দাশগুপ্তের লেখা একটি বই এককালে, মানে বছর বিশ-পঁচিশ আগে, কলকাতার ফিল্ম স্টাডিজের ক্লাসরুমে বা ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সগুলোতে বেদ-বাইবেল-কোরানের সমতুল খাতির পেত। বইটির নাম ছিল বই নয় ছবি। চিদানন্দবাবুর মোদ্দা কথাটা ছিল এই যে বাঙালিরা, বিশেষ করে কলকাতা আর তার আশপাশের বাঙালি যে সিনেমায় গেলে গোলগাল একটি গল্প খুঁজতে থাকেন আর শেষমেশ গল্পের ল্যাজামুড়ো মিলেজুলে না গেলে যারপরনাই উত্তেজিত হন, এই ব্যাপারটার মধ্যে গোড়ায় গলদ আছে। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি জেনে এসেছে বুঝে বুঝেছে যে সিনেমা মাত্রেই কোনো একটি গদ্যসাহিত্যের চলমান চিত্রমালা। কাহিনির কাছে কসম খেয়ে সে পয়দা হয়েছে। বইয়ের গর্ভে সে জন্মেছে। তাই সিনেমাও একটি ‘বই’। তাকে যতই ‘ছায়াছবি’ বা ‘চলচ্চিত্র’ বলা হোক না কেন এই সেদিনও কলকাতা দূরদর্শন ‘ফিচার ফিল্ম’কে বাংলায় ‘কাহিনিচিত্র’ বলত। অত গালভরা নাম তো মুখে মুখে ফেরে না। তাই ‘সিনেমা’ ইজ ইকুয়াল টু ‘বই’ – আম-আদমির কাছে তো বটেই, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছেও এটিই ছিল চালু রেওয়াজ। চিদানন্দবাবু এই রেওয়াজটি ভাঙতে চেয়েছিলেন। সিনেমা মোটেই গদ্যসাহিত্যের কাছে দাসখত লিখে দেয়নি। স্রেফ গল্প বলা তার কাজ নয়। এই কথাটি তিনি হামেশাই বলতেন। এবং ‘বই’ নয়, এই নবীনতর শিল্প মাধ্যমটিকে ডাকনামে ‘ছবি’ বলাই শ্রেয়। এই ছিল তাঁর মোদ্দা কথা।

বাংলা সিনেমার গোড়ার দিনগুলিতে গদ্যসাহিত্য তো বটেই, তুলনায় প্রাচীনতর পৌরাণিক সাহিত্যের ওপর সে এতই নির্ভরশীল ছিল যে, চিদানন্দবাবু ও তাঁর প্রজন্মের ফিল্ম ক্রিটিকদের দায়িত্ব ছিল ‘বই’ আর ‘ছবি’র আলাদা প্রকাশভঙ্গি ও নান্দনিক গুণাবলিকে চিহ্নিত করে সচেতন দর্শক গড়ে তোলা। তাঁর প্রজন্মের চলচ্চিত্রকারেরা ক্রমাগত সাহিত্যাশ্রয়ী ছবি করে চলায় ব্যাপারটি যে সহজ হয়েছিল এমন নয়। বিমল রায়, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক কুমার ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিংহ থেকে শুরু করে অজয় কর, তরুণ মজুমদার, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, ঋতুপর্ণ ঘোষ সকলেই সাহিত্যের কাছে ঋণী থেকেছেন। কাজেই এখনো কলকাতায় সিনেমাকে ‘বই’ বলার লোকের অভাব নেই।

থিয়েটারকেও কেউ কেউ ‘বই’ বলে থাকেন। তবে সংখ্যাটি একেবারেই নগণ্য। সত্যি বলতে কি, সিনেমা হামেশাই থিয়েটারের কাছে হাত পেতেছে। এখনো পাতে। মাঝেসাঝে এই দুই শিল্প মাধ্যমের মধ্যে প্রযুক্তি ও প্রকৌশলের লেনদেনও ঘটে। কিন্তু এখনো সিনেমা থিয়েটারের কাছে যতটা অধমর্ণ, থিয়েটার সিনেমার কাছে ততটাই উত্তমর্ণ। দুয়ের মধ্যে আসল তফাত তার উপস্থাপনে। থিয়েটার একটি লাইফ আর্ট ফর্ম। জলজ্যান্ত শিল্পমাধ্যম। সাহেবি বুলিতে যাকে বলতে পারি পারফরম্যান্স। সে রোজ বাঁচে, রোজ মরে। আজ সন্ধেয় এই মঞ্চে ঢাকার নামি নাট্যদল থিয়েটার আর্ট ইউনিটের আমিনা সুন্দরী হবে। আমি একাধিকবার এটি দেখেছি। সব কটি দেখার মধ্যে তফাত আছে। এই তফাত মূলত উপস্থাপনগত।

আরেকটি জরুরি কথা আছে। নাটক বলতে আমরা যদি প্লে-স্ক্রিপ্ট বুঝি, তবে সেটি বরাবরই সাহিত্যের পদবাচ্য। প্রাচীন গ্রিসের কথা ধরুন। প্লেটোর রিপাবলিকে কবিদের কোনো জায়গা নেই। আবার অ্যারিস্টটলের পোয়েটিকসে ট্র্যাজেডি, যা আদতে নাটক, সেটিই হচ্ছে সাহিত্যের পরাকাষ্ঠা। আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে এমন নয়। বৈদিক সাহিত্যে সে উচ্চকুলীন নয়। তবে একথা আপনারা সকলেই জানেন যে, নাট্যকে ‘পঞ্চম বেদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর ভরত মুনির সংকলন করা দুহাজার বছরের পুরনো বই নাট্যশাস্ত্রর কথা যদি ধরি তবে তো কথাই নেই। দেব আর অসুরকুলের আবহমান লড়াইয়ে ব্রহ্মার তুরুপের তাস হয়ে উঠেছিল নাট্যক্রিয়া। এই নাট্যকে হাতিয়ার করেই শেষ রাতে ওস্তাদের মার মেরেছিলেন দেবতাকুল।

কাজেই দুটি কথা আমাদের স্বতঃসিদ্ধ ধরতে হবে। এক. মঞ্চ মোটেই সাহিত্য থেকে পৃথগন্ন নয়। ওরাল ট্র্যাডিশনে তো এই দুটি অঙ্গাঙ্গি থেকেছে। ‘বই’ হয়ে আগে থেকেই তাদের দোস্তালি পাতানো আছে। দুই. গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধের পঙ্ক্তিতে নাটককে ঠাঁই দেওয়ার যে রীতি, সেটি একেবারে হালফিলের। বাংলার বেলায় তো বটেই।

তাই বলে কি মঞ্চ কখনো গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধের কাছে হাত পাতেনি? পেতেছে বইকি! ইদানীংকালে এর ভূরি ভূরি দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। আমরা সেই আলোচনাতেই থাকব। এবং বাংলাতেই। অর্থাৎ সমকালীন থিয়েটার কীভাবে বাংলা গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধের কাছে হাত পেতেছে এবং পাততে গিয়ে কী কী পন্থা অবলম্বন করেছে তার হদিস নেব। সমকালীন থিয়েটার বলতে আমি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের হালফিলের নাট্যচর্চার হরেকরকম দিগন্তের কথা বলতে চাইব।

গেল পরশু দিন এই সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চেই একটি নাট্যানুষ্ঠান হয়েছে। মণিপুরি থিয়েটারের পরিবেশনায় কহে বীরাঙ্গনা। না, এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত নয়। শুভাশিস সিন্হা নির্দেশিত এই নাট্যের আধার মাইকেল মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্য।

মধুসূদন কী করেছিলেন আপনাদের অনেকের মনে থাকতে পারে। রোমান এপিসলের আঙ্গিকে উনি পত্রসাহিত্য রচনা করেছিলেন। যে অমিত্রাক্ষর ছন্দে উনি মেঘনাদবধ কাব্য লিখেছিলেন, বীরাঙ্গনা কাব্য তাতেই রচিত হয়েছিল। শোনা যায়, উনি যুগপৎ দুটি কাব্যই মুখে মুখে বলে যেতেন। যাকে বলে ডিকটেশন দিতেন। আর তাঁর বৈঠকখানায় বসে শ্রম্নতলিপি প্রস্ত্তত করতেন কয়েকজন প–ত। এই মেঘনাদবধ কাব্য প্রসেনিয়াম থিয়েটারে এসেছে অনেক পরে। ১৯৯৫ সালে। নান্দীকার ও গৌতম হালদারের সৌজন্যে। তবে এই আধার থেকে যাত্রা হয়েছে অনেক। আমাদের চিতপুর পাড়ায় মোহন অপেরা বলে একটি যাত্রা কোম্পানি ছিল। তার প্রোপ্রাইটর ছিলেন বসিরহাটের মানুষ মোহন চট্টোপাধ্যায়। চল্লিশ বছর আগে, মানে এই ধরুন ১৯৭০-এর দশকজুড়ে মোহনবাবুর নির্দেশনায় মেঘনাদবধ কাব্য গ্রামবাংলায় হইহই করে মঞ্চস্থ হতো। বস্ন্যাংক ভার্সেই হতো। তখনো পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের যাত্রায় পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক পালার চল ছিল বেশি। সামাজিক পালা জাঁকিয়ে বসেনি। আমি সেই যাত্রা দেখিনি। তবে শুনেছি। লং প্লেয়িং রেকর্ডে তার একটি সম্পাদিত রূপ এখনো সংরক্ষিত আছে। শুনলে অবাক হবেন যে, এখনো উত্তর ও দক্ষিণ চবিবশ পরগনায় এমন কিছু প্রবীণ আছেন, যাঁরা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মেঘনাদবধ কাব্য অভিনয় করেন। তার কিছু কিছু দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। নান্দীকারের সেই মাইলস্টোন প্রডাকশন এখনো মঞ্চায়িত হয়। গৌতম হালদার নিজে একটি দল গড়েছেন, নয়ে নাটুয়া নামে। তাঁরা করেন। নান্দীকারের একসময় বেইলি রোড পাড়ায় যাতায়াত ছিল। তখন এটি মঞ্চায়িতও হয়েছে। আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ সেটি দেখেও থাকবেন। সাকল্যে আড়াই ঘণ্টার প্রযোজনা। মেঘনাদবধ কাব্যকে সমগ্রতায় ধরার জন্যে চেষ্টার কসুর করেন না গৌতম। কোনো সর্গ বা ক্যান্টো বাদ পড়ে না। একটু কেটেছেঁটে নিতে হয় এই যা! গৌতম একক অভিনয় করেন। খালি গায়ে। ধুতি পরে। কথকতার আঙ্গিকে। একটি সাদা চাদর থাকে তাঁর সঙ্গে। সেটিকে যে কত রকমভাবে ব্যবহার করেন গৌতম তা বলে শেষ করা যাবে না। কখনো গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বাগদেবীকে আবাহন করেন। কখনো সেটি দিয়ে আড়াল তৈরি করে মায়াদেবী হয়ে ওঠেন। কখনো সেটিকে শূন্যে ছুড়ে দিয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর ব্যঞ্জনা তৈরি করেন। অর্থাৎ কেবল বচননির্ভর না থেকে আঙ্গিক, বাচিক, সাত্ত্বিক অভিনয়ের একটি সনাতন কাঠামোকে পুনর্নির্মাণ করেন গৌতম। আহার্য তার অনিবার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। এরই সঙ্গে জুড়ে যায় জুড়ির দল। জুড়ে যায় মঞ্চস্থাপত্য। আলোকসম্পাত। কাব্য থেকে নাট্য হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি বেশ ঘটনাবহুল হয়ে ওঠে। মধুসূদন চেয়েছিলেন রাম আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ যে মোটেই ধৌত তুলসীপত্র ছিলেন না, বরঞ্চ আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদের প্রতিভূ ছিলেন, সেটিকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে। পাশাপাশি রাবণের দশ মাথায় যে শয়তানি গিজগিজ করত না, তার মধ্যেও যে সদ্গুণের আধার ছিল সেইটিকে সামনে আনতে চেয়েছিলেন মধুসূদন। ১৯৯৫ সালের পুজোর মরসুমে নান্দীকার যখন এটি প্রথম মঞ্চায়ন করে, কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে তখন ভারতজুড়ে নব্য হিন্দুত্ববাদের শেকড় চারিয়ে গেছে। লালকৃষ্ণ আদবানি তাঁর সেই গেমচেঞ্জিং ‘রথযাত্রা’ প্রায় সম্পন্ন করেছেন। বাবরি মসজিদ ধুলোয় মিশে গেছে। সারা উপমহাদেশের মনোজগতে একটি বিকার জাঁকিয়ে বসেছে। এই পরিস্থিতিতে রামলালাকে মাথায় তুলে নৃত্য না করে এরিয়ান আর দ্রাবিড় সিভিলাইজেশনের সংঘাতবিন্দুতে মেঘনাদবধ কাব্যকে পুনঃস্থাপন করেছিল নান্দীকার। কলকাতা ও ঢাকা এটিকে বরণ করে নিয়েছিল।

আমাদের মধ্যেই আছেন শাঁওলী মিত্র। তাঁর রচনা নাথবতী অনাথবৎ একাধারে নাটক ও নাট্য। সেটি যেমন আনন্দ পুরস্কারের মতো সারস্বত সম্মানে বন্দিত হয়েছে, তেমনি প্রায় তিরিশ বছর ধরে মঞ্চস্থও হয়েছে। সেখানেও কথকতার আঙ্গিক ছিল। শাঁওলীদি এ নিয়ে অনেক বলেছেন, অনেক লিখেছেন। লেকচার ডেমস্ট্রেশনও দিয়েছেন। তাঁর সামনে এ নিয়ে পাঁচকথা বলি এমন বুকের পাটা আমার নেই।

বরঞ্চ ফিরে আসি কহে বীরাঙ্গনার কথায়। মধুসূদনের কাব্যে বেশ কয়েকটি পত্র ছিল। তার মধ্যে মহাভারত-প্রাণিত চারটিকে এক ঘণ্টার সম্পুটে ধারণ করেছে মণিপুরি থিয়েটার। দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা, জয়দ্রথের প্রতি দুঃশলা, অর্জুর্নের প্রতি দ্রৌপদী এবং নীলধ্বজের প্রতি জনা। এটিও একক অভিনয়। জ্যোতি সিন্হার। তবে উপস্থাপনায়, বিশেষ করে তাঁর সংগীত প্রয়োগে একটি স্বাতন্ত্র্য আছে। অভিনয় শুরুর ঢের আগে থেকেই মঞ্চের ওপর হারমোনিয়াম বাজিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে, খোল-করতাল বাজিয়ে রসিকমনে কৌতূহলের সঞ্চার করা হচ্ছে। ওপেন কার্টেন প্রডাকশন। ফলে ডিপ সেন্টার স্টেজে একটি বেদি দেখা যাচ্ছে। আরো দুটি বেদি আছে ডাউনস্টেজে। বাঁ দিকে একটি। ডান দিকে একটি। স্টেজের ওপর বার থেকে ঝুলছে বেশ কয়েকটি দড়ি। আলো পড়তেই মঞ্চটি ঘিরে একটি ধ্রম্নপদী কল্পবাস্তব রচনা করতে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে না। জ্যোতি হালফিলের পোশাক না পরে মঞ্চে আসছেন না। চারটি চরিত্রের জন্যে চারটি আলাদা আলাদা পোশাক পরছেন। মঞ্চজুড়ে অমিত্রাক্ষর বলছেন। সূত্রধারের কথাটি সেরে নিয়েই চরিত্রে ঢুকে পড়ছেন। আর শুভাশিস সিন্হা জ্যোতিকে একা মঞ্চে রাখেননি। তিন-চারজন সহ-অভিনেত্রীকে মাঝে মাঝে মঞ্চে দেখতে পাচ্ছি। মুখ নয়, কথা বলছে তাঁদের শরীর। কখনো তাঁরা অনসূয়া-প্রিয়ংবদা হয়ে শকুন্তলার সঙ্গে হাসিখেলা করছেন। কখনো অন্য একটি লাইট জোনে কন্বের তপোবনে দুষ্মন্তের সঙ্গে শকুন্তলার গান্ধর্ব বিবাহের মূকাভিনয় করছেন, পরমুহূর্তেই আরেকটি লাইট জোনে তাঁদের ফুলশয্যা রচনা হচ্ছে। অর্থাৎ শকুন্তলার স্মৃতিচারণকে মূর্ত করে তোলার জন্য নির্দেশক কিছু দ্যোতক নাট্যমুহূর্ত রচনা করে দিচ্ছেন। আমাদের কল্পনার ওপর আস্থা নেই বলে এমনটি করছেন তা বোধ করি নয়। ভিন্ন ভিন্ন রসানুভূতিতে সহায়কই হচ্ছে এইসব অণুনাট্যায়ন। কহে বীরাঙ্গনার একেবারে শেষে নীলধ্বজের পত্নী জনাকে নদীর জলে আত্মাহুতি দিতে দেখছি। কীভাবে? না, ওই চার সহ-অভিনেত্রী একটি সাদা কাপড় এনে সেন্টার স্টেজ ঢেকে ফেলছেন। তার ওপর নীল আলো এসে পড়তেই তরঙ্গায়িত নদীর একটি দৃশ্যরূপ নির্মাণ হচ্ছে। ওই সাদা কাপড়ের মাঝখানে গোল করে কাটা। সুকৌশলে নিচ দিয়ে তার ভেতরে মাথা গলিয়ে দিচ্ছেন জনারূপী জ্যোতি। গলিয়ে দিচ্ছেন দুটি হাত। যেন গঙ্গার তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে স্বামীর উদ্দেশে শেষ অভিমানটি নিবেদন করছেন তিনি। তারপর মিলিয়ে যাচ্ছেন। একটি হাত খানিক উঠে ডুবে যাচ্ছে যখন আমাদের মনে তখন করুণ রসের বান ডেকেছে।

মণিপুরি থিয়েটারের আরো দুটি নাট্য এই সংযোগে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। একটি বড়ু চণ্ডীদাস আধারিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। অন্যটি রবীন্দ্রনাথ আধারিত দেবতার গ্রাস।

কালকের সভায় অনেকের মুখেই শহীদুল জহিরের নাম শুনেছি। তাঁর একটি বহুল চর্চিত উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিল আমাদের অনেকেরই পড়া। বাংলা গদ্যসাহিত্যে জাদুবাস্তবতার এমন বয়ান তো বিরল! তা আরশীনগর নাট্যদল আর নির্দেশক রেজা আরিফের যুগলবন্দিতে এই কয়েক বছর আগেই এর একটি চমৎকার মঞ্চায়ন হয়েছে। জাতীয় শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটারে এর একটি অভিনয় এখনো চোখের সামনে ভাসছে। কারণ তার দৃশ্য নির্মাণের সৌকর্য। আবছা আলোয় ঢাকা আছে মঞ্চ। দেখতে পাচ্ছি আড়াআড়ি করে রাখা নৌকোর গলুই হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ নৈশজীবনের বাতিঘর। ঝুলে থাকা এক ফালি কাপড়ে ভর দিয়ে উড়াল দিচ্ছে মানুষ। আটপৌরে জীবনের এমন আশ্চর্য মঞ্চায়ন করতে গিয়ে উপন্যাসটিকে হুবহু অনুসরণ করেননি নির্দেশক। জোর দিয়েছেন দৃশ্যরূপে। যে বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যের অভিজ্ঞান হয়ে উঠেছে তারও সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। কথন আর সংলাপ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মঞ্চে।

বর্ণনাত্মক রীতির কথা বলব আর ঢাকা থিয়েটারের কথা উঠবে না তা তো হয় না। নটী বিনোদিনীর আত্মকথা আমার জীবনের কথা আপনারা সবাই জানেন। সেটিকে আধার করে একটি পূর্ণাঙ্গ একক অভিনয় করতেন শিমূল ইউসুফ। আমাদের সাইমন জাকারিয়া করেছিলেন কি, বিনোদিনীর মূল রচনার প্রসাদগুণকে অক্ষুণ্ণ রেখে টেক্সটটিকে একটু এডিট করেছিলেন মাত্র। উত্তমপুরুষে লেখা গদ্য কণ্ঠে ও শরীরে ধারণ করেছিলেন শিমূল। নির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফ মঞ্চজুড়ে বিনোদিনীর উত্তর কলকাতার বাড়ির অন্দরমহলের একটি অবয়ব ছকে দিয়েছিলেন। আলোর প্রয়োগে বিনোদিনীর জীবনের নানান অধ্যায় নানান বর্ণবিভায় রঞ্জিত হয়েছিল। কিছু প্রপসও ছিল হাতের নাগালে। স্বকৃত অভিনয়ের কিছু নমুনাও উপস্থাপনা করেছিলেন বিনোদিনী ওরফে শিমূল। নেপথ্য সংগীত তাঁর সহায় হয়েছিল। স্মৃতিকথাটি বেরিয়েছিল আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে। এগারো বছর আগে ঢাকা থিয়েটারের বিনোদিনী প্রথম দেখি। সেই সময় আর এই সময়ের তফাত কল্পনা দিয়ে মুছে দেওয়া গিয়েছিল।

কদিন আগেই হরিশংকর জলদাসের জলপুত্র মঞ্চায়িত হয়েছে। এই সিলেটের কবি ও নাটককার রুমা মোদক উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিয়েছেন। নিম্নবর্গীয় জনজীবন ক্রমশ বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উৎসমুখ হয়ে উঠছে। বাংলা মঞ্চ তাকে মর্যাদা দিতে শুরু করেছে। কলকাতাতেও। ঢাকাতেও। দেবেশ রায়ের তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত থেকে সুমন মুখোপাধ্যায়ের নাট্যনির্মাণ (প্রযোজনা চেতনা) আমাদের প্রজন্মের কাছে একটি শস্নাঘনীয় অভিজ্ঞতা। নবারুণ ভট্টাচার্যের কথাসাহিত্যও বেশ কয়েকবার মঞ্চায়িত হয়েছে। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে, কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল থেকে রসদ জোগাড় করে বহুরূপী একটি উল্লেখযোগ্য নাট্য নির্মাণ করেছিল বছর পনেরো আগে। নাটককার রুদ্রপ্রসাদ চক্রবর্তী এর নাম দিয়েছিলেন ফুলস্নকেতুর পালা। নির্দেশনা দেন কুমার রায়। মঙ্গলকাব্যকে আধার করে একটি মহানাট্য রচনা করেছিলেন শম্ভু মিত্র। চাঁদ বণিকের পালা। সেটি সেভাবে মঞ্চস্থ হয়নি। হলে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক বাংলা নাট্যের টানাপড়েন কোনো নয়া নাট্যের দিগন্ত খুলতে পারে তার একটি স্পষ্ট দিশা পেতে পারতাম। খানিকটা পেয়েছি বিভাস চক্রবর্তীর সৌজন্যে। মৈমনসিং গীতিকাকে আধার করে তাঁর দল অন্য থিয়েটার যে চমৎকার প্রযোজনা করেছিল তার স্মৃতি ঢাকাই থিয়েটারওয়ালাদের মধ্যে এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান। এখন তো ঢাকায় গীতিকা আধারিত আধুনিক নাট্য নির্মাণের ঢল নেমেছে। সাহেবি কেতার প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ঘেরাটোপ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাকি রেখেছে খালি!

কলকাতা তো বটেই, বলা ভালো পশ্চিমবঙ্গের ঘাড়ে এখনো কর্তার ভূত আঁট হয়ে চেপে আছে। একদিকে নাট্যদলের সংখ্যা রোজ রোজ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। অন্যদিকে ঘোরতর সংকট আছে মৌলিক নাটকের। ফলে কথাসাহিত্যের কাছে মাথা নুইয়ে ভিক্ষা করাই এখন দস্ত্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অরুণ মুখোপাধ্যায়, অশোক মুখোপাধ্যায়, হরিমাধব মুখোপাধ্যায়, ঊষা গাঙ্গুলির মতো প্রবীণ নাট্যজন অহরহ কথাসাহিত্যের দ্বারস্থ হচ্ছেন। নবীনদের কথা তো বলাই বাহুল্য!

কাকতালীয় হলেও একথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে, এই মুহূর্তে যে চারটি নাট্য প্রযোজনা নিয়ে কলকাতা বেশ কলার তুলে দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়াতে পারে তার সব কটিই উপন্যাসের নাট্যরূপ। গত দেড় বছরের মধ্যে এগুলো একে একে মঞ্চস্থ হয়েছে। এখনো হয়ে চলেছে। সব স্তরের রসিকদের সমাদর পাচ্ছে।

জীবনানন্দ দাশের কারুবাসনা থেকে একটি আশ্চর্য নাট্যায়ন প্রস্ত্তত করেছেন অর্পিতা ঘোষ। প্রযোজনা করেছে পঞ্চম বৈদিক। বরিশালের আধা-গ্রামীণ আধা-শহুরে পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে কলকাতার সঙ্গে এক অসম বোঝাপড়ার বীজ বোনা ছিল। এক সংবেদনশীল তরুণ কবির অচরিতার্থতার অনেকগুলি পরত ছিল জীবনানন্দের লেখায়। অর্পিতার নাট্যরূপে সেই পরত একে একে ধরা পড়েছে। বাস্তব আর পরাবাস্তবের বুনোটে এর দৃশ্যকাব্য রচনা করেছেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। নাট্য শুরুই হয়েছে দ্বিধাবিভক্ত নায়কের দ্বৈত কণ্ঠে জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতার প্রথমাংশের আবৃত্তি দিয়ে। কবিতা এসেছে বারে বারে। কখনো ওই স্পিস্নট পার্সোনালিটির অন্তর্গত আকাঙক্ষার উচ্চারণ হয়ে। কখনো এই সময়ের কবি জয় গোস্বামীর নিজের গলায় জীবনানন্দের উচ্চারণের মাধ্যমে। ১৯২০-এর দশক আর ২০১০-এর দশকের যাতায়াত ঘটে চলেছে অনেকগুলি স্তরে। এমন নিবিড় নাট্য আমাদের অভিজ্ঞতায় সচরাচর ধরা পড়ে না।

সমরেশ বসুর শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে উপন্যাসে পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী রাজনীতির বিচ্যুতিবিন্দুগুলি খচিত ছিল। রচনার প্রায় তিন দশক পরে সেটিকে মঞ্চে এনেছে রঙ্গলোক বলে উত্তর কলকাতার একটি দল। তীর্থঙ্কর চন্দ এর নাট্যরূপ দিতে গিয়ে মধ্য ১৯৮০-র বাস্তবতাকে একটু এগিয়ে এনেছেন। ফলে ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে বামপন্থীদের পর্যুদস্ত হওয়ার অবশ্যম্ভাবিতাই যেন ফেটে বেরিয়েছে এই নাট্যে। এমনিতে একজন সত্যিকারের মজদুর কীভাবে কমিউনিস্ট নেতা হয়ে উঠলেন এবং ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর থেকে পার্টির ক্রমশ বদলে যাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না-পারা সেই ট্রেড ইউনিয়ন নেতার কীভাবে একটি অমোচনীয় দূরত্ব তৈরি হলো সেই কথাটি বলতে চেয়েছিল সমরেশের উপন্যাস। নির্দেশক শ্যামল চক্রবর্তী সেটিকে একটি ঐতিহাসিক দলিলে রূপান্তরিত করেছেন। প্রায় অর্ধ শতকব্যাপী কমিউনিস্ট মুভমেন্টের ধারাবিবরণী হয়ে উঠেছে সেটি। অথচ নাট্যগুণে ঘাটতি পড়েনি কোথাও। বরঞ্চ ‘ইন্টারন্যাশনাল’ সমেত গণসংগীতের বর্ণাঢ্য প্রয়োগ আমাদের বোধের দরজায় একটু বেশি বেশি করে কড়া নেড়ে গেছে। এখনো যাচ্ছে।

উত্তর কলকাতার পাটোয়ারি থিয়েটার আর দক্ষিণ কলকাতার বায়োয়ারি থিয়েটারের মাঝখানে পড়ে গিয়েছিলেন অসীম চক্রবর্তী নামে একজন ক্ষমতাবান নট ও নাট্যকার। তাঁর জীবনকে আধার করে অদ্য শেষ রজনী বলে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। প্রায় তিরিশ বছর আগে। গেল বছর একুশে ফেব্রুয়ারি সেটিকে মঞ্চে এনেছে পাইকপাড়ার ইন্দ্ররঙ্গ বলে একটি নাট্যদল। নাট্যরূপ দিয়েছেন উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় আর নির্দেশনা দিয়েছেন ব্রাত্য বসু। এক কথায় এটি একজন নাট্যজনের বায়োপিক। একজন বিস্মৃতপ্রায় ট্র্যাজিক থিয়েটার হিরোর পুনরুজ্জীবন। ব্রাত্য করেছেন কি, উপন্যাসের চোরা বয়ানে গুঁজে রাখা অসংখ্য নাট্যমুহূর্তের পুনর্নির্মাণ করেছেন এই অদ্য শেষ রজনীতে। ফলে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে কলকাতার নাটমহলে সৃজনশীলতার যে বিপুল বিস্ফোরণ ঘটেছিল তারও সঞ্জীবন ঘটেছে। একটি অবিস্মরণীয় কালখ–র প্রতীক হয়ে উঠেছে অদ্য শেষ রজনী। আগামী মার্চ মাসে এটি বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি শহরে অভিনীত হবে। আমাদের কথা আপনারা মিলিয়ে নিতে পারবেন।

তবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক নাট্যের মরা খাতে জল এনেছে কোজাগরী। এটি হাওয়ার্ড ফাস্টের একটি উপন্যাস সাইলাস টিম্বারম্যানের বঙ্গীয় রূপান্তর। একজন বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক, যিনি কলেজে রবীন্দ্রনাথ পড়ান, প্রকৃতির লুণ্ঠন নিয়ে রবীন্দ্রদর্শনকে মনে মনে মান দেন, সেই অধ্যাপক যখন দেখলেন তাঁদের কলেজ প্রাঙ্গণের ভেতরকার একটি পুরনো শালবন আইনকানুনকে কলা দেখিয়ে বিকিয়ে যাচ্ছে আর তাতে মদদ দিচ্ছেন কলেজের গভর্নিং বডির মাতববর, যাদের টিকি বাঁধা আছে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কায়েমি স্বার্থের কাছে, তখন তিনি একটু একটু মাথা তুলে দাঁড়ালেন। তাঁকে প্রাণে মারার চেষ্টা হলো। তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা হলো। তাঁর একমাত্র কন্যাকে অশস্নীল আক্রমণ করা হলো। তবু তিনি কতক ইবসেনের ডক্টর স্টকম্যানের মতো অটল থাকলেন। তাঁর পাশে থাকলেন কয়েকজন সহ-অধ্যাপক, যাঁরা এখনো শিরদাঁড়া বিকিয়ে দেননি। কয়েকজন ছাত্র, যাঁরা এখনো ক্ষমতার আস্ফালনকে তুড়ি মেরে ওড়াতে পারেন। আর রইলেন রবীন্দ্রনাথ, যিনি ওই অধ্যাপকের জীবনদেবতা। আমাদের রাজ্যে সিভিল সোসাইটি মুভমেন্ট প্রায় ধুঁকছে। এমন সমকালস্পর্শী নাট্য তাদেরকে প্রেরণা দিচ্ছে। যে সততা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শপথ নিয়ে গ্রম্নপ থিয়েটার পথচলা শুরু করেছিল সেই দর্শনের গভীরতা স্পর্শ করছে কৌশিক চট্টোপাধ্যায় রূপান্তরিত ও বেলঘড়িয়া অভিমুখ নির্দেশিত এই নাট্য, যার নামটিও তীব্রভাবে সাংকেতিক। কোজাগরী।

গোড়ার কথা ফিরি। ‘সাহিত্য থেকে মঞ্চে’ আসতে গেলে কী কী সংযোজন ঘটে, কোন নান্দনিক পরিক্রমা ঘটে চলে আমাদের আলোচনা এই কথাটিই শুনতে চেয়েছিল, বুঝতে চেয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই যে, সাহিত্যকে সমিধ করে সাম্প্রতিক নাট্য নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারছে। আমাদের বহুধাবিভক্ত উত্তর-আধুনিক সত্তা নিজেকে রঙ্গমঞ্চে ব্যক্ত করতে পারছে। সাহিত্যের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জীবনের আভাস ছিল সেটিকে পূর্ণাবয়ব করে রসিকজনের কাছে তো বটেই, জনগণের কাছেও উপস্থাপন করতে পারছে। একক পাঠকের দরবার থেকে সাহিত্যকে সামাজিক বাস্তবতার চলমান বয়ান করে তুলতে নাট্যের প্রতিদ্বন্দ্বী একমাত্র চলচ্চিত্র।

সে প্রসঙ্গ পরে কখনো অবতারণা করা যাবে। n

 

সিলেট, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

 

 

লেখক : নাট্যসমালোচক ও গবেষক, কলকাতা, ভারত

 

Leave a Reply

*