logo

সাহিত্য থেকে নাটক বা চলচ্চিত্র

শাঁ ও লী  মি ত্র

সাহিত্য বলতে নাটকটিকে কি ‘সাহিত্য’ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে? এই কথাটি পরিষ্কার হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি করা হয় তাহলে তার বিষয়-বর্ণনা একরকম হবে, আর তা না হলে বলবার কথাটি সম্পূর্ণ বদলে যাবে। সেই সংশয় নিয়েই শুরু করা যাক। তবে যেভাবে বিষয়টিকে বক্তার কাছে উপস্থাপিত করা হয়েছে, বক্তব্য পেশ করবার অনুরোধে তাতে এ বক্তার ধারণা হয়েছে নাটকটিকে ‘সাহিত্য’ হিসেবে আয়োজক সংস্থা তত গুরুত্ব দিতে নারাজ। অথচ বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিক অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটককার ছিলেন। নাট্যকারও বটে। নিজের রচিত নাটকের নাট্যরূপ দর্শককে প্রত্যক্ষ করিয়েছেন তিনিই।

রবীন্দ্রনাথের কথা অবশ্য ‘বিশেষ’। প্রকৃতির এমন সৃষ্টি তো সহসা হয় না। কবিতা, গীতিরচনা, সুরকার, নাটক এবং নাট্যকার, অভিনেতা। আবার গল্পকার, প্রবন্ধকার, ঔপন্যাসিক – এই সমস্ত পরিচয়েই তিনি অনন্য।

কিন্তু সমসময়ের দ্বিজেন্দ্রলাল রায়? তিনিও নাটক লিখেছেন। গীতিকার হিসেবে তাঁর যেমন খ্যাতি, একই রকম খ্যাতি নাটককার হিসেবেও। তাঁর বহু নাটক বহুদিন ধরে অভিনীত হয়েছে। যদি গিরিশচন্দ্র ঘোষের কথা মনে করি? ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ মশায়ের কথা ভাবি? দীনবন্ধু মিত্র? বা মীর মশাররফ হোসেন?

আমি কিঞ্চিৎ পূর্বের যুগের কথাই বলতে চাইছি। এ যুগের নাটক নিয়ে বলা হয়তো পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে যাবে, একদেশদর্শিতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়াও অসম্ভব নয়। তা সমীচীন হবে বলে বোধ হয় না। তাই আগের যুগের উদাহরণ সহযোগে বক্তব্য পেশ করাই ঠিক বলে মনে করি।

বিশেষ করে যদি রবীন্দ্রনাথকে আলোচনা করা যায়, তবে ‘নাটক’ বা ‘উপন্যাস’ বা ‘গল্প’ থেকে নাট্য বা চলচ্চিত্র নির্মাণের বহু উদাহরণ পাওয়া যাবে। আর যেহেতু আমার পরিসরে আমি রবীন্দ্রনাথের নাটকে অভিনয় করেছি, তাঁর ক্ষুদ্র গদ্যনাটিকা চালিকা নাট্যে রূপায়িত করেছি সেহেতু এই পরিশ্রমটি আমার জানা। তবে নিজের কথা নিজে বলা যায় না। এখানে যদি আমার পূর্বসূরিদের কথা নিয়ে সামান্য আলোচনা করি তাহলে বোধহয় অন্যায় হবে না। আর বিষয়টির উদাহরণ রবীন্দ্রনাথে সীমাবদ্ধ রাখলে আমার কিঞ্চিৎ সুবিধা হয়। তাই রবীন্দ্রনাথের রচনাই থাক আজকের আলোচনার বিষয়।

 

 

আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রথমে দু-একটি কথা বলব। প্রথমে বলি রাজা নাটকটির কথা। নাটক থেকে নাট্যাভিনয়ের উপযুক্ত করে তোলা। যা প্রধানত নির্দেশকের দায়িত্ব। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের নাটকে নাটককার কোনো নির্দেশনা প্রায় দেন না। তখন চরিত্রের সংলাপ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সেই চরিত্রের তাকানো, চলা,ওঠা-বসা, ভ্রূ-ভঙ্গিমা, চরিত্রকে প্রেক্ষকের সামনে জীবন্ত করে তোলে। তাই অভিনেতা এবং নির্দেশককে সংলাপের মধ্যে থেকে নাটককারের ইঙ্গিত খুঁজে বার করে নিতে হয়। যেমন, সুরঙ্গমা কেমন করে তাকায়? তার দৃষ্টি কেমন? আর সুদর্শনাই বা কেমন করে রাজাকে অনুভব করবার চেষ্টা করে? এমন করে সব চরিত্রের কথাই বলা যায়। এমনকি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চরিত্রগুলিও যেভাবে রবীন্দ্রনাথ পরিস্ফুট করেছেন তা বিশ্লেষণ করে মঞ্চে ফুটিয়ে তুলবার দায়িত্ব আমাদের। অর্থাৎ অভিনেতৃবর্গের।

আবার নির্দেশকের মূল কাজ, আমার দৃষ্টিতে, নাটকের সম্পাদনা। নাটকটির অভিমুখ কী, কী তার বক্তব্য, সেই অনুসারে যুক্তি-অনুসরণে নাটকটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। অনেক সময়ে এমন হতেই পারে – নাটকে রচয়িতাকে অনেক কথা বলতে হয়েছে – কারণ তিনি তো বুঝতে পারছেন না স্বল্প কথায় সেই চরিত্রের রূপটি তাঁর অভিপ্রায় অনুসারে প্রকাশ পাচ্ছে কি না! কিন্তু নাট্যে যখন সেই চরিত্রগুলি বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে ‘মানুষ’ হয়ে দর্শকের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে – তখন সে তার হাত-পা নাড়া, হাঁটবার ভঙ্গি, সর্বোপরি তার মুখম-লের প্রতিটি প্রত্যঙ্গের ভঙ্গি দিয়ে সংলাপ উচ্চারণ করছে। অনেক সময়ে দেখা যায় নাট্যনির্মাণের সময়ে অনেক কথা আর উচ্চারণের প্রয়োজন হচ্ছে না। ভঙ্গিতেই অনেক কথা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। যখন তা প্রকাশ পায়, অথবা নির্দেশক সেই রকমভাবে নাটকের গতিটি কল্পনা করেন, তখন আর সংলাপগুলো উচ্চারণের প্রয়োজন পড়ে না।

আমি দেখেছি রাজা নাটকে নগরবাসীর দৃশ্যে বা ভিড়ের দৃশ্যেও এমন উদাহরণ অনেক পাওয়া যায়। তেমনিই যদি দেখা যায় যে-কথা আগের দৃশ্যে বলা হয়ে গেছে এবং পরের দৃশ্যে তা পুনর্বার উচ্চারণ না করলেও চলে – তখন হয়তো নির্দেশক তা বাদ দিয়ে দেন। যদি না তা এমন সংলাপ হয় যার পুনরুচ্চারণ নাটকের বক্তব্য প্রকাশের জন্যই প্রয়োজন।

যেমন ধরা যাক, রক্তকরবী নাটকে গোকুল যখন বলে, ‘দেখি দেখি তোমার সিঁথিতে ঐ কী ঝুলছে’ – তখন উল্লেখ না থাকলেও আমরা বুঝতে পারি কিশোর রক্তকরবী ফুল এনে দেবার পরে নন্দিনী ওই ফুল দিয়ে মঞ্জরি নির্মাণ করে সিঁথিতে পরেছে। সে যে প্রথম থেকেই রক্তকরবী ফুলের মালা গেঁথে সেজেগুজে বসে ছিল না – সে কথা কিশোর-নন্দিনীর সংলাপ বিনিময়ে স্পষ্ট। যক্ষপুরীতে যে রক্তকরবী ফুলের গাছ আছে সে খবর তো কিশোরই প্রথম নন্দিনীকে দিলে। নাটকের শুরুতেই সে বলে, ‘অনেক খুঁজেপেতে এক জায়গায়, এখানে জঞ্জালের পেছনে একটি মাত্র গাছ পেয়েছি।’

– পেয়েছিস? –

এই কথাটুকু আবার নন্দিনীর বিস্ময় এবং আনন্দের অভিব্যক্তির জন্য জুড়তে হয়। অর্থাৎ এই শব্দটুকু অভিনয়ের প্রকাশভঙ্গির জন্য সংযোজিত করা হতে পারে। নন্দিনী বলে,

– আমাকে দেখিয়ে দে কিশোর, আমি নিজে গিয়ে ফুল তুলে আনব।

কিন্তু কিশোর তো তাতে রাজি নয়। সে চায় ওই গাছটি থাকবে তার একটিমাত্র গোপন কথার মতো। এবার থেকে সেই নন্দিনীকে রক্তকরবী ফুল জুগিয়ে যাবে।

তাই রক্তকরবীর ফুলের গয়না নন্দিনী আগে থাকতে পরে বসে থাকবে এ তো নাটকের যুক্তি বা সংলাপ অনুসারে সম্ভব নয়! – এমনই ধ্যান সহযোগে আমাদের অভিনয়ের এবং নাট্যরূপ গড়ে তুলবার পথটি খুঁজে নিতে হয়। তাই ‘নাটক’ হলেও তা নাট্যে রূপান্তরিত করতে অনেক অনুসন্ধান ও কল্পনাশক্তির প্রয়োজন। আর সেইসঙ্গে যা অতীব প্রয়োজনীয় সে কথাটি পুনর্বার উচ্চারণ করি – ‘যুক্তিভিত্তিক কল্পনা’র শক্তিকে আয়ত্ত করা।

আমার মনে হয় – এই অনুসন্ধানে যদি এমন প্রসঙ্গ যুক্ত করতে হয়, যা নাটকে নেই – তাহলে সে নাটক না করাই ভালো। বিশেষ করে সেই লেখক যদি রবীন্দ্রনাথের মতো বড়মাপের লেখক হন।

আর অনেক সময়ে নির্দেশক নাচার হন। যদি চ-ালিকা গদ্যনাটিকার উপস্থাপনার কথা ভাবা যায় – তাহলে প্রকৃতির অনুরোধে মা কী মন্ত্র পড়ে টেনে আনছে আনন্দের মতো পুরুষকে তার কোনো ছবি নির্মাণ করেননি লেখক। অথচ মঞ্চস্থ করতে গেলে কিছু তো একটা ঘটতে হবে মঞ্চে, যাতে প্রকৃতির দোলাচল স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সেই মহাপুরুষের কী হচ্ছে তা আমরা প্রকৃতির সংলাপে, মুকুরের প্রতি তার দৃষ্টিপাতে এবং প্রতিক্রিয়ায় সে ঘটনা হয়তো অনুভব করতে পারি পাঠক হিসেবে। কিন্তু প্রেক্ষাগৃহস্থ দর্শক কিসে অনুভব করবেন তার টানাপড়েন? কী করে তাঁরা বিচলিত হবেন এই তিনটি চরিত্রের যন্ত্রণায়? তখন কী করবেন নির্দেশক? তাঁকে তো এই বিষম দ্বন্দ্ব দর্শকের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস পেতে হবেই। তা না হলে তো নাট্যপরিবেশনের কোনো অর্থ থাকবে না।

একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই মহৎ সাহিত্য বা প্রাসঙ্গিক লিখন নানান শিল্পকে উজ্জীবিত করতে সক্ষম। তা চিত্রকলা হতে পারে, হতে পারে চলচ্চিত্র, হতে পারে নাট্য। যেমন অনেক কবিতা গানের সুরে অন্যতর মর্যাদা পায়। আবার তার বিপরীত ঘটনাও ঘটতে পারে। হয়তো সে-সুরারোপে কবিতার দার্ঢ্য বা ব্যঞ্জনা হারিয়ে গেল – এমনটি তো অজস্র হতে দেখেছি আমার আশেপাশে।

ধরা যাক, কোনো একটি ছোটগল্প ‘শাস্তি’। রবীন্দ্রনাথের অতি পরিচিত একটি গল্প। তার শেষ বাক্যটি হলো – চন্দরা কহিল, ‘মরণ!’ – এই গল্পটির মঞ্চায়নের খবর আমরা প্রায়শই দেখতে পাই। কিন্তু এই সংলাপে কেমন করে নাটকটি শেষ হতে পারে? বা চলচ্চিত্রও কি সমাপ্ত হতে পারে ওই ছোট্ট শব্দ উচ্চারণে? বা ‘নষ্টনীড়’ গল্পের – চারু কহিল, ‘না থাক’। – এ গল্পদুটির নিদারুণ শেষ দুটি বাক্যের যে অভিঘাত পাঠকের মনে সঞ্চারিত হয় সে অভিঘাত কেমন করে অন্য মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সম্ভব? ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য আমরা শুনেছি তার অন্তিম বাক্যে প্রকাশ পায়। সেই ছোটগল্প যখন অন্য মাধ্যমে রূপায়িত হবে তখন কি তার অন্যতম বৈশিষ্ট্যকে আমরা উপেক্ষা করব?

উপন্যাসের ক্ষেত্রেও এই কথাটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তা তো নির্ভর করবে সেই উপন্যাসের মূল বক্তব্যের সমাপন কী উপায়ে নির্মাণ করে তুলছেন লেখক।

এই দুই সৃষ্টিকারের ভাবনাচিন্তায় যখন মেলবন্ধন ঘটে তখন সাহিত্য ও শিল্পের সমন্বয়ে মহত্ত্বের স্পর্শ অনুভব করা যায়। উভয় পক্ষই হয়তো অন্যতর মর্যাদার আসন লাভ করে।

কিন্তু তার বিপরীত ঘটনা ঘটে চলে অবিরত। তাতে নাট্য বা চলচ্চিত্র তো লাভবান হয়ই না (এখানে আর্থিক লাভের কথা বলা হচ্ছে না সেকথা নিশ্চয় উপস্থিত শ্রোতৃম-লী বুঝতে পারবেন।) সাহিত্য সম্পর্কে দর্শকের মনে যে ধারণা তৈরি হয় তা হয়তো আদৌ সেই গল্পকারের অভিপ্রেত নয়। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন আজকাল অনেক মানুষই বই ‘পড়েন’ না, বই ‘দেখেন’। হয়তো কাউকে জিজ্ঞাসা করা হলো শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস পড়েছ?’ উত্তর পাওয়া গেল, ‘হ্যাঁ! দেখেছি। ওই যে শাহরুখ খান যেটা করেছিল তো? মাধুরী আর ঐশ্বর্য কী সুন্দর নাচল।’

অথবা সম্পাদনা শিক্ষার ক্ষেত্রে কী পরিণাম ডেকে আনে তাও আমরা দেখেছি। ডাকঘর নাটকটির একটি অংশ অমল ও দইওয়ালা নামে পাঠ্য ছিল স্কুলে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত। নাট্যশিক্ষার্থী কাউকে হয়তো জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘ডাকঘর নাটকটি পড়েছেন?’ শিক্ষার্থী বললেন, ‘হ্যাঁ!’ তাঁকে ডাকঘর নাটকটির একটি অংশ খুলে দেওয়া হলো পাঠ করবার জন্য। সে দেখেশুনে বললে, ‘না! আমি অমল ও দইওয়ালা পড়েছি।’

বৃহত্তর ক্ষেত্রে এই পাপ তৈরি হয় বিশেষত চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে। সে তখন সাহিত্যের স্রষ্টার থেকে বহু দূরে অবস্থান করে। তা কি সমাজের পক্ষে ভালো? তাহলে কি সাহিত্য মেলা বা সাহিত্য উৎসব ইত্যাদি অর্থহীন হয়ে যায় না? মনে হয় নাকি, সাহিত্য পড়বার বা তা নিয়ে আলোচনা করার উদ্দেশ্যটি কোথায় যেন মিলিয়ে গেল?

প্রসঙ্গত মনে পড়ে গেল – কিছু বছর আগে বেশ নামি এক পরিচালক ডাকঘর নাটকটি মঞ্চস্থ করে প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছিলেন। তাঁর কিছু প্রযোজনা সত্যিই খুব ভালো হয়েছিল। সাহসী তিনি। তাঁর ডাকঘর নাটকের মঞ্চায়নে দেখা গেল – অমলের সঙ্গে সুধার যেন প্রেম প্রেম ভাব। আর দুষ্টু মোড়ল তা নিয়ে কী এক জট পাকিয়ে ফেললে যে, সুধার মা শমী মালিনী (যার কেবল উল্লেখ আছে সুধার সংলাপে) – তাকে ছুটে এসে অমলের বাড়ির সামনে আপত্তি প্রকাশ করে চেঁচামেচি করতে হলো। দর্শকাসনে বসে, একেবারে দর্শক এবং তৎসহ রবীন্দ্রনাটকের পাঠক হিসেবে, আমার মনে হলো – এ কী সাহসিকতা? না দুঃসাহসিকতা? নাকি হঠকারিতা?

যাঁরা এই প্রযোজনা নিয়ে ‘ধন্য-ধন্য’ রব তুলেছেন তাঁরা কিন্তু এই নিদারুণ বিচ্যুতি কিংবা অসংগত সংযোজনের কথা কোথাও উল্লেখ করেননি। এইটাই ভয়ংকর বলে মনে হয়। সকলেই যদি নাট্য দর্শনান্তে বইটি পড়তেন অথবা বইটি পড়ে নাটক দেখাবার আগ্রহ অনুভব করতেন তাহলে এত বিপদের কিছু তো ছিল না। কিন্তু দেখা যাবে বেশিরভাগ দর্শকের নাটকটি জানাই নেই। তাই একটি ডাগর সুধার প্রতি অমলের তীব্র অনুরাগ দেখে তাঁরা হয়তো মনে করে নেবেন – এইরকমই রবীন্দ্রনাথের নির্মাণ আর তাই শশী মালিনীকে তিনি মঞ্চে প্রবেশ করিয়েছেন মেয়ের সর্বনাশের আশঙ্কায়। সে ‘মা’ তো। তাই অমলকে সে কটু কথা শোনাতেই পারে। অথচ এই নাটকাংশ যে রবীন্দ্রনাথ নির্মাণ করেননি তা তাঁদের জানানোর দায় কার?

আরো একটি কথা রবীন্দ্রনাথের নাটক বা উপন্যাসের চিত্ররূপে ভাষাকে জোর করে ‘আধুনিক’ করে তুলবার কোনো প্রয়োজন আছে কি? অর্থাৎ সংলাপের ভাষা অনেক সময়েই অনেকে পরিবর্তন করে নেন। অথচ আমি যদি সে সাহিত্য পাঠ করে ভাষাটি হৃদয়ঙ্গম করতে পারি, যদি ছবি দেখতে পাই – তাহলে আমার দর্শকেরা বুঝতে পারবেন না, তাঁদের জন্য তাঁর সংলাপের ভাষার আধুনিকীকরণ করতে হবে – এ যুক্তিতে মন সায় দিতে চায় না। দর্শকের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ পায় এতে – এমনই মনে হয় আমার। ‘কঠিন কথা সহজ করে বোঝানো যায়’ – সেই তো মহৎ সাহিত্যের লক্ষণ।

সংলাপের উদাহরণ হিসেবে আমি বলতে পারি চার অধ্যায় উপন্যাসের কথা, ঘরে বাইরে উপন্যাসের কথা, মালঞ্চর কথা, শেষের কবিতার কথা। গল্প হিসেবে উদাহরণ দিতে পারি ‘রবিবার’, ‘শেষ কথা’, তো বটেই। এমনকি, যদিও সাধু ভাষার বাক্যবন্ধ, তবু কি সহজ নয় ‘বোষ্টমী’ বা ‘ঘাটের কথা’ বা ‘খাতা’ অথবা ‘ছুটি’র সংলাপ?

বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়ও সেই সহজের আভাস রয়েছে।

কাজেই সাহিত্যকে আমি কোন দৃষ্টিতে দেখব তার ওপরেই নির্ভর করে। ভাষাকে লঘু করে তুললে বিষয়বস্ত্তর মান যে নিম্নগামী হতে বাধ্য সে তো আমরা জানি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখকের মূল্যবান রচনায় যদি হাত দিতে হয় অন্য মাধ্যমে রূপায়িত করবার জন্য তাহলে লেখকের অভিপ্রায় সম্পর্কে অনুসন্ধান যেমন অনিবার্য, তেমনিই অনস্বীকার্য লেখকের প্রতি যুক্তিসংগতভাবে অনুগত থাকা। আর তা নাহলে সেই লেখককে তাঁর নিজের মতো করে বাঁচতে দেওয়া। যাকে আমি – বলা যায় – ‘সত্য’ রূপে স্বীকার করতে অক্ষম তাকে আমি – আমার ক্ষুদ্রতার গ–র মধ্যে টেনে আনতে যাব কেন?

কিন্তু যদি এমন কোনো শিল্পীর সন্ধান পাওয়া যায়, যিনি সেই মহৎ সাহিত্যিকের রচনাকে মর্যাদা দিয়ে আপন শিল্পমাধ্যমের দ্বারা প্রকাশ করতে পারেন, তাকে যুক্তিবহ করে তুলতে পারেন – তাতে সাহিত্যের লাভ, সেই বিশেষ শিল্পমাধ্যমের লাভ, সমগ্র সমাজের লাভ। কারণ সমাজের সঙ্গে ব্যক্তি, সমষ্টির সঙ্গে ব্যষ্টি – এক অরূপ বন্ধনে ধরা পড়তে পারে, যা নিতান্ত কাম্য। আমাদের সংস্কৃতির পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

কিন্তু বিকৃতির সাহায্য নিয়ে আমরা যেন সমাজকে বিকৃততর করে তুলবার প্রয়াস না পাই। তাতে সাহিত্যের ক্ষতি হয়, অন্য শিল্পমাধ্যমেরও লাভ হয় না।

অথচ অধুনা সাহিত্যকে উপেক্ষা করে, অথবা লেখকের দর্শন করে অবজ্ঞা করে যে প্রচেষ্টা ক্রমশই বেড়ে চলেছে, তাতে বড় আশঙ্কা হয়। এর অনেকানেক উদাহরণ ইচ্ছা করলেই উপস্থিত করা যায়। কিন্তু সে আলোচনা নয় থাক।

তাই এই বিষয়ে আলোচনা করা বড় শক্ত। কারণ অনেক বিখ্যাত-প্রখ্যাত মানুষ সাহিত্য থেকে অন্য শিল্পমাধ্যমে নিজেদের কল্পনা প্রয়োগ করে শিল্প নির্মাণ করেছেন যে আমাদের মতো তুচ্ছ মানুষের বড় ভয় করে। বড় ভয় করে তাঁদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করে। তাই আমার মতো সামান্য ব্যক্তি কীই-বা আর বলতে পারে এ-বিষয়ে! n

Leave a Reply

*