logo

সার্ধশতবর্ষে শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

মৃণাল ঘোষ

শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬৭-১৯৩৮) জন্মের সার্ধশতবর্ষ পূর্ণ হল এ বছর (২০১৭)। ভারতের চিত্রকলার আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আধুনিকতার এক নতুন পথের প্রথম পথিকৃৎ ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। আধুনিকতা থেকে আধুনিকতাবাদ-এ বা মডার্ন থেকে ‘মডার্নিজম’-এ উত্তরণের পথে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। আমাদের প্রথাগত শিল্প-ইতিহাসে তাঁর সেই স্বীকৃতি অনেকটাই উপেক্ষেত। অসামান্য বহুমুখী প্রতিভাদীপ্ত শিল্পী ছিলেন তিনি। ছবিতে স্বতন্ত্র অভিঘাত সৃষ্টি করা ছাড়াও, কার্টুনচিত্রে তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ। এছাড়া থিয়েটারের মঞ্চসজ্জা করেছেন। পোশাক পরিকল্পনা করেছেন। বুটিক ও সুচিশিল্পের নানা দিক, কাঠের পুতুল, আসবাব ও গৃহসজ্জার নানা দিক নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। শিল্পকলার একজন সংগঠক হিসেবেও তাঁর অবদান অপরিসীম।

বিংশ শতকের প্রথম দুই দশকে আমাদের চিত্রধারায় দুটি রূপরীতি প্রাধান্য পাচ্ছিল। একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার চাপিয়ে দেওয়া অ্যাকাডেমিক স্বাভাবিকতা। আর একটি এরই প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যগত ভারতীয় আত্মপরিচয়ের সন্ধান। একে সাধারণভাবে বলা হয় নব্য-বঙ্গীয় বা নব্য-ভারতীয় ঘরানা। এর প্রথম ও প্রধান পথিকৃৎ ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৭১-১৯৫১)। অবনীন্দ্রনাথ গগনেন্দ্রনাথের ছোট ভাই। কিন্তু গগনেন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন অবনীন্দ্রনাথের অনন্ত দশ বছর পরে। কেন নিজস্ব ছবির ক্ষেত্রে আসতে তাঁর দেরি হয়েছিল, সে প্রসঙ্গে আমরা একটু পরে আসছি। কিন্তু শুরু থেকেই গগনেন্দ্রনাথের ছবি ছিল নব্য-ভারতীয় ঘরানার আবহম-লের একেবারে বাইরের। গগনেন্দ্রনাথই ছিলেন প্রথম শিল্পী যিনি একদিকে জাপানি ঐতিহ্য, আরেক দিকে পাশ্চাত্য আধুনিকতার উদ্ভাবনকে আমাদের ঐতিহ্যগত রূপরীতির সঙ্গে মিলিয়ে চিত্রকলায় নতুন উজ্জীবন এনেছিলেন। আমাদের আধুনিকতার অন্নেষণকে আন্তর্জাতিকতায় অভিষিক্ত করেছিলেন। ভারতের চিত্রকলার আধুনিকতায় এটাই ছিল তাঁর প্রধান অবদান। গগনেন্দ্রনাথ তাঁর সারাটা শিল্পীজীবন নব্য-ভারতীয় ঘরানার আবহম-লে কাজ করেছেন। এর প্রধান এক সংগঠকও ছিলেন তিনি। তাঁর কোনো কোনো অঙ্কনশৈলীতে ঐতিহ্যগত আঙ্গিকের অনুরণন থাকলেও, এ থেকে মুক্তির সন্ধানে স্বদেশকে বিশ্বে প্রসারিত করাই ছিল তাঁর চিত্রসাধনার প্রধান লক্ষ্য।

গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথ – তিন ভাই। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় ভাই গিরীন্দ্রনাথ। গিরীন্দ্রনাথের ছোট ছেলে গুণেন্দ্রনাথ। গগনেন্দ্রনাথ ছিলেন গুণেন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান। তাঁর জন্ম ১৮৬৭ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর। তাঁর যখন ১৪ বছর বয়স, তখন তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে সংসারের সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়ে। তাঁর ছত্রছায়ায় অবনীন্দ্রনাথ ছবি এঁকেছেন। কিন্তু তিনি নিজে ছবিতে মগ্ন হতে পারেন নি। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষা ছিল না। ছেলেবেলায় সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে পড়ার সময় আর সকলের মতো তাঁকেও কিছুটা ছবি আঁকা শিখতে হয়েছিল। ছবি আঁকার জন্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন তখন। কিন্তু এর পরে তাঁর চিত্রচর্চা বিশেষ এগোয় নি। ১৮৯৯-১৯০০ সালে তিনি কিছুদিন ছবি আঁকা শেখেন হরিনারায়ণ বসুর (১৮৬৮-১৯২০) কাছে। হরিনারায়ণ বসু গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিকে দক্ষ ছিলেন। গগনেন্দ্রনাথও সেটাই শিখেছিলেন।

এরপর গগনেন্দ্রনাথ ছবিতে উদ্বুদ্ধ হন জাপানি শিল্পীদের সংস্পর্শে এসে। ১৯০২ সালে জাপানের শিল্পবেত্তা ও মনীষী ওকাকুরা (১৮৬২-১৯১৩) কলকাতায় আসেন। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন আরো তিনজন জাপানি শিল্পী – তাইকান, কাৎসুতা ও হিশিদার শুনসো। তাঁরা জোড়াসাঁকোতে গগনেন্দ্রনাথের আতিথ্যেই থেকেছেন। তাঁদের ছবি আঁকা দেখে অনুপ্রাণিত হন গগনেন্দ্রনাথ। এরপর এক দুঃখের অভিঘাত তাঁকে ছবির মধ্যে এনে ফেলে। ১৯০৫ সাল নাগাদ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র গেহেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয় মাত্র ১৭ বছর বয়সে। তাঁর বিয়ের এক বছরের মধ্যে। সেই শোকে একেবারে ভেঙে পড়েন গগনেন্দ্রনাথ। তাঁকে সান্তবনা দিতে ক্ষেত্র চূড়ামণি এক কথককে নিয়ে আসা হয়। তিনি পুরাণের গল্প শোনাতেন। পরে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে শিলাইদহ থেকে নিয়ে আসা হয় শিবু সাহা নামে এক কীর্তনীয়াকে। কাহিনি বা কীর্তন শুনতে শুনতে গগনেন্দ্রনাথ নিজেকে ব্যস্ত রাখতেন কথক বা কীর্তনীয়ার বিভিন্ন ভঙ্গির ছবি আঁকাতে। সেই তাঁর ছবি আঁকার সূচনা। তাঁর বয়স তখন ৩৮। সেই থেকে ১৯৩০ পর্যন্ত মাত্র ২৫ বছর তাঁর সৃষ্টিশীল জীবন। ১৯৩০-এ তিনি পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হন। ১৯৩৮-এর ১৪ ফেব্রম্নয়ারি মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি আর কোনো কাজ করতে পারেন নি। এই স্বল্প পরিসরের শিল্পী জীবনে গগনেন্দ্রনাথ যে কাজ করে গেছেন, তা ভারতের আধুনিক চিত্রকলায় নতুন পথ নির্দেশ করেছিল।

কীর্তন শুনতে শুনতে তিনি যেসব ছবি এঁকেছিলেন, তার দু-একটি দৃষ্টান্ত আমরা একটু দেখে নিতে পারি। শিবু কীর্তনীয়ারই বিভিন্ন ভঙ্গির ছবি করেছিলেন বেশ কিছু। কাগজের ওপর পেনসিল ও কালিতে করা এই স্কেচগুলিতে আমরা দেখতে পাই তাঁর প্রত্যয়ী রেখার চলন। ধুতি পরে উন্মুক্ত দেহে গান গাইতে গাইতে নৃত্য করছেন শিবু কীর্তনীয়া। শূন্য প্রেক্ষাপটে সংবৃত রেখায় আঁকা হয়েছে অবয়বগুলি। স্বাভাবিকতাবাদী রীতির সুষ্ঠু প্রকাশ এখানে। তবু অবয়বের যথার্থতা থেকে কৌতুকদীপ্ত জঙ্গমতার ওপর জোর দিয়েছেন বেশি।

১৯০৫ থেকে ১৯১০-এর মধ্যে চাইনিজ ইঙ্কে তিনি কিছু কাকের ছবি আঁকেন। জাপানি কালি-তুলি ছবির আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন এখানে। একলা একটি বিষণ্ণ কাক বসে আছে। সম্মুখ অংশটিকে শুধু রূপায়িত করেছেন কোনো ছবিতে। ছায়াময়তায় ঘনিয়ে তুলেছেন বিষাদ। যেন নিজস্ব বিষাদ অভিব্যক্ত হয়েছে কাকের মধ্য দিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাভাবিকতাবাদকে অতিক্রম করে গেছেন এখানে। অবয়বের মধ্য দিয়েই পরিস্ফুট করেছেন আত্মমগ্নতা। ছবির যে নতুন অভিমুখ তৈরি করবেন তিনি, তারই কিছু কিছু ইঙ্গিত যেন উদ্ভাসিত হচ্ছে এখানে। বাঁশের পাতার কিছু ছবিও তিনি এঁকেছিলেন এই সময়। সেখানে প্রত্যক্ষভাবেই রয়ে গেছে জাপানি বিশ্বদৃষ্টির প্রভাব। এই সময়ে করা অবনীন্দ্রনাথের ছবিগুলির দিকে যদি তাকাই, তাহলে বোঝা যায় গগনেন্দ্রনাথের স্বকীয়তার স্বরূপ। ১৮৯৭-এ ‘রাধা-কৃষ্ণ’ চিত্রমালার পর ১৯০৫ পর্যন্ত অবনীন্দ্রনাথ যেসব ছবি এঁকেছেন তাতে ছিল তাঁর ঐতিহ্যগত রূপরীতি আয়ত্ত করার প্রয়াস। ১৯০২-এ তেলরঙে এঁকেছেন ‘সাজাহানের মৃত্যু’। স্বাভাবিকতার সঙ্গে মোগল-শৈলীকে মিলিয়েছেন। ১৯০২ ও ১৯০৫-এ স্বাদেশিকতার পরিম-লে এঁকেছেন ‘বঙ্গমাতা’ তথা ‘ভারতমাতা’। জাপানি আঙ্গিকের সুচারু ব্যবহার এখানে। ঐতিহ্যের মধ্য দিয়েই এখানে স্বাভাবিকতাকে ধরতে চাইছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। গগনেন্দ্রনাথের মানসম-ল ছিল এ থেকে একেবারেই আলাদা। তিনি উন্মীলিত করতে চাইছেন একান্ত আত্মমগ্ন বিষণ্ণ এক সৌন্দর্যের আবহ, যেখানে সমকালীন বিশ্ব তাঁর নিজস্ব ঐতিহ্যে বিশিস্নষ্ট হচ্ছে।

১৯১১ সাল নাগাদ রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ বইয়ের জন্য ছবি আঁকতে অনুরোধ করেন গগনেন্দ্রনাথকে। কেন গগনেন্দ্রনাথকেই নির্বাচন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ? স্বাভাবিকতাবাদী আঙ্গিকের মধ্যে রহস্যের মায়াজাল সৃষ্টি করে দৃশ্যমান বাস্তবতাকে রূপায়িত করার মতো অন্য কোনো শিল্পী তখন কেউ ছিলেন না। এখানেই গগনেন্দ্রনাথের অনন্যতা ও স্বকীয়তা। ২৪টি ছবি এঁকেছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। এই ছবিগুলি তাঁর শিল্পীজীবনে যেমন, তেমনি আধুনিকতার উত্তরণেও গৌরবময় পাদপীঠ স্বরূপ। কলকাতার বাস্তব ও ঠাকুরবাড়ির আবহম-ল তাঁর আগে আর কেউ এত সফলভাবে আঁকেন নি। জাপানি প্রকরণের সঙ্গে ইম্প্রেশনিস্ট আঙ্গিকের সকল সমন্বয়ে এই ছবিগুলি অনবদ্য।

জোড়াসাঁকোতে দোতলার বারান্দায় আরামকেদারায় পা ছড়িয়ে বসে আছেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। পাশে আর একটি চেয়ারে বসে আছে শিশু-রবি। দুজনেরই কালির ছোপে আঁকা আপাদ-বেষ্টিত পোশাকের মধ্যভাগে শূন্য পরিসর ছেড়ে গড়ে তোলা আলোর ব্যঞ্জনা, অবয়বে এনেছে আত্মমগ্ন রহস্যের পরিম-ল। রেলিংয়ের পাশে বড় দুটি স্তম্ভ। তার মাঝখান দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে ঝোপের ভেতর থেকে মাথা তুলেছে নারকেল গাছ। যেন হাওয়ায় নড়ছে পাতাগুলি। তখনকার কলকাতার প্রকৃতির সামান্য আভাস ধরা আছে এখানে। চারপাশে অন্ধকার। মাঝখানে উদ্ভাসিত প্রদীপের আলো। তাতে গোল হয়ে বসে রামায়ণ পড়ছে ভৃত্যেরা। আলো-আঁধারের এই মরমি মায়া শিল্পীর নিজস্ব মগ্ন অন্তর্মুখীনতার পরিচয় বহন করে। প্রবল বৃষ্টিতে ঝাঁপসা হয়ে গেছে জোড়াসাঁকোর পারিপার্শ্বিকের আবহ। এরই মধ্যে ইংরেজি শিক্ষক ছাতা মাথায় দিয়ে কিশোর রবিকে পড়াতে আসছেন। বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে ধূসর হয়ে গেছে পরিম-ল। দুটি পাখি শূন্যে উড়তে উড়তে পরস্পরের সঙ্গে খেলা করছে। এরকম সব ছবিতে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ি ও কলকাতার আবহম-লকে রূপায়িত করেছেন আত্মমগ্ন নিবিড় কাব্যময়তায়। এই কবিতার অনুষঙ্গই হয়ে উঠবে ছবিতে তাঁর স্বাতন্ত্র্যের একটি বিশেষ দিক।

তাঁর পরবর্তী চিত্রমালার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রাঁচি, পুরি ও গ্রাম বাংলার নিসর্গমূলক জলরঙের ছবি, হিমালয়ের চিত্রমালা, চৈতন্য চিত্রমালা, কার্টুনধর্মী সমাজ-সমালোচনামূলক ছবি, আলোছায়ার জ্যামিতিতে গড়া তথাকথিত ঘনকবাদী বা কিউবিস্ট আঙ্গিকের পরীক্ষামূলক ছবি, লোককথাভিত্তিক চিত্রমালা ও মৃত্যু পরপারের জীবনের প্রতীকী চিত্রাবলি বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় গগনেন্দ্রনাথের ছবি সম্পর্কে বলেছেন, ‘বিষয় অপেক্ষা বস্ত্তই, অন্তর্ভাব অপেক্ষা আকারই গগনেন্দ্রনাথকে বেশি আকৃষ্ট করেছিল, এ কথা ১৯১০-২০ সালের রচনার সাক্ষ্য থেকে সিদ্ধান্ত করা চলে।’ (‘চিত্রকথা’ অরুণা প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৮৪, পৃ: ৩১৭)। অন্তর্ভাব যে ছিল না তাঁর ছবিতে, এ কথা নিঃশংসয়ে বলা যায় না হয়তো। স্ট্রাকচারের ওপর জোর পড়েছিল তাঁর কিউবিস্ট আঙ্গিকের ছবিতে। কিন্তু নিসর্গের ছবিগুলিতে গঠনিকতা সংবৃত হয়ে অন্তর্ভাবই প্রধান হয়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিসর্গের ধ্যানমগ্ন উদাত্ততাকে প্রকাশ করেছেন। নিসর্গকে প্রায়-বিমূর্ততার দিকে নিয়ে গেছেন। এই আত্মগত প্রকাশের মধ্য দিয়ে ইম্প্রেশনিজমের তত্ত্ববিশ্বকে তিনি আত্মস্থ করেছেন।

এরকম কয়েকটি নিসর্গমূলক ছবির দিকে আমরা একটু দৃষ্টিপাতের চেষ্টা করতে পারি। ‘সমুদ্রের উপর চাঁদ’ নামে একটি ছবি আছে তাঁর। এঁকেছেন জলরং, ওয়াশ ও টেম্পারা মাধ্যমে। বিষয় জ্যোৎস্নালোকিত সমুদ্র। কিন্তু সমুদ্র বা ঢেউয়ের স্পষ্ট কোনো উপস্থিতি নেই। হালকা স্বর্ণাভ আলোয় সবটাই আবিল হয়ে গেছে। চিত্রপটের মধ্যভাগে পূর্ণচাঁদের উপস্থিতি দেখা যায়। তাও খুব সোচ্চার নয়। বেলাভূমিতে একজন মানুষের উপস্থিতি। কিন্তু সেই মানুষ একটি ঘন ছায়াময় কম্পমান রেখায় পর্যবসিত। চাঁদের আলোয় তার ছায়া পড়েছে ভূমির ওপর। দেখতে দেখতে টার্নারের (১৭৭৫-১৮৫১) একটি ছবি মনে পড়ে – ‘মর্নিং আফটার দ্য শিপরেক’। সমুদ্রঝড়ে জাহাজটি ডুবে গেছে কাল রাতে। আজ ভোরে কোথাও কোনো চিহ্ন নেই তার। শুধু সেই সর্বনাশকে প্রগাঢ় করে তুলছে বালুকাবেলায় একাকী একটি কুকুরের কান্না। ১৮৩৫ থেকে ৪০-এর মধ্যে আঁকা এই ছবিটিতে রয়েছে রোমান্টিকতা সঞ্জাত করুণ ট্র্যাজেডির অনুষঙ্গ। এই রোমান্টিক চেতনাই পরে ইম্প্রেশনিজমে রূপান্তরিত হয়েছিল। গগনেন্দ্রনাথের উলিস্নখিত ছবিটিতে সেই ধ্বংসের আবহ নেই। শূন্যতা আছে, কিন্তু তা মগ্ন সৌন্দর্য সঞ্জাত। নিসর্গের এই অমূর্ত উদাত্ততার অনুষঙ্গ এসেছে অবনীন্দ্রনাথের ছবিতে আরো অনেক পরে। ১৯১৯-২০-এর ‘দার্জিলিং হিমালয় রেলপথ’ শীর্ষক ছবিটি হতে পারে যার দৃষ্টান্ত। রবীন্দ্রনাথও এঁকেছেন এরকম অরূপ নিসর্গ ১৯৩০-এর দশকে। তিনজনের নিসর্গ রচনায় রূপের মধ্যে অরূপের ব্যঞ্জনা তিনরকম। গগনেন্দ্রনাথকেই এখানে বলা যেতে পারে পূর্বসূরি। প্রাচ্য দর্শন ও পাশ্চাত্য বাস্তবতার সমন্বয়ে রূপ অতিক্রম করে তিনি আনছেন যে রূপাতীতের ধ্যান, সেই মগ্নতাই তাঁকে অনন্য করেছে। এই পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ নিসর্গরচনাগুলির মধ্যে রয়েছে পানিহাটির বাগান থেকে দেখা গঙ্গার ছবি, রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ কবিতা অবলম্বনে আঁকা নদী তীরে বৃষ্টির দৃশ্য, পদ্মা নদীতে ঝড়ের দৃশ্য এরকম সব ছবি।

কলকাতার পথ বেয়ে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনে যাচ্ছে – জলরঙে আঁকা এরকম একটি নাগরিক নিসর্গের ছবি আছে তাঁর। প্রদীপ্ত অন্ধকার ছড়িয়ে আছে আকাশে। দুপাশে বাড়িঘর। পথ ধরে অজস্র মানুষের সমাবেশ চলেছে। চিত্রক্ষেত্রের মধ্যবর্তী অংশে, পথ থেকে অনেকটা উঁচুতে, যেখানে চালচিত্রসহ দুর্গামূর্তির অবস্থান, সেখানে লালাভ এক আলো উদ্ভাসিত হয়ে আছে। অজস্র মানুষ প্রতিমাকে বিসর্জনে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের আনন্দের উদ্ভাস যেন এই আলো। আলোছায়ার এই দীপ্ত নাটকীয়তার মধ্যেই এই ছবিটির নৈসর্গিকতা অনৈসর্গিকে উদ্ভাসিত হচ্ছে। এই উত্তরণই গগনেন্দ্রনাথের ছবির বৈশিষ্ট্য। ইম্প্রেশনিজম ও নব্য-ভারতীয় রীতির আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে এদের ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা।

‘চৈতন্য চিত্রমালা’ করেছিলেন ১৯১২-১৩-তে। তাঁর মা-র মৃত্যু তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এই চিত্রমালায়। বিষয়ের দিক থেকে পুরাণকল্পমূলক বলে এই চিত্রমালায় গগনেন্দ্রনাথের আঙ্গিক অনেকটা নব্য-ভারতীয় ঘরানার আবহম-লের কাছাকাছি চলে এসেছিল। বাস্তবতা ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয় ঘটেছিল এই চিত্রমালায়। ‘চৈতন্য সমুদ্রের গান শুনছেন’ এই শিরোনামে একটি ছবি আছে। ওপরে নীলিম আকাশ, নিচে সমুদ্রের জলরাশি বালুকাবেলায় গড়িয়ে আসছে। তীরে একাকী বসে আছেন শ্রীচৈতন্য। নিসর্গের উদাত্ততা চৈতন্যের আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মিলেছে এখানে। চৈতন্যের নির্বাণের ছবিটিতেও সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে মিলে অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে চৈতন্যের শরীর তথা সত্তা। অসীমের ভেতর বিলয় ঘটছে তাঁর। এই মহত্ত্বর বোধই গগনেন্দ্রনাথের ছবির বৈশিষ্ট্য।

এরপর গগনেন্দ্রনাথের ছবিতে দুটি বৈশিষ্ট্যের উন্মোচন ঘটে, যা তাঁকে ঐতিহ্যের গ– থেকে আবিশ্ব আধুনিকতাবাদী মূল্যবোধের দিকে নিয়ে যায়। এর একটি তাঁর কার্টুন চিত্রমালা। দ্বিতীয়টি কিউবিস্ট আঙ্গিকের আত্তীকরণ। ১৯১৫-তে তৈরি বিচিত্রা ক্লাবের অন্যতম উদ্যোক্তা ও সংগঠক ছিলেন তিনি। এখানে নাটক অনুশীলনের মধ্য দিয়ে অভিনয় ও মঞ্চ পরিকল্পনায় তাঁর আগ্রহ জন্মে। তা থেকেই কৌতুক রূপায়ণের দিকে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। তখনকার কলকাতায় নব্য-ধনী ও মধ্যবিত্ত সমাজে যে নানারকম অনাচার চলছিল, একেই তিনি প্রতিবাদে বিদ্ধ করেন তাঁর কার্টুন চিত্রমালায়। এছাড়াও ঔপনিবেশিকতার যে নানা অনাচার, এরও বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উঠে এসেছে নানাভাবে। সশ্রদ্ধ কৌতুকের নানা দিকও উদ্ভাসিত হয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথ বিমানে উড়ে যাচ্ছেন বা জগদীশ চন্দ্র বসুর নানা বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, এসব বিষয় নিয়েও তিনি এঁকেছেন কার্টুন। তাঁর অজস্র কার্টুনের মধ্যে নির্বাচিত কিছু ছবি নিয়ে তিনটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯১৭-তে ‘বিরূপ বজ্র’ ও ‘অদ্ভুতলোক’ এবং ১৯২১-এ ‘নবহুল্লোড়’।

এরই দু-একটি ছবি আমরা দেখে নিতে পারি। ১৯১৭-এর ১৩ সেপ্টেম্বর এঁকেছিলেন ‘মিলস্টোন অব কাস্ট’। ব্রাহ্মণ ও এক কঙ্কাল ওপরে বসে চাকতি ঘোরাচ্ছে। তাতে পিষ্ট হয়ে বেরিয়ে আসছে অজস্র নিম্ন প্রজাতির মানুষ। উচ্ছৃত জলস্রোতে ভেসে যাচ্ছে তারা। নিম্নবর্গের মানুষের প্রতি অত্যাচার ভারতবর্ষের এক চিরন্তন সমস্যা। মধ্যবিত্ত মানুষের চিন্তার দ্বিচারিতাকে কশাগাত করেছেন ‘হিন্দুর ধর্মে ঘোরতর আঘাত’ শীর্ষক কার্টুনে। সাহেবদের মৎস্য শিকারের সংবাদ পাঠে ব্যথিত হয়েছেন একজন বাঙালি বাবু। অথচ তারই সামনে তার স্ত্রী বঁটিতে কাতলা মাছের মু-চ্ছেদ করছে। ‘রাজা রামমোহন রায়’ বিষয়ে রামমোহন রায়ের মহত্ত্বের বিপরীতে সাধারণ বাঙালির ক্ষুদ্রতাকে তুলে ধরেছেন। রামমোহনের বিরাট মূর্তিকে দড়ি বেঁধে ভূপতিত করতে চাইছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাঙালি। ১৯১৪ থেকে ১৯১৭-১৮-এর মধ্যে যখন গগনেন্দ্রনাথ আঁকছেন এসব কার্টুন তখন বাংলা তথা ভারতীয় চিত্রকলায় চলছে পৌরাণিক ও ধর্মীয় বিষয়ের চর্চা। প্রতিবাদী চেতনা যে ছবির একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয় হতে পারে, এ কথা আমাদের দেশে এখনো কেউ ভাবেন নি। আরো পরে ১৯৩০ সালে ‘আরব্যরজনী’ চিত্রমালায় এ কথা ভাববেন অবনীন্দ্রনাথ। ১৯৩৮-এর ‘কৃষ্ণমঙ্গল’ চিত্রমালায়ও ভাববেন। ১৯৩০-এর পর রামকিঙ্করের ছবিতে উন্মীলিত হবে প্রতিবাদী চেতনার নানা দিক, ১৯৪০-এর দশকে যা আরো পরিপূর্ণতার দিকে যাবে। এই প্রতিবাদী চেতনার প্রথম পথিকৃৎ ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। কার্টুনের মধ্য দিয়ে চিত্রভাষাতেও তিনি পরিবর্তন আনেন। স্বাভাবিকতাকে সরলীকৃত ও কৌতুকদীপ্ত করেন। এর মধ্যেই থাকে আধুনিকতাবাদী চেতনার কিছু ইঙ্গিত।

১৯২০-এর পর থেকে গগনেন্দ্রনাথের ছবি জ্যামিতিক গাঠনিকতার দিকে গেছে ক্রমশ। এখানেও আলোছায়ার দ্বৈতের মধ্য দিয়ে এক রহস্যময়তাকেই উন্মীলিত করেছেন তিনি। এই যে জ্যামিতি, এর স্বরূপ কী? কিউবিজমের সঙ্গে কি কোনো সম্পর্ক আছে এর? একাধিক মত আছে এ সম্পর্কে। অর্ধেন্দ্রকুমার গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৩৮ সালে এক লেখায় বলেছিলেন যে, গগনেন্দ্রনাথ তাঁর কিউবিজম অনুসারী ছবিতে চিত্রক্ষেত্রে যেভাবে আলো ও ছায়া বা সাদা ও কালোর জ্যামিতিকতায় বিশেস্নষণ করেছিলেন, ব্রাক ছাড়া আর কোনো কিউবিজমের শিল্পী সেভাবে করেন নি। কিউবিজমের পরিপ্রেক্ষিতে এটা গগনেন্দ্রনাথের বিশেষ অবদান। (ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্ট প্রকাশিত (১৯৭২) ‘গগনেন্দ্রনাথ টেগোর’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত, পৃ: ২২)।

নীরদ সি চৌধুরী দেখিয়েছিলেন জ্যামিতিকতা সত্ত্বেও গগনেন্দ্রনাথের মনোভঙ্গি বা উদ্দেশ্য ছিল কিউবিস্ট শিল্পীদের একেবারে বিপরীত। তাঁর কথায়, ‘In diametrical opposition to the doctrine, not only of cubist, but of ever for less uncompromising adherents of the formal in painting, Gaganendranath Tagore’s mind was fixed on creating psychological values through visual from rather than on crating forms for their own sake’ (পূর্বোক্ত উৎস, পৃ: ২৫)। আমিনা কর তাঁর ১৯৬৭-এর এক লেখায় বলেছেন, কিউবিজম ও আর্ট নুভিউ-এর অনুষঙ্গে গড়ে ওঠা তাঁর যে আলোছায়ার জ্যামিতিক রচনা, তা ওই সমস্ত আঙ্গিক-সর্বস্ব নয় কখনোই। … শুধুই ফর্মের জন্য ফর্ম করেন নি তিনি। (পূর্বোক্ত উৎস, পৃ: ৬৮) বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় তাঁর এ পর্যায়ের ছবির সঙ্গে কিউবিজমের সরাসরি সম্পর্ককে সমর্থন করেন নি। বলেছেন, ‘একান্তভাবে কিউবিজম থেকে গগনেন্দ্রনাথ উপাদান সংগ্রহ করেছিলেন এই ধারণা অনেকটাই ভিত্তিহীন।’ [চিত্রকথা : (পৃ : ৩১৭)]। বিনোদবিহারী এই ছবির স্বরূপ নির্ধারণের জন্য প্রিজমের ভেতর দিয়ে আলোক বিচ্ছুরণের কথা বলেছেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আলো-আঁধারি পরিম-লের কথাও বলেছেন। এই আলোছায়ার জ্যামিতিই গগনেন্দ্রনাথকে উজ্জীবিত করেছিল, বলেছেন এ কথাও।

এ সমস্ত পর্যালোচনা থেকে একটি সিদ্ধামেত্ম পৌঁছাতে পারি আমরা যে কিউবিজম গগনেন্দ্রনাথকে ভাবিয়েছিল বা অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি তার এই আঙ্গিককে কিউবিজম নামে অভিহিত করতেও দ্বিধা করেন নি। একটি ছবির চিত্রক্ষেত্রে তিনি নিজ হাতে লিখেছেন ‘Flight of the first indian cubist’ সেই ছবিতে শিল্পীর নিজেরই প্রতিকৃতি ছিল। কিন্তু ব্রাক, পিকাসসো প্রমুখ কিউবিস্ট-শিল্পীর বিশেস্নষণাত্মক জ্যামিতিকতা থেকে গগনেন্দ্রনাথের ছবি ছিল একেবারেই আলাদা। জীবনের ও প্রকৃতির অন্তর্লীন এক রহস্যময়তা তাঁকে সবসময়ই আকর্ষণ করত। সেই রহস্যকে পরিস্ফুট করতেই তিনি আলোছায়ার জ্যামিতি নিয়ে খেলা করেছেন। পাশ্চাত্যের কিউবিজম প্রাচ্যের শিল্পপ্রজ্ঞা থেকেই রূপান্তরিত এক আঙ্গিক। গগনেন্দ্রনাথের ছবিতে প্রাচ্য-প্রজ্ঞার এই রহস্যময়তাই আলোছায়ার দ্বৈতে বিশেস্নষিত হয়।

তাঁর কিউবিজমের দিকে অভিযাত্রার সূচনা হয় গাঠনিকতার হাত ধরে। এলাহাবাদ মিউজিয়ম সংগ্রহে তাঁর জলরঙে আঁকা একটি ছবি আছে যার শিরোনাম ‘প্রস্ফুটিত গুলমোহন’। সম্মুখভাগে ফুটে থাকা লাল ফুলের বিসত্মার। তাকে ছাড়িয়ে চিত্রক্ষেত্রের মধ্যভাগে রয়েছে একটি অট্টালিকা। এই অট্টালিকাশ্রেণির নির্মাণে শিল্পী ত্রিমাত্রিক জ্যামিতিক গাঠনিকতা ব্যবহার করেছেন। আবার ন্যাশনাল গ্যালারির সংগ্রহে আছে ‘শিল্পীর ডেস্ক’ নামে কাগজের ওপর কালিতে আঁকা একটি ছবি। টেবিলের ওপর অনেক কাগজপত্র ছড়ানো রয়েছে। এই হল ছবিটির বিষয়। এখানেও সাদা ও ধূসরে ত্রিমাত্রিক গাঠনিকতার আভাস আছে। এরকম গাঠনিকতার অনুশীলনের মধ্য দিয়েই গগনেন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে কিউবিস্ট জ্যামিতির দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

এরপর তাঁর জ্যামিতিক গাঠনিকতা দুটি ধারায় প্রবাহিত হতে থাকে। একটি ধারায় তিনি লৌকিক সুষমাকে বিশেস্নষণাত্মকভাবে উপস্থাপিত করেন। আর একটি ধারায় স্থাপত্যের জ্যামিতিকে আলোছায়ায় বিশেস্নষণ করেন। সেখানেও জানার ভেতর অজানা রহস্যের সঞ্চার ঘটান। প্রথম পর্বের ছবির মধ্যে দুটি ছবি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি জলরঙে আঁকা ‘সাত ভাই চম্পা’। নিম্নবর্তী বর্ণিল স্থাপত্যের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে পারুল বোন। তার দুপাশের ফুলের মতো প্রস্ফুটিত সাত ভাই চম্পা। বর্ণিল জ্যামিতিক ক্ষেত্রের এমন মায়াময় বিশেস্নষণ সারাবিশ্বের ছবিতে আগে কখনো দেখা যায় নি। লৌকিকের এই ব্যবহারও অতুলনীয়। দ্বিতীয় ছবিটির শিরোনাম ‘পাখির দ্বিপে রবীন্দ্রনাথ’। পাখি আছে, রবীন্দ্রনাথও আছেন; কিন্তু কেউই স্পষ্ট প্রতিভাত নয়। সকলেই মিলে গেছে বিচ্ছুরিত আলোকপুঞ্জের মায়ায়। আর একটি ছবির কথাও বলতে হয়। এর শিরোনাম ‘জাপানি পুতুল’। মুখোশ পরা দুটি মেয়ে দ- হাতে দাঁড়িয়ে থাকে বনানীর মধ্যে। লৌকিকের জ্যামিতিক ব্যঞ্জনা আমরা লক্ষ করি এখানেও।

দ্বিতীয় ধারার যে জ্যামিতিকতা, তাতে একদিকে রয়েছে স্থাপত্যের বিশেস্নষণ, আর একদিকে নাটকের মঞ্চের পরিম-ল। ‘স্টেজ ডেকরেশন’ নামে একটি ছবি আছে। আলো-আঁধারে পরিসরের জ্যামিতি নিয়ে খেলেছেন সেখানে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ বা ‘রক্তকরবী’ নাটকের মঞ্চের ছবিতেও এই জ্যামিতিকতা আমরা দেখতে পাই। এই রূপারোপই বিশেস্নষিত হতে হতে সাম্প্রতিক সর্বনাশের বিরুদ্ধে শিল্পীর প্রতিবাদী ভাষ্য হয়ে ওঠে। ‘ধ্বংসের আগে দ্বারকা’ শীর্ষক ছবিটি এরই একটি দৃষ্টান্ত। চিত্রক্ষেত্র জুড়ে অট্টালিকাশ্রেণি যেন টলমল করে ভেঙে পড়ছে। ‘কুরুক্ষেত্র’ ছবিতেও এই শূন্যতাই প্রসারিত হয়। গগনেন্দ্রনাথ এভাবে পুরাণকল্পকে সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভাষ্যে উপস্থাপিত করেন। এর ভেতর দিয়েও তিনি আধুনিকতাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটান।

এর পরের পর্যায়ে আসে গগনেন্দ্রনাথের রহস্যলোকের ছবি। কিউবিজমের জ্যামিতিকতা এখানে অনেক সংবৃত হয়ে এসেছে। গাঠনিকতার অবশেষ কিছু রয়েছে। কিন্তু তা মিশে গেছে মগ্ন অধ্যাত্মবোধের সঙ্গে। ‘নটীর পূজা’ ছবিটি আছে ‘কলা ভবন’ সংগ্রহে। ছায়াবৃত প্রেক্ষাপটে নৃত্যমগ্ন আলোকিত কবি দাঁড়িয়ে থাকেন। আর তাঁর পদপ্রামেত্ম উপবিষ্ট নটী। নৃত্য আর সংগীতে ঝংকৃত হয় আবহ। ‘সিঁড়িতে সাক্ষ্য’ শীর্ষক ছবিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে একটি চাতালে দাঁড়িয়ে থাকে দুই নারী। বাইরে উজ্জ্বল আলো। ভেতরে সংহত ছায়া। এরই মধ্যবর্তী অঞ্চলে মুখোমুখি দুই মানবী। গাঠনিকতাকে শিল্পী নিয়ে গেছেন আলোছায়াময় রহস্যলোকের দিকে। আঙ্গিক নিয়ে এত যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা সারাজীবন করেছেন গগনেন্দ্রনাথ, তার তুলনা তাঁর সমসাময়িককালে অবনীন্দ্রনাথ ছাড়া আর খুব বেশি নেই। অবনীন্দ্রনাথ যদি হন ধ্রম্নপদী বোধের শিল্পী, তাহলে গগনেন্দ্রনাথকে বলা যায় নবোন্মেষমুখী রোমান্টিক মননের শিল্পী।

গগনেন্দ্রনাথের সাংগঠনিক প্রতিভাও আমাদের সংস্কৃতিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে। ১৯২২ সালে কলকাতায় এসেছিল যে জার্মান এক্সপ্রেশনিক শিল্পীদের ছবি, তারও প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন গগনেন্দ্রনাথ। এই প্রদর্শনী তৎকালীন ভারতীয় চিত্রকলায় পাশ্চাত্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে আত্মস্থ করতে সাহায্য করেছিল। তাঁর সাহিত্যচেতনার স্বাক্ষর রয়েছে ১৯২৬-এ লেখা ‘দাদাভাইয়ের দেয়ালা’ বইতে। ১৯৮৬-তে তা ‘ভোঁদড় বাহাদুর’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। শিল্পী হিসেবে অনন্য প্রতিভাদীপ্ত ছিলেন এই মানুষটি।

Leave a Reply

*