logo

সাম্প্রতিক তিনটি প্রামাণ্যচিত্র

মা হ মু দু ল হো সে ন
যে তিনটি ছবি নিয়ে এই লেখা তার প্রতিটি ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো সাধারণ্যে প্রদর্শিত হয়েছে। ছবিগুলো চলচ্চিত্রামোদীদের মধ্যে একটি পর্যায় পর্যন্ত আলোচিত হয়েছে। সাড়া জাগানো কথাটা আপেক্ষিক, সেটা এক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাই না; আর সাড়া জাগানো ব্যাপারটা হয়তো অনেকটাই নির্ভর করে যোগাযোগ সুবিধাকে কে কতটা সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করছেন তার ওপর। তবে আমাদের চলচ্চিত্র-সংস্কৃতির বাস্তবতায় একটি প্রামাণ্যচিত্র কতদূর পর্যন্ত তরঙ্গ তুলতে পারে দর্শক পরিম-লে সে এক বিবেচনা বটে। তারপরও মনে হয়েছে প্রামাণ্যচিত্রের আগ্রহী দর্শকরা ছবিগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা প্রত্যাশা করে। সেই ধারণা থেকেই এ লেখার সূত্রপাত। আরো প্রামাণ্যচিত্র কিন্তু হয়েছে গত বছর। সব ছবি দেখা হয়নি। যেগুলো দেখেছি, তার মধ্যে এই তিনটি ছবির বিষয়ে নিজের মধ্যে কিছু পক্ষপাত লক্ষ করেছি। সে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। আর সংশ্লিøষ্ট মহলে এই তিনটি ছবি নিয়ে আগ্রহের বিষয়টিও কাজ করেছে।
জন্মসাথীর যাত্রায়
(জন্মসাথী, শবনম ফেরদৌসী, ৮০ মিনিট, ২০১৬)

জন্মসাথী দীর্ঘ এক দৃষ্টিনন্দন ডকুমেন্টারি। দ্বিতীয়বার যখন দেখছি ছবিটি তখন মনে হলো এই দৈর্ঘ্যরে চ্যালেঞ্জটি ভালোই মোকাবিলা করেছেন শবনম ফেরদৌসী। এক ঘণ্টা বিশ মিনিটের এই লম্বা আয়োজন ক্রমাগত নতুন কিছু প্রকাশ করে আর আমাদের দৃষ্টিকে আকৃষ্ট রাখে। প্রকাশের বিষয়টি আসলে গল্পটা বলার মুনশিয়ানার। যেভাবে সে উন্মোচিত হয়, জন্মসাথী ছবি অথবা শবনমের জন্মসাথীরা তা চলচ্চিত্রিক সময়ের সুব্যবহার করে। দর্শক শেষ পর্যন্ত একটা প্রকাশ এবং তার পূর্ণাঙ্গ অবস্থার জন্যে অপেক্ষা করে। যেন আমরা এক কাহিনি ছবি নিয়েই লিখছি! কাহিনি বনাম প্রামাণ্যচিত্রের আঙ্গিকের পুরনো আলোচনা নয়, আমরা জন্মসাথী ছবিতে প্রাপ্ত যে বলার ভঙ্গি তাকেই চিনতে চাইছি। সেখানে দেখছি একটি গল্পাংশের মতো ট্রিটমেন্ট (সুধীর পর্ব), সুধীর আর শামসুন্নাহার পর্বের মধ্যে যে যাতায়াত তা এক সময়-নির্দিষ্ট সমান্তরাল প্রবাহের স্বাদ দিতে চায়, আর প্রথমে যে খোঁজ Ñ শবনমের জন্মসাথীদের সন্ধানে, সে তো এক কাহিনির সূচনা পর্বই, যার শেষটা জানব বলে আমরা খানিক টানটান উৎকণ্ঠিত! এই বিস্তার এক সরল গল্পময় চিত্রনাট্যের। এই বিষয়ে আর অধিক কী! বরং দেখার সুখাবস্থার কথাটি বিশদ করা যাক। ছবিটি দেখতে ভালো। প্রচলিত সুন্দর কম্পোজিশন, ক্যামেরার দৃষ্টির ভারসাম্যময় চলিষ্ণুতা, নিরাপদ ট্র্যানজিশন দর্শককে এক স্বস্তিময় দায়মুক্তি দেয়। বিষয়ের উন্মোচনের ভার তাকে আক্রান্ত করে না, বিচলিত করে না। অথচ জন্মসাথী এমন বিষয়ের কারবারি যে, দর্শকের মধ্যে নানারকম নৈরাজ্যকর মানসিক টানাপড়েন সৃষ্টি হতে পারত। পরিতৃপ্তির চেয়ে বরং কোনো প্রকারের তাপ অনুভূত হতে পারত। সেটা অবশ্য শবনম চেয়েছেন কি না সে এক প্রশ্ন বটে। কারণ অভিব্যক্তির আঙ্গিকটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা তো তার আছেই। যে আঙ্গিকে তার কাজ, তাতে জন্মসাথী তার প্রসঙ্গটিকে সম্পূর্ণতা দিয়েছে, প্রসঙ্গটিকে দর্শকের জানার মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছে। এভাবেই ছবিটি দেখার প্রস্তাব করা যেতে পারে।
জন্মসাথী অংশগ্রহণমূলক এবং খানিকটা পারফরমেটিভ এক প্রামাণ্য ছবি। ছবিটিতে নির্মাতা এক প্রধান চরিত্র; আসলে এ ছবির উৎসই হচ্ছে তার এক আত্মানুসন্ধান। এই অনুসন্ধানের পশ্চাৎপটটিও বিশদে প্রকাশিত এই ছবিতে। শবনমের জন্ম ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। সেখানে সেদিন তেরোটি শিশুর জন্ম হয়েছিল। তাদের ভেতর ছিল কয়েকটি যুদ্ধশিশু। শবনম সেইসব যুদ্ধশিশুকে খুঁজে পেতে চান, তার জন্মসাথীদের সঙ্গে যুক্ত হতে চান, এই তেতাল্লিশ বছর পরে। এই তো এই ছবির যাত্রাটির প্রেক্ষাপট। কাজেই শুরুর ‘আমার সোনার বাংলা’, মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নারী নির্যাতনের ফুটেজ আর যুদ্ধশিশুদের জন্মের তথ্যের পরই শবনমের তেতাল্লিশতম জন্মদিনের অনুষ্ঠানের কেক কাটা দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করি। তারপর থেকে শবনমের আত্মকথনই এই ছবির কমেন্ট্রি, তার চলনের সূত্রধর, আর চলনটি স্বয়ং হচ্ছে তার যাত্রা জন্মসাথীদের খোঁজে। সংগতভাবেই ছবি জুড়ে তার ইমেজের উপস্থিতি তো আছেই। এভাবে আদলে জন্মসাথী এক অংশগ্রহণমূলক ছবি। শবনমের ভূমিকা কিছুটা পারফরমেটিভও এই অর্থে যে, শবনম নিজেই এই ছবির এক চরিত্র এবং এই প্রামাণ্যচিত্রের ভেতরেই তিনি এর প্রবাহের নিয়ন্তা হিসেবে দৃশ্যমান। কিন্তু এ ধরনের ছবি যেরকম ভীষণ ব্যক্তিগত বা ক্রীড়াময় বা অন্য কোনোভাবে ব্যতিক্রমী একটি দৃষ্টিকোণ থেকে ছবির বিষয়কে বিবেচনা করে এবং উপস্থাপন করে সেরকম অবশ্য এ ছবি নয়। এমনকি একটি পর্যায়ের পর আর শবনমের ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটের মতো কিছুকে ধরে অগ্রসর হয়নি এই ছবি। সুধীর, শামসুন্নাহার আর মনোয়ারা ক্লার্কের সঙ্গে যখন আমাদের যাত্রা আর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের ব্যাখ্যায় ‘যুদ্ধশিশু’ বিষয়টিকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা তখন শবনমের ভূমিকাটি সেখানে সূত্রধরের, ছবির পরিচালকের, উপস্থাপকের; কোনো চরিত্রের নয়। এই যাত্রা, এইসব জানা তার ভেতরে কীভাবে কাজ করে তা আর তলিয়ে দেখা হয় না আমাদের। শেষ পর্যন্ত শবনমের আত্মানুসন্ধানের কোনো মীমাংসিত গন্তব্যের বা অমীমাংসিত উপলব্ধির খোঁজ আমরা পাই না। এভাবে তার আত্মানুসন্ধানের বিষয়টির ক্রমশ নিরাকরণ হয়ে গেছে। বরং এক তথ্যানুসন্ধানী প্রামাণ্যকরণই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। শবনমের আত্মানুসন্ধানের মধ্যে আসলে এই ছবির জেনেসিস। সে নিজেই এই ছবির বিষয় নয়। বিষয়, যুদ্ধশিশুবিষয়ক তথ্যানুসন্ধান এবং দুই যুদ্ধশিশুর বিশদ স্টাডি; অপরজনকে চকিতে দেখা, কিছু জানায় বিদ্ধ হওয়া।
এ ছবির তথ্যানুসন্ধানের ভঙ্গিটি অবশ্য এক তীর্থযাত্রার মতোই। এর বিশদতা ও গভীরতা প্রণিধানযোগ্য। প্রথম ২৫ মিনিটের ১২টি দৃশ্যাংশের প্রায় প্রতিটিই কিছু নতুন তথ্য উন্মোচিত করে। এভাবে যুদ্ধশিশু বিষয়ে আমাদের মনোযোগ জোরদার হয়। প্রধান যে তথ্য বা অবলোকনগুলি প্রতিষ্ঠিত হয় তারা এরকম – ১. অন্তত চার-পাঁচশো যুদ্ধশিশু হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ছিল। সেখানে মায়েরা কেউ শিশুকে স্তন্য পান করাননি (শান্তি ডি কস্টা)। ২. দেশেই আছেন এমন যুদ্ধশিশুদের পরিবার বিষয়টি গোপন রাখতে চায়। যারা প্রথমে তা করেননি তাদের সমাজে নিগৃহীত হতে হয়েছে (শাহিনা হাফিজ ডেইজ)। ৩. অন্তত তিন হাজার যুদ্ধশিশু বিদেশে চলে গেছে দত্তক গ্রহণ করার ভেতর দিয়ে। অনেক সচ্ছল পরিবার তাদের রেপ-ভিকটিম আর যুদ্ধশিশুদের নিয়ে বিদেশে চলে গেছে (ডক্টর এম এ হাসান)। ৪. দেশের ভেতরে যুদ্ধের পরপরই ধর্ম অনুসারে কিছু দত্তক গ্রহণ করা হয়। অর্থাৎ হিন্দু পরিবার হিন্দু শিশু, মুসলিম পরিবার মুসলিম শিশু দত্তক নেয়। সেসময় একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন রেপ-ভিকটিমদের জন্যে গর্ভপাতের আয়োজন করে এবং বেশ কিছু গর্ভপাত ঘটানো হয়; যদিও গর্ভপাত বেআইনি ছিল। বিদেশে শিশুদের পাঠানো নিয়ে একপর্যায়ে কিছু বিতর্ক সৃষ্টি হয়। শিশু বিক্রির অভিযোগও ওঠে (ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম)। ৫. পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলিতে মায়েদের বাচ্চাদের নিকট থেকে আলাদা করলে মায়েরা তাড়াতাড়ি সুস্থ হতেন (মালেকা খান)। মালেকা খানই প্রথম এই ছবিতে একটি যুদ্ধশিশুর ছবি দেখান, যার সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। তিনিই জানান শিশুটিকে মাদার তেরিজা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তথ্যের সমাগমে ও গুণে একটি ক্যাজুয়াল আবেগময় জায়গা থেকে বিষয়টিকে দেখার বদলে আমরা ছবিতে বুদ্ধিবৃত্তিক মনোযোগ নিবদ্ধ করি। সমান্তরালে আমাদের মধ্যে শবনমের জন্মসাথীদের খোঁজ কাজ করতে থাকে, যাত্রাটি আমাদের মধ্যে সংক্রমিত হতে থাকে। তথ্য আর তার বিশ্লেষণের বিষয়টি ছবির মূল পর্বে প্রবেশ করার পর জারি রাখেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। যুদ্ধশিশুদের দৃশ্যাংশগুলির ভেতর দিয়ে যাত্রাকে যদি ধরি বিষয়ের আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, তাহলে তুরিন আফরোজের সাক্ষাৎকারগুলি এক ব্যষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে দেখায় আমাদের। আবার কনটেন্টের বিবেচনায় বলা যায়, যুদ্ধশিশুদের দৃশ্যাংশগুলি দর্শকের মধ্যে কীভাবে কাজ করবে সে বিষয়ে একধরনের যুক্তিগত প্রভাব নির্মাণ করে তুরিন আফরোজের কথন। এভাবে তথ্য এবং তার বিশ্লেষণ চলতে থাকে; আমাদের মধ্যে একটি দ্বিচারিতা কাজ করতে থাকে যেন! ব্যক্তি সুধীর না সুধীরের ভেতর দিয়ে প্রাপ্ত তথ্যের মধ্য দিয়ে যুদ্ধশিশুবিষয়ক এক সংহত জ্ঞান Ñ আমরা ঠিক বেছে নেই না, বেছে নিতে হয় না; কিন্তু এই যাতায়াত আমাদের ভেতরে চলতে থাকে। একটি সংশ্লিষ্টাবস্থা কি কাম্য ছিল Ñ একটি গভীর কোনো বোধ; হয়তো, ছবির নির্মাতার আত্মানুসন্ধানের ক্লাইম্যাক্সের ভেতর দিয়েই কোনো বোঝাপড়া? কিন্তু এ প্রশ্ন প্রাকল্পিক এবং কার্যত প্রসঙ্গবহির্ভূত।
ছবির সুধীর পর্বটি এক গল্প-পৃথিবীর সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। টপ অ্যাঙ্গেল থেকে তার বাড়ির এস্টাবলিশিং শট, আঙিনার নানা মীজ-অঁ-সীন, সুধীরের দীর্ঘ সময় ধরে বড় ক্লোজআপ, পোষা টিয়া পাখি, নিকানো উঠান, সেখানে বিত্তহীন কৃষি-পরিবারের দৈনন্দিনতা, আয়োজিত পরিকল্পিত সংলাপের সাক্ষাৎকার Ñ সব মিলে এক সাজানো-গোছানো গল্পের আয়োজনই যেন। কেবল টেপরী বর্মণকে প্রথমে অনুসরণ করে যেভাবে ঘরে ঢুকে পড়েছিল চলমান ক্যামেরা সে এক ভিন্নতা এই আয়োজনে। সে চলনে টেপরী বর্মণের অবিন্যস্ততার সমান হয়ে উঠেছিল। তেমন কিন্তু আর নেই, অন্তত সুধীর পর্বে। এমনকি টেপরী বর্মণ আর সুধীর যেন কাউন্টার পয়েন্ট নির্মাণ করে এই ‘গল্প-পৃথিবী’র। সুধীর এক আশ্চর্য অস্তিত্ববাদী মানুষ; নির্লিপ্ততাতেই তার পরিচয়। এই নির্লিপ্ততা কি এক অর্জিত শক্তি, অথবা, এক রক্ষাবর্ম ভীষণ দুঃসহ এই যাত্রায় – যা জীবন নামে তাকে যাপন করতে হয়? উলটোদিকে, টেপরী বর্মণ – সুধীরের মা, বীরাঙ্গনা-মুক্তিযোদ্ধা বিক্ষত, ক্ষুব্ধ, অভিব্যক্তিময়। তার স্মৃতি এবং বর্তমানের মধ্যে অনেক দগ্ধ অভিজ্ঞতা, অনুভব। আমরা তার আঁচ পাই। পার্শ্বচরিত্ররা Ñ সুধীরের মামা রমেশ বর্মণ, সুধীরের স্ত্রী, কন্যা জনতা – সকলে মিলে এই গল্প-পৃথিবীর সম্ভাবনাকে জায়মান রাখে। শাণিত সংলাপেরা আসে কখনো কখনো। তাদের সারাংশ করা যায় এভাবে। বোনের আত্মত্যাগই তাদের পরিবারকে রক্ষা করেছিল (রমেশ বর্মণ)। সন্তানের মুখ দেখে ভালো লেগেছিল। বাবা তাকে মেরে ফেলতে দেননি, বলেছিলেন এই ছেলেই বড় হয়ে তাকে ভাত দেবে; তিনি একা, ভীষণ একা, কেউ সঙ্গে নেই (টেপরী বর্মণ)। দাদিকে দেখে গর্ব হয়, প্রয়োজনে সেও একই আত্মত্যাগ করতে পারে (জনতা)। ‘জীবনটা কেমন?’ – এই প্রশ্নের উত্তরে সুধীর যে ‘ফাঁকা’ বলবে তা যেন আমাদের জানাই ছিল। বড় বড় ক্লোজআপে সুধীরের যে দৃষ্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছি এরই মধ্যে তা এই উত্তরের জন্যে আমাদের প্রস্তুত করেছিল। সেভাবে বললে ঢাকায় শহুরে নাগরিকদের মাঝে সুধীরের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া অবস্থা আর একটু বেসামাল আবেগ আসলে কিছুই যোগ করে না। কারণ সুধীর যা পাড়ি দেয় Ñ তার জন্মের নিদারুণতা, তার বেঁচে থাকার ক্রূরতার ভেতর দিয়ে – তার সবচেয়ে শক্তিমান প্রকাশ তার নির্লিপ্ততায়, তার স্বল্পভাষে। এর তুলনা নেই। আর জীবন যে এক বিচিত্র সার্কাস তার গল্পটা চূড়ান্ত হয় সুধীর আর তার স্ত্রীর সুখালাপের দৃশ্যাংশে। সে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বলা কথাই, ক্যামেরাকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু আমাদের ভ্রম হয়, যেন সে গভীর প্রেমের কোনো সংলাপগুলি – জীবনের ক্ষান্তিহীন সদর্থতায় নিবেদিত! এই দৃশ্যাংশ আসলে দর্শকের সেই দায়মুক্তিকেই সংহত করে, যার কথা শুরুতে লিখেছি। কিন্তু তর্ক তো এই যে, এসব কথা তাদের জীবনের অন্তর্গতই এবং সত্য!
সে তুলনায় শামসুন্নাহার পর্বটি অনেক বেশি কেজো প্রামাণ্যধর্মিতায় নির্মিত। যাদের বাড়িতে যাওয়ার উপায় নেই তাদের সঙ্গে, নির্যাতিত মাজেদা আর তার মেয়ে যুদ্ধশিশু শামসুন্নাহারের সঙ্গে শবনমকে দেখা করতে হয় চা-বাগানের বাংলোয়, ফসলের মাঠে, নালার ধারে Ñ এ বিষয়টি কি একটি সাজানো উপস্থাপনাকে ব্যাহত করেছে? সে এক সম্ভাবনা বটে। কিন্তু দেখি যে, এভাবে এসব দৃশ্যাংশের আঙ্গিক তার বিষয়ের প্রতি একধরনের সুবিচার করেছে। তারা সাহসী মানুষ। ক্ষমতাবান যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন – এর পরিণামকে জেনেই। তাদের জীবন বিপর্যস্ত, এলোমেলো, অনির্দিষ্ট। প্রায় ক্ল্যান্ডেস্টাইন। একভাবে তাদের সঙ্গে শবনমের কথা বলাও এক গোপন বিষয়; তাদের পরিচিত জন আর গ্রাম থেকে দূরে, প্রায় লোকচক্ষুর আড়ালে। আবার মাজেদা আর শামসুন্নাহারের মধ্যে যে সম্পর্ক তাও তো জটিল। মাজেদা হয়তো যুদ্ধ করে করে জীবনের কাছে খানিকটা জব্দ, ক্লান্ত। সে তুলনায় শামসুন্নাহার তিক্ত, বিষন্ন, অসুস্থ – কিন্তু এই স্বপ্নহীন, ভালোলাগাহীন জীবনকে সে দেখে নিতে উদ্যত, ভীষণ ক্রোধে নাকি সিদ্ধান্তহীনতায়। একজন নারী হিসেবে শবনম অনেক বেশি যুক্ত হতে সচেষ্ট হন শামসুন্নাহারের সঙ্গে। কিন্তু শামসুন্নাহারের জীবন ও বোধকে ঘিরে যে দেয়াল তাকে ভাঙা যায় না; তার নিঃসঙ্গতা, জীবনের অর্থহীনতা, বোধের শূন্যতা অনিরূপিতই থেকে যায় অনেকাংশে। আমাদের এই অক্ষমতা, ব্যর্থতা এক বড় জানা – শামসুন্নাহার পর্বটি থেকে। এই অমীমাংসিত, বিচল পর্বে বাংলার প্রকৃতির সৌন্দর্যের আনাগোনা হৃদয়বিদারক বটে! এমনকি তারা যখন শামসুন্নাহারের জীবন বা তার কোনো উচ্চারণের প্রতীকে ধরা পড়ে ক্যামেরায়, আমরা তাকে সেই কনোটেশনে গ্রহণ করতে পারি না। আমরা দেখি লং শটে অবারিত প্রান্তর, মেঘলা আকাশ, গাছের আড়ালে ডুবতে থাকা সূর্য, নদী আর তার জল, জলের ওপর ফড়িং Ñ এসব মুগ্ধ দৃশ্য। আমাদের শামসুন্নাহার বিষয়ে জানাটি বিচ্যুত হয়, আবারো দায়মুক্তি ঘটে।
বরং মনোয়ারা ক্লার্ক আমাদের বুদ্ধি ও দৃষ্টিকে সেরকম কোনো স্পেস দেন না। ‘I was angry because Bangladesh had given me away… I was angry, very angry.’ একটি সনদের জন্যে তার এদেশে আসা। সেটি জন্মসনদ। সেটি কি পাবেন মনোয়ারা ক্লার্ক? ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ তো দেখান যে, যুদ্ধশিশুদের বিদেশে দত্তক দেওয়ার সিদ্ধান্তটিই একটি পুরুষতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত কি না – এই প্রশ্ন তোলা যায়। কারণ এর পেছনের একটি প্রচ্ছন্ন যুক্তি তো এই যে, শিশুটির পিতা এদেশের কেউ নয়। তাহলে শুধু মায়ের পরিচয়ে কি একটি শিশু বাংলাদেশের নাগরিকের অধিকার পাবে না? লক্ষ করি, সুধীর এদেশে ভোটার হয়েছেন। তার পিতার নামের জায়গায় লেখা আছে সেই লোকটির নাম যে তার জন্মেরও আগে তার মায়ের স্বামী ছিলেন। যিনি তার নির্যাতিত মাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেননি, সুধীরের পিতৃত্বের স্বীকৃতি তো অনেক দূরের কথা। তারও আগে তুরিন আফরোজ জানতে চান আমরা এইসব শিশুকে দত্তক দেওয়ার আগে কি জেনেছি, তারা নিজেরা কী চায় বা তার মা কী চায়। এইসব একরাশ জটিলতা, অস্বস্তি, অপ্রস্তুত দায়। এই চালটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেবল এই পর্বেই।
শবনম ফেরদৌসীর জন্মসাথীরা এই ছবির সময়কালে আমাদের জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেন। আমরা যে বাস্তব স্পেসে বসে এই ছবি দেখি, সেখানে তারা আবির্ভূত হন না শরীরে, কিন্তু তারা চলচ্চিত্রের বিভ্রমকে অতিক্রম করতে পারেন। আমাদের চৈতন্যে তারা এক শরীরী অভিজ্ঞায় নির্মিত হন। এটি এ ছবির বড় পারা। যে তারা অতিক্রম করে যান না আমাদের বোধের প্রাথমিকতা অথবা আমাদের মধ্যে নির্মিত হয় না নিরাপদ জীবন যাপনের এক দুর্বাস সমান্তরাল সে আমাদের বাড়তি চাওয়াই। শবনমের ছবিটি যেন সেরকম প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু নিজেকে সীমিত রাখে, সংযত রাখে Ñ চেনা সংবেদের ঘেরে।
কিন্তু কে বলে জীবনে নাটক নেই, নাটক কেবল নাটকেই প্রাপ্য? সেই যে সুধীর, যে শুধু টিকে থাকায় নিমজ্জিত এক করুণ নাবিক, তার মোবাইল ফোনটি যখন ডাক দেয় তখন চমকে উঠি না আমরা? ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা…’ ইত্যাদি, ইত্যাদি! জীবন আসলে এক ক্ষান্তিহীন নতুনতা। তার অভিজ্ঞতার নির্মাণই তো চলচ্চিত্র; জন্মসাথী সে সার্থকতার মর্যাদা পায়।
ঝলমলিয়ার গাথা
(ঝলমলিয়া, সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল, ৬০ মিনিট, ২০১৬)

ঝলমলিয়া ও আত্মবাচনিক কিছু কথা
ঝলমলিয়া নামের একটি ছবির খবর সেরকম কোনো সাড়া জাগায়নি। খবর বলতে তো এতটুকুই যে, এ নামে একটি ছবি তোলা হচ্ছে। আসলে, শাব্দিক অর্থে ছবিটি ততদিনে তোলা শেষ হয়েছে; চলছে যাচাই-বাছাই, ডিকম্পোজিশন! সাইফুল ওয়াদুদ হেলাল নামের মানুষটি কানাডা প্রবাসী; সেখানে বসেই ওই ছবি গড়ার কাজটি হচ্ছে। আর হ্যাঁ, ঝলমলিয়ার ছবি তুলতে তিনি গেল কয়েক বছরে বাংলাদেশে ঘুরে গেছেন বেশ কয়েকবার, অথবা তিনি যখন এসেছেন এদেশে তখন ছবি তুলেছেন ঝলমলিয়ার; দূর দক্ষিণের কোথায় যেন গিয়ে। ছবিটি নিয়ে হেলাল ফেসবুকে এটা-ওটা পোস্ট দেন; এখন তখন। সেসব আমরা দেখি, কিন্তু দেখি না। যেমন দেখি আরকি ফেসবুক! তো হেলালের এই নতুন অ্যাডভেঞ্চার তেমন কোনো সাড়া তোলেনি; আমার মনে পড়ে না আমরা কোনো আড্ডায় এ নিয়ে উত্তেজনা প্রকাশ করেছি। শপথ করে অবশ্য একথা বলা নয়; কারণ আমি আড্ডার ভালো কারিগর নই। কিন্তু কেন যেন মনে হয় ঝলমলিয়া ঠিক আলোচনায় ছিল না। এসব কিন্তু গত বছরের বর্ষা অথবা শরৎকালের কথা।
হেলালকে চিনতাম অবশ্য। তার ছবি অপরাজেয় বাংলা নিয়ে উজ্জীবিত বোধ করেছিলাম। অপরাজেয় বাংলার ইনটিউটিভ ফর্মালিটি ছবিটিকে মনে করিয়ে দিত, দেয় যখন তখন। সিনেমা নিয়ে এলোমেলো ভাবনার সময় উড়ে এসে বহুবার জুড়ে বসেছে ছবিটি আমার ভেতরে। দুটি লেখায় ছোট করে অপরাজেয় বাংলা নিয়ে মন্তব্য করেছিলাম। সে যৎসামান্যই। আর জানা ছিল হেলাল ছবির হাটের মানুষ! অপরাজেয় বাংলার প্রেরণাটা মিলে যায় ব্যাপারটার সঙ্গে। এই ভেবে ভালো লাগত যে, লোকটির সৃজনশীলতা তার জীবনযাপন থেকে প্রোটিন পায়! ছবির হাটের বন্ধুদের সূত্রে তার সঙ্গে কথাও হয় ফোনে। তখন তিনি ঢাকায়। অপরাজেয় বাংলার একটি কপি চাইতেই পাওয়া যায়। পরিচয় তার চেয়ে বেশি এগোয় না। সেটা আমার গোটানো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই।
অক্টোবরের গোড়ার দিকে ঝলমলিয়া নিউইয়র্কে একটি উৎসবে দেখানো হয়েছে, এমন সময়, হেলালের কাছে ছবিটি দেখার জন্যে অনলাইন লিংক চেয়ে বসলাম! কাজটি খুব শোভন নয় এবং ছবির নির্মাতার জন্যে বিব্রতকর হতে পারে। কারণ ছবিটির তখন পর্যন্ত কোনো প্রিমিয়ার শো হয়নি; কেউ দেখেনি বললেই চলে। এরকম অরাজক কাজ করি মাঝে মাঝে; কিন্তু এক্ষেত্রে মনে হয়েছিল ছবিটি আমি দেখতে চাই; অপরাজেয় বাংলা দেখার অভিজ্ঞতা আমার মধ্যে কাজ করছিল Ñ এরকমই এখন মনে হয়। হেলাল কিন্তু কথা বাড়াননি, পত্রপাঠ ছবির লিংকটি পাসওয়ার্ডসহ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
অক্টোবরের তিন তারিখে আমি প্রথম দেখি ঝলমলিয়া। আমার প্রথম যে অনুভূতিটি হয় ছবিটি দেখে সেটি আত্মশ্লাঘার। আমার মনে হয় যে, আমি ছবি চিনতে ভুল করিনি। অথচ এটি নিজের সঙ্গেই মিথ্যাচার! এ ছবি সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিল না। সুতরাং চেনা না চেনার কথাটি অবান্তর। আবার এভাবেও আমি তুষ্টিতে ভুগি যে, আমিই প্রথম এদেশে ছবিটি দেখলাম। এটাও অনুমানের চেয়ে বেশি কিছু নয়। কারণ এ বিষয়ে আমার কাছে কোনো তথ্য ছিল না। হেলাল তার বন্ধুদের সঙ্গে, পরিচিত চলচ্চিত্রজনদের সঙ্গে ছবিটি শেয়ার করে থাকতেই পারেন। কিন্তু আমি এই দুই বোধ নিয়ে বেশ তৃপ্ত এক অবস্থায় তখন। এই তৃপ্তিবোধ কেন কাজ করেছিল?
একটি ছবি দেখার পর তার সঙ্গে আমরা কয়েক রকমভাবে সম্পৃক্ত বোধ করতে পারি। চলচ্চিত্রে উপস্থাপিত চলমান ছবির যে আকস্মিকতা তা আমার কাছে নতুন বা উদ্দীপক মনে হতে পারে; ছবির ওভারটোন আমাকে এক বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপে এনগেজ করতে পারে; ছবিটি আমার সংবেদন ও স্বজ্ঞাকে শাণিত করে তুলছে একথা মানতে হতে পারে; আদর্শগতভাবে আমি ছবিটির পক্ষপাতী হয়ে পড়তে পারি Ñ এই আদর্শ চলচ্চিত্রের বিষয়গত হতে পারে; আবার চলচ্চিত্রিক আঙ্গিকগতও হতে পারে। ঝলমলিয়া আমাকে কীভাবে সম্পৃক্ত করেছিল? ছবিটি আমি দেখতে থাকি Ñ প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় কয়েকদিন ধরে। একসময়, আমার মনে হয়, আমি ঝলমলিয়াকে অতিক্রম করে যাই, আমি এমন সব চিত্রময়তা এবং চিত্রকল্প নির্মাণ করে নিতে পারি যা ঝলমলিয়ার চেয়ে বেশি কিছু, যাদের অনুপ্রাণিত করে ঝলমলিয়া। আর যে দেখার অবয়ব আমি নির্মাণ করতে থাকি আমার ভেতরে তা ভীষণ নতুন ও নতুন চেনার অ্যাডভেঞ্চারে যুক্ত। ঝলমলিয়ার ইমেজের নতুনতা এই অতিক্রমকে অর্জন করে। এখন ফিরে দেখে বলা যায়, তার নতুনতা, ঝলমলিয়ার ইমেজের, আসলে এক প্রকল্প বটে। এই প্রকল্প সহজ সৌন্দর্য বিষয়ে অবিব্রত পক্ষপাতের, এক অবিরাম দেখার এবং দেখার ভেতর দিয়ে মননশীল পাঠের। এভাবে ঝলমলিয়া যে জীবনের ছবি সে জীবনের রূপ সম্পর্কে আমাকে উজ্জীবিত করে। আমি দক্ষিণের রামপাল থানার হুরকা গ্রামের একটি দৃশ্যমান অভিজ্ঞতা নিজের ভেতরে নির্মাণ করে নেই। কিন্তু আরো যা ঘটে তা হলো ঝলমলিয়ার মিথ, ভিজ্যুয়াল টোটেম এবং হুরকার জীবনবিষয়ক তুচ্ছতাগুলি একটি বিষয়গত ওভারটোন সৃষ্টি করে। হেলালের রোমান্টিকতা আমাকে জলজ পদ্যময়তায় কেন যেন ভাসিয়ে দেয় না। আমি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এনগেজমেন্টের তাগিদ অনুভব করি। আর আদর্শিক একটি পক্ষপাতও তৈরি হয়। অনেকেই হতাশ হবেন, কিন্তু হেলালের নাগরিক মননের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করি ঝলমলিয়া দেখে! কিন্তু সে প্রসঙ্গ পরে।
ঝলমলিয়া তাহলে এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ! যেন সে এক বিশেষ নমুনা Ñ চলচ্চিত্রের, প্রামাণ্য ছবির। আর এভাবেই সে আমার মধ্যে সেই তৃপ্তাবস্থা সৃষ্টি করেছিল।

ঝলমলিয়া বনাম হেলালের মানস ও মনন
হেলাল ঝলমলিয়ার বিষয়টির প্রতি অগ্রসর হয়েছেন একটি নাগরিক মননশীলতার দিক থেকে। তিনি যে ২০০৯ সালে ছবির হাটের বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েছিলেন হুরকা গ্রামে আর যোগ দিয়েছিলেন সনাতন মেলায়, তখন কিন্তু চলচ্চিত্রের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ছবি যা তুলছিলেন তিনি আর তার বন্ধুরা তা অনির্দিষ্ট, অনির্ধারিত ব্যাপার Ñ যেমন ঘটে আর কি এরকম ভ্রমণে। সব ছবি তোলারই তো প্রাথমিক উদ্দেশ্য প্রামাণ্যকরণ Ñ বিষয় এবং ছবি তুলিয়ের অহংয়ের! এভাবেই তাহলে ঘটনার শুরু। কিন্তু আমাদের হাতে যে ছবিটি এখন Ñ ঝলমলিয়া Ñ সে তো আর সেই পরিকল্পনাহীন কিছু ইমেজ ধরে রাখার ব্যাপারটি নয়। দুইশো ঘণ্টার তোলা ছবি বেছে, বাদ দিয়ে, গুরুত্ব বাড়িয়ে, কমিয়ে একটি ষাট মিনিটের (পরে আরো দশ মিনিট বাদ গেছে দেখছি) উপস্থাপনা। অবশ্য পরের ভ্রমণগুলিতে নিশ্চয়ই চলচ্চিত্র নির্মাণের বিষয়টি দানা বাঁধতে শুরু করেছিল, অনেক অথবা কিছু দৃশ্যায়ন নিশ্চয়ই একটি বিশেষ ছবির কথা ভেবেই করা। সেই বিশেষ ছবিটি এখন এই ঝলমলিয়া। মনে হয়েছে, নগরের মানুষের যে নানারকম উচ্ছ্বাস এবং প্রগল্ভতা থাকে গ্রাম অথবা প্রান্তিক জনপদ নিয়ে হেলাল সেভাবেই যাত্রা করেছিলেন। তার ছিল অনভিজ্ঞতা এবং অজ্ঞতা Ñ হুরকার মতো জনপদ এবং ঝলমলিয়ার মতো পৌরাণিকতা বিষয়ে। ঝলমলিয়া ছবির দৃষ্টিক্ষেপের মধ্যে সে সরল বিস্ময় এবং আবিষ্কারের আনন্দ অবিরাম, প্রচুর। আর এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হেলালের উন্মূল অস্তিত্বের অভিব্যক্তি। এ ছবির ধারাবর্ণনা, হেলালের নিজের পাঠে, আমাদের জানায় তার নাগরিকতা-বিষয়ক সংকট ও অভাববোধগুলির কথা। ঝলমলিয়ার সঙ্গে জাক্সটাপজিশনে এসব কথা ছবিটির হয়ে ওঠার বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে। একদিকে এই অচেনা, অজানা জনপদবিষয়ক জলজতা আর তার সঙ্গে উদ্্যাপনহীন নাগরিকতার কঠোরতা। এভাবে ঝলমলিয়া দাঁড়ায় এক সংহত ভূমিতে। সে ভেসে যায় না উচ্ছ্বাসে, প্রগল্ভতায়; সে পা-িত্যে বারোটা বাজায় না। হেলাল হুরকায় বহিরাগতই। সেভাবেই অন্তত তিনবার সে আসে গ্রামটিতে, গ্রামের মানুষেরা তাকে চেনে সেই লোকটি হিসেবে, যে সনাতন মেলায় আসে বারবার, যে ছবি তোলে, কিন্তু সে ছবি টিভিতে দেখাতে পারে না; তারা খোঁজ নেয় তাদের ছবি বিদেশ থেকে টাকাপয়সা আনবে নাকি হেলালের কপালে! সুতরাং হেলাল হুরকার অংশ নয়, পারফরম্যান্সের ভেতর দিয়ে ঝলমলিয়ার কেউও সে হয়ে উঠতে চায় না। সে দেখে, তার দেখার ভেতর দিয়ে এই দৃশ্যকাব্য নির্মিত হয়। একটি নাগরিক দৃশ্যকাব্য, যার সংযত রোমান্টিকতা, যার মৃদু উদ্বেলন এক শেকড়ের সন্ধানে, যার ভিজ্যুয়াল নৃতত্ত্ব নির্মাণের প্রতিশ্রুতি মিলে এক চলচ্চিত্রিক ঐশ্বর্য। কিন্তু আত্মসাতের বিষয়টি ঘটে না। এরকম বিষয়ে যখন রচিত হয় শিল্প, অভিব্যক্তি, তখন তাকে নিংড়ে অনেক সময় নির্মিত হয় শিল্পের পুঁজি। হেলালের মনন সেদিকে ধাবিত হয় না। এ ছবির কোনো এজেন্ডা নেই; হুরকার জীবনের ঊনতা অথবা প্রাচুর্য বিষয়ে তার কোনো বিশেষ অনুসন্ধান নেই। এই জনপদ তাকে টানে। এই টান থেকেই তার দেখা, দেখে যাওয়া; তারপর নির্মাণের সংহতি।
ঝলমলিয়া আসলে হেলালের ভেতরে নির্মিত হয়। সেভাবে বললে হুরকাও নির্মাণ করে হেলালই। একথা অবশ্য তাচ্ছিল্যে বাতিল হয়ে যেতে পারে যে, সব চলচ্চিত্র, সব অভিব্যক্তিই কি তা নয়! যা উপস্থাপিত হয় ভোক্তার সামনে, তা তো আসলে অভিব্যক্তি-নির্মাতার প্রস্তাবনাই, অথবা, ব্যাখ্যা বিষয়টি প্রসঙ্গে। কিন্তু বলব যে, এ হচ্ছে এক ব্যাপক সাধারণ প্রকল্প। যে বিশেষ অর্থে ঝলমলিয়াকে হেলালের অন্তর্গত নির্মিতি বলতে চাই তা তার প্রামাণ্যাবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। লক্ষ করা যেতে পারে, ঝলমলিয়া, সেই পৌরাণিক জলাশয় যতেœ এবং ডিটেইলে প্রামাণ্যকৃত নয়। কিছু উঁচু ও নিচু কোণের লং শট এবং সামগ্রিকভাবে এক ধরনের সাবক্টেভিজমে আক্রান্ত ঝলমলিয়া। অথচ, একটি গড়পড়তা প্রামাণ্যচিত্রকে কল্পনা করুন। সেখানে ঝলমলিয়া সবিস্তারে উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা, তার সঙ্গে তার ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস। এখানে এই জলাশয়, ঝলমলিয়া, দেখা ও অদেখা, বাস্তব ও স্বপ্নের মধ্যে প্রায় এক পরাবাস্তব আঙ্গিকে প্রকাশিত। কারণ, এভাবেই সে গঠিত হয়েছে হেলালের মানসে। আর হুরকা একটি জনপদ হিসেবেও হেলালকে কীভাবে ধরে রাখে, টানে তা-ই আসলে প্রামাণ্যকৃত হয়। কিছু গল্পরা গড়ে উঠতে চায়, কিছু ইঙ্গিত। সুমাইয়ার বাবার ছাগশিশু ধরে বিক্রি করে দেওয়া অথবা সুমাইয়ার মার চুল বিক্রির ঘটনাগুলো ভাবুন। আর সেই যে, সুমাইয়াদের বাড়িতে চলতে থাকা টেলিভিশনে নগরের গ্রাম্যতা, এখানে সেখানে জীবনের নানা তরঙ্গ Ñ কুটুমবাড়ি যাওয়া, বিয়ে, ভ্যান আর নৌকায় চলাচল, ছোটখাটো কায়-কারবার, ব্যবসা-বাণিজ্য Ñ এসব মিলে হেলালের ঝলমলিয়া। বেশির ভাগই ক্যাজুয়াল লং শটে দূরবর্তী অবলোকন। আর বর্ষার সে জনপদ তো হেলালের ক্যামেরা দেখেনি আগে! তখন, তার দৃষ্টি পুরোটাই ইনটিউটিভ, বিপজ্জনকভাবে জলজ তো বটেই। সে জলজতা কাটেনি ঝলমলিয়ার জন্মচক্রে। সম্পাদনাতেও থেকে গেছে তার ছাপ, শটের বাছাইয়ে, সুরের যুক্ততায়। এভাবে গড়ে ওঠা ঝলমলিয়া চলচ্চিত্র একটি জনপদবিষয়ক সর্বব্যাপী প্রামাণ্যচিত্র হয়ে ওঠে না। তার দেখায়, প্রামাণ্যকরণে নির্মাতার পক্ষপাতের, মননের বিবেচনাটি প্রবল।
সে কারণেই একটি নিটোল, অ্যাকাডেমিক এথনোগ্রাফিক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে না এই ছবি। কিন্তু নির্মাতার মনন ভিজ্যুয়াল নৃতত্ত্ব-বিষয়ক একটি কাজ করে। হেলাল এই জনপদের পৌরাণিকতা, এর ইতিহাস, এর সমকালীনতার দৃশ্যরূপ নির্মাণ করেন। তিনি অগ্রসর হন তার স্বজ্ঞার দ্বারা পরিচালিত হয়ে, মেজাজে যে ছবি নির্মিত হয় তার মধ্যে পরাবাস্তবতার অনুভব আছে, আছে জনপদবিষয়ক নাগরিক কাব্য। আমরা মানব যে, এখানে যে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারগুলো আছে সেগুলি নিশ্চয়ই সচেতন প্রয়াস! কিন্তু হেলালের সংবেদ যেভাবে প্রবেশ করেছে এই জনপদের গভীরে তাতে মূলত তার স্বজ্ঞা তাকে যথার্থ জ্ঞানে পৌঁছতে সাহায্য করে। সব মিলে এই প্রান্তিকতা, জলাবদ্ধ জমি, মরতে থাকা নদী, সাহসী এবং সংগ্রামী জীবন, মতের সংঘাত, রাজনীতি, একাকিত্ব, সংঘবদ্ধতা, স্পিরিচুয়ালিটি – সব কিছুকে পাই আমরা।
সব ছাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত হেলাল ছুঁতে চান এক মহান মানবিকতাকে। ঝলমলিয়াকে ঘিরে ছয় ঘর হিন্দু আর এক ঘর মুসলমান যে জনপদ গড়েছিলেন – আজ যার নাম হুরকা Ñ তার সামগ্রিকতা হেলালকে এরকম সৃজনশীল হয়ে উঠতে প্রেরণা দেয়। বলতে তো পারি যে, ঝলমলিয়া একভাবে হেলালের এক বিকল্পানুসন্ধান Ñ তার যাপিত জীবনের এবং সকল সমকালীন বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তির। ‘এমন সমাজ কবে গো সৃজন হবে…’ বলে হেলাল তার মানবিক ইউটোপিয়াকে ঝলমলিয়ার শেষ ফ্রেমে ধারণ করেন। আদর্শ নয়, কারণ আদর্শের আছে প্রাণহীন কানুন; তার চেয়ে হুরকার জীবনের সামান্যতা আর মানবীয় বিচ্যুতি, ঝলমলিয়ায় তাদের বিশ্বাস ও সমর্পণ এবং এক প্রকারের আদি যাত্রা এই মানবিক বিকল্পের সূত্রধর।
এভাবে সাইফুল ওয়াদুদ হেলালের মনন ও মানসে গড়ে ওঠে ঝলমলিয়া চলচ্চিত্রটি।

ঝলমলিয়া বনাম হুরকা
ছবির নাম যে ঝলমলিয়া তা আমাদের এভাবে প্রস্তুত করে যে, এই পৌরাণিক জলাশয়টিই তবে আমাদের দেখার বিষয়। কিন্তু আমরা ক্রমেই হুরকার মুখোমুখি হই এবং জানি যে, এই চলচ্চিত্রটি ঝলমলিয়ার কোনো পবিত্র বিচ্ছিন্নতা-বিষয়ক তথ্যকাহিনি নয়। হেলাল হুরকা গ্রাম এবং তার মধ্যে মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিই আগ্রহী আসলে। ঝলমলিয়া নামের জলাশয়টি এই জনপদের সৃষ্টির আদিকথার সঙ্গে যে জড়িত এবং যে আখ্যান তাকে ঘিরে তাও স্বভাবতই আকৃষ্ট করে হেলালের দৃষ্টিক্ষেপকে। তার পরও এটা আগ্রহোদ্দীপক যে, আমরা যেন এক দ্বৈততার ইঙ্গিত পাই ছবির গড়নে, চলনে। আমাদের, দর্শকের বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহল জেগে ওঠে। হেলাল কি সম্ভব হলে এড়িয়ে যেতেন হুরকার যাপিত জীবনকে, নাকি হুরকা যে ঝলমলিয়ায় অবধারিত এটা মেনে নেন তিনি? প্রায় দুটি ফর্মালিটি যেন আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলে এই চলচ্চিত্রে। একটি এক জনপদবিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলিকে ধারণ করে অগ্রসর হতে চায়। সেখানে অবজেক্টিভ সাক্ষাৎকারগুলি আছে, কিছু তথ্য আহরণের ব্যাপার আছে। হুরকার প্রকৃতির পরিবর্তন; সাইক্লোন অথবা টর্নেডোর ছোবল, নদীর মরে যাওয়া, তার দরুন মানুষের বদলে যাওয়া পেশা, যা আসলে টিকে থাকার সংগ্রাম, বাস্তুচ্যুতি, জলাবদ্ধতা, চিংড়ির ঘের Ñ এসব নিয়ে কেজো হয়ে উঠতে থাকে চলচ্চিত্র ঝলমলিয়া। ব্যক্তি মানুষের বিচ্ছিন্নতা, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, প্লাস্টিক ব্যাগ Ñ এসব সাম্প্রতিকতাও চোখ এড়ায় না হেলালের ক্যামেরার। এইসব মানুষ, এই জীবন কখনো হয়তো ঝলমলিয়ার পৌরাণিকতা এবং আধ্যাত্মিকতা থেকে অনেক দূরবর্তী, হেলালের মতোই! সাক্ষাৎকারগুলির সঙ্গে এইসব প্রামাণ্যকরণকে একত্রিত করে একটি লাগসই ছবি তৈরি করে ফেলা যায় বটে। কিন্তু লক্ষ করি যে, হেলাল এইসব জীবনের পাঁচালিগুলিকে স্পর্শ করে যান, এদের ভেতরে প্রবেশ করেন না। তিনি যেন এক জনপদের জীবনের স্পন্দনকে শোনান; যে ‘এইরকম জীবন চলতে থাকে’ Ñ তা আমরা জানি।
অন্যদিকে এই জনপদ সৃজনের যে লৌকিক ইতিহাস তার কেন্দ্রে আছে ঝলমলিয়া। গাছের মাথায় মাথায় যে সাহসী মানুষেরা উত্তর থেকে এসেছিলেন নতুন আবাস আর আবাদের জন্যে তারা এই টলটলে দীঘির প্রেরণায় এখানে থিতু হয়েছিলেন। তারা এখানে বাঘের জঙ্গল কেটে জীবন নির্মাণ করেছিলেন। একথা কিন্তু তাদের, হুরকার আজকের মানুষের যৌথ-অবচেতনে সদা বিরাজমান। তারা ঝলমলিয়ার পানি পান করেন, ঝলমলিয়ার ঘাটে তারা প্রশান্তি এবং যৌথতাকে খোঁজেন। আর এ অলৌকিকতা তাদের মুখে মুখে যে, আজও যখন সমুদ্রের নোনা জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় পুরো হুরকা গ্রাম, তখনো মিষ্টি থাকে ঝলমলিয়ার পানি। এভাবে ঝলমলিয়াকে ঘিরে অনেক গল্প Ñ বিশ্বাসের আশ্রয়! আর রাস পূর্ণিমার রাতে এই ঝলমলিয়াকে ঘিরে অনেক আলো, স্নান-গান এক উৎসব বটে, জীবনবিষয়ক, দারুণ সদর্থে। এভাবে এই জীবনে ঝলমলিয়ার প্রাসঙ্গিকতা, পূর্বনারী ও পুরুষের গাথায় এবং এই দহিত জীবনের যাপনে। প্রামাণ্যচিত্রনির্মাতা এই জীবনে ঢুকে পড়েন সেই সনাতন মেলায় আসার ঘটনাচক্রে। এক আশ্চর্য মৃদুস্বর প্রতিবর্ত সম্পর্কের মধ্যে হেলাল প্রবেশ করেছেন ঝলমলিয়ার সঙ্গে, হুরকা জনপদের ভেতর দিয়ে। নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে যে নিষ্করুণতা, কোলাহল ও বিচ্ছিন্নতা মেট্রোপলিসমূহের তার মোহন প্রতিকার এই ঝলমলিয়ার গল্প ও দৃশ্যমানতা; আর তাকে যে পাওয়া হুরকার মানুষ জীবন আর মানুষগুলোর ভেতর দিয়ে তাকে তিনি মানেন। হুরকার সমকালীনতার অবভাষ তাকে এই প্রামাণ্যগল্পের ওপরকাঠামোটা দেয়, সেটার অযতœ তার এই সময় তক্ষণকে অবয়ব দিত না, সেও মান্য।

ঝলমলিয়া ও অতিক্রান্ত বাস্তবতা
ঝলমলিয়ার প্রশান্ত স্পিরিচুয়ালিটি আর হুরকার সমকালের ক্রূরতাগুলি Ñ এই দুই মিলে এই ছবির বাস্তবতা। তিন বছর আগে যে নদীতে স্টিমার চলত, এখন (২০১২) সেখানে বিশাল বালুভূমি। আরো আগেই (২০০৯) শুনেছি যে ১৫-২০ বছর আগে ধান হতো যে জমিতে এখন নোনা পানির চিংড়ির ঘেরের কারণে সেখানে আর ধান হয় না। ২০১৫-তে আমরা শুনি নদীতে ট্রলারও আর চলে না। নদী নেই বললেই চলে। কেন নদী নেই, সে নিয়ে কিন্তু নানারকম মত। সরকারি উদ্যোগে নদীর যে ড্রেজিং হচ্ছে তার ফলাফল বিষয়ে উৎসাহী তেমন কেউ নেই। কেউ ঘেরের বিরুদ্ধে, কেউ আবার সেই উজানে ফারাক্কা বাঁধের বিরুদ্ধে। ঘের কারো রোজগারের পথ, কেউ ঘের কেটে দেওয়ার পক্ষে। হুরকার জীবনে রাজনীতি আছে, আমরা বুঝতে পারি। আর এনজিওগুলো যে আছে তা তো আরো স্পষ্ট। ঝলমলিয়ার জল তাদের আগ্রহের বিষয় এটা কৌতূহলোদ্দীপক। তারা সে জল পরিশোধন করে পান করাতে চান, তারা সে জলবিষয়ক পরিসংখ্যান নিয়ে মাথা নষ্ট করছেন তাও শুনি। পুরুষ কত জল নিল, মহিলা কত জল নিল, প্রতিবন্ধী কত জল নিল, নসিমনে গেল কত জল আর ভ্যানে গেল কত জল Ñ এসব জরুরি হিসাব তারা কষছেন! কিন্তু বাস্তব হচ্ছে শিশুরা ঝলমলিয়ার মিষ্টি পানি বহন করে নিয়ে যায় তেতে ওঠা ইটের সড়ক আর গলা পর্যন্ত নদীর জলের ভেতর দিয়ে।
সুমাইয়াদের পরিবারটিকে হেলাল কেন যেন নিবিড়ভাবে বোঝার চেষ্টা করেন ২০১৫ সালের বর্ষায়। হুরকার পারিবারিক জীবন বিষয়ে এটি এক প্রতিবেদন – এভাবে ভাবব কি? সুমাইয়ার বাবার বিষয়ে আমরা মনস্থির করতে পারি না। তার সাক্ষাৎকারটি কিছু যোগ করে না। সুমাইয়ার মা সাহসী, পরিশ্রমী এক নারীর প্রোফাইল নির্মাণ করেন। আইলা ঝড়ের সঙ্গে তার সংগ্রাম আর বিজয়ের গল্পে, তার সংসারের নিত্যকর্মে এসব প্রতিষ্ঠিত হয়। তাকেই যখন দেখি শখের ফেরিওয়ালার কাছে মাথার চুল বিক্রি করতে তখন তিনি নতুন হন। অথবা তার সঙ্গে যখন হুরকার পথে হাঁটে হেলালের ক্যামেরা তখন এই পরিবারে তার হতাশার কথাগুলি তার প্রোফাইলে আরো কিছু যুক্ত করে। হেলালের স্টাডিও ধনী হয়ে ওঠে। বিপরীতে সুমাইয়ার বাবার ছাগলের বাচ্চাটিকে মায়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার দৃশ্যটি যেন সুযোগের অপেক্ষায় ছিল পরিকল্পিত মন্তব্যের। আর সুমাইয়া তো কিশোরী, পুকুরের জলে কাটে তার রোদ থৈ থৈ দুুপুর! তার মা-বাবা প্রবল বৃষ্টি আর স্রোতের মধ্যে বাঁধে ঘের দিয়ে মাছ ধরে। হেলাল লং শটের দীর্ঘ টেকে জীবনের এই অবিনশ্বরতাকে ধরে রাখেন। হুরকার জীবন স্পন্দনের এক ভিজ্যুয়াল টোটেম এই দৃশ্যটি। আবার সাদামাটা ক্যামেরার কাজে কখন যেন এক গল্পে প্রবেশ করি আমরা। সেখানে সতের বছর ধরে বেঁচে থাকা এক মুরগির কাহিনি জানা হয়। এভাবে হুরকার জীবনেই বাস্তবতা এক জাদুময়তার ছোঁয়া পায়। সে অতিক্রান্ত হতে চায়, প্রমাণের অধিক হয়ে উঠতে চায় আমাদের বোধে।
বৃষ্টি! বৃষ্টি! এমন বৃষ্টি কখনো দেখেনি হেলালের ক্যামেরা! মাছের ঘের ভেসে যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেজে হুরকা, ভেজে ঝলমলিয়া, ভেজে মানুষ, ভেজে বৃক্ষ, গবাদিপশু। হেলালের চোখে কর্তব্যবিমূঢ়তা। জল কাদায় একাকার ডাঙায় লাফাতে থাকা কৈ মাছ, থৈ থৈ পানির মধ্যে ছোট্ট মাটির দ্বীপে কয়েকটি হাঁস, জলরঙের রোমান্টিকতায় নানা দূরত্বের গ্রামীণ দৃশ্যাবলি এরকম সাবজেক্টিভিটিতে আক্রান্ত হয় চলচ্চিত্র।
এভাবে হুরকার জীবন চলতে থাকে। হেলাল এবং তার ক্যামেরা Ñ তার সহযোগীদের ক্যামেরা, সে জীবনবিষয়ক দৃশ্যরচনা নির্মাণ করতে থাকে। এক আবহমান গল্প তৈরি হতে থাকে। বর্ষার ভিজ্যুয়াল সাবজেক্টিভিটি, শরতের নৌকার মিছিল, সন্ধ্যার উপাসনার আহবান আমাদের মধ্যেও অতিক্রান্ত বাস্তবের অনুভব বিস্তারে ক্রমাগত সাহায্য করতে থাকে। মাঝে মাঝে
গ্রাম-বৃদ্ধদের দেখা মেলে। তারা এই জনপদবিষয়ক পৌরাণিকতা জারি রাখেন, ঝলমলিয়াকে রাখেন সকল গাথার মাঝখানে। হেলাল কোনো দক্ষতা দেখান না। এসব গল্প, ঝলমলিয়ার জলের শুদ্ধতা বিষয়ে কোনো বিশেষ জ্ঞানের সন্ধানে ছোটেন না। কেননা, তিনি সমর্পিত, বিশ্বাসী, প্রার্থী। তিনি যেন খুঁজে ফেরেন এক ক্লাসিক্যাল এথনিসিটি – ঝলমলিয়াকে ঘিরে।
ঝলমলিয়ার ক্যামেরা আমাদের শ্যালো ফোকাসের পঞ্জিকাসুলভ সৌন্দর্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। ঘন ঘন ফোকাস শিফটের অর্থহীনতাও স্বাভাবিকভাবেই অনুপস্থিত। বরং ডেপথ অব ফিল্ডের গভীরতা আমাদের দৃষ্টিকে মেধাবী হতে চ্যালেঞ্জ করেছে। উন্মুক্ত স্পেসে লং শটগুলি কোনো নির্দিষ্টতাকে দৃশ্যমান না করে অনেক সময় এক ধরনের সাজেস্টিভ ভিজ্যুয়াল ন্যারেটিভ তৈরি করেছে। ফলে পরাবাস্তব গল্পের মুডটি দৃশ্যের দিক থেকে সংহত হয়েছে। ক্যামেরা যখন চলমান তখন সাবলীল ভাব বজায় রেখেছে। ঘটনার অনুসরণে ইনটিউটিভ মুভমেন্ট সফল হয়েছে। শটে জুমের ব্যবহার সীমিত। এভাবে দৃশ্যগত নাটুকেপনা পরিত্যাগ করা গেছে। তবে প্রকৃতির সৌন্দর্যে তিনি রোমান্টিক হয়ে পড়েছেন, তার দৃষ্টিক্ষেপের মুগ্ধতা তিনি দর্শকের মধ্যে সংক্রমিত করতে চেয়েছেন। এটা এক অবধারিত সংগতিই। কারণ, যে মেজাজের ছবি নির্মাণ করেছেন তিনি তাতে এটা অবশ্যম্ভাবী।
কথোপকথনে অনানুষ্ঠানিক সচল ইমেজই দেখি আমরা। তবে প্রচুর কাট অ্যাওয়ে আছে সাক্ষাৎকারগুলির মাঝে। এসব কাট অ্যাওয়ে অনেকক্ষেত্রেই নতুন কিছু যোগ করে না, কিন্তু ইমেজের সমৃদ্ধি আমাদের মানসকে এই জনপদের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ করে তোলে। আটটি ক্যামেরায় ছয় বছর ধরে তোলা এসব ইমেজ মূলত ঝলমলিয়া আর হুরকার প্রতি এক অনিরামেয় টানের প্রতিবেদন।
সব মিলে তার সমৃদ্ধি; ঝলমলিয়া এক নতুন প্রামাণ্যচিত্র।
এখনো একাত্তর : যুক্তি ও জাগরণের দৃশ্যকাব্য
(এখনো একাত্তর, মানজারেহাসীন মুরাদ, ৯০ মিনিট, ২০১৬)

দেখার আগেই
এখনো একাত্তর নামটি জনপ্রিয়তার দাবিদার! যেন সে এক কবিতার শিরোনাম, যার আবৃত্তি ফিরবে মুখে মুখে। আর সে যখন ছবি Ñ চলচ্চিত্র, তখন সে মুুক্তিযুদ্ধের নানা দৃশ্য-চিহ্নগুলিকে জাগিয়ে তোলে আমাদের মানসে। সে জেগে ওঠা আমাদের অভিজ্ঞতানির্ভর; মুক্তিযুদ্ধ যেভাবে কাজ করে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে তার পৃথকতা সেখানে ছাপ রাখে। তবে স্টপ জেনোসাইড, মুক্তির গান এসব চলচ্চিত্র-অভিজ্ঞতার ব্যাপ্তি জনমনে ব্যাপক বিস্তৃত; মুক্তিযুদ্ধের ছবি বললে আরো নানারকম বাছাইয়ের সঙ্গে এরা তো অবধারিতই। আর তখন তার জনপ্রিয়তার দাবি এরকম শক্তপোক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। আমরা একটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পন্ন চলচ্চিত্র দেখার দাবি জানাই, আমাদের ছবিটি দেখার মানসিক প্রস্তুতির মধ্যে এই দাবিটি থাকে। এই তো গেল নামের মহিমা!
কিন্তু আরো জানা যায়, ছবিটি দেখার আগেই যে, এর বিষয় ২০১৩-এর শাহবাগ আন্দোলন। তখন নামের সংকেত পেরিয়ে প্রত্যাশাটি দর্শকের মধ্যে অন্য এক মাত্রা নেয়। সদ্য পার হওয়া সে সময়ের অভিজ্ঞতা Ñ আবারো যার যেমন, সে দাবি জানায় যে, ছবিটি সেই অভিজ্ঞতার সমান হয়ে উঠবে। এটি এক অমোঘ সম্ভাবনা, সমকালের এমন অনুপেক্ষণীয় প্রবল প্রবাহ আমাদের ভেতরে যে ছবি লেখে তা ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে সে বিষয়ে রচিত অভিব্যক্তিগুলির সঙ্গে। আর আমাদের অন্তর্গত সে ছবি হয় বিশাল ক্যানভাসে আঁকা এক সাবজেক্টিভ স্ক্রল। আমরা মিলিয়ে পড়তে চাই সে অসীম, অনিশ্চিত চিত্রময়তাকে একটি গদ্য, কবিতা, চিত্র, ফটোগ্রাফ অথবা চলচ্চিত্রের সঙ্গে। এভাবে এক অসম, প্রায়-অন্যায় প্রতিযোগিতার আয়োজন, নাকি শিল্পের দুষ্ট বিচার? অথচ এর শুশ্রƒষাই বা কী? অভিজ্ঞতার বোধের চেয়ে সৎ তো আর কিছু নেই। সময়ের দূরত্ব সে বোধের প্রখরতা কমায়, অন্য বোধের সঙ্গে মিলে তার নানারকম নিরাকরণ হয়; শিল্প তখন এক সহানুভূতিময় জায়গা-জমিন পায় ভোক্তার বোধের মধ্যে। কিন্তু তার আগে, সমকালে, সে ভীষণ বৈরিতার সামনে! এখনো একাত্তর এই ভাগ্য বরণ করে। কেননা, শাহবাগ সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক প্রবলতা; আমাদের চৈতন্যে সে ভীষণ, ব্যাপক, কলোসাল; এখনো। তার বিশাল ক্যানভাস আমরা নিজের মতো করে এঁকে বসে আছি ভেতরে। এখন যখন দেখব এখনো একাত্তর তখন সে ক্যানভাসের সঙ্গে মিলিয়ে তার অনুধাবন অমোঘ, অবধারিত। শাহবাগ নিয়ে আরো চলচ্চিত্র দেখা গেছে। তারা ছিল তাৎক্ষণিক, আসলে শাহবাগেরই অংশ; মিছিল, সেøাগান, গান, ছবি, কবিতা, অভিনয়, আলো, ফানুস আর ফুলের সেই দ্রোহে যুক্ত আরেক অনুপ্রাণিত অধ্যায়। সেইভাবেই তাদের অভিজ্ঞান। এখনো একাত্তরের সেই তাৎক্ষণিকতা নেই, সে শাহবাগের অংশ নয়, শাহবাগ প্রসঙ্গে। আমরা আমাদের স্মৃতির প্রখরতা আর মেধার কার্যকারিতাকে প্রস্তুত রাখি এ ছবি দেখব বলে; আমাদের নিজস্ব শাহবাগের সঙ্গে মিলিয়ে পড়ব এ ছবি এবং সেভাবেই একরকম মূল্য বিচার হবে! মূল্য বিচার খুব সঠিক পদ নয় শিল্প-রাজনীতিতে এখন। কিন্তু আসলে সে ঘটেই, অন্তত ভোক্তার ভেতরে।

সূর্যোদয় থেকে মধ্যরাত
এইসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি এখনো একাত্তর ছবিটিকে আমরা দেখতে বসি। আসলে চ্যালেঞ্জগুলি আমাদের ভেতরে কাজ করে, সেভাবে চিন্তা করলে, চলচ্চিত্র এখনো একাত্তর তো ততক্ষণে এক ডিজিটাল বাস্তবতা। সে তখন পরিণত, অবশেষ। তার নতুন করে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার, নিয়ে বদলে ওঠার ক্ষমতা, বাস্তবতা আপাতত নেই। প্রশ্নটি বরং এই যে, এসব চ্যালেঞ্জ কি কাজ করেছিল ছবিটির নির্মাতার মধ্যে যখন ছবিটি তার ভেতরে প্রেরিত হচ্ছিল অথবা তার দৃষ্টি এবং শ্রবণের মধ্যে খুঁজছিল অবয়ব? ছবিটি কয়েকবার দেখার পর মনে হয়েছে, সময়ের উত্তাপের চ্যালেঞ্জটির বিষয়ে সচেতন ছিলেন নির্মাতা মানজারেহাসীন মুরাদ। তার ফলটি দাঁড়িয়েছে এরকম যে, শাহবাগ আন্দোলনের যে অবভাষিক রূপ সেটিকে ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। অথচ তার চলচ্চিত্র এই অবভাষ প্রসঙ্গে নয়, অন্তত মূল উদ্দেশ্যের দিক থেকে। শাহবাগ আন্দোলনের একরকমের সর্বব্যাপী প্রামাণ্যকরণের উদ্যোগ আছে ছবিটিতে। অন্তত এর সকল মাত্রার নমুনাকরণের চেষ্টা দেখতে পাই। ফলে ছবিটির দৈর্ঘ্যরে বিস্তৃতি ঘটেছে, কিছু ক্ষেত্রে দর্শকের বোধে বা জ্ঞানে নতুন কিছু যুক্ত না করেই। শাহবাগের দৃশ্যমানতাকে অস্বীকার করা Ñ এখনই, আরেক বড়ো চ্যালেঞ্জ। সেদিকে যাওয়া হয়নি চলচ্চিত্র এখনো একাত্তরের। কারণ ওই সময়ের উত্তাপ বিষয়ে সচেতনতা। কিন্তু এখনো একাত্তর এই উত্তাপকে দেখার এবং বিশ্লেষণের এক অন্য দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করেছিল। সেভাবে সে আমাদের ভেতরে শাহবাগ আন্দোলনের অবভাষবিষয়ক যে চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে আমরা এ ছবি দেখতে বসি তাদের এড়িয়ে যেতে পারত এবং ভিন্ন এক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারত। বিষয় বিবেচনায় সে কাজটি সে করে, সেই তার প্রধান অর্জন, কিন্তু শাহবাগ আন্দোলনের দৃশ্যমানতাকে সে আলাদা এক মান দেয়। এই মান দেওয়া এক শিল্পকর্ম হিসেবে কি তার পক্ষে যায়?
মানজারেহাসীন মুরাদ আঙ্গিকগত দুটি কৌশল এ ছবিতে অবলম্বন করেছেন, যা গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি এই যে, তিনি শাহবাগের এক নিজস্ব সময় প্রবাহ নির্মাণ করে নিয়েছেন। শাহবাগ আন্দোলনের যে ঘটনাবলি তা এই ছবিতে একটি সূর্যোদয় থেকে মধ্যরাতের সময় প্রবাহের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে গত হয়। এভাবে প্রামাণ্য সময়ের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশলটি মুরাদ তার আরেক বিশিষ্ট ছবি রোকেয়াতেও প্রয়োগ করেছিলেন। এখনো একাত্তর ছবিতে শাহবাগের ঘটনাবলির অবভাষকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি, কিন্তু তার নির্বাচিত নমুনাকরণের জন্যে দর্শককে তিনি একটি কালবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে দিচ্ছেন। ফলে, দর্শক অবচেতনেই নির্মাতার নির্ধারিত একটি বয়ানকে ধরে এই চলচ্চিত্র-যাত্রাটি, বিশেষ করে শাহবাগ-যাত্রাটি অভিজ্ঞান করেন। বিষয়টি কাজ করে, নির্মিতির মুনশিয়ানায় আমরা সম্ভবত বড় কোনো আপত্তি উত্থাপন করি না। কথাটি প্রাসঙ্গিক, যাদের মধ্যে শাহবাগ কাজ করে, প্রত্যক্ষতার দিক থেকে, তাদের ক্ষেত্রেই। অন্যদের জন্যে, এ এক ধনী অভিজ্ঞতাই, প্রামাণ্যচিত্রের ফর্মালিটির।
তবে যা কৌতূহলোদ্দীপক তা হলো এই চলচ্চিত্রের মধ্যে একধরনের কাহিনিচিত্রসুলভ গল্প বিন্যাসের ভঙ্গি। শাহবাগে সূর্যোদয়ের আগেই যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়ে যাওয়ার টেলিভিশন ফুটেজ দেখি আমরা। জেল গেটের সেই
ফুটেজ শেষ হয় শাহবাগের স্লোগানের শব্দের সঙ্গে মিক্স করে। কাদের মোল্লার একটি বিশাল স্থিরচিত্র রং হারিয়ে মোনোক্রোম হয়ে যায়। দৃশ্য ফেড আউট হয়… স্লোগান চলতে থাকে। এরপর শাহবাগে সূর্যোদয় এবং কাদের মোল্লাসহ অন্য যুদ্ধপরাধীদের শাস্তির দাবিতে আন্দোলনের প্রামাণ্যকরণ শুরু হয়।
এভাবে শাহবাগের প্রাথমিক উত্তেজকটির নিরাকরণ করে সরল ন্যারেটিভ ভাঙার যে চিত্রনাট্য-ঢং সেটিকে ব্যবহার করেন মানজারেহাসীন মুরাদ। আবার অন্যদিকে এটিও যেন প্রতিষ্ঠিত হয় যে, এই ছবি শাহবাগের ক্রমিক প্রামাণ্যকরণের চেয়ে বেশি কিছু হয়ে উঠতে চায়।
নির্মিতির যে মুনশিয়ানার কথা আগে লিখছিলাম সে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এটি হচ্ছে দ্বিতীয় আরেক নিরীক্ষা, যা মানজারেহাসীন মুরাদ করেছেন। তিনি তার স্বভাবসিদ্ধ একটি কেন্দ্রাভিমুখী, যৌক্তিক সংবেদনই নির্মাণ করেছেন। তার প্রামাণ্যচিত্র মোটের ওপর আধুনিক শিল্পরুচির প্রতিনিধিত্ব করে; এই আমাদের দেখা। এখনো একাত্তর তার বাইরে যায়নি, কিন্তু বিষয়ের ভেতরে যে সুযোগ ছিল একটি ক্রীড়াময়, অরাজক, অরৈখিকতার; তার সুযোগটি তিনি নিয়েছেন। শাহবাগ আন্দোলন একালের এবং ক্রমশ তা রূপ নিয়েছিল গণচেতনার। তার বহিঃপ্রকাশে ছিল গণরুচির প্রভাব; সেখানে দ্রোহ এবং আনন্দ, সুর এবং কোলাহল, তত্ত্ব এবং আবেগ, ব্যঙ্গ এবং প্রতিবাদ সমকালের গণসংবেদনকে রচনা করেছে; হয়তো প্রগল্ভতা, কিন্তু লিখতে অনুপ্রাণিত হই, তখন রচিত হয়েছে সমকালের এপিক। তা মৃদুস্বর, যৌক্তিক সংবেদনকে ছাড়িয়ে নতুন কিছু, হয়তো সে আধুনিকতার পরের, হয়তো সে একালের তারুণ্যের। মানজারেহাসীন শাহবাগের এই মৌলিকতাকে স্বাগত জানিয়েছেন তার আঙ্গিকে। শাহবাগের সমান হয়ে ওঠার জন্যে তিনি যুক্ত করেছেন একালের গান। ঢাকা শহরের মাথার ওপর সূর্য ওঠে, সূর্য ওঠে শাহবাগে। তখন ছবির সাউন্ড ট্র্যাকে, ‘এখনই কি ভুলব মোরা কী করেছ তুমি?… তোমায় আমি সহ্য করি মানুষ আমি তাই। কিন্তু জানি তোমার সাথে বন্ধু হতে নাই।’ জনপ্রিয় ঢঙের এই গান ক্রমশ মিলেমিশে একাকার শাহবাগের সেøাগানের শব্দে, নাচের ছন্দে। এরকম গান আরো আছে, যা তৈরি করে নিয়েছেন নির্মাতা এই ছবির প্রয়োজনে। আবার শাহবাগে তখন গানের যে ঐশ্বর্য, যা জাগিয়ে রাখছিল, উদ্বেলিত করছিল মানুষের আবেগকে তাকেও ব্যবহার করেছেন নির্মাতা ব্যাপকভাবে। শক্তিমান এবং জনপ্রিয় ব্যঙ্গচিত্রনির্মাতা শিশির ভট্টাচার্য যে একটি উপ-অধ্যায় ধরে কয়েকবার ফিরে এসেছেন ছবিতে, তার গুণগত সংযোজন কিন্তু ওই ক্যারিকেচারের অ্যাটিচুডটিই। যে ব্যঙ্গ-ছবিটির হয়ে ওঠা দেখা যায় শুরু থেকে শেষ স্বাক্ষরটি পড়া পর্যন্ত তা ছবিতে চলতে থাকা ইতিহাস পাঠের মধ্যে যুক্ত করে একটি আলাদা অ্যাটিচুড, দেখবার এক মন্তব্য Ñ এক ক্রীড়াশীলতা। তখন শাহবাগে এরকম ব্যঙ্গছবির আর কথার ছড়াছড়ি। এখনো একাত্তরে তারা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পথনাটক, নানারকম পারফরম্যান্স, আবৃত্তি, স্বতঃস্ফূর্ত দল-নৃত্য আর মুহুর্মুহু বাদন মিলে এখনো একাত্তরের শাহবাগ। লক্ষ করি, শাহবাগ চত্বরে পরিকল্পিত কেজো সাক্ষাৎকার নেই বেশি, উদ্ঘাটনের বিষয়টি অন্তত এখানে নয়, তার চেয়ে শাহবাগের সমান হওয়ার চেষ্টাই এখানে প্রধান এই ছবির। টপ অ্যাঙ্গেলের লং শটে দিনের বিভিন্ন সময়ের শাহবাগকে প্রতিষ্ঠিত করার ভেতর দিয়ে এক বিশেষ প্রামাণ্যচোখকে শনাক্ত করি আমরা। এই চোখ শাহবাগের দৃশ্যমান প্যাটার্নটিকেই খোঁজে এবং দেখে, তার সহযাত্রী হয়। সে চলমান হয় সড়কে বিছিয়ে রাখা সুদীর্ঘ স্ক্রলের ওপর অথবা হয়ে উঠতে থাকা কাঁচা ফুলের আলপনার ওপর, সে সময় নিয়ে দেখে, পাঠ করে দীর্ঘ আর লম্বা সব ব্যানার, ফেস্টুন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের যে পোর্ট্রেট শাহবাগের ইতিহাস-চেতনার প্রতীক বারবার সে ধরা পড়ে এ ছবির অবলোকনে। আর সে চলে সকলের সঙ্গে, শাহবাগের রাস্তায়, সকলের মধ্যে একজন হয়ে। তার চোখ যায় মুষ্টিবদ্ধ হাতে, সেøাগানমুখর প্রোফাইলে, মিছিলের চলিষ্ণুতায়। সেসব অসাধারণ কিছু নয়, কিন্তু তার শরীরে শাহবাগের চেনা ঘ্রাণ। সকলের মতো সে এই জাগরণ দেখে, জাগরণ হয়ে ওঠে।
এভাবে, এই চলচ্চিত্রের যে সেরিব্রাল গন্তব্য, তার সঙ্গে এক আপাত বিরোধিতায় শাহবাগ আন্দোলন প্রামাণ্যকৃত হয় এই চলচ্চিত্রে। লিখেছি যে, শাহবাগবিষয়ক যে দৃশ্যমানতার বোধ আমাদের ভেতরে রয়ে গেছে, তার চ্যালেঞ্জটি এভাবেই নেয় এখনো একাত্তর। অথবা, এই বা নয় কেন যে, এই দৃশ্যমানতা আসলে চলচ্চিত্রকারের নিজস্ব শাহবাগের প্রতিই এক দায়মোচন, অথবা তার শাহবাগ-যাত্রার উদ্্যাপন? একটি বুদ্ধিধর্মী প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের প্রকল্প হলেও এখনো একাত্তর নির্মাতাকে এই ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি-বিলাসটি রচনার সুযোগ করে দেয়। আর নির্মিতির গুণে সে উত্তরিতও হয়। দৈর্ঘ্য একটি অপ্রধান সমস্যা হয়ে দেখা দেয় বটে, কিন্তু সেটা সম্ভবত যাদের শাহবাগের অভিজ্ঞতা ঘটেনি তাদের ক্ষেত্রেই কাজ করবে বেশি। শাহবাগ-যাত্রী একালের বাংলাদেশ এখনো একাত্তরকে আঙ্গিকের বিচারে অনুমোদন করবে বলেই অনুমান করি।

যুক্ত করে যে
এই ছবি ইতিহাসের বিরতিকে অতিক্রম করে। সে শাহবাগ আন্দোলনকে যুক্ত করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের দেশপ্রেম ও ন্যায়বোধের সঙ্গে। আপাতদৃষ্টিক্ষেপেই একথা অবশ্য মেনে নেওয়া যায় যে, শাহবাগের মূল কথাটিই তো তাই। তারা, এই আন্দোলনের প্রাথমিক সংগঠকরা তো মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতেই নেমে এসেছিলেন রাজপথে। কিন্তু যা আপাত নয়, যা ক্রমশ বোধে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তা হলো এই যে, যারা সংগঠক নন, যারা হাজারে হাজার এসেছেন এই আন্দোলনে যোগ দিতে, যারা জনতা; তাদের মধ্যে কাজ করেছে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দীপনা। তারা যুদ্ধপরাধীদের বিচার চান, তারা আসলে এই প্রথম এবং প্রধান অপরাধটির কঠোর শাস্তি দাবি করেন এই বিবেচনায় যে, অতঃপর সকল অন্যায় এবং অসাধুতার বিরুদ্ধে এভাবেই রুখে দাঁড়াবে মানুষ – এদেশের। তারা কেউ কেউ এক নতুন শুরুর কথা বলেন। যেমন শুরুর কথা উঠেছিল সেই ১৯৭১-এ, যখন নতুনের স্বপ্ন পতাকা আর মানচিত্রকে অতিক্রম করে সোনার বাংলায় পৌঁছনোর জন্যে প্রেরিত করেছিল একটি প্রজন্মকে। এখন শাহবাগে কেউ গায়, ‘আমি দেখেছি দুই শূন্য তের, দেখিনি একাত্তর…’। কেউ সেøাগান তোলে, ‘আমাদের ধমনিতে শহীদের রক্ত/সেই রক্ত কখনো বৃথা যেতে দেব না।’ কেউ বলে যে, নিজেকে মনে হয় একাত্তরের লাঞ্ছিত নারীদের একজন। এভাবে নতুন এক প্রজন্ম যে, এতসব ইতিহাসহীনতা আর মিথ্যার পাহাড় পেরিয়ে আস্থা রাখে মহান মুক্তিযুদ্ধে; সে মহৎ হতে চায়, তার সময়কে মহত্ত্ব দিতে চায় ’৭১-এর প্রেরণায়, সে বিষয়টিকে বিশদ করে এখনো একাত্তর। মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, গণযুদ্ধের ফুটেজ এই ছবিতে প্রামাণ্যকরণের বেশি কিছু হয়ে ওঠে। এমনকি শাহবাগ আন্দোলনের যৌক্তিকতাকে প্রতিষ্ঠা করার কাজটির পরও তার প্রাসঙ্গিকতা নিঃশেষ হয় না যেন! নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধবোধের সঙ্গে জাক্সটাপোজড হয়ে সেসব ছবি নতুন কনোটেশনে পৌঁছে। তারা যুক্ত করে, তারা সংহত করে। যখন পিতার বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণ করে, ‘যুদ্ধবন্দি এক জিনিস আর যুদ্ধাপরাধী আরেক জিনিস।… এই বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে।’ তখন এই সংহতি ছোঁয় ক্লাইম্যাক্স। অনুপ্রাণিত এক সমান্তরাল যুক্ত করে দুই সময়কে যখন শাহবাগের আন্দোলনকারীরা জনতাকে সঙ্গে নিয়ে শপথ করে আর সেই শপথ একাত্তর সালে মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণের ফুটেজের সঙ্গে ক্রস কাট করে দেখানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন করা যেতে পারে, এই সংযুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চলচ্চিত্রে। আবেগ সরিয়ে রেখে বলা যেতে পারে যে, এখনো একাত্তর চলচ্চিত্রের হয়ে ওঠার জন্যে এরকম একটি প্রকল্প আবশ্যিক ছিল। এর অনথ্যায়, সে এক মামুলি প্রামাণ্যকরণের বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারত না। শাহবাগের যে জাগরণ তার ভেতরে পৌঁছুতে চেয়েছে এই প্রামাণ্যচিত্র Ñ তার সারসত্তাকে বুঝতে চেয়েছে। এই প্রচেষ্টায় এই ঐতিহাসিকতা তো অনিবার্য। আর সেভাবেই সে পৌঁছেছে নব্বই দশকের ঘাতক দালাল নির্মূল আন্দোলনে। ১৯৭১ যে অনির্বাণ সকল বিরুদ্ধতার দমকেও তাকে বুঝতে শাহবাগ থেকে পিছিয়ে যেতে হয় অন্তত দুই দশক। সেটা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে জেগে ওঠার সময়। প্রায় দেড় দশকেরও বেশি সময়ের নিমজ্জনের পর মুক্তিযুদ্ধবোধের পুনরুত্থানের কাল। সেই আন্দোলনের কথা বিস্তারিত শোনা হয় এই চলচ্চিত্রে, আর সেই গণ-আদালতের প্রামাণ্যছবি দেখি আমরা বিশদে। যুক্ত হয় ১৯৭১, ১৯৯২ আর ২০১৩। একটি আদর্শিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। শাহবাগের একটি প্রধান অধ্যয়ন তাহলে এই যে, সে এক দীর্ঘ সংগ্রামের সমকালের প্রজন্ম, সে যুক্ত মুক্তিযুদ্ধের পরম্পরায়। এখনো একাত্তর অবশ্য এই আদর্শ, এই পরম্পরা বিষয়ে কোনো তাত্ত্বিক সংলাপে অবতীর্ণ হয় না; মুক্তিযুদ্ধবোধের অভ্যন্তরীণ ভিন্নতা এবং তার রাজনৈতিক মতাদর্শগত বৈচিত্র্য এই চলচ্চিত্রের সম্ভাবনার বাইরে থাকে। সে যাত্রা করে শাহবাগের প্রধান দাবিটি থেকে এবং বাংলাদেশের মানুষের যৌথ মননে এই দাবির উৎস ও যৌক্তিকতার সন্ধানে সে ক্রমাগত যাতায়াত করে বাংলাদেশের ইতিহাসের ভেতর। তার দৃষ্টিক্ষেপ যুক্ত করে ইতিহাসের তিনটি অধ্যায়কে এবং দেখে যে, মুক্তিযুদ্ধ এক চূড়ান্ত শ্রেয়োবোধ এদেশের মানুষের মানসে, তার বিপরীতে তারা রাখে সকল অন্যায় এবং অন্যায্যকে। যুদ্ধাপরাধ, ১৯৭১-এর, চরম এক অমানবিকতা এবং বিরুদ্ধতা মুক্তিযুদ্ধের। এভাবেই তার কঠোর শাস্তির দাবির জন্যে জাগরণ Ñ জনগণের।

ছড়ানো কথার অধ্যয়ন
এই যাত্রা সময়ের রৈখিকতা ভেঙে চলতে থাকে। আর শাহবাগের মূর্ততার মধ্যে ফিরে ফিরে আসে। এই চলনের একটি চিত্রকথা কীভাবে এক কেন্দ্রীভূত চিন্তন হিসেবে স্থাপিত হয়? আমরা এখনো একাত্তর দেখে একথা মানি যে, সে দৃশ্যমানতা এবং শব্দের অবিরামতার ভেতর দিয়ে এক পরাবাস্তব প্রবাহ নয়, নয় এক বিষয়ীগত ইঙ্গিতময়তা। সে স্পষ্ট, যৌক্তিক; হয়তো আবেগে জাড়িত কখনো। কিন্তু সে পথভ্রষ্ট হয় না, তার গন্তব্য যে শাহবাগবিষয়ক এক অনুসন্ধান সেটি কার্যকর করতে সে নির্দিষ্টভাবে অগ্রসর হয়। এ কাজে তার প্রধান কৌশল
প্রসঙ্গ-জনদের কথা। যারা কথা বলেন এই চলচ্চিত্রে তাদের জন্যে চরিত্র নির্ধারিত আছে (আবারো যেন আমরা এক কাহিনিচিত্র নিয়েই লিখছি)! তারা তাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাদের সংলাপ প্রায় সকল ক্ষেত্রেই লক্ষ্যভেদী হয়। এখনো একাত্তরের ওপরিতলে যে ছড়ানো ফ্রেম তা আসলে দাঁড়ানো এই কথামালার শক্ত ভিতের ওপর।
ছবিতে মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ মূলত বলেন ন্যায়বিচার প্রসঙ্গটিকে ধরে। তিনি শুরু করেন শাহবাগের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু ফিরে যান দ্রুতই নব্বইয়ের ঘাতক দালালবিরোধী আন্দোলনের প্রাথমিকতায়। তিনি জোর দেন এ বিষয়টির ওপর যে, সে আন্দোলন ছিল একটি সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, যার কোনো দল ছিল না। ১৯৯২-এর গণআদালত, তার মতে, বিচার বিভাগের নৈতিক অবস্থানকে জোরদার করার জন্যে ভূমিকা রেখেছিল। শাহবাগ আন্দোলনের একটি যে দাবি ছিল, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে বাদীপক্ষের আপিল করার অধিকার প্রদান বিষয়ে, সেটির পক্ষে নাসির উদ্দীন ইউসুফ যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি দেখান যে জনমানুষ আসলে আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা দেখতে চায়। তারা চায় বিচার বিভাগ সঠিকভাবে কাজ করুক।
শাহরিয়ার কবির শাহবাগকে এবং এখনো একাত্তরকে গভীরভাবে যুক্ত করেন নব্বইয়ের গণআদালতের সঙ্গে এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সঙ্গে। তিনি স্মরণ করেন যে, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তিনি দেখা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি কথা দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে, আইন হচ্ছে। সে আইনে ১৯৭২-এ ট্রাইব্যুনাল হয় এবং বিচারও শুরু হয়। ১৯৭৫-এর ডিসেম্বরে সে দালাল আইন বাতিল হয়। সে আইনে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে আপিল করে ছাড়া পেয়ে যায়। তিনি স্মৃতি থেকে বলেন যে গণআদালতের দিন, ২৬ মার্চ ১৯৯২ সেখানে পাঁচ লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছিল। তিনি মনে করেন এই নতুন প্রজন্ম যারা শাহবাগের রাজপথে নেমে এসেছে তারা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের চেতনার সন্তান।
আরিফ জেবতিক এবং মারুফ রসুল এই আন্দোলনের অন্যতম দুই সংগঠক মূলত এর প্রেক্ষাপট, চরিত্র ও গণসম্পৃক্তির বিষয়গুলি তুলে ধরেন। তাদের কথায় সময়ের সারল্য এবং সজীবতা আছে। আরিফের শেষ কথাটি এই চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে। তিনি বলেন, একটি মানবিক রাষ্ট্রের জন্যে যথাযথ বিচার বিভাগ প্রয়োজন। আমরা যদি এই দেশের এই প্রধান অপরাধটির বিচার করতে পারি তাহলে আর সব অপরাধেরই বিচার করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে মারুফ মনে করেন, মানুষ যে মুক্তিযুদ্ধকে মনে রেখেছে, তারা, যারা অনলাইনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার যোদ্ধা তারা যে একা নন তা শাহবাগ তাদের জানিয়েছে।
ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ আইনের দৃষ্টিকোণটি স্থাপন করেন এই চলচ্চিত্রে। তিনি দেখান যে, একটি গণহত্যা দুটি বিবদমান পক্ষের মধ্যে বিরোধ নয়। এটি এমনকি কেবল একটি রাষ্ট্রের বিষয় নয়, এটি বিশ্ব মানবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি মনে করেন যে, বিচারিক প্রক্রিয়ার পাশাপশি নাগরিকদের এই অপরাধের যথাযথ বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকাটা জরুরি। কারণ, তার মতে, নুরেমবার্গ বা রুয়ান্ডার বিচার হয়েছিল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরপরই। বাংলাদেশে এই বিচার হচ্ছে অপরাধ সংঘটনের চার দশক পর। সুতরাং, সক্রিয় নাগরিক সমাজ এক্ষেত্রে প্রয়োজন।
ডাক্তার নুজহাত চৌধুরী শহীদ সন্তানের স্মৃতির নিদারুণতা, ন্যায়বিচারের আকুতি, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা এবং বারবার আশায় বসতির নির্মাণ আর সবশেষে শাহবাগ নিয়ে একরাশ বাঁধভাঙা আবেগকে ছড়িয়ে দেন ছবির শরীরে। লাকি আখতার ছাত্ররাজনীতির কর্মী হিসেবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন এই আন্দোলনে। তিনি জোর দেন এ বিষয়টিতে যে, এটি অবশ্যই গণমানুষের আন্দোলন এবং মানুষের চেতনা তখন অর্জন করেছিল অনেক উচ্চতা। লাকি নারীদের অবাধ অংশগ্রহণের বিষয়টির প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে জামি এ ছবিতে কথা বলেছেন অল্প। কিন্তু তার উপস্থিতি, ক্যামেরার সামনে, ওই যুক্ত করার কাজটিকে শক্তি দিয়েছে। আসলে এভাবেই কাজ করে এখনো একাত্তর। সামান্য ইমেজ, সাদামাটা কথা যুক্ত করার আর যুক্তি নির্মাণের কাজটি করতে থাকে অবিরাম। আবার তার ন্যারেটিভের ঢংটিও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে সম্পৃক্ত রাখে।
শাহবাগের দিন পরিক্রমা শুরুর আগেই আমাদের জানানো হয়েছিল যে, যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার দ- কার্যকর করা হয়েছে। আর এই পরিক্রমার একটি পর্যায়ে এসে আমরা সে ঘটনা পরম্পরার আরো আগের খবরটি পাই। জানি যে, তার আইনজীবীরা জেলগেটে রিভিউ পিটিশনের কপি পৌঁছে তার দ- কার্যকর করার প্রক্রিয়াকে সাময়িকভাবে আটকে দিয়েছেন। কাদের মোল্লার ঘটনা নিয়ে এটিই এ ছবির শেষ দৃশ্যাংশ। এভাবে ন্যারেটিভের ভাঙনটি চূড়ান্ত হয়।
তখন শাহবাগে রাত নামে। লং শটে আমরা দেখি জনসমুদ্র। দেখি সারি সারি মোমবাতি জ্বলছে শাহবাগের রাজপথে। অফ ভয়েসে নুজহাত চৌধুরী বলেন, তিনি বিশ্বাস করেননি যে সত্যি কোনোদিন যুদ্ধাপরাধের বিচার হবে। যদিও তার মা সবসময় আশাবাদী ছিলেন। একটি মশালের ক্লোজ শট। তারপর কয়েকটি, তারপর অনেক মশাল। মশালের আলোয় উদ্ভাসিত শাহবাগ চত্বর। দেয়ালজুড়ে বিশাল এক ছবি আঁকার কাজ চলছে। একজন শিল্পী ব্যাখ্যা করেন যে, এটি হচ্ছে শাহবাগের এক মানবজমিন, কেননা এ হচ্ছে এক নতুন প্রজন্মের ঐক্যের ফসল। এভাবেই ইমেজ এবং কথার নিপুণ বুননে ধনী হয় এখনো একাত্তর।

ধ্বনির ঐশ্বর্য
এই ছবিতে শব্দ সংবেদ প্রকাশের একটি ফাংশনাল উপাদানের চেয়ে আরো বড় কিছু হয়ে উঠতে চায়। এমনকি এখনো একাত্তরকে একটি শাব্দিক অভিব্যক্তি হিসেবে আমি কল্পনা করতে পারি। বেতারে যে প্রামাণ্য-অনুষ্ঠান হয় তার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, শব্দের নানা নিপুণ ব্যবহারে একটি ঘটনা এবং সময়কে জীবন্ত করে তোলেন সৃজনশীল এবং দক্ষ অনুষ্ঠাননির্মাতারা। সেখানে কেবল তথ্যের উপস্থাপনা নয়, সময় এবং ঘটনার মেজাজটিকেও তুলে ধরার চেষ্টা থাকে। এখনো একাত্তর যেন সেরকমই এক ধ্বনি রচনার সঙ্গে পাল্লা দেয়! এর চিত্রের সমৃদ্ধি ছাড়া সে যেন হয়ে উঠতে পারত শাহবাগবিষয়ক আরেকটি অভিব্যক্তি। এর একটি প্রধান কারণ হচ্ছে শাহবাগের শব্দের ঐশ্বর্য। সেখানে সেøাগান, সংগীত, আবৃত্তি, অভিনয়, বাদন, নৃত্য মিলে শব্দের অফুরান আয়োজন। আর তার সঙ্গে আছে মূল মঞ্চের বক্তব্য, নানা আনুষ্ঠানিকতা যাতে কথা গুরুত্বপূর্ণ। এখনো একাত্তর অনৈর্বচনিক প্রামাণ্যকরণ নয়, কেননা, প্রামাণ্যকরণ তার প্রধান উদ্দেশ্যই নয়। কিন্তু তার নির্বাচন শাহবাগের ধ্বনিময়তাকে দারুণভাবে পেয়েছে; লিখতে চাই, ধ্বনি এখনো একাত্তরের স্টাডিয়ামকে অতিক্রম করে আমাদের মধ্যে তার পাঙ্কটামটিকে বিদ্ধ করে। তার প্রকল্পের অধিক যে সে হয়ে ওঠে, সেটি তার এক অঘোষিত উদ্দেশ্যও সম্ভবত, যার কথা লিখেছি আগেই। এই ছবি যে একটি লোকপ্রিয়তার এবং কবোষ্ণতার অনুভব জাগায় তাতে শব্দের ভূমিকাটি বড়। লিখতে চাই, প্রকল্পটি হচ্ছে এই ছবির স্টাডিয়াম আর এই যে, লিরিক্যাল প্রামাণ্যকরণ এটিই তার পাঙ্কটাম Ñ তার শিল্পিত অঙ্কুশ, যা বেঁধে অনুভবে।
‘জেগে আছে শাহবাগ/শাহবাগ ঘুমায় না’, ‘একাত্তরে তখন আমি অনেক ছোট, মৃত্যু বুঝি যুদ্ধ বুঝি না। এখন আমি অনেক বড়ো, যুদ্ধ বুঝি, মৃত্যু বুঝি না।’, ‘কেউ ভাবেনি এমন দিনের দেখা পাব বাস্তবে/দুষ্টু লোকের বিচার কর, বিচার কর আজ তবে।… এই শুভক্ষণ চিরদিনের জন্যে আসুক চাইছে মন।’, ‘আমি দেখেছি দুই শূন্য তের, দেখিনি একাত্তর/আমি দেখেছি শাহবাগ, জনসমুদ্দুর’।
আমরা এই সেরিব্রাল শিল্পকর্মটির ভেতরে শাহবাগের প্রভাত এবং গোধূলি, মধ্যাহ্ন এবং নিশিরাতের ঘ্রাণ পাই; এইসব ধ্বনি সে ঘ্রাণের ইন্ধন জোগায়।

জন্মসাথী, ঝলমলিয়া এবং এখনো একাত্তর ভিন্ন ভিন্ন মেজাজের ছবি। প্রথমটি একটি আত্মানুসন্ধান থেকে যাত্রা করে শেষ পর্যন্ত একটি সামষ্টিক অবলোকনে গিয়ে সমাগত হয়। তার দৃষ্টি রোমান্টিক এবং সে মেজাজে গল্প-পৃথিবীর আমেজ আনে প্রামাণ্যচিত্রের পরিম-লেই। কিন্তু প্রসঙ্গটিকে সে পূর্ণতা দেয়, দর্শকের বোধে ও বুদ্ধিতে তার প্রতিবেদন যুক্ত হয়। ঝলমলিয়া এক লিরিক্যাল দৃষ্টিক্ষেপ, পৌরাণিকতা এবং লোকজ সামান্যতাকে সে পরখ করে দেখে। তার নাগরিক দৃষ্টি আত্মসাৎমূলক নয়, বরং গভীর সংবেদী। রোমান্টিকতা অবশ্য তাকেও আচ্ছন্ন করে কখনো, তবে সে বিষয়ে সে অবিব্রতই। এখনো একাত্তর এক স্বদেশ অন্বেষণে সংশ্লিষ্ট, যা চার দশকেও ক্ষান্তিহীন এদেশে। সে সমকালের জন-উত্থান থেকে যাত্রা করে পৌঁছুতে চায় এই আকাক্সক্ষার শেকড়ে। সে সেরিব্র্যাল, কিন্তু সময়ের উত্তাপকেও ধরতে চায় সমান মর্যাদায়। এভাবে সে হয়তো বহুগামী। এইসব ছবি, আরো সব ছবির সঙ্গে মিলে প্রামাণ্যচিত্রের যে স্পেক্ট্রামটি দেখায় – এখানকার বাংলাদেশে – তার ব্যাপ্তি অনেকখানি; সে আগ্রহ জাগায় বটে। 

Leave a Reply

*