logo

শিল্প-আন্দোলনে নিবেদিতা

সুশোভন অধিকারী

ভারতের আধুনিক শিল্প-আন্দোলনে ভগিনী নিবেদিতার ভূমিকা গভীর ও বিসত্মৃত। বিদেশি শাসকের অধীনে আমাদের শিল্পের সেই ধ্বস্ত সময়ে তেজস্বিনী নিবেদিতা যে এক পরিকল্পিত পথরেখা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, তা ভারতীয় শিল্পকলার নতুন করে গড়ে ওঠার কালে নিঃসন্দেহে জরুরি সূচনা। স্বভাবতই মনে হবে, সেই পরিকল্পিত পথরেখাটি কী­ – যা এক বিদেশিনীর প্রদর্শিত পথে নির্দেশিত? এ প্রশ্নের পাশাপাশি মনে রাখা দরকার, তীব্র ভারতপ্রীতির বশে নেহাত আবেগতাড়িত হয়ে নিবেদিতা কোনো আলগোছে ভাবনাকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চান নি। সময়ের প্রেক্ষাপটে ভারত শিল্পের প্রয়োজন ও সমস্যাকে গভীরভাবে বুঝে তিনি একটা স্থির লক্ষক্ষ্যর দিকে এগিয়েছেন। পরিকল্পনামাফিক তিনি যেন একটা বস্নু-প্রিন্ট তৈরি করে নিয়েছিলেন এবং স্থিতধীচিত্তে সেদিকে অগ্রসর হয়েছেন। পাশাপাশি এ কথাও ভুললে চলবে না যে, ভাবনা আর আদর্শের লক্ষ্যেতিনি একজন সাধারণ ভারতবাসীর চেয়ে অনেক বেশি ভারতীয় ছিলেন। ভারতের জাতীয়তাবাদী আদর্শে অবগাহিত এই সন্ন্যাসিনী তাঁর কর্তব্য, ত্যাগ ও নিবিড় সহমর্মিতায় এ দেশের অন্তস্তলটি যেভাবে স্পর্শ করেছিলেন – তা একজন বিদেশিনীর পক্ষে সহজ কাজ নয়। অবশ্য এর নেপথ্যে স্বামী বিবেকানন্দের ভূমিকা নতমস্তকে স্মরণ করি, তিনিই ভারতীয় শিল্পশিক্ষায় নিবেদিতার প্রধান গুরু।

এবারে তলিয়ে দেখা যাক, ভারতীয় শিল্পের নবজাগরণে নিবেদিতার প্রয়াস কোন পথে? কোন সোনার কাঠির ছোঁয়ায় তিনি ভারত শিল্পের অন্তরাত্মাকে নতুন করে জাগিয়ে তুললেন? এর উত্তর খোঁজার আগে ভগিনী নিবেদিতার সঙ্গে আরো কিছু শিল্পী, ভাবুক ও চিন্তকের কথা এখানে স্মরণ করতে হবে – যাঁদের বাদ দিয়ে ভারত শিল্পের এই নবজাগরণ সম্ভব ছিল না। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন কাকুজো ওকাকুরা, ই বি হ্যাভেল, আনন্দ কুমারস্বামী, অবনীন্দ্রনাথ, ও সি গাঙ্গুলী, লর্ড রোনাল্ডসে, লরেন্স বিনিয়ন প্রমুখের মতো ব্যক্তিত্ব এবং অবশ্যই স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর নিশ্চিতভাবে এই তালিকায় সংযুক্ত করতে হবে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের নাম – তাঁর মতো শিল্পদরদী মানুষ ছাড়া আর্টের এই আন্দোলন এমন গতি পেত কিনা সন্দেহ! এ ক্ষেত্রে রামানন্দের পত্রিকা প্রবাসী বা মডার্ন রিভিউর ভূমিকা প্রসঙ্গে কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না।

আবার একটু পিছিয়ে গিয়ে বলতে পারি, সমগ্র বিশ্ব শিল্পের ইতিহাসেই এই উনিশ শতক যেন একটা জরুরি মাইলস্টোন, যেখানে পূর্ব-পশ্চিমের দেওয়া-নেওয়ায় এক নতুন দিগন্ত দেখা দিয়েছিল। জাপানি উড-কাট প্রিন্টের সঙ্গে ইম্প্রেশনিস্ট আর্টের সম্মেলন সেই পর্বে পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট আন্দোলনের পক্ষে এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছিল। যা পরবর্তীকালে বিশ্ব শিল্পের নবতম আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিমুখটি চিহ্নিত করেছে। আজকে আন্তর্জাতিক আর্ট সিনারিয়োর দিকে তাকিয়ে আধুনিক শিল্পকলার স্বর্ণস্তম্ভ হিসেবে যাঁদের নাম চকিতে মনে পড়ে, সেই মাতিস-পিকাসো-ব্রাকের নেপথ্যে দাঁড়িয়ে আছেন সেজান-ভ্যানগঘ-গগার মতো শিল্পীরা। মনে পড়বে, রঁদার মতো শিল্পীকে, যিনি আমাদের নটরাজের মূর্তি দেখে কীভাবে আন্দোলিত হয়েছিলেন। ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রীদের হাত শক্ত করে ধরে আছেন হোকুসাই হিরোসিগের মতো জাপানি কাঠখোদাই শিল্পীর দল। সব মিলিয়ে স্বীকার করতে হবে, কেবলমাত্র শিল্পের নিরিখেই উনিশ শতক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এবারে দৃষ্টির ফোকাসকে কিঞ্চিৎ সংকুচিত করে বাংলার দিকে নজর দিই, উনিশ শতকের শেষভাগে এখানেও কয়েকটি জরুরি বাঁক এসেছে। জেমস ফাগুসনের ‘মিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান আর্কিটেকচার’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ নাগাদ। শিল্পী জন গ্রিফিথসের বিখ্যাত অ্যালবাম ‘দি পেইন্টিংস ইন দি বুদ্ধিস্ট, কেভ-টেম্পলস্ অফ অজন্তা, খান্দেশ, ইন্ডিয়া’ প্রকাশিত হয়েছে ১৮৯৬-৯৭ সালে। ১৮৯৬-এর জুলাইতে অধ্যক্ষ হিসেবে আর্ট কলেজে যোগ দেওয়ার কিছুকালের মধ্যে হ্যাভেল পরিচিত হন অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে। ১৯০২ সালের গোড়ায় প্রখ্যাত জাপানি ভাবুক ও চিন্তাবিদ কাকুজো ওকাকুরা কলকাতায় আসেন, পাশাপাশি জাপানি চিত্রকর টাইকান এবং হিসিদা সুন্শোর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে অধিষ্ঠান নিশ্চিতভাবে এক জরুরি ঘটনা। ১৯০৩ সালে ওকাকুরার দি আইডিয়ালস্ অফ দি ইস্ট গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে যার ভূমিকা লেখেন নিবেদিতা। এর আগে নিবেদিতার লেখা কালী দি মাদার বইটি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যে বইয়ের প্রসঙ্গে স্বয়ং কুমারস্বামী বিশেষ মনোযোগী ছিলেন। ১৯০৫ সালে শিল্প শিক্ষকের ভূমিকায় অবনীন্দ্রনাথের আর্ট কলেজে যোগদান, নন্দলালও এই সময়ে শিল্প শিক্ষার্থী হিসেবে আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছেন। ক্রমশ যোগ দিলেন ভেঙ্কটাপ্পা, ক্ষক্ষতীন্দ্রনাথ মজুমদার, শৈলেন দে বা সমরেন্দ্র গুপ্তের মতো ছাত্রদল। অবশ্য অবনীন্দ্রনাথ দীর্ঘকাল আর্ট কলেজের শিক্ষকতায় যুক্ত থাকেন নি, হ্যাভেলের পর পার্সি ব্রাউনের সঙ্গে মতবিরোধের ফলে তিনি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। অবন ঠাকুরের প্রিয়তম ছাত্র নন্দলালও আর্ট কলেজের পাঠ শেষে অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউনের শিক্ষকতার আমন্ত্রণ ফেলে রেখে জোড়াসাঁকোর দক্ষক্ষণের বারান্দায় গুরুর কাছে ফিরে এসেছেন। সময়ের খতিয়ানে অবনীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছবি ‘ভারতমাতা’ রচনাকাল ১৯০২ থেকে ১৯০৫। আর নন্দলালের কথা অনুসারে সেই ছবি ‘বঙ্গমাতা’ থেকে নিবেদিতার ‘ভারতমাতা’ হয়ে উঠেছে।

এবারে নিবেদিতার ভূমিকার দিকে তাকাই। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের কথায় ‘নিবেদিতা ভারতীয় শিল্পের মস্ত সমর্থক। ভারতবাসীর কোনো মৌলিক দান সর্বদাই তাঁর সমাদর ও উৎসাহ পেয়েছে।… তিনি তরুণ শিল্পীদের ছবির সমালোচনা লিখতেন, তাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন, শিল্পের উত্তম সমঝদার ছিলেন, পাশ্চাত্য শিল্পের ব্যাপক অনুশীলন করেছিলেন। ভারতীয় ভাবধারার অনুগামী বাঙালি শিল্পীরা তাঁর বিচক্ষণ নির্দেশে বিশেষ উপকৃত হয়েছেন। অজন্তার ছবি তাঁকে আত্মহারা করে দিত’ – ইত্যাদি। ওপরের এই কথাগুলি ভারতীয় শিল্পধারায় ভগিনী নিবেদিতার অবদান সম্পর্কে একটি চুম্বক-ভাবনার মতো আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। আমরা জানি, শুধুমাত্র শিল্পের সমর্থক বা উৎসাহদাতা হওয়াই শেষ কথা নয়, শিল্পের ভুলত্রুটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তাকে পজিটিভ দিকে এগিয়ে দেওয়ার ওপরেই নির্ভর করে শিল্প-আন্দোলনের অভিমুখ। এ ক্ষেত্রে নিবেদিতার ভূমিকা অত্যন্ত সদর্থক। আর কেবল প্রথিতযশা শিল্পীর কাজের আলোচনা নয়, তরুণ-শিল্পীদের সমালোচনা লিখে তাদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি এই নবীন প্রজন্মের শিল্পকলার ‘ভুলত্রুটি ধরিয়ে’ তাদের দীক্ষক্ষত করে তোলার ব্যাপারে নিবেদিতার অবদান বিশেষ স্মরণীয়। কারণ যে কোনো আন্দোলনে – তা শিল্প-সাহিত্য যাই হোক না কেন – তরুণদের হাতেই বর্তায় আগামী দিনের উত্তরাধিকার। এছাড়া আরো দুটি জরুরি পয়েন্ট যদুনাথ আমাদের জানিয়েছেন, তা হলো, ‘অজন্তার ভিত্তিচিত্রে তিনি (নিবেদিতা) খাঁটি ভারতীয় শিল্পের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেছেন এবং এলিফ্যান্টার ত্রিমূর্তির মধ্যে হিন্দুধর্মের সমন্বয়ভাবনার প্রস্তর-রূপায়ণ রয়েছে, এ কথাও (নিবেদিতা) বলেছেন।’ অর্থাৎ নব্য ভারতীয় শিল্পের আদর্শ হিসেবে অজন্তার আঙ্গিক তথা ভারতীয় ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্যগুলি শিল্পীকুলের সামনে মেলে ধরার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ ব্যাপারে নিবেদিতা আমৃত্যু বিপুল প্রচেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম, ১৯০৯ সালে লন্ডনের ইন্ডিয়া সোসাইটির উদ্যোগে অজন্তার দেয়ালচিত্রের অনুলিপি করার জন্য ভারতীয় ও বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের যে দল নির্বাচিত হয় সেখানে নন্দলাল ও অসিতকুমার হালদারকে যুক্ত করা। নিবেদিতার অনুরোধে এবং অবনীন্দ্রনাথের নির্দেশে নন্দলাল ও অসিতকুমার সেবারে লেডি হেরিংহ্যামের সঙ্গে অজন্তা যাত্রা করেন। পরে অবশ্য অনুলিপির কাজে সহযোগিতার জন্য সমরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, কে. ভেঙ্কটাপ্পাও ওঁদের সঙ্গে যোগ দেন। আবার হায়দরাবাদ থেকে সৈয়দ আহমেদ, ফজলউদ্দিন কাজি প্রমুখ শিল্পী অনুলিপির কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন। আর বলতে বাধা নেই, ভারতীয় শিল্পের নতুন করে গড়ে ওঠার কালে অজন্তার চিত্রকলা শিল্পীদের মধ্যে কতটা প্রভাব বিসত্মার করেছিল। নন্দলাল ও অসিতকুমারের কাজে অজন্তা চিত্রমালার মনুমেন্টাল কোয়ালিটি বা বৃহদত্তগুণ আর অঙ্কনধর্মিতা বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে। অবনীন্দ্রনাথের কাজে পার্সিয়ান ও মোগল মিনিয়েচার ছবির প্রভাব বেশি থাকলেও তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ ছাত্রটি গুরুর প্রায় বিপরীত পথে হেঁটে অজন্তার শৈলী ও বিন্যাসের ধারাটিকে স্বমহিমায় আত্মস্থ করেছেন – যা নন্দলালের নিজস্ব স্টাইল নির্মাণে অন্যতম সহায়ক হয়েছে। আর এখানে পরোক্ষভাবে নিবেদিতার ভূমিকাটি আমাদের অবশ্য স্মরণে রাখতে হয়।

নিবেদিতা সর্বদা ভারতীয় শিল্পকলার নবজন্ম-গ্রহণের স্বপ্ন দেখতেন। ভারতীয় শিল্প বলতে তিনি বুঝতেন ‘ঐতিহ্যবাদী প্রাচ্যরীতি, পুরাতন পা-ুলিপি এবং ভাস্কর্যরীতির দ্বারা প্রভাবিত রীতি।’ এই ধরনের শৈলীকে তিনি বরাবর অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছেন, তিনি আরো বলেছেন, ‘আমি চাই মসিত্মষ্ক ও হৃদয়ের যোগ – নিছক চোখ ও হাত দিয়ে আঁকা ছবি নয়। চাই ভাবাত্মক ছবি।’ আর কেবল ভারতীয় আঙ্গিকই নয়, প্রয়োজন হলে বিশেষ গোত্রের ইয়োরোপীয় স্টাইলকে গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা নেই – এ কথাও তাঁর মনে হয়েছে। আর সেদিক থেকে তাঁর আদর্শ বিদেশি চিত্রীরা হলেন রসেটি, মিলে, পুভি দ্য শ্যভান, ববতে মঁভাল প্রমুখ, আর প্রি-র‌্যাফেলাইট ও মিডিয়াভেল শিল্পীরা তাঁর কাছে ছিলেন আদর্শস্বরূপ। তবে তাঁর ঝোঁক বিশেষ করে দেয়ালচিত্রের দিকে, মিনিয়েচার ছবি বা অনুচিত্র অপেক্ষা চিত্র-ভাস্কর্যের ম্যুরালের প্রতিই তাঁর বিশেষ অঙ্গুলি নির্দেশ। যেসব ছবি ছোট পটের সীমানায় আবদ্ধ নয়, আকারে আয়তনে যাদের বিশালতা আছে, এমন শিল্পকলাই আদর্শ হিসেবে নিবেদিতার কাছে প্রাধান্য পেয়েছে। ১৯০৫-এ লেখা তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা অ্যাগ্রেসিভ হিন্দুইজম-এ তিনি শিল্পীদের জন্য ছবির কিছু বিষয়-ভাবনাও স্মরণ করিয়েছেন। তাঁর মতে, শিল্পীদের বিষয় সংগ্রহ করতে হবে ভারতের মহাকাব্য ও ইতিহাসের উজ্জ্বল অধ্যায়গুলি থেকে। যেমন চিত্রের বিষয় অনুযায়ী তিনি ভীষ্ম, যুধিষ্ঠির, আকবর, শেরশাহ, প্রতাপ সিংহ, চাঁদবিবি ইত্যাদি চরিত্রকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন – যে ছবি দর্শকের মনে নাড়া দিয়ে যাবে। অর্থাৎ কেবল ভালো ছবি আর দেশীয় ছবি রচনাই উদ্দেশ্য নয়, তা যেন সকলের মনে একটা জাত্যভিমানের অহংকার তৈরি করে, সেদিকে নিবেদিতার বিশেষ লক্ষ্য আর তাঁর মতে ‘সমগ্র অতীত জীবনকে বিশ্ব জীবনে অঙ্গীভূত’ করতে হবে। তাঁর দৃঢ় ঘোষণা, ‘জাতীয় ভাবকে আত্মগত করতে হবে বিশ্বভাবের অংশ হিসেবেই। সেজন্য প্রয়োজনে ভাঙতে হবে আচারের বন্ধন – তবে তা যেন নীচ ব্যক্তিস্বার্থে করা না হয়।’ একশ বছর আগে বলা নিবেদিতার এই কথাগুলি কি আজকেও নতুন করে আমাদের ভাবিয়ে তোলে না?

নিবেদিতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য কাজ কলাশিল্পের যথার্থ রসটুকু সাধারণের কাছে পরিবেশন করে তাদের দীক্ষক্ষত করে তোলা। নিয়মিত প্রবন্ধ লেখা ও বিবিধ শিল্পালোচনার দ্বারা তিনি সাধারণের মধ্যে শিল্পের বোধকে জাগিয়ে তুলতে আজীবন প্রয়াস করেছেন। আর এ কাজে তিনি পাশে পেয়েছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব – যার সহায়তায় প্রকাশ পেয়েছে এই মূল্যবান রচনাগুলি। প্রবাসী বা মডার্ন রিভিউ পত্রিকার সাহায্য ছাড়া নিবেদিতার এই প্রয়াস কোনোমতেই পাঠকের চোখের সামনে আনা সম্ভব ছিল না। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের কথায়, ‘শিক্ষিত ভারতবাসীকে তিনি (নিবেদিতা) শিল্পের খাঁটি তত্ত্ব স্বীকারে প্রণোদিত করেছেন। এবং তিনি তাঁর প্রাজ্ঞ সমালোচনার দ্বারা বাংলায় ‘‘ভারতীয় চিত্রকলা’’ শিল্পীগোষ্ঠীর চিত্রাবলীকে শিক্ষিত সমাজে পরিচায়িত করেছেন। এই নব্য ভারতীয় চিত্রকলা মডার্ন রিভিউ পত্রিকার বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল।’ কেবল যদুনাথ নন, অবনীন্দ্রনাথও এ ব্যাপারে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন রামানন্দকে, তিনি বলেছেন, ‘রামানন্দবাবুর কল্যাণে আমাদের ছবি আজ দেশের ঘরে-ঘরে। এই যে ইন্ডিয়ান আর্টের বহুল প্রচার – এ এক তিনি ছাড়া আর কারুর দ্বারা সম্ভব হত না। আর্ট সোসাইটি পারেনি; চেষ্টা করেছিলুম, হলো না। রামানন্দবাবু একনিষ্ঠভাবে এই কাজে খেটেছেন, টাকা ঢেলেছেন, চেষ্টা করেছেন, পাবলিকে ছবির ডিমান্ড ক্রিয়েট করেছেন। কত বাধা তিনি পেয়েছিলেন।… আমরা কখনোই পারতুম না। তিনিই হাত বাড়িয়ে ভার তুলে নিলেন। আমরা আর্টিস্টরা শুধু যে তাঁর দৌলতে বিনা পয়সায় দেশজোড়া বিজ্ঞাপন পেয়ে গেছি তাই নয়, নিয়মিত দক্ষক্ষণা, কাঞ্চনমূল্য তাও পাচ্ছি এখনো। কে ছাপতো ঘরের কড়ি দিয়ে আমাদের ছেলেমেয়েদের হাতের ছেলেখেলার ছবি যদি না প্রবাসী বার করতেন রামানন্দবাবু?’ ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখি, অবনীন্দ্রনাথের এই কথাগুলি বর্ণে বর্ণে সত্য। প্রবাসী বা মডার্ন রিভিউ ছাড়া শিল্পের এমন প্রচার বা প্রসার কখনোই সম্ভব ছিল না।

তবে রামানন্দের শিল্পভাবনার নেপথ্যে কাজ করেছে নিবেদিতার ভূমিকা। ভারতীয় শিল্পের মূল সুরের সন্ধানে তাঁকে পথ দেখিয়েছিল নিবেদিতার শিল্প চিন্তা। বলতে কোনো বাধা নেই যে, নিবেদিতা একপ্রকারে প্রবাসী সম্পাদকের শিল্পগুরুর আসন অলংকৃত করেছেন। প্রবাসী পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় (বৈশাখ, ১৩০৮) অজন্তার চিত্রকলা বিষয়ে রামানন্দের রচনা ‘অজন্টা গুহা চিত্রাবলী’র অনেক জায়গায় বিরূপ সমালোচনা লক্ষ করা যায় – যদিও পরবর্তীকালে তাঁর মতের বদল ঘটেছে। সেই পর্বে অন্য সকলের মতো তিনিও রবিবর্মার ছবির রিয়েলিস্টিক অ্যাপ্রোচের প্রতিই পক্ষপাতী ছিলেন। পাশাপাশি অজন্তার ছবির ঈষৎ আলংকরিক ভাবের প্রাচ্য চিত্রভাষাটিকে তখনো তিনি পুরোপুরি গ্রহণ করে উঠতে পারেন নি। তবে ভারতীয় ছবির অন্দরমহলে প্রবেশ করতে নিবেদিতার সক্রিয় ভূমিকা যে কাজ করেছে, তা স্বয়ং রামানন্দ মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। একটু খেয়াল করা যাক সেই প্রবন্ধে রামানন্দ কী লিখেছিলেন? তিনি লিখেছিলেন – ‘অজন্টা গুহা চিত্রাবলীতে চিত্রকরগণ অনেক স্থলে ললনাদিগের চক্ষু বড়োই দীর্ঘ করিয়াছেন। টানা চোখের মতো আমাদের প্রাচীন সাহিত্যে পীন পয়োধর ও গুরু নিতম্বের প্রশংসা আছে। কিন্তু তাই বলিয়া কিছুতেই স্বভাবকে অতিক্রম করা উচিত নয়। অজন্টা গুহার ছবিগুলিতে নারীগণের স্তন ও নিতম্ব স্বাভাবিক অপেক্ষা পীনতর ও পৃথুতর করিয়া আঁকা হইয়াছে।’ তবে রামানন্দের দৃষ্টি যথেষ্ট উন্মুক্ত, অজন্তার ছবির উৎকর্ষের প্রশংসাও করেছেন। যেমন পরক্ষণেই তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু নরনারী-দেহচিত্রণে অপরাপর বিষয়ে এই প্রাচীন চিত্রকরগণ অসামান্য নৈপুণ্য প্রদর্শন করিয়াছেন। অঙ্গুলিভঙ্গ যে কতপ্রকার আছে বলা যায় না। মিনতি, রোষপ্রদর্শন, আদর প্রভৃতি ভিন্ন-ভিন্ন কার্যে ভিন্ন-ভিন্ন প্রকার ভঙ্গি। কিন্তু এই প্রাচীন শিল্পীগণ ভালো করিয়া পা-আঁকিতে পারেন নাই।’ আরেকটি ব্যাপার বোধকরি তিনি খুশি মনে মেনে নিতে পারেন নি তা হলো, নারী দেহের নগ্নতা। সে লেখায় বলেছেন, ‘নারীগণকে প্রায়ই বিবসনা বা অর্ধনগ্না আঁকা হইয়াছে, কিংবা এরূপ বস্ত্র পরানো হইয়াছে যাহাতে দেহের গঠন বুঝিতে পারা যায়।’ স্বভাবতই মনে হয়, রামানন্দ প্রথম পর্বে রিয়েলিস্টিক শিল্পের প্রতি আগ্রহী ছিলেন, তাই ভারতীয় বিষয়ের হলেও পাশ্চাত্য আঙ্গিকে চিত্রিত রবিবর্মার ছবি তাঁকে আকর্ষণ করেছে।

কিন্তু প্রবাসী বা মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় প্রকাশিত নিবেদিতার শিল্পালোচনা তাঁকেও শিক্ষিত করে তুলেছিল। রামানন্দ নিজেই বলেছেন, ‘তিনি (নিবেদিতা) আমার কাগজে লেখায় কয়েকটি বিষয়ে আমার চোখ ফুটিয়াছিল। আমি প্রথম-প্রথম রবিবর্মার ছবির প্রতিলিপি ছাপিতাম। তিনি ক্রমাগত আমার সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করিয়া আমার এই বোধ জন্মান যে, রবিবর্মা ও তদ্বিধ অন্য ছবির রীতি ভারতীয় নহে এবং পাশ্চাত্যরীতির চিত্র হিসাবেও সেগুলির উৎকর্ষ নাই। চিঠিতে ছাড়া এসব ও অন্যান্য বিষয়ে তাঁহার সহিত মৌখিক কথা যখন হইত, তখন কথা বলার কাজ তিনিই বেশি করিতেন, আমি বেশিরভাগ শ্রোতার কাজ করিতাম।… গ্রীক-গান্ধার মূর্তিশিল্প যে, ভারতীয় মূর্তিশিল্প অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ নহে, এবং গান্ধার মূর্তিশিল্পের বাহ্য কারিগরি গ্রীক হইলেও তাহাতে প্রাণ যতটুকু আছে তাহা যে ভারতীয়, তাহা তিনি প্রদর্শন করেন। অজন্টা গুহা-বিহারের প্রাচীরচিত্রে অঙ্কিত চিত্রাবলী ছাড়া গুহাবলীর স্থাপত্যাদিও যে প্রশংসনীয়, নিবেদিতা কয়েকটি সচিত্র প্রবন্ধে তাহা প্রদর্শন করেন।’ – (‘ভগিনী নিবেদিতা’ উদ্বোধন, ১৩০৫)

এখানেই শেষ নয়, প্রবাসী পত্রিকার অগ্রহায়ণ, ১৩২০ সংখ্যায় রমাপ্রসাদ চন্দের ‘ভারতের প্রাচীন চিত্রকলা’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তার বছর দুয়েক আগে নিবেদিতার আকস্মিক প্রয়াণ ঘটেছে। খেয়াল করলে দেখি, রমাপ্রসাদের প্রবন্ধের শেষে রামানন্দের একটি জরুরি নোট সংযোজিত হয়েছে – যেখানে রবিবর্মার ছবির প্রতি তাঁর আকর্ষণ ও নিবেদিতার মনোভাব প্রসঙ্গে একটি জরুরি ঘটনার সবিসত্মার উল্লেখ আছে। সেই নোট-অংশে রামানন্দ অকপটে স্বীকার করেছেন, ‘আমি একসময় রবিবর্মা ও তাঁহার সম্প্রদায়ের গোঁড়া ছিলাম। আমার লেখা তাঁহার সচিত্র জীবনচরিত এখনও বাজারে বিক্রি হয়। আমি তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতাপাশে বদ্ধ। ৫/৬ বৎসর পূর্বে ছবি সম্বন্ধে স্বর্গীয়া ভগিনী নিবেদিতার সহিত উত্তেজিতভাবে চিঠি লিখিয়া রবিবর্মার পক্ষাবলম্বনপূর্বক তর্ক করিয়াছিলাম। আমার চিঠির উত্তরে সেই মনস্বিনী বত্রিশ পাতার একটি চিঠি লিখিয়া, একটু বিবেচনার পর, তাহা আমাকে পাঠান নাই। তাঁহার সেই চিঠি বোধহয় এখনও আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু মহাশয়ের নিকটে আছে। পরে স্বর্গীয়া লেখিকার মুখে শুনিয়াছি যে, তিনি এই ভাবিয়া উহা আমাকে পাঠান নাই যে, আমি ছবি দেখিতে-দেখিতে উহার মর্মজ্ঞ হইব, তর্কদ্বারা আমার চোখ খুলিবে না। মর্মজ্ঞ হইয়াছি কিনা জানি না, কিন্তু এখন তাঁহার যেরূপ ছবি ভালো লাগোত আমিও তদ্রূপ ছবির অনুরাগী হইয়াছি।… কেবলমাত্র স্বভাবের অনুকরণ বা বস্ত্ততন্ত্রতা যে আর্ট নহে, তাহা বুঝিতে আমার অনেক সময় লাগিয়াছে।’ স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, রামানন্দের এই বিবর্তিত শিল্প চিন্তার পেছনে নিবেদিতার ভূমিকা কতটা প্রগাঢ় ছায়া ফেলেছে, এবং নিঃসন্দেহে এই প্রভাব পজিটিভ অর্থে। তবে সেই ‘বত্রিশ পাতার’ চিঠিতে নিবেদিতা কী লিখেছিলেন তা জানতে আমাদের প্রবল ইচ্ছে করে। কারণ নিশ্চিতভাবে সেই চিঠিতে নিবেদিতার ভাবনায় ভারত শিল্পের সারকথাটি বিধৃত আছে।

এবারে দেখা যাক, কেবল শিল্পালোচনা ছাড়াও নিবেদিতার সহযোগিতায় আমাদের চিত্রীদের দীক্ষক্ষত করতে কোন ধরনের বিদেশি ছবির প্রতিলিপি রামানন্দের পত্রিকায় মুদ্রিত হচ্ছিল? না, কেবল ভালো ছবি হলেই তা নিবেদিতার বিচারের মাপকাঠি অতিক্রম করতে পারেনি। নিবেদিতার প্রায়োরিটি তালিকায় সেসব ছবি প্রাধান্য পেয়েছে, যেগুলো ছবি হিসেবে উৎকৃষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভাবের দিক থেকেও মহিমান্বিত। নিবেদিতা আধুনিক শিল্পী অপেক্ষা অপেক্ষাকৃত পুরনো দিনের শিল্পীদের কাজকে বেশি মর্যাদা দিতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, আধুনিকদের কাজ একটু হালকা ধাঁচের, একটু বেশি ব্যক্তিগত। সেসব ছবি একদিকে যেমন সূক্ষ্ম অনুভূতি জাগায়, তেমনি মন থেকে দ্রম্নত মুছেও যায়। অন্যদিকে প্রাচীন শিল্পীদের সকলেই ঐকামিত্মক ও আত্মসচেতনহীন, তাঁদের ছবিতে কোথাও কোথাও আড়ষ্টতা, স্থূলতা বা আতিশয্য থাকলেও তা কখনোই ‘ভালগার’ নয়। অর্থাৎ এখানেই নিবেদিতার শিল্পভাবনার গোড়ার কথাটি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত।

পত্রিকায় প্রকাশের জন্য যেসব শিল্পীর ছবি তাঁর পছন্দের তালিকায় ছিল, তার একটা সূচি এখানে তৈরি করা যেতে পারে। পাশ্চাত্য চিত্রকরদের মধ্যে মিলে (১৮১৪-১৮৭৫), টিশিয়ান (১৪৯০-১৫৭৬), রাফায়েল (১৪৮৩-১৫২০), মিকেলাঞ্জেলো (১৪৭৫-১৫৬৪), পেরুজিনো (১৪৪৬-১৫২৫), জিয়ত্তো (১২৬৬-১৩৩৭), বতিচেলিস্ন (১৪৪৫-১৫১০), ফ্রা আঞ্জেলিকো (১৩৯৫-১৪৫৫), ভেরোনেজ (১৫২৮-১৫৮৮), জি এফ ওয়াটস্ (১৮১৭-১৯০৪), বার্ন জোনস্ (১৮৩৩-১৮৯৮), রসেট্রি (১৮২৮-১৮৮২) প্রমুখ শিল্পীদের ছবি তিনি পত্রিকায় প্রকাশ করতে চেয়েছেন। মিস ম্যাকলাউডকে বিদেশ থেকে পাঠানো ছবির জন্য তালিকার সঙ্গে এ কথাও জানাতে ভোলেন নি যে ‘আমি কিন্তু রিলিজিয়াস ছবি চাই, ক্লাসিক্যাল ছবি কদাপি নয়।’ অর্থাৎ আধ্যাত্মিক ও আদর্শবাদী ছবিকে নিবেদিতা আমাদের শিল্পীদের চোখের সামনে মেলে ধরতে চাইছিলেন। বিদেশি শাসকের অধীন ভারতীয় শিল্পীদের অন্তরে শিল্পকলার মাধ্যমে স্বদেশি ভাবনা জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি শিল্পকলাকে যেন পূজার নৈবেদ্য হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। আর শুধু পত্রিকায় ছবি প্রকাশ করাই নয়, প্রত্যেকটি ছবির জন্য তিনি স্বতন্ত্র নোটস লিখে দিতেন, সেগুলি বাংলায় অনুবাদ করে প্রবাসীতে মুদ্রিত হতো। এদিক থেকে দেখলে, নিবেদিতা বাংলা শিল্প-সমালোচনার ধারাটিকেও যেন অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেলেন। কীভাবে একটি ছবিতে দেখতে বা বুঝতে হয় – আমাদের সামনে তার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দিলেন তিনি। পরে যখন নব্যবঙ্গীয় শিল্পকলার ছবি রামানন্দের পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছে, নিবেদিতা তখনো সেগুলির টীকা-ব্যাখ্যা লিখে সেসব ছবি বুঝতে দর্শক-পাঠককে সহায়তা করেছেন। ও সি গাঙ্গুলীর মতো শিল্পবোদ্ধাও তাঁর কাজের ভূয়সী প্রশংসা না করে পারেন নি। তাঁর আত্মজীবনীমূলক শিল্পালোচনা ভারতের শিল্প ও আমার কথা গ্রন্থে লিখেছেন – ‘মডার্ন রিভিউতে বাংলার নতুন শিল্প-আন্দোলনের পুরোধা শিল্পীকুলের যে সকল ছবি প্রকাশিত হোত, সেই সম্বন্ধে চমৎকার সব টীকা-ব্যাখ্যা লিখে দিতেন ভগিনী নিবেদিতা। এই বিষয়ে রামানন্দবাবু তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলেন প্রচুর সহায়তা। আমাদের তখনকার তরুণ শিল্পীদের তিনি সর্বদা ভারতের পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়সমূহের চিত্রাঙ্কন করতে উৎসাহ ও নির্দেশ দিতেন; অবনীবাবুর সাজাহানের মৃত্যু, তাজের স্বপ্ন, ভারতমাতা, বন্দিনী সীতা, প্রভৃতি ছবি সম্বন্ধে নিবেদিতার ব্যাখ্যা ও মন্তব্য অতি অপূর্ব। এই জাতীয় সব লেখাই বেরিয়েছিল মডার্ন রিভিউতে। এককথায় বলা যায়, ভগিনী নিবেদিতা ছিলেন বাংলার তৎকালীন নবীন শিল্পীগোষ্ঠীর কর্মপ্রেরণার অন্যতম উৎস।’ অর্দ্ধেন্দ্রকুমারের এই কথা যে প্রতিটি অক্ষরে সত্য, সে কথা আজ বলার অপেক্ষা রাখে না। নিবেদিতা সম্পর্কে তিনি আরো বলেছেন, ‘অবনীবাবুর বাড়িতে ভগিনী নিবেদিতা ও স্টেটসম্যান সম্পাদক র‌্যাটক্লিফ-সাহেব একসঙ্গে এলে কলাবিদ্যা সম্বন্ধে আলোচনা চলতো খুব জোরালোভাবে। এই আলোচনার মধ্যে সর্বদাই নিবেদিতার একটি সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যেত। ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর সহানুভূতি। তাঁর চেষ্টা ব্যতীত নন্দলাল, অসিতকুমার প্রভৃতির অজন্তায় গিয়ে লেডি হেরিংহ্যামের সঙ্গে কাজ করবার সুযোগ হোত না কখনোই।’ আবার অন্যত্র তিনি একটি অত্যন্ত জরুরি কথা বলেছেন – ‘তাঁর (নিবেদিতা) সব লেখা পড়ে পড়ে তাঁর চিন্তাধারার প্রভাবে আমি ক্রমশ ভারতীয় কলাবিদ্যার মর্ম অনুসন্ধানে প্রচুর প্রেরণা পেয়েছিলাম।’ অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, নিবেদিতার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও মেধার কাছে অবনীন্দ্রনাথের মতো শিল্পী, কুমারস্বামী বা অর্দ্ধেন্দ্রকুমারের মতো শিল্পবেত্তা থেকে শুরু করে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো গুণী সম্পাদক সকলে প্রাণিত হয়েছিলেন। একসঙ্গে এতগুলি কৃতী মানুষকে মোটিভেট করে একত্রিতভাবে একটি বিশেষ অভিমুখে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া মোটেই সহজ কথা নয়। কিন্তু এই ‘বিদেশিনী’ এই অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছেন। অর্দ্ধেন্দ্রকুমার বাস্তবিকই বলেছেন যে, তাঁকে বাদ দিয়ে ভারত শিল্প আন্দোলনের বিবরণ বাস্তবিকই লিপিবদ্ধ করা যায় না। নিবেদিতাকে তিনি ‘বাংলাদেশে জাতীয়তার উদ্বোধনে একটি জ্বলন্ত শিখাস্বরূপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। নিবেদিতার কাজের পরিধি ও দুর্মর প্রয়াসকে বিশ্ব শিল্পের প্রাঙ্গণে এনে বিচার করতে চেয়েছেন তিনি। উদাত্ত মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন –

‘পারস্য বা আরবের ক্ষেত্রে বার্টন বা আর্মেনিয়ান ভামবেরী, কিংবা জাপানের ক্ষেত্রে লাফকাডিও হার্ন যা করেছেন, ভারতের আত্মরূপের উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার ব্যাপারে নিবেদিতার ভূমিকা সেসব কাজকে ছাপিয়ে গেছে।’ এখানেই শেষ নয়, আরো বলেছেন, ‘বর্তমান বাংলায় এমন কোনো কার্যাবলী নেই – সাহিত্য, শিল্প, প্রাচীন ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বের গবেষণা – যা নিবেদিতার লেখার দ্বারা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়নি।’

নিবেদিতা কীভাবে তরুণ শিল্পীদের অন্তরে চিত্রের বিষয়কে কেন্দ্র করে গভীর বাণী সঞ্চারিত করতেন তার একটা ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। একদা তরুণ নন্দলাল চিত্রিত রাধাকৃষ্ণের ছবি প্রসঙ্গে এই সাক্ষ্য দিয়েছেন আরেক শিল্পী ক্ষক্ষতীন্দ্রনাথ মজুমদার। তিনি লিখেছেন – ‘একবার তিনি (নন্দলাল) রাধাকৃষ্ণের ছবি আঁকছেন, পিছনে এসে দাঁড়ালেন ভগিনী নিবেদিতা। গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখলেন বৃন্দাবনের সেই অপরূপ প্রেমিকযুগলকে। কিন্তু কই, তাঁদের নয়নে স্বর্গীয় সুষমা তো নেই, দ্যুলোকের দিব্যজ্যোতিতে দীপ্ত হয়নি তো সুঠাম শ্যামবরণতনু! নিবেদিতা শুধালেন, ‘কার ছবি আঁকছ আর্টিস্ট?’ ‘রাধাশ্যামের’ – নন্দলাল বললেন। ‘তা তো নীলাভ অঙ্গলাবণ্য দেখেই বুঝেছি। কিন্তু এতে যৌবনসুলভ আত্মোচ্ছ্বাস তোমার, আর্টিস্ট। পঞ্চাশ অতিক্রম না করে রাধাকৃষ্ণের লীলা এঁকো না, বুঝলে?’ নন্দলাল সেই উপদেশ অক্ষরে-অক্ষরে পালন করেছেন।’ আমাদের মনে পড়বে পাশ্চাত্য শিল্পীদের ছবি নির্বাচনের ব্যাপারে নিবেদিতা বারংবার ‘ভালগারিটি’কে দিতে চেয়েছিলেন। শিল্পী অসিতকুমার তাঁর লেখায় (সাবেকী কথা, সমকালীন, জ্যৈষ্ঠ ১৩৬২) অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাঁকে লিখেছেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, তাঁর মতো মাতৃস্থানীয়া দেবীকে দর্শন করেছি এবং তাঁর স্নেহশীতল বাণী ক্রমাগত লাভ করেছি। যখন কখনো কখনো সতীর্থ সুহৃদ শৈলেন, ক্ষক্ষতীশ (ক্ষক্ষতীন্দ্রনাথ) বা নন্দলালের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তখন আমরা তাঁর কথা স্মরণ করে থাকি।’

স্বদেশিযুগের প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী অভিমানের সুরে তাঁর শ্রী অরবিন্দ ও বাংলার স্বদেশী যুগ-এ লিখেছেন, ‘পাশ্চাত্ত্য আদর্শ বর্জন করিয়া প্রাচ্য আদর্শে নূতন চিত্রাঙ্কন পদ্ধতির জন্মদাতা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর।… ভগিনী নিবেদিতা এই চিত্রাঙ্কন পদ্ধতিকে সূতিকাগার হইতে বাহির করিয়া তাঁহার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইহার সুদীর্ঘ শৈশবকালে এই নবজাত শিশুকে যেরূপ অকৃত্রিম মাতৃস্নেহে লালনপালন করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে এই বিদেশিনী মহিমাময়ী মহিলার পুণ্যস্মৃতির উদ্দেশ্যে যদি বাঙালী জাতি করজোড়ে দ-ায়মান না হয়, তবে তাহার ললাটে অকৃতজ্ঞতার কলঙ্কস্পর্শ হইবে।’ অন্যদিকে অর্দ্ধেন্দ্রকুমার নিবেদিতার জন্মশতবর্ষের স্মারকগ্রন্থে দুঃখ প্রকাশ করেছেন নিবেদিতার অকাল প্রয়াণে তাঁর আশা অপূর্ণ রয়ে যাওয়ায়। তিনি এক অলৌকিক প্রত্যাশাও করেছেন, অসমাপ্ত কাজের অতৃপ্ত আকাঙক্ষা নিয়ে নিশ্চয়ই নিবেদিতা পুনরায় ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করবেন। অর্দ্ধেন্দ্রকুমারের আশা পূর্ণ হবে কিনা জানি না, তবে আজ মনস্বিনী নিবেদিতার একশ পঞ্চাশতম জন্মবর্ষে তাঁর জীবন ও কাজের দিকে আমাদের একবার ফিরে তাকানোর সময় এসেছে বৈকি। আর সাম্প্রতিক শিল্প-প্রেক্ষাপটের দিকে তাকিয়ে আমাদের মনে হয় এই মুহূর্তে এমন এক ব্যক্তিত্বের বড় প্রয়োজন, যাঁর শক্ত হাতে ধরা থাকবে আজকের কলাশিল্পের প্রবল চালিকাশক্তি – যে অভিমুখ এক নতুন শিল্প-আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাবে আমাদের।

Leave a Reply

*