logo

মকবুল ফিদা হুসেন সীমাহীন আকাশের নিচে এক প্রাণখোলা সত্তা

প ত্র লে খা  না থ

সময়টা ১৯৩৪-এর গ্রীষ্মের পড়ন্ত বিকেল। পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্য ঢেলে দিয়েছে তার নরম সোনালি আভা, গোলাপি হয়ে উঠেছে ইন্দোর নগরী। এই রূপনগরীর রাজপথের একধারে দাঁড়িয়ে একটি জনবহুল বাজারের দৃশ্য এঁকে চলেছেন উনিশ বছরের এক সপ্রতিভ যুবক। লম্বা হাতে আঙুলের ভাঁজে থাকা তুলির একের পর এক টানে রঙিন হয়ে উঠেছে দৃশ্যপট। যুবকটিকে ঘিরে ক্রমশ জমে উঠছে ভিড়। শিল্পীর ছবি সম্পূর্ণ হলে ভিড়ের মধ্যে থেকে শোনা যায় এক শিল্পরসিকের কণ্ঠস্বর, ‘বাহু, অপূর্ব এঁকেছ তুমি, ছবিটা আমাকে দেবে?’ শিল্পী কিছু বলার আগেই সেই মানুষটি একেবারে এগিয়ে এসে শিল্পীর হাত থেকে ছবিটা নিয়ে একটা দশ টাকার নোট গুঁজে দেয় যুবকটির হাতে। শিল্পী অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন সেই ভদ্রলোকটির দিকে, তারপর লাজুক দৃষ্টিতে চোখ নামিয়ে মুচকি হাসেন। সেই উনিশ বছরের যুবকের পেশাদারি উৎকর্ষ সেদিন তাক লাগিয়ে দিয়েছিল শিল্পরসিক ভদ্রলোকটিকে। সেই উৎকর্ষের সূক্ষ্ম টান আজীবন যিনি ক্যানভাসে ধরে রেখেছিলেন তিনি হলেন ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিতর্কিত শিল্পস্রষ্টা, শিল্পনায়ক, জীবন্ত কিংবদন্তি, শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন (১৯১৫-২০১৩)।

ঠাকুরদা ছিলেন লণ্ঠন বানানোর কারিগর, বাবা করণিক, কাকা কুস্তিগির আর মা সর্বংসহা এক আটপৌরে নারী। খুব ছোটবেলাতেই মাকে হারিয়েছিলেন, তা নিয়েও রয়েছে লোককথার মতো জিইয়ে থাকা কাহিনি। অবশ্য মকবুল ফিদা হুসেনের নিজের জীবনটাও প্রায় ওই রকমই নানা লোককথার আঙ্গিকে লুকিয়ে আছে। খালি পায়ে হাঁটা, লম্বা হাতলের তুলির ব্যবহার, ছবি এঁকে আবার সাদা রং দিয়ে তাকে ঢেকে দেওয়া কিংবা মুম্বাইয়ের বস্তিতে শামিয়ানা টাঙিয়ে নিজের ছেলের বিয়ের ভোজে সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষদের সঙ্গে নিম্নবর্গের মানুষদের মিলনক্ষেত্র তৈরি করা – এরকম মানুষকে নিয়ে লোকমুখে তরজা তো থাকবেই।

মকবুল ফিদা হুসেনের জন্মশতবর্ষে দাঁড়িয়ে তাঁর সংগ্রামময় জীবনের সঙ্গে সংবেদনশীলতার মিশ্রণ তাঁকে সৃষ্টিশীলতার কোন উৎকর্ষে পৌঁছে দিয়েছিল, তা নিয়ে লিখতে গেলে হুসেনের জীবনের ঘটনাগুলি বিশ্লেষণের দরকার।

মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত গ্রাম গান্ধারপুর, যার যাবতীয় ঐশ্বর্য কেন্দ্রীভূত বিধবাজীর এক মন্দির ঘিরে। হাজার হাজার ভক্তসমাগমে ঘেরা থাকত মন্দির চত্বর। মন্দির চত্বরেই মকবুল ফিদা হুসেনের ঠাকুরদা আবদুল সাহেবের একটি দোকান ছিল। আবদুল সাহেব ওই দোকানে বসেই টিনের লণ্ঠন বানাতেন এবং বিক্রি করতেন। আবদুল সাহেবের দুই পুত্র, বড় পুত্র ফিদা, তিনি ছিলেন বইমুখো, আর ছোটজন মুরাদ, তিনি আবার মলস্নযুদ্ধে মনোযোগী। উচ্চ বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরোনোর পরই বড় ছেলে ফিদার সঙ্গে জয়নাবের বিবাহ হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই পরিবারে এলো নতুন অতিথি ছোট্ট মকবুল।

মকবুল ফিদা হুসেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক চিত্রমালায় তাঁর শৈশব-কৈশোরের নানা ছবি এঁকেছেন। এঁকেছেন মায়ের বহু ছবি। যদিও তাঁর দুই বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু হয় কিন্তু কিছু আবছা স্মৃতি, মায়ের মায়াময় আবেশ এবং পরবর্তীকালে অন্যদের মুখ থেকে শুনে মায়ের যে বর্ণনা তিনি তুলে ধরেছিলেন তা এককথায় অসাধারণ। সব সন্তানেরই মায়ের প্রতি চিরকালীন এক আকর্ষণ কাজ করে, কিন্তু মকবুল ফিদা হুসেন অত ছোটবেলায় মাকে হারানোর জন্যই বোধহয় জীবনের প্রতি মুহূর্তে মাকে সন্ধান করেছেন কখনো তাঁর ছবিতে, কখনো তাঁর লেখার মধ্যে, কখনো বা মাদার টেরিজার ছবি এঁকে সেই মাতৃত্বের স্বাদ পূরণ করতে চেয়েছেন, কখনো বা পুরাণের দেবদেবীতে অনুসন্ধান করেছেন সেই আশ্রয়কে।

হুসেনের মাতৃদেবীর মৃত্যুটাও ছিল সিনেমার কাহিনির মতো। শিশু হুসেন একদিন প্রবল জ্বরে পড়লেন। জ্বর কিছুতেই নামে না। দিন চলে যাচ্ছে, কোনো ওষুধই কাজ করছে না। চোখ বুজে জীর্ণ শরীরে নিশ্চুপ পড়ে রয়েছেন মকবুল। মা জয়নাব এ দৃশ্য আর দেখতে পারছিলেন না। উতলা জয়নাব শেষ পর্যন্ত দৈবের আশ্রয় নিলেন। কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন সন্তানের মাথা। নিজেরই দুই বাহুতে তুলে নিলেন সন্তানকে। টিমটিমে লম্ফের আলো জ্বলছে ঘরে। আলো-আঁধারিরা খেলা করছে ঘরের আনাচে-কানাচে। জয়নাব সন্তানকে নিয়ে বিছানা প্রদক্ষিণ শুরু করলেন। যাকে বলে ‘সাদকা’। কিন্তু জয়নাব হয়তো নিজেও জানতেন না তিনি শারীরিকভাবে কতখানি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। মকবুলকে দুহাতে নিয়ে খাট প্রদক্ষিণ করতে করতে হঠাৎই মাথাটা ঘুরে যায় জয়নাবের। স্বামী ফিদা হঠাৎ ঘরে এসে যাওয়ায় জয়নাবকে ধরে ফেলেন। তারপর জয়নাবকে ধীরে ধীরে শুইয়ে দেন শয্যায়। কিন্তু সেই শয্যাই জয়নাবের শেষ শয্যা হয়। স্নেহশীলা জননী কিংবা কর্তব্যপরায়ণ পত্নীর ভূমিকা পালন করে নিজেকে নিংড়ে দিয়ে নীরবে সংসার পালন করতে করতে চলে গেলেন পরদিন সকালেই। প্রায় অদেখা মাকে নিয়ে মকবুল ফিদা হুসেনের কল্পনার ক্যানভাস বাস্তব হয়ে উঠেছে। মকবুল বিয়ের সাজে এঁকেছেন তাঁর স্নেহময়ীকে। বিশুদ্ধ মারাঠি সাজ, হলুদ রঙের ন-হাতি কাপড়ের ‘লঙধর’ এবং নীলাভ লাল রঙের চোলি, মাথায় বাঁধা ফুলের মালা, সঙ্গে রঙিন কাচের চুড়ি, রুপোর কানের দুল এবং গলার হার। মকবুলের আত্মজীবনীমূলক চিত্রমালায় মায়ের ছবি উঠে এসেছে বারবার। ছোটবেলায় হুসেনের মা তাঁর ছোট পা দুটি বাবার বিশাল জুতোর মধ্যে ঢুকিয়ে দিতেন এবং এই নিয়ে মা-ছেলের এক মজার খেলা চলত। তাঁর মা হয়তো তাঁকে তখন থেকেই একজন ‘বড় মানুষ’ রূপে দেখতে চাইতেন। এই ঘটনাটা মকবুলকে সারাজীবন ধরেই তাড়িত করেছে। পিতার সেই বৃহৎ জুতোয় পা গলিয়ে বসে থাকার যে প্রতীকী ব্যঞ্জনা বা প্রত্যয় তাঁর মনের মধ্যে জিইয়ে ছিল তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে প্রায়শই পাদুকাবিহীন হয়ে তাঁর ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে, অন্তত কোনো কোনো কলাবেত্তা এমনটাই মনে করেন। শুধু ছবিতে নয়, তাঁর লেখা কবিতার মধ্যেও হুসেন কৈশোরের এই ঘটনাটি ব্যক্ত করেছেন।

মায়ের মৃত্যুর পর মকবুল চলে গেলেন ঠাকুরদাদা আবদুলস্নার সম্পূর্ণ হেফাজতে। প্রায় সারাটা দিন তাঁকে দাদাজির নজরে থাকতে হতো। মকবুলের ছয় বছর বয়সে তাঁর পিতা আবার বিয়ে করলেন গুজরাটের সিধপুরের এক মসজিদের মৌলানার মেয়ে সিরিনকে। হুসেনের জীবনে মারাঠি সংস্কৃতির সঙ্গে গুজরাটি কৃষ্টিরও মিলন ঘটে গেল। ইতিমধ্যে আরো একটি বড় পরিবর্তনের সামনে তাঁকে পড়তে হয়েছিল। জন্মস্থান গান্ধারপুর ছেড়ে তাঁদের সবাইকে ইন্দোর শহরে আসতে হয়েছিল। সেই সময়কার ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ কাপড়ের কারখানা ‘চুরিমবয়’ মিলে টাইমকিপারের চাকরি পেয়েছিলেন ফিদা। সিরিনের গর্ভে ক্রমে ছয় সন্তানের জন্ম হলে মকবুল তাঁর ঠাকুরদাদার হেফাজতেই রয়ে গেলেন। পরিবারে একে একে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল। এরপর এলো আরো কঠিন সময়, মকবুলের বয়স তখন মাত্র এগারো বছর। তাঁর দাদাজি তাঁকে চিরদিনের মতো ছেড়ে চলে গেলেন। এর মধ্যেও ভাবুক মকবুল, শিল্পী মকবুল একা একা তাঁর সৃষ্টিজগতে হারিয়ে যেতে লাগলেন।

মকবুল ফিদা হুসেনের বয়স তখন ষোলো, সেসময় ইন্দোর শহরের মারাঠি রাজা যশোবন্ত রাও হোলকরের প্রাসাদে এক ফরাসি চিত্রকর বার্নে দ্য সুভেঁর বরাত জুটল রাজার অবয়ব অঙ্কনের জন্য। মকবুলের কানে কথাটা যেতেই মকবুল প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতেন রাজপ্রাসাদের সামনে, যদি একবার সেই ছবি ও শিল্পীকে দেখা যায়। কিন্তু প্রাসাদের দ্বাররক্ষীরা তাঁকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিলো না। মকবুলের সেই আশা পূরণ হয়েছিল অনেক অনেক বছর পরে। পরবর্তীকালে যশস্বী শিল্পী হিসেবে পরিচিত হুসেন সেই রাজবাড়িতে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আদৃত হয়েছিলেন। তিনি নিজেই এঁকেছিলেন হোলকারের একটি ছবি এবং তাঁর পাশে জুড়ে দিয়েছিলেন দুই স্ত্রীর ছবি – এক বিদেশিনী, এক স্বদেশিনী।

ঠাকুরদাদা মারা যাওয়ার পর থেকে ছোট্ট মকবুল খুঁজে ফিরতেন প্রান্তর থেকে প্রান্তরে, শহরের গলিতে গলিতে নিসর্গ রাস্তার চলমানতায়, শরীরী অবয়বের নানা বিভঙ্গ দৃশ্যগত উপস্থিতির মধ্যে সঙ্গসুখ উপলব্ধি করতেন সেই একাকী বালক। সেই উপলব্ধি দৃশ্যপটে স্থায়ী করে রাখতে তাঁর সঙ্গী থাকত আঁকার খাতা ও সরঞ্জাম। চুরিমবয় মিলের ধোঁয়ামুখো চিমনি, ঘিঞ্জি গলিতে ঝুঁকে পড়া খুপরির ছাদ, বাজারচলতি মানুষ, যানবাহন, মেহনতি নানা মানুষের চেহারা এঁকেছেন তিনি ক্রমাগত – রুটি বানানোর মাসি জুম্মান বাঈ কিংবা মিষ্টিওয়ালা ‘মিঠু’ তাঁর অতি প্রিয় ছিল, তিনি তাঁদের অসংখ্য রেখাচিত্র এঁকেছিলেন ওই অপ্রাপ্ত বয়সেই। সাধারণ মানুষের মুখ তাঁকে খুব আকর্ষণ করত। এছাড়া ওই সময় দেশি-বিদেশি যানবাহন ও পশু-পাখির ছবিও আঁকতে ভালোবাসতেন। আর ছিল সাইকেল নিয়ে তাঁর অবসেশন। অসংখ্য ছবি এঁকেছিলেন সাইকেল নিয়ে। সাইকেল নিয়ে তাঁর বাস্তবিক ছবি ছাড়াও নানা প্রতীকী ছবিও এঁকেছিলেন। সাইকেলকে তিনি কখনো দেখেছেন খ্যাপা ষাঁড়ের মতো। মকবুলের ছবিতে সাইকেলের দুটো হাতল ষাঁড়ের দুটো শিংয়ের আকার নিয়েছে। আসলে সাইকেলই ছিল তাঁর ওই সময়ের প্রধান বাহন। পাশাপাশি মনে হয়, গতিকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। তাই সাইকেল বা ঘোড়ার ছবি বারবার উঠে আসত তাঁর ক্যানভাসে।

এভাবেই ইন্দোর শহর আর তার আশপাশের নিসর্গ ঘুরে শিল্প সৃজনে দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু শৈশব থেকেই যার মধ্যে নানা সংস্কৃতির ব্যবহারিক রীতির নানা বৈভব এবং বৈচিত্র্য প্রবেশ করেছে, তিনি যে একজন সৃজনশীল মানুষ তৈরি হবেন, সে তো স্বাভাবিক। ১৯৩৬ সালে ইন্দোরের স্মৃতি বুকে আগলে এক বিসত্মৃত পৃথিবীর বুকে পাড়ি দিলেন মকবুল, পৌঁছালেন মুম্বাই। রাজা আর রাজপুত্রের রাজ্য থেকে একেবারে ইংরেজ শাসিত ভারতের এক কর্মমুখর বাণিজ্য বন্দরে। এ শহর যেমন কাউকে ফেরায় না, তেমনি এই শহরে ভাত জোটাবার জন্য নানা ফিকিরের মধ্যে ভালোমন্দ দুটোই আছে, একটু বেচাল হলেই অন্ধকারের রাস্তায় তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এই প্রতিকূলতার মধ্যে মুম্বাই শহরের এক ঘিঞ্জি বস্তিতে আস্তানা গেড়ে শিল্পসাধনার এক কঠিন তপস্যার আসন পাতলেন ভবিষ্যতের শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেন। ওই নির্মম শহর তাঁর সংবেদনশীল মনকে কম যন্ত্রণা দেয়নি, তবু তিনি নিজ সত্তাকে কখনো জলাঞ্জলি দেননি। বছরের পর বছর চরম জীবনসংগ্রামে কাটিয়ে নিজের শিল্প প্রতিভাকে লালন করে গেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে, এর প্রভাব উঠে এসেছে তাঁর ছবিতে। তিনি যেন যাবতীয় অন্ধকারকে নিজের মধ্যে রেখে সমস্ত আলোর নির্গমনে সাজিয়ে তুলেছেন তাঁর সৃষ্টিকে।

ব্যক্তিজীবনে হুসেন কখনো তাঁর অতীত জীবনকে ভোলেননি। শিল্পের মধ্যে এই ব্যক্তিগত গস্নানিকে তিনি টেনে আনেননি। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রেখেছেন জীবনসংগ্রামের সময় পাশে পাওয়া সেইসব মানুষকে। শিল্পপতি অশোক মুখোপাধ্যায়ের মুখ থেকে শোনা একটি ঘটনা সেই কথাকেই প্রমাণ করে। মকবুল ফিদা হুসেন তাঁর এক ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন ঠিক সেই পাড়ায়, যেখানে তিনি মুম্বাইতে এসে প্রথম ডেরা বেঁধেছিলেন। গ্রান্ড রোডের ওপর খেটে খাওয়া মানুষদের একটি বস্তিতে খোলা মাঠে নিজের নকশায় একটি অদ্ভুত সুন্দর শামিয়ানা তৈরি করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন ভারতবর্ষের বিশিষ্ট সব ব্যক্তিত্ব। আমন্ত্রিত ছিলেন শিল্পপতি পরমেশ্বর গোদরেজ থেকে শুরু করে সাহিত্যিক শোভা দে, অভিনেত্রী রাখী গুলজার প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। শিল্পপতি অশোক বাবুও সস্ত্রীক সেদিন উপস্থিত ছিলেন। অশোকবাবুর ভাষায়, ‘যা দেখলাম, তা অসাধারণ, সেই সব সেলিব্রেটিকে উনি যে কায়দায় সসম্মানে স্বাগত জানাচ্ছিলেন আবার অতি সাধারণ তাঁর পূর্বের স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষদের একইভাবে একই মর্যাদায় স্বাগত জানাচ্ছিলেন।’ এ থেকেই বোঝা যায়, কত শত কোটি টাকার মালিক এই ভারতীয় চিত্রকর নিজের জীবনচর্যাকে বাস্তব জীবনের উপাদানে এক সংবেদনশীল, নীরব, প্রতিবাদী বিবর্তনবাদিতার বাঁধনে বাঁধতে চেয়েছেন। তাই এই উচ্চকোটির মানুষটি অনায়াসে নিজের ‘রোলসরয়েস’ গাড়িটিকে লন্ডনে তাঁর বন্ধুর হাতে সঁপে দিয়ে নিজে পায়ে পায়ে শহরময় ঘুরে বেড়াতে পারেন।

মুম্বাইয়ে আসার পর পরই হুসেন যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন মুম্বাই চলচ্চিত্রজগতের সঙ্গে। না, ঠিক সরাসরি নয়, চলচ্চিত্রের কাট আউট হোর্ডিংয়ের কাজ করতে শুরু করেন। প্রবল পরিশ্রমে খোলা আকাশের নিচে কনকনে শীতে কিংবা গনগনে গ্রীষ্মের তাপদাহে পাঁচশো ফুট উচ্চতায় উঠে ছবি আঁকতেন, সে সময় দুপয়সা রোজগার করে ইরানি রেস্তোরাঁয় চা খাওয়ার ব্যবস্থা করাটাও তাঁর কাছে কঠিন ছিল। তবে মুম্বাইতে শিল্প প্রেম এবং শিল্প আরো বেশি বিস্তার ঘটাবার জন্য পার্সি সম্প্রদায়ের অবদান অনস্বীকার্য। মুম্বাই আর্ট সোসাইটির মতো সংস্থা এঁনাদেরই পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল।

এই শহরেই মকবুল ফিদা হুসেনের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল সুজা, হেববার, বেন্দ্রে প্রমুখ শিল্পীর। এইসব প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর অনুপ্রেরণা মকবুল ফিদা হুসেনকে মেইন স্ট্রিম ছবি আঁকার কাজে নিয়ে এসেছিলেন। সেই সময় মুম্বাইয়ের প্রগ্রেসিভ গ্রম্নপ তৈরি হয়েছিল। এইসব শিল্পী ছিলেন সেই গ্রম্নপের সদস্য। এঁনাদের মধ্যে সুজা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। সে সময় কমিউনিস্টদের প্রভাবে ভারতজুড়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলন শুরু হলে প্রগেসিভ গ্রম্নপের অনেকেই এই আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তবে হুসেন কিন্তু সাম্যবাদী দলের সদস্য ছিলেন না। কিন্তু তাঁর চলমান জীবনের অভিজ্ঞতা এবং উপাদান যে তাঁকে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় প্রভাবিত হতে সহযোগিতা করবে সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে না। পরবর্তীকালে দেশের নানা শ্রেণির সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার মানুষের সঙ্গে তাঁর সখ্য অটুট ছিল – বিশেষত বলা যায়, লোহিয়াপন্থী বহু সমাজতান্ত্রিক মানুষ তাঁর বন্ধু ছিলেন। এই প্রসঙ্গে হায়দরাবাদের বদ্রীবিশাল পিট্টির নাম করা যেতে পারে। জানা যায়, স্বয়ং রামমোহন লোহিয়া একবার নিজেই হুসেনকে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে তিনি টাটা বিড়লার মতো পুঁজিপতিদের জন্য ছবি না এঁকে সাধারণ মানুষের জন্য ছবি আঁকেন।

হুসেন গতানুগতিক জীবনের বাইরে, সীমাহীন আকাশের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীবন রঙিন স্বপ্ন বিভোর মানুষ, যিনি ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ঊর্ধ্বে, কুসংস্কারবিরোধী। তাই সহজেই তিনি ভালোবেসে ফেলেন প্রাচীন ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতিকে, ছবির উপাদান খুঁজে নেন ভারতীয় পৌরাণিক কাব্য ও চরিত্র থেকে। আবার নিজ বোধ ও ভাবনা থেকে হিন্দু দেবদেবীর কাল্পনিক রূপ দেওয়ায় তাঁকে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই চরম হেনস্তা হতে হয়। ছাড়তে হয় ভারতবর্ষ। তাঁর ছবি পুড়িয়ে ফেলা হয়, তাঁর অনুগামীদের ওপর নেমে আসে শারীরিক নির্যাতন। এই উন্মাদনা হুসেনের মৃত্যুর পরও এতটুকু ক্ষান্ত হয়নি। তাই হুসেনের জন্মশতবার্ষিকীতে চুপ থেকেছে সারা ভারতবর্ষ, ব্যতিক্রম একমাত্র কলকাতা। সেদিক থেকে বলা যায় কলকাতা আজো ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুক্তিচর্চার পরিবেশ ধরে রাখতে পেরেছে। কলকাতায় অনুষ্ঠিত হওয়া কলকাতার র‌্যাড, সোসাইটি ফর কনটেম্পরারি আর্টিস্ট, ক্যালকাটা পেইন্টারসহ বেশ কিছু শিল্পী দলের উদ্যোগে ‘হুসেন ১০০’-ই তার বড় প্রমাণ। অনুষ্ঠানটির প্রধান আহবায়ক ছিলেন শিল্প পুনঃস্থাপক শ্রী গণেশ প্রতাপ সিং।

বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন রকম কাজ করতে হয়েছিল মকবুল ফিদা হুসেনকে। কখনো হোর্ডিং লেখার কাজ, কখনো ফার্নিচার অলংকরণের কাজ; কিন্তু শিল্পীসত্তাকে তিনি মুহূর্তের জন্যও অবহেলা করেননি। কমার্শিয়াল আর্টের পাশাপাশি তিনি এঁকেছেন ‘ব্ল্যাক ওমেন’, ‘পুতুলের বিয়ে’, ‘খাঁচায় বন্দী পাখি’ এসব ছবি। ১৯৫৬ সালে ‘জমিন’ ছবিটি আঁকবার পর তিনি ছবিটি বিক্রি না করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ছবিটির দাম ৩০০ থেকে ৩০০০ করে দিয়েছিলেন, কিন্তু তাও যখন ছবিটি বিক্রি হয়ে গেল, তখন হুসেন বুঝতে পারলেন ছবির বাজারে ফিদা হুসেনের একটা জায়গা হয়ে গিয়েছে। এরপর চলল তাঁর এগিয়ে চলা, বিশালাকৃতির ছবি তাঁর তুলির টানে ফুটে উঠল। বাস্তব চরিত্রের পাশাপাশি মহাকাব্যের চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠল মকবুলের ক্যানভাসে। প্রসঙ্গত, শিল্প পুনঃস্থাপক গণেশ প্রতাপ সিংয়ের সেদিনের কথাগুলো মনে পড়ে যায়। তিনি দুঃখ করে জানাচ্ছিলেন, রামমোহন লোহিয়ার অনুরোধে হুসেন-অঙ্কিত রামায়ণ সিরিজের অন্তত ২৫০টি ছবি বর্তমানে হায়দরাবাদে ‘লোহিয়া সমতা ন্যাস’-এর গুদামে আটকে পড়ে রয়েছে। এগুলি সে সময় একটি সংগ্রহশালায় স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রামমোহন লোহিয়াজি ও বদ্রীজির মৃত্যুর পর এসব ছবি ওখানেই থেকে যায়। হুসেন তাঁর জীবিতকালেই এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। কলাবিদ সুনীত চোপড়ার কাছ থেকে আরো একটি তথ্য জানা যায়, জননেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে সখ্যের দরুন হুসেন একবার কলকাতায় তাঁদের দলীয় দফতরে আসেন এবং সেখানে ‘গণশক্তি’ পত্রিকার ওপর একটি ছবি এঁকেছিলেন, যেটি বর্তমানে সম্ভবত প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের হেফাজতে আছে। হুসেনের অঙ্কিত এরকম বহু ছবি এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শিল্পরসিকদের দাবি, সেগুলি জনসমক্ষেআসুক এবং উপযুক্তভাবে রক্ষণাবেক্ষণ হোক। n

Leave a Reply

*