logo

বেঙ্গল-স্কিরা পথযাত্রার সূচনা ক্যামেরায় বন্দি জীবনের ছবি

মু ন তা সি র  মা মু ন  ই ম রা ন
অবশেষে শহিদুল আলমের বই বেরোল। প্রাপ্তিটা আমাদের সবার, বাংলাদেশের বললেও ভুল হয় না। কেননা, দক্ষিণ এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে ইকোনমি নিয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সময় শিল্পের লড়াইয়ে এক ধাপ এগিয়ে যে যাওয়া গেল, তা বললে বোধহয় ভুল হবে না। শহিদুলকে নতুন করে চিনিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কেননা আলোকচিত্রী হিসেবে দুনিয়াজোড়া তাঁর বিচরণ। তাঁর সব বড় কাজ নিয়ে এককভাবে প্রকাশিত বই – মাই জার্নি অ্যাজ অ্যা উইটনেস। তাঁর আরো পাবলিকেশনের মধ্যে মূল রচনা হিসেবে যে এটাই প্রথম তা নিজেই স্বীকার করবেন। এই বই আরো আগে প্রকাশিত হলে খারাপ হতো না। সেক্ষেত্রে দোষ দেওয়ার কাঁধ খোঁজা হলে পাওয়া যাবে। প্রথম কাঁধটি মনে হয় তাঁর নিজের। কারণ এই বইয়ের আগে তাঁর আলোকচিত্রী হিসেবে একক কর্মের উদাহরণ দেওয়ার চেয়ে ‘ছবিমেলা’র গল্প বেশি করা যাবে। অথবা ‘পাঠশালা’র কথা? কিংবা ‘দৃক’? সবই তাঁর সৃষ্টি, সবই আলোকচিত্র নিয়ে। কিন্তু তাঁর পরিচিতি যত না আলোকচিত্রী হিসেবে, এর চেয়ে বেশি দক্ষ সংগঠকরূপে। এজন্যে হয়তো তাঁর ফটোগ্রাফার পরিচিতিতে ধুলোর আস্তরণ পড়ছিল। এক্ষেত্রে প্রকাশকের ব্যাপারটিও জড়িত বোধকরি। তাঁর গ্রন্থে একই সঙ্গে দেশের ভেতরের ও বাইরের কাজ থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এক্ষেত্রে গ্রন্থ প্রকাশের পর তা বাজারজাতে আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশক-পরিবেশক প্রয়োজন।
মাই জার্নি অ্যাজ অ্যা উইটনেসের প্রকাশনা উৎসব সম্প্রতি ঢাকায় বেঙ্গল শিল্পালয়ে হয়ে গেল। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন এবং স্কিরা এডিটরির যৌথ উদ্যোগে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে এদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষায় পরিচর্যা করে আসছে আর স্কিরা ইতালির বিশ্বখ্যাত আর্ট পাবলিশার। তাই বলা যায়, বইটি পাবলিকেশনের দিক থেকে যথেষ্ট সমীহ আদায় করেছে। কেননা আর্ট প্রকাশনা শিল্পে স্কিরাকে সেরাদের সেরা বলাটাও ভুল হবে না। মূলত ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ওভিদের মেটামরফসিস দিয়ে। এর সঙ্গে ছিল পাবলো পিকাসোর তিরিশটি ছাপচিত্র (এনগ্রেভিং)। ধারণা করা হয়, এমন যাত্রার পেছনে অ্যালবার্ট স্কিরার সঙ্গে পিকাসোর বন্ধুত্বই মূল কারণ। প্রায় শতবর্ষী সংস্থাটির কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীব্যাপী। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের আলোকচিত্রী শহিদুল মাই জার্নি অ্যাজ অ্যা উইটনেসের মধ্য দিয়ে নিজের কাজকে  মর্যাদার একটি স্থানে নিয়ে গেছেন, সঙ্গে এদেশকেও এগিয়ে নিয়েছেন অনেক।
বইয়ের সূচিতে আছে সালগাদোর লেখা ‘ফর শহিদুল আলম’। এরপর রাঘু রাইয়ের ‘অ্যাট ওয়ান উইথ দ্য ওয়ার্ল্ড’, প্রকাশকের পক্ষ থেকে রোজা মারিয়ার ‘ইম্পসিবল ইজ নাথিং’ এবং সবশেষে শহিদুলের লেখা ‘মাই জার্নি অ্যাজ অ্যা উইটনেস’। বইয়ের মলাটে ব্যবহৃত ছবিটি ১৯৮৮ সালে তোলা। আগুনের পাশে বসে থাকা আটপৌরে শাড়িতে অল্পবয়সী নারীর অপলক আলোক-সন্ধান আর কালো জমিনের মাঝে প্রকট ভাব বইয়ের মূল বিষয় ফুটিয়ে তুলেছে নিঃসন্দেহে।
মুখবন্ধের পর শুরুটাও বেশ – দেখার শুরু (‘লার্নিং টু সি’)। পাঠক-আলোকচিত্রী দুজনের জন্যই শুরু। শুরুর আলোকচিত্র ‘ভেসে থাকা বন’ লন্ডনের কেও গার্ডেনে তোলা, ১৯৮৩ সালে, তাঁর শুরুর দিকের কাজ। আলো আর প্রকৃতির অনিন্দ্য মেলবন্ধন ক্যামেরায় ধরা পড়েছে স্বমহিমায়। তাঁর কথায় – তিনি ফটোসাংবাদিক, তবে স্বাধীনচেতা। তাই তাঁর ছবিতে আবহমান বাংলার জীবন-জীবিকা-পরিবেশের পাশাপাশি উঠে এসেছে শহুরে যান্ত্রিকতায় আটকেপড়া ব্রাত্য মানবতার কথাও। অন্য যে-কোনো আলোকচিত্রের বই থেকে এ-বইটা বেশ আলাদা মূলত শহিদুলের লেখার কারণেই। নতুন অধ্যায় শুরুর আগে সে-প্রসঙ্গে বর্ণনার ছলে বলে যাওয়া ঘটনাগুলো ছবিগুলোকে আরো বাস্তব করে তুলেছে। তারপরও আটাশির বন্যার সময় শহিদুলের তোলা ছবি প্রামাণ্য দলিল। সে-বন্যার ক্ষয়ক্ষতির কথা এখনো গল্পের মতো ছড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় জীবনে। শহিদুলের ক্যামেরার চোখে বন্দি কমলাপুরের নদী হয়ে যাওয়া রাজপথে নৌকা-রিকশার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া নারীর অবয়বের পাশ দিয়ে ঠিকরে বের হওয়া আলো যেন আমাদের এগিয়ে যাওয়ার সন্ধান দেয়!
রাজনৈতিকভাবে স্বৈরশাসকের পতনের বছরের ছবিগুলো প্রেস জার্নালিজমের উদাহরণ। এখানে রাজপথের আরো কিছু ছবি থাকলে বিষয়টিকে জোরালো করত বলে মনে হয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আবার ভয়ংকর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বাংলাদেশ। একানব্বইয়ের হাতিয়ার ছবিটি হাহাকার আর অসহায়ত্বের দলিল বলেই গণ্য হবে। এই ভাগেই আবার জেগে ওঠার গান – সন্দ্বীপের বিশাল নৌকা মেরামতের ছবি যেন এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান। শত আঘাতেও আমরা থেমে যাইনি, থেমে যাই না – এ যেন তারই প্রতিচ্ছবি।
শহিদুলের ‘দ্য ব্রহ্মপুত্র ডায়েরি’ নামে একটা চটি বই বের হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। অতি ছোট আকারের হওয়ায় তাতে আলোকচিত্রগুলোর মাধুরী ধরা না গেলেও এবার সে তেষ্টা মিটবে আশা করি। এশিয়ার এই বিশাল নদটি আমাদের মহাদেশীয় কৃষ্টি-কলা, রাজনীতি-ধর্ম সর্বোপরি পারিপার্শ্বিক সমাজজীবনের প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিষয়েই অবদান রেখে চলেছে। এ জলধারার উৎস খুঁজতে তিব্বতের মালভূমিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন কনকনে শীতে। তারপর বিভিন্ন বন্দর ঘুরে চলে এসেছেন ঢাকায়।
কাশ্মিরের ভয়াবহ ভূমিকম্প-পরবর্তীকালের দুর্ভোগক্লিষ্ট বালাকোট, চাক্কার বাজার আর বুধিয়ারা ক্যাম্পের ছবিতে ভূমিকম্প-উত্তর পরিস্থিতি আর ব্যক্তিগত দুর্ভোগের বর্ণনা এসেছে। তবে শুরু আর শেষের ডাললেক-জালজালা লেকের ছবিতে গতানুগতিক ভূস্বর্গ কাশ্মির উঠে এসেছে।
শ্রেণিবৈষম্য আর স্বাধীন দেশের পরাধীন শ্রমিকের জীবনপ্রণালির সচিত্র বর্ণনা আমাদের জাহাজভাঙা শিল্প। ব্যাপারটা শিল্প হিসেবে পরিগণিত হলেও শ্রমিক আর কর্মীদের নিদারুণ শারীরিক-মানসিক পরিশ্রম আর করুণ পরিণতির ছবি আটকে গেছে শহিদুলের ক্যামেরায়।
শহিদুল আলোকচিত্রী, তবে তার চেয়েও বেশি মনে হয় প্রতিবাদী বা অ্যাক্টিভিস্ট। তাঁর শেষ বড় কাজের যে প্রদর্শনী ঢাকায় হয়েছিল তা সরকারিভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল শুরুর দিনই। ‘ক্রসফায়ার’ শিরোনামের সিরিজটি তাঁর শেষ দিকের বড় কাজ।
শহিদুল বাংলাদেশকে নিয়ে গেলেন অনেকটা পথ। পৃথিবীর পথে বাংলাদেশের পথচলা দৃপ্ত হোক, হোক সাবলীল, আর এ-যাত্রায় শহিদুল আলম এবং তাঁর মতো গুণীরা জোগান দিয়ে যান মাথা উঁচু করে বাঁচার রসদ, সেই প্রত্যাশা শুধু আমার নয়, কোটি বাংলাদেশির, বাঙালির।

কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের প্রদর্শনী

নেপালের সিদ্ধার্থ আর্ট গ্যালারি এবং বেঙ্গল গ্যালারি অব্ ফাইন আর্টসের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের ১০ জন বরেণ্য শিল্পীর ‘Nepal Rendezvous II শীর্ষক সাত দিনব্যাপী চিত্রকলা প্রদর্শনী শুরু হয় গত ১০ সেপ্টেম্বর। শিল্পীরা হলেন – কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ জাহাঙ্গীর,মুস্তাফা মনোয়ার, তাহেরা খানম, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, হাশেম খান, রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, মাহমুদুল হক ও শহিদ কবির।
১০ সেপ্টেম্বর শনিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় সিদ্ধার্থ গ্যালারিতে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন নেপালের পররাষ্ট্র ও সংস্কৃতি সচিব দিনেশ হরি অধিকারী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর, সিদ্ধার্থ গ্যালারির পরিচালক সংগীতা থাপা এবং বেঙ্গল গ্যালারির পরিচালক সুবীর চৌধুরী। অনুষ্ঠানে নেপালের বিশিষ্ট শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, শিল্পানুরাগী সুধী এবং বিভিন্ন দূতাবাসের সদস্যগণের আগমন ঘটে।
এছাড়া ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুর সন্নিকটে নগরকোটে বাংলাদেশ ও নেপালের শিল্পীদের অংশগ্রহণে তিন দিনব্যাপী আর্ট ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়।

Leave a Reply

*