logo

ফ্রিদা কাহলোর চিত্রে দ্বৈতসত্তা ও পরাবাস্তববাদ

ম ঈ নু স  সু ল তা ন
গেল শতাব্দীর শেষদিকে আমি যখন লাওসে কাজ করতাম ফ্রিদা কাহলোর নাম তখন শুনি। খুব আলোচিত হচ্ছিলেন মেক্সিকোর এই মহিলা চিত্রশিল্পী। তাঁর রং-তুলির ক্যারিশমা শিল্পীসত্তাকে অতিক্রম করছিল ভৌগোলিক অর্থে। নারীদের জীবনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জগৎজোড়া আন্দোলনে তিনি যেন হয়ে উঠছিলেন অন্তর্গত রক্তক্ষরণের শিল্পশোভন ঝান্ডা হাতে প্রতিবাদের প্রতীক। সে-সময়ে তাঁর চিত্রকলার দু-চারটে রিপ্রডাকশন প্রিন্টও দেখেছিলাম। তারপর তাঁর সঙ্গে যতটা না চিত্রকলা তার চেয়ে বেশি শিল্পশোণিতে বিচিত্র ব্যঞ্জনাময় চিত্রগুলো যিনি এঁকেছেন, তাঁর দ্বন্দ্ব-বর্ণিল জীবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন আমার মেক্সিকান সহপাঠিনী সিনোরিতা আবরিল নভারো। ২০০২ সালে আমরা দুজন ছিলাম যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসে সতীর্থ। মেক্সিকোর উচ্চবর্গের হিস্পানিক কালচারে আজটেক ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতি-রিচ্যুয়েলের প্রভাব নিয়ে আবরিল ডক্টরাল লেভেলে গবেষণা করছিলেন। ফ্রিদা কাহলোর চিত্রের কিছু অনুষঙ্গ – বিশেষ করে বর্ণ ও কম্পোজিশনের শৈল্পিক তর্জমা তাঁর বিষয়বস্তুর অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফ্রিদা কাহলো তাঁর প্রিয় শিল্পী, সুতরাং তাঁর চিত্র ও জীবনের সঙ্গে সতীর্থদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া আবরিল তাঁর সাংস্কৃতিক কর্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতেন।
তখন কেবলমাত্র ফ্রিদা নামের জুলি টাইমার-নির্দেশিত ফিল্মটি বাজারে এসেছে। এ চলচ্চিত্রে সালমা হায়েক ফ্রিদার এবং আলফ্রেড মলিনো ফ্রিদার বিতর্কিত স্বামী – দুনিয়াজোড়া যশস্বী চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ফিল্মটি নির্বাচিত হয়েছে ছয়টি অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ডের জন্য। সিনোরিতা নভারো আমাদের ডাকলেন এক সন্ধ্যায় তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে এক পাত্র মার্গারিটা পানের সঙ্গে তা পর্যবেক্ষণ করতে। এ ফিল্মে ফ্রিদার চিত্রকর্ম যতটা উপস্থাপিত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি হাইলাইট করা হয়েছে চিত্রীর জীবনের অনুপুঙ্খ ঘটনাবলি তথা মোটর দুর্ঘটনায় শিল্পীর চলৎশক্তি রহিত হওয়া, তাঁর প্রণয়ে প্রত্যাখ্যান, আবেগজনিত দ্বন্দ্বে লবেজান হতে হতেও সামাজিক কমিটমেন্ট নিয়ে বাম ঘরানার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি। এ চলচ্চিত্র দেখে আমরা যেন আচ্ছন্ন হয়ে উঠে এসে বসি আবরিল নভারোর কাঠের ঝুলবারান্দায়। তাঁর জীবনের বেদনাবিধুর অনুষঙ্গ পানিভর্তি পেয়ালায় রঙের নীল বড়ির গুলে যাওয়ার মতো ছড়িয়ে যেতে থাকে আমাদের চেতনায়। মনে হতে থাকে – যে-নারী তাঁর রং, রূপ ও কম্পোজিশনের এমন বাসনাবিহ্বল ও সচেতন সংঘাতে বিক্ষত বর্ণিল রূপবন্ধ পেশ করতে পেরেছেন – তাঁর জীবনে দহন ও যন্ত্রণা একটু কম হলে কী ক্ষতি হতো?
বোধকরি পর্যবেক্ষণজাত তাজা সংবেদনকে উসকে দেওয়ার জন্য আবরিল ওই সন্ধ্যায় লেবু ও লবণমিশ্রিত টাকিলার সঙ্গে একটু পর স­াইডে দেখান ফ্রিদা কাহলোর কয়েকটি নির্বাচিত চিত্র। কিন্তু তখনো চিত্রের বর্ণব্যঞ্জনা ছাড়িয়ে আমাদের করোটিতে ঘুরছে তাঁর জীবনের অনুপুঙ্খ ঘটনা, পরোক্ষ বিষাদ, গাঢ় প্রত্যাখ্যান, রতিকাতরতা ও বাসনা-রঙিন স্বপ্ন। আবরিল আজটেকদের কথ্য ভাষার কেতানুযায়ী উপমা ও প্রতীক দিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। তিনি ফ্রিদার চিত্রকর্মকে রংধনুর সঙ্গে তুলনা দিয়ে তাঁর যাপিত জীবনকে অভিহিত করেন – বৃষ্টির সম্ভাবনায় ভরপুর বজ্রবিদ্যুতে বিভাময় আকাশের মতো। এ রংধনুর সাতরঙের সিজিলমিছিলকে বুঝতে হলে আসমানের স্কাইস্কেপকে খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা আছে। সুতরাং চিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের আগে তাঁর জীবন-সম্পর্কিত কিছু তথ্য পর্যালোচনা করা যেতে পারে :
ফ্রিদা কাহলোর জন্ম ১৯০৭ সালের ৬ জুলাই মেক্সিকো সিটির কয়োকোয়ান এলাকায়। হিস্পানিক ও স্থানীয় মেক্সিকান সংস্কৃতির যুগ্ম কেতানুযায়ী তাঁর পুরো নাম – ম্যাগডালেনা কারমেন ফ্রিডা কাহলো ই কালডেরন। তাঁর পিতা উইলহেম কাহলো – পেশায় ফটোগ্রাফার, অভিবাসী হয়ে জার্মানি থেকে মেক্সিকোতে আসেন। সে-আমলে ভাগ্যান্বেষী হয়ে ইউরোপ থেকে নানা পেশার লোকজন আকছার মেক্সিকোতে আসতেন। তাঁর পিতা তাঁদেরই একজন, পেশায় কিংবা জীবন-যাপনে তেমন কিছু ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি বিবাহিত হন মটিলডে কালডেরন ই গনজালেস নামক ম্যাসতিঝো (স্থানীয় নারীর সঙ্গে স্প্যানিশ পুরুষের মিলনে সৃষ্ট সন্তান) এক মহিলার সঙ্গে।
ছোট্ট ফ্রিদা মাত্র ছয় বছর বয়সে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন পুরো নয় মাস। এরপর থেকে বালিকা ফ্রিদা খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলে তাঁর প্রবল ইচ্ছাশক্তিওয়ালা পিতা তাঁকে ফুটবল খেলতে ও সাঁতার কাটতে উৎসাহিত করতেন – যাতে তিনি পোলিও থেকে প্রাপ্ত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেন। এমনকি সে-আমলের মেক্সিকান সমাজে মেয়েদের জীবনে একেবারে অপ্রচলিত স্পোর্টস মল্লযুদ্ধেও তিনি তাঁকে যোগ দেওয়ান।
১৯২২ সালে ফ্রিদা প্রিপারেটরি স্কুলে ভর্তি হন। সে-আমলে ছবি আঁকাতে তাঁর তেমন কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে তাঁর সহপাঠিনীদের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে – বালিকা ফ্রিদা আদিবাসী আজটেক জনগোষ্ঠীর সনাতনী ধারার অত্যন্ত রংচঙে পোশাক, পুঁতির বুনটে বর্ণাঢ্য পাথর-বসানো অলংকারাদি পরে স্কুলে আসতেন। একই বছর – সে-সময়ে মেক্সিকোর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী দিয়েগো রিভেরা প্রিপারেটরি স্কুলের লেকচার হলে ‘দ্য ক্রিয়েশন’ নামে এক বিশাল ম্যুরাল আঁকতে আসেন। সহপাঠিনীদের কাছ থেকে জানা যায়, ফ্রিদা খুব মনোযোগ দিয়ে রিভেরার কাজ করা লক্ষ করতেন। এ সময়ে তাঁর এক বান্ধবীকে বলেছিলেন, একদিন তিনি কিন্তু রিভেরার সন্তানের জননী হবেন!
ফ্রিদা কাহলোর জীবনের মোড় পালটে যায় তিনি এক ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় আহত হলে পরে। এ অ্যাক্সিডেন্ট এমনই ট্র্যাজিক ছিল যে, তাতে তাঁর মেরুদণ্ডে তীব্র ফ্র্যাকচারের সঙ্গে ভেঙে যায় কলার বোন ও পাঁজরের হাড়গোড়। কোমরের মাংসপেশি ভেদ করে নিম্নাঙ্গে ঢুকে যায় লোহার শিক; তাতে বিক্ষত হয় পেলবিস এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জননেন্দ্রিয়। ডাক্তারসহ আত্মীয়স্বজনের কেউ ভাবেননি এ বিক্ষত শরীর নিয়ে ফ্রিদা আর কখনো উঠে দাঁড়াতে পারবেন। না, শরীর তাঁর সারেনি সম্পূর্ণভাবে কোনোদিন। সমর্থ মানুষদের মতো চলৎশক্তি ফিরে পাননি, তবে পরবর্তী জীবনে প্রতিরোধের, শোক সামলানোর এবং মানসিকভাবে রুখে দাঁড়ানোর সাহস পেয়েছিলেন। তাঁর ছবি আঁকারও সূত্রপাত হয় এ-ঘটনা থেকে। তরুণী হিসেবে চিত্রশিল্পী নয় বরং ফ্রিদা হতে চেয়েছিলেন ডাক্তার। কিন্তু আঠারো বছরের এ যুবতী দুর্ঘটনায় শরীরের তাবৎ সামর্থ্য হারিয়ে দীর্ঘদিন পড়ে থাকেন বিছানায়। তখনই তিনি হঠাৎ ছবি আঁকতে শুরু করলেন – ‘দিনযাপনের একঘেয়েমি ও তীব্র দৈহিক যন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করার জন্য।’ এ বাবদে তিনি নিজেই বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছিল, ডাক্তারি পড়া ছাড়াও সৃজনশীল কিছু করার মতো তখনো অঢেল মানসিক এনার্জি ছিল আমার। এ-ব্যাপারে বিশেষ একটা ভাবনাচিন্তা না করেই হঠাৎ একদিন আমি আঁকতে শুরু করলাম।’
শারীরিক এ ভোগান্তির সময় তিনি মূলত চিত্রশিল্পের ভুবনে পা দেন আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কনের মাধ্যমে। এবং পরবর্তী জীবনে নিজেকে আঁকেন বিবিধ ভঙ্গিতে বহুবার। ক্রমশ আত্মপ্রতিকৃতির এ-প্রকরণ নানা বিবর্তনের ভেতর দিয়ে তাঁর অভিব্যক্তি ও মুখ ফুটে না বলা বক্তব্যের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
ফ্রিদা কাহলো সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে তাঁর সঙ্গে মেক্সিকোর সর্বাধিক যশস্বী বহুমাত্রিক শিল্পী ‘এল মায়েস্ট্রো’ বা শিল্পগুরু হিসেবে খ্যাত দিয়েগো রিভেরার বিবাহের প্রসঙ্গ উল্লেখ করতেই হয়। ১৯২৮ সালের দিকে ফ্রিদার সঙ্গে দিয়েগো রিভেরার যখন যোগাযোগ হয় তখন তিনি অল্পবিস্তর আঁকছেন। দিয়েগোর মতামত চেয়ে তিনি তাঁকে কয়েকটি চিত্রকর্ম দেখান। তারপর আত্মীয়-পরিজন ও অনুরক্তদের চমকে দিয়ে ১৯২৯ সালে বাইশ বছরের তরুণী ফ্রিদা বিয়ে করেন বিয়াল্লিশ বছরের ভুঁড়োপেট স্থূলকায় দিয়েগো রিভেরাকে। ফ্রিদার জননী এ পরিণয়ে এমনই উত্ত্যক্ত হয়েছিলেন যে, তিনি বিবাহবাসরে যোগ না দিয়ে উলটো মন্তব্য করেন, ‘কুচকুচে কালো হাতির সঙ্গে শুভ্র কপোতের বিয়ে’ বলে। বিয়ের রাতে দিয়েগো মাত্রাধিক পানের পর পিস্তলের আওয়াজ করে এক বন্ধুর হাত মুচড়ে তাঁর আঙুল ভেঙে দিয়ে ফ্রিদার জীবনকে করে তোলেন দুর্বিষহ। তারপর এ শিল্পী দম্পতি একত্রে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন সর্বত্র। ১৯৩০ সালে তাঁরা বাস করেন কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে। ওখানে মহিলা শিল্পীদের ষষ্ঠ বার্ষিক প্রদর্শনীতে ফ্রিদা শিল্পী হিসেবে বোদ্ধাদের নজর কাড়েন ‘ফ্রিদা ও দিয়েগো রিভেরা’ চিত্রটি ডিসপ্লে করে।
ফ্রিদা ও দিয়েগোর বৈবাহিক জীবন প্রথম দিন থেকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে পূর্ণ হলেও তা টিকে থাকে বছরদশেকের মতো। দিয়েগো ফ্রিদার বোন ক্রিস্টিনার সঙ্গে পরকীয়ায় লিপ্ত হলে তিনি মানসিকভাবে আঘাত পান তীব্রভাবে। এবং পরবর্তী সময়ে এ-বিষয় উপজীব্য হয়ে ওঠে তাঁর চিত্রকলার। ১৯৩৯ সালে অফিসিয়ালি তাঁদের ডিভোর্স হয়। অল্পদিন পর ১৯৪০ সালে তাঁরা আবার বিবাহিত হন।
বিবাহিত জীবনে ফ্রিদা কখনো দুর্ঘটনাজনিত তীব্র শারীরিক ভোগান্তি থেকে সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। এ প্রসঙ্গ বারবার উপজীব্য হয়েছে তাঁর চিত্রকলার। এ ধারার কাজের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১৯৪৪ সালে আঁকা ‘দ্য ব্রোকেন কলাম’ শিরোনামের চিত্রটি। এতে তিনি নিজেকে প্রায় নগ্ন করে এমনভাবে আঁকেন যেন তাঁর দেহ ভেঙেচুরে দুই ভাগ হয়ে গেছে। মধ্যিখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে মেরুদণ্ড – যাকে তিনি এঁকেছেন অলংকৃত এক কলাম বা স্তম্ভের মতো করে। পর্যবেক্ষকের চোখকে এ-চিত্রের যে ডিটেল সবচেয়ে বেশি পীড়া দেয় তা হচ্ছে তাঁর দেহে গাঁথা অনেক শলাকার উপস্থিতি। শিল্পী এখানে বোদ্ধা দর্শককে নির্লিপ্ত হালতে এসথেটিকস নিয়ে ভাবার কোনো অবকাশ দেন না; তার পরিবর্তে তিনি তাঁর শারীরিক চ্যালেঞ্জজনিত যন্ত্রণাকে সংক্রমিত করেন প্রত্যক্ষভাবে। বেদনাকে শুধু শিল্পকলায় রূপান্তরের ক্ষমতাই নয়, তাকে সংক্রমণের প্রবণতাও হয়ে ওঠে ফ্রিদা কাহলোর অভিব্যক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্য।
দুরারোগ্য ব্যাধির দেবদূত যেন তাঁকে অনুসরণ করে চলেন জিন্দেগিভর। ১৯৫০ সালের দিকে – সমঝদার সমাজে ফ্রিদার কিঞ্চিৎ নামদাম হচ্ছে, এতদিনে গড়েও উঠেছে তাঁর নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি। তখনই তাঁর ডান পা আক্রান্ত হয় গ্যাংগ্রিনে, অনেকগুলো সার্জারি হয় শরীরে। তাঁকে নয় মাস কাটাতে হয় হাসপাতালে। রোগশয্যায় শুয়ে শুয়ে ফ্রিদা লড়ে যান দুর্দৈবের সঙ্গে। দৈহিক যন্ত্রণাকে পরোয়া না করে এঁকে যান নিয়মিত। শুধু কি তাই – মেক্সিকোর জনজীবনে জুলুমের প্রতিবাদে সক্রিয় হন বাম ধারার রাজনীতিতে। ইয়াং কমিউনিস্ট লিগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আগে থেকেই, এবার সদস্যপদ গ্রহণ করেন মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টির।
খানিক সামাজিক স্বীকৃতি আসে ১৯৫৩ সালে – মেক্সিকো সিটিতে তাঁর একক প্রদর্শনীর আয়োজন হলে। তখন দুরারোগ্য সব ব্যাধি এতই জেঁকে বসেছে, যন্ত্রণা এমনই তীব্র যে ফ্রিদার বিছানা ছেড়ে ওঠার তাগদ নেই। তা সত্ত্বেও তিনি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হাজির হন স্ট্রেচারবাহিত হয়ে অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে। একক প্রদর্শনীর কিছুদিন পর তাঁর ডান পা কেটে বাদ দিতে হয় গ্যাংগ্রিনের বিস্তার রোধ করার জন্য।
১৯৫৪ সাল, ফ্রিদার দিন কাটছে তীব্র ডিপ্রেশনের ভেতর। ব্রংকো নিউমোনিয়া নিয়ে তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন হাসপাতালে। এত কিছুর মধ্যেও তাঁর পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট ছিল অত্যন্ত দড়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো এর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শিল্পীর সর্বশেষ পাবলিক এপিয়ারেন্স ছিল ১৯৫৪ সালের ২ জুলাই। মার্কিন প্রশাসনের মদদে গুয়াতেমালার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জেকোবো আরবেনঝ ক্ষমতাচ্যুত হলে হুইল চেয়ারে চড়ে শিল্পী যোগ দেন প্রতিবাদী ডেমনসট্রেশনে।
তার ঠিক এগারো দিন পর ফ্রিদার মৃত্যু হয় হাসপাতালে। কারণ হিসেবে অফিসিয়ালি ‘পালমোনারি এমবোলিজন’ বলে রোগের কথা রেকর্ডে লেখা হলেও মেক্সিকো সিটির বোদ্ধা সমাজে প্রচলিত কাহিনি হচ্ছে – অত্যধিক নিদ্রাকর্ষক ড্রাগ নিয়ে শিল্পী আত্মহত্যা করেন।
মৃত্যুর পর থেকেই শিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিসরে ফ্রিদার খ্যাতি বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমাগত। ‘কাসা ডে আসুল’ বা ‘ব্লু-হাউস’ নামে পরিচিত মেক্সিকো সিটির যে-বাড়িতে শিল্পী দিয়েগো রিভেরার সঙ্গে যুগলে বাস করতেন – তা জাদুঘর হিসেবে খুলে দেওয়া হয় ১৯৫৮ সালে। সত্তরের দশকে ফ্যামিনিস্ট বা নারীবাদী আন্দোলনের ফলে বিশ্ব পরিসরে তাঁর জীবন ও শিল্পকর্মের ওপর নতুন করে আলোকসম্পাত করা হয়। তিনি হয়ে ওঠেন ফিমেল ক্রিয়েটিভিটি বা নারী সৃজনশীলতার প্রতিমা। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয় হাইডেন হেরেরা-রচিত বহুলপঠিত গ্রন্থ এ বায়োগ্রাফি অব ফ্রিদা কাহলো। তাঁর আইকন হয়ে ওঠার পেছনে এ গ্রন্থেরও বিশেষ অবদান আছে।
বজ্রনির্ঘোষে ঝঞ্ঝাময় আকাশের মতো জীবনের প্রেক্ষাপটে ফ্রিদা কাহলো চিত্রকর্মের যে-রংধনু ফুটিয়েছেন – এবার সে-সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। ফ্রিদা কাহলোকে মার্ডানিস্ট মুভমেন্টের – যা মেক্সিকোতে দানা বাঁধে প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মাঝামাঝি – অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। আত্মপ্রতিকৃতি অঙ্কনের মাধ্যমে মূলত তিনি তালাশ করেছেন তাঁর নিজস্ব পরিচিতি। মানবজীবনের নশ্বরতা প্রতীকীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর নানা ভঙ্গিতে বিধৃত অনেকগুলো আত্মপ্রতিকৃতিতে। দর্শক যখন তাঁর প্রতিকৃতির দিকে তাকান তখন তিনি দেখেন তীব্র দৈহিক ভোগান্তির সঙ্গে মিশে আছে দহন ও বিষাদ। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, তিনি আঁকেন কেবলই তাঁর জন্য। এ প্রসঙ্গে ফ্রিদা নিজেই বলেন, ‘আমি আঁকি কারণ আমাকে যে আঁকতে হয়। আর আমার করোটিতে যা ভেসে যায় মূলত তাই হচ্ছে আমার আঁকার বিষয়বস্তু।’ তাঁর আত্মপ্রতিকৃতির চারদিকে ছড়ানো-ছিটানো বিড়াল, বানর বা বৃক্ষ – সবই ডিটেল হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা দর্শকদের দৃষ্টিকে যুক্ত করে পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে। কিছু কিছু অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে প্রতীক। এবং সবকিছু ছাড়িয়ে তাঁর কিছু আত্মপ্রতিকৃতি প্রতিফলিত করে দৈহিক বেদনাকে। বর্ণ আর কম্পোজিশনের প্রতীকী পর্দা ভেদ করে পর্যবেক্ষক দেখতে পান – কোনো এক নির্দিষ্ট সময়ে কীভাবে শিল্পী দৈহিক ও মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
যদিও বাম ঘরানার রাজনীতিতে তিনি শামিল ছিলেন সক্রিয়ভাবে – তারপরও স্বামী দিয়েগো রিভেরার মতো বিশাল আকারের ম্যুরালে মূর্ত করে তোলেননি সরাসরি কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক ইস্যুকে। তাঁর প্রায় প্রতিটি কাজই ছিল তীব্রভাবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত এবং যার মাত্রা ছিল অত্যন্ত গভীর। চিত্রের রং ও কম্পোজিশনে তিনি সন্ধান করেছেন  মেক্সিকোর  আদিবাসী  আজটেক   সংস্কৃতির   শিকড়।  তাঁর ্রপ্রতীকের ব্যবহারে মূর্ত হয়ে উঠেছে জাদুময় বাস্তবতা। সে-আমলে মেক্সিকোর মডার্নিস্ট মুভমেন্ট ছিল পুরুষ শিল্পীদের দ্বারা বহুলাংশে নিয়ন্ত্রিত। একজন নারী শিল্পী হিসেবে এ আন্দোলনের প্রান্তিকে তাঁর অবস্থান হলেও তিনি লড়ে গেছেন দৃঢ়ভাবে তাঁর নিজস্ব বর্ণবিধুর প্রকাশভঙ্গির মাধ্যমে। অতঃপর বোদ্ধা সমাজ সত্তরের দশকের দিকে আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে তাঁর বিশেষ অবদানকে স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়।
বলা যেতে পারে, তাঁর চিত্রকলার বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘নারী’। তিনি বিবিধ ভঙ্গিতে বহুবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আঁকেন নারীর শরীর, তাদের জন্ম-মৃত্যু; তাদের বেঁচে থাকার স্ট্রাগলের সঙ্গে সঙ্গে সর্বদা সম্পৃক্ত করেন       জীবন-যাপনের অন্তর্গত যন্ত্রণা। সারা জীবনে তিনি এঁকেছেন ২০০টির মতো চিত্র। তার এক-তৃতীয়াংশের বিষয়বস্তু হচ্ছে তিনি স্বয়ং শিল্পী। এসব কাজের ভেতর দিয়ে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করেন – নারীদের জীবনে পুরুষশাসিত সমাজের বেইনসাফি। তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিতে প্রতিফলিত বেদনার সঙ্গে বিশ্বের নানা প্রান্তের অনেক বোদ্ধা নারী মিল খুঁজে পান নিজস্ব বেদনার। তাই তিনি ক্রমে ক্রমে হয়ে ওঠেন ‘ফ্যামিনিস্ট আর্ট’ বলে নতুন একটি শিল্প প্রকরণের প্রেরণার উৎস।
দুর্ঘটনায় বিক্ষত ফ্রিদার যখন চিত্রকলায় হাতেখড়ি হয় তখন তাঁর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো স্টাইল ছিল না। তাঁর সে-সময়কার কাজে নামজাদা সব মেক্সিকান শিল্পী – যাঁদের কাজ ফ্রিদা পছন্দ করতেন, তাঁদের স্টাইল ও মোটিফের প্রভাব থাকত। এ-ধরনের কাজের মধ্যে ১৯২৬ সালে আঁকা ‘সেলফ পোর্র্ট্রটে ইন অ্যা ভেলভেট ড্রেসে’র কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এটা ছিল ফ্রিদার আঁকা প্রথম আত্মপ্রতিকৃতি, যাকে শিল্পী বতিচেল্লির ‘ভেনিস’ বলতে ভালোবাসতেন। এ চিত্রকর্মে ফ্রিদা অনুসরণ করেন উনিশ শতকের মেক্সিকান পেইন্টারদের স্টাইল – যাঁরা প্রভাবিত হয়েছিলেন মূলত ইউরোপের রেনেসাঁস যুগের ওস্তাদ শিল্পীদের দ্বারা। উনিশ শতকের চিত্রশিল্পীদের কাছ থেকে এ-সময়ে ফ্রিদা ধার করেছিলেন আরেকটি কৌশল, যা ফরাসি ভাষায় ‘বেন্ডেরোল’ বলে পরিচিত। এ প্রক্রিয়ায় চিত্রে সংযুক্ত ইনসক্রিপশন বা লিপির মাধ্যমে যার প্রতিকৃতি তাকে শনাক্ত করা এবং চিত্রের অর্থ ব্যাখ্যা করা যায়। এ-ধারার কাজগুলোর মধ্যে ১৯৩১ সালে আঁকা ‘পোর্ট্রেট অব ইভা ফেডরিকে’র উল্লেখ করা যেতে পারে।
ফ্রিদা যখন তাঁর নিজস্ব চিত্রভাষা ও প্রকাশভঙ্গি খুঁজছেন তখন যোগাযোগ হয় মেক্সিকোর জনাকয়েক বুদ্ধিজীবী ও চিত্রশিল্পীর সঙ্গে। তাঁরা সকলে কমবেশি অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন শিল্পী এডালফো মাওগার্ডের মতাদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার বিষয়ে। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত শিল্পবিষয়ক একটি গ্রন্থে মাওগার্ড শিল্পক্ষেত্রে মেক্সিকোর আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক শিকড়ে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। মেক্সিকান শিল্পকলার ইতিহাসে এ শিকড়সন্ধানী প্রবণতা ‘ফোকলরিক স্টাইল’ হিসেবে পরিচিত। আমেরিকান চিত্র-সমালোচকরা এ-আন্দোলনকে ‘মেক্সিকান রেনেসাঁস’ বলে অভিহিত করে থাকেন।
ফ্রিদা তাঁর দ্বিতীয় আত্মপ্রতিকৃতি ‘টাইমস ফাইলে’ ব্যবহার করেন ফোকলরিক স্টাইল। এ চিত্রের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – মোটিফে ব্যবহৃত আদিবাসীদের রুচি মোতাবেক অত্যন্ত উজ্জ্বল বহুবিধ বর্ণ। তাঁর প্রথম চিত্রে স্প্যানিশ তথা ইউরোপীয় রুচি মোতাবেক ব্যবহার করেছিলেন ভেলভেটের বস্ত্র; দ্বিতীয় আত্মপ্রতিকৃতিতে তা বদলে দাঁড়াল চাষিদের ব্যবহৃত সাধারণ সুতি কাপড়। প্রথম চিত্রে অঙ্কিত অলংকারহীন দেহ যেমন স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক আমলের স্মারক, তেমনি দ্বিতীয় চিত্রে তা প্রতিনিধিত্ব করছে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের আগের যুগের আদিবাসী  আজটেক  সংস্কৃতির।  এ  চিত্রের  মাধ্যমে  ফ্রিদা  যেন  তাঁর আদিবাসী শিকড়কে স্বীকার করে নিচ্ছেন। তাঁর মেক্সিকান পরিচিতিকে আরো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি এ-চিত্রে ব্যবহার করেন লাল, সাদা ও সবুজ রঙের – যা মূলত মেক্সিকান জাতীয় পতাকার রং।
ফ্রিদার মানসে তাঁর নিজস্ব আইডেনটিটি নিয়ে কোনো ক্রাইসিস না থাকলেও ছিল তীব্র সচেতনতা। তাঁর জার্মান পিতার দিক থেকে পাওয়া ইউরোপিয়ান হেরিটেজ এবং মিশ্রবর্ণের মাতার তরফে মেক্সিকান আদিবাসী আজটেক শিকড়ের কারণে তাঁর নিজস্ব পরিচিতি নিয়ে ছিল তীব্র দোলাচল। তাঁর পিতা-মাতার ভিন্ন সাংস্কৃতিক শিকড়ের কারণে মিশ্র সংস্কৃতি ছিল তাঁর সামাজিক বাস্তবতা। তার ওপর রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির বলয় থেকে বেরিয়ে এসে স্বদেশীয় আদিবাসী আজটেক সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীলও হতে চেয়েছিলেন তিনি আন্তরিকভাবে। মানসের এ দোলাচল ও দ্বান্দ্বিকতা প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর অনেকগুলো কাজে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ হচ্ছে ১৯৩৭ সালে আঁকা ‘মাই ওয়েট নার্স অ্যান্ড আই’ চিত্রটি। এখানে তাঁর যুগ্ম সংস্কৃতি তথা ইউরোপীয় ও মেক্সিকান আদিবাসী আজটেক শিকড়ের সঙ্গে তাঁর সংযুক্তি প্রতিফলিত হয়েছে। এ চিত্রে আজটেক মুখোশপরা এক ধাত্রী স্তন্য পান করাচ্ছে ইউরোপীয় ধাঁচের পোশাকপরা শিশু ফ্রিদাকে। তবে শিশুটির মুখমণ্ডলের দিকে তাকালে মনে হয় শিল্পী এখানে বসিয়ে দিয়েছেন প্রাপ্তবয়স্ক ফ্রিদার মুখ। নিসর্গের প্রেক্ষাপটে আকাশ দুগ্ধবৃষ্টি করছে। ধাত্রী যে স্তন থেকে শিশুকে দুধ দিচ্ছে তার ওপর সুপারইমপোজ করে আঁকা নিসর্গের রূপরেখা, যা যুগপৎ হয়ে উঠেছে উর্বরতা ও পুষ্টির প্রতীক।
এ চিত্রের কম্পোজিশন খুব যে আধুনিক তা নয়। খুব নিরিখ করে তাকালে ধ্র“পদী যুগের চিত্র ‘ম্যাডোনা অ্যান্ড চাইল্ডে’র কথা দর্শকদের মনে আসবে অবধারিতভাবে, এমনকি শিশুর দেহে জুড়ে দেওয়া প্রাপ্তবয়স্ক মুখের দিকে তাকিয়ে জননী মরিয়মের সঙ্গে যিশুর স্মৃতিতে দর্শক ফিরে যেতে পারেন। তবে ধ্র“পদী যুগের খ্রিষ্টধর্মীয় ইমেজের সঙ্গে ফ্রিদার অঙ্কিত ইমেজের প্রধান তফাৎ হচ্ছে – এখানে তিনি আদিবাসীদের প্যাগান বিশ্বাস – মাতৃরূপ পৃথিবীর কথা প্রতীকী কায়দায় বলছেন। এ চিত্রের প্রচলিত ব্যাখ্যা হচ্ছে – ধাত্রী রূপক অর্থে ফ্রিদারই আদিবাসী আজটেক সত্তা; যা জোগাচ্ছে পুষ্টি ও লালন-পালনের ধারাবাহিক বিকাশ। অন্যদিকে শিশু হচ্ছে ফ্রিদার ইউরোপীয় উত্তরাধিকার-জাতসত্তা – যার বিকাশে প্রয়োজন আদিবাসী নিসর্গময় সংস্কৃতির আবহ। এ ব্যাখ্যার সঙ্গে সকলে কিন্তু একমত না। কোনো কোনো চিত্র-সমালোচক মনে করেন – ধাত্রী রূপক অর্থে মূলত তাঁর মিশ্রবর্ণের মেক্সিকান জননী এবং শিশু এখানে প্রতিনিধিত্ব করছে জার্মান পিতা থেকে প্রাপ্ত ইউরোপীয় উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ ফ্রিদা।
ফ্রিদা তাঁর ব্যক্তিত্বের দুটি ভিন্ন – কখনো খানিকটা পরস্পরবিরোধী সত্তাকে উপস্থাপন করেন চিত্রভাষা ও কম্পোজিশনে। এ-ধারার কাজের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত চিত্র হচ্ছে ১৯৩৭ সালে আঁকা ‘দ্য টু ফ্রিদাস’ শিরোনামের চিত্রটি। আকারে অত্যন্ত বড় মাপের এ-চিত্রে কাজ করার সময় তিনি দিয়েগো রিভেরার কাছ থেকে বিবাহ বিচ্ছেদের খবর পান। এ-তথ্যকে তিনি তাঁর প্রণয়ের প্রত্যাখ্যান হিসেবে বিবেচনা করেন। এ চিত্রে স্পষ্টত প্রতিফলিত হয়েছে আক্ষরিকভাবে তাঁর সত্তার বিভাজন। এর চমকপ্রদ কম্পোজিশনে – বাঁদিকে মেক্সিকান ফ্রিদা বসে আছেন আজটেকদের তিহুয়ানা গোত্রের পোশাক পরে আর ডানদিকে ইউরোপীয় ফ্রিদা সেজেছেন ঔপনিবেশিক কেতার শুভ্র বিয়ের ড্রেসে। ভিন্ন ভিন্ন সত্তার দুই ফ্রিদা পরস্পরের হাত ধরে বসে আছেন সবুজ রঙের বেঞ্চে। তাঁদের হৃৎপিণ্ডের অ্যানাটমি এখানে সুপারইমপোজ করা। তাঁর ইউরোপীয় সত্তার হৃৎপিণ্ড – বুকের কাছে পোশাকের গর্তের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে। ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে মিশে যাচ্ছে শুভ্র পোশাকের লোহিত পুষ্পে। দুর্ঘটনাজনিত কারণে শারীরিক অক্ষমতার জন্য ফ্রিদা তিনবার গর্ভধারণে ব্যর্থ হন। তাঁর শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয় মোট তিরিশ বার। কোনো কোনো চিত্র-সমালোচক তাঁর শুভ্র ড্রেসে রক্তের ছিটাকে এসবের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। মেক্সিকান সত্তার ফ্রিদার পরনের ছেঁড়াখোঁড়া অন্তর্বাস তাঁর প্রণয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়া ভগ্নহৃদয়ের প্রতীক বলে বিবেচনা করা হয়। তবে এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে – আবেগগত দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর হৃদয় ভগ্ন হলেও ভিজ্যুয়ালি তা থেকে গেছে অখণ্ড।
১৯৪৬ সালের দিকে তাঁর শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। এ-সময়ে তাঁর ‘ট্রি অব হোপ’ শিরোনামের চিত্রে আবার ফিরে আসে দ্বন্দ্বাত্মক দ্বৈতসত্তার উপস্থিতি। এ চিত্রে তাঁর ইউরোপীয় সত্তা দর্শকদের দিকে রক্তাক্ত শরীরের কিয়দংশ অনাবৃত করে শুয়ে আছে হাসপাতালের চাকাওয়ালা স্ট্রেচারে। পাশেই – ডানদিকে তিহুয়ানা কেতার পোশাক পরে তাঁর আদিবাসী আজটেক সত্তার উপস্থিতি। দ্বৈতসত্তার ধারণা আরো দৃঢ় হয়েছে এ-চিত্রের কম্পোজিশনে সূর্যালোকিত দিবস ও চন্দ্র কিরণে ছায়াময় রাত্রির বিভাজনের মাধ্যমে। প্রেক্ষাপট হিসেবে এখানে শিল্পী ব্যবহার করেছেন মেক্সিকোর বিরান ভূভাগ, যা রূপক অর্থে তাঁর পরাবাস্তববাদী কাজের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
কিছু চিত্র-সমালোচক ফ্রিদাকে সুররিয়ালিস্ট বা পরাবাস্তববাদী শিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। এ-প্রসঙ্গের আলোচনায় ওই ধারণার ঐতিহাসিক সূত্র খুঁজে বের করার প্রয়োজন আছে। ১৯৩৮ সালে ফরাসি কবি আঁদ্রে ব্রিটন ও তাঁর চিত্রশিল্পী স্ত্রী জ্যাকুলিন লাম্বা মেক্সিকোতে এলে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ফ্রিদা-দিয়েগো দম্পতির। ফ্রিদা তখন স্প্যানিশ ভাষায় ‘লো কে লা আগুয়া মে দিও’ বা ইংরেজিতে ‘হোয়াট দ্য ওয়াটার গেইভ মি’ শিরোনামের চিত্রটি কেবল সমাপ্ত করেছেন। কবি আঁদ্রে ব্রিটন তা দেখামাত্র তাঁকে পরাবাস্তববাদী ধারার কাজ বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি তাঁর চিত্রাবলি প্যারিসের প্রদর্শনীতে দেখানোর ব্যবস্থা করে দেবেন বলেও আশ্বাস দেন। সুররিয়ালিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত কবি আঁদ্রে ব্রিটন ছিলেন পরাবাস্তববাদী মেনিফেস্টোর রচয়িতা। সুতরাং ফ্রিদাকে তাঁর পরাবাস্তববাদী হিসেবে শনাক্তকরণ গুরুত্বপূর্ণ।
‘হোয়াট দ্য ওয়াটার গেইভ মি’ চিত্রটির দিকে তাকালে প্রথম দৃষ্টিতে যা চোখে পড়ে তা হচ্ছে – ফ্রিদার প্রতীকী দেহ যেন উষ্ণমণ্ডলীয় কোনো দ্বীপের সমুদ্রজলে শুয়ে আছে ফ্লোটের ওপর। এবং তাঁর চোখ পর্যবেক্ষণ করছে অগ্নিগিরির লাভা উদ্গিরণ – যা থেকে বেরিয়ে আসছে স্কাইস্কেপের মতো দেখতে একটি স্ট্রাকচার। এ চিত্রে তিনি প্রোথিত করেছেন অনেকগুলো ইমেজ – যার মধ্যে জল ফুঁড়ে জাগানো বৃক্ষের উপরিতলে আকাশমুখী হয়ে শুয়ে থাকা পাখি এবং অস্বাভাবিক জলজ তৃণের মাঝে যুগল প্রতিকৃতি উল্লেখযোগ্য। শিল্পীমহলে এ-চিত্রের নানাবিধ ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, এ চিত্র হচ্ছে বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায়ের বর্ণনা। আবার এ বক্তব্যও শোনা যায় যে – মূলত এ-চিত্রের মাধ্যমে শিল্পী প্রকৃতি ও সভ্যতার দ্বন্দ্বময় ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে করছেন আত্মপ্রতিফলন। ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও শিল্পীমহলের অনেকেই একমত যে, চিত্রটি ভিজ্যুয়ালি পরাবাস্তব ঘরানার। কেউ কেউ এরকম মতও প্রকাশ করে থাকেন যে – কবি আঁদ্রে ব্রিটন মেক্সিকোতে আসার আগে স্থানীয় আর্টক্রিটিকরা দেখেছেন ফ্রিদার চিত্রের উপরিতল। তাঁরা কেউই ঠিক সারফেস খুঁড়ে প্রবেশ করতে পারেননি তাঁর অবচেতনের অন্তর্গত জগতে। তারপর আঁদ্রে ব্রিটনের আলোকসম্পাতে তাঁর পরাবাস্তববাদী মুখোশের আড়াল থেকে দৃশ্যমান হয়ে উঠল আবেগমথিত বেদনাদগ্ধ মুখ।
ফ্রিদা  কাহলো  পরাবাস্তববাদী  শিল্পী  কিনা এ-প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া উচিত তাঁর সমগ্র কাজের ভিত্তিতে। এ প্রসঙ্গে পরাবাস্তববাদের বৈশিষ্ট্যসমূহ বিবেচনায় রাখা যেতে পারে। পরাবাস্তববাদ হচ্ছে মূলত অবচেতনের অভিব্যক্তি – যার প্রকাশমাধ্যমে প্রাধান্য পায় প্রথাবহির্ভূত ব্যতিক্রমী দৃশ্যকল্প। যৌক্তিকতার নিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার করে এ-প্রকরণ উপস্থাপন করে থাকে স্বপ্নপুষ্ট বিচিত্র ও অনুপম চিত্রপ্রতিমা। ফ্রিদা কাহলোর চিত্রে প্রথাবহির্ভূত ব্যতিক্রমী দৃশ্যকল্প আছে বিস্তর, তবে তিনি আক্ষরিক অর্থে একজন সচেতন শিল্পী। অবচেতনের নকশা আঁকার পরিবর্তে তাঁর কাজে প্রাধান্য পায় নিজস্ব দ্বন্দ্ব, যন্ত্রণা ও দ্বৈততা – অত্যন্ত সচেতনভাবে। পরাবাস্তবের হদিস খোঁজার বদলে তিনি মূলত মূর্ত করে তোলেন তাঁর ব্যক্তিগত ও সামাজিক বাস্তবতা। এবং এ-বাস্তবতা মানসিক যন্ত্রণা ও শরীরিক ভোগান্তির নিরিখে নির্মম। তিনি তাঁর কষ্টকে এমন এক শিল্পশোভন সরোবরে রূপান্তরিত করেন – রূপক অর্থে, যেখানে সহমর্মী পর্যবেক্ষক দেখতে পান নিজস্ব দহন-যন্ত্রণার প্রতিফলন। এ-প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, ‘আমি কিন্তু স্বপ্নের নকশা করিনি কখনো, আমার আঁকার বিষয়বস্তু হচ্ছে বাস্তবতা।’
সংগতভাবে সওয়াল হতে পারে – ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তবতার শিল্পিত উপস্থাপনই ছিল যাঁর কাজের সিংহভাগ, তাঁকে কেন পরাবাস্তববাদী শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে? তবে কি তাঁর কিছু কিছু চিত্রে পরাবাস্তববাদী উপাদানের জন্যই জুটেছে এ অভিধা? উপরন্তু ১৯৪০ সালে ‘গ্যালারিয়া দে আরটে মেক্সিকানো’তে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশন অব সুররিয়ালিজম’ নামক প্রদর্শনীতে ফ্রিদা তাঁর দুটি অত্যন্ত বড় মাপের কাজ ‘দ্য টু ফ্রিদাজ’ ও ‘দ্য উনডেড টেবিল’ ডিসপ্লে করেন। এ চিত্র দুটোকে কিছু চিত্র-সমালোচক পরাবাস্তববাদী কাজের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তাঁকে পরাবাস্তববাদী শিল্পী হিসেবে অভিহিত করার পেছনে আরেকটি উপাদান উল্লেখযোগ্য – যা হচ্ছে  তাঁর  ব্যক্তিগত ডায়েরি। তাঁর জীবনের পুরো একটি দশকের কিছু কিছু বিষয়ের বর্ণনা আছে এ রোজনামচায়। খুব সঙ্গোপনে তিনি তা মুসাবিদা করেন। পুরো চল্লিশ বছর তা ছিল একটি বাক্সে তালাবদ্ধ। চিত্রিত এ-জার্নালের প্রকাশভঙ্গি ও দৃশকল্পের বিশ্লেষণ থেকে কিছু কিছু বোদ্ধা তাঁকে পরাবাস্তববাদী হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন।
ফ্রিদা কাহলো কিন্তু নিজেকে পরাবাস্তববাদী মনে করতেন না। এ বিষয়ে একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমার চিত্রকলা পরাবাস্তব কি-না তা আমি ঠিক জানি না। তবে আমি যা জানি তা হচ্ছে – এগুলো হচ্ছে আমার মনের সৎ ও খাঁটি অভিব্যক্তি।’ তাঁর জীবনের শেষদিকে তিনি লিখিতভাবে পরাবাস্তববাদকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘বুর্জোয়া শিল্পকলার মেনিফেস্টেশন’ বলে।
এ আলোচনার প্রারম্ভে আমার মেক্সিকান সহপাঠিনী আবরিল নভারোর উল্লেখ করেছিলাম। ঘটনাক্রমে সিনোরিতা নভারো ও আমি দুজনেই হালফিল মেক্সিকো সিটিতে বাস করি। আজটেকদের আদিবাসী ঘরানার আর্ট নিয়ে প্রবন্ধাদি লিখে আজকাল নভারোর খানিক নামদামও হয়েছে। এ নিবন্ধের তথ্য সংগ্রহের জন্য আমি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি আমাকে কয়োকোয়ান এলাকায় ফ্রিদা ও দিয়েগো দম্পতির স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি ‘কাসা ডে আসুল’ বা ‘ব্লু-হাউসে’ নিয়ে যান একটি চিত্র-প্রদর্শনী দেখাতে। না, ওখানে ফ্রিদার কোনো চিত্রের ডিসপ্লে হচ্ছিল না তখন। পৃথিবীর – ব্রাজিল, নিকারাগুয়া, ইরান প্রভৃতি মিলিয়ে মোট সতেরো দেশের সতেরোজন চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলোকে নিয়ে আঁকা তাঁদের চিত্রকর্ম মেক্সিকোতে পাঠিয়েছেন। ব্লু-হাউসে তাঁদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক চিত্রগুলো দেখতে দেখতে আমি সিনোরিতা নভারোকে জিজ্ঞেস করি – ‘ফ্রিদা কি সুররিয়ালিস্ট ছিলেন?’ ‘নো এস ইমপরত্যান্তে, বা নট ইমপরট্যান্ট বলে আমার সওয়াল নাকচ করে দিলে, আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করি, ‘টেল মি হোয়াট ইজ ইমপরট্যান্ট অ্যাবাউট ফ্রিদা?’ তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষার মিশ্রিত জবানে বলেন, ‘এয়া এস মারাভিয়াসো’, সি ওয়াজ মার্ভেলাস। ‘নস এনকানতা সু পিনতুরা’। উই লাভ হার পেইনটিংস। দ্যাটস ইট। চিত্র-আলোচনার কচালে না গিয়ে একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে আমিও তাঁর সঙ্গে একমত যে – আমরা ভালোবাসি ফ্রিদা কাহলোর চিত্রকলা।

তথ্যসূত্র
Bauer, C. (2007) Frida Kahlo. New Jersey : Prestel
Barbara, L. & Jaycox, S. (2009) Finding Frida Kahlo. New York : Princeton Architectural Press
Herrera, H. (1991) Frida Kahlo Ñ The Paintings. New York : Harper-Collins Publications
Kettenmann, A. (1999). Frida Kahlo : 1907–54 Pain and Passion. Taschen
Petil, P. (2010) What the Water Gave Me : Poems After Frida Kahlo. Bridgend : Serem books
People’s Daily Online (August 14, 2007). Centenary show for Mexican Painter Kahlo breaks Attendeance Records. http://english.people.com.cn/90001/90782/6239310.html. Retrieved 2011-08-21.
Schrimer’s Visual Library (1994) Frida Kahlo : Masterpieces. Munuch : W.W Norton

বি.দ্র. লেখক জানিয়েছেন, স্পেনীয় ভাষায় শিল্পীর নামের উচ্চারণ ফিদা কালো। আমরা প্রচলিত বানান অনুসরণ করেছি। – সম্পাদক

  1. Bengali Tutorials Reply

    জীবনানন্দ দাসের মত আধুনিক কবিও এই পরাজগতের(আপাত বাস্তব নয়) চর্চা করতেন। যা কিছু মনে আসে দ্রুততার সাথে লিখে ফেলা একজন পরাবাস্তববাদী সাহিত্যিকের বৈশিষ্ট্য। অনেকে এই মতের বিরোধিতা করলেও এভাবে অসাধারণ সৃষ্টিশীল শিল্পকর্ম তৈরি হওয়া সম্ভব… http://www.tutorialsbangla.com/2016/04/definition-of-surrealism.html

Leave a Reply

*