logo

ফিলাডেলফিয়া : শিল্পের গল্প

ম ই নু দ্দী ন  খা লে দ

মাইলের পর মাইল গাড়ি ছুটে চলে। কেবলই গতি বাড়ে। কোনো যতি নেই। দেশ যত বড়, পথ তার চেয়েও বেশি। গন্তব্য ভুলে তাই চারদিককার প্রকৃতি ও জলধারা দেখতে হয়। গাড়ির জানালার কাচ ভেদ করে দৃষ্টি মুক্তি পেল প্রশস্ত এক নদীতে। অদূরে আটলান্টিক সাগর। তাই নদীর বুক এখানে চওড়া। নদীর নাম দেলোয়ার। দেলোয়ারকে দিলদরিয়া বললে ভুল হয় না। কারণ আটলান্টিকের উপসাগরে সে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছে। পেনসিলভানিয়া রাজ্যের ভেতরে শিরা-উপশিরার মতো অনেক নদী আছে। সবাই ওরা আটলান্টিকের নিকটাত্মীয়। নিউ জার্সি থেকে অনেক দূর নয়। তবু বিরামহীন চলায় ক্লান্তি আসে। ছোট দেশের নাগরিক বলে পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় হাঁপিয়ে ওঠে মন। নিউ জার্সি ছেড়ে কখন পেনসিলভানিয়া রাজ্যে ঢুকে গেছি তা খেয়াল করিনি। তা অবশ্য লং ড্রাইভের দেশের মানুষের কখনো ভাবনার বিষয় নয়। আমাদের পুলক যে অফুরান। ভাবি এক রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে ঢুকলে নিশ্চয়ই নতুন কিছু দেখব। আমেরিকা বড় বেশি সাজানো-গোছানো-নিকোনো। ঝকঝকে পথ, ঝকমকে দালান, দোকানপাট।

সব মানুষের মনে আদর আছে। মানুষের জীবনের বড় পাওয়া সেই আদরের চর্চা করা। আবেগের কাছে পোশাকি হিসেব হেরে যায়। যার যেই নাম তা ভালোবাসার টানে অন্যভাবে মানুষ উচ্চারণ করে। পেনসিলভানিয়াকে তাই ছোট করে ডাকা হয় পেন নামে। পেন যেতে হলে কোন স্টেশনে কোন ট্রেন বা বাস ধরতে হবে? এ প্রশ্ন শুনে পথচারী আপনাকে বলবে – ওই তো, ডানে গিয়ে বামে তাকালেই পেন টার্মিনাল দেখতে পাবেন। এ রাজ্যের রাজধানীর নাম মনে থাকে না। মনে থাকে তার বিখ্যাত নগরী ফিলাডেলফিয়ার কথা। এই নগরেই সেই ১৭৭৪-এর জুলাইয়ে বিশাল এক ঘণ্টা বাজিয়ে উচ্চ স্বরে জানান দেওয়া হয়েছিল আমেরিকার স্বাধীনতা। সেই ঘণ্টাটা ঘিরে এখন নানা আয়োজন। এখানে সুউচ্চ দালানের নাম হয়েছে বেল টাওয়ার। ঘণ্টাটা বানিয়ে আনা হয়েছিল লন্ডন থেকে। বাজাতে গিয়ে প্রথম দিনেই তাতে বড় একটি ফাটল ধরে যায়। সেই ফাটল অনেক চেষ্টা করেও সারানো যায়নি। থাক না ফাটল। তাও তো ইতিহাস।

পেলসিলভানিয়া যেমন পেন হলো তেমনি আদুরে আবেগে ফিলাডেলফিয়াকে মার্কিন মুলুকের লোক আদর করে ডাকে ‘ফিলা’, কেউবা বলে ‘ফিলি’। আমরা যারা ভালোবাসি চলচ্চিত্র তাদের অনেকেই দেখেছি হলিউডের স্বর্ণযুগের বিখ্যাত ছবি ফিলাডেলফিয়া স্টোরি। জর্জ কুকর পরিচালিত ছবির প্রেমের গল্পের নায়িকা ক্যাথরিন হেপবার্ন আর নায়ক কারি গ্রান্টের অভিনয় ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়।

এ শহরের ইতিহাস অনেক পুরনো। বেল টাওয়ার ছাড়াও গৌরব করার মতো অনেক আছে, ঢের আছে। ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়ম অব আর্ট, যদি আপনি না দেখে থাকেন তাহলে শিল্পের আমেরিকা দেখা আপনার অপূর্ণ থেকে যাবে। একথা বুঝদার সমঝদার বিনা বিতর্কে মেনে নিয়েছে।

ফিলা, ফিলি আর ফিলাডেলফিয়া যে নামেই ডাকি না কেন, এর মিউজিয়মে ঢুকতে গিয়ে মনে হলো গ্রিকদেবী ডেলফির মন্দিরে যেন ঢুকতে যাচ্ছি। গাঢ় মধুর মতো রঙের বিশাল দালান গ্রিসের আদর্শ ধরে নির্মাণ করা হয়েছে। উঁচু উঁচু থাম। আকাশে চোখ তুলে দেখতে হয়। থামশীর্ষে ফুলকারির কাজ ও আরো অনেক জ্যামিতিক নকশা। থামগুলোর নাম কী? ডোরিক, আয়োনিক, নাকি করিন্থীয়। ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আমাদের বড় দুর্ভাগ্য! স্থাপত্যবিদ্যায় এতটুকু জ্ঞান নেই বলে মানুষের গড়া সবচেয়ে সমারোহপূর্ণ আয়োজন স্থাপত্যকে আমরা পাঠ করতে পারি না। ছবির সঙ্গে কথা হয়। কথা হয় কবিতার সঙ্গে। কিন্তু সুন্দরী প্রাসাদের সঙ্গে একটি কথাও হয় না।

সংগৃহীত ঐশ্বর্যের কারণে ফিলার এই সংগ্রহশালাকে আমেরিকানরা প্রথম সারির তিনটির একটি মনে করে। নিউইয়র্কের মোমা (মিউজিয়ম অব মডার্ন আর্ট) আর মেটের (মেট্রোপলিটন মিউজিয়ম) সঙ্গেই উচ্চারিত হয় ফিলাডেলফিয়ার এই জাদুঘরের নাম। বিশ্বকোষতুল্য জাদুঘর মেটের মতো ফিলারও সব আছে। নানা সভ্যতার নিদর্শন দেখার পর ইতালীয় রেনেসাঁস হয়ে বারোক, রোকোকো পর্বের পথ বেয়ে আরো সব ইজম হয়ে ভ্যান গঘ-পিকাসো-মাতিস পর্যন্ত প্রচুর বিখ্যাত কাজ আছে এই শিল্পালয়ে। তবে এখানে এসে এশিয়ার মানুষের মন একটু শান্তি পাবে বেশি। চীন-জাপান-কোরিয়ার নিদর্শনের পাশে ভারত সভ্যতার নিদর্শনেও পূর্ণ বিশাল বিশাল ভবন। ভারতীয় উপমহাদেশের মিনিয়েচার আর মূর্তি ভাস্কর্য দেখতে দেখতে মনে হয় পূর্ব ভারতের সভ্যতার আয়নায় যেন স্বদেশ বাংলাদেশ পাঠ করছি।

এত আয়োজন কোত্থেকে জোগাড় হলো? এ প্রশ্নের উত্তর খানিকটা ইতিহাস পড়ে জানা যায়। অনেকটা জানার কোনো উপায় নেই। ঔপনিবেশিক কালে নানা লুটপাট হয়েছে আর তারপর সেই লুটের মালের কালোবাজার দীর্ঘকাল জমজমাট ছিল। শেষে আইন হয়েছে। এক দেশের প্রত্নসম্পদ ও অকিঞ্চিৎকর শিল্পসম্পদ আইন মেনে নিলামে ডাকা গেলেও যত্রতত্র বিকিকিনি চলবে না। আইনের ফাঁক দিয়ে কত কী হলো পৃথিবীর ইতিহাসে। যদি আপনি পশ্চিমের কোনো জাদুঘরে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্তাব্যক্তিকে হঠাৎ বলে বসেন, আচ্ছা, আপনারা ভারতের এই মোগল মিনিয়েচারটি বা বাংলাদেশের এই বুদ্ধ ভাস্কর্যটি কীভাবে পেয়েছেন, তাহলে আপনাকে তিনি রূঢ় ভাষায় জানিয়ে দেবেন যে তা আপনার জানার বিষয় নয়। বোস্টনের জাদুঘরে বাংলাদেশের একটি বুদ্ধমূর্তি নিয়ে এই প্রশ্ন করে আমাকে মন খারাপ করা উত্তর শুনতে হয়েছে।

 

পৃথিবীর নানা দেশের শিল্প সংগ্রহের সুবর্ণ সুযোগ আন্তর্জাতিক মেলার আয়োজনে। ১৮৭৬-এ আমেরিকা তার স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপন করে। বিশ্বমেলার আয়োজন করা হয় ফিলাডেলফিয়ায়। এখানে কেনাবেচার জন্য আসে নানা দেশের শিল্প-বণিক। শুধু ছবি নয়; সেইসঙ্গে আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি নানা ধরনের হাতিয়ার, মারণাস্ত্রও মেলার তাপ বাড়িয়ে দিলো। আর এ মেলাতেই দাঁও মারল ফিলা। বিপুল জিনিস তারা শতবর্ষের বিশ্বমেলা থেকে কিনে নিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে সব কেনা তো সম্ভব নয়। চারুকলার ধনাঢ্য সমঝদাররাই তাদের প্রাসাদের মতো বাড়ি শোভিত করার জন্য শিল্পের হাট উজাড় করে নিয়ে গেল। তারপর সেই ধনকুবেররা ভাবল, মহামূল্যবান শিল্পরত্ন স্বদেশের শিল্পাগারে সঞ্চিত থাকলেই তার বংশগৌরব স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাই বংশের নবীন প্রজন্মের কাউকে না দিয়ে আমেরিকান তাদের অমূল্য সঞ্চয় রাষ্ট্রকে দান করেছে। এভাবেই সমৃদ্ধ ও পূর্ণতা পেয়েছে আমেরিকা ও পৃথিবীর অনেক দেশের অনেক জাদুঘর। আসলে মানুষের দূরদৃষ্টিই দেশকে গড়ে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এই মেলা থেকে সংগৃহীত হয়েছিল চীন, জাপান, পারস্য, ভারত ও মরক্কোর বিবিধ শৈল্পিক সামগ্রী।

 

স্বাপ্নিক মানুষেরাই দেশের চারুশীল সভ্য অভিব্যক্তির জন্ম দেয়। ফিলার কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন স্বাপ্নিক মানুষ। তাঁরা তখনই বুঝেছিলেন, পৃথিবী মানে পশ্চিম নয় শুধু, পূর্বদেশ বা প্রাচ্যের যুগযুগান্তরের অর্জন ছাড়া শিল্পের ইতিহাসের বৈশ্বিক অবয়ব অবলোকন করা সম্ভব নয়। তাই তাদেরই দূরপ্রসারী দৃষ্টি এই সংগ্রহশালাকে দিয়েছে বিশ্বকোষের মর্যাদা। এ ধরনের জাদুঘরে ঢুকে নিদর্শন পাঠ করতে গেলেই আগের পঠিত শিল্পের ইতিহাস আমাকে দ্বিধায় জড়িয়ে ফেলে। বারবার মনে হয় ইতিহাস যেন পরিহাস। পশ্চিম কেন আমাদের মন ও মগজ দখল করে রেখেছে। পশ্চিমের বড় বড় ধারার বিখ্যাত-সুখ্যাত কাজ দেখে যে জীবন শিহরিত হয়েছিল তাতে বড় একটা ঠোক্কর লাগে। আমরা অ-ইউরো আমেরিকার শিল্পভুবন আয়ত চোখে দেখিনি কেন এতদিন! চৌদ্দশো শতকের হান যুগের চীনের একটা কালো ধূসর রঙের প্রকৃতি দৃশ্যের ছবি অথবা একটা পোরসেলিনের পাত্রের গৌরব ইতালীয় রেনেসাঁসের চেয়ে শিল্পমানে কেন ঊন বলে মনে হবে?

ফিলা প্রথমেই এশিয়ার শিল্প দেখার আয়োজন করেছে। ফিস্ক্ কিমবাল ফিলা জাদুঘরের পরিচালনার দায়িত্ব পান। তাঁর ছিল দূরপ্রসারী দৃষ্টি, যাকে বলে ভিশনারি প্রজ্ঞা। তিনি বুঝেছিলেন যে শুধু পশ্চিমের কীর্তি দিয়ে সংগ্রহশালা রচনা করলে মানবসভ্যতার অর্জনের হিসাব মেলে না। পশ্চিমের বাইরেই তো বড় বড় প্রাচীন সভ্যতার লালনভূমি। প্রাচ্যেই তো সভ্যতার প্রথম সূর্যোদয়। কিমবাল এশিয়ার শিল্পের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে পারলেন। তাঁর এই বোধোদয় প্যারিসে চারুকলা বিদ্যায় অধ্যয়নের সময়। তিনি বুঝলেন মেলাতে হবে দুপ্রান্তই – পূর্ব ও পশ্চিম। তাই এই স্বাপ্নিক মানুষটা এশিয়ার শিল্পের সঞ্চয়ে যেমন মনোযোগী হলেন, তেমনি মনোনিবেশ করলেন রেনেসাঁস থেকে শুরু করে পশ্চিমের নানা ধারার শিল্পকৃতি আহরণে। তার মধ্যে সংগ্রহশালার মর্মার্থ একটা আগাম বার্তা পাঠিয়েছিল যেন। তিনি তখনই বলেছেন যে জাদুঘর হবে প্রত্যক্ষভাবে মানুষের সৃষ্টি দেখে ইতিহাস পাঠের মহাবিদ্যালয়। আজ আমরা বলতে শুরু করেছি যে জাদুঘর মানে জনতার মহাবিদ্যালয় অর্থাৎ পিপলস ইউনিভার্সিটি।

একদিকে তামা, পিতল, পাথর, পোড়ামাটি, কাঠের নানা মূর্তি ভাস্কর্য, অন্যদিকে প্রাচীন যুগের চিত্রকলা ও চিত্রল ও ভাস্কর্যগুণম–ত নানা সামগ্রীতে এশিয়ার মানুষের মন নানা সুরের তরঙ্গ তুলেছে ফিলা মিউজিয়মে। বৌদ্ধ ও হিন্দু সভ্যতার সুসজ্জিত উপস্থাপন। চীন, জাপান আর ভারতের বৈশিষ্ট্যযুক্ত বিচিত্র বোধিসত্ত্ব আর শিব, রাম, গণেশ দেবতার মূর্তিসহ পীনোন্নত অথচ সুডৌল স্তনবতী সুরসুন্দরী, কিন্নর-কিন্নরীরা আমাদের সুন্দরের কল্পলোকে উড্ডীন করে রাখে। ভারতীয় শিল্পাগারে প্রবেশ করার পর চোখ প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না যে আমেরিকার এক ডাকাবুকো শহরের জাদুঘরে দাঁড়িয়ে আছি। ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে যেন মন্দিরে ঢুকে গেলাম। সত্যিই মন্দির। তামিলনাড়ুর মাদুরাইয়ের বিজয়নগরে যে স্থাপত্যকলা ও ভাস্কর্যশৈলীর বিকাশ ঘটেছিল পঞ্চদশ শতকে তারই একটি মন্দিরের বিশাল ভবন থামসহ তুলে এনে এখানে স্থাপন করা হয়েছে। এখানে ঢোকার পর মনে হয় না জাদুঘরে আছি। যেন মাদুরাইয়ের বিখ্যাত সেই মন্দিরেই দাঁড়িয়ে আছি।

পারস্যের ও মোগল ভারতের মিনিয়েচার, নেপালের মন্ডলা চিত্র আর চীন-জাপানের জলরঙের ছবিও বিপুল পরিমাণে টাঙানো আছে দেয়ালে। এমনকি গুজরাটের জৈন পুঁথিচিত্রের কয়েকটি পাতাও এখানে প্রয়োজনীয় তথ্য বর্ণনাসহ ফ্রেমবন্দি করে রাখা আছে। কল্পসূত্র গ্রন্থের এসব পাতায় লেখা আছে তীর্থঙ্কর মহাবীরের বাণী এবং লেখার পাশে চিত্রায়িত হয়েছে এক রাজ্যের নারীর অবয়ব। জৈন, পারসিক, আকবরের আমলে আঁকা দুর্লভ আমীর হামজা গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত মিনিয়েচার, নেপালের মন্ডলা চিত্র, এত সব দেখার পর মনে হয় এশিয়ার শিল্পপাঠের জন্য এক জীবন এখানেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। রাজস্থানি কলমের রাধা-কৃষ্ণের রূপায়ণে যে ললিত ক্যালিগ্রাফিক রেখা আর বর্ণ জৌলুস আর সূক্ষ্মতর কারুকাজের নকশা টানা হয়েছে তা কি সত্যিই প্রমাণ করে না আসলে প্রাচ্য প্রাচ্যই। পূরবীর রাগ-রং সবই আলাদা। পশ্চিম কি তার স্বাদ নিতে পারেনি। তাদের কাছে পূরবী ধারা কেবলই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। ভিন্ন কোনো সভ্যতা নিয়ে ভিন্নভাবে গবেষণার বিষয়। পূর্ব দেশের ভাস্কর্য ও চিত্রকলার সঙ্গে কেন হলো না পশ্চিমের জোরালতর সংশ্লেষ। মানুষ কি বিভক্তিতে পা–ত্যের দৌড় দেখাতে চায়? বহুকাল ধরে এ প্রশ্ন আমাদের মনে জেগে আছে। তবে পশ্চিমের নিজের অনেক আছে গর্ব করার মতো। তারা গ্রিক, রোমান হয়ে মাঝে মধ্যযুগের সব আলোকিত অর্জনকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে ত্রয়োদশ থেকে ষোড়শ শতক অবধি যে জাগরণ তার মশাল উঁচিয়ে সভ্যতার পরিমাপ নিতে চেয়েছে। আর তারপর তো কেবলই তাদের জ্ঞানার্জনের ইতিহাস। শুধু তাদের রীতি অধ্যায়ের পর অধ্যায় জুড়ে লেখে নাম দিয়েছে বিশ্ব শিল্পের ইতিহাস।

পর্যটক হয়ে জাদুঘর দর্শন আদৌ সম্ভব নয়। বিপুলাকার এই সংগ্রহশালা দেখতে হলে, বুঝতে হলে কিছুকাল আসা-যাওয়া করতে হবে শিল্পাগারে। একদিনে হাজার হাজার বছরের অর্জন কতটুকু আর পাঠ করা যায়। জানি বলা হবে যে সব বিষয়ে তো সবার আগ্রহ থাকার কথা নয়। যে যার শখ ও প্রয়োজন অনুসারে শিল্পবস্ত্ত দেখে প্রত্নমদ পান করে নান্দনিক তৃষ্ণা মেটাবে। কিন্তু আপনি যখন এশিয়া ভূখ–র একজন নাগরিক এবং এসে দেখলেন ভবনের পর ভবনে এশীয় শিল্পের পিদিম থেকে মোহন আলো জ্বলছে তখন আপনি তো আপনি নেই। আপনার শরীর-মন ধ্যানস্তরে চলে গেছে। শিল্পপাঠে নির্বাণ লাভের জন্য তখন আকুলিত আপনি কী করবেন। এশিয়ার শিল্পসভ্যতার খোঁজ নিতে আমি ফিলার এই নন্দনবনে বিহার করতে আসিনি। আমি পশ্চিমের শিল্পের সারাৎসার পান করতে চাই। দীন যথা যায় দূর, তীর্থ দরশনে আমারও মনের অবস্থাটা তেমন। কখন দেখব ইতালীয়, ডাচ, জার্মান, ফরাসি ডাকসাইটে শিল্পীদের বিশ্ববিশ্রম্নত শিল্পকর্ম। তবে আমার এই উন্মন মন একটা ভালো ধাক্কা খেলো এশীয় শিল্পের সমারোহ দেখে। ঘণ্টা দুই প্রাচ্যশিল্পের মহাযজ্ঞে কাটিয়ে একটু বিরাম নিলাম। কিন্তু সোফায় বসে বুজে আসা চোখ হঠাৎ দেখে ফেলে একটি কোরিয়ার চিত্রকলা। রেশমের কাপড়ে কালো কালিতে আঁকা একটি কুকুরছানার ছবি। কুকুরশাবক একটি রঙিন পাখির পালক মুখে নিয়ে টুকটুক করে ছুটে যাচ্ছে। শিল্পীর নাম ই আম। ষোড়শ শতকের শিল্পী। পশুশাবকের কী অনাবিল শান্তশিষ্ট রূপ! পুরো ছবিতে অনেক ফাঁকা স্পেস। একটুখানি নিসর্গের আভাস মাত্র। এমন আদুরে কুকুরছানাটিই কি যথেষ্ট নয় পশ্চিমকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য যে প্রাচ্যের অর্জন কোনোভাবেই ন্যূন বা ঊন নয়। মনীষা প্রদীপ শুধু গ্রিসে বা ইতালিতে জ্বলে না, তা অনির্বাণ এশিয়াতেও।

 

পশ্চিমের শিল্পের প্রশস্ত সংগ্রহ আছে ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়মে। শিল্পের ইতিহাস যে বিন্যাসে সাজানো তার এমন চিত্ররূপময় পাঠের সুযোগ পৃথিবীর খুব কম সংগ্রহশালাতেই মেলে। আবারো সেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জাত্যভিমান সজাগ ধনাঢ্য মার্কিনদের দান-অনুদানে গড়ে উঠেছে ফিলার পশ্চিমের শিল্পের সংগ্রহ। পেলসিলভানিয়ায় জি জনসন নামে এক অভিজাত পরিবার ছিল। তাদের সংগ্রহে ছিল ইতালীয় ও উত্তুরে রেনেসাঁস অর্থাৎ জার্মান, ওলন্দাজ, ফ্লেমিশ, ইংরেজ ছবির প্রভূত চিত্রকর্ম। তারা সেসব ফিলাকে দান করে অমরত্ন কায়েম করল। বিখ্যাত আমেরিকান ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী, যাঁর নাম শিল্পের সব বইতে উদ্ধৃত হয় সেই মারি কাসাতের ভাই আলেক্সান্ডার কাসাতের প্রাসাদের মতো আবাসের বড় গৌরব ছিল ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের শিল্পের সংগ্রহের কারণে। তাঁরও বাসনা জাগল মনে, শিল্পসম্পদে বড় হোক দেশ। জাত্যভিমানটা তাঁর মৃত্যুঞ্জয়ী হলো ভুবনবিখ্যাত কাজ দেশের প্রধান শিল্পাগারে সমর্পণ করে। আমার মনে হয়, ক্যাথলিক পশ্চিম যত ছবি এঁকেছে তত বোধহয় আর কোনো ধর্মবিশ্বাসী আঁকেনি। এটা অবশ্য পশ্চিমের হিসাব। পূর্বের হিসাব আলাদা। পুরো এশিয়ায় বৌদ্ধ সন্তশিল্পীরা যত বোধিসত্ত্ব আর অবলোকিতেশ্বর গড়েছে ও এঁকেছে তত দেবদেবীর প্রতিমা ও চিত্র রচনা করেনি হিন্দু ভারতও। জাপান থেকে আফগানিস্তান, দূরপ্রাচ্য থেকে নিকট প্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, যতদূরই যাওয়া যাক না কেন বৌদ্ধের ধর্মচক্র ঘুরছে – অহিংসার পতাকা উড়ছে। আর মিশর-মরক্কো হয়ে আরব-পারস্য-ভারত জুড়ে এমন নকশামণ্ডিত গম্বুজ, জেলস্নাদার কারুকাজের মিম্বার ক্যালিগ্রাফির ললিত রেখার লহরিতে থাম ও দেয়াল শোভিত করে যে মরমি স্পেস তৈরি হয়েছে নানা স্থাপত্যশৈলীর মসজিদে তাতে প্রবেশ করলে বিশ্বাসী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আনত হয়ে পড়ে, সেজদায় গিয়ে করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করে শান্তির জীবন, অনুকম্পা চায় নিজের জীবনের সব ভুলভ্রান্তির। মানুষের সভ্যতার সঙ্গে আদি থেকেই ধর্মের যোগ রয়েছে। শিল্পের জন্ম ধর্মালয়ে। গুহা যুগের মানুষেরাও নাকি শিকারে সাফল্য লাভের মন্ত্রসিদ্ধির জন্য ছবি এঁকেছিল। শিল্পের সঙ্গে বিশ্বাসের যোগ বড় নিবিড়। একজন কাঠমিস্ত্রিও তার জীবিকার হাতিয়ারটাকে কপালে ছুঁয়ে ভক্তি জানিয়ে কাজ শুরু করে।

অনেকদিন ইউরোপ-আমেরিকার অনেক সংগ্রহশালায় রাশি রাশি খ্রিষ্টীয় ছবি দেখার পর এখন তা আমার মনে ক্লান্তি নিয়ে আসে। মাতা মেরি, শিশু যিশু, যিশুর আগমনী বার্তার রূপক ছবি, যিশুর জীবনের নানা ঘটনা, ক্রুশবিন্দু যিশু, যিশুর পুনরুত্থান – এসব বার্সেলোনা থেকে শুরু করে সুইডেন পর্যন্ত অঢেল দেখেছি। আমেরিকাতেও সিয়াটল থেকে ফ্লোরিডা, সানফ্রানসিসকো থেকে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত কত জাদুঘরে কতবার যে পাঠ করলাম চিত্রল ইঞ্জিল শরিফ। ক্লান্ত লাগলেও শিল্পীর নাম শুনলে চমকে উঠতে হয়। যিশুশিষ্য পল আর পিটার হেঁটে যাচেছ। এত সজীব করে কে আঁকল, মাসাচ্চো। তাই হবে। দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো আর রাফায়েল পথ খুঁজে পেত না যদি না মাসাচ্চো অগ্রদূতের দায়িত্বটা পালন করত। মানুষের জ্যান্ত রূপ, যা অর্জিত হয় দেহসংস্থান বিদ্যার নৈপুণ্যে, আলো-ছায়ার বিলি-বণ্টনে ত্রিমাত্রিকতার বিভ্রমে আর বৈজ্ঞানিক হিসেবের পরিপ্রেক্ষিতের জ্যামিতিতে, তার সবটাই করায়ত্ত করেছিল ফ্লোরেন্সের পঞ্চদশ শতকের শিল্পী মাসাচ্চো। এই ছবি দিয়ে রেনেসাঁস পর্ব জানান দিয়েছে ফিলার জাদুঘর। তবে যারা ভ্যাটিকানে ভেট দিয়ে খ্রিষ্টানি পবিত্রতা জানান দিতে চায়নি সেই উত্তরের খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বী বিখ্যাত ডাচ শিল্পী ইয়ান ফান আইকের ছবিও আছে এখানে। আছে ফ্লেমিশ রুবেন্সের সুপরিচিত ছবি ‘প্রমিথিয়ুস বাউন্ড’। তবে উত্তরে রেনেসাঁসের শিল্পে মাটির গন্ধ আছে। তারা ধর্মবিষয়ক ছবি আঁকলেও তাতে থাকে পার্থিবতার উজানি প্রকাশ। যিশু আসলে প্রভু হলেও মানুষ। এই সত্যটা জানান দিতে দিতে ডাচরা একেবারে মাটিলগ্ন জীবনই আঁকতে শুরু করে। প্রকৃতি দৃশ্য, নদী ও সাগর দৃশ্য, ঘর-গেরস্তালির ছবি, নগরের ছবি, শহরের ও গাঁয়ের নানা জীবনযাত্রা সবই শিল্পায়িত করল ওলন্দাজ ও ফ্লেমিশ শিল্পীরা। তাদের হাত ধরেই শিল্প চলে এলো মানুষের আঙিনায়। ডাচ শিল্পীদের ধারা অনুসরণ করেই আলোর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রতিক্রিয়ায় বিষয় বিস্ময়করভাবে চিত্রার্পিত করেছেন ফরাসি জঁ-বাপতিস্ত-সিমিয়োঁ-শারদ্যাঁ। শুধু শারদ্যাঁ বললেই শিল্পভুবনের মানুষ এ শিল্পীকে চিনে ফেলে। সপ্তদশ শতক ডাচ শিল্পের স্বর্ণযুগ। এ যুগেই ফরাসি শারদ্যাঁ জন্মেছেন। এ সময় বিত্তবৈভবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল ওলন্দাজ ও ফরাসিরা। ধনাঢ্য জীবনের সুখের চিত্রকর এই সময়ের শিল্পীরা। বিলাসী জীবন এঁকেছেন বলে শারদ্যাঁকে বুর্জোয়া গেরস্তালি জীবনের চিত্রকর হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এত সুন্দর সুন্দর স্টিললাইফ বা জড়জীবন এঁকেছেন শিল্পী যে তা বিষয়ের মাহাত্ম্য ছাড়াই শিল্পগুণে উত্তীর্ণ হয়েছে বিরচনের কৌশল আর আলো-অন্ধকারের নাটকীয় পরিমার্জনায়। আমেরিকার এ জাদুঘরে সদ্য শিকার করা একটি খরগোশের ছবি তাঁর পটুত্বের বড় প্রমাণ।

এখন দুই বিখ্যাত ইংরেজ শিল্পীর কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে। কন্স্টেবল আর টার্নার। দুজনই সমবয়সী। দুজনেরই আয়ু প্রায় সমান। দীর্ঘকাল বেঁচেছেন, এঁকেছেনও প্রচুর। কন্স্টেবল স্থির। টার্নার অস্থির। দুজনের ইংরেজি নাম বাংলা করলে যেন তা বুঝতে সুবিধা হয়। একজন স্টেবল অর্থাৎ স্থাণু আর অন্যজন টার্নিং অর্থাৎ ঘূর্ণায়মান। শান্ত-সুন্দর ভূদৃশ্য এঁকেছেন কন্স্টেবল। একটা চিরায়ত নিসর্গমায়া আছে তাঁর কাজে। তাঁকে কেউ বলে রোমান্টিক, কেউ বলে রিয়ালিস্টিক। চাষাভূষার
মাঠ-ঘাট-নদী এঁকেছেন বলে তাঁকে দুধারাতেই ফেলা চলে। অপরদিকে টার্নারকেও স্থির প্রত্যয়ে কোনো নামে ডাকা যায় না। তিনি সাগর দৃশ্য এঁকেছেন। আগুন লাগা দালানের লেলিহান শিখা নদীর জলে পড়ছে, দূরে একটা অস্পষ্ট জাহাজ দেখা যাচ্ছে, এসব টার্নারের বিষয়। হয়তো এগুলো বিষয় নয়, উপলক্ষ মাত্র, তিনি বর্ণের বিচিত্র যাতায়াতে একটা আবহ সৃষ্টি করে বলতে চেয়েছেন, আমি আসলে পেইন্ট লাগিয়ে পেইন্টিংয়ের নিরঙ্কুশ স্বভাবটা জানান দিতে চেয়েছি। রঙের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টার্নার আবার হয়ে গেলেন ইম্প্রেশনিস্টদের আদিদেবতা।

ইংরেজ চিত্রকরদের কাজের গৌরব ফিলা করতে পারে। তবে রিয়ালিজমের শিল্পী কুর্বে, করো প্রমুখের কাজে তাদের গৌরব তেমন বাড়েনি। এই ইজমের প্রধান শিল্পী জঁ-ফ্রাঁসোয়া মিলের যে কাজটি আছে তাতেই রিয়ালিজমের স্বর্ণ জয় হয়ে গেছে। মিলের কাজটির নাম পাখি শিকারির দল। ওরা রাতের বেলা বনভূমিতে বন্য পায়রার বাসায় হানা দিয়েছে। অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে অন্ধ করে দিয়েছে পাখিদের। টর্চের আলোর ঝলকানিতে পাখিদের ধরে ডানা ভাঙার খেলা প্রিয় ছিল চাষাদের। মিলে সারাজীবন চাষিজীবনই এঁকে গেছেন। মিলের এরকম ছবি আমি আর কোনো চিত্রাগারে দেখিনি। কালোর বিপরীতে আলোর ঝলকানি আর তার মধ্যে ঘোর ঘোরাল তমসাচ্ছন্ন মানুষ ও পাখিদের পাখার ঝাপটানি, পাখিদের মৃতদেহ। এক ভুতুড়ে আবহ তৈরি হয়েছে।

ফিলার ইম্প্রেশনিস্ট সংগ্রহ গণ্য করার মতো। এদগার দোগা, এদুয়ার মানে এধারার শিল্পী ক্লদ মনে ও অগুস্ত রেনোয়ার চেয়ে বয়সে বড়। উনিশ শতকের রিয়ালিজমের শেষ রেশটুকু তাই ওঁদের প্রথমদিককার কাজে লক্ষ করা যায়। রিয়ালিজমের সঙ্গে ইম্প্রেশনিজমের যোগসূত্র বোঝার জন্য দোগা-মানে দেখার প্রয়োজন আছে। লীলাহাস্যে চপল নগ্নিকার যৌন-যৌবন উজ্জ্বলতা দেখার জন্য নয়ন অধীর হলে রেনোয়ার স্নানরত নারীদের ছবিটি দেখতে এখানে আসতেই হবে। রক্তমাংসময় শরীরী উষ্ণতাই যেন রেনোয়ার তুলির গন্তব্য।

আন্তন মোভ নামে এক শিল্পীর কাজ আমার খুব ভালো লাগে। আমার মনে হয় চাষিজীবনের বাস্তবতা নিপাট রূপে তিনি চিত্রিত করেছেন। এ শিল্পী অবশ্য ডাচ। ভ্যান গঘ খুব মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করেছেন মোভকে। মোভকে তাঁর মনে হয়েছে সবচেয়ে সৎ শিল্পীদের একজন। এ শিল্পীর কথা ভাই থিওকে পত্র লিখেও জানিয়েছেন শিল্পী।

ইম্প্রেশনিজম সুখ এঁকেছে। এ রীতি জীবনের কান্না শুনতে চায়নি। উনিশ শতকের দ্বিতীয় অর্ধে যখন কাফে, পানশালা, নাচঘর, অপেরা, রূপজীবীদের ছায়ান্ধকার ঘরে জীবনের রগড় জমেছে খুব তখনই বিলাসী হয়েছে শিল্পীদের তুলি। সত্যি কি যাতনার কোনো চিহ্ন নেই কারো ছবিতে। দোগার সেই ধোপানি আর তার শিশুকন্যাটির কায়িক কষ্ট কি কখনো মানুষের স্বাভাবিক জীবনের কাহিনি হতে পারে? দোগার নগ্নিকা যখন শরীর মুচড়ে দেহ পরিষ্কার করে তখন কি মডেলের প্রথাবদ্ধ চিহ্ন চোখে পড়ে? নগরের রঙিন আবরণের তলে অনেক পাপ আছে। প্যারিস ভেতরে ভেতরে পচে গেছে। কামনার কামড় অসহ্য বোধ হচ্ছে। জীবন দেয়ালে ঠেক গেছে। ওই জ্বালাকে তো মেনে নিতেই হবে। জীবনের তড়পানি কারো তুলিতে অনুরণিত হবে না, এমন তো হতে পারে না। দুঃখ অপেক্ষা করছিল দুই শিল্পীর জন্য। একজন ফরাসি। নাম তুলুজ লোত্রেক। অপরজন ডাচ। ভ্যান গঘ নামটি শুনলেই শিল্পভুবনের মানুষ আর্তনাদ করে ওঠে। লোত্রেক ও গঘ, দুজনই বেদনার সন্তান। মানুষের জীবন যে দুধরনের। একপক্ষ গা বাঁচিয়ে চলে, সুবিধা লোটে। অন্যপক্ষ শহীদ হওয়ার জন্য জন্মে, জীবনে একটুও সোনা-রুপা জমায় না।

 

লোত্রেক পানশালা, নাইটক্লাব, নাচঘরের শিল্পীদের জীবন এঁকেছেন। তাদের জীবন মানে গস্নানি – ঘানিটানা সার। ওদের পোশাক রঙিন। গালে গোলাপি ঝোপ, রক্তিম প্রসাধিত ঠোঁট, ফিনফিনে স্বচ্ছ কাপড়ে ঢাকা দেহবলস্নরী পুরুষের চোখ যতক্ষণ টাটায় ততক্ষণ ওদের আয়, ওদের বেঁচে থাকা। মুলাঁ রুজ নামের কুখ্যাত নাইটক্লাবের দুঃখী নাচনেওয়ালি, সার্কাসের ভাঁড়, দুপয়সার বেহালাবাদক – এসব লোত্রেকের ছবির চরিত্র। ওখানে তপ্ত জীবন বলকায়, জীবনের ভাপ ওঠে। জীবনের শেষ অঙ্গার থেকে ধোঁয়া ওঠে। মুলাঁ রুজ লোত্রেককে শিল্পীজীবন দিয়েছে। এই নাইটক্লাব নিয়ে উপন্যাস লেখা হয়েছে। লোত্রেকের জীবন চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে মুলাঁ রুজ নামের চলচ্চিত্রে দুবার। একবার সাদা-কালোয়। আরেকবার এই তো সেদিন রঙিন ভাষায়। লোত্রেকের মতো ভ্যান গঘেরও প্রধান কাজ আছে ফিলার উনিশ শতকের কাজের নানা কক্ষে। ভ্যান গঘ নামে পরিচিত হলেও তাঁর কোনো চিত্রের গায়ে এ নামটি লেখা নেই। লেখা আছে ভিনসেন্ট। ভ্যান গঘ বংশের নাম। নিজের নাম ভিনসেন্ট। গঘ মানে প্রবহমান জীবনের প্রদাহ – যাতনার মুদ্রা। কেউ একজন বলেছিলেন যে গঘ নাকি তুলিকে চাবুক মনে করে আর ক্যানভাসকে সময় মনে করে তাকে চাবুকপেটা করেছেন। তাতে জীবনের বিষবাষ্প কি শিল্পী ঝেড়ে ফেলতে পেরেছিলেন? পারেননি বলেই কি নিজের হৃৎপি– পিস্তলের তীব্র শেলে ছিন্নভিন্ন করে জীবনের ইতি টানলেন? শিল্পী হতে চাননি। চেয়েছিলেন সন্ত হয়ে সান্তবনা দেবেন দুখিজনে। তারপর জীবনের গতি বেঁকে গেল শিল্পসৃজনের দিকে। কোথাও কোনোদিন থিতু হতে পারলেন না। হাসপাতালে ও মানসিক শুশ্রূষালয়ে কেটেছে সংক্ষিপ্ত জীবনের অনেকগুলো দিন। দক্ষিণ ফ্রান্সের আর্লে বুঝি সুখ আছে। নগর বুঝি ওখানে জীবনকে প্যারিসের মতো ধাওয়া করে না। জীবনের পথে বলি পল গগ্যাঁ আর লোত্রেককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি আর্লে এসে তিন শিল্পী মিলে বেদনার সংঘ রচনার জন্য। গগ্যাঁ এসেছিলেন। তারপর দুজনের কলহ। ক্ষুর হাতে বন্ধু গগ্যাঁকে মারতে উদ্যত হয়ে শেষে নিজেই সেই ক্ষুরে নিজের কান কেটে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়লেন। যে কটি কাজ গঘকে শিল্পভুবনে অমরত্বের তকমা পরিয়েছে তার মধ্যে সূর্যমুখী অন্যতম। অনেক সূর্যমুখী এঁকেছেন শিল্পী। কখনো এককভাবে একটি সূর্যমুখী আঁকেননি। কেন? মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে একটা অস্বভাবী ঘোরের মধ্যে থাকলে মানুষ একক কেন্দ্রে দৃষ্টি স্থির রাখতে পারে না। গঘের সামনে একক কোনো কেন্দ্র ছিল না। তিনি কেন্দ্রহারা। তাকালেই দেখেন অনেকগুলো কেন্দ্র। একটা সাইক্লেডেলিক অবস্থা। তার আঁকা অনেক সূর্যমুখী তাঁর কেন্দ্রচ্যুত অস্থির মনোলোকের স্বাক্ষর। বারোটি সূর্যমুখী নিয়ে আঁকা একটি অমূল্য ভ্যান গঘ আছে ফিলাডেলফিয়ার এই সংগ্রহশালায়।

মনেকে মনে করা হয় ইম্প্রেশনিজমকে তিনি শেষ গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে গেছেন। এরপর আর এ নিয়মের ছবিতে নতুন কোনো মাত্রা দেওয়া সম্ভব ছিল না। গাছে ফুল ফোটে না, রং ফোটে। ইম্প্রেশনিজমের আগে শিল্পীরা গোলাকার প্রায় লাল আপেল এঁকেছেন। ইম্প্রেশনিজম আপেলের লাল দিয়ে আপেলকে নির্ণয় করেছে। রং আগে, রূপ নয়। রং স্বয়ম্ভু। আমাদের চোখের মণিতে রং-ই প্রণোদনা নিয়ে আসে প্রথম, রূপ নয়। কিন্তু সেজান এসে নাকচ করলেন এই তত্ত্ব। তিনি বর্ণবিগলিত ইম্প্রেশনিজমের ভাষার মধ্য থেকে ফর্ম বা আকার বের করে আনলেন। আসলে এ পৃথিবী তো আকারের বর্ণমালা দিয়েই বর্ণিত হয়েছে। ছবিকে আবার ঋজু শিরদাঁড়ায় দাঁড় করাতে চাইলেন সেজান। স্ত্রীর সঙ্গে শিল্পীর সম্পর্কটা কেমন ছিল তা কেউ ঠিক জানে না। মাদাম সেজানের একটা ছবি আছে। দীঘল ভাবের মুখাবয়ব। কিন্তু মুখটা আনত। মুখরেখা স্পষ্ট দেখা যায়। এতে একধরনের দৃঢ়তা আছে ভাস্কর্যের মতো। কখনো মনে হয় তা যেন মাতা মেরির ছবি। মধ্যযুগের আইকন শিল্পীদের আঁকা যিশুমাতা। আনত ভঙ্গির মাদাম সেজানের মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। চোখ নিরুপায়, লক্ষ্যহীন। ‘মাদাম সেজান’ নামের ছবি ছাড়াও স্পষ্ট জ্যামিতিক মাপজোকে আঁকা লম্বাটে কম্পোজিশনে স্নানার্থীদের যে ছবি এঁকেছিলেন সেজান তাও আছে এই শিল্পের ইম্প্রেশনিস্ট আলয়ে। আধুনিক ভাস্করচূড়ামণি রদ্যাঁ ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীদের সমবয়সী। মনে বেঁচে ছিলেন ১৯২৬ পর্যন্ত। রদ্যাঁ চলে যান ১৯১৭-তে। মনে আর রদ্যাঁর একটা যুগলবন্দি প্রদর্শনী হয়েছিল প্যারিসের বিশাল প্রদর্শনশালা গ্রঁ পাল্লেইতে। খুব সম্ভবত মনের মৃত্যুর বছর দুই আগে। মেঝেতে রদ্যাঁর কীর্তি আর দেয়ালে শোভমান মনের সুখ্যাত সৃষ্টি ওয়াটারলিলি।’ এ প্রদর্শনীতে মনে ততটা গুরুত্ব পায়নি। দর্শকরা আকুল হয়ে দেখেছে রদ্যাঁর ভাস্কর্য। পাথর আর পাথর নেই। পাথর যেন শিল্প জন্মে সার্থক হয়েছে। ধাতবখ-ও প্রাণসত্তায় রূপান্তরিত হয়ে জড়তা থেকে মুক্তি পেয়েছে। রেনেসাঁসের শোধিত গড়া নয়। পেলব পলিশও নেই কোথাও। বরং যে উপাদানে গড়া হয়েছে ভাস্কর্য তাই যে মুখর ও প্রকাশ-জর্জর ভাব নিয়েছে। রদ্যাঁর নরকের দরজার প্রথম ব্রোঞ্জ নির্মিত ভাস্কর্যটিসহ আরো অনেক রদ্যাঁ আছে এই জাদুঘরের ভাস্কর্যের গ্যালারিতে।

ছাপচিত্র, ড্রইং আর আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন গ্যালারিতে। প্রতিভা বিচিত্র মাধ্যমে বিকশিত হয়। শুধু চিত্রকলা বা ভাস্কর্য দিয়ে কি আর পৃথিবীর চারুশীলতার চর্চা পরিমেয় হতে পারে? এ বিখ্যাত জাদুঘরের হয়তো বিখ্যাত কোনো রেমব্রান্ট, ভেলাসকেস নেই। কিন্তু এ শিল্পীদের কাজ ছাড়া যে শিল্পপাঠে ছেদ পড়ে। বিষয়টা আয়োজকরা ভালোভাবেই অনুধাবন করেছেন। তাই বিখ্যাত শিল্পীদের ছাপচিত্র প্রদর্শন করে পূরণ করেছেন ইতিহাসের সেই পর্ব। রেমব্রান্ট সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে তিনি যদি পেইন্টিং না করে শুধু যে প্রিন্টগুলো করেছেন তাতেই তিনি শিল্পের ইতিহাসে প্রথম সারিতেই ঠাঁই পেতেন। রেমব্রান্ট, উইলিয়ম ব্ল্যাকের পাশাপাশি এখানে বড় সুযোগ রয়েছে জাপানের সেই অষ্টাদশ শতকের শিল্পীদের রঙিন উডকাটের কাজ দেখার। কিতাগাওয়া উতামারো (১৭৫৩-১৮০৬) ও কাতসুসিকা হোকুসাই (১৭৬০-১৮৪৯)-এর প্রিন্ট একই সঙ্গে প্রমাণ করে দুই সত্য। প্রথমটি হলো এশিয়া যে নিজের নিয়মেই বিকশিত হয়েছিল তার প্রমাণ। পশ্চিমের সংস্পর্শে না এলেও জাপানের তেমন ক্ষতি নেই তা শুধু এদেশের মহান ছাপচিত্রীদের কাজ দেখলেই বোঝা যায়। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই যে এশিয়ার ভাষা আলাদা তা সেই কবে থেকেই তো প্রমাণিত। উতামারো আর হোকুসাইয়ের জীবৎকালটা দেখলে তা বোঝা যায়। এ শিল্পীরা উনিশ শতকের সবচেয়ে জাঁকাল শিল্প-আন্দোলন ইম্প্রেশনিস্টদের নতুন পথ দেখিয়েছিলেন।
ছবিকে রেনেসাঁস ভাষা কবুল করে নিতে হবে এমন কোনো ঐশ্বরিক নির্দেশ থাকতে পারে না। ফরাসিদের এই ভাবনায় পলি জুগিয়েছে অ-ইউরোপীয় শিল্প, বিশেষ করে জাপানি রঙিন উডকাট।

যতই বলা হোক না কেন আমেরিকা আগন্তুকদের দেশ, মাল্টি কালচার বা সংকর সংস্কৃতি চর্চার সবচেয়ে বড় লালনভূমি, তবু আমেরিকান বলে তার যে জাত্যভিমান আছে তার প্রতিনিধিত্ব করে সাদা মানুষেরা – সাদা মানুষের কীর্তিকে তারা দীর্ঘকাল উজিয়ে জানান দিয়েছে। অধুনা তার পরিবর্তন এসেছে। সে যা-ই হোক। শিল্পীর গায়ের রং দেখে তো শিল্প বিচার চলে না। ওরা করলে আমরাও একই কাজ করব কেন। আমেরিকা কিন্তু আপনাকে আমেরিকার শিল্পীদের কাজের মুখোমুখি করিয়ে ছাড়বে। এদের প্রতিটি বড় জাদুঘরে আমেরিকান আর্ট বলে অনেক শিল্পীর প্রচুর কাজ স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত হচ্ছে। লক্ষ করে দেখেছি, এ কাজগুলো অ-আমেরিকানরা তেমন গুরুত্বের সঙ্গে তাকিয়ে দেখে না। অ্যাডওয়ার্ড হিকস, জন সিঙ্গার কপলে, মারি কাসাট, উইনস্নো হোমার, জন সিঙ্গার সার্জেন্ট, থমাস ইয়াকিনস প্রমুখ আঠারো ও উনিশ শতকের শিল্পীর ছবির ভাষা স্বচ্ছ। ছবির মতো ছবি। তা মানুষের সুখই হোক আর ভূদৃশ্য বা জনজীবনই হোক। এই স্বচ্ছ ভাষার বড় প্রেরণা সতেরো শতকের ডাচ শিল্পী। কোনো কোনো শিল্পী অবশ্য রিয়ালিজমের শিল্পী কন্স্টেবল থেকেও প্রেরণা পেয়েছেন মেঠো জীবন চিত্রিত করার জন্য। তাছাড়া ইম্প্রেশনিস্ট বর্ণ মাধুরী ছোঁয়া তো কমবেশি প্রসাধনের মতো লেগেই যায় উনিশ শতকের শেষের শিল্পীদের কাজে। একটা মুক্ত মন নিয়ে ঘুরছিলাম এ ভবন থেকে ও ভবনে। আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমেরিকার এসব শিল্পীর কাজ কি শুধুই পশ্চিমের অনুকরণ? এদের কেউই কি পশ্চিম প্রণীত শিল্পের ইতিহাসে স্বমহিমায় কীর্তিত হতে পারত না? শিল্পের ইতিহাসের দিকে তাকালে পশ্চিম ইউরোপের কয়েকটি দেশকে আমার চূড়ান্ত আধিপত্যবাদী বলে মনে হয়। অ্যাডওয়ার্ড হিকসের ‘নোয়া’স আর্ক’ ছবিটির মুখোমুখি হয়ে আমার বিস্ময় জাগে। বাস্তববাদী শৈলী অনুসরণ করে হিকস নিজের মতো সরলা কিছু পরিমার্জনা এনেছে পশুপাখির রূপায়ণে। জানি, ইউরোপ একে নাঈভ বলে নাক সিটকাবে। তবু হিকসের কেন সব শিল্পের ইতিহাস বইতে ঠাঁই হয় না তা আমি বুঝতে পারি না। পিকাসারা অঁরি রুশোর অজ্ঞাতকুলশীল ভাষাকে মূল্যায়ন করেছিল বলে এ শিল্পী বিশেষ বিবেচনায় পাশ করে গেল। হিকসেরও কমপক্ষে পাশ নম্বর পেয়ে ইতিহাসে জায়গা নেওয়ার দাবি আছে।

এরকম বড় জাদুঘর, যদি সুযোগ হয়, তবে জীবনে একবার দিনকয়েক গভীর মনোযোগে পাঠ করা প্রয়োজন। তাতে চোখের ছানি কেটে যায়। মনের জড়তা ঘোচে। মস্তিষ্কের কোষ নির্বিঘ্নে চিত্ররূপময় ভাষায় মানুষের কীর্তি পাঠের সুখ পায়। শুধু চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের মহিমা দেখে মানুষের নান্দনিক স্পৃহার হিসেব মেলানো সমীচীন নয়। আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, নিত্যদিনের প্রয়োজনের নানা সামগ্রীর মধ্যে যে শিল্পবোধের ছাপ আছে তা ঘনিষ্ঠ চোখে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। জনরুচির মধ্যেই তো দেশজ শিল্পভাবনা প্রবহমান। ওইসব দ্রব্যসামগ্রীতে সমৃদ্ধ ফিলার সংগ্রহশালা। এসব সামগ্রীর শিল্পীকে চারুশিল্পী বা কারুশিল্পী, যাই বলি না কেন তাদের কাজ ছাড়া কিন্তু আমেরিকার সৌন্দর্যভাবনা অনুভব করা যায় না। অবশ্য আমেরিকার কাজের পাশাপাশি এখানে অন্য দেশের চারুময় কারুশিল্পের উপস্থাপনা রয়েছে।

বিশ শতকের প্রথম পঞ্চাশ বছরে শিল্পের ইতিহাসে যে বিচিত্র বিপুল পালাবদল ঘটেছে তা হয়নি তার আগের পাঁচশো বছরেও। একদিকে এক্সপ্রেশনিজম, কিউবিজম উনিশ শতকের শিল্পচর্চার অন্তিম সুর শুনিয়েছে আর দাদাবাদ, ফিউচারইজম, সুররিয়ালিজম চিত্রকলার প্রথার বাগান করেছে লণ্ডভণ্ড।

ইতিহাস গতি পায় নতুন চিন্তাবীজের অঙ্কুরোদ্গমে। এক্সপ্রেশনিজমের বাংলা করা হয়েছে প্রকাশবাদ। জগতে সবই তো প্রকাশিত, তবে প্রকাশবাদের বাইরে কী থাকল? থাকল অনেক। চোখের দেখা দিয়ে তো শিল্প জন্ম নেয় না। শিল্প আসলে মনের রসায়ন। মনোবিদরা বলেছেন যে সব শিল্পই আসলে শিল্পীর অস্বাভাবিক মনের গতি থেকে রচিত হয়। শিল্পীর এই মনোলোক একটা বিচিত্র ভাষার জন্ম দিলো। এটাই প্রকাশবাদের প্রথম ঘরানা। এর নাম ফবিজম। ফব মানে বন্য পশু। এটি একটি ফরাসি শব্দ। এ ঘরানার শিল্পীদের ডাকা হলো ফবিস্ট বলে। এর বাংলা কি পশুচেতন করা যায়? ঘটনাটা বিস্তারিত বলা দরকার। এ দলের পান্ডা শিল্পী অঁরি মাতিস। তিনি ও তাঁর সঙ্গে আরো কয়েকজন শিল্পী ১৯০৫ সালে প্যারিসের দামি প্রদর্শনশালা গ্যালারি দো’তোঁনের দেয়ালে ছবি টাঙালেন। গ্যালারির মেঝেতে রাখা হলো ইতালীয় রেনেসাঁসের নয়ন জুড়ানো একটা ভাস্কর্য। ভাস্করকে আমরা সবাই চিনি। তাঁর নাম দোনাতেলেস্না। এ প্রদর্শনী দেখে এক সমালোচক একটা সমালোচনা ছাপলেন পত্রিকায়। এ সমালোচনা ফরাসি ভাষায়। লেখাটির শিরোনাম বাংলা করলে দাঁড়ায় বন্য পশুদের মাঝে দোনাতেলেস্না। সমালোচক যে নতুন ধারার চিত্রকলা বুঝতে পারেননি তা নয়। তিনি বুদ্ধিদীপ্ত রসময় শিরোনাম দিয়ে শিল্পপ্রেমী দর্শকদের মন মজাতে চেয়েছেন। নীল-হলুদ-লাল এই প্রাথমিক বর্ণজোটের সঙ্গে সবুজ মিলিয়ে এতকাল যে রঙিলা চিত্রল সুরের চর্চা হয়েছে তার বুকে একটা বড় ঘা মারলেন মাতিস। তিনি বললেন, বর্ণ যেহেতু আমাদের চেতনার সারথি এবং তার নিজস্ব একটা ক্ষমতা আছে তবে তাকে আমরা ভিন্ন পথে চালিত করি না কেন। আমাদের দেহে ও অবয়বে তো সাদা, বাদামি, কালচে, ঈষৎ গোলাপি ছাড়া কোনো রং নেই। এতকাল তাহলে আমরা লাল, হলুদ, নীল আর সবুজের অমিশ্র ছোপে এবং আরো কত বিমিশ্র বর্ণযোজনে মানুষকে এঁকেছি কেন। তার অর্থ বর্ণের সত্য হচ্ছে চিত্রকলার মর্মকথা। আমি যদি পরস্পরবিরোধী রঙের বিন্যাস মানুষের মুখে চাপাই তাহলে তার অন্তর্লীন সংক্ষুব্ধতা আরো জর্জর ভাষা পাবে। মাতিস সবুজ টান (গ্রিনলাইন) নামে নিজের বউয়ের একটা ছবি টাঙিয়েছিলেন ওই প্রদর্শনীতে। নাক বরাবর টানা, লেখাটি মুখের স্বভাবধর্মটার নতুন ব্যাখ্যা জানান দিচ্ছে। বর্ণের সূত্র ধরে এই খলবলে প্রকাশই প্রকাশবাদ। মাতিস তাঁর তত্ত্বেও আরো বিস্তারিত বিবরণ দিলেন। তিনি বললেন, চিত্রকলা মানে একটা দ্বিতল পদে বর্ণযোজন – রেখা ও রূপে তা ভরিয়ে দেওয়া এবং প্রকাশের নানা সমীকরণ তৈরি করা। আমার কাছে সাদা ক্যানভাস আর রং সত্য। শূন্যতাকে আমি সাজাব। জগতে কোনটা কোথায় আছে আমার কাছে তা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। কে আগে, কে পরে, কোনটা সামনে, পেছনে কোনটা তার আমি ধার ধারি না। আমার কাছে রেনেসাঁসের ভুয়োদর্শী আবিষ্কার পরিপ্রেক্ষিত আর দেহসংস্থান বিদ্যা আর ওই যে সবচেয়ে লোভনীয় আবিষ্কার আলো-ছায়ার দোলাচলে দ্বিতল চিত্রপটে ত্রিমাত্রিকতার বিভ্রম বানানো – এসবের কোনো মূল্য নেই। আমি মনে করি, আমাকে দেওয়া হয়েছে একটি নারী, একটি টেবিল, একটি চেয়ার, একটি ফুলদানি, ঘরের দেয়াল, দেয়ালে টাঙানো ছবি ও অন্য কিছু, জানালা, জানালার বাইরে সবুজ ঘাস, সবুজ ঘাস শেষে সমুদ্রের নীল এসবই। সমতলীয় চিত্রপটে আমাকে ডিজাইনের আদর্শে সাজিয়ে দেখাতে হবে। এখানে কোনো গল্প নেই, তবে রেখা, রূপ ও বিন্যাস কথা বলবে। আর চিত্রকলার জন্য এটাই কি পরম ও চরম সত্য নয়? গল্প বলার জন্য তো সাহিত্য আছে, চিত্রকলা তো তার নিজস্ব হরফে কথা বলবে। এভাবে চিত্রকলার পাঁচশো বছরের ধারনায় কোপ বসালেন ফবিস্ট মাতিস। সেইসঙ্গে তিনি প্রাচ্যদেশের শিল্পভা-ার থেকে অকুণ্ঠভাবে অনুদান নিলেন শিল্পের নতুন ব্যাকরণ সূত্র ধরে আরো ছবি আঁকার জন্য। পারসিক ক্যালিগ্রাফি, আমাদের কালীঘাট পটচিত্রসহ অজস্র উৎসের তুলি ছুপিয়েছেন মাতিস রঙের ও রেখার ললিত পথ পাড়ি দেওয়ার জন্য। নীল গাউন পরে লাল সোফায় বসে আছে এক নারী। মাতিসের এ ছবি দেখলে বোঝা যায়, নারী এখানে বিষয় নয়। বিষয় প্রশস্ত নীল পরিধেয় বস্ত্র লাল আসন, চারদিককার অবকাশে কালো নকশা, ফুল, দেয়ালের ছবি সব একই তলে পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরি করেছে মাত্র।

বিষয় বলে কিছু নেই। মধুরেখা আর রঙের মাধুরীতে মন মজিয়েছিলেন ফরাসি মাতিস। স্পেনীয় পিকাসো তা-ও গ্রাহ্য করলেন না। তাঁর মনের রাগ ক্ষুরধার। ষাঁড়ের লড়াইয়ের দেশের মানুষ বলে কথা। মস্তিষ্কও জটিল জাল বুনতে পারে। মাতিসের মাস্তানি দেখে ভাবলেন নিজেও একটা বিপস্নব ঘটাবেন। ব্রাক পিকাসোর বন্ধু। ওঁরা দুজনে জাদুঘরে গিয়ে নিগ্রো ভাস্কর্য দেখেন। ওঁরাও আবিষ্কার করলেন অ-ইউরোপীয় শিল্পভাষায় একটা অন্য মন্ত্রগুপ্তি আছে। পিকাসো তা দেখে রেনেসাঁসের ক্যানভাসের হৃৎপি– একটা অব্যর্থ তীর ছুড়লেন। তিনিও বললেন, পরিপ্রেক্ষিত, আলো-ছায়া, দেহসংস্থান, মিথ্যা প্রচারণা আর কেন। এই বস্ত্তপৃথিবী প্রতি অনুমুহূর্তে অজস্র ইমেজে বদলে বদলে আমাদের চোখে আলো ফেলছে। কোনো দুটি মুহূর্তে একটি বিষয়কে আমি একইভাবে দেখতে পারি না। সময় যদি সত্য হয় তবে বৈজ্ঞানিক হিসেবেই তা সম্ভব নয়। একটা বিষয় আমি দেখি না কৌণিক দূরত্ব থেকে। দেখি ওপর থেকে নিচ থেকে। আমার এই বিচিত্র দেখাকে আমি সমতলে সন্নিবেশিত করার ব্যাকরণ তৈরি করব। তবেই আমার বস্ত্ত অবলোকনের সত্য চিত্ররূপ পাবে। বড়ই গুরুতর তত্ত্ব। একেবারে বৈজ্ঞানিক। আইনস্টাইনের রিলেটিভিটির তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায় এই শিল্পভাবনা। মিলে যায় ক্যামেরার ভাষার সঙ্গেও। নানা অ্যাঙ্গেল থেকে ইমেজ তুলে চলচ্চিত্রে গতির ব্যাকরণ গড়তে হয়। এভাবে জন্ম নিল কিউবিজম। বাংলা নাম ঘনকবাদ। একটি বস্ত্তর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও বেধের উপস্থাপন বর্ণের বিভ্রমে নয়, ভিন্ন ভিন্ন কেন্দ্র থেকে তাকে দেখার হিসাবটার সমাবেশ ঘটাতে হয় কিউবিজমে। ১৯০৭ সালে ‘লে দেমোয়াজেল দাভিনোঁ’ নামের ছবি এঁকে রেনেসাঁসের শিল্পাদর্শের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে পিকাসো জন্ম দেন বিশ শতকের সবচেয়ে বুদ্ধিমার্গী চিত্রশৈলী কিউবিজম।

ইউরোপের শিল্পীদের আঁকা ইতিহাসখ্যাত অনেক ছবি আর তাদের নিজের দেশে নেই। পিকাসোর যে ছবি দিয়ে কিউবিজমের ইতিহাসের সূচনা তা আছে নিউইয়র্কের মোমায়। লে দোমোয়াজেল দাভিনোঁ বা আভিনোঁর মেয়েরা নামের ছবিটি বিজ্ঞাপিত করে মোমা শিল্পরসিককে আমন্ত্রণ জানায়। পিকাসোর অনেক ছবি তাঁর স্বদেশ স্পেনে এবং জীবনের যৌবন থেকে মৃত্যু অবধি যে দেশে কেটেছে সেই ফ্রান্সেও তাঁর ছবি আছে প্রচুর। প্যারিসের মুজে পিকাসোর সংগ্রহ আর বার্সেলোনার ‘মিউজাই পিকাসো’তে শিল্পীর চিত্র, ভাস্কর্য ও মৃৎশিল্প দেখার পর ভেবেছিলাম এই মহাগুরুর কাজ যথেষ্ট দেখা হয়েছে। তারপর মনে পড়ল, আভিনোঁর মেয়েদের সঙ্গে তো দেখা হলো না, ‘থ্রি মিউজিশিয়নস’ নামেই শিল্পীর যে বিখ্যাত দুটি কাজ সেগুলোই বা কোন শিল্পাগারে ঠাঁই পেয়েছে। বই ঘেঁটে জানলাম, এর সবই আছে আমেরিকায়। দুই দুইটা মহাযুদ্ধ বাধাল ইউরোপ। হারল ইউরোপের সব দেশ। ক্ষতি হলো সবার অপরিমেয়। জাপান আণবিক বোমায় ছাই হলো। বলা হয়, যুদ্ধে নাকি কেউ জেতে না। কিন্তু মহাযুদ্ধে আমেরিকা জিতেছিল নানাভাবে। তার অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল ১৯৩০-এর মহামন্দার পরপরই। নিলামখানার হাতুড়ির শব্দে সাড়া দিয়ে তাই তারা অমূল্য শিল্পরত্ন অর্থমূল্যে বাগিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া দূরদৃষ্টির সংগ্রাহক, বিশেষ করে গুগেনহাইম পরিবার এবং কয়েকটি মার্কিন ধনকুবের পরিবারের শিল্পানুরাগীজনেরা পিকাসোর পেছনে লেগে থাকত নাছোড়বান্দা জেদে। ওদের অর্থও ছিল আর ভূয়োদর্শী জহুরির মতো ওরা রত্নও চিনত। ইউরোপের অনেক অমূল্য চারুকীর্তি এখন আমেরিকার জাদুঘরে। ইতিহাসের নিষ্ঠুর চালে ইউরোপকে হেরে যেতে হয়েছে। তাই আজ মোমা, ফিলা, বোস্টন ও ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মিউজিয়ম না দেখলে আধুনিক শিল্পের ইতিহাস সুসম্পন্ন হয় না।

 

‘থ্রি মিউজিশিয়নস’ বা ‘তিন বাদক’ নামে পিকাসো ১৯২১ সালে দুটি ছবি আঁকেন। একটিতে তাঁর প্রিয় কুকুরটির উপস্থিতি আছে, অন্যটিতে নেই। প্রথমটি আছে মোমায়। ‘আভিনোঁর মেয়েরা’ও বাস করে মোমাতে। মাঝে মাঝে তারা বেড়াতে যায় ইউরোপের বিখ্যাত জাদুঘরে। বাপের বাড়ি ফ্রান্সেও তাদেরকে বার কয়েক বেড়িয়ে আসতে হয়েছে। ‘থ্রি মিউজিশিয়নস’ অপরটি আছে ফিলার সংগ্রহে। ১৯২১-এ কিউবিজমও নতুন সংস্করণ পেয়েছে। পিকাসো মানে ফর্ম আর মাতিস মানে রেখা ও রং। এই দেদীপ্যমান দুই নক্ষত্র বিশ শতক পেরিয়ে একুশ শতকের আকাশকেও আলোকিত করে রেখেছে। ছবিটিতে তিনজনের হাতে তিনটি বাদ্যযন্ত্র। একজনের ঠোঁটে বাঁশি, একজনের কাঁধে বেহালা, অন্যজন অ্যাকোর্ডিয়ানের মতো কোনো বাদ্যযন্ত্রে সুর তুলেছে। ছবিটাকে শুধু চোখ দিয়ে দেখলে হয় না, কান পেতে শুনতে হয়। ছবি শুধু চাক্ষুষ নয়, কানঘনিষ্ঠও বটে। খুঁজে নিতে হয় তিন বাদকের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, বাদ্যযন্ত্রের গড়ন, স্বরলিপি লেখা নোটেশন বুক, পরিপার্শ্বের অন্যান্য অনুষঙ্গ। দৃষ্টি যদি প্রত্নতাত্ত্বিকের মতো নৈপুণ্যে ছবিকে খুঁড়ে না দেখে তবে শিল্পের রস নেওয়া যাবে না। চৌখুপি, ত্রিকোণ, আয়তাকার নানা রকম গড়ন নানা রঙের। গড়নেরই এক সুরসাম্য বা হারমনি। চোখ যদি কানের মতো সংবেদী না হয় তবে তিন বাদকের চিত্রল সংগীতের আস্বাদ নেওয়া যাবে না। সংগীতেরই শিল্পরূপ এই ছবি। তিন বাদকের তিন বাদ্যযন্ত্র মানে তিন হৃদয়ের কথা – তিন হৃদয়ের মরমি সম্পর্ক। এই ত্রিরত্নের মধ্যিখানে সার্কাসের ভাঁড়ের পোশাকে আছেন স্বয়ং পিকাসো আর দুজন তাঁর অভিন্ন হৃদয় বন্ধু কবি গিয়োম আপোলিন্যের ও কবি মাক্স জাকব। পিকাসো যখন ছবিটি এঁকেছেন তার দুবছর আগেই আপোলিন্যের প্রথম বিশ্বযুদ্ধের গোলার আঘাতে আহত হয়ে কিছুদিন বেঁচে লোকান্তরিত হয়েছেন। তাই এ ছবিকে বলা যায় বন্ধুত্বের স্মৃতিময় অর্কেস্ট্রা।

কিন্তু সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের খ্যাপা ঋত্বিক স্পেনীয় শিল্পী সালভাদর দালি মনে করতেন পিকাসোতে এক ফোঁটা মরমি রস নেই। তাঁর দেশের এই শিল্পী একশতে একশ পেতে পারেন, তবে শিল্পে অধরা মাধুরী যোজনের পরীক্ষায় তিনি পাবেন শূন্য। দালি একটা নম্বরপত্র বা মার্কশিট তৈরি করেছিলেন একবার। তাতে রেনেসাঁসের দা ভিঞ্চি থেকে নিজেকেসহ উনিশ ও বিশ শতকের কয়েকজন শিল্পীর তালিকা বানিয়েছিলেন এবং একটা সারণি তৈরি করে বুদ্ধিবাদিতা, স্বপ্নচারিতা, কল্পনাশক্তি, মরমিতা এসব বিষয়ের উল্লেখ করে বিভিন্ন শিল্পীর নামের ঘরে প্রাপ্ত নম্বর উল্লেখ করেছিলেন। উচ্চাভিলাষী ও চরম খেয়ালি দালি এই নম্বরপত্রের অনেক বিষয়ে নিজেই নিজেকে সর্বোচ্চ নম্বর দিয়েছেন।

পরীক্ষক দালিকে ইতিহাস মেনে নেয়নি। কিন্তু তাঁর শিল্প ইতিহাসে বিজয়ী হয়েছে। দালি কোন বাস্তবতা এঁকেছেন! তা চোখে দেখা রূপের সঙ্গে তো তার মিল নেই। কারণ তিনি স্বপ্নের জগৎ এঁকেছেন। নির্জ্ঞান লোক বা অবচেতনে অবরুদ্ধ ভোমরাটা অবমুক্ত করেছেন তিনি। কোনো সুখ স্বপ্ন আঁকেননি। নগ্নভাবে যৌনতার ইশারা দিয়েছেন। কেননা মানুষের মনে কামনাকীট অমনি কিলবিল করে। অবচেতনের ওই শুঁয়োপোকা পাখা মেলে প্রজাপতিও হয়ে যায়। অবচেতনের রুদ্ধ কুঠুরি ভেঙে বেরিয়ে আসে ভয়াল দৈত্য। মানুষ দুঃস্বপ্ন দেখে। যুদ্ধ, হিংস্রতা, বিচ্ছিন্নতার জ্বালা এইসব নেতির পীড়ন দুষ্পাঠ্য রূপকে জানান দিয়েছেন দালি। তাঁর শিল্পে উপস্থাপিত অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কেবলই উলস্নম্ফন। পরাবাস্তববাদ শিল্পে নতুন মুক্তি নিয়ে এসেছে। তার ত্রাতা দালি এবং তাঁর বন্ধু ও সহধর্মীরা। এঁদের একটা কথা আমার খুব মনে ধরেছে। কথাটা বলেছেন দালির বন্ধু বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েল। বুনুয়েলের সঙ্গে আঁ সিয়াঁ অঁনদালু বা ‘আন্দালুসিয়ার কুকুর’ নামে বিশের দশকের শেষে দালি একটি ফিল্মও বানিয়েছেন। বুনুয়েল বলেছিলেন, আমার জীবনী যদি লিখতে হয় তবে আমি যা যা করেছি এবং যা যা করিনি দুই-ই লিখতে হবে। বিষয়টা একটু খোলাসা করা লেখা যাক। বুনুয়েল বলতে চান আমার প্রতিদিনের দিনযাপন ও কর্মকা–র মধ্যেই শুধু আমার জীবন পরিমেয় নয়। আমি যা যা ভেবেছি, তা যত ভয়ংকর, কুৎসিত, অভব্য, কাল্পনিকই হোক না কেন, আর আমার যত দিবাস্বপ্ন আর যত দুঃস্বপ্ন সবই যদি লেখা যায় তবেই বলা যাবে সেইটা আমার জীবনী। পরাবাস্তববাদীদের আগে এসব কথা কেউ কি এমনভাবে বলতে পেরেছে? সত্তাত্তর বা রূপান্তরের মায়ার খেলায় ছিল তারা পারঙ্গম। শিল্পে আসলে অবচেতনের জাদুর খেলাটা দেখাতে হয়। মানুষ প্রতিনিয়ত নানা প্রপঞ্চে হারিয়ে যায়। তার চোখের কাছে সাদা রুমালটা সাদা পাখি হয়ে উড়ে যায়। অমিল আর দূরত্বকে বোঝানোর জন্য সমুদ্রপারের বিশাল পাহাড়ের নিচে রেখেছেন একটা ছোট্ট মটরশুঁটি। দালির স্বপ্নপাঠের সুযোগ আছে মোমায়। তাঁর বিখ্যাত কাজ ‘পারসিসটেন্স অব মেমোরি’ বা স্মৃতির নির্বন্ধ কাজটি আছে মোমায় আর আরেক বিখ্যাত কাজ প্রিমোনিশন অব সিভিল ওয়ার’ আছে এই জাদুঘরে। এ ছবির নাম দিয়েছি ‘গৃহযুদ্ধের অশনিসংকেত’। করাল কালের দৈত্য পিষ্ট করছে নারীর দেহ। দৈত্যাকার মানুষী রূপের অদ্ভুত কাঠামো আতঙ্কের স্থাপত্য তৈরি করেছে যেন।

যে আমেরিকা ১৯১২ সালের আগে ইউরোপের শিল্পের বিচিত্র বিকাশের কোনো খোঁজ রাখেনি তারাই পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নিজ দেশে বানাল আধুনিকতার সুফলা সুতিকাগার। প্যারিস থেকে সার্বিক শিল্পচর্চার ভরকেন্দ্র চলে এলো নিউইয়র্কে। আমেরিকার শিল্পীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল ১৯৪০-এর দশক থেকে। যুদ্ধের তাড়া খেয়ে ইউরোপের অনেক বিখ্যাত-অখ্যাত শিল্পী আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিল আমেরিকার পূর্ব তীরের নগরী নিউইয়র্কে। বিমূর্ত প্রকাশবাদ, পপ, নিও দাদা, মিনিমালিজম, ধারার পর ধারা, মতবাদের পর মতবাদ এত দ্রম্নতলয়ে পালাবদল এর আগে কখনো শিল্পের ইতিহাসে ঘটেনি, যা ঘটেছে ১৯৫০ ও ’৬০-এর দশকে।

বিবর্তনের স্রোতে খাবি খেয়ে পুরনো রীতির খোলনলচে পালটে যায়। পেইন্টিং আর পেইন্টিং থাকে না অথবা পেইন্টিং শুধু তার স্বরাট উপস্থিতি ঘোষণা করে কোনো ইমেজ বা ছবি আর আঁকা হয় না। একদিকে নির্ভেজাল রঙের গতায়তে বিমূর্তবাদ আর অপরদিকে চিত্রকলার কৌমার্য হরণ। রঙের সঙ্গে আরো অনেক উপাদানের সহাবস্থান ও সঙ্গমে আকীর্ণ হলো ছবি। ফটোগ্রাফিক ইমেজ, পেইন্টারলি ইমেজ, রং ছাড়াও কাঠ, বালি, পত্রিকার পাতা, স্ক্রিনপ্রিন্ট, এমনি নানা কিছু সেঁটে যেতে লাগল ক্যানভাসে। ইমেজের এই বিরামহীন বিচিত্র প্রয়োগের কারণ কী? রবার্ট রওসেনবার্গ বললেন, এটাই আমাদের বাস্তবতা। আমরা সমকাল ও বিগতকালের ঘটনাস্রোতে ডুবে থাকি। কখনো জেগে দেখি চোখের সামনের পৃথিবী, কখনো স্মৃতির রোমন্থনে চলে যাই। রওসেনবার্গ আমেরিকার মনোলোক চিত্রার্পিত করেছেন। তাঁর ছবিতে স্ট্যাচু অব লিবার্টি, নিয়ন সাইন, সিস্টেন চ্যাপেল, রকেট উৎক্ষেপণের দৃশ্য, এসবের কোনোটা রঙে, কোনোটা ছাপচিত্রে, কোনোটা বা সরাসরি যে উপাদানে ছিল তাই জুড়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু এখানে নয়, প্রায় সব বড় জাদুঘর রওসেনবার্গ দেখিয়ে আধুনিকতার সংজ্ঞা ব্যাখ্যা করে।

ইভা হেসে তাঁর শিল্পের নাম দিয়েছেন অ্যান্টি-ফর্ম। বাংলায় বলা যায় প্রতি-রূপবন্ধ। মিউজিয়মের দেয়াল ঘেঁষে পড়ে আছে কতগুলো কাঠামো। মনে হয় কোনো বড় থাম, ছোট ছোট খ– ভেঙে পড়েছে। মসৃণ দেয়াল ও মেঝের মধ্যে গড়নগুলোর মধ্যে ভেঙে পড়ার নাটক আছে। আছে বিচ্ছিন্নতা ও বিক্ষিপ্ততার ব্যঞ্জনা। আসলে পিলার বা থামের টুকরো অংশে যে গুরুভার থাকে তার বিপরীতের সংকেত দিতে চেয়েছেন জার্মান শিল্পী ইভা। এখানে ভারের মোড়কে নির্ভারতার অর্থ যুক্ত হয়েছে। এগুলো ওজনদার গড়ন নয়। কারণ এগুলো ফাইবার গস্নাস আর তার দিয়ে বানানো হয়েছে। খুবই হালকা-পলকা।

জাদুঘরের সব গুরুগম্ভীর, বুদ্ধিদীপ্ত, চিন্তাগর্ভ বিশাল বিশাল আয়োজনের মধ্যে ইভার ধূসর রঙের ফাঁপা গড়নগুলো যেন এক পশলা শরতের হাওয়ায় মনকে মর্মরিত করে দিলো। n

Leave a Reply

*