logo

প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর সংলাপ

ই না  পু রী

‘নদী বলল, আমি তৃষ্ণার্ত; আমায় তুমি এক গ্লাস জল দেবে?
সাগর করল আহ্বান : আমার কাছে এসো, আমি তোমায় সব দেব!’
একথাগুলো গণেশ হালুইর রোজনামচায় উঠে এসেছে। এর ব্যাখ্যায় শিল্পী বলেছেন, মোক্ষলাভের এক শব্দাতীত তৃষ্ণার নামই জীবন, যে তৃষ্ণা সবসময়ই অপূর্ণ থেকে যায়। হালুইর শিল্পীজীবনের সূচনা হয়েছিল কলেজ-পরবর্তী সময়ে, অজন্তায়; সেখানে তিনি বিশেষ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি যে আলংকারিক (ফিগারেটিভ) স্টাইল আত্মস্থ করেছিলেন, অজন্তায় ফ্রেসকো দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তাতে নতুন মাত্রা যোগ হলো, যেগুলো ছিল সুনির্মিত ডেকোরেটিভ মোটিফ-সমৃদ্ধ এবং জটিলভাবেই পুঙ্খানুপুঙ্খ।
সময়ের পরিক্রমায় ফিগারেটিভ স্টাইল ধাবিত হয়েছে বিমূর্তকলার (অ্যাবস্ট্রাক্ট) দিকে। কাগজে, রঙের ব্যবহারে, শেপ ও ফর্মে এত স্পষ্ট দ্যোতনার সমাবেশ তিনি ঘটিয়েছেন যে, অ্যাবস্ট্রাক্ট মেথড ছাড়া আর কোনো পদ্ধতিতে হালুই ছবি আঁকতেন – এটা বিশ^াস করাই কঠিন। কোমল রঙের প্রবাহ এমন আঁচড় কেটেছে যে, সদ্যবিধৌত সমুদ্রসৈকতের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে ক্যানভাসে, রেইন ফরেস্টের এমন প্যাটার্ন ফুটে উঠেছে যেন অনেক ওপর থেকে তা দেখা হয়েছে, দূরবর্তী সমতল থেকে দেখা প্রতœতাত্ত্বিক সাইট, রাত্রির নিস্তব্ধতা, প্রত্যুষের ধূসর-নীল আকাশে িস্নগ্ধ গোলাপি রঙের আভা, সরালির গান। হালুই এসব দৃশ্যকল্প তাঁর চিত্রে টেনে এনেছেন অতি সাধারণ পরিচিত চারপাশ থেকে; কিন্তু তাঁর ক্যানভাসে এসব এসেছে বহুবর্ণিল ও দীপ্তিময় হয়ে।
হালুইর পেইন্টিং মাঝে মধ্যেই তাঁর শিল্পীজীবনের প্রথম পর্যায়ের দিকে ফিরে যায়, যখন তিনি আওরঙ্গবাদে ছিলেন, অজন্তা-ইলোরার ফ্রেসকো নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। সেই মনোরম দেয়ালচিত্রগুলো উদ্ঘাটনে তাঁর দীর্ঘ এবং ব্যাপক অভিনিবেশ সবসময়ই তাঁর মন ও মস্তিষ্কে গেঁথে আছে। সেই স্মৃতিই তাঁর আইকনোগ্রাফিকে দিয়েছে ধ্যানশীল স্পষ্ট দ্যোতনা।
জাহাঙ্গীর আর্ট গ্যালারির এ-প্রদর্শনীতে হালুইর আর্টের দীর্ঘদিনের ভিন্ন ভিন্ন ডাইমেনশন এমন শিল্পিত অভিব্যক্তি নিয়ে এসেছে যে, প্রদর্শনীটিকে একজন দর্শকের কাছে প্রায় রেট্রোস্পেকটিভ বলেই মনে হতে পারে। হালুই নেপালি রাইস পেপার ব্যবহার করেছেন, যা তাঁর চিত্রকলাকে  বুনোটের পরশ দিয়েছে।
হালুইর অন্য অসাধারণ চিত্রগুলোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই তাঁর প্রথম দিকের ফিগারেটিভ এবং পরবর্তী অ্যাবস্ট্রাকশনিস্ট সময়কার এক সুষম ভারসাম্য। রঙের ব্যবহারের পটুতা এবং ব্রাশের স্ট্রোকের মুন্শিয়ানাই বলে দেয়, এ-শিল্পীর মধ্যে আর অনিশ্চয়তার কিছু নেই। জীবনের এই বসন্ত সময়ে সৃষ্টিশীলতার চূড়ায় দাঁড়িয়ে অকপটে দুটি স্টাইলকে মিলিয়ে তিনি এমন একটি স্টাইলে উপনীত হয়েছেন, যেটি খাঁটি এবং দৃশ্যকল্প-সমৃদ্ধ। হালুইর কাজ সম্পর্কে মনসিজ মজুমদারের উদ্ধৃতি এখানে উল্লেখ্য। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর অন্তরঙ্গ সংলাপ আর তাঁর সেই মুডের দ্যুতি ফুটে উঠেছে প্রতিটি কাজে। ফিগারেটিভ আর নন-ফিগারেটিভ কাজের যৎসামান্য কিন্তু সমৃদ্ধ সীমার মধ্যে এমন তুখোড় সংলাপের সঙ্গে মধ্যস্থতা করেছে তাঁর আর্ট।’
এ-সিরিজে চিত্রের পর চিত্র জুড়ে দেখা যাবে নেচারস্কেপ/ মাইন্ডস্কেপের বিমূর্ত অভিব্যক্তি। গণেশ হালুই আমাদের সময়ের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত শিল্পী, যা আবারও প্রমাণ করএ-প্রদর্শনী।
গণেশ হালুইর জন্ম ১৯৩৬ সালে বাংলাদেশের ময়মনসিংহের জামালপুরে। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে কলকাতা চলে যায় হালুইর পরিবার। শেকড় ছেঁড়ার সেই বেদনার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর কাজের মধ্যে। ১৯৫৬ সালে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফট থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরের বছর অজন্তার ম্যুরালের কপি করার দায়িত্ব নিয়ে ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভের কাজে যোগ দেন। সাত বছর সেখানে কাজ করে কলকাতায় ফেরেন। ১৯৬৩ সালে অবসরগ্রহণের আগে পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্র্যাফটে। ১৯৭১ সাল থেকে তিনি সোসাইটি অব কনটেম্পরারি আর্টের একজন সদস্য। অজন্তায় কাজ করার অভিজ্ঞতা হালুইকে ব্যাপক প্রভাবিত করেছে, ফলে তাঁর কাজে লিরিসিজমের ছোঁয়া পাওয়া যায়। হালুই অনেক মাধ্যমে কাজ করেছেন, প্রথম দিকে ল্যান্ডস্কেপে ফিগার পেইন্টিং করতেন। হারিয়ে যাওয়া এক জগতের জন্য এক ধরনের নস্টালজিয়া ঘুরে বেড়ায় এসব চিত্রে। একসময় হালুই অ্যাবস্ট্রাক্টেই মনোনিবেশ করেন।
(অনুবাদ : আদনান মনোয়ার হোসেন)

Leave a Reply

*