logo

ই য়ো কো হা মা ট্রি য়ে না লে ২ ০ ১ ৪ শিল্পীর দায়বদ্ধতা : পুরনো বিতর্কের পরিচ্ছন্ন নতুন উপস্থাপনা

ম ন জু রু ল  হ ক

শিল্পী কি সমাজের কাছে দায়বদ্ধ? দায়বদ্ধ হয়ে থাকলে কোন শর্তে এবং কেনই বা সেই দায়বদ্ধতা? প্রশ্নের চটজলদি উত্তর খুঁজে পাওয়া যে সহজ নয়, শিল্প আর সাহিত্যকে ঘিরে দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা বিতর্ক সেই প্রমাণ আমাদের দিচ্ছে। তারপরও থেমে নেই চলমান সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে কোনো এক পক্ষ অবলম্বন করা কিংবা প্রতিপক্ষকে যুক্তির মারপ্যাঁচে ঘায়েল করতে পারায় চালিয়ে যাওয়া নানারকম প্রচেষ্টা। শিল্প আর সাহিত্যের কাজ ঠিক কী – এ নিয়ে শিল্পের সমঝদার সমালোচক ও তাত্ত্বিকেরা তাঁদের ঠান্ডা লড়াই চালিয়ে গেলেও শিল্পী, কবি কিংবা ঔপন্যাসিক কিন্তু বসে নেই জয়-পরাজয়ের নিষ্পত্তি হওয়ার অপেক্ষায়। নিজস্ব সৃজনশীলতার জগতে তাঁরা মগ্ন আছেন সৃষ্টির নেশায়, যদিও দায়দায়িত্বের বোধ এঁদের মধ্যে যাঁরা অগ্রসর চিন্তার অধিকারী তাঁদের চেতনাকে পরোক্ষে হলেও তাড়িত করে। ফলে আমরা দেখি নতুন ভাবনাচিন্তার নানারকম  প্রকাশ তাঁদের সেই সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ফুটে উঠতে। আর এখানেই চলে আসে সেই চেতনাকে তুলে ধরা, কিংবা এর গভীরতাকে বুঝে ওঠায় সাহায্য করার লক্ষ্যে হাতে নেওয়া নানারকম  আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। সেরকমই একটি চমৎকার প্রয়াস সম্প্রতি দেখা গেছে জাপানের বন্দরনগরী ইয়োকোহামায় ত্রি-বার্ষিক আন্তর্জাতিক চারুকলা প্রদর্শনী ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালের আয়োজনে।

ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালের সূচনা একবিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরু থেকে। নতুন শতাব্দীতে চারুকলা কোন পথ ধরে এগিয়ে যাবে এবং গত শতাব্দীর নানারকম পরীক্ষা ও আন্দোলন নতুন সেই পথচলাকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, সেইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যেই সম্ভবত ত্রি-বার্ষিক এই আয়োজনের সূত্রপাত, পঞ্চম সংস্করণে এসে এ বছরের আয়োজন যেখানে আবারো আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত অতীতের সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, যার সার্বিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান চটজলদি খুঁজে পাওয়া সম্ভবত বাস্তবসম্মত নয়। এ কারণে তা বাস্তবসম্মত নয় যে সাহিত্যের সমাজদর্শনের বিপরীতে চারুকলার ক্ষেত্রে সামাজিক দায়দায়িত্ব অনুভব করার তাগিদ শিল্পীর মনের ভেতরে দেখা দেওয়া অনুরণন থেকে যতটা না উৎসারিত, তাত্ত্বিক ভাবনাচিন্তার আলোক থেকে ততটা নয়। আমাদের শিল্পাচার্য যৌবনে যখন অনাহারক্লিষ্ট ক্ষুধার্ত মানুষের ছবি অাঁকার অনুপ্রেরণা বোধ করেছিলেন, মনের তাগিদেই সেটা তিনি করেছিলেন, কোনোরকম শক্ত আদর্শগত অবস্থানের অনুসারী হয়ে নয়। একইভাবে পিকাসোর শান্তির সপক্ষে বলিষ্ঠ অবস্থানও ছিল অনেকটা যেন একই চেতনার ভিন্ন এক বহিঃপ্রকাশ, যদিও আমরা জানি পিকাসো ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কার্ডধারী সদস্য, অন্যদিকে শিল্পাচার্যের সঙ্গে কমিউনিস্ট মতাদর্শের সম্পর্ক ছিল নজরুলের সঙ্গে পার্টির গড়ে ওঠা সম্পর্কের মতোই এই আছি, এই নেই।

ইয়োকোহামার ত্রি-বার্ষিক আন্তর্জাতিক চিত্রকলা প্রদর্শনী এর সূচনার দিনগুলোতে ছিল অনেকটাই যেন পরিচয় হাতড়ে বেড়ানো এমন এক আয়োজন, চারুকলার নামে নানারকম উদ্ভট ঠাট্টা-তামাশাও যখন সেই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে সহজেই সেখানে ঢুকে পড়েছিল। মনে পড়ে দ্বিতীয়বারের আয়োজনে সেরকমই এক উদভট শিল্পকলার সাক্ষাৎ পাওয়ার কথা। সুদূর আয়ারল্যান্ড থেকে আমন্ত্রিত হয়ে আসা এক দম্পতি তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা ফ্ল্যাটে চালু রেখেছিলেন ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত একটি টেলিভিশন প্যানেল, যেখানে ফুটে উঠছিল তাঁদের তাৎক্ষণিক সব রকম তৎপরতার ছবি। আর এটাকেই তাঁরা চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন ‘উত্তর-আধুনিক’ এক শিল্পকলা হিসেবে। একদল সাংবাদিকের সঙ্গে মিলে কিম্ভূত সেই উত্তর-আধুনিক শিল্পকলা প্রত্যক্ষ করার দুর্ভাগ্য সেবার আমার হয়েছিল। শিল্পী দম্পতির কাছে আমি জানতে চেয়েছিলাম, প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিকতায় নিয়মিত আহার গ্রহণ থেকে শুরু করে শারীরিক প্রয়োজনের নানারকম কাজকেও তাঁরা শিল্প বলে মনে করেন কি না। আমার সেই প্রশ্নে রীতিমতো বিরক্ত বোধ করেছিলেন চারুকলার জগতে নিজেদের উত্তর-আধুনিকতার প্রতিনিধি দাবি করা সেই স্বামী-স্ত্রী। আমার তো মনে হয়
উত্তর-আধুনিকতার যে সংজ্ঞা বিদ্বজ্জনেরা আমজনতার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন, ফাঁকিটা হয়তো সেখানেই রয়ে গেছে। আর সে কারণেই আধুনিকতারও পরের এক আধুনিকতার যে ব্যাখ্যা আমাদের সামনে তুলে ধরার নানারকম অপপ্রয়াস বিশ্বজুড়ে নিজেদের বিদ্বজ্জন দাবি করা তাত্ত্বিকেরা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের সেই তত্ত্বের ফাঁকফোকর খুঁজে নিয়ে আইরিশ সেই দম্পতির মতো অনেকেই এর থেকে ফায়দা লুটে নেওয়ার চেষ্টায় মত্ত আছেন।

তবে এক যুগের অভিজ্ঞতা যে ইয়োকোহামার ত্রি-বার্ষিক প্রদর্শনীর আয়োজনে আগের চাইতে অনেক বেশি পরিপক্বতা এনে দিয়েছে, এবারের প্রদর্শনী মনে হয় সেই প্রমাণ দর্শকদের সামনে রাখতে পারছে। ফলে শিল্পকলার নামে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির ছাপ এবারের প্রদর্শনীতে যেমন অনুপস্থিত, সেইসঙ্গে আবার শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত অতীতের অমীমাংসিত নানারকম প্রশ্নও সেখানে এখন নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। শিল্পকলায় আধুনিকতা বলতে আমরা কী বুঝি, বিভ্রান্তিকর উত্তর আর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ভরপুর সেই বিষয়টিও বাদ যায়নি এর আওতা থেকে।

 

আগস্ট মাসের একেবারে গোড়া থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে নভেম্বরের ৩ তারিখ পর্যন্ত। ইয়োকোহামা শহরের ভিন্ন দুটি জায়গায় মূল প্রদর্শনী বসলেও এর সঙ্গে সম্পর্কিত নানারকম আয়োজন শহরজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে চলছে। ২০০১ সালে এর যাত্রা শুরুর দিনগুলো থেকে এখনকার এই সময় পর্যন্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনেকটা যেন অনিশ্চিত এক পথ ধরে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে, যে পথ একইভাবে হচ্ছে নিরন্তর পরিবর্তনশীল এক পথ, ভবিষ্যৎ যেখানে অনেকটাই অজানা এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন। বিশ্ব রাজনীতির নাটকীয় সব পালাবদল আর অর্থনৈতিক সংকটের ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি মনে হয় সেই অনিশ্চিত যাত্রাপথের ছবি আরো পরিষ্কারভাবে আমাদের চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে। সেরকম এক পরিস্থিতিতে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক, বিশ্বের সঙ্গে জাপানের সম্পৃক্ততা এবং নানারকম অবস্থান থেকে শিল্পের সামাজিক ভূমিকা পর্যালোচনা করে দেখার লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালে। তবে শুরুতেই যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, উদ্দেশ্য পরিষ্কার থেকে গেলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন কীভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব তা নিয়ে বিভ্রান্তি আর দোলাচল দেখা দেওয়ায় প্রতিটি আয়োজনে এর যথাযথ উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। এবারে ২০১৪-এর আয়োজন মনে হয় সেই বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে অনেকটাই সমর্থ হয়েছে।

বড়মাপের আন্তর্জাতিক চারুকলা প্রদর্শনীর মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কী রকম হবে এবং বক্তব্যের বলিষ্ঠতা কতটা বাস্তবসম্মত ও কার্যকরভাবে এর মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হবে, এসবের অনেকটাই নির্ভর করে শৈল্পিক পরিচালক হিসেবে কাকে বেছে নেওয়া হয় তার ওপর। নানারকম বিবর্তন আর সংকটের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া জাপানি সমাজে ২০১১ সালে ঘটে যাওয়া একাধিক দুর্যোগ মানুষের জীবনযাত্রা ও চিন্তাভাবনা নতুনভাবে পর্যালোচনা করে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে বলে এই দেশে অনেকে এখন মনে করছেন। বিশেষ করে ফুকুশিমা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুর্ঘটনা ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সহজ জীবনের সনাতন ধারণাকে অনেকটাই গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং সেইসঙ্গে বদলে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর মানুষের অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়ার অতীতের প্রচলিত ধারাকে। ফলে ভেতর থেকে এতটা ব্যাপকভাবে বদলে যাওয়া সমাজে মানুষ এখন তাদের জীবন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাবছে, কোন সে প্রেরণা যা কি না এই সংকটকালীন সময়েও তাদেরকে অনুপ্রাণিত করছে সৃজনশীল চেতনাকে ধরে রাখতে, এসব জটিল প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে সৃজনশীলতার সঙ্গে সরাসরি যাঁরা সম্পর্কিত, সেই শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি আর বুদ্ধিবৃত্তির অন্যান্য শাখার মানুষের পোষণ করা ব্যতিক্রমী ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধানলাভের চেষ্টা চালানো যে দরকার, সেই বাস্তবতা এখন অনেকেই অনুধাবন করতে পারছেন। ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালের এবারের প্রদর্শনীর আয়োজকরাও নিশ্চয় মনে করে থাকবেন যে সেই উদ্যোগ নেওয়ার এখনই হচ্ছে সঠিক সময়। আর সেরকম ধারণা থেকেই শিল্পী ইয়াসুমাসা মোরিমুরাকে ২০১৪ সালের প্রদর্শনীর শৈল্পিক পরিচালক হিসেবে তাঁরা বেছে নিয়েছেন।

ইয়াসুমাসা মোরিমুরার জন্ম পশ্চিম জাপানের ওসাকা শহরে ১৯৫১ সালে। আত্মপ্রতিকৃতিভিত্তিক কাজের মধ্যে দিয়ে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে উপস্থাপন করা ব্যতিক্রমী কিছু শৈল্পিক অবদানের মধ্যে দিয়ে ১৯৮৫ সালে নতুন ধারার শিল্পী হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। ছবি ও ভিডিওভিত্তিক একাধিক আত্মপ্রকৃতি তিনি এঁকেছেন এবং এরকম নতুনত্বের মধ্যে দিয়ে নিজের ব্যতিক্রমী সৃজনশীলতার প্রকাশ তিনি শিল্পানুরাগীদের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন। ফলে ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালের শৈল্পিক পরিচালক পদে তাঁর নিয়োগ যে প্রদর্শনীতেও নতুনত্বের ছোঁয়া নিয়ে আসবে, শুরু থেকেই সেই আভাস পাওয়া যাচ্ছিল, প্রদর্শনীর উদ্বোধনীর পর যে বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ দর্শকদের মনে দেখা দেয়নি। প্রদর্শনীর থিম বা মূল বিষয়বস্ত্ত বেছে নেওয়া থেকে শুরু করে শিল্পী নির্বাচন এবং প্রদর্শিত বিষয়াবলির বিন্যাস, সবকিছুতেই নতুনের ছোঁয়া চোখে পড়লেও একইসঙ্গে বলিষ্ঠ সনাতনী ধারণার উপস্থিতিও নজর এড়িয়ে যায় না।

সমগ্র প্রদর্শনীর একক থিম হিসেবে এর যে নামকরণ মোরিমুরা বেছে নিয়েছেন, সেটা অবশ্য তাঁর নিজের দেওয়া কোনো নাম নয়, বরং বিখ্যাত একটি উপন্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা নামকরণ। উপন্যাসটি হলো রে ব্র্যাডবেরির ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিভিত্তিক উপন্যাস ফারেনহাইট ৪৫১। মোরিমুরা অবশ্য সেই নামকরণকে কিছুটা ভেঙে নিয়েছেন এবং এর সঙ্গে দ্বিতীয় একটি অংশ জুড়ে দিয়েছেন। ফলে প্রদর্শনীর সম্পূর্ণ নামকরণ হয়ে উঠেছে ‘আর্ট ফারেনহাইট ৪৫১ : বিস্মৃতির সাগরে ভেসে বেড়ানো’। মার্কিন লেখক রে ব্র্যাডবেরির বিখ্যাত সেই উপন্যাসের সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা জানেন বইপত্র নিষিদ্ধকরণের মধ্যে দিয়ে চিন্তার স্বচ্ছতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা হচ্ছে গল্পের পেছনের কাহিনি। পুরো প্রদর্শনীকে মোরিমুরা সাজিয়েছেনও অনেকটা বইয়ের আকার দিয়ে, যে বইয়ে আছে দুটি মুখবন্ধ বা ভূমিকা এবং এগারোটি অধ্যায়। এই কাঠামোর ভেতরেই স্থান পেয়েছে ১৯টি দেশের ৬৫ জন শিল্পীর শিল্পকর্ম। এর বাইরে ফুকুওকা এশীয় চারুকলা জাদুঘরের স্থায়ী সংরক্ষণের যে কয়েকটি কাজ এই প্রদর্শনীতে দেখানো হচ্ছে, বাংলাদেশের ভিডিও আর্ট শিল্পী ইয়াসমিন কবিরসহ আরো কয়েকটি দেশের শিল্পী সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকছেন (মঈনুল শাওনের ভিন্ন রচনা দেখুন)।

প্রদর্শনী থেকে ঠিক কী আমরা প্রত্যাশা করতে পারি, শুরুতেই সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে মোরিমুরা তা পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন, আর তাঁর সেই বক্তব্য ছাপা হয়েছে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক গাইড বুকে। সেখানে তিনি বলছেন, ‘শিল্প হচ্ছে ব্যক্তির দৃষ্টিকে বিস্মৃতির জগতে রূপান্তরিত করে দেওয়ার এক মাধ্যম। এর অতিপ্রাকৃত সেই ক্ষমতা হচ্ছে এরকম, যা কি না ভুলে যাওয়া প্রতিটি বিষয়, অবহেলিত, হেলায় উপেক্ষিত, কিংবা কেবলই দৃষ্টির আড়ালে রয়ে যাওয়া সবকিছু নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারার শক্তি আমাদের মধ্যে এনে দেয়।’

শিল্পের যে অভিযাত্রায় প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁর সঙ্গী হচ্ছি, সেটা যে স্মৃতির জগতে জায়গা করতে না পেরে কোথাও হারিয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়া কোনো কিছুকে নতুনভাবে খুঁজে পাওয়ার এক চেষ্টা, সেকথাও আমরা জেনে যাই প্রদর্শনীর একেবারে শুরু থেকে।

ইয়োকোহামা নগরীর পরিচিত যে দুটি ভবনে মূল প্রদর্শনীর আয়োজন বসেছে, তার একটি হচ্ছে ইয়োকোহামা চারুকলা জাদুঘর। সেখানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে প্লাস্টিকের স্বচ্ছ আধারে ঢেকে রাখা বিশাল একটি বাক্স, প্রায় ছাদ পর্যন্ত যেটা উঠে গেছে। মোরিমুরা এটাকে আখ্যায়িত করেছেন বইয়ের দ্বিতীয় ভূমিকা হিসেবে, কেননা এর আগেই ভবনের প্রবেশপথ এবং কিছুটা দূরে যে আরো দুটি শিল্পকর্ম রাখা আছে, তাঁর দেওয়া ব্যাখ্যায় সেগুলোকে তিনি বলছেন বইয়ের প্রথম ভূমিকা। দুই ভূমিকাই প্রদর্শনীর মূল বিষয়বস্ত্তকে সহজে সামনে নিয়ে আসতে সাহায্য করছে। দ্বিতীয় ভূমিকার ইনস্টলেশন আর্ট, যেটা রাখা আছে চারুকলা জাদুঘরে প্রবেশের ঠিক মুখে, এর স্রষ্টা হলেন ব্রিটিশ শিল্পী মাইকেল ল্যান্ডি। আর্ট বিন বা শিল্পের আবর্জনা ফেলার বাক্স নামের এই কাজটি সৃষ্টির বিপরীতমুখী দিকটিকে তুলে ধরার একটি প্রয়াস মাত্র। অর্থাৎ একজন নিষ্ঠাবান শিল্পীর প্রতিটি টিকে থাকা কাজের পেছনে অনাকাঙ্ক্ষিত, ফেলে দিতে হওয়া যেসব আবর্জনা তৈরি হয়, তারই প্রতিনিধিত্ব করছে মাইকেল ল্যান্ডির ব্যতিক্রমী এই কাজ। এছাড়া একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর পেছনে যে রয়ে গেছে আরো অনেক হারিয়ে যাওয়া ব্যর্থ শিল্পী, সেই বাস্তবতাকেও আর্ট বিন আমাদের সামনে তুলে ধরছে। প্রদর্শনীর আয়োজকরা এই ইনস্টলেশনকে ঘিরে উন্মুক্ত একটি আহবান সকলের প্রতি জানিয়েছেন, আর তা হলো – যে কেউ পরিত্যক্ত যে-কোনো শিল্পকর্ম নিয়ে এসে সেখানে ফেলে যেতে পারেন। এই আহবানে সাড়াও মিলছে যথেষ্ট।

অন্যদিকে প্রদর্শনী হলের বাইরে রাখা দুটি কাজ মিলিয়ে একত্রে তৈরি হয়েছে বইয়ের প্রথম ভূমিকা। এর একটি হচ্ছে বেলজিয়ামের শিল্পী উইম ডেলভোয়ার ফ্ল্যাটবেড ট্রেইলর, আর অন্যটি হলো কোরীয় শিল্পী কিম হং-সকের ফোলানো বেলুনের মতো দেখা যাওয়া কিম্ভূত এক চরিত্র, যার পাশে পড়ে আছে আবর্জনা বলে মনে হওয়া দুটি প্যাকেট। দেখতে বেলুনের মতো মনে হলেও এই ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে কিন্তু পেটানো মূল্যবান ধাতু ব্রোঞ্জ দিয়ে। ‘কোন সে বিষয় যা কি না বস্ত্তকে শিল্পে রূপান্তরিত করে?’ – প্রশ্নবোধক এই নামকরণের ব্রোঞ্জের সেই ভাস্কর্যের মধ্যে দিয়ে দর্শকদের সামনে ঠিক সেই প্রশ্নই রাখছেন কোরীয় শিল্পী। অন্যদিকে বেলজিয়ামের শিল্পীর ফ্ল্যাটবেড ট্রেইলার তৈরি করা হয়েছে মর্চে ধরা লোহা দিয়ে। পনেরো মিটার দীর্ঘ সেই যানটিকে প্রথম দেখায় খোলা কোনো জায়গায় বসানো নাগরিক চারুকলার একটি নিদর্শন হিসেবে ভ্রম হতে পারে। তবে কাছে গিয়ে দেখলে বোঝা যায়, শিল্পী কেবল দীর্ঘ একটি যান্ত্রিক বাহনই তৈরি করেননি, বরং সেটার মধ্যে দিয়ে আরো অনেক কিছু আমাদের তিনি বলতে চেয়েছেন। এর প্রতিটি বিভাজন, প্রতিটি   স্তরে গোথিক রীতির নিপুণ কাজের চমৎকার উপস্থাপনা কাছের দৃষ্টিতে সহজেই চোখের সামনে ফুটে ওঠে। ফলে এখানেও সেই একই প্রশ্ন কিছুটা ভিন্নভাবে উত্থাপন করা হয়েছে, যে প্রশ্ন হলো, ‘কোন সে বিষয় যা কি না বস্ত্তকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যায়?’ সে কি এর একক সার্বিক আবেদন, নাকি বিচ্ছিন্ন বিভিন্ন অংশে ফুটে ওঠা সৌন্দর্য। প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখার দায়িত্ব শিল্পী তাঁর সৃষ্টির দিকে চোখ মেলে তাকানো দর্শকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।

ভিন্ন দুটি ভূমিকা প্রদর্শনীর বিষয়বস্ত্ত সম্পর্কে পরিষ্কার কিছু ধারণা দর্শকদের দেওয়ার পর জাদুঘরের প্রবেশপথে রাখা আর্ট বিন পার হয়ে গিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে দর্শকরা পৌঁছে যাবেন মোরিমুরার এগারো অধ্যায়ের বইয়ের ভেতরের মূল বাণীতে, যা শুরু হয়েছে বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নের রুশ আভাঁ গার্দ শিল্পী কাজিমির মালেভিচের ছোট দুটি কাজের মধ্যে দিয়ে। মালেভিচকে গণ্য করা হয় বিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের প্রধান এক শিল্পী হিসেবে, যদিও সোভিয়েত নাগরিকত্বের কারণে এবং মার্ক্সবাদী মতবাদের প্রতি আস্থাশীল থাকায় পশ্চিমের পক্ষপাতদুষ্ট শিল্প-সমালোচকরা দীর্ঘ সময় ধরে ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁর প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার মনোভাব দেখিয়েছেন, যে অবস্থার পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন অস্তিত্ব-লুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর থেকে। গত বছরের শেষ দিক থেকে এ বছরের এই সময় পর্যন্ত ইউরোপের তিনটি নামি শিল্পকলা জাদুঘর – আমস্টারডামের স্টেডেলিক মিউজিয়াম, বনে জার্মান ফেডারেল প্রজাতন্ত্রের আর্ট অ্যান্ড এক্সিবিশন হল এবং লন্ডনের টেট মডার্নে মালেভিচের প্রদর্শনীর বিশেষ আয়োজন শতবর্ষ আগের অত্যন্ত প্রতিভাবান এই শিল্পীর পরিচয় নতুন করে তুলে ধরছে। সেদিক থেকে মনে হয় স্বল্প আকারে হলেও জাপানের ইয়োকোহামায় মালেভিচের আগমন ট্রিয়েনালের আয়োজনকে আরো অনেক বেশি পরিপূর্ণ করে তুলেছে।

কাজিমির মালেভিচের শিল্পীজীবনে চারটি ভিন্ন পর্যায় পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠতে দেখা যায়। বিংশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ায় ফবিস্ট ধারার কাজের মধ্যে দিয়ে ইউরোপের সেই সময়ের চারুকলার জগতে মালেভিচের প্রবেশ, পরবর্তীকালে যে ধারা থেকে ক্রমশ সরে গিয়ে তিনি সিম্বলিজম এবং ইম্প্রেশনিস্ট স্টাইলে ছবি অাঁকতে শুরু করেন। শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ইউরোপ ক্রমশ সংঘাতময় এক পথ ধরে যাত্রা শুরু করার দিনগুলোতে তাঁকে দেখা যায় কিউবিস্ট-ফিউচারিস্ট সংমিশ্রণে অত্যন্ত বলিষ্ঠ কিছু কাজ নিয়ে উপস্থিত হতে। কিউবিক ধারায় ছবি অাঁকলেও ছবির বিষয়বস্ত্ত হিসেবে সাধারণ মানুষের জীবনকে তুলে আনায় সেইসব ছবিতেও ব্যতিক্রমী প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি রাখতে পেরেছিলেন। এছাড়া মালেভিচের কিউবিক ছবির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বিমূর্ত ধারার কাজ হলেও একাধিক প্রতিফলন পাশাপাশি তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে গতিময়তার চমৎকার প্রকাশ যতটা সাফল্যের সঙ্গে তিনি তাঁর ছবিতে তুলে ধরতে পেরেছেন, অন্য কোনো কিউবিস্ট শিল্পীর পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তবে উত্তরণ যেহেতু হচ্ছে সত্যিকার অর্থে প্রতিভাবান শিল্পীদের শিল্পীজীবনের খুবই স্বাভাবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ এক বৈশিষ্ট্য, কাজিমির মালেভিচকেও তাই বারবার দেখা গেছে অনেকটা যেন নিয়মিতভাবে স্টাইল বদল করে নিয়ে নতুন ধারায় ছবি অাঁকায় নিয়োজিত হতে। কিউবিস্ট শিল্পী হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে থাকা অবস্থায় নিজের উদ্ভাবিত নতুন সুপারম্যাটিস্ট রীতিতে তিনি সরে আসেন এবং রঙের ব্যবহার প্রায় পুরোপুরি এড়িয়ে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কালো এবং সেইসঙ্গে কখনো কখনো কেবল সাদা রং ব্যবহার করে তিনি ছবি অাঁকতে শুরু করেন। কালো রঙে অাঁকা বিমূর্ত আকারের সব আকৃতি এর প্রকাশের বলিষ্ঠতা আর বিশুদ্ধতার দিক থেকে ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ছবিকে তিনি যেন রঙের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে এনে বিশুদ্ধ এক শূন্যতায় ছেড়ে দিতে চেয়েছেন। সাদার ভেতরে সাদায় অাঁকা একটি ছবি হচ্ছে এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, মালেভিচ নিজে যেটা সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘রংগুলোকে এখান থেকে আমি এক এক করে তুলে নিয়েছি, ছবিতে ফুটে ওঠা আকৃতির ব্যাগের ভেতরে সেগুলো ঢুকিয়ে দিয়ে তারপর শক্ত এক গিঁট সেখানে আমি বেঁধে দিয়েছে। ভেসে যাও! সাদা, মুক্ত এক গভীরতা, অনন্ত এখন আপনার সামনে উপস্থিত।’

নিজের সেইসব কাজের ভেতরে এভাবেই ভাবের বিশেষ কোনো প্রকাশ তুলে না ধরে বরং দর্শকদের নিজেদের মতো করে তা বুঝে নেওয়ার লক্ষ্যে অাঁকা মালেভিচের ‘নীরব ছবি’ হচ্ছে এসব শিল্পকর্ম। তবে শিল্পের নামে বেলেল্লাপনা যে সেগুলো কোনো অবস্থাতেই নয়, মালেভিচের আগের আর পরের কাজ তার প্রমাণ আমাদের দিয়ে থাকে। ১৯৩৫ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার কয়েক বছর আগে আরো একবার তিনি ফিরে গিয়েছিলেন বাস্তববাদী ধারায় এবং সেই সময়ে অাঁকা মা, স্ত্রী আর কন্যার প্রতিকৃতি আমাদের আবারো বলে দেয় কতটা গভীর প্রতিভার অধিকারী ছিলেন পোলিশ বংশোদ্ভূত এই রুশ শিল্পী।

ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালেতে মালেভিচের যে দুটি ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে, সেগুলো হচ্ছে তাঁর সুপারম্যাটিস্ট ধারার প্রতিনিধিত্বশীল ছবি। মালেভিচের নীরব সেইসব ছবির কাছেই আছে ‘নীরব সংগীতে’র স্রষ্টা হিসেবে পরিচিত গত শতাব্দীর প্রথমার্ধের মার্কিন শিল্পী জন কেইজের কয়েকটি কাজ। এরপর স্পেন, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানের প্রতিষ্ঠিত ও নামি কিছু শিল্পীর অাঁকা বিমূর্ত ছবি পার হয়ে দর্শকরা একসময় পৌঁছে যাবেন বিংশ শতাব্দীর আরেক খ্যাতিমান শিল্পী, বেলজিয়ামের রেনো মাগ্রিতের কয়েকটি ব্যতিক্রমী কাজের সামনে। ব্যতিক্রমী এগুলো এ কারণে যে এসব হচ্ছে মাগ্রিতের নিজের তোলা অদ্ভুত কিছু ফটোগ্রাফির কোলাজ, যে ছবিগুলো তিনি তুলেছিলেন পরবর্তীকালে সেই ভাবধারা অনুসরণ করে ছবি অাঁকার উদ্দেশ্য নিয়ে।

রেনো মাগ্রিতের ছোট আকারের সাদা-কালো ছবি পার হয়ে গিয়ে ঠিক পাশের কক্ষে কালো পর্দা টেনে দেওয়া অন্ধকার এক জায়গায় দর্শকরা এসে উপস্থিত হবেন। যে শিল্পকর্ম সেখানে স্থান পেয়েছে, চোখে দেখে অাঁচ করতে পারার কাজ সেটা নয়। তবে এর স্রষ্টা হলেন বেলজিয়ামে জন্মগ্রহণকারী আরেক বিখ্যাত শিল্পী মার্সেল ব্রুথার্স, কবি হিসেবেও যিনি সুপরিচিত। ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পী হচ্ছেন রেনো মাগ্রিতের পরের প্রজন্মের প্রতিনিধি, অনেকটা পরিণত বয়সে, ১৯৬৩ সাল থেকে যিনি তাঁর সৃজনশীলতার গন্ডি সম্প্রসারিত করে নিয়ে চারুকলা সামগ্রীর পাশাপাশি ফটোগ্রাফি এবং স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র নির্মাণে জড়িত হয়েছিলেন। ব্রুথার্সের যে কাজটি সেই অন্ধকার জায়গায় স্থান পেয়েছে, সেটি হচ্ছে অডিওতে ধারণকৃত এক সংলাপ – শিল্পী যেখানে কথা বলছেন তাঁর পোষা বিড়ালের সঙ্গে। এর বাইরে বাড়তি কিছু সেখানে নেই। কথাবার্তা চলছে মূলত ফরাসি ভাষায়, আংশিক ইংরেজি সংলাপও সেখানে অন্তর্ভুক্ত। চারুকলার, বিশেষ করে বিমূর্ত ছবির নামে চারুকলার যেসব নিদর্শন দেশ-বিদেশের নির্বোধ অথচ বিত্তবান ক্রেতাদের হাতে গছিয়ে দিচ্ছেন ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন চতুর শিল্পীরা, সেই প্রবণতা এবং বিমূর্ত ছবি অাঁকার নামে অনেকটা যেন বাঁদরামো করে বেড়ানো শিল্পীদের লক্ষ্য করে চাবুক হেনেছেন ব্রুথার্স তাঁর সেই বিড়ালের সঙ্গে কথোকপথনে (বক্স দেখুন)। বলা বাহুল্য, বিমূর্ত শিল্পকলা নিয়ে আশাবাদী আমি নিজেও একেবারেই নই। জীবদ্দশায় ইতিবাচক প্রচারণার কল্যাণে অতিমাত্রায় মূল্যায়ন পাওয়া এইসব শিল্পী কতটা কালোত্তীর্ণ হবেন, সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। এর মূল কারণ হলো মাটির সঙ্গে সেইসব শিল্পীর সম্পর্কহীনতা। উত্তরণের ধারেকাছে না গিয়ে শুধুমাত্র রঙের খেলাকে দেশজ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সময়ের কঠোর মাপকাঠির ছাঁকনিতে যে আটকা পড়ে যেতে বাধ্য, কাজিমির মালেভিচের ফিরে আসা তো সেকথাই বলছে।

প্রদর্শনীর ইয়োকোহামা চারুকলা জাদুঘরের অংশের পুরোটা জুড়ে আরো স্থান করে নিয়েছে সমকালীন শিল্পীদের নজরকাড়া কিছু কাজ। এসবের মধ্যে জীবিত ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নামকরণে মার্কিন শিল্পী টারিন সাইমনের ছবি ও ফটোগ্রাফির মিশ্রণে করা অসাধারণ একটি কোলাজ সহজেই দর্শকের নজর কেড়ে নেয়। এছাড়া আরো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে আছে ইরাকি-ইহুদি বংশোদ্ভূত আরেক মার্কিন শিল্পী মাইকেল রাকোউইচের ‘কোন সে ছাইভস্ম উঠে আসবে?’ নামে পাথরের দুটি বই। বইয়ের জন্য যে পাথর তিনি ব্যবহার করেছেন, সেটা হলো আফগানিস্তানের বামিয়ানে তালিবানের ধ্বংস করে দেওয়া গেŠতম বুদ্ধের প্রাচীন মূর্তির অংশবিশেষ। স্বচ্ছ কাচের একটি টেবিলের ওপর পাশাপাশি রাখা বই দুটির সঙ্গে তালিবান নেতা মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের উদ্ধৃতি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা কি না বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তালিবান নেতা সেখানে বলেছেন, ‘বামিয়ানের মূর্তি আমি ধ্বংস করতে চাইনি। আসলে বিদেশি কিছু লোক আমার কাছে এসে বলেছিল যে বৃষ্টির পানিতে ক্ষতি হওয়া সেইসব মূর্তি তারা মেরামত করতে আগ্রহী। এতে আমি দুঃখ পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল নিষ্ঠুর সেইসব মানুষের ক্ষুধার যাতনায় মৃতপ্রায় জীবিত আফগানদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ নেই, অন্যদিকে বুদ্ধ মূর্তির মতো নিষ্প্রাণ কোনোকিছুর জন্য এতটাই তারা মর্মাহত। সেটা ছিল খুবই দুঃখজনক। এ কারণেই বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করার নির্দেশ আমি দেই। মানবিক কাজে জড়িত হওয়ার জন্য তারা এসে থাকলে বুদ্ধের মূর্তি ধ্বংসের আদেশ আমি কখনো দিতাম না।’

সেই একই প্রদর্শনী কক্ষে বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তির পাথর থেকে তৈরি করে নেওয়া বইয়ের ঠিক পাশে থাক দিয়ে রাখা আছে পেপারব্যাক সংস্করণে ছাপা একই বইয়ের অনেকগুলো কপি। স্পেনের শিল্পী দোরা গার্সিয়ার কাজ এটা। সব কটি বই হচ্ছে ফারেনহাইট ৪৫১-র স্প্যানিশ ভাষার সংস্করণ। তবে ছাপা হয়েছে উলটোভাবে, যা কি না কেবল আয়নায় ফুটে ওঠা প্রতিফলনের মধ্যে দিয়েই পাঠ করা সম্ভব। ভাষার দূরত্ব অতিক্রম করে একে অন্যকে বুঝতে পারার সম্ভাবনার ইঙ্গিত শিল্পী তাঁর এই কাজের মধ্যে দিয়ে দিয়েছেন। ফারেনহাইট ৪৫১-এও তো নিয়মিতভাবে বই পুড়িয়ে ফেলা এক সমাজের কথা বলা হয়েছে, প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ নিজেই যখন বইয়ের পুরো পাঠ স্মৃতিতে ধরে রেখে নিজেরাই তারা প্রত্যেকে একেকটি বই হয়ে উঠেছিল। অবাস্তব মনে হওয়া সেরকম এক সমাজের কঠিন বাস্তবতার কথাই দোরা গার্সিয়া তাঁর সেই ইনস্টলেশন আর্টের মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়েছেন।

 

পাথরের বই আর উলটোভাবে ছাপা বইয়ের পাশে কাঠের ঘের দেওয়া একটি জায়গা আছে, যেটা দেখতে অনেকটা আদালতের কাঠগড়ার মতো। কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে এর ওপরে উঠে গেলে খোলা অবস্থায় বই রাখার বিশেষ একটি রেকাবের ওপরে রাখা আছে আরেকটি বই। আকারে সেটা বেশ বড় এবং বিভিন্ন ভাষায় লেখা কিছু পাঠ ও ছবি হচ্ছে সে বইয়ের প্রধান আকর্ষণ। একটিমাত্র বই সেটা হলেও পুরো প্রদর্শনীর বৈশিষ্ট্য মনে হয় সব দিক থেকেই খুবই ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলছে সেই বই। জাপানি ভাষায় বইটির নামকরণ করা হয়েছে ‘মোয়ে নাই কোতো বা,’ বাংলা অনুবাদে যার অর্থ দাঁড়াবে ‘যে কথা আগুনে পুড়ে না’। প্রদর্শনীর মূল থিমের সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ এই নামকরণ। মূল ভাষার পাঠ সেখানে সংযুক্ত রয়েছে আটটি এবং সেই সব কটি লেখাই এ কারণে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে, অতীতের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন মহলের কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হওয়া সেইসব পাঠকে ভুলিয়ে দেওয়া প্রভাবশালীদের পক্ষে আদৌ সম্ভব হয়ে ওঠেনি। লোকমুখে প্রচলিত হওয়ার মধ্যে দিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কেবল টিকেই থাকেনি সেইসব রচনা, বরং একইসঙ্গে নিপীড়িত জনতাকে তা করেছে অনুপ্রাণিত, তাদেরকে দিয়েছে বেঁচে থাকার শিক্ষা।

আমাদের বঙ্গভাষীদের জন্য পরম তৃপ্তির একটি বিষয় হলো অসাধারণ সেই গ্রন্থে বাংলা ভাষার একটি বিখ্যাত কবিতার জায়গা করে নেওয়া। কবিতাটি হচ্ছে কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’, অতীতে একসময় ব্রিটিশ প্রশাসনের রোষানলে যে কবিতাকে পড়তে হয়েছিল। ইয়োকোহামার সেই আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে রাখা বিশেষভাবে ছাপা হওয়া একটি বইয়ে অন্যান্য ভাষার কয়েকটি রচনার পাশাপাশি বাংলা ভাষায় নজরুলের কবিতা পাতা উলটে দেখা তৃপ্তির এক অনুভূতি মনে এনে দেয়।

ভিন্ন ভাষার অন্য সাতটি রচনার মধ্যে আছে রুশ কবি আন্না আখমাতোভার একটি কবিতা, স্তালিন ক্ষমতাসীন থাকার সময় যেটা নিষিদ্ধ ঘোষিত হলেও মানুষের স্মৃতিতে থেকে গিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকে গিয়েছিল সেই কবিতা। আরো আছে ওকিনাওয়ার কবি নাকাইয়া কোকিচির কবিতা ‘শেষ নোট’, অস্ট্রিয়ার নাট্যকার এলফ্রিডে ইয়েলিনেকের একটি নাটক এবং থাইল্যান্ডের নিহত কবি ও রাজনৈতিক কর্মী চিত ফুমিসাকের একটি কবিতা। সব রচনার সঙ্গেই প্রদর্শনীর মূল বিষয়বস্ত্ত বিস্মৃতির আছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এছাড়া যেসব ছবি এতে ছাপা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে রুশ শিল্পী ভেরা মিলুতিনার অাঁকা সাংকত পিতারবুর্গের হেরমিটেজ আর্ট গ্যালারির খালি দেয়াল। নাৎসি বাহিনীর হামলার আশঙ্কায় সব ছবি নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার পর খালি দেয়ালের সেই ছবি এঁকেছিলেন শিল্পী। এছাড়া আরো আছে কোরীয় শিল্পী কিম ইয়ং-গিক এবং জাপানি শিল্পী মাৎসুই চিয়ের অাঁকা কয়েকটি ছবি।

আয়োজকরা বইটির ভিন্ন যে আরেকটি নাম দিয়েছেন সেটা হলো বিশ্বের একমাত্র বই। বইয়ের ডিজাইন করেছেন কাজুও ওয়াতানাবে এবং এর বাঁধাইয়ের কাজে জড়িত ছিলেন আরেক শিল্পী তোশিও ওহিয়ে। বিশ্বের একমাত্র বই এটাকে এ কারণে বলা হচ্ছে যে এর একটিমাত্র কপি ছাপা হয়েছে, এবং সেটা ছাপা হয়েছে শুধুমাত্র প্রদর্শনীতে রাখার জন্য।

মানুষের চিন্তার প্রকাশকে যে শত চেষ্টা করেও দাবিয়ে রাখা যায় না, ‘আগুনে না পোড়া কথা’র সেই বই হচ্ছে তার প্রমাণ। নজরুলের বিদ্রোহীকে যেমন চেষ্টা করেও ভুলিয়ে দিতে পারা সম্ভব হয়নি, একইভাবে সম্ভব হয়নি আমাদের ঘরের পাশের থাইল্যান্ডের বামপন্থী বিপ্লবী চিত ফুমিসাকের লেখা বিভিন্ন রচনাকে বিস্মৃতির অন্ধকারে ফেলে দেওয়া। থাইল্যান্ডের এই কবি তাঁর স্বল্পকালীন জীবনে লিখেছেন খুব কম। তবে দেশের একজন নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

বইটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রদর্শনীর শেষ দিন, অর্থাৎ নভেম্বরের ৩ তারিখে বিশেষ এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এটিকে পুড়িয়ে ফেলা হবে এবং এর মধ্যে দিয়ে হারিয়ে যাবে বিশ্বের একমাত্র সেই বই। প্রদর্শনীর মূল থিমের সঙ্গে সংগতি রেখে সেই উদ্যোগ আয়োজকরা নিতে চাইছেন। যেহেতু চিন্তার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারার অশুভ তৎপরতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে পরোক্ষে ব্যক্ত করা হচ্ছে, ফলে বই পোড়ানোর সেই আয়োজনও অনেকটা যেন রূপক অর্থে গ্রন্থের বহ্নিশিখায় চিন্তার স্বাধীনতাকে আবদ্ধ রাখায় চালানো যাবতীয় প্রচেষ্টার অসারতাকেই তুলে ধরবে। কেননা একমাত্র সেই বইটিতে অন্তর্ভুক্ত সব কটি লেখা ও ছবি তো নিজে থেকেই সেই প্রমাণ আমাদের সামনে তুলে ধরছে। অতীতের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতা-মাতাল শক্তিধরদের চালানো নানারকম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সেইসব লেখার কোনো একটিরও অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দেওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে আবার আনুষ্ঠানিকভাবে আগুনে পোড়ানো হলেও বইয়ে অন্তর্ভুক্ত সব কটি লেখার যে বক্তব্য, তা তো আর হারিয়ে যাচ্ছে না।

 

ইয়োকোহামা চারুকলা জাদুঘরের বিস্তৃত পরিসরে বেশ কয়েকটি ইনস্টলেশন আর্টও জায়গা করে নিতে পেরেছে। সেরকম একটি শিল্পকর্ম হচ্ছে জাপানি শিল্পী মিচিও ফুকুওকার বেলুন আর মানুষের
বাস্তবতার বিপরীত অবস্থানের প্রতিফলন। একটি প্রদর্শনী কক্ষের ঠিক মাঝখানটা জুড়ে বসানো আছে এটা, যেখানে ছাদ থেকে ঝুলে আছেন একজন মানুষ এবং তাঁর ধরা রজ্জুর মাথায় বাঁধা আছে মেঝেতে পড়ে থাকা বড় এক বেলুন। শিল্পী তাঁর এই কাজের নাম দিয়েছেন ‘কেন আমি উড়ে যাই?’ প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যেই হয়তো ফুটে উঠছে বৈপরীত্যের প্রকাশ। ছাদে ঝুলে থাকা সেই মানুষটি কি আসলেই উড়ছে, নাকি বেলুনের উড়ে যাওয়ার সামর্থ্যের সামনে অসহায় আমরা আমাদের কল্পনায় দেখছি নিজেদের উড়ে যেতে?

রঙের বাহারি ব্যবহার আর উপস্থাপনার চাকচিক্যের দিক থেকে ইনস্টলেশন আর্টের অন্য যে তিনটি কাজের একক একটি সমন্বয় সহজে নজর কেড়ে নেয়, সেটার নাম রাখা হয়েছে টেম্পোরারি ফাউন্ডেশন বা অস্থায়ী ভিত্তি। যে শিল্পী বা শিল্পী দলের কাজ এটা, তাঁরা থেকে গেছেন দৃষ্টির বাইরে। নাম, জাতীয়তা, ঠিকানা কিংবা ব্যক্তিপরিচয় – কাজটি যিনি করেছেন সেই স্রষ্টার সম্পর্কে এসবের কিছুই আমরা জানতে পারি না। লাল রঙের একটি আদালত কক্ষ, সবুজ টেনিস কোর্ট আর কালো কারাগার – এই তিনের সমন্বয় হচ্ছে টেম্পোরারি ফাউন্ডেশন, শিল্পীর পরিচিতি হিসেবেও একই যে নাম ব্যবহার করা হয়েছে। প্রদর্শনী চলার সময়ে পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভিন্ন পাঁচটি আলোচনা লাল রঙের সেই আদালত কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে, যেগুলোর সার্বিক নামকরণ করা হয়েছে ‘ইয়োকোহামা ট্রায়াল’।

কারাগার, আদালত কক্ষ আর টেনিস কোর্ট অতিক্রম করে প্রদর্শনীর এই পর্যায়ের শেষ দিকটায় এসে আরো যে কটি উল্লেখযোগ্য কাজ চোখে পড়ে, তার মধ্যে আছে অ্যান্ডি ওয়ারহলের কাস্তে-হাতুড়ি সিরিজের কয়েকটি ছবি, শিল্পী যেখানে সমাজতন্ত্রের সেই প্রতীকের শক্তিশালী বার্তার স্থানচ্যুতি ঘটিয়েছেন এর সঙ্গে এক ডলারের নোট, কনডম এবং আরো কিছু সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বস্ত্তর ছবি জুড়ে দিয়ে। প্রদর্শনীর সব কটি কক্ষ পার হয়ে এসে জাদুঘরের নির্গমন পথের সিঁড়িতে এসে দাঁড়ালে চোখে পড়বে আরো দুটি ব্যতিক্রমী কাজ। প্রয়াত জাপানি শিল্পী মাসানোবু ইয়োশিমুরা তাঁর এসব কাজকে এন্টি আর্ট হিসেবে উল্লেখ করে গেছেন, শিল্প-সংস্কৃতি নিয়ে শিল্পীর সাংঘর্ষিক, অটল অবস্থানকে যা কি না তুলে ধরে। একটি হচ্ছে গোটানো মাদুরের ওপর দাঁড়ানো বড় আকারের একটি দাঁড়কাক এবং অন্যটি হলো সত্তরের দশকের উইমেন লিব আন্দোলন সম্পর্কে শিল্পীর প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা ‘পিগ পিগ লিব’ নামের একটি ভাস্কর্য। শূকরের অর্ধেক দেহের সেই ভাস্কর্যে দেখা যায় দেহের পেছনের অংশের শূকরের মাংসের তৃপ্তিকর খাবার হ্যামে পরিণত হতে। অর্ধেক কাটা হ্যামের একটি টুকরো আবার ঝুলে আছে শূকরের দেহ থেকে। উল্লেখ্য, ইয়োশিমুরা ছিলেন ১৯৬০-এর দশকে জাপানে গড়ে ওঠা নিও-দাদা আন্দোলনের একজন সংগঠক; শিল্পকলার নানারকম পরীক্ষামূলক কাজ জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও যিনি করে গেছেন।

প্রদর্শনীর এই প্রথমাংশের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে বইয়ের ভূমিকা আর সাতটি অধ্যায়। বাকি চার অধ্যায়ের আয়োজন বসেছে অল্প দূরের ভিন্ন এক জায়গায়। সন্দেহ নেই, প্রথমাংশের বিস্তৃত পরিসরে স্থান পাওয়া সব শিল্পকর্ম বোদ্ধা দর্শকের মনে নানারকম প্রশ্ন জাগিয়ে তুলে প্রদর্শনীর গভীরতা নিয়ে তাঁদের ভাবিয়ে তুলতে সমর্থ। বিস্মৃতির পথে যাত্রা হিসেবে আয়োজকরা এই প্রদর্শনীকে তুলে ধরলেও উলটোভাবে বরং স্মৃতির গভীরে টোকা দিয়ে অতীতের দুঃখময় দুঃসময়কেই যেন তা আমাদের সামনে নিয়ে আসে সেইসব সময়, সৃজনশীল মানুষের মনের ভাবনাকে প্রকাশ করাও যখন ক্ষেত্রবিশেষে বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিতে পারত। তবে অন্যদিকে আবার নেতিবাচক অর্থে স্মৃতির সেই ফিরে আসা এটা মোটেও নয়। বরং সামনে চলার পথে আমাদের না চাওয়া সেই অতীত যেন আবারো ফিরে আসতে না পারে, সেই নিশ্চয়তাই যেন এর মধ্যে দিয়ে পাওয়া যায়। সেইসঙ্গে অন্য যে আরেকটি বলিষ্ঠ বাণী আমরা প্রদর্শনী দেখা শেষ করে পেয়ে যাই তা হলো – চিন্তার স্বাধীনতা এর নিজস্ব প্রবাহ ধরে বহমান, যে স্রোতের গতিকে আটকে রাখা মানুষের সামর্থ্যের বাইরে। ইতিহাস বারবার সেই প্রমাণ আমাদের সামনে রেখে গেলেও ইতিহাসের সেই শিক্ষা গ্রহণে আমরা মনে হয় অপারগ। আর তাই ক্ষমতার মোহে দিশেহারা মানুষকে বারবার একই গোলকধাঁধার পথ ধরে হেঁটে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হচ্ছে। তারপরও শেষ নেই আবারো উঠে দাঁড়িয়ে একই সেই ভ্রান্ত পথে পা বাড়ানোর অভিপ্রায়ের। n

 

(টোকিও, অক্টোবর ২০১৪)

 

 

 

ট্রিয়েনালের ভিডিও আর্ট

মঈনুল শাওন

 

 

ইয়োকোহামা ট্রিয়েনালের শৈল্পিক পরিচালক ইয়াসুমাসা মোরিমুরা মনে করেন, বিস্মরণের গোড়ায় ফিরে তাকানোই শিল্প। হারিয়ে যাওয়া, ফিরে না চাওয়া বা আলগোছে দৃষ্টির বাইরে থাকা অস্তিত্ব বা অবয়বের দিকে ফিরে তাকানোর প্রণোদনা বা আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তাঁর এই প্রদর্শনী। আর সেই ফিরে তাকানোর খেলায় রং-তুলিতে অাঁকা ছবির সঙ্গে আরো যে যুক্ত হয়েছে একগুচ্ছ ভিডিও আর্ট ডিসপ্লে, তারই সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরতে এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

লেবাননি শিল্পী আকরাম জাত্তারির ২০১৪ সালে তৈরি ৩৩ মিনিটের ভিডিও হার (Her) + হিম (Him) মূলত হচ্ছে ফটোগ্রাফির হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর জন্য এলিজি। সম্প্রতি খুঁজে পাওয়া ১৯৫৯ সালে তোলা বন্ধুর দাদিমার ১২টি সাদাকালো রগরগে ছবির কুলুজি খুঁজতে গিয়ে কায়রোর শহরতলিতে বৃদ্ধ ফটোগ্রাফার ভ্যান লিওর শরণাপন্ন হন শিল্পী আকরাম। অতঃপর লিও, আকরামের রঙিন ভিডিও ক্যামেরার সম্মুখে তাঁর সাদাকালো স্থির ক্যামেরার অতীত পারঙ্গমতার গল্প শোনান এবং ফটোগ্রাফির মৃত্যুর জন্য তিনি ভিডিওকে অথবা যেন আকরামকেই দায়ী করেন। কাহিনির অবলোকন শেষে হল থেকে বেরোনোর পথে দর্শক পুনরায় মুখোমুখি হন এতক্ষণ দেখা চলচ্চিত্রের ভাঁজে ভাঁজে ব্যবহৃত দাদিমার যৌবনের এক ডজন উন্মুক্ত স্থিরচিত্রের।

অন্যদিকে ডাচ শিল্পী মেলভিন মতি ২০০৪ সালের কাজ নো শো ভিডিওচিত্রটি নির্মাণ করেছেন শুধুমাত্র একটি জাদুঘরের অভ্যন্তরের একটিমাত্র স্থিরচিত্র দিয়ে, যাতে আমরা দেখতে পাই অথবা শুনতে পাই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন রাশিয়ার হারমিটেজ জাদুঘরের পেইন্টিংবিহীন শূন্যকক্ষে একজন গাইডের সহায়তায় সোভিয়েত সৈন্যদের শিল্পসুধা উপভোগের কাহিনি। গাইড এতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে এক ফ্রেম থেকে আরেক ফ্রেমের পেইন্টিংয়ের বর্ণনা দিয়ে যায়, তাতে অদৃশ্য সৈন্যদের পাশাপাশি দর্শক বা শ্রোতারাও যেন তাঁদের অন্তর্দৃষ্টিতে স্পষ্ট দেখতে পান বর্ণিত শিল্পকর্মগুলোর নানা রং। এখানে চলচ্চিত্র আর স্থিরচিত্রের পাশাপাশি ইমেজ ও শব্দের পারস্পরিক সম্পর্কের দিকেও শিল্পী আমাদের দৃষ্টি ফেরান।

একই রকমভাবে মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার লোভে তাইওয়ানের একসময়ের সমৃদ্ধ গার্মেন্টশিল্প এবং এর শ্রমিকদের বিস্মরণের অতলে হারিয়ে যাওয়ার অনবদ্য দৃশ্যায়ন আমরা দেখি শিল্পী চেন চিয়ে জেনের প্রায় ৩১ মিনিটের নির্মাণ ফ্যাক্টরিতে। অতি ধীরলয়ের ক্যামেরা মুভমেন্ট এবং চরিত্রসমূহের ক্যামেরা বা দর্শকের দিকে  দীর্ঘ স্থিরদৃষ্টির অপরূপ দ্বান্দ্বিকতায় যেন মূর্ত হয় বিস্মরণের আর্তনাদ।

একই ধারায় ফরাসি নির্মাতা এরিক বোদলেয়ার (পরিচালক) এবং জাপানের বিপ্লবী ধারার চলচ্চিত্রকার মাসাও আদাচির (লেখক) যৌথ বিনির্মাণে ১০০ মিনিট দৈর্ঘ্যের ছবি, দি আগলি ওয়ান (২০১৩) তুলে ধরে বিস্মরণে হারিয়ে যাওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দ বা উচ্চারণ বা ধারণা। ডকুমেন্টারি ও ফিকশনের যৌথ আদলে বৈরুতে সংঘটিত একটি সন্ত্রাসবাদী হামলার প্রেক্ষাপটে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে শোনা যায় – বিপ্লব, শ্রেণিসংগ্রাম, সেকুলারিজমসহ বিশ্বায়নের কালে অনেকটা হারিয়ে যাওয়া এমন অনেক শব্দ বা বোধের নবউচ্চারণ।

প্রদর্শনীতে রয়েছে জোসেফ কর্নেলের ১৯৪০-৬৭ সালে ১৬ মিলিমিটারে নির্মিত নির্বাক ও সাদাকালো কটিলিওন, দি চিলড্রেনস পার্টি এবং মিডনাইট পার্টি – এরকম নানা দৈর্ঘ্যের কয়েকটি চলচ্চিত্র, যা কি না বিস্মরণে হারিয়ে যাওয়া চলচ্চিত্রের প্রারম্ভিক দিনগুলোর দিকে দিকনির্দেশ করে। অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরে নিজেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পী বেস জান আদেরের ১৯৭০-৭১ সালের চার রকম পতনের নির্বাক চিত্রও রয়েছে এবারের প্রদর্শনীতে।

এছাড়া আছে জ্যাক গোল্ডস্টেইনের  ১৯৭২ সালের দুটি কাজ এ গ্লাস অফ মিল্ক এবং সাম প্লেইট। অন্যদিকে যেন নিজ সত্তারই বিস্মরণে হারিয়ে যাওয়াকে তুলে ধরছে অ্যানা ম্যান্ডিয়েটার
১৯৭৪-৭৫ সালের তিনটি ভিডিও আর্ট – ‘বডি ট্র্যাকস’, ‘ওশেন বার্ড ওয়াশআপ’ এবং ‘সোউল, সিলাওয়েট অন ফায়ার’। পাশাপাশি কোরিয়ার কিম সং ইয়ুয়ান, ফিলিপাইনের কিরি দালেনা, চীনের হে ইউয়েচাং এবং ভিয়েতনামের ডিন কিউ লির কাজেও রয়েছে বিস্মরণের ছায়া।

আলোচনার ইতি টানব প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী শিল্পী ইয়াসমিন কবিরের ২০০৮ সালে নির্মিত ভিডিওচিত্র দি লাস্ট রাইটস দিয়ে। এখানে বলে রাখা দরকার, ইয়াসমিনের-সহ মোট আটটি ভিডিও শিল্পকর্ম ফুকোওকা এশীয় চারুকলা জাদুঘর থেকে ধার করা। চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে অবস্থিত জাহাজ ভাঙার আঙিনাগুলোতে ১৬ মিনিটের এই ভিডিওচিত্রের বিচরণ। সাগরের জলে দাঁড়িয়ে থাকে মরা জাহাজ। তাকে ভেঙে গুঁড়ো করার দায় পড়ে বাস্ত্তহারার। দিনরাত কাজ। সাগরের তট যেন তাদের নিত্য খোলা দপ্তর। লোহার শেকল কাঁধে হাঁটে তারা দলবেঁধে। কাদার ভেতর, জলের ভেতর, স্থলের ওপর পায়ের কোরাস। নির্মাতার চোখ পা চেনে। ক্যামেরা আগায় তাই পদচিহ্ন গুনে গুনে। ভাঙে জাহাজ, সেই সঙ্গে মানুষের গা। তল্লাটে মাথা তোলে যন্ত্রহীন যন্ত্রণার সভ্যতা। মানুষ টানে ঘানি মাথায়, ঘাড়ে, হাতে, পায়ে রাত-দিন। হঠাৎ জ্বলে আগুন ঝালাইয়ের। জাহাজের গা কেটে কেটে সারা। ছ্যাঁত করে ওঠে প্রাণ। ইস্ক্রা থেকেই বুঝি জ্বলবে আগুন, যদি এই মজুরি বা দাসত্বের পাল্টায় বিন্যাস, একদিন, কোনদিন? ক্যামেরা বা লেন্স অথবা নির্মাতা-দর্শকের দৃষ্টি কাছে যায়। আরো কাছে। শ্রমিকের মুখ নয়, যেন অনাসৃষ্টি। বীর চট্টলার সাগরতটে গাঁথা মুনাফার নিক্তিতে এরা স্থবির বস্ত্তই বটে। তাই গতর খাটা দিন-রাত। পায়ে পায়ে সম্পর্কের অগ্রযাত্রা। যেন মৃত্যুর পানে আগানো আরো কয় কদম। নির্মাতার শ্রমে অথবা তাঁর দৃষ্টিতে অপরের বা গরিবের শ্রমবিন্যাসে শ্রদ্ধা অটুট আমার। তথাপি স্মৃতির দ্বারে কেন যেন বারে বারে একই দ্রষ্টব্যের দিশা। বিদেশি বা দেশি ক্যামেরা শ্রমিকের নির্মাণে বিদিশা বাংলার জাহাজ ভাঙার গল্প তো দেখেছি বহুবার। ফারাক নেই বলা যাবে না। গতিতে ফারাক। কাহিনির গাঁথুনিতেও। আবহে ব্যবহৃত সুরের ভেতর অদ্ভুত লয়। যেন দর্শনের পুরোটা ক্ষণে দর্শকের প্রাণে বহে অচেনা প্রলয়। পরিশেষে শ্রমের পাশাপাশি যে শ্রমিক হারিয়ে যায় বিস্মরণে অথবা সময়ের জলে, তার ছবিই যেন সেলুলয়েডে সযত্নে অাঁকেন শিল্পী ইয়াসমিন।

 

 

 

একটি বিড়ালের সাক্ষাৎকার

মার্সেল ব্রুথার্স

 

(এই সাক্ষাৎকারিটি ধারণ করা হয়েছে ১৯৭০ সালে ডুসেলডর্ফের আধুনিক চারুকলা জাদুঘরে)

 

– এটা কি ভালো কোন ছবি?… কনসেপচুয়াল আর্ট বা ধারণাগত শিল্পকলা থেকে কোনো এক ধরনের গঠনে সরে যাওয়া নতুন এক সংস্করণ হিসেবে যেটাকে বলা হয়ে থাকে, সর্বাধুনিক সেই উত্তরণ থেকে যা তুমি প্রত্যাশা করতে পার তার সঙ্গে এটা সমঞ্জস্যপূর্ণ কি?

– মিয়াঁও।

– তুমি কি তা বিশ্বাস করো?

– মিয়াঁয়াঁও…ম্?ম্?…মিয়াঁউ…মিয়াঁও।

– তা সত্ত্বেও আমি তো বলব এই রং আমাকে
সেই ধরনের রঙের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে, অ্যাবস্ট্র্যাক্ট
আর্ট বা বিমূর্ত শিল্পকলার সময়ে যা তৈরি করা হয়েছিল,
নয় কি?

– মিয়াঁও…মিয়াঁওও…ম্যাঁও।

– তুমি কি নিশ্চিত যে নতুন ধরনের কোনো অ্যাকাডেমিক কাজ এটা নয়?

– মিয়াঁউ।

– ঠিক আছে, এটা যদি দুঃসাহসী কিছু হয়ে থাকে, তবে তা সত্ত্বেও বলতে হয় সেটা হচ্ছে প্রশ্নসাপেক্ষ এক দুঃসাহস।

– মিয়াঁঅ।

– শেষ পর্যন্ত এর সবটাই তো এখনো হচ্ছে…

– মিয়াঁও।

– আহা, সবটাই এখনো হচ্ছে বাজারকে ঘিরে…

– মিয়াঁউউ।

– তবে এসব ছবির সবগুলোই তো বিক্রি করতে হবে।

– মিয়াঁআউ।

– আচ্ছা, মানুষ এগুলো কিনে নেওয়ার পর আগে যেসব কেনা হয়েছে সেগুলো নিয়ে তারা করবেটা কী?

– মিয়াঁউও।

– সেগুলো কি তারা আবারও বিক্রি করে দেবে?

– মিয়াঁউঅ…মিয়াঁ।

– নাকি ছবি কেনা তারা অব্যাহত রাখবে? তুমি কী মনে করো? এই প্রশ্ন আমি তোমাকে করছি কেননা অনেক শিল্পী এ মুহূর্তে তা জানতে চাইছেন।

-মিয়াঁওউ…মঁমঁ…মিঁমিঁ…মিআআউ…মাআআউ…মিয়াঁউ…মঁমঁ…মিয়াঁআউ…মিয়াঁউউ…মিইইয়াঁউ।

– ঠিক আচ্ছে, জাদুঘরগুলো সব তাহলে বন্ধ করে দাও!

– মিইয়াঁআউ।

 

Leave a Reply

*