logo

অন্ধকারের আলো যোগেন চৌধুরীর ছবি

ত প ন  ভ ট্টা চা র্য

কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজে ছাত্র থাকাকালীন শিল্পী যোগেন চৌধুরী বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অ্যাকাডেমিক দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। শিক্ষানবিশি পর্যায়ে তাঁর কাজের একনিষ্ঠতা আজো দর্শককে টানে। সাধারণভাবে অ্যাকাডেমিক বাস্তবনিষ্ঠভাবে ড্রইং, জলরং করলেও সময় সময় বেঙ্গল স্কুলের ধারায়ও তিনি তখন কাজ করেছিলেন। যেমন ১৯৫৬ সালে আঁকা ‘মেলা’ বা ১৯৫৮-র ‘পুতুল খেলা’ বা ‘মাছ ধরা’ ছবিগুলিতে বেঙ্গল স্কুলের স্মৃতিমেদুরতা, পেলব গঠন ইত্যাদি দেখতে পাই আমরা। এই সময় আর্ট কলেজের অনেক ছাত্রই একইসঙ্গে বাস্তবনিষ্ঠ অ্যাকাডেমিক আর্ট ও বেঙ্গল স্কুল ঘরানার কাজ করতেন। ধীরে ধীরে তিনি পশ্চিমি দুই শিল্পী এডজার দেগা ও কাথে কোলভিৎসের ছবিতে বাস্তবরীতির প্রয়োগে আকৃষ্ট হন। কলেজ থেকে পাশ করে যাবার পরও ১৯৬০-৬২ সাল নাগাদ যে মডেল লক্ষ করে ন্যুড এঁকেছেন তিনি তার গঠন, ভঙ্গিও ফরাসি শিল্পী এডজার দেগার কাজের কথা মনে পড়ায়। শিল্পে সংবেদনশীলতা, যৌনতা বা এ রসের প্রাথমিক পাঠ দেগার কাছ থেকেই এসেছিল তাঁর। আবার শিয়ালদহ স্টেশনে উদ্বাস্ত্ত মা ও শিশু বা কোনো ছোট্ট মেয়ের যে চিত্রণ তিনি করেছিলেন, তার যে সমাজসচেতনতার ধরন তাতে জার্মান মহিলা শিল্পী কাথে কোলভিৎসের কাজের কথা মনে আসে। পরবর্তীকালে পরিণত শিল্পী যোগেন চৌধুরীর অসংখ্য কাজেই যৌনতাবোধ ও সমাজসচেতনতা মিলেমিশে রয়েছে, যার সূত্রপাত কলেজের শেষদিকে এবং কলেজ শেষ হবার পরপরই হয়েছিল মনে হয়।

কলেজ থেকে পাশ করার পর শিল্পী যোগেন চৌধুরী পাঁচ বছর একটা স্কুলে শিল্পশিক্ষকের কাজ করেন। কিন্তু এই পাঁচ বছরে তিনি যে ছবি আঁকেন তাতেও অ্যাকাডেমিক দক্ষতা ছাপিয়ে এক ধরনের অভিব্যক্তিবাদী কাজের ধরন লক্ষ করা যায়। উনিশশো ষাট থেকে পঁয়ষটি, এই বছরগুলিতে তেলরঙে যে কাজগুলি করেছিলেন তা মসৃণ বা সুডৌল নয়, বরং পেলবতাহীন দ্বন্দ্বাকীর্ণ জীবনকেই তিনি তাঁর বিষয় করেছেন।

এই সময়ই তিনি প্রৌঢ় দম্পতি বা খালি গায়ে হতাশ বৃদ্ধের লোলচর্ম শরীর এঁকেছেন, যা পরবর্তীকালেও তাঁর বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। যেমন ১৯৬৫-তে আঁকা Representative from Hell-এ যে নতমুখ অর্ধনগ্ন হতাশ বৃদ্ধকে আমরা দেখতে পাই, তেলরং লাগাবার ক্ষেত্রে যে দ্রুততা ও অভিব্যক্তিমূলক প্রবণতা রয়েছে তা পরবর্তীকালে বদলে গেলেও বিষয় হিসেবে তা বাদ হয়নি। এই সময় তরুণ যোগেন চৌধুরীর স্বপ্রতিকৃতি আঁকারও একটি ঝোঁক ছিল এবং এতদিন পরও ওই কাজগুলির মৌলিকতা, অভিব্যক্তির আর্তি নিবিষ্ট করে দর্শককে। যোগেন চৌধুরীর আঁকা মুখাবয়বগুলি আপাত কোনো ফ্যাশন নিয়ে উপস্থিত হয় না, বরং সেখানে সংশয়, অস্থিরতার উপস্থিতি রয়েছে। এই ড্রইংগুলিও এমন সত্যকে দর্শায়, যা হারিয়ে যাবার নয়।

পঁয়ষট্টি সালে তিনি আরো শিল্পশিক্ষার জন্য প্যারিসের ইকোল বিউ আর্টে যোগ দেন। প্যারিসে থাকাকালীন চারকোলে বা কালিতে যে ড্রইংগুলি তিনি করেছিলেন তা তাঁর আগের কাজগুলির থেকে নানা কারণেই আলাদা। এ সময়ে তিনি ছবির ফিগারগুলি নিয়ে আরো অস্তিত্ববাদী হয়েছেন, যেমন ফিগারটি একটা সোফায় বসে আছেন, ব্যস, ওইটুকুই আঁকছেন। ফিগারটির চারদিকের পারিপার্শ্বিকতা তিনি সরিয়ে দিয়েছেন। একটা অস্তিত্ববাদী শূন্যতায় যেন ফিগারগুলিকে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছে; স্থূল, শরীরময় ফিগারগুলি অস্তিত্বের সংকটকে প্রকাশিত করে। একধরনের স্থবিরতা তাদের যেমন স্থূল করে রেখেছে, তেমন তারা জীবনের উৎসব থেকেও অবসরপ্রাপ্ত। তার সঙ্গে লক্ষণীয় এই যে, ফ্রান্সে শিল্পশিক্ষা করতে গিয়ে এবং ওখানে পশ্চিমের অসাধারণ শিল্পীদের নানা কাজ দেখেও সরাসরি কারো দ্বারা তিনি প্রভাবিত হননি। ইউরোপীয় শিল্পীদের কাজ থেকে সরাসরি প্রভাবিত হয়ে ভারত/এশীয় শিল্পী হিসেবে যে ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয় দেওয়া হবে সে বিষয়েও তিনি সচেতন ছিলেন সেই সময়, এই সচেতনতা তাঁকে শিল্পী হিসেবে যে নিজস্বতা দিয়েছে, তা নিয়েও কোনো সন্দেহ থাকে না। অথচ তিনি প্রাদেশিকও নন। তাঁর সামাজিক অবস্থান থেকে যতটুকু গ্রহণ করার এবং তাকে সম্পূর্ণ নতুন এক নিজস্বতা দেওয়ার ব্যাপারেও তিনি সচেতন ছিলেন।

দুই

প্যারিস থেকে ফিরে এসে তিনি চেন্নাইতে চাকরিতে যোগ দেন। প্রাথমিকভাবে এই সময়ে প্রায় এক বছর যোগেন চৌধুরী ছবি আঁকেননি। কেননা তাঁর ভেতর কী আঁকবেন, কেন আঁকবেন এমন ভাবনার দ্বন্দ্ব এসেছিল। তাঁর লেখায়, বিশেষত আর্ট নিয়ে লেখাতেও এমন অবস্থানটি প্রাসঙ্গিক হয়েছে। শিল্পী হিসেবে তাঁর যে অতৃপ্তি ও টানাপড়েন তার উল্লেখ যোগেন চৌধুরীর লেখা কবিতাতেও সেই সময় রয়ে গেছে। এবং সেদিক থেকে ফ্রান্সে থাকাকালীন লেখা তাঁর কবিতাগুলিও বিশেষভাবে সোচ্চার। অস্তিত্বের সংকট যোগেন চৌধুরীর ব্যক্তিত্বের বিশেষ একটি দিক।

কলকাতায় আর্ট কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশনে গিয়ে উদ্বাস্ত্তদের ছবি এঁকেছেন, কিন্তু চেন্নাইতে থাকাকালীন এই উদ্বাস্ত্ত অনুভব আরো গভীর ও ব্যক্তিগত হয়ে ফিরে এলো। বিশেষত তিনি যেন মুখোমুখি হলেন ব্যাকুল কিন্তু উৎকণ্ঠিত মানসিক অবস্থার। আটষট্টি থেকে তেয়াত্তর পর্যন্ত (১৯৬৮-৭৩) তিনি যে ছবির সারি এঁকেছিলেন তাই বিখ্যাত হয়ে রয়েছে Reminiscence of Dream সিরিজ নামে। এই সারির কাজগুলি শিল্পী যোগেন চৌধুরীর অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ফসল এবং তাঁর সারাজীবনের কাজের ভেতর বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এই সিরিজে তাঁর বিষয় হয়েছে মাছ, সাপ, বিচ্ছিন্ন কোনো হাত, জলজ ফুল, নারী স্তনের কোনো দিক এবং অবশ্যই ছবিগুলিতে রয়েছে জলের একটা অদৃশ্য উপস্থিতি। উনিশশো আটচল্লিশ সালে পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্ত্ত হয়ে এসেছিলেন কলকাতায় যোগেন চৌধুরী ও তাঁর পরিবার। কিন্তু সেখানকার নদীকেন্দ্রিক জীবন যোগেন চৌধুরীর অবচেতন মনে থেকেই গিয়েছিল এবং যা অবচেতন থেকেই পুনরুদ্ধার হলো এই সিরিজের কাজে। কিন্তু তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল তাঁর যৌনতার প্রতি আকর্ষণ ও বিবাহ-পরবর্তী যৌন অভিজ্ঞতা।

জল মানুষকে সঞ্জীবিত করে, নতুন করে জেগে ওঠার যে স্পিরিট তা জল মানুষকে দেয় এবং নবীকরণের দিক থেকেও জলের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য এবং জলের এমন চঞ্চলতা রয়েছে যেন জল কোনো বিশেষ দেশের নয়, জল বয়ে বেড়ায় সর্ব দেশেই।

হারিয়ে যাওয়া বা হারিয়ে ফেলার অনুভূতি থেকেই উৎকণ্ঠার অনুভব আসে, জীবনের ব্যাকুলতা, উদগ্রীবতা যা এই ছবিগুলিতে ছেয়ে রয়েছে। এবং তিনি যে মাছ, সাপ, মানুষের শরীরের অংশ এঁকেছেন, তারা ভেসে রয়েছে কিন্তু ডুবে যাচ্ছে না বা জোরে সাঁতারও কাটছে না। এবং সেখানে থেকেই তারা তাদের অস্তিত্বকে বাঁচিয়ে রাখছে এবং নতুন সম্ভাবনার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এবং সেখানেই বিকশিত কোনো জলজ ফুলকে বলা যায় যোগেন চৌধুরীর শিল্পীসত্তারও প্রতিনিধি। ভাসমান উৎকণ্ঠায় এরা স্বপ্নের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে। এই ছবিগুলিতে যোগেন চৌধুরী এমন স্বপ্ন দেখছেন যা এড়ানো যায় না, যা হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্বের সঙ্গে বর্তমান স্মৃতির সম্পর্কে তৈরি। এই কারণে এই সিরিজের নামে যে reminiscence (পূর্বস্মৃতি, স্মৃতিচারণ) ও dream (স্বপ্ন) দুটো শব্দ রয়েছে, তা সিরিজটির অর্থের দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ।

এই ভাসমান উৎকণ্ঠার অনুভব আধুনিকতারও লক্ষণ। শিল্পীর আধুনিকতা গড়েই ওঠে এমন উৎকণ্ঠা ও ব্যাকুলতার অনুভব থেকে। দক্ষতা ছাপিয়ে এমন যে ব্যক্তিগত শিল্প-ভাষা যোগেন চৌধুরী গড়ে নিতে পেরেছিলেন সে কারণেই তিনি ভারতের একজন প্রধান আধুনিক শিল্পী হিসেবে পরিচিত হন।

ছবির পটভূমিতে বিশেষ জায়গায় অবস্থান ছাড়িয়ে অন্ধকার রাত্রিতে ভাসমান অবস্থায় অবস্থান করার ভেতর দোদুল্যমানতা রয়ে গিয়েছে, তেমন এই ছবিগুলির পরিবেশে বিচিত্র অন্ধকার নির্মাণ করতেন যোগেন চৌধুরী। বাস্তবতার যে দর্শন ক্ষেত্র তা হয়ে উঠেছে অন্ধকার শূন্য অঞ্চল। শিল্পীর অবচেতন অন্ধকারের, কালোর গভীরতা থেকে দৃশ্যকে নির্মাণ করেছে। শিল্পসৃষ্টির ক্ষেত্রে যোগেন চৌধুরীর অবচেতন সক্রিয় হয়ে উঠছে না কেবল, তা প্রকাশিত হচ্ছে নির্মাণের শৃঙ্খলায়। যেভাবে কালি, কলমে ক্রমাগত দাগ টেনে টেনে তিনি ফর্মকে, রূপকে প্রকাশিত করেছিলেন তা একজন শিল্পীর মনোযোগের শৃঙ্খলা ছাড়া কখনো গড়ে উঠতে পারত না। এই পর্যায়ের ছবিতে যে তীব্রতা, প্রগাঢ় গভীরতা যোগেন চৌধুরী আনতে পেরেছিলেন তা আধুনিক ভারতীয় ছবিতে অজানা ছিল, যদিও রবীন্দ্রনাথের ছবিতেই তার প্রাথমিক শুরুটা হয়েছিল।

এই অন্ধকার বা কালো রাত্রিকে শুধু দেখা নয়, তাকে অনুভব করা চলে। বলা যায়, যেন এক আপাত শান্ত অন্ধকার বা রাত্রি ছবিগুলির ভেতর দিয়ে আমাদের ভেতর প্রবেশ করে।

এই সিরিজের ছবিতে যোগেন চৌধুরী ক্রমাগত উপস্থিত করেছেন fragmented body image যেমন নারী শরীরের কোনো একটি অংশ বা একটি মাত্র স্তনের উপস্থিতি, যাকে ঘিরে আছে একটা বড় সাপ ইত্যাদি, এই অনুভব হয়ে উঠেছে শিল্পীর অবচেতনের যৌনতারও প্রকাশ। এবং এইভাবে প্রকাশিত fragmented body images-এর সঙ্গে স্বপ্নের যোগাযোগ মূর্ত হয়ে ওঠে। সেই দিক থেকে এই ছবিগুলিকে বলা যায় যোগেন চৌধুরীর সুররিয়ালিস্ট পর্বও। অথচ সেই সুররিয়ালিজম এমন দেশজভাবে প্রকাশিত হয়েছে যে তার নিজস্বতা নিয়ে কোনো সন্দেহই থাকে না। সাধারণভাবে ছবিগুলি দেখার সময় ফরাসি সুররিয়ালিস্ট শিল্পীদের প্রভাবের কথা মনেও আসে না। ছবিতে পরিবেশ, বিষয়, রূপ পরস্পরের সঙ্গে জৈব সমন্বিত হয়ে গড়ে উঠেছে। আধুনিক মানুষের যে কল্পনার জেনিথ বা শিখর তা ছুঁয়ে দেয় এই ছবিগুলি। শরীরের এই বিভাজন ও অসম্পূর্ণতা শিল্পীর অস্তিত্বের বিচ্ছিন্নতা, উদ্বাস্ত্ত অনুভবকেও নান্দনিক অনুভবে প্রকাশ করে। অথচ জলের পরোক্ষ উপস্থিতির কারণেই তা নতুন করে জেগে ওঠার অনুভবকেও প্রকাশ করে, কোথাও নবীকরণেরও চেষ্টা সতত হয়ে চলেছে মনে হয়। শুধু মাত্রায় আবেগ, প্রবণতা ছাড়াও শিল্পকর্ম করে ওঠা, তাকে পূর্ণতা দেওয়া যে গভীর মানসিক ক্রিয়াও, মনোযোগ যার বড় একটি অংশ তা যোগেন চৌধুরীর ছবি দেখলে বোঝা যায়।

যদিও সরাসরি ছবি দেখবার সময় মনে আসে না তবুও যোগেন চৌধুরী তাঁর ছবিতে ইমেজারির ক্ষেত্রে সুররিয়ালিস্ট রেনে ম্যাগ্রিটের কাজ দিয়ে উৎসাহিত হয়েছিলেন, তা কখনো মনে হয়। ম্যাগ্রিটেরও ভাসমান ফর্মের দিকে আকর্ষণ ছিল, একধরনের নরম তুলতুলে বায়োমর্ফিক ফর্মের প্রতি আকর্ষণ, তা যোগেন চৌধুরীরও নানা কাজের বিষয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে, নরম বায়োমর্ফিক ফর্ম হিসেবে উপস্থিত করার প্রবণতা এই দুজন শিল্পীর ভেতর বর্তমান। রেনে ম্যাগ্রিটের কোনো কোনো ছবির সঙ্গে যোগেন চৌধুরীরও কোনো কোনো ছবির তুলনামূলক আলোচনা সম্ভব। যেমন ম্যাগ্রিটের ১৯৫২ সালে আঁকা ‘The listening room’ ছবিতেও পটজুড়ে একটা বিরাট ফলকে দেখি আমরা, যার সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর ১৯৭৬-এ আঁকা
‘The intellectual’ ছবিতে যে চালকুমড়োটি দেখা যায় প্রায় পুরো পটজুড়ে তার সঙ্গে তুলনা করা যায়। এ বিষয়ে একথাও বলতে হবে, এই ছবিটিতে যেভাবে তল বিভাজন করেছেন যোগেন চৌধুরী তা তান্ত্রিক ছবিতে শিবলিঙ্গ বা ইত্যাদিতে যে পটবিভাজন করে আঁকা হয় তার সঙ্গেও তুলনা চলে। রেনে ম্যাগ্রিট ছাড়াও সুররিয়ালিস্টদের ভেতর সালভাদর দালি, জাঁ আর্প ইত্যাদিরাও নরম বায়োমর্ফিক ফর্ম দিয়ে উৎসাহিত ছিলেন তাঁদের পরস্পরের কাজে, যোগেন চৌধুরীরও বেশ কিছু কাজকে এমন ধারার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে বলে ভাবা যায়। যদিও এমন আন্তর্জাতিকতার সঙ্গে যোগেন চৌধুরীর ভারতীয়তা, তাঁর নিজস্ব পরিচয়চিহ্নে কোনো অভাব ঘটেনি।

 

তিন

নিকষ কালো অন্ধকারের মায়াময় কাব্যিক উপস্থিতিতে এই যে শরীরের আনাগোনা তা আঁকা হয়েছে সাধারণত কালি, কলমে ও তার সঙ্গে প্যাস্টেল, ক্রেয়ন ইত্যাদি ঘষে। ছবি আঁকার মিডিয়ামের ক্ষেত্রেও যোগেন চৌধুরী একেবারেই তাঁর নিজস্ব উপায় নির্মাণ করে নিয়েছিলেন। ড্রইংকে তিনি যে তাঁর মুখ্য অভিব্যক্তি করে তোলেন তাতেও তাঁর আধুনিক এগিয়ে থাকা অবস্থান রয়েছে, সে কারণেই নতুন এক নিজস্বতায় উপস্থিত হয়েছে তাঁর ছবি। পশ্চিমে এবং আফ্রিকাতেও অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁরা ড্রইংকে তাঁদের মুখ্য অভিব্যক্তির উপায় হিসেবে নিয়েছেন। যেমন যত ছবি এঁকেছেন বিখ্যাত জার্মান শিল্পী যোসেফ বুই, তার নববই ভাগের ওপর রয়েছে ড্রইং। গুরুত্বপূর্ণ আফ্রিকান শিল্পী ফ্রেডরিক ব্রুলি বউআব্রে (Frédéric Bruly Bouabré) মুখ্যত ক্রেয়নে ড্রইং করেছেন। আমেরিকান শিল্পী রেমন্ড পেট্টিবন (Raymond Pettibon, জন্ম ১৯৫৭) কেবল কালি-কলমে ও ব্রাশে ড্রইং করেন। অর্থাৎ সেদিক থেকে শুধুমাত্র ড্রইং করা কিছু শিল্পীর একটা আন্তর্জাতিক ধারায় পরিণত হয়েছে। এবং যোগেন চৌধুরীকে তাঁদের মতোই আরেকজন উল্লেখযোগ্য শিল্পী বলে ভাবা যায়। এবং এই যে কালি ও কলম দিয়ে ক্রিস-ক্রস করে তোলেন ছবির পটকে, যেন মনে হয় তিনি সেলাই করে ছবিটিকে রূপদান করলেন বা আকার গড়ে তুললেন। এবং ফুল, সাপ, লতা, নগ্ন হাত, নারীর শরীর বা স্তন যাই আঁকুন না কেন তা যেন পূর্ণ বিকশিত হয়ে উঠেছে, এমন পূর্ণ বিকশিত রূপের গভীরে শিল্পীর যে যৌন আকর্ষণ, এ রসের বোধ তা হারিয়ে যায় না বরং প্রকাশিত হয় মায়াময় কাব্যিক উপস্থিতিতে।

‘রেমিনিসেন্স অফ এ ড্রিম’ সিরিজের চুয়াল্লিশ নম্বর ছবিতে দেখতে পাই অন্ধকারে বসে থাকা রানীর মতো এক মহিলাকে, যার স্তন যেন আলাদাভাবে বিস্ফোরিত হয়ে আছে এবং তারই সঙ্গে তার মাথা থেকে উঠেছে এক বিরাট কোনো ফুল। ১৯৭৩ সালে আঁকা এই রমণীর শাড়িতেই রয়েছে নানা ভাঁজের উপস্থিতি। পরবর্তীকালে যোগেন চৌধুরীর অসংখ্য কাজে কাপড়ের, বালিশের, চাদরের ভাঁজের সঙ্গে পরিচিত হই আমরা। মনে রাখা দরকার, চেন্নাই বা তৎকালীন মাদ্রাজে তিনি হ্যান্ডলুম বোর্ডে আর্ট ডিজাইনারের চাকরি করতেন। সে-সময় চাকরি করাকালীনও অসংখ্য কাপড়ের সেলাই, স্তূপ করে রাখা কাপড় ইত্যাদি তিনি দেখে থাকবেন এবং তাঁর অবচেতনে এইসবের উপস্থিতির সঙ্গে নানা যৌন যোগাযোগের কথাও তাঁর মনে হয়ে থাকবে এবং আর্ট ওয়ার্ক করার সময় এই অভিজ্ঞতাগুলিকে তিনি কাজে লাগান। এমন রহস্যময় নারী-উপস্থিতি নিয়ে বিখ্যাত
শিল্প-সমালোচক গীতা কাপুর লিখেছিলেন, ‘A series of related images suggest a replete mother, as well as the horror of a devouring mother. The fear is associated with the infants need and thin, at a later stage, with a boy’s sexuality. The darkness is often populated by a range of metamorphosed phallic forms that are eerie, graceful, comic by turn. (Jogen Chowdhury : Smearing the ghost with ink, Catalogue of Berlin Exhibition, text-Geeta Kapur)

কাপড়ের স্তূপ, আপেল, প্রজাপতি ইত্যাদি কত কিছুই কেমন ভাসমান হয়েছিল এই ১৯৬৮ থেকে ’৭৩-এর কাজে। সত্তর সালে বিয়ে করার কারণে যে সরাসরি যৌন অভিজ্ঞতা তাও এই কাজগুলিতে মূর্ত হয়েছে, এমন ভেবেছেন শিল্পী নিজেই। জলের মায়াময় কবিতা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল এই সিরিজ। এবং তা চেন্নাই বা মাদ্রাজে ১৯৬৮ সালে শুরু হলেও দিল্লিতে ১৯৭৩ সালে শেষ হয়। তিনি তখন চেন্নাইয়ের সর্বভারতীয় হ্যান্ডলুম বোর্ডের টেক্সটাইল ডিজাইনারের চাকরি ছেড়ে ’৭২ সালে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে কিউরেটরের পদে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু এই মায়াময় জলের উপস্থিতি আবার যোগেন চৌধুরীর ছবিতে হঠাৎই বৃহৎ আকারে ফিরে এসেছিল; কিন্তু আরো পরিবর্তিত মেটাফরে, রূপকল্পে তা হলো ১৯৭৮-এ তাঁর আঁকা একটা মাস্টারপিস, প্রতিভার অসাধারণ দক্ষতায় করা ‘Tiger in the moonlit night’. রাজনৈতিকভাবে সে-সময় ভারতে জরুরি অবস্থা বা ইমার্জেন্সি ঘোষণা হয়েছিল এবং শিল্পী ও মানুষ হিসেবে যোগেন চৌধুরী দেশের রাজধানীতে থেকে সেই দমনমূলক রাজনীতি ও তার প্রভাব লক্ষ করেছিলেন। একথা মনে রাখা দরকার, দেশে দমনমূলক সামাজিক অবস্থায় যখন মানুষের সৃষ্টিশীল স্বাধীনতার ওপরও সেন্সরশিপ ও নানা বাধা চাপিয়ে দেওয়া হয় তখন সৃষ্টিশীল শিল্পী তাঁর কাজে নতুন মেটাফর বা পারফর্ম উপমা নিয়ে আসেন এবং যোগেন চৌধুরী তা করে উঠতে পেরেছিলেন বলেই এত উল্লেখযোগ্য একটা শিল্পসৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

কাজুবাদামের মতো এক ফালি বাঁকা চাঁদ ওঠা ঘন রাত্রিতে সে ছবিতে একটা গর্ভবতী মৃত নতমুখ নারী যেন অন্ধকার কোনো নদীতে ভেসে চলেছে এবং পাড়ে বসে আছে, ওত পেতে এক বিশালকায় বাঘ। এই ছবিতে পাড়, জল মিলেমিশে একাকার, তাদের আলাদা করে ফারাক করা যায় না। ফলে বাঘ, গর্ভবতী মৃত নারী ও চাঁদ সবই ভাসমান দেখায়। পরবর্তীকালে গুজরাট দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতেও যোগেন চৌধুরীর ছবিতে অসহায় গর্ভবতী নারী এসেছে, এসেছে এইমাত্র জন্ম নেওয়া মৃত/জীবিত কোনো শিশুর উপস্থিতি। এই ছবিতে দেশ ভাগের স্মৃতি ও কুশাসনের অভিজ্ঞতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।

যোগেন চৌধুরীর ছবিতে শুধু হাত আঁকা দেখে যেমন দর্শকের মনে হতে পারে কবি জীবনানন্দ দাশের ‘নগ্ন নির্জন হাতে’র কথা, তেমনি এই ‘Tiger in the moonlit night’ ছবিতে মৃত গর্ভবতী নারীকে দেখে মনে পড়ে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘আমি স্বেচ্ছাচারী’ কবিতাটি। প্রসঙ্গত, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কালি ও কলমে প্রতিকৃতিও এঁকেছিলেন যোগেন চৌধুরী সেই ষাটের দশকেই।

বিখ্যাত কবিতাটির প্রথম চার লাইন হলো এমন –

তীরে কি প্রচন্ড কলরব

‘জলে ভেসে যায় কার শব

কোথা ছিল বাড়ি?’

রাতের কল্লোল শুধু বলে যায় – ‘আমি স্বেচ্ছাচারী’।

(শ্রেষ্ঠ কবিতা – শক্তি চট্টোপাধ্যায়)

 

এই ছবিতেও মৃত নতমুখ ভেসে যাওয়া নারীকে দেখে প্রশ্ন জাগে, ‘জলে ভেসে যায় কার শব। কোথা ছিল বাড়ি?’ হতে পারে, এই নারী হয়তো ভারতমাতার রূপান্তরিত কোনো করুণ রূপক বা উপমা এবং বাঘ হয়তো হিংসা বা হিংসাজনিত ভয়। অথবা বাঘটা যেন কাগজের বাঘ বা পেপার টাইগার, যা বনের বাঘ নয়, বরং সামগ্রিক মানুষের মনের ভয়ের কারণে উপস্থিত কাল্পনিক বাঘ। ‘Reminiscences of Dream’ সিরিজে যা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতি, স্বপ্ন, যৌনতা, ভাসমান কল্পনা তা এই বৃহৎ ছবিটিতে (১৫২ সেমি x ২২৮ সেমি, ১৯৭৮) এক গভীর রাজনৈতিক উপস্থিতিও নিয়ে এলো, যেখানে রয়ে গেছে সামগ্রিক ভয় ও জীবিতের নয়, বরং মৃতের ভেসে থাকার করুণা। কাগজের হলে বাঘটা থেকেও নেই, অন্তত প্রাণের দিক থেকে নেই। স্টুডিওতে পড়ে থাকা একটা দেশলাই বাক্সের ওপর একটা বাঘের ছবি দেখে হঠাৎই বাঘ আঁকার পরিকল্পনা এসেছিল শিল্পীর; কিন্তু এমন গভীর হয়ে উপস্থিত হলো সে ছবিতে, যা আধুনিক ভারতীয় শিল্পকর্মের সাপেক্ষে অতুলনীয়। তারপর যোগেন চৌধুরীর ছবিতে জলের উপস্থিতি, অনুভব আর সরাসরি তেমন থাকেনি। ভারতীয় জরুরি অবস্থা বা ইমার্জেন্সির ওপর ভিত্তি করে চেতন-অবচেতন মিলিয়ে আর কোনো এমন ছবি যে আঁকা হয়নি, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। স্বপ্নময়তার সঙ্গে মিশে গেছে ভয়ের, উৎকণ্ঠার সামগ্রিক পরিবেশ। সুররিয়ালিস্ট অতিবাস্তবতা এমন সীমিত রঙের প্রয়োগে আরো তীব্র, গাঢ় হয়েছে ছবিটি এবং জরুরি অবস্থাকে চিহ্নিত করায় ছবিটির নান্দনিকতায় ঐতিহাসিক ভিত্তিও থেকে যায়।

Leave a Reply

*